আল্লাহ আরশের ওপর সমুন্নত কেন আমরা এই অনুবাদটি এড়িয়ে চলি

ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর, ‘ইস্তিওয়া’ (استواء)-এর অনুবাদে ‘সমুন্নত’ শব্দটি কেন আমরা এড়িয়ে চলি—বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে প্রথমে ‘উলূ’ (عُلُوّ) ও ‘ইস্তিওয়া’ (استواء)—এই দুটি সিফাত সম্পর্কে জানা জরুরি। আমরা জানি, আল্লাহর সত্তা ও তাঁর কর্মের সঙ্গে সম্পর্কের দিক বিবেচনায় তাঁর সাব্যস্ত সিফাতসমূহকে মূলত দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়—সিফাতে যাতিয়্যাহ (صفات ذاتية) সত্তাগত গুন এবং সিফাতে ফি‘লিয়্যাহ (صفات فعلية) কর্মগত গুন।
.
▪️এক.الصفات الدائمة:সত্তাগত বা চিরন্তন গুণাবলি:
সত্তাগত গুণাবলি হলো:যে গুণে আল্লাহ পূর্বে গুণান্বিত ছিলেন এখনও গুণান্বিত আছেন এবং ভবিষ্যতেও গুণান্বিত থাকবেন, সেগুলোকে সত্তাগত বা সার্বক্ষণিক কিংবা চিরন্তন গুণাবলি বলা হয়।যেমন জীবন,জ্ঞান,কুদরত, শ্রবণ, দর্শন, হিকমত, সর্বোচ্চতা,ক্ষমতা প্রভৃতি।এগুলোকে সত্তাগত গুণরাজিও (الصفات الذاتية) বলা হয়ে থাকে।মহান আল্লাহর সত্তাগত গুণ চেনার মূলনীতি হল: وضابط الصفة الذاتية: أنه لم يزل ولا يزال متصفا بها “যে গুণে তিনি পূর্বে গুণান্বিত ছিলেন এবং এখনও গুণান্বিত আছেন”।
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন “الصفات الذاتية: هي صفات المعاني الثابتة لله أزلاً وأبدا، مثل الحياة، والعلم، والقدرة، والسمع، والبصر، والعزة، والحكمة، إلى غير ذلك وهي كثيرة فهذه نسميها صفات ذاتية؛ لأنه متصف بها أزلا وأبدا ولا تفارق ذاته” “সত্তাগত গুণাবলী: যে ভাবগুলো আল্লাহ্‌র জন্য অনাদি ও অনন্তকাল ব্যাপী সাব্যস্ত; যেমন- জীবন, জ্ঞান, ক্ষমতা, শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, পরাক্রমশালিতা ও প্রজ্ঞা ইত্যাদি অনেক গুণ। এ গুণগুলোকে আমরা সত্তাগত গুণ বলে থাকি। যেহেতু তিনি এসব গুণে অনাদি ও অনন্তকাল ব্যাপী গুণান্বিত। এগুলো তাঁর সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না।”(শারহুস সাফ্যারিনিয়্যাহ পৃষ্ঠা: ১৫৫)
.
▪️দুই. الصفات الفعلية: কর্মগত সিফাত:
.
যেসব গুণ আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তা কার্যকর করেন, আবার ইচ্ছা করলে তা কার্যকর করেন না। যেমন:আরশের ওপর উঠা এবং দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করা। এগুলোকে কর্মর্গত গুণাবলি (الصفات الفعلية) বলা হয়ে থাকে।আল্লাহ্‌র কর্মগত গুণের কিছু উদাহরণ হচ্ছে— উপরে উঠা, আগমন করা,ধরা,পাকড়াও করা ইত্যাদি অগণিত আরও অনেক গুণ। যেমনটি আল্লাহ্‌ তাআলা বলেছেন: ﴿الرَّحْمَٰنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَىٰ﴾—“পরম করুণাময় আরশের ওপর উঠেছেন” [সূরা ত্ব-হা, ২০:৫) তিনি আরও বলেন:”নিশ্চয় আপনার প্রভুর পাকড়াও কঠোর।”[সূরা বুরুজ,আয়াত: ১২) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «ينزل ربنا كل ليلة إلى السماء الدنيا»”আমাদের রব প্রতিদিনই নিম্নাকাশে নেমে আসেন”।(সহীহ বুখারী হা/১১৪৫)
.
বিগত শতাব্দের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম,ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) কর্মগত সিফাত সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন:
الصفات الفعلية: هي التي تتعلق بمشيئته، إن شاء فعلها، وإن شاء لم يفعلها، مثل الاستواء على العرش، والنزول إلى السماء الدنيا، والمجيء للفصل بين العباد، والفرح بتوبة التائب، والضحك إلى رجلين يقتل أحدهما الآخر كلاهما يدخل الجنة، والغضب على الكافرين، والرضا للمؤمنين، وغيرها، فهذه نسميها صفات فعلية؛ لأنها من فعله، وفعله يتعلق بمشيئته.
لكن هذا القسم من صفات الله آحاده حادثة، تحدث شيئا فشيئا، وأما جنس الفعل فإنه أزلي أبدي، فجنس كون الله فعالا – أي جنس الفعل في الله عز وجل – أزلي، فلم يزل ولا يزال فعالا، لم يأت وقت من الأوقات يكون الله تعالى معطلا فيه عن الفعل، فإن الله لم يزل ولا يزال فعالا لما يريد سبحانه وتعالى.لكن نوع الفعل أو آحاده هي التي تكون حادثة.مثلا: الاستواء على العرش نوع من أنواع الفعل، وهو حادث، لأنه كان بعد خلق العرش، كذلك النزول إلى السماء الدنيا: نوع من أنواع الفعل، وهو حادث، لأنه كان بعد خلق العرش، كذلك النزول إلى السماء الدنيا نوع من أنواع الفعل، وهو حادث، لأنه كان بعد أن خلق السماء الدنيا، كذلك الرضا والغضب نوع من أنواع الفعل، وهو حادث لأنه إذا فعل العبد فعلا يقتضي الرضا، رضي الله عنه، وإذا فعل فعلا يقتضي الغضب، غضب الله عليه”
“আর কর্মগত গুণাবলী (صفات فعلية) হলো যেগুলো আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। তিনি চাইলে তা করেন, না চাইলে করেন না। যেমন: আরশে আরোহন (ইস্তিওয়া), প্রথম আকাশে অবতরণ, বান্দাদের মাঝে ফয়সালা করতে আগমন, তওবাকারীর তওবায় আনন্দিত হওয়া, দুইজন লোকের প্রতি হাসি যাদের একজন অপরজনকে হত্যা করে অথচ উভয়ে জান্নাতে প্রবেশ করে, কাফেরদের প্রতি রাগ, মু’মিনদের প্রতি সন্তুষ্টি, ইত্যাদি। এগুলোকে কর্মগত বা কার্যগত গুণ বলা হয় কারণ এগুলো আল্লাহর কাজের অন্তর্ভুক্ত, আর আল্লাহর কাজ তাঁর ইচ্ছার সাথে সম্পর্কযুক্ত।তবে এই শ্রেণির গুণাবলীর পৃথক ঘটনাসমূহ নতুনভাবে সংঘটিত হয়। অর্থাৎ, একের পর এক ঘটে। কিন্তু গুণের গোত্র বা শ্রেণি হিসেবে তা চিরন্তন। অর্থাৎ, আল্লাহর ‘কর্মশীলতা’ চিরন্তন; তিনি সবসময় কর্মরত ছিলেন ও থাকবেন। এমন কখনোই হয়নি যে আল্লাহ কোনো কাজে নিস্ক্রিয় ছিলেন। তিনি চিরকাল এবং সর্বদা যা ইচ্ছা করেন তাই করেন এটা তাঁর গুণ।তবে কাজের ধরণ বা তার একক ঘটনা এইগুলোই নতুনভাবে সংঘটিত হয়।উদাহরণস্বরূপ: আরশে আরোহন হলো এক ধরণের কাজ এটি নতুনভাবে সংঘটিত, কারণ এটি আরশ সৃষ্টি হওয়ার পর ঘটেছে। একইভাবে প্রথম আকাশে অবতরণ এক ধরণের কাজ এটিও নতুনভাবে ঘটে, কারণ এটি প্রথম আকাশ সৃষ্টির পরে হয়েছে। তেমনই, সন্তুষ্টি ও রাগও এক ধরণের কাজ এগুলোও নতুন, কারণ বান্দার এমন কাজের প্রতিক্রিয়ায় ঘটে, যা সন্তুষ্টি বা রাগের উপযুক্ত হয়।”(শরহুস-সাফারিনিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১৫৫; আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন: পৃষ্ঠা ২৪১)
.
জেনে রাখা ভাল যে, একটি সিফাতকে ভিন্ন দুই দিক থেকে বিবেচনা করলে তা একই সঙ্গে সিফাতে যাতিয়্যাহ (সত্তাগত সিফাত) এবং সিফাতে ফি‘লিয়্যাহ (কর্মগত সিফাত)—উভয়টিই হতে পারে। এর একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ হলো কালাম (কথা বলা)।মূল বা সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বিবেচনা করলে কালাম আল্লাহর একটি সত্তাগত সিফাত। কারণ, মহান আল্লাহ অনাদিকাল থেকেই কালাম তথা কথা বলার গুণে গুণান্বিত এবং ভবিষ্যতেও এই গুণে গুণান্বিত থাকবেন। অর্থাৎ, আল্লাহ কখনোই কথা বলার গুণ থেকে বঞ্চিত ছিলেন না এবং হবেনও না।অন্যদিকে, কথার একক ও অংশের বিবেচনায়, অর্থাৎ মহান আল্লাহ ক্রমান্বয়ে (একটির পর একটি) কথা বলে থাকেন, সেই বিবেচনায় এটি একটি কর্মগত সিফাত। কেননা ‘কথা বলা’ আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত।কারণ, আল্লাহ তা‘আলা যখন যা ইচ্ছা করেন, তখন তা বলেন; তাঁর কালাম তাঁর ইচ্ছা ও মাশিয়্যাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি ইচ্ছা করলে কোনো বিষয় সম্পর্কে কথা বলেন এবং ইচ্ছা করলে কথা বলেন না। অর্থাৎ,কালামের মূল বৈশিষ্ট্যটি সত্তাগত, আর নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট কথা বলা কর্মগত।এর প্রমাণ আল্লাহ তা‘আলার বাণী:﴿إِنَّمَآ أَمۡرُهُۥٓ إِذَآ أَرَادَ شَيًۡٔا أَن يَقُولَ لَهُۥ كُن فَيَكُونُ﴾“নিশ্চয়ই তাঁর ব্যাপার হলো—তিনি যখন কোনো কিছুর ইচ্ছা করেন, তখন তাকে শুধু বলেন, ‘হও’; ফলে তা হয়ে যায়।”—সূরা ইয়াসীন, ৩৬:৮২) এখানে ‘যখন তিনি কোনো কিছুর ইচ্ছা করেন’—এই কথাটি প্রমাণ করে যে, নির্দিষ্ট কোনো কথা বলা আল্লাহর ইচ্ছার সঙ্গে সম্পৃক্ত।আর আল্লাহ তা‘আলা বলেন:﴿وَمَا تَشَآءُونَ إِلَّآ أَن يَشَآءَ ٱللَّهُۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمٗا﴾“আর তোমরা ইচ্ছা করতে পারবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ ইচ্ছা করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”—সূরা আল-ইনসান, ৭৬: ৩০)
.
সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সা‘ঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদ সদস্য ও অধ্যাপক,আকিদা ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আল-বাররাক (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫২ হি./১৯৩৩ খ্রি.] “আল-কাওয়াইদুল মুসলা”-এর ব্যাখ্যায় বলেন:
” ومن الصفات ما يصدق عليها أنها ذاتية فعلية باعتبارين، مثل: الكلام، والخلق، والرَّزق؛ فهذه باعتبار أن الله لم يزل موصوفًا بها، فتقول: الله لم يزل فعالًا لما يريد، ولم يزل خالقًا، ولم يزل غفورًا، ولم يزل رحيمًا، فهذه صفات ذاتية.وباعتبار أفراد أو آحاد هذه الأفعال هي تابعة للمشيئة، فهو يرحم من شاء إذا شاء، ويرزق من شاء إذا شاء، ويتكلم إذا شاء.فالكلام قديم النوع، حادث الآحاد، فالكلام صفة ذاتية فعلية، والخلق صفة ذاتية فعلية، والمغفرة وكونه – تعالى – غفورا، صفة ذاتية فعلية، وما أشبه ذلك” انتهى.
“কিছু সিফাত এমন রয়েছে, যেগুলোকে দুটি ভিন্ন বিবেচনায় সিফাতে যাতিয়্যাহ (সত্তাগত সিফাত) এবং সিফাতে ফি‘লিয়্যাহ (কর্মগত সিফাত)—উভয়ই বলা যায়। যেমন: কালাম (কথা বলা), খালক (সৃষ্টি করা) এবং রিযিক প্রদান। একটি বিবেচনায়, আল্লাহ তা‘আলা অনাদিকাল থেকেই এসব সিফাতে গুণান্বিত। তাই বলা যায়: ‘আল্লাহ অনাদিকাল থেকেই যা ইচ্ছা তা কার্যকরকারী’; ‘তিনি অনাদিকাল থেকেই সৃষ্টিকর্তা’; ‘তিনি অনাদিকাল থেকেই ক্ষমাশীল’; এবং ‘তিনি অনাদিকাল থেকেই পরম দয়ালু।’ এই বিবেচনায় এগুলো সিফাতে যাতিয়্যাহ অন্যদিকে, এসব কর্মের পৃথক পৃথক সংঘটন ও একেকটি বাস্তবায়নের বিবেচনায় এগুলো আল্লাহর মাশিয়াত (ইচ্ছা)-এর অধীন। তিনি যাকে ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা, তার প্রতি দয়া করেন; যাকে ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা, রিযিক প্রদান করেন; এবং তিনি যখন ইচ্ছা কথা বলেন।
সুতরাং, কালাম (কথা বলা) প্রকারের দিক থেকে চিরন্তন (قديم النوع), আর পৃথক পৃথক কথনসমূহের দিক থেকে নতুনভাবে সংঘটিত (حادث الآحاد)। অতএব, কালাম এমন একটি সিফাত, যা এক বিবেচনায় যাতিয়্যাহ এবং অন্য বিবেচনায় ফি‘লিয়্যাহ। একইভাবে, খালক (সৃষ্টি করাও) এমন একটি সিফাত, যা যাতিয়্যাহ ও ফি‘লিয়্যাহ—উভয় বিবেচনাতেই প্রযোজ্য। আর মাগফিরাত (ক্ষমা করা) এবং আল্লাহ তা‘আলার ‘গফূর’ (ক্ষমাশীল) হওয়াও এমন একটি সিফাত, যা যাতিয়্যাহ ও ফি‘লিয়্যাহ—উভয় বিবেচনায় প্রযোজ্য। এ ধরনের আরও অনুরূপ সিফাত রয়েছে।”—(শারহুল-কাওয়াইদিল মুসলা, পৃ. ৭৮)
.
▪️তাহলে সূরা তহা’র ৫ নং আয়াতে “ইস্তিওয়া আলাল-আরশ” অর্থ আল্লাহ তা‘আলা আরশে সমন্নত। কেন আমরা এই অনুবাদটি এড়িয়ে চলি?
.
বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে হলে প্রথমে ‘উলূ’ (عُلُوّ) ও ‘ইস্তিওয়া’ (استواء)—এই দুটি সিফাতের পার্থক্য পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। উভয়ের মধ্যে ঊর্ধ্বতার একটি সাধারণ দিক থাকলেও আকীদার পরিভাষায় এগুলো একে অপরের সমার্থক নয়। ‘উলূ’ (عُلُوّ) অর্থ—মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির ঊর্ধ্বে এবং সকল সৃষ্টির উপরে রয়েছেন। এটি তাঁর সত্তাগত (ذاتي) সিফাত। অর্থাৎ যে সিফাত আল্লাহর সত্তার সঙ্গে চিরকাল বিদ্যমান এবং তাঁর সত্তা থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হয় না, তাকে সত্তাগত সিফাত বলা হয়। মহান আল্লাহ তাঁর সকল সৃষ্টির ঊর্ধ্বে—এই বৈশিষ্ট্যও তাঁর সত্তা থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হয় না; তিনি অনাদিকাল থেকেই এই গুণে গুণান্বিত, বর্তমানে আছেন এবং অনন্তকাল থাকবেন। যেমন তিনি অনাদিকাল থেকেই বড়ত্ব, মহত্ত্ব ও ক্ষমতার গুণে গুণান্বিত এবং চিরকাল এসব গুণে গুণান্বিত থাকবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ﴾—“আর তিনিই সর্বোচ্চ (সবকিছুর ওপরে) এবং সবচেয়ে মর্যাদাবান।”(সূরা আল-বাকারা, ২:২৫৫)এবং সুন্নাহ থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। নবী ﷺ বলেছেন: «رَبَّنَا اللَّهُ الَّذِي فِي السَّمَاءِ»—“আমাদের রব হলেন সেই আল্লাহ, যিনি আসমানের ওপরে রয়েছেন।”(আবু দাউদ হা/৩৮৯২)
.
পক্ষান্তরে ইস্তিওয়া এর কয়েকটি অর্থ থাকলেও ইস্তেওয়া’ শব্দটি যখন على বা إلى যোগে ব্যবহৃত হয়, তখন এর মশহুর তাফসির:ঊর্ধ্বে উঠা ও উপরে উঠার অর্থই সর্বজন স্বীকৃত।এটি আল্লাহর কর্মগত (فعلي) সিফাত, যা তাঁর ইচ্ছা ও মাশিয়্যাতের সঙ্গে সম্পর্কিত।আরশের ওপর আল্লাহর আরোহণ একটি সুনির্দিষ্ট সিফাত।এই সিফাত আরশের সাথে সম্পর্কিত। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা চাইলে ইস্তাওয়া করেন আর না চাইলে করেন না। তবে তিনি নিজের সম্পর্কে আমাদের জানিয়েছেন যে,তিনি আরশের ওপর উঠেছেন।অন্য কোনো সৃষ্টির ওপর তিনি উঠেছেন কিনা তা জানাননি। তাই আমারা সে বিষয়ে আক বাড়িয়ে কিছু বলি না। আল্লাহর কর্মগত সিফাতের দলিল আল্লাহর বানী: ﴿الرَّحْمَٰنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَىٰ﴾—“পরম করুণাময় আরশের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন বা উঠেছেন”[সূরা ত্ব-হা, ২০:৫]।পূর্বোক্ত আয়াতটি ছাড়াও কুরআনে মোট ছয়টি আয়াতে বলা হয়েছে-মহান আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টি করার পরে আরশের ওপর ওঠেছেন। মহান আল্লাহ বলেছেন:ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ.”এরপর তিনি আরশের ওপর আরোহণ করেছেন।”(সুরা আরাফ ৭: ৫৪, সুরা ইউনুস ১০: ৩, সুরা রাদ ১৩: ২, সুরা ফুরকান ২৫: ৫৯) এখানে ‘ইস্তিওয়া’ এটি কর্মগত সিফাত যা কুরআন সুন্নাহ এবং সালাফদের ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত।আল্লাহ তা‘আলার আরশের উপর উঠা তাঁর সবকিছুর উপরে থাকার অতিরিক্ত আরেকটি গুণ। কারণ সবকিছুর উপরে থাকা তাঁর সত্ত্বাগত গুণ; যা মানব মনের স্বাভাবিক নীতি, বিবেক, সকল জাতির ঐকমত্য দ্বারা সাব্যস্ত। কিন্তু আরশের উপর উঠার বিষয়টি তিনি বা তাঁর রাসূল না জানালে আমাদের জানার কোনো সুযোগ নেই।
.
শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:মহান আল্লাহর আরশের ওপর উঠা কি তাঁর কর্মগত গুণ (সিফাতে ফে’লিয়্যাহ), নাকি সত্তাগত গুণ (সিফাতে যাতিয়্যাহ)?
জবাবে শাইখ বলেন:أنه من الصفات الفعلية؛ لأنه يتعلق بمشيئته, وكل صفة تتعلق بمشيئته؛ فهي من الصفات الفعلية.
“এটি তাঁর কর্মগত গুণ; কারণ এটি তাঁর ইচ্ছা ও চাওয়ার সাথে সম্পৃক্ত। আর যে গুণই আল্লাহর ইচ্ছা ও চাওয়ার সাথে সম্পৃক্ত হয়, সেটিই কর্মগত গুণ হিসেবে গণ্য।” (শারহুল আকীদাতিল ওয়াসিত্বিয়্যাহ,খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৮৬)
.
এছাড়া আমরা জানি যে, আল্লাহর (علو) উলু মানে ঊর্ধ্বে থাকা বা সমুচ্চ হওয়া।এই গুণটি সিফাত যাতিয়্যাহ, আর (استوى) ইস্তিওয়া মানে ঊর্ধ্বে উঠা ও উপরে উঠা। এই গুণটি সিফাত ফি’লিয়্যাহ। (علو) উলু গুণটি দ্বারা ব্যাপকভাবে উপরে থাকা বুঝায়, আর استوى গুণটি দ্বারা বিশেষভাবে উপরে থাকা বুঝায়।এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর একটি কর্ম বুঝায়।আমরা আরও জানি যে,সালাফদের মানহাজ হচ্ছে, আল্লাহর علو বা উপরে থাকার মধ্যে তিনটি অর্থ রয়েছে যথা:(১). সত্তাগত ঊর্ধ্বতা, অর্থাৎ আল্লাহ সত্তাগতভাবে তাঁর সৃষ্টিকুলের ওপরে রয়েছেন।(২). মর্যাদাগত ঊর্ধ্বতা, অর্থাৎ আল্লাহ সুমহান মর্যাদার অধিকারী,তাঁর কোনো সৃষ্টিই মর্যাদার ক্ষেত্রে তাঁর সমপর্যায়ে যেতে পারে না।আর আল্লাহর মর্যাদায় কোনো ত্রুটিও আপতিত হয় না। (৩). প্রতাপগত ঊর্ধ্বতা, অর্থাৎ মহান আল্লাহ সকল সৃষ্টির ওপর বিজয়ী হয়েছেন।আল্লাহর কোনো সৃষ্টিই তাঁর রাজত্ব ও কর্তৃত্ব থেকে বের হতে পারে না। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত আল্লাহর علو বা উপরে থাকার উপরোক্ত তিনটি অর্থই সাব্যস্ত করে পক্ষান্তরে জাহামিয়ারা এবং কালামী তথা আশআরী ও মাতুরিদিয়ারা সত্তাগতভাবে উপরে থাকা সাব্যস্ত করে না। বাকী দুটি তথা মর্যাদাগত ঊর্ধ্বতা, এবং প্রতাপগত ঊর্ধ্বতা, তারা সাব্যস্ত করে। আমরা আরও জানি যে, করা, উঠা,এরকম অনুবাদ না হলে ফে’লে মাযী মূতা’আদ্দী এর অনুবাদ সঠিক হয় না।
.
সুতরাং, সূরা ত্ব-হা-এর ৫ নম্বর আয়াত ﴿الرَّحْمَٰنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَىٰ ‘আল্লাহ আরশে সমুন্নত’ অনুবাদ করা আমাদের কাছে অধিক স্পষ্ট ও নিরাপদ মনে হয় না। কারণ এতে ‘ইস্তিওয়া’ ক্রিয়াটির স্বতন্ত্র অর্থ প্রকাশিত না হয়ে সাধারণ ‘ঊর্ধ্বতা’ বা ‘সমুন্নত থাকা’-এর অর্থ বোঝার সম্ভাবনা থাকে। অথচ ‘উলূ’ (العلو) আল্লাহর সত্তাগত সিফাত [صفة ذاتية], আর ‘ইস্তিওয়া’ (الاستواء) তাঁর কর্মগত সিফাত [صفة فعلية]—দুটি স্বতন্ত্র বিষয়। এখন সত্তাগত সিফাতের ন্যায় কর্মগত তথা ক্রিয়ার অর্থও যদি শুধু ‘সমুন্নত’ করেন তবে বিশেষণ ও ক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য করলেন কোথায়? আল্লাহ দুটি সিফাতের ক্ষেত্রে দুই ধরনের শব্দ উল্লেখ করে পার্থক্য করলেন অথচ আমরা পার্থক্য করি না। যদি দুটোর অর্থ একই রকম হতো তবে আল্লাহ শুধু বিশেষণ অথবা শুধু ক্রিয়ার যেকোনো একটি উল্লেখ করতেন—দুটো উল্লেখ করতেন না। তাই ‘রহমান আরশের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন বা উঠেছেন’—এভাবে অনুবাদ করলে আয়াতের ক্রিয়াটি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় এবং ‘উলূ’ ও ‘ইস্তিওয়া’র পার্থক্যও পাঠকের কাছে পরিষ্কার থাকে।আর এই কারণেই ﴿اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ﴾-এর অনুবাদে ‘আল্লাহ আরশের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন’ বা উঠেছেন বলা অধিক স্পষ্ট ও নিরাপদ; কেননা এখানে উপরে ওঠা কর্মগত সিফাত সাব্যস্ত হচ্ছে, আর আয়াতের উদ্দেশ্যে এটিই।পক্ষান্তরে বাংলার ‘সমুন্নত’ শব্দটি বিশেষণ পদ। এটি কখনো সাধারণ উচ্চতা বা ঊর্ধ্বতা বোঝায়, আবার কখনো দূরবর্তী অর্থ হিসেবে ‘উপরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া’র অর্থেও ব্যবহৃত হয়—ফলে শব্দটির মাধ্যমে সরাসরি ক্রিয়া প্রকাশ পায় না। যার কারনে ‘উলূ’ ও ‘ইস্তিওয়া’র স্বাতন্ত্র্য অস্পষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং বিদআতপন্থীরা এ অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
.
পরিশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনো সালাফি আলেম অনুবাদের ক্ষেত্রে ‘সমুন্নত’ শব্দ ব্যবহার করলে শুধু এই একটি শব্দের ভিত্তিতে তাঁকে ভুল আকীদার অনুসারী বা গোমরাহ বলে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা ন্যায়সংগত নয়। কারণ অনুবাদে শব্দচয়ন কখনো ভাষাগত রীতি, পাঠকের বোধগম্যতা কিংবা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে ভিন্ন হতে পারে। মূল বিষয় হলো—তিনি ‘ইস্তিওয়া’ (الاستواء)-কে আল্লাহর একটি স্বতন্ত্র কর্মগত সিফাত হিসেবে স্বীকার করেন কি না এবং এর শরঈ অর্থ যথাযথভাবে গ্রহণ করেন কি না। তাই কোনো আলেমের অনুবাদে ‘সমুন্নত’ শব্দ পাওয়া গেলে কেবল সেই শব্দের ওপর ভিত্তি করে তাঁর আকীদা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত না নিয়ে তাঁর অন্যান্য বক্তব্য ও ব্যাখ্যাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কোথাও ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা থাকলে ব্যক্তিকে আক্রমণ না করে বরং সঠিক বিষয়টি স্পষ্ট করে দেওয়া উচিত। আমাদের উদ্দেশ্য কোনো আলেমের সমালোচনা করা নয়; বরং আল্লাহর সিফাতের বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা, যাতে ‘উলূ’ ও ‘ইস্তিওয়া’-এর পার্থক্য পরিষ্কার থাকে এবং সাধারণ পাঠক জাহামিয়াদের বিভ্রান্তি থেকে বেঁচে থাকেন। এ দিক থেকে ‘আল্লাহ আরশের ওপর ইস্তিওয়া করেছেন’—এ ধরনের অনুবাদ আমাদের কাছে অধিক স্পষ্ট ও নিরাপদ মনে হয়; কারণ এতে আয়াতের মূল শব্দ ‘ইস্তিওয়া’ এর সঠিক অর্থ অবিকৃত থাকে এবং এটিকে আল্লাহর কর্মগত সিফাত হিসেবে বোঝার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তবে কোনো আলেম ‘সমুন্নত’ শব্দ ব্যবহার করলে তাঁর উদ্দেশ্য ও আকীদা যাচাই না করে তাঁর বিরুদ্ধে মন্তব্য করা উচিত নয়; বরং ব্যক্তিকে নয়, বক্তব্যের অর্থ ও উদ্দেশ্যকে যাচাই করাই ন্যায়সংগত ও ইলমি পদ্ধতি। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: