সৌদি আরবকে কেন তাওহিদের দেশ বলা হয়

ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি।অতঃপর, পৃথিবীর মানচিত্রে সৌদি আরব কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ডের নাম নয়; বরং এটি ইসলামের পবিত্র ভূমি, মক্কা-মদিনার দেশ এবং মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি ভূখণ্ড। অষ্টাদশ শতকে সৌদি শাসকগোষ্ঠী ও সংস্কারক ইমাম মুহাম্মদ ইবনু আবদুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ)-এর তাওহিদভিত্তিক দাওয়াতের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এ অঞ্চলে শিরক ও বিদআতের বিরুদ্ধে ব্যাপক সংস্কারমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরবর্তী সময়েও তাওহিদের শিক্ষা প্রচার, কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ, মসজিদ ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং শিরক ও বিদআত থেকে সতর্ক করার ক্ষেত্রে সৌদি আরব বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। এসব ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে সৌদি আরবকে অনেকেই ‘তাওহিদের দেশ’ হিসেবে অভিহিত করেন। আলহামদুলিল্লাহ, ইসলামের দুই পবিত্রতম মসজিদের আবাসভূমি হিসেবে দেশটির ধর্মীয় গুরুত্ব মুসলিম বিশ্বের কাছে অনন্য।
.
বর্তমান সৌদি আরব সম্পর্কে বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, “আমি যা বলছি তা আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি- প্রকৃতপক্ষে, আমি বর্তমান পৃথিবীতে এমন কোন দেশকে জানি না, যেখানে আল্লাহর আইন প্রয়োগ করা হয়, যেভাবে এই পবিত্র ভূমিতে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। আমি বলতে চাচ্ছি সঊদী আরবের আরব সাম্রাজ্যের কথা। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা আমাদের উপর আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ, যে আমরা এই দেশের অধিবাসী। তাই আসুন আমরা আজ যে অবস্থায় আছি তা সংরক্ষণ করি, বরং আসুন আমরা আজকে যা করছি তার চেয়ে বেশী আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করি। আমি পরিপূর্ণতার দাবি করছি না, তবে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরাই শীর্ষে আছি। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আমাদের অনেক কিছুই বর্জিত, তবে আমরা আরও ভাল করতে পারি। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, কারণ আমরা অন্যান্য দেশ সম্পর্কে যা জানি তার তুলনায় আমরা অনেকটাই এগিয়ে। আমরা দরিদ্রদের পাশে থাকি, ভীতিগ্রস্থ মানুষদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করি, অজ্ঞদের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করি এবং এই ইসলামী রাষ্ট্রে সকলেই সম্মানের সহিত বসবাস করি। বিশুদ্ধ ইসলাম ধর্মকে আঁকড়ে ধরার কারণে আজ আমরা অনেকেরই চক্ষুশূল। বিদ্বেষপূর্ণ লোকদের অন্তরে আমাদের প্রতি ক্রোধ জেগে ওঠে। তারা চায় আমরা যে অবস্থায় আছি তার অস্তিত্ব বন্ধ হয়ে যাক…! (শাইখ আহমদ বাযমূল, দাওলাতুত তাওহীদ ওয়াস-সুন্নাহ, পৃ. ১১)
.
শাইখ আহমাদ ইবনু উমার ইবনু সালিম বাযমূল (রাহিমাহুল্লাহ) ও শাইখ সালিহ আল-লুহাইদান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,”এই দেশ ইসলামের প্রাণকেন্দ্র এবং পবিত্র স্থান। এটি শান্তি ও নিরাপত্তার অনেক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে যার মিল বিশ্বে খুঁজে পাওয়া যায় না। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, বর্তমান বিশ্বের সরকারগুলোর মধ্যে এটিই সেরা। এর অর্থ এই নয় যে, এটি নিখুঁত, এ কথা কেউ বলে না যে এটি নিখুঁত, বরং এর মধ্যেও ভুল রয়েছে, তবে তা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। সে কারণে, দেশের মধ্যে ও বাহিরে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয, সে যেন দৃঢ়তার সহিত সত্যের উপর অটল থাকে এবং নির্যাতিতদের সাহায্য করে। তাওহীদের বিশুদ্ধ আক্বীদাহ গ্রহণ করে এবং নির্ধারিত ইসলামী আইন প্রণয়ন করে।(দাওলাতুত তাওহীদ ওয়াস-সুন্নাহ, পৃ. ১৪)
.
শাইখ আব্দুল আযীয ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘আল্লাহ্ তা‘আলা বাদশাহ আব্দুল আযীযের জন্মের মাধ্যমে মুসলিমদের সীমাহীন উপকার করেছেন। তিনি ঐক্য এনেছেন, সত্যকে উত্থাপন করেছেন, তাঁর দ্বীনকে সাহায্য করেছেন এবং তাঁর পথে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। যার ফলে প্রচুর জ্ঞান, প্রচুর বরকত, ন্যায় প্রতিষ্ঠা, সত্যকে সাহায্য করা, সত্যের প্রচার করা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আল্লাহর দিকে ডাকা অর্থাৎ তাওহীদ, সুন্নাহ ও সালাফদের পথে আহ্বান জানিয়েছেন। অতঃপর তাঁর পরে তাঁর সন্তানরাও এই পথেই হাঁটতে থাকে। তাঁরাও সত্য প্রতিষ্ঠায়, ন্যায়বিচারের প্রচারে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। এই সঊদী রাষ্ট্র একটি বরকতময় রাষ্ট্র। আল্লাহ সত্য ধর্মকে সাহায্য করেছেন এবং তাঁর মাধ্যমে ঐক্য এনেছেন এবং দুর্নীতির পথ বন্ধ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মাধ্যমে যমীনে নিরাপত্তা আনয়ন করেন এবং সেখানে মহান নে‘মত সংঘটিত হয়, যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গণনা করতে পারে না’।(দাওলাতুত তাওহীদ ওয়াস-সুন্নাহ, পৃ. ৯-১০)
.
বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছ আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,”আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আরব উপদ্বীপে এবং সমস্ত মুসলিম ভূখণ্ডে নিরাপত্তা ও বরকত রক্ষা করেন এবং তিনি তাওহীদের রাষ্ট্র অর্থাৎ সঊদী আরবের সাম্রাজ্যকে সংরক্ষণ করেন”।(দাওলাতুত তাওহীদ ওয়াস-সুন্নাহ, পৃ. ১২)
.
সঊদী বাদশাহ সাউদ ইবনু আব্দিল আযীয (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,”সর্বপ্রথম আমাদের যে বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিত তা হল- আমরা সকলেই আল্লাহর রজ্জু অর্থাৎ কিতাব ও সুন্নাহকে দৃঢ়তার সহিত আঁকড়ে ধরি এবং আমরা আমাদের দেশের মধ্যে সেই উপায়গুলোকে কাজে লাগাই, যা সমাজের সমস্ত ব্যক্তির হৃদয়ে বিশুদ্ধ তাওহীদের চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং যাতে সবাই আন্তরিকভাবে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে”।(দাওলাতুত তাওহীদ ওয়াস-সুন্নাহ, পৃ. ৪১)
.
❑ নিম্নে সৌদি আরবকে ‘তাওহিদের দেশ’ বলার পেছনে উল্লেখযোগ্য ১৭টি কারণ তুলে ধরা হলো:
.
​১. জাতীয় পতাকায় কালিমাতুত তাওহিদের চিরন্তন ও প্রকাশ্য ঘোষণা: সৌদি আরবের জাতীয় পতাকা কেবল একটি ভূখণ্ডের ভৌগোলিক প্রতীক নয়; বরং এটি পুরো বিশ্বে তাওহিদ ও রিসালাতের রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারনামা। পতাকার সবুজ পটভূমিতে সুবিন্যস্ত অক্ষরে শোভা পাচ্ছে কালিমাতুত তাওহিদ— ‘لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ’ (আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসূল)। আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্র তার জাতীয় পরিচয়ে ও পতাকায় তাওহিদকে এভাবে প্রকাশ্য ও সর্বোচ্চ স্থান দেয়নি, যা দেশের প্রতিটি নাগরিক ও বিশ্ববাসীর মনে প্রতিনিয়ত তাওহিদের চেতনাকে জাগ্রত রাখে।
.
​২. শিরক ও কুসংস্কারমুক্ত পবিত্র ধর্মীয় পরিবেশের সুরক্ষা: তাওহিদের মূল দাবি হলো যাবতীয় ইবাদত একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা। ‘তাওহিদের দেশ’ হিসেবে পরিচিত সৌদি আরবে ইবাদতের এই মৌলিক ভিত্তিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে পিরপূজা, মাজারপূজা, কবরকে কেন্দ্র করে সেজদা বা মানত করা কিংবা গাছ, পাথর বা খুঁটি ঘিরে প্রচলিত তাবৎ শিরক ও কুসংস্কারমূলক আচার-অনুষ্ঠানের প্রকাশ্য চর্চা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসূলে কারীম (ﷺ)-এর নির্দেশিত ও সালাফে সালেহীনের অনুসৃত আকীদার আলোকে একটি শিরকমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ এবং তাওহিদের সুমহান চেতনাকে জিইয়ে রাখাই এ দেশের রাষ্ট্রীয় নীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
.
​৩. ইসলামের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা ও অমুসলিমদের প্রকাশ্য উপাসনালয় নিষিদ্ধকরণ: রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পবিত্র নির্দেশনার আলোকে আল-জাজিরাতুল আরাব বা হিজাজ ভূখণ্ডকে শিরক ও কুফর থেকে মুক্ত রেখে তাওহিদের মূল চেতনাকে সুরক্ষার লক্ষ্যে সৌদি আরবে অমুসলিমদের কোনো প্রকাশ্য গির্জা, মন্দির বা উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেওয়া হয় না। একই সাথে মূর্তিপূজা, ক্রুশ প্রদর্শন কিংবা অন্যান্য ধর্মের যাবতীয় প্রকাশ্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান উদযাপনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখা হয়েছে, যা ভূখণ্ডটির ঐতিহাসিক ইসলামী পরিচয়, স্বাতন্ত্র্য এবং তাওহিদের নিশান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
.
​৪. কবরকেন্দ্রিক অতিরঞ্জন ও বিজাতীয় রীতিনীতি দমন: বিভিন্ন সমাজ ও সুফি ভাবধারার প্রভাবে কবরকে কেন্দ্র করে শিরক ও বিদআতের যে বিস্তার ঘটেছে, তা থেকে উম্মাহর আকিদা ও তাওহিদ সুরক্ষায় রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহ হুবহু বাস্তবায়ন করা হয়। এ লক্ষ্যে সৌদি আরবে কবর পাকা করা, কবরের ওপর গম্বুজ বা সুরম্য স্থাপনা নির্মাণ, চুনকাম, আলোকসজ্জা এবং কবরবাসীর নিকট কোনো প্রকার প্রার্থনা বা সাহায্য চাওয়া রাষ্ট্রীয় আইনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে; যাতে মুসলিম উম্মাহ সর্বপ্রকার শিরক ও অনৈসলামিক সংস্কৃতি থেকে মুক্ত থেকে একত্ববাদের বিশুদ্ধ ধারায় অবিচল থাকতে পারে।
.
৫. কবরকেন্দ্রিক অতিরঞ্জন ও বিজাতীয় রীতিনীতি দমন: বিভিন্ন সমাজ ও সুফি ভাবধারার প্রভাবে কবরকে কেন্দ্র করে শিরক ও বিদআতের যে বিস্তার ঘটেছে, তা থেকে উম্মাহর আকিদা ও তাওহিদ সুরক্ষায় রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহ হুবহু বাস্তবায়ন করা হয়। এ লক্ষ্যে সৌদি আরবে কবর পাকা করা, কবরের ওপর গম্বুজ বা সুরম্য স্থাপনা নির্মাণ, চুনকাম, আলোকসজ্জা এবং কবরবাসীর নিকট কোনো প্রকার প্রার্থনা বা সাহায্য চাওয়া রাষ্ট্রীয় আইনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে; যাতে মুসলিম উম্মাহ সর্বপ্রকার শিরক ও অনৈসলামিক সংস্কৃতি থেকে মুক্ত থেকে একত্ববাদের বিশুদ্ধ ধারায় অবিচল থাকতে পারে।
.
৬. যাদুবিদ্যা, গণকগিরি ও প্রতারণামূলক অপকর্ম দমন: খাঁটি তাওহিদের মূল ভিত্তিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং সমাজকে সকল প্রকার কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত করতে সৌদি আরবে যাদুবিদ্যা, গণকগিরি ও প্রতারণামূলক অপকর্ম কঠোরভাবে দমন করা হয়। দেশটিতে তাবিজ-কবচের রমরমা ব্যবসা, হাত বা চেহারা দেখে ভাগ্য গণনা, টিয়াপাখি দিয়ে ভবিষ্যৎ বলা এবং অলৌকিকতার ভণ্ড দাবিদার সাধুবাবাদের সমস্ত কার্যক্রমকে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।
.
৭. আকিদাবিরোধী সাহিত্য, বইপত্র ও তন্ত্রমন্ত্রের প্রসার রোধ: নতুন প্রজন্ম ও সাধারণ মুসলিমদের খাঁটি আকিদা এবং বিশুদ্ধ তাওহিদের ওপর অবিচল রাখতে সৌদি আরব বিভ্রান্তিকর দর্শন ও বাতিল মতবাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। দেশটিতে যাদুবিদ্যা, তন্ত্রমন্ত্র, শিরকি ঝাড়ফুঁক এবং সালাফি আকিদাবিরোধী যেকোনো ধরনের বইপুস্তক, লিফলেট, প্রিন্ট ও ডিজিটাল মিডিয়ার প্রচারণা এবং কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব অপসংস্কৃতি ও অনৈসলামিক উপাদানের বিস্তার কঠোরহস্তে দমন করা হয়।
.
​৮. পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সংবিধান ও শাসনব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ: সৌদি রাষ্ট্রব্যবস্থা কোনো মানব রচিত মতবাদ বা ধর্মনিরপেক্ষ নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। ১৯৯২ সালে প্রণীত দেশের ‘মৌলিক শাসনব্যবস্থা আইন’ (Basic Law of Governance)-এর প্রথম অনুচ্ছেদেই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—পবিত্র কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহই দেশের সর্বোচ্চ সংবিধান ও শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি। পাশাপাশি, সমাজকে পাপমুক্ত রাখতে ‘আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার’ (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বিভাগকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে।
.
​​৯. ইসলামি শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা বিশ্বের বুকে তাওহিদভিত্তিক শাসন ও ন্যায়বিচারের এক অনন্য বাস্তব দৃষ্টান্ত, যেখানে প্রচলিত মানব রচিত আইনের পরিবর্তে সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহ থেকে উৎসারিত বিশুদ্ধ ইসলামি শরিয়তের ভিত্তিতে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়; আর এই বিচারিক স্বচ্ছতা ও সুবিচার নিশ্চিতকরণ এবং যেকোনো ভুল রায়ের সম্ভাবনা চিরতরে বন্ধ করতে সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড বা কিসাসের মতো চরম শাস্তির ক্ষেত্রে অত্যন্ত নিখুঁত ও কঠোর ৫টি ধাপ অনুসরণ করা হয়—যেখানে প্রথমে পুলিশ ও পাবলিক প্রসিকিউশনের (النيابة العامة) মাধ্যমে গ্রেপ্তার ও তদন্ত সম্পন্ন হয়, দ্বিতীয় ধাপে প্রাথমিক আদালতে (المحكمة الجزائية) চুলচেরা বিচারিক বিশ্লেষণের পর রায় দেওয়া হয়, তৃতীয় ধাপে আসামি আপিল না করলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপিল কোর্টে (محكمة الاستئناف) ফাইল যাচাই করা হয়, চতুর্থ ধাপে সুপ্রিম কোর্ট (المحكمة العليا) সম্পূর্ণ নথি শরীয়ত অনুযায়ী পরীক্ষা করে চূড়ান্ত করে এবং পঞ্চম ও শেষ ধাপে বাদশাহ বা ক্রাউন প্রিন্সের স্বাক্ষরে “আমর মালাকি” (রাজকীয় আদেশ) জারি হওয়ার পরেই কেবল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা কার্যকরের তারিখ ঘোষণা করে; ফলে কমপক্ষে তিনটি উচ্চ আদালত এবং স্বয়ং বাদশাহর অনুমোদন সাপেক্ষে সর্বনিম্ন ৩ থেকে ৪ বছর বা তার চেয়েও বেশি দীর্ঘমেয়াদী এই সুশৃঙ্খল আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কেবল সৌদিতে চূড়ান্ত বিচার সম্পন্ন হয়ে থাকে।
.
১০. প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত তাওহিদ ও সালাফি আক্বীদার বাধ্যতামূলক শিক্ষাদান: শিক্ষা হলো আকিদা সংরক্ষণের প্রধান হাতিয়ার, আর তাই সৌদি আরবের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে তাওহিদ, ফিকহ, সুন্নাহ ও সালাফদের বিশুদ্ধ আকিদা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শৈশব থেকেই ইসলামের মৌলিক ও বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করে গড়ে ওঠে, যা তাদের সামাজিক ও দ্বীনি জীবনে যাবতীয় বিদআত ও বিভ্রান্তি থেকে সুরক্ষিত রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
.
​১১. মসজিদ, মিম্বর ও দাওয়াহ ব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় পর্যবেক্ষণ ও সুন্নাহর প্রচার: সৌদি আরবের সমস্ত মসজিদ ও মিম্বর ‘মন্ত্রণালয় অব ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স’-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়, যেখানে জুমার খুতবা, ওয়াজ ও নিয়মিত পাঠ্যসূচিতে সর্বদা তাওহিদের গুরুত্ব তুলে ধরা হয় এবং বিদআত, কুসংস্কার ও চরমপন্থা থেকে সতর্ক করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কেবল সঠিক দ্বীনি জ্ঞানে সমৃদ্ধ ও যোগ্য আলেম-ইমামগণই মিম্বরে দাঁড়িয়ে তাওহিদ ও সুন্নাহর খাঁটি বাণী প্রচারের সুযোগ পেয়ে থাকেন।
.
১২. বিশ্বমানের আলেম ও দাঈদের সম্পৃক্ততায় আন্তর্জাতিক দাওয়াহ কার্যক্রম ও প্রশিক্ষণ: সৌদি আরব কেবল নিজস্ব সীমানার মধ্যে দ্বীনি প্রচার সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং বিশ্বজুড়ে বিশুদ্ধ তাওহিদ ও সুন্নাহর বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে প্রখ্যাত আলেম, মুফতি, দাঈ ও ইসলামী চিন্তাবিদদের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ স্থাপন করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইসলামিক কনফারেন্স, কর্মশালা ও সিম্পোজিয়ামে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জ্ঞানতাপস ও গবেষকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের মূল্যবান পরামর্শ ও খুতবার মাধ্যমে স্থানীয় নাগরিক ও প্রবাসী মুসলিমদের ইসলামি জ্ঞানের আলোয় সমৃদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে, দেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত বিভিন্ন দাওয়াহ সেন্টার (যেমন: মাকতাতুদ দা’ওয়াহ বা ইসলামিক গাইডেন্স অফিসসমূহ) ও মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বহুভাষিক দক্ষ দাঈ ও আলেমদের মাধ্যমে অ্যারাবিক ও নন-অ্যারাবিকভাষী বিশাল প্রবাসীকুল ও নওমুসলিমদের মাঝে তাদের মাতৃভাষায় বিশুদ্ধ আকীদা, মাসআলা-মাসায়েল এবং কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা প্রচারের এক অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা চালু রেখেছে, যা বিশ্ব মুসলিম ঐক্যে ও দাওয়াতি ময়দানে এক সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করে আসছে।
.
১৩. বিশ্বব্যাপী পবিত্র কুরআন ও ইসলামি প্রামাণ্য সাহিত্য বিতরণ: সৌদি আরবের মদিনাতুল মুনাওয়ারায় ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘কিং ফাহদ কমপ্লেক্স ফর দ্য প্রিন্টিং অব দ্য হোলি কুরআন’ (King Fahd Complex for the Printing of the Holy Quran) বিশ্বের বৃহত্তম ও সর্বাধুনিক কুরআন মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠান থেকে শত শত কোটি কপি পবিত্র কুরআনুল কারিম এবং এর বিশ্বখ্যাত অনুবাদ ও তাফসির সাথে গুরুত্বপূর্ণ আক্বীদার কিতাবাদী বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হাতে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বাংলাসহ বিশ্বের ৭০টিরও বেশি ভাষায় পবিত্র কুরআনের অনুবাদ এবং খাঁটি আকিদাসংক্রান্ত প্রামাণ্য ইসলামি কিতাবাদী বিশ্বজুড়ে বিলি করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি নজিরবিহীন ভূমিকা পালন করে আসছে।
.
​১৪. দাওয়া সেন্টার ও আন্তর্জাতিক দাঈ প্রেরণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী দাওয়া কার্যক্রম: সৌদি আরব বিশ্বজুড়ে বিশুদ্ধ তাওহিদ, সুন্নাহ ও খাঁটি ইসলামি জ্ঞান প্রচার ও প্রসারের লক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘সউদী ইসলামিক দাওয়া সেন্টার’, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং মসজিদ কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করতে লক্ষ লক্ষ রিয়াল খরচ
করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যোগ্য, দক্ষ ও শরিয়তসম্মত ইলমে সমৃদ্ধ দাঈ (প্রচারক) ও আলেমদেরকে বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রেরণ করা হয়। তাঁরা স্থানীয় আলেম ও সাধারণ মানুষের সাথে সমন্বয় করে মানবজাতিকে শিরক, বিদআত ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত করে সঠিক কুরআন ও সুন্নাহর পথে আহ্বান করার কাজে নিরলসভাবে নিয়োজিত রয়েছেন।
.
​১৫. আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলন ও গবেষকদের পৃষ্ঠপোষকতা: বিশ্বের নানা প্রান্তের শীর্ষস্থানীয় আলেম, মুফতি, ফকিহ ও গবেষকদের সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলন, সিম্পোজিয়াম ও সেমিনার আয়োজনে সৌদি আরব সর্বদা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। মুসলিম উম্মাহর সমসাময়িক জটিল সমস্যাবলির সমাধান, ইসলামের মূল শিক্ষা সংরক্ষণ এবং উগ্রবাদ ও নানা মতবাদ বা বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে সঠিক জ্ঞানচর্চা প্রসারে ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী’ (Muslim World League)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য ও মধ্যপন্থী আদর্শ প্রচারের কাজ অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে।
.
​১৬. আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাবৃত্তি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ (মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য): সৌদি আরবের বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়—বিশেষ করে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিখ্যাত ‘মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ (Islamic University of Madinah), রিয়াদের ‘ইমাম মুহাম্মাদ বিন সাউদ ইসলামিক ইউনিভার্সিটি’ এবং মক্কার ‘উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়’-এ বিশ্বের শতাধিক দেশ থেকে আগত হাজার হাজার মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকা, খাওয়া, চিকিৎসা ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়।এসব প্রতিষ্ঠানে তাঁরা দীর্ঘ মেয়াদে বিশুদ্ধ কুরআন-সুন্নাহ, আরবি ভাষা ও সালাফদের খাঁটি আকিদার সুগভীর শিক্ষা অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে নিজ নিজ দেশে ফিরে গিয়ে সমাজে তাওহিদের বার্তা ও সুন্নাহর প্রচার-প্রসার ঘটিয়ে থাকেন।
.
​১৭. বিশ্বজুড়ে মসজিদ নির্মাণ, ইসলামিক ইনস্টিটিউট ও বহুমুখী মানবিক সহায়তা: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিতে এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ইবাদত-বন্দেগী ও সামাজিক কর্মকাণ্ড সুচারুরূপে পরিচালনার জন্য সৌদি সরকার ও বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে হাজার হাজার মসজিদ, ইসলামিক স্কুল, মাদরাসা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য নিয়মিত আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়। এছাড়া ‘কিং সালমান হিউম্যানিটারিয়ান এইড অ্যান্ড রিলিফ সেন্টার’ (KSrelief)-এর মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ বা সংকটে নিপীড়িত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে জরুরি মানবিক সহায়তা ও ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রেও দেশটির ভূমিকা আজ বিশ্বজুড়ে সর্বমহলে স্বীকৃত ও প্রশংসিত।
.
তবে এর অর্থ এই নয় যে, তাওহিদের এই পবিত্র ভূমিতে কোনো ধরনের পাপাচার বা ভুলত্রুটি সংঘটিত হয় না; বরং মানুষের স্বভাবসুলভ দুর্বলতার কারণে অন্যান্য মানববসতির মতো এখানেও ছোট-বড় বিভিন্ন পাপ সংঘটিত হয়। পার্থক্য হলো, এসব পাপ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আলেম-উলামা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন না; বরং সাধ্যমতো সংশোধনের চেষ্টা চালিয়ে যান। তাঁরা শাসকদের কাছে গিয়ে, বাদশাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং আলেম ও শাসকদের যৌথ বৈঠকে সুস্পষ্ট ও জোরালো নসিহত পেশ করার মাধ্যমে সমাজের অনিষ্ট দূর করা, পাপাচার প্রতিরোধ করা এবং মানুষকে দ্বীনের পথে পরিচালিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। তাঁরা নিজেদের সাধ্যানুযায়ী সমাজকে পাপমুক্ত রাখতে ও মানুষকে সঠিক দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন আলহামদুলিল্লাহ। পরিশেষে, মহান আল্লাহর দরবারে বিনীত প্রার্থনা—তিনি যেন এই দেশটিকে বিশুদ্ধ তাওহিদ ও সুন্নাহর ওপর অটল রাখেন এবং সব ধরনের ষড়যন্ত্র, বিপদাপদ ও ফিতনা-ফাসাদের হাত থেকে চিরকাল নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখেন।আমীন।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: