স্ত্রীর সম্মান ও নিরাপত্তা রক্ষায় স্বামীর দায়িত্ব

ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর ইসলামে বিবাহ কেবল একটি সামাজিক বন্ধন নয়; বরং এটি ভালোবাসা, দায়িত্ব, আমানত ও পারস্পরিক অধিকারের পবিত্র সম্পর্ক। একজন স্বামীর দায়িত্ব শুধু স্ত্রীর ভরণপোষণ নিশ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাঁর সম্মান, নিরাপত্তা, পর্দা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার রক্ষাও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। তাই একজন দায়িত্বশীল স্বামী স্ত্রীকে ভালোবাসা ও সম্মান করার পাশাপাশি শরিয়তের সীমারেখার মধ্যে তাঁর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও দাম্পত্য জীবনের পবিত্রতা রক্ষায় সচেতন থাকবেন এবং এমন পরিবেশ ও পরিস্থিতি থেকে যথাসম্ভব দূরে রাখবেন, যেখানে তাঁর শালীনতা, নিরাপত্তা বা সম্মান ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নিম্নে স্ত্রীর সম্মান ও নিরাপত্তা রক্ষায় একজন দায়িত্বশীল স্বামীর করণীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হলো:
.
♦️ আপনার স্ত্রীকে এমন কোনো বিউটি পার্লারে পাঠাবেন না, যেখানে পুরুষ কর্মীরা সেবা প্রদান করে।
.
♦️ আপনার স্ত্রীকে কোনো গায়রে মাহরাম পুরুষের সঙ্গে নির্জনে (খালওয়াতে) থাকতে দেবেন না; প্রয়োজনীয় পরিস্থিতিতেও শরিয়তের সীমারেখা ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করুন।
.
♦️ শুধু শিষা (হুক্কা) খাওয়ার অজুহাতে এমন কোনো ক্যাফেতে স্ত্রীকে নিয়ে বসবেন না, যেখানে পুরুষদের অবাধ উপস্থিতি বেশি। (ইসলামে শিষা সেবন নিষিদ্ধ)।
.
♦️ পরপুরুষ মেহমানদের সামনে স্ত্রীকে পানি, চা বা খাবার পরিবেশন করার দায়িত্ব দেবেন না; বরং তাঁর পর্দা ও মর্যাদা রক্ষা করুন।
.
♦️ আপনার স্ত্রীকে এমন কোনো পরিবেশে যেতে উৎসাহিত করবেন না, যেখানে তাঁর পর্দা, শালীনতা ও ব্যক্তিগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রয়োজন হলে বিকল্প ব্যবস্থা করে দিন এবং তাঁর সম্মান ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিন।
.
♦️ আপনার স্ত্রীকে এমন কোনো অনুষ্ঠানে পাঠাবেন না, যেখানে অশালীনতা, বেপর্দা পরিবেশ, মাদক, অশ্লীল বিনোদন বা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা রয়েছে।
.
♦️ আপনার স্ত্রীকে এমন কোনো ক্যাফে বা কর্মস্থলে চাকরি করতে দেবেন না, যেখানে পুরুষদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা ও মিশ্র পরিবেশ বিদ্যমান রয়েছে।
.
♦️ কোনো পণ্যের দাম কমানোর উদ্দেশ্যে আপনার স্ত্রী যেন কোনো পুরুষ বিক্রেতার সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় হাসি-তামাশা, কোমলভাষী কথা বা ঘনিষ্ঠতাপূর্ণ আচরণ করেন—এটি কখনোই মেনে নেবেন না এবং এ বিষয়ে কখনোই আপস করবেন না।
.
♦️ আপনার স্ত্রীকে আত্মীয়- ননআত্মীয়ের মধ্যে গায়রে মাহরাম পুরুষের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও দীর্ঘ কথোপকথন থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করুন—বিশেষত ফোন, মেসেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
.
♦️ আপনার স্ত্রীর সৌন্দর্য ও আকর্ষণীয় অবয়বকে গ্রাহক আকৃষ্ট করার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে কোনো রেস্তোরাঁ, শপিংমল বা প্রতিষ্ঠানে তাকে রিসেপশনিস্ট কিংবা অভ্যর্থনাকারীর দায়িত্বে নিয়োজিত হতে দেবেন না। সে আপনার জীবনসঙ্গিনী—কোনো প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক টানার বিজ্ঞাপন নয়।
.
♦️ কোনো পোশাকের প্রচার-প্রচারণা ও বাজারজাতকরণের উদ্দেশ্যে আপনার স্ত্রীকে কোনো পেজ, প্রতিষ্ঠান বা ব্র্যান্ডের মডেল হিসেবে উপস্থাপন করার অনুমতি দেবেন না।
.
♦️ পারিবারিক সচেতনতা বা পারস্পরিক বোঝাপড়ার অজুহাতেও আপনার স্ত্রীর ছবি ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করবেন না—যেমনটি আজকাল অনেক যুবক করে থাকে।
.
♦️ আপনার স্ত্রীর ব্যক্তিগত ফোন, মেসেজ, ছবি বা ব্যক্তিগত কথোপকথন তাঁর অনুমতি ছাড়া অন্যের কাছে প্রকাশ করবেন না; একইভাবে তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়কে জনসমক্ষে আলোচনার বিষয় বানাবেন না।
.
♦️ আপনার স্ত্রীকে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাপূর্ণ কোনো মিশ্র জিম বা ব্যায়ামাগারে যেতে অনুমতি দেবেন না; একজন মুসলিমের আত্মমর্যাদা ও শালীনতার জন্য এমন পরিবেশ থেকে দূরে থাকা উচিত।
.
♦️ আপনার স্ত্রী অসুস্থ হলে চিকিৎসার ক্ষেত্রে তাঁর প্রয়োজনীয়তা, গোপনীয়তা ও মর্যাদার প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখুন এবং সম্ভব হলে নারী চিকিৎসক বা নারী স্বাস্থ্যকর্মীর ব্যবস্থা করুন; তবে জরুরি প্রয়োজন ও বাস্তব পরিস্থিতিকেও বিবেচনায় রাখুন।
.
♦️ আপনার স্ত্রী যেন কোনো নারী-পুরুষের মিশ্র হেয়ার সেলুনে কাজ না করেন—এ বিষয়ে একজন দায়িত্বশীল স্বামী হিসেবে আপনার সচেতন ও দৃঢ় অবস্থান থাকা উচিত।
.
♦️ যৌক্তিক প্রয়োজন ছাড়া রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী বা পুরুষকর্মী-প্রধান কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে আপনার স্ত্রীকে একা যেতে দেবেন না; তাঁর প্রয়োজন ও নিরাপত্তার প্রতি সচেতন থাকুন।
.
♦️ আপনার স্ত্রী কোনো বিপদ, হয়রানি বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে তাকে দোষারোপ না করে প্রথমে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন এবং ন্যায়সঙ্গত উপায়ে বিষয়টির সমাধান করুন।
.
♦️ আপনার স্ত্রীকে যেন তাঁর ন্যায্য ভরণপোষণের অধিকার আদায়ের জন্য কখনো আদালতের দ্বারস্থ হতে না হয়। তাঁর ভরণপোষণের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করুন; আপনার অবহেলার কারণে যেন তাঁকে নিজের ন্যায্য অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করতে না হয়।
.
♦️ স্ত্রীর বৈধ আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ন্যায্য অধিকারকে সম্মান করুন এবং অযথা তাদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদে বাধ্য করবেন না।
.
♦️ টিকটক বা এজাতীয় কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ করার সময় আপনার স্ত্রীকে আপনার সঙ্গে থাকার অনুমতি দেবেন না।
.
♦️ আপনার স্ত্রীকে যেসব জায়গায় সঙ্গে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, যথাসম্ভব সেসব জায়গায় তাঁর পাশে থাকার চেষ্টা করুন—বাজার, সরকারি অফিস, হাসপাতাল কিংবা প্রয়োজনীয় অন্য কোনো কাজ।
.
♦️ আপনার স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয়, দাম্পত্য জীবনের গোপন কথা বা ব্যক্তিগত ছবি অন্যের কাছে প্রকাশ করবেন না। স্ত্রী আপনার কাছে আমানত; তাঁর গোপনীয়তা রক্ষা করা আপনার দায়িত্ব।
.
♦️ স্ত্রীর কোনো ভুল হলে তাকে মানুষের সামনে অপমান না করে একান্তে নসিহত করুন। একজন দায়িত্বশীল স্বামী স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করে সংশোধনের চেষ্টা করেন।
.
♦️ স্ত্রীর ব্যক্তিগত দুর্বলতা, পারিবারিক সমস্যা বা দাম্পত্য জীবনের কোনো বিষয় বন্ধু-বান্ধব কিংবা আত্মীয়দের সামনে আলোচনা করবেন না। দাম্পত্য জীবনের গোপনীয়তা রক্ষা করা স্বামীর গুরুত্বপূর্ণ আমানত।
.
♦️ স্ত্রীর সম্মান ও নিরাপত্তা রক্ষার নামে তাঁর ওপর জুলুম, অযৌক্তিক সন্দেহ, অপমান, গৃহবন্দিত্ব বা বৈধ অধিকার হরণ করবেন না। গীরাহ হতে হবে শরিয়তসম্মত, আর আচরণ হতে হবে ন্যায়, প্রজ্ঞা ও ভালোবাসাপূর্ণ।
.
♦️ স্ত্রীকে ভালোবাসুন, সম্মান করুন এবং তাঁর মর্যাদা রক্ষায় সচেতন থাকুন। এমন একজন দায়িত্বশীল স্বামী হোন, যার উপস্থিতিতে স্ত্রী নিরাপদ ও সম্মানিত বোধ করে; যেন প্রয়োজনের সময় তাকে একা অন্যের ওপর নির্ভর করতে না হয়।
.
পরিশেষে: প্রকৃত পুরুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আত্মমর্যাদাবোধ, দায়িত্ববোধ ও গীরাহ (অসূয়া)। আত্মমর্যাদাবোধ কখনোই সচেতনতা, সভ্যতা বা আধুনিকতার বিরোধী নয়। বরং নিজের স্ত্রী, পরিবার ও সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করা একজন দায়িত্বশীল স্বামীর স্বাভাবিক কর্তব্য। তাই এমন কোনো কথায় বিভ্রান্ত হবেন না, যেখানে স্বামীর বৈধ আত্মমর্যাদাবোধ ও গীরাহকে সন্দেহপ্রবণতা, পশ্চাৎপদতা কিংবা অজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। মনে রাখুন- আত্মমর্যাদাবোধ মানে স্ত্রীকে বন্দী করে রাখা নয়; বরং তাঁর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও দাম্পত্য সম্পর্কের পবিত্রতা রক্ষায় দায়িত্বশীল থাকা। যে পুরুষ নিজের স্ত্রী ও পরিবারের সম্মান-মর্যাদা নিয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন, তার সেই উদাসীনতাকে আধুনিকতা বা উদারতা বলা যায় না। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: