জামাআতে সালাত আদায়ের সময় পরস্পরের পায়ের সঙ্গে পা এবং কাঁধের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানোর বিধান এবং সঠিক পদ্ধতি

প্রশ্ন: জামাআতে সালাত আদায়ের সময় পরস্পরের পায়ের সঙ্গে পা এবং কাঁধের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানোর বিধান এবং সঠিক পদ্ধতি কী? একটি গবেষণা ভিত্তিক পর্যালোচনা।
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর জামাআতে সালাত আদায়ের সময় কাতার সোজা করা এবং মুসল্লিদের পরস্পরের কাছাকাছি হয়ে দাঁড়ানো শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। মুসল্লী পরস্পর পায়ের সঙ্গে পা এবং কাঁধের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানোর বিষয়টি ফিকহের একটি মতভেদপূর্ণ মাসআলা। তবে এ বিষয়ে বর্ণিত একাধিক সহিহ হাদিস, সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর আমল এবং আলেমদের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, কাতার সোজা ও সুসংবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে পা ও কাঁধ মিলিয়ে কাছাকাছি হয়ে দাঁড়ানো একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।দলিলের আলোকে তাই এ মতটিই অধিক শক্তিশালী ও অগ্রাধিকারযোগ্য। এ বিষয়ে বর্ণিত হাদিসসমূহ, সাহাবায়ে কেরামের আমল, আলেমদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট দলিলগুলোর সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ নিম্নে উপস্থাপন করা হলো:
.
প্রখ্যাত সাহাবী আনাস ইবনু মালিক (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) [মৃত: ৯৩ হি.] থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,أَقِيمُوا صُفُوفَكُمْ فَإِنِّي أَرَاكُمْ مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِي وَكَانَ أَحَدُنَا يُلْزِقُ مَنْكِبَهُ بِمَنْكِبِ صَاحِبِهِ وَقَدَمَهُ بِقَدَمِهِ“তোমরা তোমাদের কাতার সোজা করো। কেননা, আমি তোমাদিগকে আমার পিঠের পিছন থেকে দেখতে পাই।” আনাস রা. বলেন, (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে) আমাদের একজন তাঁর কাঁধ ও পা তাঁর পাশের ব্যক্তির কাঁধ ও পায়ের গোড়ালি (গোছ) এর সাথে লাগিয়ে রাখতো।” [সহিহ বুখারি, অধ্যায়: ৪৭; হা/৪৬৮)
.
ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) উক্ত হাদীস বর্ণনা করার পূর্বে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন,بَابُ إِلْزَاقِ الْمَنْكِبِ بِالْمَنْكِبِ وَالْقَدَمِ بِالْقَدَمِ فِي الصَّفِّ وَقَالَ النُّعْمَانُ بْنُ بَشِيْرٍ رَأَيْتُ الرَّجُلَ مِنَّا يُلْزِقُ كَعْبَهُ بِكَعْبِ صَاحِبِهِ.সালাতে কাতারের মধ্যে কাঁধে কাঁধ ও পায়ে পা মিলানো অনুচ্ছেদ’। নু‘মান ইবনু বাশীর (রাঃ) বলেন,আমি আমাদের প্রত্যেক মুছল্লীকে দেখতাম, সে তার টাখনুকে তার পার্শ্বের ভাইয়ের টাখনুর সাথে মিলিয়ে দিত।”(সহীহ বুখারী ‘আযান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪৭, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা: ১০০)
.
ইমাম বুখারি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক উক্ত নুমান বিন সাবিত রা. এর উক্ত কথাটি মূলত: আবু দাউদে বর্ণিত একটি পূর্ণ হাদিসের অংশ। পূর্ণ হাদিসটি হল:নুমান ইবনে বশীর রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,أَقْبَلَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى النَّاسِ بِوَجْهِهِ فَقَالَ أَقِيمُوا صُفُوفَكُمْ ‏”‏ ‏.‏ ثَلاَثًا ‏”‏ وَاللَّهِ لَتُقِيمُنَّ صُفُوفَكُمْ أَوْ لَيُخَالِفَنَّ اللَّهُ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ ‏ قَالَ فَرَأَيْتُ الرَّجُلَ يُلْزِقُ مَنْكِبَهُ بِمَنْكِبِ صَاحِبِهِ وَرُكْبَتَهُ بِرُكْبَةِ صَاحِبِهِ وَكَعْبَهُ بِكَعْبِهِ
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমবেত ব্যক্তিদের নিকট উপস্থিত হয়ে তিনবার বলেন, “তোমরা তোমাদের কাতার সোজা কর। আল্লাহর শপথ! তোমরা কাতার সোজা করে দণ্ডায়মান হবে, অন্যথায় আল্লাহ তা’আলা তোমাদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করবেন।” বর্ণনাকারী (নোমান রা.) বলেন, “অতঃপর আমি মুসল্লিদেরকে পরস্পর কাঁধে কাঁধ, পায়ের গিঁঠের সাথে গিঁঠ লাগিয়ে দাঁড়াতে দেখেছি।” [সুনান আবু দাউদ, অধ্যায়: ২/ সালাত, পরিচ্ছেদ: ১০০. কাতার সোজা করা।] হাফেজ ইবনু হাজার আসকালানি (রাহিমাহুল্লাহ) ফাতহুল বারি গ্রন্থে বলেন:والمراد بذلك المبالغة في تعديل الصف وسد خلله “এর উদ্দেশ্য হলো সারি সোজা করার ব্যাপারে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া এবং সারির ফাঁক বন্ধ করা।”
.
উক্ত হাদিসে বর্ণিত “الكَعْبُ” (কাআব) শব্দের অর্থ:العَظْمُ النَّاتِئُ عِنْدَ مُلْتَقَى السَّاقِ وَالْقَدَمِ—অর্থাৎ, পায়ের গোছা (ساق) ও পায়ের পাতার (قدم) সংযোগস্থলে অবস্থিত উঁচু হাড়। আরবি ভাষায় প্রত্যেক পায়ের সংযোগস্থলে ডান ও বাম পাশে দুটি করে উঁচু হাড় থাকে; এগুলোকে كَعْبَانِ বলা হয়।অতএব, এখানে الكعب দ্বারা পায়ের গোড়ালির উভয় পাশের উঁচু হাড়—অর্থাৎ ankle bones—বোঝানো হয়েছে। আর يُلْزِقُ শব্দটি لَزِقَ ধাতু থেকে এসেছে। আরবি অভিধানে বলা হয়েছে:لَزِقَ الشَّيْءُ بِالشَّيْءِ: اتَّصَلَ بِهِ، لَا يَكُونُ بَيْنَهُمَا فَجْوَةٌ অর্থাৎ, একটি বস্তু অপরটির সঙ্গে এমনভাবে সংযুক্ত হওয়া, যাতে উভয়ের মাঝে কোনো ফাঁক বা ব্যবধান না থাকে। সুতরাং يُلْزِقُ كَعْبَهُ بِكَعْبِهِ-এর অর্থ হবে: ‘সে তার গোড়ালির উঁচু হাড়টি অপর ব্যক্তির গোড়ালির উঁচু হাড়ের সঙ্গে এমনভাবে মিলিয়ে রাখে, যাতে দুটির মাঝে কোনো ফাঁক না থাকে।’ এখানে يُلْزِقُ-এর অর্থ শুধু ‘স্পর্শ করা’ নয়; বরং ফাঁক না রেখে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত বা মিলিয়ে রাখা—এটাই শব্দটির অধিক যথার্থ অর্থ।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন: অনলাইন ভিত্তিক আরবি অভিধান almaany)
.
হাদিসগুলো সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে শাইখ আব্দুল আযীম আবাদী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,قال في ” التعليق المغني ” : فهذه الأحاديث فيها دلالة واضحة على اهتمام تسوية الصفوف ، وأنها من إتمام الصلاة ، وعلى أنه لا يتأخر بعضه على بعض ، ولا يتقدم بعضه على بعض ، وعلى أنه يلزق منكبه بمنكب صاحبه ، وقدمه بقدمه ، وركبته بركبته ، لكن اليوم تُركت هذه السنَّة ! ولو فعلت اليوم لنفر الناس كالحُمُر الوحشية !!. فإنا لله وإنا إليه راجعون .”তা‘লীকুল মুগনী-তে বলা হয়েছে: এই হাদিসগুলোতে কাতার সোজা করার ব্যাপারে অত্যন্ত সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। কাতার সোজা করা নামাজ পূর্ণ করার অন্তর্ভুক্ত। কাতারে কেউ অন্যের চেয়ে পিছিয়ে থাকবে না এবং কেউ অন্যের চেয়ে এগিয়েও থাকবে না। বরং সে তার সঙ্গীর কাঁধের সঙ্গে কাঁধ, পায়ের সঙ্গে পা এবং হাঁটুর সঙ্গে হাঁটু মিলিয়ে রাখবে। কিন্তু বর্তমানে এই সুন্নতটি পরিত্যক্ত হয়েছে! আজ যদি এটি করা হয়, তাহলে মানুষ বন্য গাধার মতো ছুটে পালাবে! সুতরাং আমরা আল্লাহরই এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব।”(আউনুল মা‘বূদ,২/২৫৬)।
.
এছাড়াও জাবির ইবনে সামুরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট বাড়ি বের হয়ে এসে বললেন,أَلاَ تَصُفُّونَ كَمَا تَصُفُّ الْمَلاَئِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا ‏”‏ ‏.‏ فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَكَيْفَ تَصُفُّ الْمَلاَئِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا قَالَ ‏”‏ يُتِمُّونَ الصُّفُوفَ الأُوَلَ وَيَتَرَاصُّونَ فِي الصَّفِّ “তোমরা কি কাতার বদ্ধ হবে না যেভাবে ফেরেশতাগণ তাঁদের রবের সামনে কাতার বদ্ধ হয় তাঁরা বললেন, ফেরেশতাগণ তাদের রবের সামনে কীভাবে কাতার বদ্ধ হন? তিনি বললেন, তারা প্রথম কাতার পূর্ণ করে। তারপর কাতারে পরস্পর মিশে দাঁড়ান।” [সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ৪/ কিতাবুস সালাত, পরিচ্ছেদ: ২৭, সালাতে নড়াচড়া করা, সালামের সময় হাতের ইশারা করা ও হাত উঠান নিষেধ এবং সামনের কাতার পূর্ণ করা ও পরস্পর হয়ে এবং একত্রিত হয়ে দাঁড়ানোর নির্দেশ] অপর বর্ননায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন,أقيمُوا الصُّفُوفَ، وَحَاذُوا بَيْنَ المَنَاكِبِ، وَسُدُّوا الخَلَلَ، ولا تَذَرُوا فُرُجَاتٍ للشَّيْطَانِ، وَمَنْ وَصَلَ صَفًّا وَصَلَهُ اللهُ، وَمَنْ قَطَعَ صَفًّا قَطَعَهُ اللهُ“কাতার সোজা করো, কাঁধের সাথে কাঁধ বরাবর করো, ফাঁক বন্ধ করো, শয়তানের জন্য কোন ফাঁক রাখবে না। যে ব্যক্তি কাতারের সংযোগ স্থাপন করে আল্লাহও তার সাথে সংযোগ স্থাপন করেন, আর যে কাতার ছিন্ন করে, আল্লাহও তার সাথে সংযোগ ছিন্ন করেন।”(আবু দাউদ, অধ্যায়: সালাত, অনুচ্ছেদ: ৯৫। এই হাদিসটি ইমাম ইবনে খুযায়মা ও ইমাম হাকিম সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন। [ইবনে হাজার আসকালানি,ফাতহুল বারী: ২/২১১)
.
উপরোক্ত হাদিসসমূহ থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, সালাতের কাতার সোজা করা এবং মুসল্লিদের পরস্পরের কাছাকাছি হয়ে দাঁড়ানো গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। সাহাবায়ে কেরাম কাতার সোজা করার সময় কাঁধের সঙ্গে কাঁধ, পায়ের সঙ্গে পা এবং গোড়ালির সঙ্গে গোড়ালি মিলিয়ে দাঁড়াতেন; কাতারে অপ্রয়োজনীয় ফাঁক রাখতেন না। সুতরাং, কাতারে অযথা ফাঁক রাখা সুন্নতের পরিপন্থী। দুঃখজনকভাবে, বর্তমান সময়ে কোনো মুসল্লি এই সুন্নত পালনের উদ্দেশ্যে পাশের মুসল্লির সঙ্গে কাঁধ ও পা মিলিয়ে দাঁড়াতে চাইলে অনেকেই তা অপছন্দ করেন এবং দূরে সরে যান; এমনকি তাকে বেয়াদব বা অশিক্ষিত বলেও কটূক্তি করেন। অথচ এটি কোনো নতুন আমল নয়; বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশ এবং সাহাবায়ে কেরামের বাস্তব সুন্নত। আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: «فلقد رأيت أحدنا يلصق منكبه بمنكب صاحبه، وقدمه بقدمه، فلو ذهبت تفعل هذا اليوم؛ لنفر أحدكم كأنه بغل شموس»—“আমি আমাদের প্রত্যেককে তার সঙ্গীর কাঁধের সঙ্গে কাঁধ এবং পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে দাঁড়াতে দেখেছি। কিন্তু আজ তুমি যদি এমনটি করতে যাও, তাহলে দেখবে—তাদের কেউ বন্য খচ্চরের মতো ছুটে পালাবে!” [মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবাহ, ১/৩৫১; সনদ সহিহ] হায়! কতই না দুঃখজনক—যে আমল সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নত হিসেবে বাস্তবায়ন করেছেন, আজ সেই সুন্নতই অনেকের কাছে অপরিচিত, অস্বাভাবিক কিংবা আপত্তিকর বলে মনে হয়! অথচ একজন মুসলিমের কর্তব্য হলো, প্রচলিত রীতিকে নয়; বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবায়ে কেরামের সুন্নতকে ভালোবাসা এবং যথাসাধ্য তা অনুসরণ করা।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:أما إلصاق الكعبين بعضهما ببعض فلا شك أنه وارد عن الصحابة رضي الله عنهم، فإنهم كانوا يسوون الصفوف بإلصاق الكعبين بعضهما ببعض، أي: أنّ كل واحد منهم يلصق كعبه بكعب جاره لتحقيق المساواة. و اهذا إذا تمت الصفوف و قام الناس (-جمع أشرف عبد الرحيم -“এতে কোনও সন্দেহ নাই যে, একে অপরের সাথে পায়ের গোছ বা গিঁঠ লাগানোর বিষয়টি সাহাবিদের থেকে বর্ণিত হয়েছে। কারণ তারা প্রত্যেকেই একে অপরের পায়ের গোছের সাথে গোছ সংযুক্ত করে কাতার সোজা করতেন। অর্থাৎ সবাই তার পার্শ্বস্থ ব্যক্তির পায়ের গোছের সাথে গোছ লাগাতেন এ জন্য যেন, কাতার সোজার করার বিষয়টি ভালোভাবে বাস্তবায়িত হয়। আর এটা ঐ সময় যখন কাতার পূর্ণ হয়ে যেতো এবং লোকজন দণ্ডায়মান হতো।”(ফাতাওয়াশ শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল উসাইমিন রাহ. ১/৩৩৬-৪৩৭)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন:নামাজের কাতার সোজা করার অন্তর্ভুক্ত কি হলো প্রত্যেক মুসল্লি তার পাশের মুসল্লির পায়ের সঙ্গে নিজের পা লাগিয়ে রাখবে?
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:نعم، لا بد أن يسدوا الخلل، قال الصحابة: كان أحدنا يلصق قدمه بقدم صاحبه فالسنة إلصاق القدم بالقدم حتى لا تبقى فرجة، لكن من دون أذى لا يؤذي جاره، لكن يلصق قدمه بقدمه حتى لا يكون بينهم فرج.المقدم: حفظكم الله.”হ্যাঁ। কাতারের ফাঁক অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। সাহাবিগণ (রাদিআল্লাহু আনতুম) বলেছেন: আমাদের প্রত্যেকে তার সঙ্গীর পায়ের সঙ্গে নিজের পা লাগিয়ে রাখত।অতএব, সুন্নত হলো পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে রাখা, যাতে তাদের মাঝে কোনো ফাঁক না থাকে। তবে এমনভাবে নয় যাতে পাশের মুসল্লিকে কষ্ট দেওয়া হয় বা তার ক্ষতি হয়। বরং পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে রাখবে, যাতে তাদের মধ্যে কোনো ফাঁক না থাকে।সংক্ষেপে: কাতার সোজা করার মূল উদ্দেশ্য হলো কেউ যেন সামনে-পেছনে এগিয়ে বা পিছিয়ে না থাকে এবং মাঝখানে কোনো ফাঁক না থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় কাঁধ ও গোড়ালি সমান রাখা গুরুত্বপূর্ণ। পায়ের সামনের অংশ (আঙুল) সমান করা মূল বিষয় নয়।”(শাইখের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফাতওয়া নং-১৮৮৭৯)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহাহ গ্রন্থে ৩১ ও ৩২ নম্বর হাদিসের আলোচনায় বলেন:استفاضت الأحاديث الصحيحة عن النبي صلى الله عليه وسلم في الأمر بإقامة الصفوف وتسويتها ، بحيث يندر أن تخفى على أحد من طلاب العلم فضلاً عن الشيوخ ، ولكن ربما يخفى على الكثيرين منهم أن إقامة الصف تسويته بالأقدام ، وليس فقط بالمناكب ، بل لقد سمعنا مراراً من بعض أئمة المساجد – حين يأمرون بالتسوية – التنبيه على أن السنة فيها إنما هي بالمناكب فقط دون الأقدام ، ولما كان ذلك خلاف الثابت في السنة الصحيحة ، رأيت أنه لا بد من ذكر ماورد من الحديث ، تذكيراً لمن أراد أن يعمل بما صح من السنة ، غير مغتر بالعادات والتقاليد الفاشية في الأمة.فأقول : لقد صح في ذلك حديثان:الأول : من حديث أنس.والآخر : من حديث النعمان بن بشير رضي الله عنهما .أما حديث أنس فهو: 31- (أَقِيمُوا صُفُوفَكُم ْ وتراصوا فَإِنِّي أَرَاكُمْ مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِي). رواه البخاري ،وأحمد من طرق عن حميد الطويل : ثنا أنس بن مالك قال : (أقيمت الصلاة ، فأقبل علينا رسول الله صلى الله عليه وسلم بوجهه ، فقال : (فذكره).زاد البخاري في رواية : (قبل أن يكبر) ، وزاد أيضا في آخره : (وكان أحدنا يلزق منكبه بمنكب صاحبه ، وقدمه بقدمه).وهي عند المخلص ، وكذا ابن ابي شيبة بلفظ : (قال أنس : فلقد رأيت احدنا يلصق منكبه بمنكب صاحبه وقدمه بقدمه ، فلو ذهبت تفعل هذا اليوم ، لنفر أحدكم كأنه بغل شموس).وترجم البخاري لهذا الحديث بقوله (باب إلزاق المنكب بالمنكب والقدم بالقدم في الصف).وأما حديث النعمان فهو: 32- (أَقِيمُوا صُفُوفَكُمْ [ثَلَاثًا] وَاللَّهِ لَتُقِيمُنَّ صُفُوفَكُمْ أَوْ لَيُخَالِفَنَّ اللَّهُ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ).”রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে কাতার সোজা করা ও তা ঠিক রাখার নির্দেশ সম্পর্কে বহু সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এমনকি কোনো আলেমের কাছে তো দূরের কথা, কোনো শিক্ষার্থীর কাছেও এগুলো গোপন থাকার কথা নয়। কিন্তু অনেকের কাছেই হয়তো এ বিষয়টি অস্পষ্ট যে, কাতার সোজা করার ক্ষেত্রে পায়েরও সমতা রক্ষা করতে হবে, শুধু কাঁধের নয়। বরং আমরা বহুবার কিছু মসজিদের ইমামের কাছ থেকে শুনেছি যখন তাঁরা কাতার সোজা করার নির্দেশ দেন, তখন তাঁরা বলেন যে, সুন্নত হলো শুধু কাঁধ বরাবর কাঁধ মিলানো;পা মিলানো নয়। যেহেতু এ কথা সহিহ সুন্নাহতে প্রমাণিত বিষয়ের বিপরীত, তাই যারা প্রচলিত রীতি-নীতি ও সামাজিক প্রথার দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সহিহ সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করতে চান, তাঁদের স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য এ বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলো উল্লেখ করা জরুরি মনে করছি। আমি বলছি, এ বিষয়ে দুটি হাদিস সহিহভাবে প্রমাণিত হয়েছে:প্রথমটি আনাস (রাঃ)-এর হাদিস। দ্বিতীয়টি নু‘মান ইবনু বশীর (রাঃ)-এর হাদিস।আনাস (রাঃ)-এর হাদিস তোমরা তোমাদের কাতারগুলো সোজা করো এবং পরস্পর ঘন হয়ে দাঁড়াও। কেননা আমি আমার পেছন থেকেও তোমাদের দেখতে পাই।এটি ইমাম বুখারি ও আহমাদ বিভিন্ন সূত্রে হামিদ তা’বীলের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। তিনি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন: সালাতের জন্য ইকামত দেওয়া হলো। তখন রাসূলুল্লাহ সা. আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, অতঃপর তিনি উপরোক্ত কথাটি উল্লেখ করেন। ইমাম বুখারির একটি বর্ণনায় অতিরিক্ত রয়েছে: তিনি তাকবির বলার আগে।আরেক বর্ণনার শেষে রয়েছে: আমাদের প্রত্যেকে তার সঙ্গীর কাঁধের সঙ্গে নিজের কাঁধ এবং তার পায়ের সঙ্গে নিজের পা মিলিয়ে দাঁড়াত। এ বর্ণনাটি মুখলিসের কাছেও রয়েছে। ইবনু আবি শাইবাহর বর্ণনায় এসেছে:আনাস (রাঃ) বলেন, আমি আমাদের প্রত্যেককে তার সঙ্গীর কাঁধের সঙ্গে কাঁধ এবং পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে দাঁড়াতে দেখেছি। কিন্তু তুমি যদি আজ এমনটি করতে যাও, তাহলে তোমাদের কেউ এমনভাবে দূরে সরে যাবে, যেন সে একটি অবাধ্য/বন্য খচ্চর।ইমাম বুখারি এ হাদিসের জন্য অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছেন: কাতারে কাঁধের সঙ্গে কাঁধ এবং পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে দাঁড়ানোর অধ্যায়।নু‘মান ইবনু বশীর (রাঃ)-এর হাদিস তোমরা তোমাদের কাতারগুলো সোজা করো। তিনি কথাটি তিনবার বললেন। আল্লাহর কসম! তোমরা অবশ্যই তোমাদের কাতারগুলো সোজা করবে, অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের অন্তরগুলোর মধ্যে পরস্পর বিরোধ সৃষ্টি করে দেবেন….।”বিস্তারিত জানতে দেখুন আলবানী; সিলসিলা সহীহা হা/৩১-৩২ এর আলোচনা দষ্টব্য)
.
অতঃপর শায়েখ রাহিমাহুল্লাহ এই দুটি হাদিস থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে অন্যতম দুটি হচ্ছে:
.
প্রথম বিষয়: কাতার সোজা করা, তার সমতা রক্ষা করা এবং পরস্পর ঘন হয়ে দাঁড়ানো ওয়াজিব। কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন। আর উসূলের মূলনীতি হলো কোনো বিষয়ের ব্যাপারে সরাসরি নির্দেশ এলে, তার বিপরীতে কোনো প্রমাণ না থাকলে তা ওয়াজিব হওয়ার অর্থ বহন করে।এখানে এমন একটি প্রমাণও রয়েছে যা এ নির্দেশের ওয়াজিব হওয়াকে আরও জোরালো করে। সেটি হলো রাসূলুল্লাহ সা. এর বাণী: অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের অন্তরগুলোর মধ্যে পরস্পর বিরোধ সৃষ্টি করে দেবেন।এ ধরনের হুমকি সাধারণত এমন কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে দেওয়া হয় না, যা ওয়াজিব নয় এ কথা সুস্পষ্ট।
.
দ্বিতীয় বিষয়: এখানে যে কাতার সোজা করার কথা বলা হয়েছে, তা হলো কাঁধের সঙ্গে কাঁধ এবং পায়ের কিনারার সঙ্গে পায়ের কিনারা মিলিয়ে দাঁড়ানো।কারণ সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছ থেকে কাতার সোজা করার ও ঘন হয়ে দাঁড়ানোর নির্দেশ পাওয়ার পর এভাবেই আমল করেছেন।এ কারণেই হাফিজ ইবনু হাজার (রাহি.) ফাতহুল বারী-তে আনাস (রাঃ)-এর হাদিসের অতিরিক্ত অংশটি উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এ বক্তব্যটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, উল্লিখিত কাজটি রাসূলুল্লাহ সা.-এর যুগেই করা হতো। এর মাধ্যমে কাতার সোজা ও সমতল করার অর্থ কী তা সুস্পষ্ট করার ক্ষেত্রে দলিল পূর্ণ হয়ে যায়।একটি দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, কাতার সোজা করার এই সুন্নতটি মুসলিমরা অবহেলা করেছে; বরং অধিকাংশই এটি পরিত্যাগ করেছে।অল্প কিছু মানুষ ছাড়া কোনো দলের মধ্যে আমি এ সুন্নতকে বাস্তবায়িত হতে দেখিনি। তবে আহলুল হাদিসদের মধ্যে আমি এ বিষয়ে আগ্রহ ও যত্ন দেখেছি। আমি ১৩৬৮ হিজরিতে মক্কায় তাদেরকে দেখেছি তারা রাসূলুল্লাহ সা. -এর অন্যান্য সুন্নতের মতো এই সুন্নতটিও দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করার ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নবান ছিল। এর বিপরীতে অন্যদের অর্থাৎ চার মাযহাবের অনুসারীদের মধ্যে আমি এমন কাউকে বাদ দিই না, এমনকি হানবালিদেরও নয়, যারা এই সুন্নতকে ব্যাপকভাবে পরিত্যাগ করেছে। তাদের কাছে এই সুন্নতটি এমনভাবে বিস্মৃত হয়েছে যে, তারা ধারাবাহিকভাবে তা ছেড়ে দিয়েছে এবং এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এর কারণ হলো, তাদের অধিকাংশ ফিকহি গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দাঁড়ানোর সময় দুই পায়ের মধ্যে চার আঙুল পরিমাণ ফাঁকা রাখা সুন্নত। এর চেয়ে বেশি ফাঁকা করলে তা মাকরুহ। ফিকহু আলাল মাযাহিবিল আরবাআহ গ্রন্থে (১/২০৭) বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু পায়ের মাঝে চার আঙুল পরিমাণ দূরত্ব রাখার এই নির্দিষ্ট পরিমাণের সুন্নাহ থেকে কোনো ভিত্তি নেই। এটি মূলত একটি মতামত মাত্র। আর যদি এ মতটি সহিহও হতো, তাহলেও তা ইমাম ও একাকী নামাজ আদায়কারীর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করা আবশ্যক হতো, যাতে এর মাধ্যমে কাতারে পা মিলিয়ে দাঁড়ানোর এই সহিহ সুন্নাহর বিরোধিতা না হয়। উসূলের নীতিমালাও এ কথাই দাবি করে।আমি মুসলমানদের বিশেষ করে মসজিদের ইমামদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, যারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর অনুসরণ করতে এবং তাঁর সুন্নতকে জীবিত করার ফজিলত অর্জন করতে আগ্রহী; তারা যেন এই সুন্নত অনুযায়ী আমল করেন, এর প্রতি যত্নবান হন এবং মানুষকে এর দিকে আহ্বান করেন। যাতে সবাই এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়। এর মাধ্যমে তারা সেই কঠোর সতর্কবাণী থেকে রক্ষা পাবে অন্যথায় আল্লাহ অবশ্যই তোমাদের পরস্পরের অন্তরে বিরোধ সৃষ্টি করে দেবেন। আর এই সংস্করণে আমি আরও একটি কথা আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে যে, একজন দাঈ এই বাস্তব সুন্নতের গুরুত্বকে হালকা করে দেখেন যে সুন্নতের ওপর সাহাবায়ে কেরাম আমল করতেন এবং নবী (ﷺ) তাঁদের সে আমলকে অনুমোদন করেছিলেন। তিনি ইঙ্গিত করেন যে, এটি নাকি নবী (ﷺ) তাঁদের শিক্ষা দেননি। আল্লাহই সর্বাধিক অবগত তিনি সম্ভবত এ বিষয়টি খেয়াল করেননি যে, প্রথমত সাহাবায়ে কেরাম নিজেরাই এ বিষয়টি বুঝেছিলেন এবং আমল করেছিলেন; আর দ্বিতীয়ত, নবী ﷺ. তাঁদের সেই আমলকে অনুমোদন করেছিলেন। আহলুস সুন্নাহর আলেমদের কাছে কোনো আমলের শরিয়তসম্মত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে এটুকুই যথেষ্ট। কারণ, যে ব্যক্তি কোনো বিষয় প্রত্যক্ষ করে,সে এমন কিছু দেখতে পায় যা অনুপস্থিত ব্যক্তি দেখতে পায় না। আর সাহাবায়ে কেরাম এমন এক জাতি, যে ব্যক্তি তাঁদের পথ অনুসরণ করবে সে কখনো দুর্ভাগা হবে না।” (বিস্তারিত জানতে দেখুন আলবানী; সিলসিলা সহীহা হা/৩১-৩২ এর আলোচনা দষ্টব্য)
.
পক্ষান্তরে একদল আলেম মুসল্লিদের পরস্পরের কাঁধ বরাবর কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানোকে সমর্থন করলেও, পায়ের সঙ্গে পা লাগিয়ে দাঁড়ানোর বিষয়টি সমর্থন করেন নি।তাঁদের মতে, এ-সংক্রান্ত হাদিসগুলোতে মূলত কাতার সোজা করা, কাতারের ফাঁক বন্ধ করা এবং মুসল্লিদের পরস্পরের কাছাকাছি হয়ে দাঁড়ানোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে; সর্বদা পায়ের সঙ্গে পা লাগিয়ে রাখা হাদিসের মূল উদ্দেশ্য নয়। ইমাম ইবনু হাজার আল-আসকালানি (রহিমাহুল্লাহ)-সহ একাধিক আলেম এ ধরনের মত ব্যক্ত করেছেন।
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি,(রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম:৭৭৩ হি: মৃত:৮৫২ হি:] বলেন:المراد بذلك المبالغة في تسوية الصفوف و تقاربها ، لاحقيقة الإلتصاق و يمكن أن أحدهم يمس منكبه منكب الآخر، فأما القدم و الركبة فلا يلزم التماس، و ذلك لأن البعض قد يتأذى من التلاصق و التقارب الشديد ، و القصد هو تراص الصفوف و سدّ الخلل فيها حتى لا تدخل بينهم الشياطين“নুমান বিন বাশীর রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদিসের দ্বারা উদ্দেশ্য হল, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে খুব ভালোভাবে কাতার সোজা করা। পায়ের সাথে পা লাগানো উদ্দেশ্য নয়। একে অপরে কাঁধের সাথে কাঁধ স্পর্শ করা সম্ভব। কিন্তু পা ও হাঁটু স্পর্শ করা আবশ্যক নয়। কারণ খুব বেশি কাছাকাছি হলে বা লাগালাগি করে থাকলে কারও কারও কষ্ট হতে পারে। মুখ্য বিষয় হল, কাতার সোজা করা ও তাতে ফাঁক বন্ধ করা যেন, মুসল্লিদের মাঝে শয়তান প্রবেশ করতে না পারে।” [ফাতহুল বারি]
.
সিরিয়ার আলেম শায়খ শুহাইর আস-সাইয়্যিদ রামাদান কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন:জামাতের নামাজে পাশের মুসল্লির পায়ের সঙ্গে নিজের পা লাগিয়ে রাখা কি ওয়াজিব?
তিনি উত্তরে বলেন:إلصاق القدم بالقدم من التنطع في الدين والإنشغال عن الخشوع في الصلاة وتشويش القلوب فيها ، فإن أهل العلم بينوا أن المراد من حديث الإلصاق هو المحاذاة بين الكعبين لأنه يستحيل لك أن تلصق كعبك بكعب جارك وفيه من التكلف ما يصرف الخشوع المطلوب بالصلاة ، وأهم شيء في صلاة الجماعة الصاق المناكب وهو ممكن ولا يؤثر على الخشوع .قال الحافظ في (الفتح): المراد بذلك المبالغة في تسوية الصفوف و تقاربها، لاحقيقة الإلتصاق و يمكن أن أحدهم يمس منكبه منكب الآخر، فأما القدم و الركبة فلا يلزم التماس، و ذلك لأن البعض قد يتأذى من التلاصق و التقارب الشديد، و القصد هو تراص الصفوف و سدّ الخلل فيها حتى لا تدخل بينهم الشياطين، و الله أعلم”পায়ের সঙ্গে পা লাগিয়ে রাখা দ্বীনের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ির অন্তর্ভুক্ত। এর কারণে নামাজের মধ্যে খুশু-খুজু থেকে মনোযোগ সরে যায় এবং অন্তরে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।আলেমগণ ব্যাখ্যা করেছেন যে, পা লাগানোর হাদিসে উদ্দেশ্য হলো দুই ব্যক্তির গোড়ালি সমান্তরাল রাখা, অর্থাৎ সারি সোজা করা। কারণ বাস্তবে একজনের গোড়ালি তার পাশের ব্যক্তির গোড়ালির সঙ্গে এমনভাবে লাগিয়ে রাখা কঠিন। এতে অতিরিক্ত কষ্ট ও কৃত্রিমতার সৃষ্টি হয়, যা নামাজের কাঙ্ক্ষিত খুশু-খুজু নষ্ট করতে পারে।জামাতের নামাজে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কাঁধগুলো সমান্তরাল রাখা ও সারি সোজা করা। এটি সহজেই সম্ভব এবং এতে নামাজের খুশু-খুজুর ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না।হাফেজ ইবনু হাজার (রহ.) ফাতহুল বারি গ্রন্থে বলেছেন: “এর উদ্দেশ্য হলো সারিগুলো সোজা ও পরস্পরের কাছাকাছি করার ব্যাপারে অধিক গুরুত্ব দেওয়া; প্রকৃত অর্থে একে অপরের সঙ্গে লেগে থাকা উদ্দেশ্য নয়। দুজনের একজন তার কাঁধ অন্যজনের কাঁধকে স্পর্শ করতে পারে। কিন্তু পা ও হাঁটুর ক্ষেত্রে পরস্পর স্পর্শ করা জরুরি নয়।এর কারণ হলো, কিছু মানুষ অতিরিক্তভাবে পরস্পরের সঙ্গে লেগে দাঁড়ানো বা খুব বেশি ঘন হয়ে দাঁড়ানোর কারণে কষ্ট পেতে পারে। মূল উদ্দেশ্য হলো সারি সোজা ও ঘন রাখা এবং সারির ফাঁকগুলো বন্ধ করা, যাতে শয়তান তাদের মধ্যবর্তী ফাঁকে প্রবেশ করতে না পারে।আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।”
.
◾এখানে একটি প্রশ্ন থাকে সেটা হচ্ছে:সালাতের কাতার সোজা করার ক্ষেত্রে পায়ের সামনের অংশ কি বিবেচ্য, নাকি গোড়ালি বরাবর কাতার সোজা করা হবে?
.
সালাতের কাতার সোজা করার ক্ষেত্রে পায়ের সামনের অংশ নয়; বরং গোড়ালিই মূল বিবেচ্য। তাই মুসল্লিগণ কোনো প্রকার সামনে-পেছনে না গিয়ে এবং কাতারে ফাঁক বা বক্রতা না রেখে এক সরলরেখায় দাঁড়াবেন। এ সময় কাঁধের সাথে কাঁধ এবং গোড়ালির সাথে গোড়ালি সমান্তরালে রাখবেন।পায়ের সামনের অংশ বরাবর কাতার সোজা করা উদ্দেশ্য নয়;কারণ সবার পায়ের দৈর্ঘ্য সমান নয়;মানুষের পায়ের দৈর্ঘ্য একেকজনের একেক রকম।ফলে পায়ের আঙুল বরাবর কাতার করলে প্রকৃতপক্ষে কাতার সোজা নাও হতে পারে।সুতরাং কাতার সোজা করার ক্ষেত্রে গোড়ালিই মানদণ্ড।ইমাম ইবনুল কাত্তান (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:”وعن أنس قال: ( كان أحدنا يلزق منكبه بمنكب صاحبه وقدمه بقدمه )، وهذا إجماع “প্রখ্যাত সাহাবী আনাস ইবনু মালিক (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) [মৃত: ৯৩ হি.] থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:”(আমাদের কেউ সালাতে) তার সঙ্গীর কাঁধের সাথে কাঁধ এবং পায়ের সাথে পা মিলিয়ে দিত।” আর এটি ইজমা (ঐকমত্য)।”(সূত্র: আল-ইকনা, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৫০)
.
এ বিষয়ে বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) -কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: কাতার সোজা করার ক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি কোনটি? তা কি শুধু পায়ের আঙুলের অগ্রভাগ বরাবর সমান করা? নাকি গোড়ালি বরাবর সমান করা? আর কাতারে দাঁড়ানোর সময় পাশের ব্যক্তির পায়ের সাথে পা মিলিয়ে রাখা কি সুন্নাত?
​উত্তরে তিনি রাহি. বলেন:الصحيح أنّ المعتمد في تسوية الصف، محاذاة الكعبين بعضهما بعضا، لا رؤوس الأصابع، و ذلك لأنّ البدن مركب على الكعب. و الأصابع تختلف الأقدام فيها، فقدم طويل و آخر صغير فلا يمكن ضبط التساوي إلا بالكعبين. وأما إلصاق الكعبين بعضهما ببعض فلا شك أنه وارد عن الصحابة رضي الله عنهم، فإنهم كانوا يسوون الصفوف بإلصاق الكعبين بعضهما ببعض، أي: أنّ كل واحد منهم يلصق كعبه بكعب جاره لتحقيق المساواة. و اهذا إذا تمت الصفوف و قام الناس،ينبغي لكل واحد أن يلصق كعبه بكعب صاحبه لتحقيق المساواة فقط و ليس معنى ذلك أنه يلازم هذا الإلصاق و يبقى ملاصقا له في جميع الصلاة.و من الغلو في هذه المسألة ما يفعله بعض الناس: تجده يلصق كعبه بكعب صاحبه و يفتح قدميه فيما بينهما حتى يكون بينه و بين جاره في المناكب فرجة، فيخالف السنة في ذلك. و المقصود أنّ المناكب و الأكعب تتساوى.”কাতার সোজা করার ক্ষেত্রে সহীহ বা বিশুদ্ধ কথা হলো—কাতার সোজা করার মূল ভিত্তি হলো উভয় গোড়ালি পরস্পরের বরাবর রাখা, আঙুলের অগ্রভাগ নয়। কেননা শরীরের ভারসাম্য ও ভর গোড়ালির ওপরই ন্যস্ত থাকে। আর মানুষের পায়ের সাইজ অনুযায়ী আঙুল ছোট-বড় হয়ে থাকে; কারো পা লম্বা, কারও বা ছোট। সুতরাং গোড়ালি মেলানো ছাড়া সমতা নিখুঁত করা সম্ভব নয়।আর পরস্পরের সাথে গোড়ালি মিলিয়ে দেওয়া—এটি সাহাবায়ে কেরাম (রা.) থেকে প্রমাণিত হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁরা পরস্পরের গোড়ালি মিলিয়ে কাতার সোজা করতেন। অর্থাৎ, কাতার সমতল ও সোজা করার উদ্দেশ্যে তাঁদের প্রত্যেকে পার্শ্ববর্তী মুসল্লির গোড়ালির সাথে নিজের গোড়ালি মিলিয়ে নিতেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সারা নামাযজুড়ে এই জোড়াগাঁথা বা সেঁটে থাকা আবশ্যক বা তারা পুরো নামাযে একে অপরের সাথে সেঁটে থাকতেন।বরং যখন কাতার পূর্ণ হতো এবং মানুষ নামাজে দাঁড়াতো, তখন কাতার সোজা করার তাগিদেই কেবল প্রত্যেকে পার্শ্ববর্তী ব্যক্তির সাথে গোড়ালি মিলিয়ে নিতেন। আর এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি হলো সেই কাজ, যা কিছু মানুষ করে থাকে—দেখা যায়, সে পার্শ্ববর্তী ব্যক্তির সাথে গোড়ালি মেলাতে গিয়ে নিজের দুই পায়ের মাঝখানে অতিরিক্ত ফাঁক (ফাঁকা জায়গা) তৈরি করে ফেলে, যার ফলে পার্শ্ববর্তী ব্যক্তির কাঁধের সাথে তার কাঁধের মাঝে ফাঁকা বা দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। এভাবে সে মূলত সুন্নাহর পরিপন্থী কাজ করে। অথচ মূল উদ্দেশ্য হলো কাঁধ এবং গোড়ালি উভয়টিই সোজা ও বরাবর থাকা।”।”(ফাতাওয়াশ শায়খ ইবনে উসাইমীন; সংকলন: আশরাফ আবদুর রহিম, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪৩৬-৪৩৭)
.
তিনি রাহিমাহুল্লাহ অপর ফাতাওয়ায় আরও বলেন: কাতার সোজা করার অর্থ হলো সবাই সমানভাবে দাঁড়াবে; যেন একজন আরেকজনের চেয়ে সামনে না থাকে। প্রশ্ন হলো, পায়ের সামনের অংশ কি বিবেচ্য?
এ বিষয়ে তিনি বলেন:المعتبر المناكب في أعلى البدن، والأكعب في أسفل البدن، وهذا عند الاعتدال.أما إذا كان في الإنسان أحديداب فلا عبرة بالمناكب؛ لأنه لا يمكن أن تتساوى المناكب والأكعب مع الحدب، وإنما اعتبرت الأكعب؛ لأنها في العمود الذي يعتمد عليه البدن، فإن الكعب في أسفل الساق، والساق هو عمود البدن، فكان هذا هو المعتبر.وأما أطراف الأرجل فليست بمعتبرة؛ وذلك لأن أطراف الأرجل تختلف، فبعض الناس تكون رجله طويلة، وبعضهم قصيرة، فلهذا كان المعتبر الكعب “বিবেচ্য হলো শরীরের উপরের অংশে কাঁধ, আর নিচের অংশে গোড়ালি। এটি স্বাভাবিকভাবে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে কোনো ব্যক্তির যদি কুঁজ থাকে, তাহলে তার কাঁধ বিবেচনা করা হবে না। কারণ কুঁজ থাকার কারণে কাঁধ ও গোড়ালি একইভাবে সমান করা সম্ভব নয়। বরং তখন গোড়ালি বিবেচনা করা হবে। কারণ গোড়ালি পায়ের নিচের অংশে অবস্থিত এবং পা হলো শরীরের ভর বহনকারী স্তম্ভ। তাই গোড়ালিই এখানে বিবেচ্য।আর পায়ের আঙুল বা সামনের অংশ বিবেচ্য নয়। কারণ মানুষের পায়ের দৈর্ঘ্য একেকজনের একেক রকম কারও পা লম্বা, কারও পা ছোট। তাই গোড়ালিই বিবেচ্য।‌”(আশ শারহুল মুমতি ৩/১০–১১)
.
মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ’-তে এসেছে:يستحب تسوية الصفوف في صلاة الجماعة بحيث لا يتقدم بعض المصلين على البعض الآخر، ويعتدل القائمون في الصف على سمت واحد مع التراص، وهو تلاصق المنكب بالمنكب، والقدم بالقدم، والكعب بالكعب حتى لا يكون في الصف خلل ولا فرجة…”জামাতের সালাতে কাতার সোজা করা মুস্তাহাব; যাতে কোনো মুসল্লি অন্য মুসল্লির চেয়ে এগিয়ে না থাকে, বরং কাতারবদ্ধ ব্যক্তিরা কোনো ত্রুটি বা ফাঁকফোকর ছাড়া এক সমান্তরালে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে লেগে থাকে। আর ‘তরাস’ বা নিবিড়ভাবে দাঁড়ানোর অর্থ হলো—কাঁধের সাথে কাঁধ, পায়ের পাতার সাথে পায়ের পাতা এবং গোড়ালির সাথে গোড়ালি মিলিয়ে রাখা, যাতে কাতারে কোনো রকম বিঘ্ন বা ফাঁকা স্থান না থাকে…”(মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ, ১১তম খণ্ড, পৃ. ৩৫৪)
.
পরিশেষে বলা যায়, জামাতে সালাত আদায়ের সময় কাঁধের সঙ্গে কাঁধ এবং গোড়ালির সঙ্গে গোড়ালি মিলিয়ে কাতার সোজা করা ও ফাঁক বন্ধ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুন্নাতসম্মত আমল। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) থেকে এই পদ্ধতির বাস্তব প্রমাণ রয়েছে, যা কাতার সুসংবদ্ধ ও শৃঙ্খলিত রাখতে সাহায্য করে। তবে এটি পালনের ক্ষেত্রে এমন কোনো বাড়াবাড়ি বা কৃত্রিমতা করা উচিত নয়, যা পাশের মুসল্লির কষ্টের কারণ হয় কিংবা খুশূ-খুযূ নষ্ট করে। মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো ফাঁক বা বক্রতা না রেখে সুশৃঙ্খলভাবে কাতার সোজা করা, যেখানে পায়ের সামনের অংশ নয় বরং গোড়ালি এবং ওপরের অংশে কাঁধই মূল বিবেচ্য। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।
Share: