প্রশ্ন: কোনো মুসলিম যুবক অবৈধভাবে অভিবাসনের উদ্দেশ্যে ইতালিতে যাওয়ার জন্য সমুদ্রপথে যাত্রা করার সময় পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করলে, শরিয়তের দৃষ্টিতে কি তাকে শহীদ হিসেবে গণ্য করা হবে?
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য এবং অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর, ইসলামী শরিয়তে পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী মুসলিম ব্যক্তিকে শহীদদের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হয়েছে। তবে শুধু পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার কারণে আমরা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ‘শহীদ’ বলে ঘোষণা করব না; কারণ তার প্রকৃত পরিণতি সম্পর্কে আমরা অবগত নই। কিন্তু সাধারণভাবে বলা যায়, যে মুসলিম ব্যক্তি পানিতে ডুবে মারা যায়, সে শহীদ।ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুমাল্লাহ) আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «الشُّهَدَاءُ خَمْسَةٌ: الْمَطْعُونُ، وَالْمَبْطُونُ، وَالْغَرِيقُ، وَصَاحِبُ الْهَدْمِ، وَالشَّهِيدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ» অর্থাৎ, “শহীদ পাঁচ প্রকার: মহামারিতে মৃত্যুবরণকারী, পেটের রোগে মৃত্যুবরণকারী, পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকারী এবং আল্লাহর পথে নিহত ব্যক্তি।”(সহীহ বুখারি, হাদীস নং ২৮২৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯১৪)। সুতরাং, হাদীসের বাহ্যিক অর্থ অনুযায়ী, পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী মুসলিম ব্যক্তি শহীদের মর্যাদা লাভকারীদের অন্তর্ভুক্ত। এ মর্যাদা লাভের জন্য তার সমুদ্রযাত্রা জিহাদ কিংবা শরিয়তসম্মত হিজরতের উদ্দেশ্যে হওয়া শর্ত নয়।তবে কোনো মুসলিম যুবক অবৈধভাবে অভিবাসনের উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে যাত্রা করার সময় পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করলে, তার ক্ষেত্রে ডুবে মৃত্যুবরণকারীর জন্য শহীদের মর্যাদা-সংক্রান্ত বিধান প্রযোজ্য হবে কি না,তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট শরয়ি নীতিমালা ও আলেমদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।কেননা, এ ক্ষেত্রে একদিকে রয়েছে পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারীর জন্য হাদীসে বর্ণিত শহীদের মর্যাদা, অন্যদিকে রয়েছে সফরের উদ্দেশ্য, সমুদ্রযাত্রার নিরাপত্তা এবং যাত্রাকালে শরিয়তবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত হওয়ার বিষয়। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে আলেমদের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে এ বিষয়ে মূলত দুটি মত পাওয়া যায়।
.
প্রথম মত: একদল আলেমের মতে, গুনাহপূর্ণ উদ্দেশ্যে সফরে বের হওয়ার কারণে ওই ব্যক্তির জন্য শহীদের মর্যাদা প্রযোজ্য হবে না।
.
দ্বিতীয় মত: অন্য একদল আলেমের মতে, কেবল গুনাহপূর্ণ উদ্দেশ্যে সফরে বের হওয়া পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করার কারণে অর্জিত শহীদের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়; বরং মৃত্যুর সময় সে সরাসরি কোনো গুনাহে লিপ্ত ছিল কি না, তা বিবেচ্য।
.
শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃত্যু: ৭২৮ হি.)-কে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে যাত্রা করেছিলেন এবং পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি কি শহীদ হিসেবে গণ্য হবেন? উত্তরে তিনি বলেন:
نعم، مات شهيدًا، إذا لم يكن عاصيًا بركوبه، فإنَّه قد صحَّ عن النَّبي صلى الله عليه وسلم أنه قال: (الغريق شهيدٌ، والمبطون شهيدٌ، والحريق شهيدٌ، والميت بالطاعون شهيدٌ، والمرأة تموت في نفاسها شهيدةٌ، وصاحب الهدم شهيدٌ)، وجاء ذكر غير هؤلاء. وركوب البحر للتجارة جائزٌ إذا غلب على الظن السلامة، وأما بدون ذلك فليس له أن يركبه للتجارة، فإن فعل فقد أعان على قتل نفسه، ومثل هذا لا يقال: إنه شهيد، والله أعلم
“হ্যাঁ, তিনি শহীদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছেন—যদি সমুদ্রযাত্রা করার কারণে তিনি অবাধ্য (গুনাহগার) না হয়ে থাকেন। কেননা নবী (ﷺ) থেকে সহীহভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন:”পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, পেটের রোগে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, মহামারিতে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, প্রসবকালীন অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী নারী শহীদ এবং ধসে পড়া স্থাপনার নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ।”এ ছাড়া আরও কয়েক শ্রেণির শহীদের কথাও বর্ণিত হয়েছে।ব্যবসার উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে যাত্রা করা জায়েয, যদি নিরাপদে যাত্রা সম্পন্ন হওয়ার প্রবল ধারণা থাকে। কিন্তু নিরাপদে যাত্রা সম্পন্ন হওয়ার এমন প্রবল ধারণা না থাকলে ব্যবসার উদ্দেশ্যে তার সমুদ্রপথে যাত্রা করা জায়েয নয়। সে যদি তা সত্ত্বেও যাত্রা করে, তবে সে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার কাজে সহায়তা করেছে। এমন ব্যক্তিকে শহীদ বলা যায় না। আর আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।”—ইবনু তাইমিয়্যাহ, আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২২)
.
খতীব আশ-শিরবীনী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
واستثنى بعضهم من الغريق العاصي بركوبه البحر ، كأن كان الغالب فيه عدم السلامة ، أو استوى الأمران ، أو ركبه لشرب خمر , ومن الميتة بالطلق الحامل بزنا , والظاهر كما قال الزركشي فيما عدا الأخيرة , وفي الأخيرة أيضا أن ما ذكر لا يمنع الشهادة
“কিছু আলিম পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারীদের মধ্য থেকে এমন ব্যক্তিকে ব্যতিক্রম করেছেন, যে পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রা করেছে। যেমন—এমন সমুদ্রপথে যাত্রা করা, যেখানে সাধারণত নিরাপদে ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে না, অথবা যেখানে নিরাপদে ফিরে আসা ও ধ্বংসের আশঙ্কা সমান; কিংবা মদপানের উদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রা করা। অনুরূপভাবে, ব্যভিচারের ফলে গর্ভবতী হওয়া কোনো নারীর প্রসববেদনার সময় মৃত্যুবরণকেও ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আল-জারকাশী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্যের আলোকে, শেষোক্ত বিষয়টি ছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রে এবং এমনকি শেষোক্ত ক্ষেত্রেও সঠিক অভিমত হলো—উল্লিখিত বিষয়গুলোর কোনোটিই শাহাদাতের মর্যাদা লাভের অন্তরায় নয়।”(খতীব আশ-শিরবীনী (রাহিমাহুল্লাহ), মুগনিল মুহতাজ, ২/৩৪)
.
হাশিয়াতুল বুজাইরিমি ‘আলাল-খতীব’-এ এসেছে:
قوله : (كالغريق) أي ولو كان عاصيا بركوب البحر ، كأن ركب سفينة لا يسير مثلها في ذلك البحر لصغرها أو ثقلها . والعصيان بالتعدي بالركوب في هذه الحالة لا ينافي حصول الشهادة . ثم نقل عن بعض علماء الشافعية قوله : (كالغريق) ما لم يسيّر السفينة في وقت الغرق , ولا يمنع من شهادته ركوبها لشرب الخمر إن لم يمت بشرق ب
“তাঁর এই বাণী: ‘(পানিতে ডুবে মারা যাওয়া ব্যক্তির মতো)’— অর্থাৎ, সমুদ্রযাত্রার কারণে সে পাপিষ্ঠ হয়ে থাকলেও (শহীদের মর্যাদা লাভ করবে)।যেমন,কেউ এমন কোনো নৌযানে আরোহণ করল, যা আকারে ছোট হওয়া কিংবা অতিরিক্ত ভারী হওয়ার কারণে ওই সমুদ্রে চলাচলের উপযোগী নয়। এ অবস্থায় (নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে) এমন নৌযানে আরোহণের মাধ্যমে সীমালঙ্ঘন করে গুনাহগার হওয়া তার শাহাদাতের মর্যাদা লাভের পরিপন্থী নয়।এরপর তিনি শাফেয়ী মাজহাবের কোনো কোনো আলেমের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন: “(ডুবে মারা যাওয়া ব্যক্তি’র হুকুম প্রযোজ্য হবে)— যতক্ষণ না সে ডুবির ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তে নিজেই নৌকাটি পরিচালনা করে। আর আর মদ পান করার উদ্দেশ্যে নৌযানে আরোহণ করাও তার শাহাদাতের মর্যাদা লাভের প্রতিবন্ধক নয়, যদি না সে মদ পানের কারণে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়।”(সূত্র: হাশিয়াতুল বুজাইরিমি ‘আলাল-খতীব, ২/২৮১)
.
পরিশেষে বলা যায়, পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী মুসলিম ব্যক্তির জন্য হাদীসে শহীদের মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে। তবে অবৈধ অভিবাসনের উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে যাত্রা করার সময় কেউ ডুবে মারা গেলে, তার ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হবে কি না, তা এককথায় নির্ধারণ করা যায় না; বরং এ ক্ষেত্রে যাত্রার প্রকৃতি, নিরাপত্তার অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট শরয়ি বিধান বিবেচনা করা জরুরি। আলেমদের বক্তব্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গুনাহপূর্ণ বা শরিয়তবিরোধী পরিস্থিতিতে সমুদ্রযাত্রা করার কারণে পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারীর শহীদের মর্যাদা লাভের বিষয়টি নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একদল আলেম এ ধরনের পরিস্থিতিকে শহীদের মর্যাদা লাভের প্রতিবন্ধক মনে করেছেন; অন্যদিকে, কোনো কোনো আলেমের বক্তব্য অনুযায়ী, সমুদ্রযাত্রায় গুনাহ সংঘটিত হওয়ামাত্রই পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারীর জন্য বর্ণিত শহীদের মর্যাদা নাকচ হয়ে যায় না। সুতরাং, শুধু অবৈধ অভিবাসনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার কারণে কোনো ব্যক্তির জন্য শহীদের মর্যাদা নিশ্চিতভাবে অস্বীকার করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি কেবল পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করার কারণে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিশ্চিতভাবে শহীদ ঘোষণা করাও সমীচীন নয়। বরং এ বিষয়ে আলেমদের মতভেদ ও সংশ্লিষ্ট শরয়ি নীতিমালা বিবেচনায় নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে বক্তব্য দেওয়া উচিত। আর নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত অবস্থা ও পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।(আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১৩৪০৪০)
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।