প্রশ্ন: শরীয়তের দৃষ্টিতে পুরুষ ডাক্তারের জন্য মহিলা রোগী এবং মহিলা ডাক্তারের জন্য পুরুষ রোগী পরীক্ষা ও চিকিৎসা করা কি জায়েজ? চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগীর সতরের অংশ দেখা বা স্পর্শ করার বিধান কী? কোন পরিস্থিতিতে তা বৈধ এবং এর শরয়ি শর্তাবলি কী?
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর মূলনীতি হলো—পুরুষ ডাক্তার পুরুষ রোগীর এবং মহিলা ডাক্তার মহিলা রোগীর চিকিৎসা করবেন। অতএব, কোনো বাস্তব প্রয়োজন ও গ্রহনযোগ্য শরয়ি ওজর ছাড়া বিপরীত লিঙ্গের রোগীর চিকিৎসা করা বৈধ নয়। তবে চিকিৎসার একান্ত প্রয়োজন দেখা দিলে এবং সংশ্লিষ্ট লিঙ্গের উপযুক্ত চিকিৎসক পাওয়া না গেলে প্রয়োজনের পরিমাণ অনুযায়ী বিপরীত লিঙ্গের চিকিৎসক রোগী পরীক্ষা ও চিকিৎসা করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে প্রথমে মুসলিম মহিলা ডাক্তার না পাওয়া গেলে বিশ্বস্ত অমুসলিম মহিলা ডাক্তার দ্বারা মহিলা রোগীর চিকিৎসা করানো হবে; তাদের কেউ না পাওয়া গেলে মুসলিম পুরুষ ডাক্তার এবং একান্ত প্রয়োজন হলে অমুসলিম পুরুষ ডাক্তার চিকিৎসা করতে পারবেন। তবে চিকিৎসক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, কেবল ততটুকুই দেখবেন বা স্পর্শ করবেন; প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো কিছু করা বা দেখা বৈধ হবে না এবং যথাসম্ভব দৃষ্টি সংযত রাখতে হবে। একইসঙ্গে নারী রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে পুরুষ ডাক্তারের সঙ্গে রোগিনীর স্বামী, মাহরাম অথবা কোনো বিশ্বস্ত নারী উপস্থিত থাকা আবশ্যক, যাতে শরীয়তবিরোধী নির্জনতা সৃষ্টি না হয়। সুতরাং চিকিৎসার প্রকৃত প্রয়োজন, উপযুক্ত চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, প্রয়োজনের সীমা রক্ষা এবং খালওয়াত থেকে বেঁচে থাকা—এসব শরয়ি শর্ত পূরণ সাপেক্ষেই বিপরীত লিঙ্গের ডাক্তার দ্বারা রোগী পরীক্ষা ও চিকিৎসা করা বৈধ হবে।
.
এ বিষয়ে ‘ইসলামী ফিকাহ একাডেমি’ থেকে একটি সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে রয়েছে:
” الأصل أنه إذا توافرت طبيبة متخصصة يجب أن تقوم بالكشف على المريضة ، وإذا لم يتوافر ذلك فتقوم بذلك طبيبة غير مسلمة ثقة ، فإن لم يتوافر ذلك يقوم به طبيب مسلم ، وإن لم يتوافر طبيب مسلم يمكن أن يقوم مقامه طبيب غير مسلم ، على أن يطّلع من جسم المرأة على قدر الحاجة في تشخيص المرض ومداواته وألا يزيد عن ذلك وأن يغض الطرف قدر استطاعته ، وأن تتم معالجة الطبيب للمرأة هذه بحضور محرم أو زوج أو امرأة ثقة خشية الخلوة
“শরিয়তের মূল বিধান হচ্ছে- বিশেষজ্ঞ মহিলা ডাক্তার মহিলা রোগীর চেক-আপ করবেন। যদি মুসলিম মহিলা ডাক্তার না পাওয়া যায় তাহলে বিশ্বস্ত অমুসলিম মহিলা ডাক্তার মহিলা রোগীর চেক-আপ করবেন। যদি অমুসলিম মহিলা ডাক্তারও না পাওয়া যায় তাহলে মুসলিম পুরুষ ডাক্তার মহিলা রোগীর চেক-আপ করবেন। যদি মুসলিম ডাক্তারও না পাওয়া যায় তাহলে অমুসলিম পুরুষ ডাক্তার সে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে শর্ত হল,পুরুষ ডাক্তার রোগিনীর শরীরের ততটুকু দেখবেন যতটুকু দেখা রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার স্বার্থে প্রয়োজন; এর বেশি দেখবে না এবং সাধ্যমত দৃষ্টি অবনত রাখবে। পুরুষ ডাক্তারকে রোগিনীর চিকিৎসা করতে হবে রোগিনীর মাহরামের কিংবা স্বামী কিংবা কোন বিশ্বস্ত নারীর উপস্থিতিতে; যাতে করে নিষিদ্ধ নির্জনবাস না ঘটে।”[একাডেমীর জার্নাল থেকে সংকলিত (৮/১/৪৯)]
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন:الواجب أن تكون الطبيبات مختصات للنساء ، والأطباء مختصين للرجال إلا عند الضرورة القصوى إذا وجد مرض في الرجال ليس له طبيب رجل ، فهذا لا بأس به ، والله يقول : ( وقد فصل لكم ما حرم عليكم إلا ما اضطررتم إليه ) “ওয়াজিব হলো নারীদের চিকিৎসার জন্য নারী চিকিৎসক এবং পুরুষদের চিকিৎসার জন্য পুরুষ চিকিৎসক নির্দিষ্ট থাকা।তবে চরম জরুরতের ক্ষেত্রে,যদি কোনো পুরুষের এমন কোনো রোগ দেখা দেয় যার জন্য কোনো পুরুষ চিকিৎসক না পাওয়া যায়, তাহলে নারী চিকিৎসক চিকিৎসা করতে পারেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:অথচ যা তোমাদের জন্য তিনি হারাম করেছেন তা তিনি বিশদভাবেই তোমাদের কাছে বিবৃত করেছেন,তবে তোমরা নিরুপায় হলে তা স্বতন্ত্র।”(সূরা আন‘আম: ১১৯; ফাতাওয়া আজিলাহ লিমানসুবিস সিহ্হাহ: ২৯)
.
.
আমরা প্রথমেই উল্লেখ করেছি যে, চিকিৎসার ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো—সম্ভব হলে নারী রোগীর চিকিৎসা নারী চিকিৎসকের মাধ্যমে এবং পুরুষ রোগীর চিকিৎসা পুরুষ চিকিৎসকের মাধ্যমে করানোই অধিক উত্তম ও অগ্রাধিকারযোগ্য। কারণ চিকিৎসার প্রয়োজনে রোগীর শরীরের বিভিন্ন অংশ দেখা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে শরীরের কোনো অংশ স্পর্শ করার দরকার হতে পারে। ফলে একই লিঙ্গের চিকিৎসক পাওয়া গেলে তার মাধ্যমেই চিকিৎসা গ্রহণ করা অধিক নিরাপদ এবং শরিয়তের পর্দা ও শালীনতার বিধান পালনের জন্যও অধিক উপযোগী।তবে বাস্তবতা ও চিকিৎসাগত প্রয়োজনের কারণে সব সময় একই লিঙ্গের দক্ষ চিকিৎসক পাওয়া সম্ভব হয় না। কোনো নির্দিষ্ট রোগ বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশেষ শাখায় বিপরীত লিঙ্গের চিকিৎসকই যদি অধিক দক্ষ ও অভিজ্ঞ হন, একই লিঙ্গের চিকিৎসক না থাকেন, অথবা থাকলেও তার পর্যাপ্ত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা না থাকে—তাহলে প্রয়োজনের সীমার মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করা বৈধ।তবে এই বৈধতা প্রয়োজনের পরিমাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চিকিৎসক ও রোগী উভয়কেই শরিয়তের পর্দা, শালীনতা, নির্জনতা এবং প্রয়োজনের সীমা-সংক্রান্ত বিধান যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা জরুরি:
.
(১).চিকিৎসক ও রোগী নির্জনে অবস্থান করবে না: পুরুষ চিকিৎসক কোনো নারী রোগীর সঙ্গে এবং নারী চিকিৎসক কোনো পুরুষ রোগীর সঙ্গে এমন নির্জন স্থানে একাকী অবস্থান করবেন না, যেখানে তাদের সঙ্গে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি নেই। সম্ভব হলে রোগীর স্বামী/স্ত্রী, বাবা-মা, ভাই-বোন, মাহরাম অথবা অন্য কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তি উপস্থিত থাকা উচিত। একইভাবে হাসপাতাল বা ক্লিনিকের এমন কোনো স্টাফের উপস্থিতিতেও নির্জনতা দূর হয়ে যায়, যার উপস্থিতিতে চিকিৎসা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব। কারণ, গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের নির্জনে অবস্থান করা শরিয়তসম্মত নয় এবং এ বিষয়ে ফকীহদের সর্বসম্মত ইজমা রয়েছে। উভয়ে বৃদ্ধ হোক কিংবা একজন বৃদ্ধ ও অন্যজন তরুণ হোক—এ বিধানের কোনো পরিবর্তন হয় না। আল-মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ-তে বলা হয়েছে: «ولفظ الرجل في الحديث يتناول الشيخ والشاب، كما أن لفظ المرأة يتناول الشابة والمتجالة (العجوز)»—“হাদীসে ‘পুরুষ’ শব্দটি যেমন যুবক ও বৃদ্ধ উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে, তেমনি ‘নারী’ শব্দটিও যুবতী ও বৃদ্ধা উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে।” (আল-মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, ২৯/২৯৫)। এ বিষয়ে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: «لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثالثهما الشَّيْطَان»—“কোনো পুরুষ কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান করলে শয়তান তাদের তৃতীয়জন হয়।” (তিরমিযী, হা/১১৭১)। অপরদিকে ইবনু ‘আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন: «لا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ وَلا تُسَافِرَنَّ امْرَأَةٌ إِلا وَمَعَهَا مَحْرَمٌ»—“কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান না করে এবং কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া সফর না করে।” (সহীহ বুখারী, হা/৩০০৬; সহীহ মুসলিম, হা/১৩৪১)। তাই চিকিৎসার প্রয়োজনে চিকিৎসক ও রোগীর একান্ত নির্জনতা এড়িয়ে চলা আবশ্যক। পাশাপাশি চিকিৎসককে বিশ্বস্ত, সচ্চরিত্র ও দ্বীনদার হওয়া উচিত; তার চরিত্র ও আমানতদারির ব্যাপারে কোনো সন্দেহ বা বদনাম থাকা উচিত নয়। এক্ষেত্রে মানুষের বাহ্যিক অবস্থাকে সঠিক ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে ধরে নেওয়াই যথেষ্ট।
.
ইমাম ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وَأَمَّا إِذَا خَلَا الْأَجْنَبِيّ بِالْأَجْنَبِيَّةِ مِنْ غَيْر ثَالِث مَعَهُمَا، فَهُوَ حَرَام بِاتِّفَاقِ الْعُلَمَاء , وَكَذَا لَوْ كَانَ مَعَهُمَا مَنْ لَا يُسْتَحَى مِنْهُ لِصِغَرِهِ كَابْنِ سَنَتَيْنِ وَثَلَاث وَنَحْو ذَلِكَ , فَإِنَّ وُجُوده كَالْعَدَمِ , وَكَذَا لَوْ اِجْتَمَعَ رِجَال بِامْرَأَةٍ أَجْنَبِيَّة فَهُوَ حَرَام , بِخِلَافِ مَا لَوْ اِجْتَمَعَ رَجُل بِنِسْوَةٍ أَجَانِب , فَإِنَّ الصَّحِيح جَوَازه “যখন কোনো গায়রে মাহরাম পুরুষ ও গায়রে মাহরাম নারী তৃতীয় কোনো ব্যক্তি ছাড়া নির্জনে একত্রিত হয়, তখন তা সকল আলেমের ঐকমত্য অনুযায়ী হারাম। অনুরূপভাবে, যদি তাদের সঙ্গে এমন ছোট শিশু থাকে, যার উপস্থিতিকে লজ্জার কারণ মনে করা হয় না—যেমন দুই বা তিন বছরের শিশু তাহলেও তার উপস্থিতি না থাকারই শামিল। আবার, একাধিক পুরুষ যদি একজন গায়রে মাহরাম নারীর সঙ্গে নির্জনে থাকে, তাও হারাম। তবে একজন পুরুষ যদি একাধিক গায়রে মাহরাম নারীর সঙ্গে থাকে, তাহলে বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী তা বৈধ।”(নববী শারহু সহীহ মুসলিম; খণ্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ১৫৩)
.
(২).চিকিৎসার প্রয়োজন যতটুকু,ততটুকুই দেখা যাবে এর অতিরিক্ত নয়:রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার জন্য রোগীর শরীরের যে অংশ দেখা অপরিহার্য, শুধু প্রয়োজনের পরিমাণ অনুযায়ী সেই অংশটুকুই দেখা যাবে। এর অতিরিক্ত কোনো অংশ দেখা কোনো ভাবেই বৈধ নয়। চিকিৎসকের উচিত আল্লাহকে ভয় করা এবং সর্বদা মনে রাখা—আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছু অবগত আছেন এবং প্রত্যেক কাজের হিসাব গ্রহণ করবেন।মহান আল্লাহ বলেছেন:إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেন।” (সূরা নিসা:১) অপর আয়াতে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:﴿فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ﴾“অতএব, তোমরা সাধ্যানুযায়ী আল্লাহকে ভয় করো।”—সূরা আত-তাগাবুন, ৬৪:১৬) এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, শরিয়তের বিধান পালনে সামর্থ্য ও প্রয়োজনের সীমা বিবেচনা করা হয়। চিকিৎসার ক্ষেত্রে যে অংশ দেখা অপরিহার্য, শুধু ততটুকুই দেখা হবে; অপ্রয়োজনীয় অংশ দেখা যাবে না।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,لَا يَنْظُرُ الرَّجُلُ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ، وَلَا الْمَرْأَةُ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ، وَلَا يُفْضِي الرَّجُلُ إِلَى الرَّجُلِ فِي ثَوْبٍ وَاحِدٍ، وَلَا تُفْضِي الْمَرْأَةُ إِلَى الْمَرْأَةِ فِي الثَّوْبِ الْوَاحِدِ ‘কোনো পুরুষ যেন অপর পুরুষের এবং কোনো নারী যেন অপর নারীর ‘আওরাত’ না দেখে। আর কোনো পুরুষ যেন অপর পুরুষের সাথে এক কাপড়ের নিচে না থাকে। অনুরূপ কোনো নারীও যেন অপর নারীর সাথে এক কাপড়ের নিচে না থাকে”(সহীহ মুসলিম, হা/৩৩৮)
.
হাদিসটির আলোকে ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,فَفِيهِ تَحْرِيمٌ نَظَرُ الرَّجُلِ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ وَالْمَرْأَةُ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ وَهَذَا لَا خِلَافَ فِيهِ وَكَذَلِكَ نَظَرُ الرَّجُلِ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ وَالْمَرْأَةُ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ حَرَامٌ بِالْإِجْمَاعِ وَنَبَّهَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِنَظَرِ الرَّجُلِ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ عَلَى نَظَرِهِ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ وَذَلِكَ بِالتَّحْرِيمِ أَوْلَى ‘এ হাদীছে একজন পুরুষের অন্য পুরুষের গোপনাঙ্গের দিকে এবং একজন মহিলার অন্য মহিলার গোপনাঙ্গের দিকে তাকানো হারাম হওয়ার প্রমাণ আছে। আর এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। একইভাবে, কোনো পুরুষের জন্য কোনো মহিলার গোপনাঙ্গের দিকে এবং কোনো মহিলার জন্য কোনো পুরুষের গোপনাঙ্গের দিকে তাকানো ইজমার ভিত্তিতে হারাম। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন পুরুষকে অন্য পুরুষের গোপনাঙ্গের দিকে তাকানোর ব্যাপারে সতর্ক করার মাধ্যমে একজন পুরুষের জন্য একজন মহিলার গোপনাঙ্গের দিকে তাকানোর ব্যাপারে সাবধান করেছেন। বরং এটা আরো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হারাম”(আল-মিনহাজ শারহু সহীহি মুসলিম ইবনিল হাজ্জাজ,৪/৩০) এছাড়াও সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম এর হাদিসে। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:«فَزِنَا العَيْنِ النَّظَر»“চোখের যিনা দৃষ্টিপাত।”(সহিহ বুখারি হা/৬২৪৩; ও সহিহ মুসলিম হা/২৬৫৭) ইবনে বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “দৃষ্টি ও কথাকে যিনা বলা হয়েছে যেহেতু এগুলো প্রকৃত যিনার আহ্বায়ক। এজন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যৌনাঙ্গ সেটাকে বাস্তবায়ন করে অথবা করে না।” ফাতহুল বারি হতে সংকলিত। ইবনুল আরাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَكَمَا لَا يَحِلُّ لِلرَّجُلِ أَنْ يَنْظُرَ إلَى الْمَرْأَةِ فَكَذَلِكَ لَا يَحِلُّ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تَنْظُرَ إلَى الرَّجُلِ، فَإِنَّ عَلَاقَتَهُ بِهَا كَعَلَاقَتِهَا بِهِ، وَقَصْدُهُ مِنْهَا كَقَصْدِهَا مِنْهُ. ‘একজন পুরুষের জন্য যেমন একজন নারীর দিকে তাকানো বৈধ নয়, তেমনি একজন নারীর জন্যও একজন পুরুষের দিকে তাকানো বৈধ নয়। কারণ নারীর সাথে পুরুষের সম্পর্ক যেমন, পুরুষের সাথে নারীর সম্পর্কও তেমন। নারীর কাছ থেকে পুরুষের চাওয়াপাওয়া যা, পুরুষের কাছ থেকে নারীর চাওয়াপাওয়াও তা”।(ইবনুল আরাবী, আহকামুল কুরআন, ৩/৩৮০)
.
(৩).চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়া শরীর স্পর্শ করা যাবে না:চিকিৎসার জন্য রোগীর শরীরের যে অংশ স্পর্শ করা অপরিহার্য, কেবল সেই অংশটুকুই প্রয়োজনের সীমায় স্পর্শ করা যাবে। অপ্রয়োজনীয় কোনো স্পর্শ বৈধ নয়। আর যদি হাতমোজা, কাপড় বা অন্য কোনো উপযুক্ত আবরণ ব্যবহার করে পরীক্ষা বা চিকিৎসা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়, তাহলে সরাসরি স্পর্শের পরিবর্তে আবরণ ব্যবহার করাই অপরিহার্য কর্তব্য।মা’ক্বিল বিন য়্যাসার বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:”لأن يطعن في رأس رجل بمخيط من حديد خير من أن يمس امرأة لا تحل له “কোন ব্যক্তির মাথায় লৌহ সূচ দ্বারা খোঁচা মারা ভাল, তবুও যে নারী তার জন্য অবৈধ তাকে স্পর্শ করা ভাল নয়”(সিলসিলা সহীহাহ হা/২২৬; সহীহুত তারগীব হা/১৯১০)।হাদিসটির আলোকে ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:في الحديث : وعيد شديد لمن مس امرأة لا تحل له “হাদিসে ওই ব্যক্তির জন্য কঠোর শাস্তির হুমকি রয়েছে, যে এমন নারীকে স্পর্শ করে যে তার জন্য হালাল নয়।”(সিলসিলাহ সহীহা (১/৪৪৮) থেকে সমাপ্ত।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন:ليس المراد بالخلوة المحرمة شرعاً انفراد الرجل بامرأة أجنبية منه في بيت بعيداً عن أعين الناس فقط ، بل تشمل انفراده بها في مكان تناجيه ويناجيها ، وتدور بينهما الأحاديث ، ولو على مرأى من الناس دون سماع حديثهما ، سواء كان ذلك في فضاء أم سيارة أو سطح بيت أو نحو ذلك ؛ لأن الخلوة منعت لكونها بريد الزنا وذريعة إليه [ أي : مقدمة الزنا ووسيلة إليه ] ، فكل ما وجد فيه هذا المعنى فهو في حكم الخلوة الحسية بعيدا عن أعين الناس”শরিয়তে নিষিদ্ধ খালওয়াত বলতে শুধু এমন নয় যে কোনো পুরুষ ও গায়রে মাহরাম নারী মানুষের দৃষ্টির বাইরে কোনো ঘরে একান্তে থাকবে। বরং এমন যেকোনো অবস্থাও খালওয়াতের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে তারা একান্তে কথা বলতে পারে, পরস্পরের সঙ্গে গোপনে আলাপ করতে পারে যদিও মানুষ তাদের দেখতে পায়, কিন্তু তাদের কথা শুনতে না পায়। তা খোলা মাঠে হোক, গাড়িতে, ছাদে বা অন্য যেকোনো স্থানে। কারণ খালওয়াত নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যেহেতু এটি ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি মাধ্যম ও ভূমিকা। তাই যেখানে এই অর্থ বিদ্যমান, সেখানেই তা শরিয়তের দৃষ্টিতে খালওয়াতের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; গ্রুপ: ২; খণ্ড: ১৭; পৃষ্ঠা: ৫৭)
.
(৪).কথাবার্তা চিকিৎসার প্রয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে:চিকিৎসক ও বিপরীত লিঙ্গের রোগীর মধ্যে কথাবার্তা রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা এবং চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। অপ্রয়োজনীয় আলাপচারিতা, হাসি-ঠাট্টা, ব্যক্তিগত আলোচনা কিংবা এমন কোনো কথাবার্তা থেকে বিরত থাকতে হবে, যা শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে অথবা ফিতনার আশঙ্কা সৃষ্টি করে।মহান আল্লাহ বলেন,یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ لَسۡتُنَّ کَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ اِنِ اتَّقَیۡتُنَّ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِالۡقَوۡلِ فَیَطۡمَعَ الَّذِیۡ فِیۡ قَلۡبِهٖ مَرَضٌ وَّ قُلۡنَ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا হে নবী-পত্নিগণ, তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর তবে পর-পুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। স্বাভাবিকভাবে কথা বল। (সূরা আহযাব; ৩৩/৩২) মহান আল্লাহ তাআলা যেরূপভাবে নারী জাতির দেহ-বৈচিত্রে পুরুষের জন্য যৌন আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন (যা থেকে হেফাযতের বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে নারী পুরুষের জন্য ফেতনার কারণ না হয়ে পড়ে।) অনুরূপভাবে তিনি নারীদের কণ্ঠস্বরেও প্রকৃতিগতভাবে মন কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা, কোমলতা ও মধুরতা রেখেছেন, যা পুরুষকে নিজের দিকে আকর্ষণ করতে থাকে। সুতরাং সেই কণ্ঠস্বর ব্যবহার করার ব্যাপারেও এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, পর-পুরুষের সাথে বাক্যালাপের সময় ইচ্ছাপূর্বক এমন কণ্ঠ ব্যবহার করবে, যাতে কোমলতা ও মধুরতার পরিবর্তে সামান্য শক্ত ও কঠোরতা থাকে। যাতে ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরবিশিষ্ট লোক কণ্ঠের কোমলতার কারণে তোমাদের দিকে আকৃষ্ট না হয়ে পড়ে এবং তাদের মনে কুবাসনার সঞ্চার না হয়। (অত্র আয়াতের তাফসির) তাছাড়া নারীরা বাসায় সালাত আদায়ের সময় আশেপাশে গায়ের মাহরাম পুরুষ থাকলে উচ্চস্বরে পড়া সালাতের কির’আত নীরবে পাঠ করার কথা বলা হয়েছে। (নববী আল-মাজমূ; খন্ড: ৩; পৃষ্ঠা:;১০০; বিন বায,;ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব: ৯/৩৫)।
.
আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষে বলা হয়েছে, إنْ كَانَ صَوْتَ امْرَأَةٍ ، فَإِنْ كَانَ السَّامِعُ يَتَلَذَّذُ بِهِ ، أَوْ خَافَ عَلَى نَفْسِهِ فِتْنَةً حَرُمَ عَلَيْهِ اسْتِمَاعُهُ ، وَإِلاَّ فَلاَ يَحْرُمُ ، وَيُحْمَل اسْتِمَاعُ الصَّحَابَةِ رِضْوَانُ اللَّهِ عَلَيْهِمْ أَصْوَاتَ النِّسَاءِ حِينَ مُحَادَثَتِهِنَّ عَلَى هَذَا ، وَلَيْسَ لِلْمَرْأَةِ تَرْخِيمُ الصَّوْتِ وَتَنْغِيمُهُ وَتَلْيِينُهُ ، لِمَا فِيهِ مِنْ إثَارَةِ الْفِتْنَةِ ، وَذَلِكَ لِقَوْلِهِ تَعَالَى : فَلاَ تَخْضَعْنَ بِالْقَوْل فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ নারীর কণ্ঠস্বরে যদি শ্রোতা আনন্দ পায় বা প্রলুব্ধ হওয়ার আশংকা করে, তবে তা শোনা তার জন্য হারাম। অন্যথায় তা হারাম নয়। এমন বর্ণনা এসেছে যে ,মহিলারা যখন কথা বলতো তখন সাহাবীরা তাদের কথা শুনতেন। এই বর্ননাগুলোকে বোঝাতে হবে সেসব ক্ষেত্রে উল্লেখ করে, যেখানে ফিতনার ভয় ছিল না। একজন মহিলার তার কণ্ঠস্বর নরম এবং লোভনীয় করা উচিত নয়, কারণ এটি ফিতনার কারণ। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন;…সুতরাং পর-পুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না,যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। স্বাভাবিকভাবে কথা বল। (সূরা আহযাব; ৩৩/৩২, আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ,খন্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৯০)
.
(৫).চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রয়োজনকে অজুহাত বানানো যাবে না: বিপরীত লিঙ্গের চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসার অনুমতি পাওয়া মানে এই নয় যে, চিকিৎসার অজুহাতে পর্দার বিধান শিথিল করা যাবে কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত শরীর দেখা, স্পর্শ করা বা অবাধ কথাবার্তা বলা যাবে। বরং চিকিৎসার ক্ষেত্রে যতটুকু প্রয়োজন, শরিয়ত ততটুকুই অনুমতি দিয়েছে; প্রয়োজন শেষ হলে অনুমতির সীমাও শেষ হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿وَقَدْ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ﴾ “তিনি তোমাদের জন্য যা কিছু হারাম করেছেন, তা বিস্তারিতভাবে বলে দিয়েছেন; তবে তোমরা যার প্রতি বাধ্য হও, তা ব্যতীত।” (সূরা আল-আন‘আম: ১১৯)। আয়াতের «إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ»—“তোমরা যার প্রতি বাধ্য হও”—এই অংশটি প্রমাণ করে যে, জরুরি অবস্থায় নিষিদ্ধ বিষয়ের যতটুকু অনুমতি দেওয়া হয়, তা কেবল প্রয়োজনের সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আলেমগণের নিকট স্বতঃসিদ্ধ শরয়ি নীতি হলো—ইসলাম কল্যাণ সাধন ও তা পূর্ণতা দান এবং অকল্যাণ প্রতিহত বা হ্রাস করার জন্য এসেছে। তাই বড় অকল্যাণ দূর করার জন্য তুলনামূলক ছোট অকল্যাণে লিপ্ত হওয়া প্রয়োজনের ক্ষেত্রে বৈধ হতে পারে। সুতরাং জরুরি অবস্থা নিষিদ্ধ বিষয়কে প্রয়োজনের পরিমাণ অনুযায়ী সাময়িকভাবে বৈধ করে। চিকিৎসার তীব্র প্রয়োজনের সময় রোগীর অসুস্থ স্থান দেখা, প্রয়োজন অনুযায়ী শরীরের অংশবিশেষ উন্মুক্ত করা বা স্পর্শ করার বৈধতার ব্যাপারে আলেমগণের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই—যেমন জরুরী ক্ষেত্রে নারী রোগীর চিকিৎসায় পুরুষ চিকিৎসক এবং পুরুষ রোগীর চিকিৎসায় নারী চিকিৎসকের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য। কারণ, এখানে সতর ও পর্দা রক্ষার স্বার্থের সঙ্গে জীবন রক্ষা ও চিকিৎসার প্রয়োজনের সংঘাত হলে বৃহত্তর কল্যাণ তথা জীবন ও স্বাস্থ্যের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে “জরুরত তার মাত্রা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়”—এই গুরুত্বপূর্ণ নীতির কারণে চিকিৎসার অনুমতিকে কখনোই সীমালঙ্ঘনের অজুহাত বানানো যাবে না। অতএব, যতটুকু দেখা, উন্মুক্ত করা, স্পর্শ করা বা কথা বলা চিকিৎসার জন্য অপরিহার্য, কেবল ততটুকুই বৈধ হবে; প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো কিছু করা শরয়ি বিধানের সীমালঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
.
.
শাফেয়ী মাযহাবের আলেম শামসুদ্দীন খতীব শিরবিনী (রাহিমাহুল্লাহ) পুরুষের নারীর প্রতি দৃষ্টির বিধান আলোচনা করতে গিয়ে বলেন:النظر للمداواة كحجامة وعلاج ، ولو في فرج ، فيجوز إلى المواضع التي يحتاج إليها فقط ؛ لأن في التحريم حينئذ حرجاً ، فللرجل مداواة المرأة ، وعكسه ، وليكن ذلك بحضرة محرم ، أو زوج ، أو امرأة ثقة ، ويشترط عدم امرأة يمكنها تعاطي ذلك ، وأن لا يكون ذميا مع وجود مسلم ، ولو لم نجد لعلاج المرأة إلا كافرة ومسلما: فالظاهر أن الكافرة تقدم لأن نظرها ومسها أخف من الرجل…. وقيد في ” الكافي ” الطبيب بالأمين ، فلا يعدل إلى غيره مع وجوده ، وشرط الماوردي أن يأمن الافتتان ولا يكشف إلا قدر الحاجة “চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যেমন শিঙ্গা লাগানো বা অন্যান্য চিকিৎসা প্রয়োজন হলে, এমনকি লজ্জাস্থানও দেখতে হলে, কেবল যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু দেখা বৈধ। কারণ, এ অবস্থায় নিষিদ্ধ করলে মানুষের জন্য কষ্ট সৃষ্টি হবে। সুতরাং পুরুষ চিকিৎসক নারীর চিকিৎসা করতে পারে, তেমনি নারী চিকিৎসকও পুরুষের চিকিৎসা করতে পারে। তবে এ সময় রোগিণীর সঙ্গে তার মাহরাম, স্বামী অথবা কোনো বিশ্বস্ত নারী উপস্থিত থাকতে হবে। আরও শর্ত হলো, এ চিকিৎসা করতে সক্ষম কোনো নারী চিকিৎসক থাকবে না। আর মুসলিম চিকিৎসক থাকলে অমুসলিম চিকিৎসকের কাছে যাওয়া যাবে না। তবে যদি নারীর চিকিৎসার জন্য কেবল একজন কাফির নারী চিকিৎসক এবং একজন মুসলিম পুরুষ চিকিৎসক পাওয়া যায়, তাহলে বাহ্যিকভাবে কাফির নারী চিকিৎসককেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কারণ, তার দেখা ও স্পর্শ পুরুষের তুলনায় হালকা। আল কাফী গ্রন্থে চিকিৎসককে বিশ্বস্ত হওয়ার শর্তও উল্লেখ করা হয়েছে। আর ইমাম মাওয়ারদী শর্ত করেছেন যে, ফিতনার আশঙ্কা না থাকতে হবে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত শরীর উন্মুক্ত করা যাবে না। (আল ইকনা; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৬৯)
.
একই আলেম মুগনী আল মুহতাজ গ্রন্থে জরুরি প্রয়োজনে কারা নারীর গোপন অঙ্গ দেখতে পারে এ বিষয়ে ইমাম বুলকীনীর ক্রমবিন্যাস উল্লেখ করেছেন:
১. প্রথমে একজন মুসলিম নারী।
২. তিনি না থাকলে অপ্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম বালক।
৩. সেও না থাকলে অপ্রাপ্তবয়স্ক অমুসলিম বালক।
৪. তাও না থাকলে একজন অমুসলিম নারী।
৫. তারপর মুসলিম মাহরাম।
৬. তিনি না থাকলে অমুসলিম মাহরাম।
৭. এরপর মুসলিম গায়রে মাহরাম পুরুষ।
৮. সবশেষে অমুসলিম গায়রে মাহরাম পুরুষ। (মুগনী আল মুহতাজ ৪/২১৬)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: চিকিৎসার প্রয়োজনে পুরুষের সামনে নারীর আওরাত বা নারীর সামনে পুরুষের আওরাত খোলা কি বৈধ? আর যদি কেবল একজন খ্রিস্টান নারী চিকিৎসক এবং একজন মুসলিম পুরুষ চিকিৎসক থাকেন, তাহলে কার কাছে চিকিৎসা নেওয়া উচিত?
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
كشف عورة الرجل للمرأة ، والمرأة للرجل عند الحاجة لذلك حال العلاج : لا بأس به بشرطين :
الشرط الأول : أن تؤمن الفتنة .
الشرط الثاني : أن لا يكون هناك خلوة .
والطبيبة النصرانية المأمونة أولى في علاج المرأة من الرجل المسلم ؛ لأنها من جنسها بخلاف الرجل .
والله المسئول أن يصلح أحوال المسلمين “
“চিকিৎসার প্রয়োজনে পুরুষের সামনে নারীর আওরাত অথবা নারীর সামনে পুরুষের আওরাত খোলা বৈধ, তবে দুটি শর্তে:
প্রথম শর্ত: ফিতনার আশঙ্কা থেকে নিরাপদ থাকা।
দ্বিতীয় শর্ত: নির্জন অবস্থায় না হওয়া।
আর বিশ্বস্ত খ্রিস্টান নারী চিকিৎসক নারীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে মুসলিম পুরুষ চিকিৎসকের তুলনায় অধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত; কারণ তিনি নারীরই সমগোত্রীয় (অর্থাৎ একই লিঙ্গের), পক্ষান্তরে পুরুষ ভিন্ন লিঙ্গের।আল্লাহর নিকট প্রার্থনা, তিনি যেন মুসলিমদের অবস্থা সংশোধন করে দেন।”(ইবনু উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ১৭৫)।
.
শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: রোগ নির্ণয়ের জন্য কোনো নারীর সতরের অংশ পরীক্ষা করা কি বৈধ? আর চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য রোগিণীর সতর দেখানো কি বৈধ? তিনি উত্তরে বলেন: “كشف المرأة ما يجب عليها ستره من أجل مصلحة الطب ببيان ما فيها من مرض وتشخيصه هذا لا بأس به ، لأنه لحاجة ، والحاجة تبيح مثل هذا المحرم ، إذ القاعدة المعروفة عند أهل العلم : أن ما حرم تحريم الوسائل أباحته الحاجة ، وما حرم تحريماً ذاتياً تحريم المقاصد فإنه لا يبيحه إلا الضرورة ، وذكروا لذلك أمثلة وهي النظر إلى ما لا يجوز النظر إليه من المرأة للحاجة ، كما يجوز نظر الخاطب إلى ما لا يجوز النظر إليه من أجل مصلحة النكاح”চিকিৎসার স্বার্থে রোগ নির্ণয় ও রোগের অবস্থা বোঝার জন্য নারীর যে অংশ সাধারণত আবৃত রাখা ফরজ, তা প্রয়োজনবশত উন্মুক্ত করা বৈধ। কারণ এটি প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। শরিয়তের একটি সুপরিচিত নীতি হলো যেসব বিষয় উপায়গত কারণে হারাম, প্রয়োজন হলে তা বৈধ হয়ে যায়। আর যেসব বিষয় নিজগতভাবে হারাম, সেগুলো কেবল চরম প্রয়োজন ছাড়া বৈধ হয় না। এর উদাহরণ হলো প্রয়োজনের কারণে নারীর এমন অঙ্গ দেখা, যা সাধারণ অবস্থায় দেখা বৈধ নয়। যেমন, বিবাহের উদ্দেশ্যে পাত্রের জন্য কনেকে দেখা বৈধ, তেমনি চিকিৎসকের জন্য রোগ নির্ণয়ের স্বার্থে নারীর প্রয়োজনীয় অঙ্গ পরীক্ষা করাও বৈধ।”(ইবনু উসাইমীন, ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব: ৯/২)
.
অপর ফাতাওয়ায় মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ আল উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: একই বিষয়ে একজন নারী চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও কোনো নারীর পুরুষ চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নেওয়ার বিধান কী?
তিনি উত্তরে বলেন: “إذا كان الاختصاص واحداً والحذق (المهارة) متساوياً بين الرجل والمرأة فإن المرأة لا تذهب إلى الرجل ، لأنه لا داعي لذلك ولا حاجة ، أما إذا كان الرجل أحذق من المرأة ، أو كان اختصاصه أعمق فلا حرج عليها أن تذهب إليه ، وإن كان هناك امرأة ؛ لأن هذه حاجة ، والحاجة تبيح مثل هذا “যদি পুরুষ ও নারী চিকিৎসকের বিশেষজ্ঞতা একই হয় এবং দক্ষতাও সমান হয়, তাহলে নারীর পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত নয়। কারণ এর কোনো প্রয়োজন বা জরুরি কারণ নেই। কিন্তু যদি পুরুষ চিকিৎসক নারী চিকিৎসকের তুলনায় অধিক দক্ষ হন, অথবা তাঁর বিশেষজ্ঞতা আরও গভীর হয়, তাহলে নারী চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও তাঁর কাছে চিকিৎসা নেওয়ায় কোনো অসুবিধা নেই। কারণ এটি একটি প্রয়োজন, আর প্রয়োজন এমন বিষয়কে বৈধ করে। (ফাতাওয়া উলামা আলা বালাদিল হারাম পৃষ্ঠা: ৬৯৩)
.
ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞেস করা হয় যে, “আমরা একদল ডাক্তার রিয়াদে চাকুরী করি। আমাদের ডিউটিকালে পুরুষ ও মহিলা রোগী আসে। কখনো কখনো কোন মহিলা রোগী মাথা ব্যথা বা পেটে ব্যথার কথা বলেন। পরিপূর্ণ চিকিৎসার দাবী হচ্ছে- রোগিনীকে পরীক্ষা করে দেখা। পরীক্ষার মাধ্যমে মাথা ব্যথার কারণ নির্ণয় করা। রোগের কারণ নির্ণয় করতে গেলে রোগীর পেট কিংবা মাথা কিংবা অন্য কোন অঙ্গ পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয়; যাতে করে ডাক্তারের উপর কোন দায় না আসে। আর যদি রোগিনীকে পরীক্ষা করা না হয় হতে পারে এতে করে রোগিনী ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। অর্থাৎ এক্ষেত্রে পরীক্ষা না করারও সুযোগ আছে। তবে যথাযথ কনসালটেন্সির করতে গেলে পরীক্ষা করা প্রয়োজন…।
শাইখ জবাবে বলেন:الواجب على إدارة المستشفى أن تلاحظ هذا وأن تجعل المناوبة بين الرجال والنساء حتى إذا احتاج النساء المرضى أن يُعالجن أو يفحصن أُرسل إليهن النساء ، فإذا لم تقم الإدارة بهذا الواجب عليها ولم تبال فأنتم لا حرج أن تفحصوا النساء ، لكن بشرط ألا يكون هناك خلوة أو شهوة ، وأيضا يكون هناك حاجة إلى الفحص ، فإن لم يكن حاجة وأمكن تأخير الفحص الدقيق إلى وقت تحضر فيه النساء فأخروه ، وإذا كان لا يمكن فهذه حاجة ولا بأس بها ” হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হচ্ছে- পুরুষ ডাক্তার ও মহিলা ডাক্তারের মাঝে এমনভাবে ডিউটি ভাগ করে দেয়া যাতে করে মহিলা রোগী আসলে তাদের চেক-আপ করা ও পরীক্ষা করার জন্য মহিলা ডাক্তারের কাছে পাঠানো যায়। যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ কর্তব্য পালন না করে, এ বিষয়ে ভ্রূক্ষেপ না করে তাহলে মহিলাদের চিকিৎসা করায় আপনারা গুনাহগার হবেন না। তবে শর্ত হচ্ছে- চিকিৎসাকালে কোন মহিলা রোগীর সাথে নির্জনবাস না ঘটা এবং যৌন উত্তেজনা না আসা এবং প্রকৃতপক্ষে রোগীকে পরীক্ষা করার প্রয়োজন থাকা। যদি পরীক্ষা করার প্রয়োজন না থাকে, কিংবা সূক্ষ্ম পরীক্ষা পরবর্তীতে মহিলা ডাক্তার আসার পর করলেও চলে তাহলে সে পরীক্ষা পরবর্তীতেই করতে হবে। আর যদি দেরী করার সুযোগ না থাকে; তাহলে এটি প্রয়োজন। এমতাবস্থায় পুরুষ ডাক্তার মহিলা রোগীর চিকিৎসা করলে গুনাহ হবে না।”[ইবনু উসাইমীন; লিকাআতুল বাব আল-মাফতুহ: ১/২০৬)]
.
পরিশেষে বলা যায়, চিকিৎসার মূলনীতি হলো—পুরুষের চিকিৎসা পুরুষ চিকিৎসক এবং নারীর চিকিৎসা নারী চিকিৎসকের মাধ্যমে করা। তবে বাস্তব প্রয়োজন বা উপযুক্ত চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে শরয়ি শর্তসাপেক্ষে বিপরীত লিঙ্গের চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা বৈধ। এক্ষেত্রে প্রয়োজনের পরিমাণ অনুযায়ী সতর দেখা বা স্পর্শ করা, খালওয়াত ও ফিতনা থেকে বেঁচে থাকা এবং অপ্রয়োজনীয় দৃষ্টি, স্পর্শ ও কথাবার্তা পরিহার করা আবশ্যক। অতএব, চিকিৎসার প্রয়োজনকে শরিয়তের সীমালঙ্ঘনের অজুহাত না বানিয়ে প্রয়োজনের সীমা যথাযথভাবে রক্ষা করাই শরিয়তের নির্দেশনা। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়,ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।