আল্লাহকে রব ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবী হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট থাকা সংক্রান্ত দুআটি কখন পাঠ করা সুন্নাহ

প্রশ্ন: আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে নবী হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট থাকা ব্যক্তির জন্য জান্নাত ওয়াজিব সংক্রান্ত দুআটি কখন পাঠ করা সুন্নাহ?
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য এবং অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর— রাসূল (ﷺ) এর বানী:“رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا، وَبِالإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا/رَسُولًا”অর্থ: “আমি আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মাদ ﷺ-কে নবী/রাসূল হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট।”এটি অত্যন্ত মহান, তাৎপর্যপূর্ণ ও ঈমানবর্ধক একটি বাক্য। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহকে রব হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট থাকা, অর্থাৎ- তাঁর রবূবিয়্যাতের সকল বিষয়ের উপর সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত বিষয়কে নিজের জন্য কল্যাণকর হিসেবে মেনে নেয়া। ইসলামকে তার দ্বীন হিসেবে মেনে নেওয়ার অর্থ হলো ইসলামের সকল আদেশ-নিষেধ ও বিধি-বিধানকে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়া ও এসবের বিরুদ্ধাচরণ না করা। এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রসূল হিসেবে মেনে নেয়ার অর্থ তিনি বিশ্বাসগত এবং ‘আমলগত যেসব বিষয় নিয়ে আগমন করেছেন তার সব কিছুকেই মেনে নেয়া তার প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য প্রকাশ করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে এই বাক্যটি বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সব হাদিসে এই বাক্যটি একই প্রসঙ্গে, একই উদ্দেশ্যে কিংবা একই সময় পাঠ করার জন্য বর্ণিত হয়নি। কোনো বর্ণনায় এটি ঈমানের স্বাদ লাভের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েছে; কোনো বর্ণনায় এর মাধ্যমে জান্নাত লাভের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে; আবার কোনো বর্ণনায় নির্দিষ্ট যিকির হিসেবে সকালে পাঠ করার কথা এসেছে। অনুরূপভাবে, আযানের পরও এ বাক্য পাঠের একটি স্বতন্ত্র হাদিস রয়েছে। সুতরাং, এ বিষয়ে সঠিক সুন্নাহ জানার জন্য প্রতিটি হাদিসের প্রসঙ্গ, শব্দরূপ ও পাঠের সময় পৃথকভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
.
প্রথমত: “আমি আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মাদ ﷺ-কে নবী হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট”— এই মহান বাক্যটি রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে একাধিক সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তবে বিভিন্ন হাদিসে এর প্রসঙ্গ ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য এক নয়। কোনো কোনো বর্ণনায় এটি আল্লাহকে রব হিসেবে গ্রহণ করা, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে মেনে নেওয়া এবং মুহাম্মাদ ﷺ-কে নবী হিসেবে স্বীকার করার প্রতি বান্দার সন্তুষ্টি ও ঈমানের প্রকাশ হিসেবে এসেছে। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় এটি নির্দিষ্ট যিকির হিসেবে পাঠ করার ফযীলত ও সময় বর্ণনা করতে এসেছে। এই প্রথম ধরনের বর্ণনাগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাদিস রয়েছে।
.
(১).আব্বাস ইবনু আব্দুল মুত্তালিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:ذَاقَ طَعْمَ الإِيْمَانِ مَنْ رَضِىَ بِاللهِ رَبًّا وَبِالإِسْلَامِ دِينًْا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا”যে ব্যক্তি আল্লাহকে রব হিসাবে, ইসলামকে দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) হিসাবে এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে রাসূল হিসাবে সন্তুষ্ট হয়েছে, সে ব্যক্তিই ঈমানের প্রকৃত স্বাদ পেয়েছে”।(সহীহ মুসলিম, হা/৩৪; তিরমিযী, হা/২৬২৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৭৮; সহীহ ইবনু হিব্বান, হা/১৬৯৪)
.
(২).আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন:قَالَ يَا أَبَا سَعِيْدٍ مَنْ رَضِىَ بِاللهِ رَبًّا وَبِالإِسْلَامِ دِيْنًا وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ”হে আবূ সাঈদ! যে ব্যক্তি এই বলে ঘোষণা করবে যে, আল্লাহকে রব হিসাবে, ইসলামকে দ্বীন হিসাবে এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে নবী হিসাবে পেয়ে আমি সন্তুষ্টি আছি, তাহলে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব।”(সহীহ মুসলিম, হা/১৮৮৪; নাসাঈ, হা/৩১৩১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১১১১৭; ইবনু হিব্বান, হা/৪৬১২)
.
লক্ষণীয় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম হাদিসে বলেছেন: «وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا»—“এবং মুহাম্মাদকে রাসূল হিসেবে”, আর দ্বিতীয় হাদিসে বলেছেন: «وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا»—“এবং মুহাম্মাদকে নবী হিসেবে।” সুতরাং, কেউ যখন এই বাক্যটি উল্লেখ, উপস্থাপন বা সাব্যস্ত করতে চাইবে, তখন সে «وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا» অথবা «وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا»—উভয়ের যেকোনো একটি বলতে পারে; এতে কোনো আপত্তি নেই। কারণ ‘নবী’ ও ‘রাসূল’—উভয় শব্দই এখানে একই ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে ব্যবহৃত হয়েছে এবং উভয় শব্দের মাধ্যমেই হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে, যা উপরোক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট।
.
দ্বিতীয়ত: এটি এমন একটি মাসনূন যিকির, যার শব্দ ও শব্দরূপ হাদিসে নির্দিষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাই সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি হলো—যিকিরকারী হাদিসে বর্ণিত শব্দরূপেরই যথাযথ অনুসরণ করবেন এবং নিজের পক্ষ থেকে এর শব্দ পরিবর্তন করবেন না। এই যিকিরটি একাধিক স্থানে বর্ণিত হয়েছে; এর মধ্যে তিনটি স্থান সহিহ সূত্রে প্রমাণিত।
.
প্রথম স্থান: কোনো নির্দিষ্ট সময় বা স্থান নির্ধারণ না করে সাধারণভাবে এটি যিকির হিসেবে পাঠ করা। এ প্রসঙ্গে আবু দাউদ তাঁর সুনানে প্রখ্যাত সাহাবী আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:مَنْ قَالَ رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا وَبِالإِسْلاَمِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولاً وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ ‏”‏ ‏ “যে ব্যক্তি বলে, আমি আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মদ (ﷺ)-কে রাসূল হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিয়েছি, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে।”(সুনানে আবূ দাউদ, হাদিস নং ১৫২৯; শাইখ আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) সহিহ আবু দাউদ (১৩৬৮)-এ হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। অতএব, এই বর্ণনায় ব্যবহৃত নির্দিষ্ট শব্দ হলো:وبمحمد رسولاً—‘মুহাম্মদকে রাসুল হিসেবে’; সুতরাং সুন্নাহসম্মত যিকির হিসেবে এই শব্দরূপটিই অনুসরণ করা উচিত।
.
দ্বিতীয় স্থান: মুআযযিনের আযান শোনার সময়। এ বিষয়ে ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ মুসলিমে সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত:তিনি বলেন, কোন ব্যক্তি মুয়াজ্জিনের আজান শোনার পর নিম্নোক্ত দোয়া পড়লে তার গুনাহ ক্ষমা করা হবে: ‏ “‏ مَنْ قَالَ حِينَ يَسْمَعُ الْمُؤَذِّنَ وَأَنَا أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا وَبِالإِسْلاَمِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا غُفِرَ لَهُ ذَنْبُهُ ‏”‏ ‏ “আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ছাড়া কোন হক ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দেই যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। আমি আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে নবী হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট”।(সহীহ মুসলিম হা/৩৮৬; ইবনে মাজাহ হা/৭২১)
.
তৃতীয় স্থান: সকালে উপনীত হলে এই যিকিরটি পাঠ করা। এ বিষয়ে ইমাম তবারানি তাঁর আল-মু‘জামুল কাবীর গ্রন্থে নবী ﷺ-এর সাহাবি মুনাইযির (রাদিয়াল্লাহু আনহু)—যিনি ইফরীকিয়ায় অবস্থান করতেন—এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি: «مَنْ قَالَ إِذَا أَصْبَحَ: رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا، فَأَنَا الزَّعِيمُ لِأَخْذِ بِيَدِهِ حَتَّى أُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ» — “যে ব্যক্তি সকালে বলবে: ‘আমি আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মদ ﷺ-কে নবী হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করলাম’, আমি তার হাত ধরে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর দায়িত্ব গ্রহণ করলাম।”(আল-মু‘জামুল কাবীর (২০/৩৫৫) শায়খ আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) সিলসিলাতুস সহিহাহ হা/২৬৮৬)-এ এই শব্দসহ হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। সুতরাং এখানে বর্ণিত শব্দরূপটি হলো:وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا—অর্থাৎ, “মুহাম্মদ ﷺ-কে নবী হিসেবে।”
.
পরিশেষে জেনে রাখা উচিত—সকাল ও সন্ধ্যায় এটি পাঠ করার বিষয়ে কিছু বর্ণনা পাওয়া গেলেও সেগুলোর সনদে দুর্বলতা রয়েছে; এ কারণেই শায়খ আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) সিলসিলাতুয-দঈফাহ (হাদিস নং ৫০২০)-এ সেগুলোকে দুর্বল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে, অনেকের মুখে দু’আ হিসেবে «وبمحمد نبيًّا ورسولًا»—অর্থাৎ ‘মুহাম্মদকে নবী ও রাসূল হিসেবে’—এই শব্দদ্বয় একত্রে উচ্চারণ করতে দেখা যায়। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত কোনো সহিহ হাদিসে, দ্বীনের কোনো বিধান সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে কিংবা যিকির-আযকার ও অজিফার ক্ষেত্রে, «نبيًّا ورسولًا» শব্দদ্বয় একত্রে বলার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই আমল ও যিকিরের ক্ষেত্রে আমাদের উচিত সহিহ ও প্রমাণিত বর্ণনার ওপরই নির্ভর করা এবং প্রমাণহীন শব্দ বা পদ্ধতি থেকে বিরত থাকা। আল্লাহ তা‘আলাই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: