সুদখোর বা সুদি ব্যাংকে কর্মরত ব্যক্তির কাছ থেকে হালাল কাজের পারিশ্রমিক গ্রহণের বিধান

প্রশ্ন: সুদখোর বা সুদি ব্যাংকে কর্মরত ব্যক্তির কাছ থেকে হালাল কাজের পারিশ্রমিক গ্রহণের বিধান কী?
▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য। অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রাণপ্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর;ইসলামে হালাল উপার্জন ও পবিত্র জীবিকা অর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। একজন মুসলিমের জন্য নিজের উপার্জন হালাল হওয়ার পাশাপাশি অন্যের কাছ থেকে গৃহীত সম্পদের বৈধতা সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি। কিন্তু কোনো ব্যক্তির উপার্জনে সুদ বা অন্যান্য হারাম উপার্জন মিশ্রিত থাকলে, তার কাছ থেকে হালাল কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা কিংবা বৈধ লেনদেনের মাধ্যমে তার সম্পদ থেকে উপকৃত হওয়ার শরয়ি বিধান কী—এ বিষয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি হয়। বিশেষত, সুদখোর ব্যক্তি বা সুদি ব্যাংকে কর্মরত কারও কাছ থেকে পারিশ্রমিক গ্রহণের ক্ষেত্রে কোন পরিস্থিতিতে তা জায়েজ, কখন তা নিষিদ্ধ এবং কখন তা পরিহার করা অধিক সতর্কতাপূর্ণ—এসব বিষয় সঠিকভাবে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, উপার্জনের পদ্ধতির কারণে হারাম হওয়া সম্পদ এবং চুরি, আত্মসাৎ বা জবরদখলের মাধ্যমে অন্যের অধিকারভুক্ত হয়ে যাওয়া সম্পদের বিধান এক নয়। তাই কুরআন-সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের বক্তব্যের আলোকে এ বিষয়ে শরিয়তের সঠিক বিধান তুলে ধরা হলো।
.
▪️ প্রথমত: সুদখোর বা হালাল-হারাম মিশ্রিত সম্পদের মালিকের সঙ্গে বৈধ লেনদেন করা এবং তার কাছ থেকে হালাল কাজের পারিশ্রমিক গ্রহণ করা মূলত জায়েজ। কোনো ব্যক্তির উপার্জনে হালাল ও হারাম উভয় ধরনের সম্পদ মিশ্রিত থাকলেই তার সঙ্গে সব ধরনের লেনদেন হারাম হয়ে যায় না; বরং এ ক্ষেত্রে হারাম সম্পদের উৎস, প্রকৃত মালিকানা এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের প্রকৃতি বিবেচনা করা জরুরি। কেননা, চুরি, আত্মসাৎ বা জবরদখলের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের বিধান এবং বৈধ মালিকানাধীন কোনো বস্তু বা সেবার বিনিময়ে হারাম উপার্জনের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের বিধান এক নয়। এর প্রমাণ হলো, রাসূল ﷺ এবং তার সাহাবায়ে কিরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) মুশরিক ও ইহুদিদের সঙ্গে ক্রয়-বিক্রয়, ভাড়া, বন্ধক, ঋণসহ বিভিন্ন বৈধ লেনদেন করতেন; অথচ তাদের সমাজে সুদ গ্রহণ ও সুদভিত্তিক লেনদেনের প্রচলন ছিল।উদাহরণস্বরূপ,আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ একজন ইহুদির কাছ থেকে বাকিতে খাদ্য ক্রয় করেছিলেন এবং তাঁর কাছে নিজের বর্ম বন্ধক রেখেছিলেন।(সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ২০৬৮)। সুতরাং, কোনো সুদখোর বা সুদি ব্যাংকে কর্মরত ব্যক্তির উপার্জনে হালাল ও হারাম উভয় ধরনের অর্থ মিশ্রিত থাকলে এবং তার কাছ থেকে শরিয়তসম্মত কোনো কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা হলে, তা মূলত জায়েজ। তবে পারিশ্রমিকটি সরাসরি কোনো হারাম কাজের বিনিময়ে দেওয়া হলে কিংবা নির্দিষ্ট অর্থটি অন্যের অধিকারভুক্ত বা অবৈধভাবে অর্জিত বলে জানা থাকলে, তার বিধান ভিন্ন হবে। তাই এ ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস ও লেনদেনের প্রকৃতি বিবেচনা করা জরুরি। আর কিছু ফকীহ সন্দেহ ও মতানৈক্য থেকে বাঁচার জন্য এ ধরনের ব্যক্তির সঙ্গে লেনদেন পরিহার করাকে অধিক সতর্কতামূলক ও উত্তম বলে বিবেচনা করেছেন।
.
​’কাশশাফুল কিনা’ গ্রন্থে বলা হয়েছে: ( وتكره إجابة من في ماله حلالٌ وحرام ، كأكله منه ، ومعاملته ، وقبول هديته وهبته ونحوه ) كصدقته “যে ব্যক্তির সম্পদে হালাল ও হারাম উভয় প্রকার সম্পদ মিশ্রিত রয়েছে, তার দাওয়াতে সাড়া দেওয়া মাকরুহ (অপছন্দনীয়)। অনুরূপভাবে, তার সম্পদ থেকে আহার করা, তার সঙ্গে লেনদেন করা, তার উপহার ও হেবা গ্রহণ করা এবং এ ধরনের অন্যান্য কাজ করাও মাকরুহ; যেমন তার সদকা গ্রহণ করা।”(কাশশাফুল কিনা’: ৫/১৬৭)
.
দুসুক্বির হাশিয়াতে এসেছে: اعلم أن من أكثر ماله حلال وأقله حرام : المعتمد جواز معاملته ومداينته والأكل من ماله كما قال ابن القاسم ، خلافا لأصبغ القائل بحرمة ذلك .وأما من أكثر ماله حرام والقليل منه حلال : فمذهب ابن القاسم كراهة معاملته ومداينته والأكل من ماله ، وهو المعتمد ، خلافا لأصبغ المحرم لذلك .وأما من كان كل ماله حراماً وهو المراد بمستغرق الذمة ، فهذا تمنع معاملته ومداينته ويمنع من التصرف المالي وغيره “জেনে রাখুন, যে ব্যক্তির অধিকাংশ সম্পদ হালাল; আর অল্প কিছু হারাম: নির্ভরযোগ্য অভিমত হল— তার সাথে লেনদেন করা, ঋণ আদানপ্রদান করা, তার সম্পদ থেকে ভক্ষণ করা জায়েয; যেমনটি বলেছেন ইবনুল কাসিম। তবে এর সাথে দ্বিমত করে ‘আসবাগ’ হারাম বলেছেন।পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তির অধিকাংশ সম্পদ হারাম; অল্প কিছু হালাল: ইবনুল কাসেমের অভিমত হচ্ছে তার সাথে লেনদেন করা; ঋণ আদানপ্রদান করা ও তার সম্পদ থেকে ভক্ষণ করা মাকরুহ। এটাই নির্ভরযোগ্য অভিমত। তবে, এর সাথে দ্বিমত পোষণ করে আসবাগ হারাম বলেছেন।আর যে ব্যক্তির সম্পূর্ণ সম্পদ হারাম; “সম্পূর্ণ জিম্মা” বলে এটাকেই বুঝানো হয়েছে— তার সাথে লেনদেন করা, ঋণ আদানপ্রদান করা নিষিদ্ধ। আর্থিক লেনদেন ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ।[সমাপ্ত; দুসুক্বির হাশিয়াত: ৩/২৭৭)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন:وإذا اشترى ممن في ماله حرام وحلال , كالسلطان الظالم , والمرابي  فإن علم أن المبيع من حلال ماله , فهو حلال , وإن علم أنه حرام , فهو حرام … فإن لم يعلم من أيهما هو , كرهناه ؛ لاحتمال التحريم فيه , ولم يبطل البيع ; لإمكان الحلال , قَلَّ الحرام أو كَثُر . وهذا هو الشبهة , وبقدر قلة الحرام وكثرته , تكون كثرة الشبهة وقلتها”কেউ যদি এমন কোন ব্যক্তি থেকে ক্রয় করে যার সম্পদে কিছু হালাল ও কিছু হারাম রয়েছে; যেমন- জালিম শাসক, সুদী কারবারী: যদি জানা যায় যে, বিক্রিত পণ্য তার হালাল সম্পদ থেকে তাহলে সেটা হালাল। আর যদি জানা যায় যে, সেটা হারাম সম্পদ তাহলে সেটা হারাম…। আর যদি জানা না যায় যে, এটা কোন শ্রেণীর তাহলে আমরা এমন ক্রয়কে অপছন্দ করি (মাকরুহ বলি); যেহেতু এতে হারাম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ক্রয়বিক্রয় বাতিল হবে না; যেহেতু হালাল হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে হারামের পরিমাণ কম হোক কিংবা বেশি হোক। এটি সংশয়পূর্ণ। হারামের অংশ বেশি বা কম হওয়ার অনুপাতে সংশয়ের মাত্রাও কমবেশি হবে।”(সমাপ্ত; ইবনু কুদামাহ; আল-মুগনী; খন্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১৮০)
.
​▪️দ্বিতীয়ত: যার সম্পূর্ণ সম্পদই হারাম এবং তাতে কোনো হালাল সম্পদের মিশ্রণ নেই, তার সম্পদের বিধান। এ ধরনের সম্পদ-কে হারাম হওয়ার কারণ বিবেচনায় দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়।
.
▪️১. সত্তাগতভাবেই হারাম সম্পদ: এমন সম্পদ, যা মূলতই হারাম; যেমন—মদ, শূকর, চুরি করা, ছিনতাই করা, জবরদখলকৃত সম্পদ কিংবা আত্মসাৎকৃত রাষ্ট্রীয় সম্পদ, প্রতারণা ও ধোঁকার মাধ্যমে উপার্জিত সম্পদ। এ ধরনের সম্পদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে লেনদেন করা জায়েজ নয়। অনুরূপভাবে, এসব সম্পদ উপহার হিসেবে গ্রহণ করা, পণ্যের মূল্য হিসেবে নেওয়া কিংবা কোনো কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে গ্রহণ করাও জায়েজ নয়। কেননা, এসব সম্পদের ওপর ওই ব্যক্তির বৈধ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়নি;বরং তা প্রকৃত মালিকের অধিকারভুক্ত।আর এ ধরনের সম্পদ অবশ্যই এর প্রকৃত মালিককে ফেরত দিতে হবে। এ ছাড়া দায়মুক্তি হবে না।যদি সে এটি খরচ করে ফেলে বা তছরূপ করে ফেলে, তবে যতদিন না সে তা মালিককে ফেরত দিতে সক্ষম হবে, ততদিন তা তার ওপর ঋণ হিসেবে রয়ে যাবে।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন:الأموال المغصوبة والمقبوضة بعقود لا تباح بالقبض إن عرفه المسلم : اجتنبه ، فمن علمتُ أنه سرق مالاً ، أو خانه في أمانته ، أو غصبه فأخذه من المغصوب قهراً بغير حق : لم يجز لي أن آخذه منه ، لا بطريق الهبة ، و لا بطريق المعاوضة ، و لا وفاء عن أجرة ، ولا ثمن مبيع ، و لا وفاء عن قرض ، فإن هذا عين مال ذلك المظلوم“জবরদখলকৃত সম্পদ এবং অগ্রহণযোগ্য চুক্তির মাধ্যমে গ্রহণ করা সম্পদ দখলে নেওয়ার মাধ্যমে বৈধ হয় না। যদি মুসলিম তা জানতে পারে, তাহলে সে এর থেকে বিরত থাকবে। যে ব্যক্তি সম্পর্কে আমি জানি যে সে কারো সম্পদ চুরি করেছে বা আমানতের খিয়ানত করেছে বা অন্যায়ভাবে জোর করে কারো সম্পদ দখল করেছে: আমার জন্য তার কাছ থেকে তা নেওয়া জায়েয নয় — না হেবা বা উপহারের মাধ্যমে, না বিনিময় হিসেবে, না মজুরির পরিশোধ হিসেবে, না বিক্রয়মূল্য হিসেবে, আর না ঋণ পরিশোধ হিসেবে।কেননা এটি সেই মজলুমের নিজের সম্পদ।”(ইবনু তাইমিয়া; মাজমুউল ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ৩২৩)
.
আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা,(রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেন,“যদি গ্রহণ করা বস্তুটি মালিকের সম্মতি ছাড়া নেওয়া হয়ে থাকে এবং এর বিনিময় পরিশোধ করা না হয়ে থাকে; তবে তা তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। যদি তাকে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভবপর না হয় তবে তা তার উপর ঋণ হিসেবে জেনে পরিশোধ করে দিবে। যদি এটিও সম্ভবপর না হয় তাহলে তা মালিকের উত্তরাধিকারীদেরকে ফিরিয়ে দিবে। আর যদি সেটিও সম্ভবপর না হয় তাহলে এটি তার পক্ষ থেকে সদকা করে দিতে হবে। যদি কিয়ামতের দিন মালিক সদকার সওয়াব গ্রহণ করতে চায়, তবে সেটা তার জন্য হবে। আর যদি সে তার সম্পদ ভক্ষণকারী থেকে নেক আমল ছাড়া অন্য কিছু নিতে রাজি না হয় তাহলে সে তার সম্পদের সমপরিমাণ নেক আমল তার থেকে গ্রহণ করবে। আর সদকাকারী সদকার সওয়াব পাবে। এভাবে সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে সাব্যস্ত।”(যাদুল মা‘আদ: ৫/৬৯০)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন: “সম্পদগুলো মালিকদের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে হবে; যেহেতু তারা চেনা ব্যক্তি কিংবা তাদের ওয়ারিশগণ চেনা ব্যক্তি। পক্ষান্তরে, আপনি যদি তাদেরকে ভুলে যান কিংবা মূলতঃই না চেনেন কিংবা তাদেরকে খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে আপনি নিরাশ হয়ে পড়েন— সে ক্ষেত্রে আপনি তাদের পক্ষ থেকে দান করে দিন। কিন্তু, তারা যদি চেনা মানুষ হয় কিংবা তারা মারা গেছেন তবে তাদের ওয়ারিশগণ চেনা হয়; কারো জন্য হয়ত তাদের কাছে গিয়ে বলা: ‘আমি তোমাদের কাছ থেকে এ সম্পদগুলো অবৈধভাবে গ্রহণ করেছি, আপনারা আমার তওবা গ্রহণ করুন এবং সম্পদগুলো গ্রহণ করুন’— সমস্যা হতে পারে। এ দিক থেকেও এটা কঠিন হতে পারে যে, শয়তান হয়তো তাদের মনে ঢুকিয়ে দিবে যে, তুমি এর চেয়ে বেশি সম্পদ নিয়েছ ইত্যাদি। তাই, আপনি একজন আস্থাভাজন, বুদ্ধিমান ও দ্বীনদার মানুষ খুঁজে নিন। তাকে বলবেন: ভাই, বিষয়টি এমন এমন। অমুকের এই পাওনা আছে কিংবা সে মারা গিয়ে থাকলে তার ওয়ারিশদের এই পাওনা আছে। আশা করি সে ব্যক্তি আপনাকে দায়মুক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবেন এবং যাদের পাওনা তাদের সাথে যোগাযোগ করে বলবে যে, ভাই! এই ব্যক্তি আল্লাহ্‌র কাছে তওবা করেছেন। তিনি তোমাদের এত এত সম্পদ অন্যায়ভাবে নিয়েছেন। এই নাও সে সম্পদ। এভাবে তার দায়মুক্ত হবে। কারণ আলেমগণ বলেন: যে সম্পদের মালিক চেনা; সে সম্পদ তার মালিকের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে হবে।”(আল-লিকা আস-শাহরি, নং-৩১ থেকে সমাপ্ত)
.
▪️২. উপার্জনের পদ্ধতির কারণে হারাম সম্পদ: এমন সম্পদ, যা মূলত বৈধ হলেও তা অর্জনের পদ্ধতি অবৈধ; যেমন—সুদ, মদ বিক্রি, গান-বাজনা কিংবা ব্যভিচারের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ। এখানে এমন উপার্জন বোঝানো হয়েছে, যা চুরি, ছিনতাই, জবরদখল বা প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত নয়; বরং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়েছে। এ ধরনের সম্পদ উপার্জনকারীর জন্য হারাম। তবে অন্য কোনো ব্যক্তি যদি বৈধ কোনো উপায়ে তার কাছ থেকে সেই সম্পদ গ্রহণ করেন, যেমন—উপহার হিসেবে, বৈধ কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে কিংবা স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ হিসেবে, তাহলে সাধারণভাবে তাঁর জন্য তা গ্রহণ করা ও তা থেকে উপকৃত হওয়া জায়েজ। কেননা, এ ক্ষেত্রে হারাম উপার্জনের গুনাহ মূলত উপার্জনকারীর ওপর বর্তায়। তবে সম্পদটি হারাম উৎস থেকে এসেছে বলে নিশ্চিতভাবে জানা থাকলে, তা গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা এবং সম্ভব হলে তা পরিহার করাই উত্তম এবং তাকওয়ার পরিচয়।
.
আল্লামা মুহাম্মদ আলীশ আল-মালিকী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: واختلف في المال المكتسب من حرام، كربا ومعاملة فاسدة، إذا مات مكتسبه عنه: فهل يحل للوارث؟ وهو المعتمد، أم لا؟ وأما عين الحرام المعلوم مستحقه، كالمسروق والمغصوب: فلا يحل له “হারাম পন্থায় উপার্জিত সম্পদ—যেমন সুদের মাধ্যমে কিংবা অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ—উপার্জনকারী ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর সেই সম্পদ তার উত্তরাধিকারীর জন্য গ্রহণ করা বৈধ কি না, এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য মত হলো, উত্তরাধিকারীর জন্য তা গ্রহণ করা বৈধ।তবে হারাম সম্পদটির প্রকৃত মালিক পরিচিত থাকলে,যেমন চুরি করা বা অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা সম্পদ, তা উত্তরাধিকারীর জন্য বৈধ নয়।”(সূত্র: মিনহুল জলীল শারহু মুখতাসার খলীল: ২/৪১৬)
.
​ইমাম ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) সুদখোর ব্যক্তির সম্পদ সম্পর্কে বলেন: أما بالنسبة لأولاده فلا حرج عليهم أن يأكلوا منه في حياة أبيهم ويجيبوا دعوته؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم أجاب دعوة اليهود مع أنهم يأكلون الربا. وأما إذا ورثوه من بعده فهو لهم حلال؛ لأنهم ورثوه بطريقة شرعية، وإن كان هو حراماً عليه، لكن هم كسبوه بطريق شرعي بالإرث، وإن تبرعوا وتصدقوا به عن أبيهم فلعل الله سبحانه وتعالى أن يجعل هذه الصدقة تمحو ما قبلها من السيئات “সন্তানদের ক্ষেত্রে তাদের পিতার জীবদ্দশায় তা থেকে খাওয়া এবং তার দাওয়াত রক্ষা করায় কোনো অসুবিধা নেই; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদিদের দাওয়াত কবুল করেছিলেন, অথচ তারা সুদ ভক্ষণ করতো। আর যদি তারা তার মৃত্যুর পর তা উত্তরাধিকার সূত্রে পায়, তবে তা তাদের জন্য হালাল; কারণ তারা শরীয়তের বিধান অনুযায়ী উত্তরাধিকার সূত্রে তা অর্জন করেছে, যদিও তা তার জন্য হারাম ছিল। তবে তারা তা বৈধ উপায়ে উত্তরাধিকারের মাধ্যমে অর্জন করেছে। তারা যদি তা দান-সদকা করে দেয় এবং তাদের পিতার পক্ষ থেকে সদকা করে, তবে আশা করা যায় মহান আল্লাহ তাআলা এই সদকার মাধ্যমে তার পূর্বের পাপগুলো মুছে দেবেন।”(ইবনু উসামীন লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-১৮১/১৯)
.
​তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন: قال بعض العلماء: ما كان محرما لكسبه، فإنما إثمه على الكاسب لا على من أخذه بطريق مباح من الكاسب، بخلاف ما كان محرما لعينه، كالخمر والمغصوب ونحوهما، وهذا القول وجيه قوي، بدليل أن الرسول صلى الله عليه وسلم اشتري من يهودي طعاما لأهله، وأكل من الشاة التي أهدتها له اليهودية بخيبر، وأجاب دعوة اليهودي، ومن المعلوم أن اليهود معظمهم يأخذون الربا ويأكلون السحت، وربما يقوي هذا القول قوله صلى الله عليه وسلم في اللحم الذي تصدق به على بريرة: (هو لها صدقة ولنا منها هدية)”কিছু আলেম বলেছেন: “যে সম্পদ উপার্জনের পদ্ধতির দিক থেকে হারাম, তার পাপ কেবল উপার্জনকারীর ওপরই বর্তাবে; আর যে ব্যক্তি সেই উপার্জনকারীর কাছ থেকে বৈধ উপায়ে তা গ্রহণ করবে, তার ওপর কোনো পাপ বর্তাবে না। পক্ষান্তরে, যে বস্তু তার স্বরূপে বা নিজ সত্তার কারণেই হারাম—যেমন মদ, জবরদস্তি দখলকৃত বা আত্মসাৎকৃত সম্পদ এবং এজাতীয় অন্যান্য জিনিস—তার হুকুম আলাদা। এই মতটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও যুক্তিসংগত। এর দলিল হলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর পরিবারের প্রয়োজনের জন্য এক ইহুদির নিকট থেকে খাদ্যশস্য ক্রয় করেছিলেন, খাইবারে এক ইহুদি নারী তাঁকে যে ভেড়ার গোশত হাদিয়া দিয়েছিল তা থেকে খেয়েছিলেন এবং এক ইহুদির দাওয়াতও কবুল করেছিলেন। অথচ এটি সর্বজনবিদিত যে,ইহুদিদের অধিকাংশই সুদখোর ছিল এবং অবৈধ উপায়ে সম্পদ উপার্জন করত। সম্ভবত এই মতের সপক্ষে আরও একটি জোরালো প্রমাণ হলো, বারীরা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে সদকা হিসেবে দেওয়া গোশত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছিলেন: “এটি তাঁর জন্য সদকা, কিন্তু আমাদের জন্য তা হাদিয়া (উপহার)।”(ইবনু উসাইমীন;উসাইমীন আল-ক্বাওলুল মুফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ: ৩/১১২)
.
পরিশেষে বলা যায়, সুদখোর বা সুদি ব্যাংকে কর্মরত কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে হালাল কাজের পারিশ্রমিক গ্রহণের বিধান নির্ভর করে অর্থের প্রকৃতি, তার মালিকানা এবং উপার্জনের পদ্ধতির ওপর। কারও সম্পদে হালাল ও হারাম উভয় ধরনের উপার্জন মিশ্রিত থাকলে, তার কাছ থেকে শরিয়তসম্মত কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েজ। এমনকি কোনো অর্থ হারাম পদ্ধতিতে উপার্জিত হলেও, তা যদি চুরি, আত্মসাৎ বা জবরদখলকৃত সম্পদ না হয়, তাহলে অন্য ব্যক্তি বৈধ উপায়ে তা গ্রহণ করলে তার জন্য সেই অর্থ ব্যবহার করা জায়েজ হওয়ার অবকাশ রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট অর্থটি অন্যের অধিকারভুক্ত বলে নিশ্চিতভাবে জানা থাকলে তা গ্রহণ করা বৈধ নয়; বরং যথাসম্ভব প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। সুতরাং,এ বিষয়ে ঢালাওভাবে সব ধরনের লেনদেনকে হারাম বলা যেমন যথার্থ নয়, তেমনি সম্পদের উৎস ও প্রকৃতি বিবেচনা না করে সব ধরনের অর্থ গ্রহণকেও বৈধ বলা সঠিক নয়। একজন মুসলিমের কর্তব্য হলো, শরিয়তের বিধান যথাযথভাবে জেনে হালাল উপার্জন গ্রহণ করা, হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং অন্যের অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: