শরীয়তের দৃষ্টিতে নামের শেষে লকব ব্যবহারে কোনো আপত্তি আছে কি

অনেক আলেম-উলামা নামের শেষে ‘মাদানি’ কেউ ‘আজহারি’, কেউ ‘কাসেমি’, কেউ ‘রাহমানী’, কেউ ‘সালাফি’ ইত্যাদি লকব ব্যবহার করেন। শরীয়তের দৃষ্টিতে এতে কোনো আপত্তি আছে কি?
▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: ইলম মহান আল্লাহ প্রদত্ত এক অফুরন্ত নেয়ামত। যা জ্ঞানী ও মূর্খদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে। হাদীসে ইবাদতের পূর্বে ইলম অর্জন করার কথা বলা হয়েছে। আর ইলম অর্জনের জন্য নিয়ত বিশুদ্ধ করতে হবে। সত্যিকারের মুত্তাক্বী আলেমগণ নবী ও রাসূলগণের রেখে যাওয়া দ্বীনী ইলম সমূহের উত্তরাধিকারী। ভারত উপমহাদেশে উপরোক্ত লকব গুলো খুবই কমন। যেমন: ভারতে অবস্থিত দিল্লীর রাহমানিয়া থেকে যাঁরা ফারেগ হয়েছেন তারা লিখেন, ‘রাহমানী’। মিসরের আযহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাঁরা ফারেগ হন তারা লিখেন, ‘আযহারী’। জামিয়া সালাফিয়া বানারস থেকে যারা ফারেগ হন তাঁরা লিখেন ‘সালাফী’। এভাবেই মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাঁরা ফারেগ হন তাঁরা লিখেন ‘মাদানী’। আর ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে একজন আলেমের নামের শেষে ‘মাদানী’, ‘আজহারি’, ‘কাসেমি’, ‘নাদভি’, ‘সালাফি’ ইত্যাদি লকব ব্যবহারের দুটি উদেশ্য হতে পারে; যা তার নিয়তের সাথে সম্পর্কিত। যেমন:
(১). শুধুমাত্র তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনের পরিচয় তুলে ধরা। (এতে কোন সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ)

(২). নিজের ইলম জাহির বা যোগ্যতা প্রকাশ করা। (এটি উচিত নয়)।
.
উপরোক্ত দুটি উদেশ্যের মধ্যে প্রথমটি অর্থাৎ কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনের পরিচয় তুলে ধরার জন্য উক্ত লকব ব্যবহার করা, এটি জায়েজ, শরীয়তের দৃষ্টিতে এতে কোনও আপত্তি নেই ইনশাআল্লাহ। কেননা তারা নিয়ত সহীহ রেখেই এটি ব্যবহার করেছে। তাছাড়া একজন হকপন্থি আলেম কখনোই ভিন্ন উদ্দেশ্যে এই লকব ব্যবহার করে না। কারণ তিনি সাধারণ মানুষের চেয়েও শরীয়ত সম্পর্কে বেশি জানেন। এবং আল্লাহকে বেশি ভয় করেন যার সার্টিফিকেট স্বয়ং মহান আল্লাহ নিজে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন إِنَّمَا يَخْشَى اللهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে মূলতঃ আলেমরাই তাঁকে ভয় করে।’ (সূরা ফাতির; ৩৫/২৮)। সুতরাং, যে আলেম আল্লাহকে ভয় করে সে কখনোই নিজেকে জাহির করা অথবা নিজের নিজের ইলমী অহঙ্কার ফাঁস করার জন্য উক্ত লকব ব্যবহার করেন না। আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ (রাঃ) বলেন, لَيْسَ الْعِلْمُ بِكَثْرَةِ الرِّوَايَةِ، إِنَّمَا الْعِلْمُ الْخَشْيَةُ ‘অধিক হাদীস জানাই প্রকৃত জ্ঞানার্জন নয়। বরং প্রকৃত জ্ঞানার্জন হলো আল্লাহভীতি অর্জন করা।'(ইবনুল ক্বাইয়িম,আল-ফাওয়ায়েদ, ১৪৭ পৃঃ)
.
বর্তমানে চায়না মালের মত সমাজে জাল-জয়ীফ আলেমের কোন অভাব নেই। তাই হক পন্থী আলেমদের পরিচয়ের জন্য এবং সাধারণ মানুষের মনে তাদের লিখনী গ্রন্থের আকর্ষণ বৃদ্ধি করার জন্য নামের শেষে উপাধি বা ডিগ্রী লাগাতে দোষ নেই। ‘মেড ইন জাপান’ অথবা ‘মেড ইন চায়না’ দেখে যেমন পণ্যের মান নির্ণয় করতে সহজ হয়। যোগ্য ডাক্তার হলেও অজানা লোকে ডিগ্রী দেখে তার কাছে রুগী নিয়ে যায়। খেজুর মার্কেটে দেখেছি, প্যাকেটের উপর تمر المدينة (মদিনার খেজুর) লিখা থাকলে, তা শ্রেষ্ঠ খেজুর বলে বিক্রি হয়। তেমনি মানুষ আলেমদের শিক্ষাগত যোগ্যতা আক্বীদা-মানহাজ ও মান লক্ষ্য করে ইলম গ্রহণ করে থাকে। আর তাতে শরয়ী কোন ক্ষতিও নেই। কেননা এটাই সালাফদের নীতি ছিল। পক্ষান্তরে যদি কেউ নিজের নামের সাথে উক্ত লকব ব্যবহার না করে তাহলে সেটা তার অধিক বিনয়ের পরিচয় বলতে হবে। কিন্তু পরিচয়ের জন্য মনে অহংকার না রেখে যদি কেউ লিখে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অহংকারে ফতোয়া প্রয়োগ করা ঠিক হবেনা। কেননা আমরা তাদের মনের খবর জানিনা সুতরাং পরিচয়ের জন্য কাউকে আমীরুল মু’মিনীন, ইমাম, মুহাদ্দিস, শাইখুল হাদিস, শায়খ, হাফেয, মাষ্টার, মাদানী, ফাইযী, শামসী ইত্যাদি বলে উল্লেখ করলেই মানুষের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি হয়না। ইলমী অহংকারের গুমর প্রকাশ করা পায়না, এসব তো মনের ব্যাপার।কারো হলে হতে পারে। আল্লাহ তার হিসাবগ্রহণকারী, দুনিয়ার মানুষ না। আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন কার নিয়ত কেমন।
.
পক্ষান্তরে জেনে রাখা ভালো যে, মাদানীদের ‘মাদানী’ লেখার একটা সূত্র আছে। মদীনা নববিয়ার মাটিতে রাসূল (ﷺ)-এর শহরে চার বা তারও অধিক বছর যাঁরা কাটিয়েছেন, তাঁদের জন্য ‘মাদানী’ লেখা দূষণীয় নয়। আহালুল আলেমগন বলেন, إن الإنسان إذا كان في بلد فاستوطنها ـ بعض العلماء يقول ـ أربع سنوات استوطنها فإنه يصح النسبة إليها، فإذا كثر استيطانه للبلدان يصح أن نطلق عليه عدة أنساب، مثلا عاش في نجد ولد في نجد ومكث فيها فترة ثم انتقل إلى المدينة ثم انتقل إلى اليمن ثم انتقل إلى الشام ثم انتقل إلى مصر هذا تقول فلان النجدي المدني اليمني الشامي المصري ويصح ـ يقولون الأولى ـ أن تقول: النجدي ثم المدني ثم اليمني ثم الدمشقي ثم المصري।।।।
অর্থাৎ, মানুষ যখন কোন শহরের বাসিন্দা হয়—কিছু উলামা বলেন, চার বছর বাস করে—তখন তার দিকে নিসবত (সম্পর্ক) জুড়া শুদ্ধ। একাধিক শহরে তার বসবাস হলে একাধিক নিসবত জুড়া আমাদের জন্য শুদ্ধ। যেমন; কেউ নজদে জীবনধারণ করল, নজদে জন্মগ্রহণ করল, সেখানে কিছুকাল অবস্থান করল, অতঃপর মদীনায় স্থানান্তরিত হল, অতঃপর ইয়ামানে স্থানান্তরিত হল, অতঃপর শামে স্থানান্তরিত হল, অতঃপর মিসরে স্থানান্তরিত হল। এর জন্য বলবেন যে, অমুক নাজদী, মাদানী, ইয়ামানী, শামী, মিসরী। অবশ্য সঠিক এই যে—তাঁরা বলেন, উত্তম এই যে, আপনি বলবেন, অমুক নাজদী, সুম্মা মাদানী, সুম্মা ইয়ামানী, সুম্মা শামী, সুম্মা মিসরী। (শারহুত তাযকিরাহ ফী উলূমিল হাদীস, ইবনুল মুলাক্ক্বিন ১/১২৮ আরো বিস্তারিত জানতে শাইখ আব্দুল হামীদ আল-ফাইযী আল-মাদানী হাফি-এর দুআ নিয়ে ‘দুয়ো’ বইটি পড়তে পারেন এখানে বেশ কিছু নোট আমি শাইখের বই থেকে নিয়েছি)। মহান আল্লাহ আমাদের অন্তর থেকে হিংসা বিদ্বেষ দূর করে সবাইকে কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী যাবতীয় কর্মগুলি সম্পাদন করার তৌফিক দান করুন। আমীন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
______________________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Share: