কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

দাজ্জাল কে ও তার পরিচয় কি এবং দাজ্জালের আগমন সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহর সঠিক বক্তব্য

ভূমিকা: ক্বিয়ামতের দশটি বড় আলামতের অন্যতম আলামত হল দাজ্জালের আবির্ভাব। হুযায়ফাহ ইবনু আসীদ আল-গিফারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, একদিন আমরা (বিবিধ বিষয়ে) আলোচনা করছিলাম। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের নিকট আবির্ভূত হলেন এবং প্রশ্ন করলেন, তোমরা কী বিষয়ে আলোচনা করছ? উত্তরে তাঁরা বললেন, আমরা ক্বিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করছি। এ কথা শুনে তিনি বললেন, ততক্ষণ পর্যন্ত ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না তোমরা দশটি বিশেষ আলামত দেখবে। অতঃপর তিনি বর্ণনা করলেন যে, (১) ধুম্র (২) দাজ্জাল (৩) দাব্বাতুল আরয বা ভূমির প্রাণী (৪) পশ্চিমাকাশ হতে সূর্যোদয় হওয়া (৫) মারইয়াম পুত্র ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর অবতরণ (৬) ইয়াজূজ-মাজূজ এবং তিনবার ভূখণ্ড ধ্বসে যাওয়া। যথা: (৭) পূর্ব দিকের ভূখণ্ড ধ্বস (৮) পশ্চিম দিকের ভূখণ্ড ধ্বস (৯) আরব উপদ্বীপে ভূখণ্ড ধ্বস। (১০) এ আলামতসমূহ প্রকাশিত হওয়ার পর এডেনের ভূগর্ভ থেকে এক অগ্নুৎপাতের প্রকাশ ঘটবে, যা তাদেরকে ইয়ামান থেকে হাশরের মাঠ পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে যাবে।’ (সহীহ মুসলিম, হা/২৯০১, ‘কিতাবুল ফিতান’; আবু দাঊদ, হা/৪৩১১; তিরমিযী, হা/২১৮৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৮৭ মিশকাত,৫৪৬৪)। অপর বর্ননায় আবু হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ছয়টি লক্ষণ প্রকাশ হওয়ার পূর্বে ভাল ‘আমল অর্জনে তৎপর হও। ১. ধোঁয়া, ২. দাজ্জাল, ৩. দাব্বাতুল আরয (মৃত্তিকাগর্ভ হতে বহির্ভূত জন্তু), ৪. পশ্চিমাকাশ হতে সূর্য উদিত হওয়া, ৫. সর্বগ্রাসী ফিতনাহ্ ও ৬. তোমাদের ব্যক্তিবিশেষের ওপর আরোপিত ফিতনাহ্(সহীহ মুসলিম ১২৮-(২৯৪৭), ইবনু মাজাহ ৪০৫৬, সিলসিলাতুস সহীহাহ ৭৫৯, সহীহুল জামি ৫১২৩, মিশকাত ৫৪৬৫)
.
আমর ইবনু হুরায়স (রহিমাহুল্লাহ) আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: দাজ্জাল পূর্বাঞ্চলের খুরাসান এলাকা থেকে বের হবে, এমন এক গোত্র তার আনুগত্য গ্রহণ করবে যাদের চেহারা হবে ঢালের মতো চ্যাপ্টা। (তিরমিযী ২২৩৭, ইবনু মাজাহ ৪০৭২, সহীহুল জামি ৩৪০৪, মিশকাত ৫৪৮৭)
.
ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি থেকে কিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত দাজ্জালের ফিতনাহ্ অপেক্ষা কোন ফিতনাহ বৃহত্তর নয়। (মুসলিম ১২৬-(২৯৪৯), সহীহুল জামি ৫৫৮৮, মিশকাত ৫৪৬৯)
.
আসমা বিনতু ইয়াযীদ ইবনুস সাকান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সা.) বলেছেন: দাজ্জাল চল্লিশ বছর জমিনে থাকবে। এর বছর হবে মাসের মতো, মাস হবে সপ্তাহের মতো এবং সপ্তাহ হবে এক দিনের মত। আর দিন হবে খেজুরের একটি শুকনা ডাল আগুনে পুড়ে নিঃশেষ হওয়ার সময়ের মত। (শারহুস্ সুন্নাহ ৩/৬০৪, মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ২০৮২২, মুসনাদে আহমাদ ২৭৬১২, মিশকাত ৫৪৮৯)
.
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: এমন কোন নবী গত হননি যিনি তাঁর উম্মাতকে কানা মিথ্যাবাদী (দাজ্জাল) সম্পর্কে সতর্ক করেননি। তোমরা জেনে রাখ! সে (দাজ্জাল) নিশ্চয় কানা হবে। আর তোমরা এটাও নিশ্চিতভাবে জেনে রাখ যে, তোমাদের প্রভু (আল্লাহ) কানা নন। তার (দাজ্জালের) চক্ষুদ্বয়ের মধ্যস্থলে লিখে থাকবে (ك ف ر) (অর্থাৎ কাফির) (বুখারী ৭১৩১, মুসলিম ১০১-(২৯৩৩), তিরমিযী ২২৪৫, সিলসিলাতুস সহীহাহ্ ২৪৫৭, সহীহুল জামি ৫৭৮৯, মিশকাত ৫৪৭১)
.
উম্মু শারীক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: লোকেরা দাজ্জালের (ফিতনাহ থেকে পলায়ন করবে, এমনকি পাহাড়-পর্বতসমূহে গিয়ে আশ্রয় নেবে। উম্মু শারীক (রাঃ) বলেন, আমি প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! তখন ‘আরব (মুজাহিদীনগণ) কোথায় থাকবেন? তিনি (সা.) বললেন, সংখ্যায় তারা খুবই কম হবে। (সহীহ মুসলিম ১২৫-(২৯৪৫), তিরমিযী ৩৯৩০, সহীহুল জামি ৫৪৬১, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬৭৯৭, মিশকাত ৫৪৭৭)
.
আনাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সা.) বলেছেন: ইস্ফাহানের সত্তর হাজার ইয়াহূদী দাজ্জালের অনুসরণ করবে। তাদের মাথা থাকবে চাদরে ঢাকা (মুসলিম ১২৪-(২৯৪৪), সিলসিলাতুস্ সহীহাহ ৩০৮০, সহীহুল জামি ৮০১৬, মিশকাত ৫৪৭৮)
.
আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সা.) হতে বর্ণনা করেন। তিনি (সাঃ) বলেছেন: মাসীহে দাজ্জাল পূর্বদিক থেকে আগমন করে মদীনাহ্ মুনাওয়ারায় প্রবেশ করতে চাইবে। এমনকি সে উহুদ পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত পৌছে যাবে। অতঃপর মালায়িকাহ্ (ফেরেশতাগণ) তার চেহারা (গতি) সিরিয়ার দিকে ঘুরিয়ে দেবেন এবং সেখানেই সে (ঈসা আলায়হিস সালাম এর হাতে) ধ্বংস হবে। (বুখারীতে নেই, মুসলিম ৪৮৬-(১৩৮০), মুসনাদে আহমাদ ৯১৫৫, আবূ ইয়া’লা ৬৪৫৯, সহীহুল জামি’ ৭৯৯৫, সহীহ ইবনু হিব্বান ৫৭৭৪, তিরমিযী ২২৪৩, মিশকাত,৫৪৮২)
.
ইমরান ইবনু হুসায়ন (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি দাজ্জালের আগমনের সংবাদ শুনে, সে যেন তার নিকট থেকে দূরে সরে থাকে। আল্লাহর শপথ! কোন ব্যক্তি নিজেকে মুমিন ধারণা করে তার কাছে যাবে, কিন্তু তার তেলেসমাতি কর্মকাণ্ডের ধোঁকায় পড়ে সে তার অনুকরণ করে ফেলবে। (মুসনাদে আহমাদ ১৯৮৮৮,
আবূ দাউদ ৪৩১৯, সহীহুল জামি ১১২৪৭, মিশকাত ৫৪৮৮)

সুতরাং দাজ্জাল ক্বিয়ামতের পূর্বে বের হয়ে আসবে। হাদীসে তার সম্পর্কে সবিস্তার বিবরণ উল্লিখিত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে কেউ কেউ দা-জ্জালের আবির্ভাবের কথা ফলাও করে প্রচার করছে। আবার তাদের দাবীর পক্ষে কুরআন-হাদীসের দলীলও পেশ করছে। যা সর্বৈব মিথ্যা। এসব মিথ্যা প্রচারের ফলে জনমনে সৃষ্ট ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে এবং দা-জ্জাল সম্পর্কে সঠিক বিষয় তুলে ধরার জন্যই এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

দাজ্জালের পরিচয়:
____________________________
দাজ্জালের পুরো নাম ‘মাসীহুদ দাজ্জাল’। ‘দাজ্জাল’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ভণ্ড, মিথ্যুক, প্রতারক, দুষ্ট। ইসলামী পরিভাষায় ক্বিয়ামতের পূর্বে যে মহা প্রতারকের আবির্ভাব হবে তাকে ‘মাসীহুদ দাজ্জাল’ বলা হয়। ওলামায়ে কেরাম বলেন, দাজ্জালকে মাসীহ এ জন্যই বলা হয় যে, তার এক চক্ষু সম্পূর্ণরূপে লেপা ও মাংস দ্বারা আবৃত। আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, দাজ্জালের এক চক্ষু লেপা হবে। তার উভয় চোখের মধ্যস্থলে কাফির লেখা থাকবে। অতঃপর তিনি এক একটি অক্ষর পৃথক পৃথকভাবে উচ্চারণ করে বললেন, ك, ف ,ر কাফ, ফা, র। আর প্রত্যেক মুসলিম এ লেখা পড়তে পারবে।’ (সহীহ মুসলিম হা/২৯৩৩, ২৯৩৪ ও ৭২৫৫)

অতএব ‘দাজ্জাল’ শব্দের অর্থ হল বিভ্রান্তি ও প্রতারণা। দাজ্জাল বলতে বুঝায় ছদ্মবেশী মিথ্যাবাদীকে, যে নিরন্তর মিথ্যা বলে মানুষকে ধোঁকা দেয়। এখন ‘দাজ্জাল’ শব্দটি একচক্ষু বিশিষ্ট মিথ্যাবাদীর চিহ্ন বা প্রতীক হিসাবে গৃহীত হয়েছে এবং দাজ্জালকে দাজ্জাল এ জন্যই বলা হয় যে, সে মানুষের সঙ্গে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা করবে এবং সে তার কুফরী ও নিন্দনীয় বিষয়গুলো মিথ্যা দ্বারা আবৃত করে রাখে। (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৮৮০৬)। যে নিজেকে ‘ঈশ্বর’ বা ‘ঐশ্বরিক শক্তির অধিকারী ব্যক্তিত্ব’ বলে দাবি করবে এবং তার ঈশ্বরত্ব প্রমাণের জন্য বহু অলৌকিক কর্মকান্ড দেখাবে। অনেক মানুষ তাকে বিশ্বাস করে ঈমানহারা হবে। প্রকৃতপক্ষে তার সমস্ত কর্মকান্ডই হবে ইন্দ্রজাল, ম্যাজিক ও জাদু কেন্দ্রিক। যার সবথেকে জোরালোতম প্রমাণ হল, ‘সে নিজেই নিজের চোখ ঠিক করতে পারবে না। যদি সত্যিই সে ঈশ্বর বা ঐশ্বরিক শক্তির অধিকারী হত, তাহলে অবশ্যই সে দোষত্রুটি থেকে মুক্ত হত। দাজ্জাল মানব জাতিরই একজন হবে। মুসলিমদের কাছে তার পরিচয় তুলে ধরার জন্য এবং তার ফিতনা থেকে তাদেরকে সতর্ক করার জন্য নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার পরিচয় বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। যাতে মুমিন বান্দাগণ তাকে দেখে সহজেই চিনতে পারে এবং তার ফিতনা থেকে নিরাপদে থাকতে পারে। নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার যে সমস্ত পরিচয় উল্লেখ করেছেন মুমিনগণ তা পূর্ণ অবগত থাকবে। দাজ্জাল অন্যান্য মানুষের তুলনায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের অধিকারী হবে। জাহেল-মূর্খ ও হতভাগ্য ব্যতীত কেউ দাজ্জালের ধোঁকায় পড়বে না।

মাসীহ (مَسِيْحٌ) শব্দটি مَسَحَ ধাতু থেকে গঠিত। যার অর্থ হল, বেশি বেশি সফর করা। আরবীতে ভূপৃষ্ঠের উপর খুব বেশি ভ্রমণকারীকে مَسَحَ الأَرْضَ বলা হয়। এই বিশ্লেষণ অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা ঈসা (আলাইহিস সালাম) নবীদের মধ্যে সর্বাধিক ভ্রমণকারী। (লিসানুল আরব, ২য় খ-, পৃ. ৫৯৪-৫৯৮) মাসীহ: এর অর্থ সম্পর্কে হাফেয ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, يُقَالُ إِنَّهُ سُمِّيَ بِذَلِكَ لِكَوْنِهِ يَمْسَحُ الْأَرْضَ وَقِيلَ سُمِّيَ بِذَلِكَ لِأَنَّهُ مَمْسُوحُ الْعَيْنِ ‘বলা হয় যে, তাকে এই নামে নামকরণ করা হয়েছে, কারণ সে পৃথিবী ধ্বংস করবে। কারো মতে, যেহেতু তার এক চোখ কানা থাকবে তাই এ নামে তাকে নামকরণ করা হয়েছে।’ (ফাতহুল বারী ৬/৪৭২)

শায়খ মুহাম্মাদ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘পক্ষান্তরে ক্বিয়ামতের নিকটতম সময়ে প্রকাশ লাভকারী দাজ্জালকেও যে মাসীহ বলা হয়, এর কারণ সম্পর্কে আলেমগণ বলেছেন, দাজ্জালকে মাসীহ এ জন্যই বলা হয় যে, সে مَمسوح العَين অর্থাৎ কানা হবে, তার এক চক্ষু সম্পূর্ণরূপে লেপা ও মাংস দ্বারা আবৃত থাকবে। যেমন রাসূল (ﷺ) বলেছেন, দাজ্জালের এক চক্ষু লেপা বা প্ল্যাস্টার করা হবে। তার উভয় চোখের মধ্যস্থলে কাফির লেখা থাকবে। অতঃপর তিনি এক একটি অক্ষর পৃথক-পৃথকভাবে উচ্চারণ করে বললেন ك, ف ,ر কাফ, ফা, র। আর মুসলিম মাত্রই প্রত্যেকে এ লেখা পাঠ করতে পারবেন।’ (সহীহ মুসলিম, হা/২৯৩৩, ২৯৩৪; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৮৮০৬)

শায়খ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘দাজ্জালও যেহেতু সারা দুনিয়া ভ্রমণ করবে এবং মক্কা ও মদীনা ব্যতীত সব স্থানেই প্রবেশ করবে, সে জন্য তাকে মাসীহ অর্থাৎ অধিক ভ্রমণকারী বলা হয়।’ (ইবনে বায অফিসিয়াল ওয়েবসাইট: ফাতওয়া নং ১৩১১৩ লিসানুল আরাব, ২য় খন্ড, পৃ. ৫৯৪-৫৯৮)

ইয়াহুদীরা দাজ্জালকে ‘মাসীহ’ এই জন্যই বলে যে, তাদেরকে যে বিপ্লব সৃষ্টিকারী মাসীহের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে এবং যার জন্য তারা এখনো পর্যন্ত ভ্রান্তিময় অপেক্ষায় রয়েছে, দাজ্জাল এই মাসীহর নাম নিয়েই আসবে। অর্থাৎ সে নিজেকে তাদের সেই অপেক্ষিত মাসীহ বলেই প্রকাশ করবে। কিন্তু সে তার এই দাবী সহ অন্যান্য দাবীতে এত বড় প্রতারক ও ধোঁকাবাজ হবে যে, পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের মধ্যে তার কোন নজির মিলবে না। আর এই জন্য তাকে ‘দাজ্জাল’ অর্থাৎ ভীষণ মিথ্যুক ও ধোঁকাবাজ, বিভ্রান্তিকারী ও প্রতারক বলা হয়। মূলত দাজ্জাল বলতে বুঝায় ছদ্মবেশী মিথ্যাবাদীকে, যে নিরন্তর মিথ্যা বলে মানুষকে ধোঁকা দেয়। (তাফরীরে কুরতুবী ও ফাৎহুল ক্বাদীর, ০৩:৪৯)

▪️দাজ্জালের বৈশিষ্ট্য:
________________________
(১) মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাজ্জালকে স্বপ্নে দেখে তার শারীরিক গঠনের বর্ণনা প্রদান করেছেন এভাবে, অতঃপর আমি তাকাতে লাগলাম, হঠাৎ দেখতে পেলাম, এক ব্যক্তি স্থুলকায় লাল বর্ণের, কোঁকড়ানো চুল, এক চোখ কানা, চোখটি যেন ফোলা আঙ্গুরের মত। লোকেরা বলল, এ-হল দাজ্জাল’! (সহীহ বুখারী হা/৭১২৮, ৩৪৪১, ৫৯০২, ৬৯৯৯, ৭০২৬; সহীহ মুসলিম হা/১৬৯, ১৭১)

(২) দাজ্জাল আদম সন্তানের ঔরসজাত হবে। পূর্বদিকে তথা খোরাসান, সিরিয়ার দিক থেকে বের হবে, ‘দাজ্জাল মানুষের মত কথা বলবে।(তিরমিযী হা/২২৩৭; ইবনু মাজাহ হা/৪০৭২; বুখারী, মিশকাত হা/৫৪৭৯-৮০; মুসনাদে আবী ইয়ালা হা/৩৪; ইবনু মাজাহ হা/৪০৭২; সনদ সহীহ)

(৩) দাজ্জাল হবে বৃহদাকার খাটো একজন যুবক পুরুষ, শরীরের রং হবে লাল, বেঁটে , মাথার চুল হবে কোঁকড়া, কপাল হবে উঁচু, বক্ষ হবে প্রশস্ত, পায়ের নলা লম্বা লম্বা চক্ষু হবে টেরা এবং আঙ্গুর ফলের মত উঁচু।’ (সহীহ মুসলিম হা/২৯৩৭; ইবনু মাজাহ হা/৪০৭৫; সহীহুল জামে হা/২৪৫৫; মিশকাত ৫৪৮৫)

(৪) তার আকার হবে আবুল উযযা ইবনু কাতান নামক জনৈক ইহূদীর মত। অর্থাৎ মানুষের মাঝে ইবনু কতানই তার কাছাকাছি সাদৃশ্য হবে (সহীহ মুসলিম ১১০-২৯৩৭; তিরমিযী ২২৪০; ইবনু মাজাহ ৪০৭৫; মিশকাত হা/৫৪৭৫, ৫৪৮৩)

(৫) দাজ্জাল নির্বংশ কাফের হবে। তার কোন সন্তান-সন্ততি থাকবে না। (সহীহ মুসলিম হা/২৯২৭; তিরমিযী হা/২২৪৬)

(৬) দাজ্জালকে চেনার সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো, তার কপালে কাফির (كافر) লেখা থাকবে। দাজ্জালের দু’চোখের মাঝখানে কাফির শব্দটি লেখা থাকবে। (সহীহ বুখারী হা/৭১৩১; মুসলিম হা/২৯৩৩)

(৭) দাজ্জাল হবে মুদিত চক্ষুবিশিষ্ট। তার চক্ষুর উপর নখ পরিমাণ মোটা চামড়া থাকবে, চক্ষুদ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে লেখা থাকবে কাফির। প্রত্যেক শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মুমিন তা পড়তে পারবে। (সহীহ বুখারী ৭১৩০, মুসলিম ১০৭-(২৯৩৪/২৯৩৫, মিশকাত ৫৪৭৩)

(৭) দাজ্জালের সাথে পানি ও আগুন থাকবে। তার আগুন হবে ঠান্ডা পানি এবং তার পানি হবে আগুন। (সহীহ বুখারী হা/৭১৩০; মুসলিম হা/২৯৩৪; মিশকাত৫৪৭৩)

(৮) দাজ্জালের সাথে জান্নাত ও জাহান্নাম থাকবে। তার জাহান্নামই হল (প্রকৃত) জান্নাত এবং তার জান্নাত হল (প্রকৃত) জাহান্নাম। (সহীহ মুসলিম হা/২৯৩৪)

(৯) দাজ্জালের ডান চোখ কানা হবে। যেন তা ফোলা আঙ্গুর। তবে কোন হাদীসে আছে, তার ডান চোখ অন্ধ হবে। আবার কোন হাদীসে আছে তার বাম চোখ হবে অন্ধ। (সহীহ মুসলিম হা/২৯৩৪; ইবনু মাজাহ হা/৪০৭১)। মোটকথা তার একটি চোখ দুষিত হবে। তবে ডান চোখ অন্ধ হওয়ার হাদীস গুলো বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। (সহীহ বুখারী হা/৪৪০২-৪৪০৩, ৭১২৩, ৭৪০৭; সহীহ মুসলিম হা/২৯৩৩)। সুতরাং দাজ্জালের অন্যান্য লক্ষণগুলো কারো কাছে অস্পষ্ট থেকে গেলেও অন্ধ হওয়ার বিষয়টি কারো কাছে অস্পষ্ট হবে না।

(১০) দাজ্জাল মক্কা-মদীনাতে প্রবেশ করতে পারবে না। মক্কা মদিনায় প্রবেশ তার জন্য হারাম করা হয়েছে। (সহীহ বুখারী হা/১৮৮১; মুসলিম হা/২৯৪৩)

(১১) সে চল্লিশ দিন বা চল্লিশ মাস বা চল্লিশ বছর অবস্থান করবে। প্রথম দিন হবে এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিন এক মাস ও তৃতীয় দিন হবে এক সপ্তাহের সমান। বাকী দিনগুলো হবে সাধারণ দিনের ন্যায় এরপর আল্লাহ ঈসা (আঃ)-কে প্রেরণ করবেন। তিনি দাজ্জালকে হত্যা করবেন। (সহীহ মুসলিম হা/২৯৪০; তিরমিযী হা/৫৪৭৫; আবু দাঊদ হা/৪৩২১; ইবনু মাজাহ হা/৪০৭৫; মিশকাত ৫৪৭৫, ৫৪৮৯)।

(১২) দাজ্জালের নির্দেশে আসমান বৃষ্টি বর্ষাবে আর যমীন ফসল ফলবে। (তিরমিযী হা/২২৪০; মিশকাত হা/৫৪৭৫)।

(১৩) দাজ্জালকে ঈসা (আঃ) বায়তুল মুক্বাদ্দাসের নিকটবর্তী ‘লুদ্দ’ নামক শহরের প্রধান ফটকে হত্যা করবেন। (সহীহ মুসলিম, মিশকাত হা/৫৪৭৫)

▪️দাজ্জাল জন্মগ্রহণ করবে নাকি প্রকাশিত হবে? বর্তমানে দাজ্জাল কোথায় অবস্থান করছে?
_______________________________________
দাজ্জাল জন্মগ্রহণ করবে না। কেননা তার জন্ম অনেক পূর্বেই হয়ে গেছে, বহুকাল থেকেই সে প্রাচ্যের কোন একটি দ্বীপের উপর লৌহ দ্বারা নির্মিত শিকলে বাঁধা অবস্থায় অবস্থান করছে। যেমন জাস্‌সা-সাহ্ নামক জন্তুর ঘটনায় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। যা নিম্নরূপ: ফাতিমা বিনতু কায়স (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সালাত আদায়ন্তে হাস্যোজ্জ্বল অবস্থায় মিম্বারে বসে গেলেন। অতঃপর তিনি বললেন, প্রত্যেকেই স্ব স্ব স্থানে বসে যাও। তারপর তিনি বললেন তোমরা কি জান, আমি কী জন্য তোমাদেরকে সমবেত করেছি? সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই (ﷺ) সর্বাধিক জ্ঞাত। তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ আমি তোমাদেরকে কোন আশা বা ভয়-ভীতির জন্য একত্রিত করিনি। তবে আমি তোমাদেরকে কেবল এজন্য একত্রিত করেছি যে, তামীম আদ-দারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) প্রথমে খ্রিষ্টান ছিল। সে আমার কাছে এসে বায়আত গ্রহণ করেছে এবং ইসলাম গ্রহণ করেছে। সে আমার নিকট এমন একটি কাহিনী বর্ণনা করেছে যা দ্বারা আমার সে বর্ণনার সত্যায়ন হয়ে যায়, যা আমি দাজ্জালের ব্যাপারে তোমাদের নিকট বর্ণনা করেছিলাম। সংক্ষিপ্ত কথা হল বর্তমানে দাজ্জাল প্রাচ্যের কোন একটি দ্বীপে আবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে, সেটি আসলে কোন দ্বীপ? এ কথা নিশ্চিতরূপে বলা অসম্ভব। কেননা এগুলো অদৃশ্যের খবর, তাই যেখানে যতটুকু যেভাবে বলা হয়েছে, সেভাবেই তার উপর ঈমান আনতে হবে। খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে গবেষণার নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা মোটেও কাম্য নয়। (বিস্তারিত দেখুন, সহীহ মুসলিম হা/২৯৪২; আবু দাঊদ হা/৪৩২৫, ৪৩২৬; তিরমিযী হা/২২৫৩; ইবনু মাজাহ হা/৪০৭৪। সহীহ মুসলিম হা/২৯৪২, ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-২২৮৪৯৩)

▪️দাজ্জাল কোথায় থেকে আবির্ভূত হবে:
______________________________________

আজকের দিনে এটি-ই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। দাজ্জাল সম্পর্কে পৃথক গবেষণাগার ও স্বতন্ত্র ফ্যাকাল্টির (Faculty) দাবীদার জনৈক বক্তা দীর্ঘ গবেষণার পর বলেছেন যে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) বলেছেন, দাজ্জাল শেষ যামানায় ‘জেরুজালেম’ থেকে আবির্ভূত হবে’। পক্ষান্তরে সহীহ হাদীসের আলোকে স্পষ্ট প্রমাণিত যে, ‘দাজ্জাল ‘খুরাসানের’ একটি এলাকা থেকে আবির্ভূত হবে, যা বর্তমান ‘ইরানে’ অবস্থিত। শায়খ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘সহীহ দলীলের ভিত্তিতে এটিই প্রমাণিত হয় যে, সর্বপ্রথম দাজ্জাল পূর্বদিক থেকে আবির্ভূত হবে। বিশেষ করে খুরাসানের অঞ্চল থেকে। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে খুরাসানের ইসফাহান নামক এলাকা থেকে। যা বর্তমানে ইরানের একটি অঞ্চল, তেহরান থেকে দক্ষিণে ৩৪০ কি.মি. দূরে অবস্থিত। (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৮৮০৬)

আবু বকর সিদ্দীক্ব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, প্রাচ্যের ‘খোরাসান’ অঞ্চল হতে দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। এমনসব জাতি তার অনুসরণ করবে, যাদের মুখাবয়ব হবে স্তরবিশিষ্ট ঢালের মত চ্যাপ্টা ও মাংসল।’ (তিরমিযী হা/২২৩৭ ‘কলহ-বিপর্যয়’ অধ্যায়, ‘দাজ্জাল কোথায় থেকে আবির্ভূত হবে’? অনুচ্ছেদ; ইবনু মাজাহ, হা/৪০৭২; মুসনাদে আহমাদ হা/১২, ৩৩; সনদ হাসান সহীহ, সিলসিলা সহীহাহ হা/১৫৯১)

নাউওয়াস ইবনু ছামআন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, إِنَّهُ خَارِجٌ خَلَّةً بَيْنَ الشَّأْمِ وَالْعِرَاقِ فَعَاثَ يَمِيْنًا وَعَاثَ شِمَالًا يَا عِبَادَ اللهِ فَاثْبُتُوْا ‘সে ইরাক্ব ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী রাস্তা হতে আবির্ভূত হবে। সে ডানে-বামে দুর্যোগ সৃষ্টি করবে। সুতরাং হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা অটল থাকবে।’ (সহীহ মুসলিম হা/২৯৩৭; তিরমিযী হা/২২৪০; ইবনু মাজাহ হা/৪০৭৫; মুসনাদে আহমাদ হা/১৭৬২৯)

উপরোক্ত হাদীসে মূলত খুরাসানের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, يَخْرُجُ الدَّجَّالُ مِنْ يَهُوْدِيَّةِ أَصْبَهَانَ مَعَهُ سَبْعُوْنَ أَلْفًا مِنَ الْيَهُوْدِ ‘দাজ্জাল আসবাহান বা ইসফাহানের ‘ইয়াহুদিয়্যাহ’ নামক অঞ্চল থেকে বাহির হবে। আর তার সাথে থাকবে সত্তর হাজার ইয়াহুদী। একই অর্থের হাদীস আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতেও বর্ণিত হয়েছে। (মুসনাদে আহমাদ হা/১৩৩৪৪, ২৪৪৬৭, সনদ হাসান; সহীহ মুসলিম হা/২৯৪৪; ফাৎহুল বারী, ১৩তম খণ্ড, পৃ. ৩৪০)

খুরাসান শহরের-ই একটি অঞ্চলের নাম ইসফাহান। হাফিয ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘সর্বপ্রথম দা-জ্জাল ইসফাহানের ‘ইয়াহুদিয়্যাহ’ নামক মহল্লা থেকে আবির্ভূত হবে।’ (আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, পৃ. ৫৯)। হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এই অঞ্চলটি ইয়াহুদী প্রধান হওয়ার কারণেই এটির ‘ইয়াহুদিয়্যাহ’ নামকরণ করা হয়েছে।’ (ফাৎহুল বারী, ১৩তম খণ্ড, পৃ. ৯২, ৩৪০)

শায়খ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, শায়খ মাশহূর হাসান সালমান বলেছেন, ‘অসংখ্য সহীহ হাদীস ও আছার থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দাজ্জাল ‘খুরাসান’ এবং ‘ইসফাহান’ থেকে আবির্ভূত হবে এবং তার অবতরণ হবে ‘খুজ’ এবং ‘কিরমান’’ থেকে। আর এ সমস্ত অঞ্চলের সবগুলোই বর্তমানে ইরানে অবস্থিত। নির্দিষ্ট করে সে ‘কুছা’ গ্রামে অবতরণ করবে। বর্তমান সময়ে যেটি ‘ইবরাহীমের টিলা’ বা ‘ইবরাহীমের টিলা পাহাড়’ নামে পরিচিত। কারণ সেখানে একটি সমাধি রয়েছে, যা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর বলে মনে করা হয়।’ (বুলদানুল খিলাফাতিশ শারক্বিয়্যাহ, পৃ. ৯৪-৯৫; মু‘জামুল বুলদান, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৩৩; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১২৯১৬৪)

▪️দাজ্জাল কখন আবির্ভূত হবে:
_________________________________
শায়খ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘দাজ্জাল কখন আবির্ভূত হবে? এর উত্তরে এক কথায় বলা যায় শেষ যামানায়। কিন্তু শেষ যামানার কোন সময়ে? তা সুনিশ্চিতভাবে বলা অসম্ভব। কারো পক্ষেই ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয় যে, অমুক সালে দাজ্জাল আবির্ভূত হবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজেও এ ব্যাপারে পরিষ্কার কোন তথ্য বা দিনক্ষণ বলে যাননি। তবে তিনি দাজ্জালের আগমনের অনেকগুলো পূর্বশর্ত বা নিদর্শন বলে গেছেন, যেগুলো সাধারণত ক্বিয়ামতের আলামত বা নিদর্শন নামেই পরিচিত। আর ক্বিয়ামতের দশটি বড় আলামতের একটি অন্যতম বড় আলামত হল দাজ্জালের আগমন। যেমন: হুযায়ফাহ ইবনু আসীদ আল-গিফারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, একদিন আমরা (বিবিধ বিষয়ে) আলোচনা করছিলাম। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের নিকট আবির্ভূত হলেন এবং প্রশ্ন করলেন, তোমরা কী বিষয়ে আলোচনা করছ? উত্তরে তাঁরা বললেন, আমরা ক্বিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করছি। এ কথা শুনে তিনি বললেন, ততক্ষণ পর্যন্ত ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না তোমরা দশটি বিশেষ আলামত দেখবে। অতঃপর তিনি বর্ণনা করলেন যে, (১) ধুম্র (২) দাজ্জাল (৩) দাব্বাতুল আরয বা ভূমির প্রাণী (৪) পশ্চিমাকাশ হতে সূর্যোদয় হওয়া (৫) মারইয়াম পুত্র ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর অবতরণ (৬) ইয়াজূজ-মাজূজ এবং তিনবার ভূখণ্ড ধ্বসে যাওয়া। যথা: (৭) পূর্ব দিকের ভূখণ্ড ধ্বস (৮) পশ্চিম দিকের ভূখণ্ড ধ্বস (৯) আরব উপদ্বীপে ভূখণ্ড ধ্বস। (১০) এ আলামতসমূহ প্রকাশিত হওয়ার পর এডেনের ভূগর্ভ থেকে এক অগ্নুৎপাতের প্রকাশ ঘটবে, যা তাদেরকে ইয়ামান থেকে হাশরের মাঠ পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে যাবে।’ (সহীহ মুসলিম, হা/২৯০১ ‘কিতাবুল ফিতান’ আবু দাঊদ, হা/৪৩১১; তিরমিযী, হা/২১৮৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৮৭)

মোটকথা হল শেষ যামানায় ক্বিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে মিথ্যুক দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। দাজ্জালের আগমন ক্বিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সবচেয়ে বড় আলামত। আদম (আলাইহিস সালাম) থেকে শুরু করে ক্বিয়ামত পর্যন্ত মানব জাতির জন্য দাজ্জালের চেয়ে অধিক বড় বিপদ আর নেই। তাই সমস্ত নবী-ই স্বীয় উম্মতকে দাজ্জালের ফিতনা সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করেছেন। আমাদের নবী (ﷺ) ও দাজ্জালের ফিতনা থেকে সতর্ক করেছেন এবং তার অনিষ্ট থেকে বাঁচার উপায়ও বলে দিয়েছেন। (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৪২৯৭০)

▪️দাজ্জাল কোথায় অবস্থান করবে:
____________________________________
জনৈক বক্তা বলেছেন, ‘দাজ্জাল জেরুজালেমে অবস্থান করবে এবং সেখান থেকেই গোটা বিশ্বকে পরিচালনা করবে’। অথচ সহীহ হাদীসের আলোচনা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। হাদীছের ভাষা অনুযায়ী দাজ্জাল ‘খুরাসান’ এবং ‘ইসফাহান’ থেকে আবির্ভূত হবে এবং তার অবতরণ হবে ‘খুজ’ এবং ‘কিরমান’ থেকে। আর এ সমস্ত অঞ্চলের সবগুলোই বর্তমানে ইরানে অবস্থিত। নির্দিষ্ট করে সে ‘কুছা’ গ্রামে অবতরণ করবে। (যা পূর্বে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে)। অতঃপর ডানে-বামে দুর্যোগ সৃষ্টি করতে করতে মদীনার দিকে রওনা দেবে। মদীনার প্রত্যেকটি গেটে পাহারাদার নিযুক্ত থাকায় সে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে না। অতঃপর সে মদীনা থেকে মাত্র তিন মাইল দূরে ‘জুরুফ’ নামক একটি জায়গায় আশ্রয় গ্রহণ করবে। (বুলদানুল খিলাফাতিশ শারক্বিয়্যাহ, পৃ. ৯৪-৯৫; মু‘জামুল বুলদান, ১ম খ-, পৃ. ২৩৩; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১২৯১৬৪)

যেমন: আবু সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, একদিন নবী (ﷺ) আমাদের নিকট দাজ্জাল সম্পর্কে একটি দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করলেন। তিনি তার সম্পর্কে আমাদেরকে যা কিছু বলেছিলেন, তাতে এও বলেছিলেন যে, দাজ্জাল আসবে কিন্তু মদীনার প্রবেশ পথে তার প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ থাকবে। সুতরাং সে মদীনার নিকটবর্তী বালুকাময় একটি স্থানে অবতরণ করবে।’ (সহীহ বুখারী হা/১৮৮২, ৭১৩২, সহীহ মুসলিম হা/২৯৩৮)

উপরোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এটি এমন একটি বালুকাময় অনুর্বর ভূমি যেখানে লবণাক্ততার কারণে কোন ফসল উৎপন্ন হয় না। আর মদীনার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোর এটিই বৈশিষ্ট্য। এ জায়গাটি মূলত মদীনা থেকে শামের দিকে অবস্থিত। (ফাৎহুল বারী, ১৩তম খ, পৃ. ১০২)

আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লহ (ﷺ) বলেছেন, অতঃপর হাম্মাদ ইবনু সালামাহ অবিকল বর্ণনা করেছেন। তবে এতে রয়েছে যে, দাজ্জাল এসে ‘জুরুফ’-এর এক অনুর্বর ভূমিতে নামবে এবং এখানেই সে তার তাঁবু বা শিবির স্থাপন করবে। যার ফলে প্রত্যেক মুনাফিক্ব পুরুষ ও মহিলা তার কাছে চলে যাবে।’ (সহীহ মুসলিম হা/২৯৪৩)

উপরোক্ত হাদীসে বর্ণিত ‘জুরুফ’ নামক জায়গা সম্পর্কে হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘জুরুফ’ হলো মদীনা থেকে মোটামুটি তিন মাইল দূরে শামের দিকে যেতে রাস্তার ধারে অবস্থিত একটি জায়গার নাম। (ফাৎহুল বারী, ১৩তম খ-, পৃ. ৯৩)। অর্থাৎ দাজ্জাল যেখানে অবস্থান করবে বা শিবির স্থাপন করবে সে জায়গাটি মদীনা থেকে মাত্র তিন মাইল দূরে অবস্থিত। অথচ মদীনা থেকে জেরুজালেমের দূরত্ব প্রায় ১.২০০ কিলোমিটার। তাহলে বক্তা কোন গবেষণার ভিত্তিতে বলেছেন যে, দাজ্জাল জেরুজালেম থেকে বিশ্ব পরিচালনা করবে? তবে এ কথা সত্য যে, দাজ্জাল সমগ্র বিশ্ব ভ্রমণ করবে, অবশেষে সে যখন জেরুজালেমে পৌঁছবে, তখন তাকে ঈসা (আলাইহিস সালাম) সেখানেই হত্যা করবেন।

▪️সহীহ হাদীসের আলোকে দাজ্জাল আবির্ভাবের পূর্বশর্ত সমূহ:
______________________________________
(১) যখন আরববাসীরা সংখ্যায় নগণ্য হয়ে যাবে। (সহীহ মুসলিম হা/২৯৪৫; তিরমিযী হা/৩৯৩০; মুসনাদে আহমাদ হা/২৭৬২০)

(২) মহাযুদ্ধে কুস্তুন্তুনিয়া বা কনস্টান্টিনোপলের উপর মুসলিম বাহিনীর বিজয় লাভ। (বিস্তারিত দেখুন আবু দাঊদ হা/৪২৯৪; সনদ হাসান, সহীহুল জামে হা/৪০৯৬; মিশকাত হা/৫৪২৪; মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ হা/৩৭২০৯; মুসনাদে আহমাদ হা/২২০২৩; ত্বাবারাণী আল-মুজামুল কাবীর হা/১৬৬৩৮; মুসতাদরাক হাকিম হা/৮২৯৭; সহীহ মুসলিম হা/২৯০০; মুসনাদে আহমাদ হা/১৫৪১; সহীহুল জামে হা/২৯৬৯; মিশকাত হা/৫৪১৯; সহীহ ইবনু হিব্বান হা/৬৬৭২; ত্বাবারানী, আল-মু‘জামুল কাবীর হা/১৮০১; আল-মু‘জামুল আওসাত্ব হা/৩৬৯১; সহীহ মুসলিম হা/২৯২০; সহীহুল জামে হা/৩৬৩৮; মুসতাদরাক হাকিম হা/৮৪৬৯; মিশকাত হা/৫৪২৩)

(৩) উদ্ভিদ উৎপাদনের হার ও বৃষ্টি বর্ষণের হার হ্রাস পাবে। (সহীহুল জামে হা/৭৮৭৫, সনদ সহীহ)

(৪) তামীম-আদ-দারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত হাদীসে দাজ্জাল আগমনের তিনটি আলামত পাওয়া যায়। (বিস্তারিত দেখুন, সহীহ মুসলিম হা/২৯৪২; আবু দাঊদ হা/৪৩২৫, ৪৩২৬; তিরমিযী হা/২২৫৩; ইবনু মাজাহ হা/৪০৭৪)
.
পরিশেষে, উপরিউক্ত আলোচনা দ্বারা প্রতীয়মান হয়েছে যে, দাজ্জাল একজন শরীরবিশিষ্ট মানুষ হবে। সে সৃষ্ট রয়েছে, যখন সময় হবে আল্লাহর হুকুমে বের হবে, যারা ইয়াহূদী-খ্রিষ্টান বা সভ্যতাকে দাজ্জাল বলে থাকেন তারা মূলত হাদীস বর্ণিত মানব দাজ্জালকে অস্বীকার করার সামিল যা বাতিল ও কুফরি। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বুঝার তওফীক্ব দিন। আমীন! (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
____________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।