প্রশ্ন: বর্তমান হারামাইন কর্তৃপক্ষের আইন অনুযায়ী ইহরামের কাপড় ছাড়া তথা ওমরাহকারী ছাড়া অন্য কেউ মাতাফে নেমে তওয়াফ করতে পারবে না। তাদেরকে কেবল উপরের তলাগুলো দিয়ে তওয়াফ করতে হবে। সেকারণে অনেক ওমরাহকারী ওমরাহ শেষ হওয়ার পরও কৌশল করে ইহরামের কাপড় পরে নীচে তওয়াফ করছেন। এরূপ করা সঠিক হবে কি?
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি।অতঃপর,একজন উমরাহকারী তার উমরাহর যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার পর চাইলে একাধিকবার নফল তাওয়াফ করতে পারেন। কেননা, নফল তাওয়াফের জন্য শরী‘আতে নির্দিষ্ট কোনো সময় বা সংখ্যা নির্ধারিত নেই। এটি অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ একটি ইবাদত। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসে তাওয়াফের ব্যাপক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে দশটি নেকী লেখা, দশটি গুনাহ মুছে দেওয়া এবং দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করার কথা বর্ণিত হয়েছে। (মুসনাদু আহমাদ, হা/৪৪৬২; তিরমিযী, হা/৯৫৯; মিশকাত, হা/২৫৮০)
.
তবে জেনে রাখুন, কোনো ইবাদত করার আগ্রহ থাকলেই তা আদায়ের জন্য বৈধ প্রশাসনিক বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করা যাবে না। সৌদি আরবের হারামাইন শরীফাইনের কর্তৃপক্ষ হাজী, উমরাহকারী ও অন্যান্য মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা এবং ইবাদতকারীদের জন্য তাওয়াফের ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল রাখার উদ্দেশ্যে মাতাফের নিচের অংশে প্রবেশ ও তাওয়াফের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে থাকে। বিশেষ করে ওমরাহকারীদের তাওয়াফ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য অ-ওমরাহকারীদের ওপরের তলায় তাওয়াফের নির্দেশ দেওয়া হলে তা জনস্বার্থ ও শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রণীত একটি বৈধ প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য হবে।সুতরাং, ওমরাহ সম্পন্ন করে ইহরাম থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর শুধু নিচের মাতাফে নফল তাওয়াফ করার সুযোগ পাওয়ার জন্য পুনরায় ইহরামের পোশাক পরিধান করে নিজেকে ইহরামরত ওমরাহকারী হিসেবে উপস্থাপন করা এবং এর মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত বিধিনিষেধ এড়িয়ে যাওয়া জায়েজ নয়। কারণ, শুধু ইহরামের কাপড় পরিধান করলেই কেউ শরী‘আতের দৃষ্টিতে মুহরিম হয়ে যায় না; বরং ইহরাম একটি নির্দিষ্ট ইবাদতের নিয়ত ও সংশ্লিষ্ট বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। পাশাপাশি এভাবে প্রবেশের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের বৈধ নির্দেশনা অমান্য করা এবং দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীদের বিভ্রান্ত করার আশ্রয় নেওয়া হয়।
.
আর মূলনীতি হলো—”জনপ্রশাসন সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন প্রতিটি নাগরিকের জন্য মান্য করা আবশ্যক-যতক্ষণ না তা শরিয়া বিরোধী হয়।” তুহফাতুল মুহতাজ আলা শারহিল মিনহাজ’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে—تجب طاعة الإمام في أمره ونهيه ما لم يخالف الشرع أي بأن لم يأمر بمبمحرم “ইমাম বা শাসকের নির্দেশ ও নিষেধের ক্ষেত্রে তাঁর আনুগত্য করা ওয়াজিব, যতক্ষণ না তিনি শরীয়তের খেলাফ করেন, অর্থাৎ কোনো হারাম কাজের নির্দেশ না দেন।”(তুহফাতুল মুহতাজ আলা শারহিল মিনহাজ’;৩/৭১) দলিল হচ্ছে,আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ﴾—“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসূলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যকার দায়িত্বশীলদের আনুগত্য করো” (সূরা আন-নিসা, ৪/৫৯)।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন,أن القوانين إذا كانت لا تخالف الشرع فلا بأس بها، النظم تسمى بالقوانين وتسمى بالنظم، فكل قانون ونظام ينفع المسلمين ولا يخالف شريعة الله لا بأس به، من المرور أو في القضاء أو في أي الدوائر الحكومية أو في أي مكان. “আইন-কানুন যদি শরিয়ত বিরোধী না হয় তাহলে তাতে কোনও সমস্যা নাই। শৃঙ্খলাকে আইন বলা হয়। সুতরাং (রাষ্ট্রের) যে সকল আইন-শৃঙ্খলা মুসলিমদের উপকার করে ও আল্লাহর আইন লঙ্ঘন করে না তাতে কোনও সমস্যা নাই। যেমন: ট্রাফিক, বিচার বিভাগ, সরকারি অফিস বা অন্য যে কোন স্থানে হোক না কেন।”(বিন বায, অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফাতওয়া নং-১০১৭)
.
ইয়েমেনের সালাফি আলেম ও ফকীহ, শায়খ আবু মালিক তাওফীক বিন মুহাম্মাদ আল-বাদ‘আনী [জন্ম: ১৯৭২ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: “আমি কি ইহরামের পোশাক পরিধান করে কাবা শরীফের তাওয়াফ করার জন্য صحن المطاف (তাওয়াফের চত্বর)-এ প্রবেশ করতে পারি? কারণ, সেখানে সাধারণ পোশাক পরিহিত ব্যক্তিদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না; বরং শুধু ওমরাহর জন্য ইহরামকারী ব্যক্তিদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।”
উত্তরে শাইখ বলেন:لا يجوز لك فعل ذلك؛ لأنه مخالفة لأمر ولي الأمر ومزاحمة ومضايقة للمحرمين؛ وحيلة للوصول إلى الممنوع من قبل ولي الأمر فاكتفي بالطواف من خارج الصحن وعذرك معك في عدم الطواف في الصحن حتى تحرم بعمرة.“আপনার জন্য এমনটি করা জায়েয নয়। কেননা, এটি দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের নির্দেশের লঙ্ঘন; ইহরাম অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে ভিড় ও তাদের চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি করা; এবং কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিষিদ্ধ করা স্থানে প্রবেশের জন্য একটি কৌশল অবলম্বন করা। অতএব, আপনি তাওয়াফের চত্বরের বাইরে থেকেই তাওয়াফ করুন। আর ওমরাহর জন্য ইহরাম না করা পর্যন্ত তাওয়াফের চত্বরে তাওয়াফ করতে না পারার ব্যাপারে আপনার ওজর গ্রহণযোগ্য।”(https://www.sheikh-tawfik.net/show_fatawa.php?id=2228
অনুরূপ বক্তব্য সৌদি আরবের আলেমদের থেকেও রয়েছে।
.
সুতরাং যে সকল আইন-কানুন জনমানুষের কল্যাণ এবং বিশৃঙ্খলা রোধের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। কোনও নাগরিকের জন্য এ সকল আইন লঙ্ঘন করা বৈধ নয়। অন্যথায় গুনাহগার হতে হবে। কেননা, এ সব আইন অনুসরণ না করলে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, জান-মালের ক্ষতি এবং নানা দুর্ভোগে পতিত হয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর মানুষের নিরাপত্তা, কল্যাণ সাধন এবং বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব যা শরিয়তের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া কেউ যদি এসব আইন লঙ্ঘন করে তাহলে সে নিজেকে নানা বিপদাপদ, শাস্তি ও লাঞ্ছনার মধ্যে নিক্ষেপ করবে-যা ইসলামে নিষেধ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لا ينبغِي للمؤمنِ أن يُذلّ نفسهُ قالوا : وكيف يُذلّ نفسهُ ؟ قال : يتعرّضُ من البلاءِ لمَا لا يطيقُ- رواه الترمذي، وصححه الألباني. “কোনও ইমানদারের জন্য নিজেকে লাঞ্ছিত করা উচিৎ নয়। তারা (সাহাবিগণ) প্রশ্ন করলেন, মানুষ কিভাবে নিজেকে লাঞ্ছিত করে? তিনি বললেন, সে নিজেকে এমন বিপদের মুখোমুখি করে যা তার সহ্য ক্ষমতার বাইরে।” [তিরমিযি,হা/২৫৫৪;শাইখ আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন-সাহাবি হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান থেকে বর্ণিত।]
.
পরিশেষে, ওমরাহ সম্পন্ন করার পর নফল তাওয়াফ করতে চাইলে হারামাইন শরিফাইনের কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত নিয়ম-কানুন মেনে ওপরের তলাগুলোতেই তাওয়াফ করা উচিত। শুধু নিচের মাতাফে তাওয়াফ করার সুযোগ লাভের উদ্দেশ্যে পুনরায় ইহরামের পোশাক পরিধান করে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত বিধিনিষেধ পাশ কাটানোর চেষ্টা করা জায়েয নয়। কেননা, এতে একদিকে জনস্বার্থ, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রণীত বৈধ নির্দেশ অমান্য করা হয়, অন্যদিকে নিরাপত্তাকর্মীদের বিভ্রান্ত করে একটি অনুচিত কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّيْ ‘যে প্রতারণা করে, সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়”(সহীহ মুসলিম, হা/১০২)। অতএব একজন মুমিনের উচিত—ইবাদতের প্রতি আগ্রহের পাশাপাশি তার পদ্ধতিতেও আল্লাহর আনুগত্য, সততা, শৃঙ্খলা ও অন্য মুসল্লিদের অধিকার রক্ষার প্রতি যত্নশীল হওয়া। তাই নিচের মাতাফে তাওয়াফ করার সাময়িক সুবিধার জন্য নিয়ম ভঙ্গ না করে, কিছুটা কষ্ট ও দূরত্ব হলেও নির্ধারিত স্থানেই নফল তাওয়াফ করা উচিত। এটাই তাকওয়া, আমানতদারি এবং আল্লাহর আনুগত্যের অধিক উপযোগী পন্থা।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।