প্রশ্ন: ইসলামী শরী‘আতের দৃষ্টিতে টিকা বা ভ্যাকসিন গ্রহণের বিধান কী? বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন গ্রহণ করা কি বৈধ? ভ্যাকসিনে হারাম বা নাপাক উপাদান থাকলে তার বিধান কী?
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর মূলনীতি হলো, ইসলামী শরী‘আতে চিকিৎসা গ্রহণ করা মূলত বৈধ। রোগ-ব্যাধি থেকে বাঁচতে কিংবা তা নিরাময়ের উদ্দেশ্যে শরী‘আতসম্মত ও উপকারী চিকিৎসা গ্রহণ করা বৈধ। তবে একজন মুসলিমের আক্বীদা হলো—রোগ প্রদানকারী ও আরোগ্যদানকারী একমাত্র মহান আল্লাহ। চিকিৎসা ও ওষুধ হলো কেবল এমন কিছু বৈধ মাধ্যম, যা আল্লাহ তা‘আলা রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ের জন্য পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছেন। অতএব, চিকিৎসা গ্রহণের অর্থ এই নয় যে, চিকিৎসাই স্বয়ং সুস্থতা দান করে; বরং চিকিৎসা গ্রহণ করা হয় আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রেখে তাঁর নির্ধারিত মাধ্যম অবলম্বনের উদ্দেশ্যে।আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন—وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ“আর আমি যখন অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে সুস্থ করেন।”(সূরা আশ-শু‘আরা: ৮০) অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন—قُلْ لَّنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا“বলুন, আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তা ছাড়া অন্য কিছুই আমাদের কাছে পৌঁছবে না।”(সূরা আত-তাওবাহ: ৫১) সুতরাং রোগ-ব্যাধি প্রতিরোধ ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে একজন মুমিনের বিশ্বাস হবে—উপকার-অপকার, রোগ-সুস্থতা এবং জীবন-মৃত্যু সবই মহান আল্লাহর ইচ্ছা ও তাকদীরের অধীন।আর চিকিৎসক, কবিরাজ, ওষুধ কিংবা টিকা বা ভ্যাকসিন গ্রহণও যদি কোনো রোগ প্রতিরোধের শরী‘আতসম্মত ও কার্যকর মাধ্যম হয়, তাহলে তা গ্রহণের বিধান নির্ধারণ করতে হবে এর উপাদান, প্রস্তুতপ্রণালী, কার্যকারিতা এবং শরী‘আতের অন্যান্য মূলনীতির আলোকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ রোগ ও ঔষধ অবতীর্ণ করেছেন এবং প্রতিটি রোগের ঔষধ সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং তোমরা ঔষধ গ্রহণ করো; তবে হারাম ঔষধ নয়।”[হাদীসটি আবু দাউদ (৩৩৭৬) বর্ণনা করেন] এছাড়া উসামা ইবনে শারীক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: বেদুঈনরা বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি চিকিৎসা নিব না? তিনি বললেন: “তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। কেননা মহামহিম আল্লাহ এমন কোন রোগ রাখেননি যার প্রতিষেধক রাখেননি; একটি রোগ ছাড়া।” তারা বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ! তা কি? তিনি বললেন: বার্ধক্য।[হাদীসটি তিরমিযী (৪/৩৮৩) বর্ণনা করেছেন, হাদীস নং: ১৯৬১। তিনি বলেন: হাদীসটি হাসান সহীহ।ইমাম আলবানী সহীহুল জামে গ্রন্থে (২৯৩০) হাদীসটি রয়েছে] আরেক বর্ননায়,জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘প্রত্যেকটি রোগের চিকিৎসা রয়েছে। কোনো রোগে যদি সঠিক ঔষধ প্রয়োগ করা হয়, তাহলে মহান আল্লাহর হুকুমে আরোগ্য লাভ হয়।’[হাদীসটি মুসলিম (২২০৪) বর্ণনা করেন]
.
বিগত শতদীয় অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম আব্দুল আজিজ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:إن الله جل وعلا ما أنزل داء إلا وأنزل له شفاء، علمه من علم وجهله من جهل، وأن الله سبحانه وتعالى جعل فيما أنزل على نبيه صلى الله عليه وسلم – من الكتاب والسنة – العلاج لجميع ما يشكو منه الناس، من أمراض حسية ومعنوية، وقد نفع الله بذلك العباد، وحصل به من الخير ما لا يحصيه إلا الله عز وجل “আল্লাহ তা’আলা এমন কোনো রোগ নাযিল করেননি যার কোনো ঔষধ তিনি নাযিল করেননি। কেউ সে ঔষধ জানে, আর কেউ সে ঔষধ জানে না। মহান আল্লাহ তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যে কুরআন-সুন্নাহ অবতীর্ণ করেছেন তাতে মানুষের যত সব রোগের অভিযোগ করে সকল দৈহিক ও আত্মিক রোগের চিকিৎসা রেখেছেন। আল্লাহ এর মাধ্যমে তার বান্দাদের উপকার করেছেন। এর মাধ্যমে এমন কল্যাণ সাধিত হয়েছে যার পরিমাণ আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।”[ফাতাওয়া ইবনে বায; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৪৫৩]
.
ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:في الأحاديث الصحيحة الأمر بالتداوي ، وأنه لا ينافي التوكل ، كما لا ينافيه دفع الجوع والعطش والحر والبرد بأضدادها ، بل لا تتم حقيقة التوحيد إلا بمباشرة الأسباب التي نصبها الله مقتضيات لمسبباتها قدراً وشرعاً ، وأن تعطيلها يقدح في نفس التوكل ، كما يقدح في الأمر والحكمة ، ويضعفه من حيث يظن معطلها أن تَرْكها أقوى في التوكل ، فإن تَرْكها عجز ينافي التوكل الذي حقيقته اعتماد القلب على الله في حصول ما ينفع العبد في دينه ودنياه ، ودفع ما يضره في دينه ودنياه ، ولا بد مع هذا الاعتماد من مباشرة الأسباب ، وإلا كان معطلاً للحكمة والشرع ، فلا يجعل العبد عجزه توكلاً ، ولا توكله عجزاً “বিশুদ্ধ হাদীসসমূহে চিকিৎসা গ্রহণ করার নির্দেশ এসেছে। এটি তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়। যেমনিভাবে ক্ষুধা, পিপাসা, গরম, ঠাণ্ডা প্রতিহত করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী বিষয় না। বরং আল্লাহর সৃষ্টিগত ও শরঈ তাকদীর অনুসারে ফলাফল পেতে হলে তিনি যে সমস্ত কারণ বা উপায় নির্ধারণ করে দিয়েছেন, সেগুলো গ্রহণের মাধ্যমেই তাওহীদ বাস্তবায়িত হবে। এগুলোকে গ্রহণ না করা তাওয়াক্কুলের বিপরীত, আবার আল্লাহর নির্দেশ ও প্রজ্ঞারও বিপরীত। এগুলো যে ব্যক্তি পরিত্যাগ করে সে মনে করে যে পরিত্যাগ করা তাওয়াক্কুলকে দৃঢ় করে। বস্তুত এ ধরনের পরিত্যাগ করা অক্ষমতা; যা তাওয়াক্কুলের বিপরীত। তাওয়াক্কুলের স্বরূপ হলো বান্দার দ্বীন-দুনিয়ার উপকার হয় এমন কিছু অর্জনে এবং দ্বীন-দুনিয়ার ক্ষতি হয় এমন কিছু প্রতিহত করার ক্ষেত্রে অন্তর আল্লাহর উপর নির্ভর করা। এই নির্ভরতার ক্ষেত্রে অবশ্যই মাধ্যম বা উপকরণ অবলম্বন করতে হবে। নতুবা ব্যক্তি প্রজ্ঞা ও শরীয়ত পরিত্যাগ করবে। সুতরাং ব্যক্তি যেন তার অক্ষমতাকে তাওয়াক্কুল কিংবা তাওয়াক্কুলকে অক্ষমতা বানিয়ে না দেয়।”[যাদুল মাআদ (৪/১৫), দেখুন: আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা (১১/১১৬)]
.
প্রথমত: টিকা বা ভ্যাকসিন গ্রহণের বিধান সম্পর্কে কথা হলো: টিকা বা ভ্যাকসিন (التلقيح), যাকে প্রতিরোধমূলক টিকাদান (التحصين) বা টিকাপ্রদান (التطعيم) বলা হয়, মূলত একটি প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাব্যবস্থা। এর মাধ্যমে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে সক্রিয় ও শক্তিশালী করা হয়। টিকা গ্রহণের ফলে শরীরে নির্দিষ্ট রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি (প্রতিরোধী দেহ) তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে ওই রোগের সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে অথবা রোগে আক্রান্ত হলেও তার তীব্রতা ও জটিলতা কমাতে সহায়তা করে। অর্থাৎ, টিকার উদ্দেশ্য রোগ সৃষ্টি করা নয়; বরং রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগেই শরীরকে সেই রোগের বিরুদ্ধে প্রস্তুত ও সুরক্ষিত করা। টিকা নেওয়ার পর সাময়িকভাবে সামান্য কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, তবে তা সাধারণত অল্প সময়ের মধ্যেই সেরে যায়।পক্ষান্তরে, আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছায় টিকার মাধ্যমে অর্জিত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভবিষ্যতে বিভিন্ন সংক্রামক ও গুরুতর রোগ থেকে সুরক্ষা লাভ এবং রোগের জটিলতা ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
.
আরব বিশ্বকোষে বলা হয়েছে:التحصين ( التمنيع ) النشط ، مصطلح آخر للتلقيح ، ويحتوي اللقاح على مواد من شأنها تحفيز المناعة في الجسم لإنتاج أجسام مضادة لمرض معد معين ، وهذه الأجسام المضادة تحمي الشخص إذا ما أصيب بالكائن الحي المسبب للمرض .ويحتوي اللقاح على مادة قوية تكفي للبدء في إفراز الأجسام المضادة ، ولكنها ليست بالقوة التي تسبب المرض فعلاً ، ومعظم اللقاحات تحتوي على البكتيريا المسببة للمرض أو فيروسات ميتة ، ويحتوي بعضها الآخر على الجراثيم الحية ، ولكن في حالة ضعيفة حتى لا تسبب المرض ، وتُعرف اللقاحات باسم ” الذوفانات ” ، حيث تُصنّع من سموم تفرزها الكائنات المسببة للمرض ، وتُعالج هذه السموم كيميائيّاً بحيث تعطي المناعة دون أن تسبب المرض .
“সক্রিয় টিকাদান (রোগপ্রতিরোধ/অনাক্রম্যকরণ) হলো টিকা দেওয়ারই আরেকটি পরিভাষা। টিকার মধ্যে এমন কিছু উপাদান থাকে যা নির্দিষ্ট কোনো সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি উৎপাদনে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে উদ্দীপিত করে। ব্যক্তি রোগ সৃষ্টিকারী সেই রোগজীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে এই অ্যান্টিবডিগুলো তাকে সুরক্ষা প্রদান করে।টিকার মধ্যে অ্যান্টিবডি উৎপাদন শুরু করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী উপাদান থাকে, তবে তা বাস্তবে রোগ সৃষ্টির মতো শক্তিশালী নয়। বেশিরভাগ টিকাতেই রোগ সৃষ্টিকারী মৃত ব্যাকটেরিয়া অথবা মৃত ভাইরাস ব্যবহার করা হয়; আর কিছু টিকায় জীবিত জীবাণু থাকে, তবে তা এতটাই দুর্বল অবস্থায় থাকে যে সেগুলো রোগ সৃষ্টি করতে পারে না।এছাড়া কিছু টিকা ‘টক্সয়েড’ (ذوفانات) নামে পরিচিত, যা রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু কর্তৃক নিঃসৃত বিষাক্ত পদার্থ থেকে প্রস্তুত করা হয়।পরে এসব বিষকে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়, যাতে তা রোগ সৃষ্টি না করেই শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।”
.
দ্বিতীয়ত: টিকা গ্রহণের শরয়ী বিধান নির্ভর করে এতে ব্যবহৃত উপাদান এবং এর ফলে সৃষ্ট প্রভাবের ওপর। এ দিক থেকে টিকাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।
.
প্রথম প্রকার: যেসব টিকায় ব্যবহৃত উপাদান মূলত বৈধ ও শরী‘আতসম্মত এবং যার উপকারিতা পরীক্ষিত, প্রমাণিত ও সুস্পষ্ট—এ ধরনের টিকা গ্রহণে শরী‘আতের দৃষ্টিতে বৈধ; এতে কোনো প্রকার আপত্তি নেই। বরং রোগ-ব্যাধি প্রতিরোধ ও মানুষের জীবন সুরক্ষায় এগুলো আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য এক মহান নিয়ামত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির ফলে অতীতে যেসব ভয়াবহ সংক্রামক রোগ ও মহামারী অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়েছে, সেগুলোর বিস্তার প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রায় নির্মূল করাও সম্ভব হয়েছে।
.
শাইখ সা‘দ ইবনে নাসির শাসরী বলেছেন:ومن المسائل المتعلقة بالأوبئة والأمراض المعدية : حُكم أخذ اللقاح الذي يعطى من أجل الوقاية من هذه الأمراض ، فنقول : اللقاح الذي يُعطى على نوعين :النوع الأول : ما عرف أثره بالتجربة أنه يقي بإذن الله من هذا المرض ، ومثل هذا له أحكام العلاج وهو نوع من أنواع العلاج ؛ وذلك لدخوله في قوله صلى الله عليه وسلم ( تداووا ) ، فيأخذ حكم التداوي ، وبعض الفقهاء استشكل أخذ اللقاح وقال : إن هذا اللقاح مرض مخفَّف يُنقل إلى الجسد ليتمكن الجسم من محاربة المرض الثقيل ( ليتعود البدن على مقاومة المرض ) ، قالوا : فكيف نستجيز إدخال مرض إلى الجسد ؟ والأظهر : أن هذا العمل لا حرج فيه ، بل هو من القربات ؛ لأن إدخال الضرر هنا لا يترتب عليه ضرر بل يترتب عليه مصلحة لوقاية متعاطي هذا اللقاح من المرض الشديد ، فهذا دليل على عدم المنع من أخذ هذا اللقاح “মহামারী ও সংক্রামক রোগ-সংক্রান্ত মাসআলাগুলোর মধ্যে একটি হলো এসব রোগ থেকে সুরক্ষার জন্য প্রদত্ত টিকা (ভ্যাকসিন) দেওয়া হয়, তার হুকুম।আমরা বলি, এ ধরনের টিকা দুই প্রকার:প্রথম প্রকার: যে টিকার কার্যকারিতা অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহর ইচ্ছায় এটি রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়। এ ধরনের টিকার বিধান চিকিৎসার বিধানের অন্তর্ভুক্ত। এটি চিকিৎসারই একটি প্রকার। কারণ, এটি নবী (ﷺ) -এর এই নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত, “তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো।”অতএব, এটি চিকিৎসারই হুকুম বহন করবে।তবে কিছু ফকীহ টিকা গ্রহণের বিষয়ে আপত্তি করেছেন। তারা বলেছেন, এই টিকায় রোগের দুর্বল জীবাণু শরীরে প্রবেশ করানো হয়, যাতে শরীর পরবর্তীতে শক্তিশালী রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে অর্থাৎ শরীরকে রোগ প্রতিরোধে অভ্যস্ত করা হয়। তারা বলেন, আমরা কীভাবে শরীরে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি রোগ প্রবেশ করানোকে বৈধ বলতে পারি? কিন্তু অধিক শক্তিশালী মত হলো, এতে কোনো অসুবিধা নেই বরং এটি সওয়াবের কাজ। কারণ এখানে যে সামান্য ক্ষতি দেখা যায়, তা প্রকৃতপক্ষে ক্ষতির জন্য নয় বরং এর মাধ্যমে বড় উপকার অর্জিত হয়। অর্থাৎ, টিকা গ্রহণকারীকে মারাত্মক রোগ থেকে রক্ষা করার স্বার্থেই এটি করা হয়। সুতরাং, এ ধরনের টিকা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞার কোনো কারণ নেই।‘(আহকাম ফিকহিয়্যাহ তাআতাল্লাকু বিল-আওবিয়াহ’ বা মহামারী সম্পর্কিত ফিকহি বিধান শীর্ষক আলোচনা থেকে সংগৃহীত) এছাড়া, টিকায় ব্যবহৃত বৈধ উপাদান ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা অন্য যেকোনো উৎসের হোক না কেন যদি তা উপকারী ও প্রশংসনীয় ফল বয়ে আনে, তবে তা গ্রহণ করা বৈধ। বিষাক্ত পদার্থ দ্বারা চিকিৎসা এবং সেগুলো টিকায় ব্যবহারের বিধান সম্পর্কে ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং ১০৯৪২৪-এর উত্তরও দেখা যেতে পারে।
.
দ্বিতীয় প্রকার: যেসব টিকায় ব্যবহৃত উপাদান মূলত বৈধ হলেও, সেগুলোর ক্ষতি উপকারের চেয়ে বেশি, অথবা আদৌ কোনো উপকারই প্রমাণিত নয়। এ ধরনের টিকা গ্রহণ করা নিঃসন্দেহে বৈধ নয়। কারণ শরীয়ত আমাদেরকে খাদ্য, পানীয়, ওষুধ বা অন্য যেকোনো উপায়ে নিজের ক্ষতি করা থেকে নিষেধ করেছে।এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং২০২৭৬-এর উত্তরও দেখুন।
.
তৃতীয় প্রকার: এমন টিকা, যার মূল উপাদান হারাম বা নাপাক ছিল কিন্তু পরে তা রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়েছে, অথবা এর সঙ্গে এমন কিছু উপাদান মিশানো হয়েছে, যার ফলে এর নাম, বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে তা বৈধ (হালাল) পদার্থে পরিণত হয়েছে। ইসলামী পরিভাষায় একে “ইস্তিহালা” বলা হয়। ইস্তেহালা বলতে বোঝানো হয় বস্তুর স্বীয় বৈশিষ্ট্য রূপান্তরিত হয়ে যাওয়া ও বদলে যাওয়া।[আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ (৩/২১৩) থেকে সমাপ্ত] এ ধরনের টিকার উপকারী প্রভাবও রয়েছে। বহু সংখ্যক আলেমের মতে যদি নাপাকির রূপ বদলে অন্য কিছু হয়ে যায় তাহলে এগুলোর থেকে নাপাকির কারণ দূর হয়ে যায় এবং এগুলোকে পাক হিসেবে হুকুম প্রদান করা হয়। ক্বারাফী রাহিমাহুল্লাহু তা’আলা বলেন: ‘কেননা আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে যে, আল্লাহ কোনো বস্তুকে কেবল সত্তাগত এবং আকৃতিগত কারণে নাপাক বা নাপাকিযুক্ত বলে ঘোষণা দেননি। বরং বস্তুর সত্তায় স্থান গ্রহণ করা বিশেষ গুণের জন্যই আল্লাহ কোনো বস্তুকে নাপাক বলে গণ্য করেছেন। সেটি হতে পারে: বিশেষ রং ও বিশেষ কোনো অবস্থা। যদি সেই বিশেষ অবস্থা ও গুণ বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে হারাম হওয়াকে অবধারিত করে এমন কিছুর অনুপস্থিতির কারণে হারামের বিধানও নাকচ হয়ে যাবে।’[আল-ফুরুক (২/২০৭) থেকে সমাপ্ত]
.
আরব বিশ্বকোষে বলা হয়েছে: وما زالت بعض اللقاحات تصنع من أجزاء أو إفرازات الكائنات المسببة للمرض ، وتتكون مجموعة لقاحات أخرى من كائنات حية تشابه تلك التي تسبب المرض ، وهذه الكائنات تعطي المناعة ولكنها لا تسبب الأمراض”এখনও কিছু টিকা রোগ-সৃষ্টিকারী জীবাণুর অংশবিশেষ বা তাদের নিঃসৃত পদার্থ থেকে তৈরি করা হয়। আবার অন্য কিছু টিকা এমন জীবন্ত অণুজীব দ্বারা প্রস্তুত করা হয়, যেগুলো রোগ-সৃষ্টিকারী জীবাণুর অনুরূপ। এসব অণুজীব শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করে, কিন্তু নিজেরা রোগ সৃষ্টি করে না। এ ধরনের টিকা গ্রহণ করা বৈধ। কারণ, ইস্তিহালা এর মাধ্যমে এর উপাদানের নাম ও বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ায় এর বিধানও পরিবর্তিত হয়েছে এবং তা ব্যবহার করা বৈধ হয়েছে।”
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: وأما دخان النجاسة : فهذا مبني على أصل وهو أن العين النجسة الخبيثة إذا استحالت حتى صارت طيبة كغيرها من الأعيان الطيبة – مثل أن يصير ما يقع في الملاحة من دم وميتة وخنزير ملحا طيبا كغيرها من الملح …ففيه للعلماء قولان : أحدهما : لا يطهر ، كقول الشافعي ، وهو أحد القولين في مذهب مالك ، وهو المشهور عن أصحاب أحمد وإحدى الروايتين عنه ، والرواية الأخرى : أنه طاهر ، وهذا مذهب أبي حنيفة ومالك في أحد القولين وإحدى الروايتين عن أحمد ومذهب أهل الظاهر وغيرهم : أنها تطهر ، وهذا هو الصواب المقطوع به ؛ فإن هذه الأعيان لم تتناولها نصوص التحريم لا لفظاً ولا معنى ، فليست محرَّمة ولا في معنى المحرَّم فلا وجه لتحريمها بل تتناولها نصوص الحل ؛ فإنها من الطيبات ، وهي أيضا في معنى ما اتفق على حله فالنص والقياس يقتضي تحليلها “নাপাক বস্তুর ধোঁয়া সম্পর্কিত মাসআলাটি একটি মৌলিক নীতির ওপর নির্ভরশীল। তা হলো যদি কোনো নাপাক ও অপবিত্র বস্তু এমনভাবে রূপান্তরিত হয়ে যায় যে তা অন্যান্য পবিত্র বস্তুর মতোই একটি পবিত্র বস্তুতে পরিণত হয়, যেমন লবণের খনিতে পড়ে থাকা রক্ত, মৃত প্রাণী বা শূকর সম্পূর্ণ রূপান্তরিত হয়ে বিশুদ্ধ লবণে পরিণত হয়। এ বিষয়ে আলেমদের দুটি মত রয়েছে। একদল বলেন, তা পবিত্র হবে না। এটি ইমাম শাফেয়ীর মত, ইমাম মালিকের একটি মত এবং ইমাম আহমাদের মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত। অপর দল বলেন, তা পবিত্র হয়ে যায়। এটি ইমাম আবু হানিফার মত, ইমাম মালিকের একটি মত এবং ইমাম আহমাদের অপর বর্ণিত মত। আহলে জাহিরসহ আরও অনেক আলেমের মতও এটাই যে, এ ধরনের বস্তু পবিত্র হয়ে যায়। এটিই সঠিক ও নিশ্চিত মত। কারণ, এসব রূপান্তরিত বস্তুকে হারাম বলার মতো কোনো কুরআন-সুন্নাহের দলিল নেই, না শব্দগতভাবে, না অর্থগতভাবে। সুতরাং এগুলো হারাম নয় এবং হারামের অন্তর্ভুক্তও নয়। তাই এগুলোকে হারাম বলার কোনো ভিত্তি নেই। বরং এগুলো হালাল ও পবিত্র বস্তুর অন্তর্ভুক্ত। কুরআন-সুন্নাহর দলিল এবং কিয়াস উভয়ই এগুলোর বৈধতা প্রমাণ করে।” (ইবনু তাইমিয়া; মাজমূউল ফাতাওয়া: ২১/৭০–৭১)।
.
ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘এই মূলনীতির উপর ভিত্তি করে মদ রূপান্তরিত হওয়ার মাধ্যমে তা পবিত্র হয়ে যাওয়াটা কিয়াসের দাবী। নিকৃষ্টতার বৈশিষ্ট্যের কারণে মদ নাপাক। নিকৃষ্টতা দূর হয়ে গেলে নাপাকিও দূর হয়ে যায়। শরীয়তের সকল উৎস ও ফলাফলের ক্ষেত্রে এটিই মূলনীতি। বরং নেকী ও শাস্তির ক্ষেত্রেও এটি প্রধান নীতি।সুতরাং সঠিক কিয়াস হচ্ছে অন্যান্য সকল নাপাকিও রূপান্তরিত হলে সেগুলোর ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রয়োগ করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের মসজিদের স্থান থেকে মুশরিকদের কবরগুলো উপড়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু মাটি সরিয়ে ফেলেননি। মহান আল্লাহ দুধের ব্যাপারে জানিয়েছেন যে দুধ রক্ত ও গোবরের মধ্য থেকে বের হয়। মুসলিমরা এ ব্যাপরে একমত যে কোনো প্রাণী যদি নাপাক খাদ্য গ্রহণ করার পর তাকে বেঁধে রাখা হয় এবং প্রাণীটি পাক খাদ্য গ্রহণ করে, তাহলে তার দুধ ও গোশত হালাল। অনুরূপভাবে শস্য ও ফল নাপাক পানি দিয়ে সেচ দেওয়ার পরে যদি পাক পানি দিয়ে সেচ দেওয়া হয় তাহলে সেই শস্যও হালাল। নাপাকির বৈশিষ্ট্য রূপান্তরিত হয়ে পবিত্র বৈশিষ্ট্য চলে আসার কারণে।এর বিপরীতে যদি পবিত্র বস্তু নাপাকিতে রূপান্তরিত হয়, তাহলে বস্তুটি নাপাক হয়ে যায়। যেমন: পানি ও খাবার যখন পেশাব ও পায়খানায় রূপ নেয়। তাই পবিত্র বস্তু নাপাকিতে রূপান্তরিত হলে এর প্রভাব থাকলে, নাপাক বস্তু পবিত্র বস্তুতে রূপান্তরিত হলে এর প্রভাব থাকবে না কেন? আল্লাহ তাআলা পবিত্র থেকে নাপাক ও নাপাক থেকে পবিত্রকে বের করেন। এখানে মূল অবস্থা বিবেচ্য নয়। বরং বস্তুর বৈশিষ্ট্য বিবেচ্য।…’ [ই’লামুল মুওয়াক্কি’ঈন (৩/১৮৩) থেকে সমাপ্ত]
.
চতুর্থ প্রকার: যেসব টিকা এমন উপাদান দ্বারা তৈরি, যা ক্ষতিকর বা হারাম, এবং সেগুলোর উপকারিতা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয় বরং চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এগুলোর কার্যকারিতা ও উপকারিতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। এ ধরনের টিকা গ্রহণ করা জায়েয নয়। কারণ এতে নিজের জীবন ও স্বাস্থ্যের ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে।আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাপাক ঔষধ সম্পর্কে নিষেধ করেছেন।[হাদীসটি তিরমিযী (২০৪৫) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন] অপর বর্ননায় আবুদ-দারদা বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “আল্লাহ রোগ ও ঔষধ অবতীর্ণ করেছেন। প্রত্যেক রোগের জন্য তিনি ঔষধ রেখেছেন। সুতরাং তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। তবে হারাম দিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করো না।”[হাদীসটি আবু দাউদ (৩৮৭৪) বর্ণনা করেন।] শাইখ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: সমার্থক আরো কিছু হাদীসের কারণে হাদীসটির ভাব সহিহ।[আত-তা’লীক্বাতুর রাদ্বিয়্যাহ ‘আলার-রাউদ্বাহ আন-নাদিয়্যাহ (৩/১৫৪) থেকে সমাপ্ত]
.
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন: التّداوي بالمحرّمات النّجسة محرّم ؛ لأنّ الأدلّة الدّالّة على التّحريم مثل قوله تعالى : ( حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ ) ، وحديث : ( كُلُّ ذِي نَابٍ مِن السِّبَاعِ حَرَامٌ ) ، وقوله تعالى : ( إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ ) عامّة في حال التّداوي وغير التّداوي ، فمن فرّق بينهما فقد فرّق بين ما جمع اللّه بينه وخص العموم ؛ وذلك غير جائز”নাপাক হারাম বস্তু দিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করা হারাম। কারণ হারামের বিধান আরোপকারী দলীলসমূহ যেমন আল্লাহর বাণী: حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ “তোমাদের জন্য মৃত প্রাণীকে (খাওয়া) হারাম করা হয়েছে” কিংবা হাদিস: ‘প্রত্যেক শিকারী দাঁত বিশিষ্ট হিংস্র জন্তু হারাম’ কিংবা আল্লাহর বাণী:“মদ, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্য নির্ণয়ের তীর এগুলো নাপাক।” এই আয়াত ও হাদীসগুলো চিকিৎসার ক্ষেত্রে ও চিকিৎসা ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রের জন্য আম (সাধারণ)। তাই যে ব্যক্তি এই দুটি ক্ষেত্রের মাঝে পার্থক্য করল, সে এমন দুটি বিষয়ের মাঝে পার্থক্য করল আল্লাহ যে দুটোকে একত্রিত করেছেন এবং আম (সাধারণ)-কে খাস (নির্দিষ্ট) করল। এমনটি করা জায়েয নয়।[মাজমুউল ফাতাওয়া (২১/৫৬২) থেকে ঈষৎ পরিবর্তনসহ]
.
ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহু) তাআলা বলেন:والمعالجة بالمحرمات قبيحة شرعاً وعقلاً .أما الشرع فما ذكرنا من هذه الأحاديث وغيرها .وأما العقل ، فهو أن الله سبحانه إنما حرمه لخبثه ، فإنه لم يُحَرِّم على هذه الأمة طيباً عقوبة لها ، كما حرمه على بني إسرائيل بقوله : ( فَبِظُلْمٍ مِّنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ ) ؛ وإنما حرَّم على هذه الأمة ما حرَّم لخبثه ، وتحريمه له حِمية لهم ، وصيانة عن تناوله ، فلا يناسب أن يُطلب به الشفاء من الأسقام والعلل ، فإنه وإن أثَّر في إزالتها ، لكنه يُعقب سقماً أعظم منه في القلب بقوة الخبث الذي فيه ، فيكون المُدَاوَى به قد سعى في إزالة سقم البدن بسقم القلب “
“হারাম বস্তু দিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করা শরীয়ত ও আকল উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে নিন্দনীয়। শরীয়তের দৃষ্টি থেকে নিন্দনীয় হওয়ার কারণ আমাদের উল্লেখিত পূর্বোক্ত হাদীসসমূহ ও অন্যান্য হাদিসসমূহ। আর আকলের দৃষ্টি থেকে নিন্দনীয় হওয়ার কারণ এই যে মহান আল্লাহ এটাকে খারাপ হওয়ার কারণেই হারাম করেছেন। তিনি এই উম্মতকে শাস্তি দেওয়ার জন্য কোনো ভালো জিনিসকে হারাম করেননি; যেমনটি বনী ইসরাইলের ক্ষেত্রে করেছিলেন। আল্লাহ সে প্রসঙ্গে বলেন: “(প্রথমে) বৈধ করা হয়েছিল এমন কতিপয় ভালো জিনিস আমি তাদের জন্য (ইহুদিদের জন্য) অবৈধ করে দিয়েছি তাদের যুলুমের কারণে।” বরং আল্লাহ এই উম্মতের জন্য যা হারাম করেছেন তা খারাপ হওয়ার কারণেই হারাম করেছেন। তিনি তাদেরকে এগুলো গ্রহণ করা থেকে রক্ষা করার জন্য হারাম করেছেন। সুতরাং এগুলোর মাধ্যমে রোগ-বিমার থেকে চিকিৎসা গ্রহণ অন্বেষণ করা উপযুক্ত নয়। কেননা যদি রোগ দূর করার ক্ষেত্রে এগুলোর প্রভাব থাকেও তবুও এগুলোর খারাপ দিক শক্তিশালী হওয়ার কারণে অন্তরের উপর গুরুতর আরেক রোগ রেখে যাবে। ফলে এগুলোর দ্বারা চিকিৎসা গ্রহণকারী ব্যক্তি যেন অন্তরকে রোগাক্রান্ত করার মাধ্যমে দেহের রোগ দূর করল।’[যাদুল মা’আদ: ৪/১৪৩) থেকে সমাপ্ত]
.
শাইখ সা‘দ ইবনে নাসির শাসরী (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:ومن المسائل المتعلقة بالأوبئة والأمراض المعدية حكم أخذ اللقاح الذي يعطى من أجل الوقاية من هذه الأمراض ، فنقول اللقاح الذي يعطى على نوعين :النوع الأول : … – سبق ذِكره قريباً – .النوع الثاني من لقاح الأمراض المعدية : ما لم يُتأكد من أثره ولم يعرف بالتجربة بعدُ ، أو اختلف كلام الأطباء فيه بحيث لم يعتمد الإنسان على شيء ولم يترجح لديه شيء من أقوالهم : فحينئذ الأصل : المنع من أخذه وعدم جوازه ؛ لأنه لم يتأكد من تأثيره في الوقاية من المرض ، فنحن تأكدنا من أنه مضر ، وأنه يدخل على البدن شيئاً من الضرر ولم نتأكد من أن له فائدةً أعظم منه ، ومن ثَمَّ فإننا نمنع منه ، لأننا لا نستجيز الإقدام على فعل إلا إذا كان نفعه أكبر من ضرره ، فما لم نتأكد من ذلك فالأصل منعه ، إذا كان الفعل نتأكد ونجزم بأنه مضر وأن ما يقابل هذا الضرر من الفائدة لم يثبت بعد : فحينئذ يمنع منه ” . انتهى من محاضرة بعنوان ” أحكام فقهية تتعلق بالأوبئة “মহামারী ও সংক্রামক রোগ-সম্পর্কিত মাসআলাগুলোর একটি হলো এসব রোগ থেকে বাঁচার জন্য যে টিকা দেওয়া হয়, তার হুকুম কী? আমরা বলি, এ ধরনের টিকা দুই প্রকার:প্রথম প্রকার: (এর আলোচনা ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।) দ্বিতীয় প্রকার: সংক্রামক রোগের এমন টিকা, যার কার্যকারিতা এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি, অথবা পর্যাপ্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এর ফলাফল জানা যায়নি। কিংবা চিকিৎসকদের মধ্যে এ নিয়ে এমন মতভেদ রয়েছে যে, মানুষ কোনো একটি মতকে নির্ভরযোগ্য বলে গ্রহণ করতে পারে না এবং কোনো মতই তার কাছে প্রাধান্য পায় না। এ অবস্থায় মূলনীতি হলো এ ধরনের টিকা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ এবং জায়েয নয়। কারণ, এর মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধের কার্যকারিতা নিশ্চিত নয়। অথচ আমরা নিশ্চিত যে, এটি শরীরে কিছু না কিছু ক্ষতি সৃষ্টি করে। কিন্তু সেই ক্ষতির চেয়ে বড় কোনো উপকারিতা এতে আছে তা প্রমাণিত নয়।সুতরাং আমরা এ ধরনের টিকা থেকে বিরত থাকতে বলি। কেননা, কোনো কাজ তখনই বৈধ হয় যখন তার উপকারিতা ক্ষতির তুলনায় বেশি হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত তা নিশ্চিত না হয়, ততক্ষণ মূলনীতি হলো তা থেকে বিরত থাকা। অর্থাৎ, যখন আমরা নিশ্চিত যে কাজটি ক্ষতিকর, কিন্তু সেই ক্ষতির বিপরীতে যে উপকারিতা দাবি করা হচ্ছে তা এখনো প্রমাণিত নয় তখন তা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ হবে।”(https://web.archive.org/…/201106042…/www.al-adwa.net/…)
.
বিগত শতদীয় অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম আব্দুল আজিজ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, যেমন টিকা গ্রহণ করার হুকুম কী?
তিনি উত্তরে বলেন :لا بأس بالتداوي إذا خشي وقوع الداء لوجود وباء أو أسباب أخرى يخشى من وقوع الداء بسببها : فلا بأس بتعاطي الدواء لدفع البلاء الذي يخشى منه لقول النبي صلى الله عليه وسلم في الحديث الصحيح : ” من تصبح بسبع تمرات من تمر المدينة لم يضره سحر ولا سم ” ، وهذا من باب دفع البلاء قبل وقوعه فهكذا إذا خشي من مرض وطُعم ضد الوباء الواقع في البلد أو في أي مكان لا بأس بذلك من باب الدفاع كما يعالج المرض النازل بالدواء ، لكن لا يجوز تعليق التمائم والحجب ضد المرض أو الجن أو العين لنهي النبي صلى الله عليه وسلم عن ذلك ، وقد أوضح عليه الصلاة والسلام أن ذلك من الشرك الأصغر فالواجب الحذر من ذلك “যদি মহামারী বা অন্য কোনো কারণে রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা গ্রহণে কোনো অসুবিধা নেই। এমন বিপদের আশঙ্কা থাকলে তা প্রতিরোধের জন্য ওষুধ গ্রহণ করা জায়েয। এর প্রমাণ হলো, নবী সা.-এর সহীহ হাদীস: যে ব্যক্তি সকালে মদীনার সাতটি আজওয়া খেজুর খাবে, সেদিন তাকে কোনো বিষ বা জাদু ক্ষতি করতে পারবে না।এটি বিপদ আসার আগেই তা প্রতিরোধ করার অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপভাবে, যদি কোনো দেশে বা এলাকায় মহামারী ছড়িয়ে পড়ে এবং কেউ সেই রোগের আশঙ্কায় টিকা গ্রহণ করে, তবে এতে কোনো দোষ নেই। এটি আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা, যেমন রোগ হলে ওষুধ দিয়ে তার চিকিৎসা করা হয়। তবে রোগ, জিন বা বদনজর থেকে বাঁচার জন্য তাবিজ-কবচ ঝুলানো জায়েয নয়। কারণ নবী সা. তা নিষেধ করেছেন এবং স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, এটি শিরকে আসগর (ছোট শিরক)। অতএব, এ থেকে সতর্ক থাকা আবশ্যক।”(মাজমূউল ফাতাওয়া শাইখ ইবনু বায: ৬/২১)।
.
পরিশেষে: ইসলামী শরী‘আতের দৃষ্টিতে টিকা বা ভ্যাকসিন মূলত একটি প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাব্যবস্থা; তাই এর বিধান নির্ভর করবে এর উপাদান, কার্যকারিতা, সম্ভাব্য ক্ষতি এবং প্রস্তুতপ্রণালীর ওপর। যেসব টিকা বৈধ ও পবিত্র উপাদানে প্রস্তুত, কার্যকারিতা পরীক্ষিত ও উপকারিতা সুস্পষ্ট—সেগুলো গ্রহণ করা বৈধ; বরং রোগ প্রতিরোধ ও জীবন সুরক্ষার উদ্দেশ্যে তা গ্রহণ করা শরী‘আতসম্মত চিকিৎসার অন্তর্ভুক্ত। আর কোনো টিকার উপাদান মূলত হারাম বা নাপাক হলেও যদি রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তা সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়ে নতুন বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতির বৈধ পদার্থে পরিণত হয়, তাহলে ইস্তিহালার নীতির ভিত্তিতে তা গ্রহণ করাও বৈধ হবে। পক্ষান্তরে, যে টিকা ক্ষতিকর এবং যার উপকারিতা প্রমাণিত নয়, অথবা এর ক্ষতি উপকারের তুলনায় বেশি—তা গ্রহণ করা বৈধ নয়। একইভাবে কোনো টিকার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবিশেষজ্ঞদের মধ্যে এমন মতভেদ থাকে যে, কোনো মতই প্রাধান্য পায় না, তাহলে নিশ্চিত ক্ষতির আশঙ্কার কারণে তা থেকে বিরত থাকা হবে। সুতরাং টিকার ক্ষেত্রে শুধু ‘হারাম উপাদান আছে কি না’—এটুকু বিবেচনা করাই যথেষ্ট নয়; বরং উপাদানের প্রকৃতি, ইস্তিহালা সংঘটিত হয়েছে কি না, টিকার কার্যকারিতা, নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য ক্ষতি—সবকিছু বিবেচনা করে এর বিধান নির্ধারণ করতে হবে। সর্বোপরি, চিকিৎসা ও টিকা গ্রহণকে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী মনে করা যাবে না; বরং বৈধ উপায় অবলম্বন করে উপকার গ্রহণ করা এবং অন্তরে বিশ্বাস রাখা যে, প্রকৃত আরোগ্য, উপকার ও ক্ষতি একমাত্র মহান আল্লাহরই হাতে—এটাই মুমিনের সঠিক আক্বীদা। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়, ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।