কুকুরের লালা কারও শরীর পোশাক বা পাত্রে লাগলে তা পবিত্র করার শরয়ি পদ্ধতি কী

প্রশ্ন: কুকুর কি সত্তাগতভাবে নাপাক, নাকি কেবল তার লালাই নাপাক? কুকুরের লালা কারও শরীর, পোশাক বা পাত্রে লাগলে তা পবিত্র করার শরয়ি পদ্ধতি কী?
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর কুকুর সত্তাগতভাবে নাপাক কি না—এ বিষয়ে আহলুল ইলমের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ বিষয়ে তিনটি মত রয়েছে:
◽প্রথম মত: কুকুর সত্তাগতভাবেই নাপাক। শুধু তার লালাই নয়; বরং তার সবকিছু তার দেহ, এমনকি পশমও নাপাক। এটি শাফেয়ী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত এবং ইমাম আহমদ (রহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণিত দুই মতের একটি। সৌদি আরবের ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির নির্বাচিত মতও এটি। এই মতের আলেমগন দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস:(طُهُورُ إِنَاءِ أحَدِكُمْ إِذَا وَلَغَ فِيهِ الكَلْبُ أنْ يَغْسِلَهُ سَبْعَ مَرَّاتٍ أُولاَهُنَّ بِالتُّرَابِ)“তোমাদের কারো পাত্রে যদি কুকুর মুখ দেয় (চেটে খায়), তবে এর পবিত্রতা হল: সাতবার ধোয়া; প্রথমবার মাটি দিয়ে।”[হাদীসটি মুসলিম হা/২৭৯) বর্ণনা করেছেন]
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন:ففيه دلالة ظاهرة لمذهب الشافعي وغيره رضي الله عنه ممن يقول بنجاسة الكلب لأن الطهارة تكون عن حدث أو نجس وليس هنا حدث فتعين النجس .فإن قيل: المراد الطهارة اللغوية ؟فالجواب: أن حمل اللفظ على حقيقته الشرعية مقدم على اللغوية“এ হাদীসে ইমাম শাফেয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) এবং তাঁর সঙ্গে একমত অন্যান্য আলেমদের মতের সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে, যারা কুকুরকে নাপাক বলেন। কারণ ‘পবিত্রতা’ (طهارة) হয় অপবিত্রতা (হাদাস) অথবা নাজাসাত (নাপাক বস্তু) থেকে। এখানে হাদাসের কোনো বিষয় নেই, তাই অবশ্যই তা নাজাসাতের কারণেই। যদি বলা হয়, এখানে ‘পবিত্রতা’ বলতে ভাষাগত অর্থ বোঝানো হয়েছে, তবে তার জবাব হলো—শরীয়তের পরিভাষাগত অর্থকে ভাষাগত অর্থের ওপর অগ্রাধিকার দিতে হবে।”—(শারহু সহীহ মুসলিম (৩/১৮৪)। আরও দেখুন: ফাতহুল বারী (১/২৭৬)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি,(রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম:৭৭৩ হি: মৃত:৮৫২ হি:] বলেছেন:والتعليل بالتنجيس أقوى، لأنه في معنى المنصوص، وقد ثبت عن ابن عباس التصريح بأن الغسل من ولوغ الكلب بأنه رجس رواه محمد بن نصر المروزي بإسناد صحيح ، ولم يصح عن أحد من الصحابة خلافه “কুকুরকে নাপাক বলার কারণ-ভিত্তিক ব্যাখ্যাই অধিক শক্তিশালী। কারণ এটি হাদীসের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইবন আব্বাস (রাযি.) থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি কুকুরের মুখ দেওয়া পাত্র ধোয়ার কারণ সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বলেছেন: ‘এটি অপবিত্র (رجس)।’ আর এ বিষয়ে কোনো সাহাবী থেকে এর বিপরীত মত সহীহভাবে বর্ণিত হয়নি।”(ফাতহুল বারী (১/২৭৭) খাত্তাবী (রাহিমাহুল্লাহ) হাদিসটির ব্যাখ্যায় বলেন: في هذا الحديث من الفقه أن الكلب نجس الذات ، ولولا نجاسته لم يكن لأمره بتطهير الإناء من ولوغه معنى ، والطهور يقع في الأصل إما لرفع حدث أو لإزالة نجس ، والإناء لا يلحقه حكم الحدث ، فعُلم أنه قصد به إزالة النجس .وإذا ثبت أن لسانه الذي يتناول به الماء نجس يجب تطهير الإناء منه ، عُلم أن سائر أجزائة وأبعاضه في النجاسة بمثابة لسانه ، فبأي جزء من أجزاء بدنه ماسه وجب تطهيره“এ হাদীসে যে ফিকহী বিধান রয়েছে তাহলো: কুকুর সত্তাগতভাবে নাপাক। যদি সে নাপাক না হতো তবে কুকুরের মুখ দেওয়ার কারণে পাত্রকে ধোয়ার আদেশ করার কোনো অর্থ থাকে না। মূলতঃ পবিত্র করা হয় অপবিত্র অবস্থা (হাদাস) দূর করার জন্য অথবা নাপাকি (নাজাস) দূর করার জন্য। আর পাত্রের ক্ষেত্রে হাদাস (অপবিত্র অবস্থা) প্রযোজ্য নয়। অতএব বোঝা গেল, ধোয়ার নির্দেশ করা দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল নাপাকি (নাজাস) দূর করা। যেহেতু প্রমাণিত হলো যে, তার জিহ্বা (যা দিয়ে সে পানি খায়) নাপাক এবং তা থেকে পাত্রকে পবিত্র করা জরুরী, সেহেতু এটাও বোঝা গেল যে, কুকুরের দেহের অন্যান্য অংশও নাপাক হওয়ার ক্ষেত্রে কুকুরের জিহ্বার মতোই। অতএব কুকুরের দেহের যে অংশই কোনো কিছুকে স্পর্শ করবে সেটাকেই ধৌত করা ও পবিত্র করা ওয়াজিব।”(মা‘আলিমুস সুনান; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৯)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন:فالنجس نوعان: أحدهما: ما هو نجس، رواية واحدة، وهو الكلب، والخنزير، وما تولد منهما، أو من أحدهما، فهذا نجس، عينه، وسؤره، وجميع ما خرج منه، روي ذلك عن عروة، وهو مذهب الشافعي، وأبي عبيد، وهو قول أبي حنيفة في السؤر خاصة “নাপাক বস্তু দুই প্রকার। প্রথম প্রকার হলো—যা সর্বসম্মতিক্রমে (এক বর্ণনা অনুযায়ী) নাপাক। তা হলো: কুকুর, শূকর এবং এ দুটির উভয় থেকে অথবা এদের যেকোনো একটির থেকে জন্ম নেওয়া প্রাণী। এগুলোর সত্তা, উচ্ছিষ্ট এবং এগুলো থেকে নির্গত সবকিছুই নাপাক। এ মতটি উরওয়াহ (রাহি.) থেকে বর্ণিত। এটিই ইমাম শাফেয়ী, আবূ উবাইদ-এর মাযহাব। আর ইমাম আবূ হানীফার মতে অন্তত কুকুরের উচ্ছিষ্টের ক্ষেত্রে এ মত গ্রহণযোগ্য।”(আল-মুগনী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৬৪)
.
ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির আলেমগন বলেন:الكلب نجس كله روثه وعرقه ولعابه، ويجب غسل ما لوثه من إناء وغيره بالماء حتى يطهر، أما اللعاب خاصة؛ فيجب غسل ما أصابه سبع مرات بالماء، إحداهن بالتراب، أو ما يقوم مقامه من المنظفات كالصابون وغيره؛ لقول النبي صلى الله عليه وسلم: طهور إناء أحدكم إذا ولغ فيه الكلب أن يغسله سبع مرات أولاهن بالتراب خرجه مسلم في (صحيحه)“কুকুর সম্পূর্ণই নাপাক। তার মল, ঘাম ও লালা—সবই নাপাক। যে পাত্র বা অন্য কোনো বস্তু কুকুর নাপাক করেছে, তা পানি দিয়ে ধুয়ে পবিত্র করতে হবে। তবে বিশেষভাবে লালার ক্ষেত্রে সাতবার ধোয়া আবশ্যক। এর একটি ধোয়া মাটি দিয়ে বা মাটির বিকল্প কোনো পরিষ্কারকারী পদার্থ, যেমন সাবান ইত্যাদি দিয়ে হতে হবে। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ‘তোমাদের কারো পাত্রে কুকুর মুখ দিলে, তার পবিত্রতা হলো সেটিকে সাতবার ধোয়া; প্রথমবার মাটি দিয়ে।’” — ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ (৪/১৯৭)
.
◽দ্বিতীয় মত: কুকুর সত্তাগতভাবে পবিত্র। এমনকি তার লালাও সাধারণভাবে পবিত্র; তাই তা নাপাক বলে গণ্য হবে না। এটি মালেকি মাযহাবের মত।ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ)-এর প্রসিদ্ধ মত হলো: “কুকুরের লালা নাপাক নয়। তবে যে পাত্রে কুকুর মুখ দেয়, সেটি সাতবার ধোয়া হবে—এটি কেবল ইবাদতস্বরূপ (তাআব্বুদী বিধান)।” ইবনু আবদুল বার (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: واختلف الفقهاء أيضا في سؤر الكلب وما ولغ فيه من الماء والطعام .فجملة ما ذهب إليه مالك واستقر عليه مذهبه عند أصحابه: أن سؤر الكلب طاهر، ويغسل الإناء من ولوغه سبعا ؛ تعبدا “ফকীহগণ কুকুরের উচ্ছিষ্ট এবং কুকুর মুখ দেওয়া পানি ও খাদ্য সম্পর্কে মতভেদ করেছেন। ইমাম মালিকের যে মতের ওপর তাঁর অনুসারীরা স্থির হয়েছেন, তা হলো—কুকুরের উচ্ছিষ্ট পবিত্র। তবে কুকুর মুখ দিলে পাত্র সাতবার ধুতে হবে, ইবাদতস্বরূপ।”—আত-তামহীদ: ১৮/২৬৯) কুকুরের লালা পবিত্র—এই মতকে ইমাম ইবনুল মুনযির ও ইমাম বুখারী (রহিমাহুমাল্লাহ) সমর্থন করেছেন। তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল:আল্লাহ তাআলা শিকারি কুকুর যে শিকার ধরে আনে তা খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন, কিন্তু সেই শিকার ধুয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেননি। আল্লাহ তাআলা বলেন:﴿فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ وَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهِ﴾ “অতএব শিকারি কুকুর তোমাদের জন্য যা ধরে রাখে, তা থেকে খাও এবং তাতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর।”—(সূরা আল-মায়িদাহ: ৪)
.
ইবনু রুশদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:فذهب مالك في الأمر بإراقة سؤر الكلب وغسل الإناء منه، إلى أن ذلك عبادة غير معللة، وأن الماء الذي يلغ فيه ليس بنجس، ولم ير إراقة ما عدا الماء من الأشياء التي يلغ فيها الكلب في المشهور عنه، وذلك كما قلنا لمعارضة ذلك القياس له .ولأنه ظن أيضا أنه إن فهم منه أن الكلب نجس العين عارضه ظاهر الكتاب، وهو قوله تعالى: ( فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ ) : يريد أنه لو كان نجس العين ، لنجس الصيد بمماسته “ইমাম মালিক কুকুরের উচ্ছিষ্ট ফেলে দেওয়া এবং পাত্র ধোয়ার নির্দেশকে এমন একটি ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যার কোনো নির্দিষ্ট কারণ (ইল্লত) বর্ণিত হয়নি। তাই তাঁর মতে কুকুর মুখ দেওয়া পানি নাপাক নয়। প্রসিদ্ধ মতে, কুকুর মুখ দেওয়া অন্যান্য খাদ্যও ফেলে দিতে হবে—এ কথাও তিনি বলেননি। কারণ কিয়াস এ মতের বিরোধিতা করে। আর তাঁর ধারণা ছিল, যদি এ হাদীস থেকে কুকুরের সত্তা নাপাক হওয়া বোঝা যায়, তবে তা কুরআনের ظاهر (বাহ্যিক অর্থ)-এর বিরোধী হবে। কেননা আল্লাহ বলেন: ﴿فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ﴾ অর্থাৎ, যদি কুকুরের সত্তাই নাপাক হতো, তবে তার স্পর্শে শিকারও নাপাক হয়ে যেত।”(বিদায়াতুল মুজতাহিদ (১/৮৩–৮৪)
.
◽তৃতীয় মত: কুকুরের দেহ ও পশম পবিত্র; তবে তার লালা নাপাক। এটি ইমাম আবু হানীফা (রহিমাহুল্লাহ)-এর মাযহাব এবং ইমাম আহমদ (রহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণিত দুই মতের অপর একটি। বহু মুহাক্কিক আলেমের মতে, এ মতটিই অধিক বিশুদ্ধ ও প্রাধান্যযোগ্য। এই মতের পক্ষে ও আলেমগন দলিল হিসেবে একই হাদিস উল্লেখ করেছেন। যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের কারো পাত্রে যদি কুকুর মুখ দেয় (চেটে খায়), তবে এর পবিত্রতা হল: সাতবার ধোয়া; প্রথমবার মাটি দিয়ে।”[হাদীসটি মুসলিম (২৭৯) বর্ণনা করেছেন]
.
উপরোক্ত হাদীসের আলোকে কিছু আলেম বলেছেন:أن الحديث يدل على نجاسة لعابه وريقه وفمه فقط ، وأما بقية بدنه فيبقى على الأصل وهو الطهارة ، وهو مذهب الحنفية ، واختاره شيخ الإسلام ابن تيمية . ينظر: “এ হাদীস কেবল তার লালা, থুতু ও মুখ নাপাক হওয়ার প্রমাণ করে। আর কুকুরের শরীরের বাকি অংশ মূল বিধানের উপর বলবৎ থাকবে। আর তা হলো পবিত্র হওয়া। এটি হানাফী মাযহাবের মত। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এ মতটি গ্রহণ করেছেন।[দেখুন: মাজমূউল ফাতাওয়া: (২১/৫৩০)] ইবনে দাকিকিল ঈদ রাহিমাহুল্লাহ স্পষ্ট করে বলেছেন:بأن الحكم على جميع بدن الكلب بالنجاسة أنه اجتهاد من العلماء وليس نصًّا عن النبي صلى الله عليه وسلم فقال : ” فتبين بهذا أن الحديث إنما دل على النجاسة فيما يتعلق بالفم ، وأن نجاسة بقية البدن بطريق الاستنباط”কুকুরের পুরো দেহকে নাপাক বলা আলেমদের ইজতিহাদ; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সরাসরি বক্তব্য নয়।তিনি বলেন: “এতে স্পষ্ট হলো যে, হাদীসটি কেবল মুখের সাথে সম্পৃক্ত কিছু নাপাক হওয়া প্রমাণ করে। আর দেহের বাকি অংশ নাপাক হওয়া দলিল থেকে উদ্ভাবিত (ইস্তিনবাতকৃত)।”[ইহকামুল আহকাম: (পৃ. ২৪) থেকে সমাপ্ত]
.
প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত তিনটি মতের মধ্যে অধিক শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য মত হলো—কুকুর সত্তাগতভাবে পবিত্র; তবে তার লালা অপবিত্র (নাজিস)। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সহীহ হাদীস সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছে, আর আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাও কুকুরের লালায় ক্ষতিকর জীবাণুর উপস্থিতির বিষয়টি সমর্থন করে। তাই কোনো কুকুর যদি কোনো পাত্রে মুখ দেয় বা তা থেকে পান করে, এরপর সেই পাত্র ব্যবহার করতে চাইলে প্রথমে পাত্রের ভেতরের পানি ফেলে দিতে হবে। অতঃপর পাত্রটি সাতবার পানি দিয়ে ধুতে হবে, যার একবার হবে মাটি দিয়ে ভালোভাবে ঘষে। তবে পাত্রটি যদি কুকুরের নিজস্ব ব্যবহারের জন্যই নির্ধারিত থাকে, তাহলে তা ধোয়া আবশ্যক নয়। পাত্র পবিত্র করার ক্ষেত্রে মাটি ব্যবহার করাই শরীয়তের নির্দেশ; মাটি সহজলভ্য থাকলে অন্য কোনো বস্তু তার বিকল্প হতে পারে না। তবে যদি মাটি পাওয়া একেবারেই সম্ভব না হয়, তাহলে প্রয়োজনের কারণে সাবান বা অন্য কোনো পরিচ্ছন্নকারী পদার্থ ব্যবহার করা যেতে পারে।অন্যদিকে, যেহেতু কুকুর সত্তাগতভাবে নাপাক নয়, তাই শুধু কুকুর স্পর্শ করা বা কুকুরের শরীরের স্পর্শ কাপড় বা শরীরে লাগার কারণে-বিশেষ করে কুকুরের শরীর শুষ্ক থাকলে এবং তার গায়ে কোনো বাহ্যিক নাপাকি না থাকলে-শরীর বা কাপড়কে বিশেষ কোনো পদ্ধতিতে, যেমন মাটি বা সাতবার পানি দিয়ে ধোয়ার প্রয়োজন নেই। তবে কুকুরের লালা শরীর, কাপড় বা পাত্রে লাগলে শরীয়তে বর্ণিত বিধান অনুযায়ী তা পবিত্র করতে হবে,আর শুধু স্পর্শের কারণে অতিরিক্ত কঠোরতা বা অযথা সন্দেহে পতিত হওয়া উচিত নয়।
.
কুকুর সংক্রান্ত বিষয়ে আলেমদের মতভেদ করে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন:وأما الكلب فقد تنازع العلماء فيه على ثلاثة أقوال: أحدها: أنَّه طاهرٌ حتى ريقه، وهذا هو مذهب مالك. والثانـي: نجس حتى شعره، وهذا هو مذهب الشافعي، وإحدى الروايتين عن أحمد. والثالث: شعره طاهـر، وريقه نجسٌ، وهذا هو مذهب أبي حنيفة وأحمد في إحدى الروايتين عنه. وهذا أصحُّ الأقوال، فإذا أصاب الثوبَ أو البدنَ رطوبةُ شعره لم ينجس بذلك”কুকুরের ব্যাপারে আলেমরা তিনটি মতে বিভক্ত। প্রথম মত হচ্ছে: কুকুর পবিত্র; এমনকি কুকুরের লালাও। এটি মালেকের মাযহাব। দ্বিতীয় মত হচ্ছে: এটি অপবিত্র; এমনকি পশমও। এটি শাফেয়ীর মাযহাব এবং ইমাম আহমদের বর্ণনাদ্বয়ের একটি। তৃতীয় মত হচ্ছে: এর পশম পবিত্র; লালা অপবিত্র। এটি ইমাম আবু হানীফা ও আহমাদের অন্য বর্ণনা। এই মতটি বিশুদ্ধতম। তাই যদি কোনো পোশাকে বা কাপড়ে কুকুরের পশমের সিক্ততা স্পর্শ করে তাতে সেটি অপবিত্র হয়ে যায় না।’[মাজমুউল ফাতাওয়া (২১/৫৩০)]
.
অন্য স্থানে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়ার (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন: “কেননা বস্তুর মূল অবস্থা হচ্ছে পবিত্রতা। সুতরাং কোনো দলীল ছাড়া কোনো কিছুকে অপবিত্র বা হারাম বলা জায়েয নেই। কেননা আল্লাহ তা’আলা বলেন:وَقَدْ فَصَّلَ لَكُمْ مَا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلاَّ مَا اضْطُّرِرْتُم إِلَيْهِ“আল্লাহ তোমাদের জন্য যা যা হারাম করেছেন বিস্তারিতভাবে সেগুলোর বিবরণ দিয়েছেন; অবশ্য নিরুপায় হয়ে তোমরা কিছু খেতে বাধ্য হলে তার কথা আলাদা।”[সূরা আন’আম: ১১৯] তিনি আরো বলেন:وَمَا كَانَ اللهُ لِيُضِلَّ قَوْماً بَعْدَ إِذْ هَدَاهُم حَتَّى يُبَيِّنَ لَهُم مَا يَتَّقُونَ“কোনো সম্প্রদায়কে পথ দেখানোর পর তারা কি কি পরিহার করবে তা স্পষ্টভাবে বলে না দেওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তাদেরকে বিপথগামী করেন না। আল্লাহ সবকিছু ভালোভাবে জানেন।”[সূরা তাওবাহ: ১১৫] বিষয়টি যেহেতু এমন তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “কুকুর কোন পাত্রে পান করলে সেই পাত্রকে পবিত্র করতে হলে সেটাকে সাতবার ধৌত করতে হবে। এর মধ্যে প্রথমবার মাটি দিয়ে (মাজতে হবে)।” অন্য হাদীসে বলেছেন: “যদি কুকুর পান করে…” এ সংক্রান্ত সমস্ত হাদীসে কেবল ولوغ (জিহ্বা দিয়ে পান করা)-এর কথা বলা হয়েছে; বাকি কোনো অঙ্গের কথা উল্লেখ করা হয়নি। সুতরাং অন্যান্য অঙ্গকে নাপাক বলার ভিত্তি হচ্ছে কিয়াস।অধিকন্তু, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিকারের কুকুর এবং গবাদিপশু ও শস্যক্ষেত পাহারার কুকুর প্রতিপালনে ছাড় দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এ ধরণের কুকুর পালে নিঃসন্দেহে তার শরীরে কুকুরের পশমের সিক্ততা লেগে যায়; যেমনিভাবে খচ্চর, গাধা বা অন্যান্য প্রাণীর সিক্ততা লাগে। তাই কুকুরের পশম নাপাক বলার মত এমন সংকীর্ণ পরিস্থিতি থেকে এ উম্মাহকে মুক্ত রাখা হয়েছে।’[মাজমুউল ফাতাওয়া (২১/২১৭, ২১৯)]
.
◾কুকুর স্পর্শ করা বা তার লালা ওযু ভঙ্গ করে? আর কুকুরের লালা কাপড়ে বা শরীরে লাগলে পবিত্রতা অর্জনের উপায় কি?
.
কুকুর স্পর্শ করা বা তার লালা ওযু ভঙ্গ করে না। কারণ ওযু বা পবিত্রতা যখন শরয়ী দলিলের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, তখন তা কেবল শরয়ী দলিল দ্বারাই বাতিল হতে পারে। আর কুকুর স্পর্শ করা বা তার লালা লাগার কারণে ওযু ভঙ্গের সপক্ষে কোনো দলিল নেই; তাই আলেমরা ওযু ভঙ্গের কারণগুলোর মধ্যে এটি উল্লেখ করেননি। ইবন কুদামা আল-মুগনীতে ওযু ভঙ্গের কারণগুলো উল্লেখ করার পর (যেখানে তিনি কুকুর স্পর্শ করা বা তার লালা লাগার কথা উল্লেখ করেননি) বলেন: “এগুলোই পবিত্রতা ভঙ্গের সমস্ত কারণ এবং সাধারণ আলেমদের মতে এর বাইরে অন্য কিছু দ্বারা তা ভঙ্গ হয় না।” (ইবন কুদামা আল-মুগনী (১/২৬৪)
.
তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, কুকুরের লালা নাপাক ও অপবিত্র। শুধু তাই নয়, এর নাপাকি অত্যন্ত কঠোর ও তীব্র। তাই কুকুরের লালা শরীর, পোশাক বা কোনো পাত্রে লাগলে সাধারণভাবে ধুয়ে ফেলাই যথেষ্ট নয়; বরং শরীয়ত নির্ধারিত পদ্ধতিতে তা সাতবার ধৌত করা আবশ্যক, যার একটি ধৌত মাটি দিয়ে হতে হবে। বর্তমান যুগে মাটির পরিবর্তে মাটির উপাদানসমৃদ্ধ বা মাটির সমতুল্য পরিষ্কারকারী দ্রব্য ব্যবহারেরও অবকাশ রয়েছে বলে একদল আলেম মত প্রকাশ করেছেন। অতএব, কুকুরের লালা লাগা স্থানটি শরয়ি বিধান অনুযায়ী সাতবার ভালোভাবে ধুয়ে পবিত্র করতে হবে, যার একটি ধৌত অবশ্যই মাটি বা তার শরয়ি বিকল্প দ্বারা সম্পন্ন হবে।
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “বড় বড় কিছু প্রতিষ্ঠানের চেকপোস্টে প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করা হয়। কুকুর গাড়ির ভেতরে ঢুকে শুঁকে দেখে এবং কখনো চেটে দেয়। এতে কি গাড়ির সিট বা যেসব জায়গা কুকুর শুঁকেছে বা চেটেছে, সেগুলো নাপাক হয়ে যাবে?”
তিনি উত্তরে বলেন:أما الشم فإنه لا يضر؛ لأنه لا يخرج من الكلب ريق، وأما اللحس فيخرج فيه من الكلب ريق، وإذا أصاب ريق الكلب ثياباً أو شبهها : فإنها تغسل سبع مرات، ولا نقول: إحداها بالتراب؛ لأنه ربما يضر، لكن نقول: يستعمل عن التراب صابوناً أو شبهه من المزيل ويكفي مع الغسلات السبع“শুধু শোঁকার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই; কারণ শোঁকার সময় কুকুরের মুখ থেকে লালা বের হয় না। কিন্তু চাটার ক্ষেত্রে কুকুরের লালা বের হয়। সুতরাং কুকুরের লালা যদি কোনো কাপড় বা এ জাতীয় বস্তুর ওপর লাগে, তাহলে তা সাতবার ধুতে হবে। তবে আমরা বলি না যে, সাতবারের একবার অবশ্যই মাটি দিয়ে ধুতে হবে; কারণ এতে (উক্ত বস্তুটির) ক্ষতি হতে পারে। বরং মাটির পরিবর্তে সাবান বা অনুরূপ কোনো পরিষ্কারকারী পদার্থ ব্যবহার করা হবে। আর সাতবার ধুয়ে নিলেই যথেষ্ট।”(ইবনু উসামীন লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-৪৯/৮)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “কুকুরের লালা যদি মানুষের শরীরে বা কাপড়ে লাগে, তবে তার বিধান কী? আর সেই কাপড় যদি অন্য কাপড়ের সঙ্গে একই ওয়াশিং মেশিনে, একই পানিতে ধোয়া হয়, তবে সেই কাপড়গুলোর হুকুম কী?” তারা উত্তরে বলেন: لعاب الكلب نجس ، يجب غسل ما أصابه من إناء أو ثوب لقوله صلى الله عليه وسلم : (طَهُورُ إِنَاءِ أَحَدِكُمْ إِذَا وَلَغَ فِيهِ الْكَلْبُ أَنْ يَغْسِلَهُ سَبْعَ مَرَّاتٍ أُولَاهُنَّ بِالتُّرَابِ) .والثياب إذا ألقيت في الماء الطهور وغسلت حتى زال أثر النجاسة عنها طهرت جميعا من نجاسة الكلب وغيره ، بشرط أن يتكرر غسلها من نجاسة الكلب سبع مرات ، تكون أولاهن بالتراب أو ما يقوم مقامه كالصابون والأشنان“কুকুরের লালা নাপাক। যে পাত্র বা কাপড়ে তা লাগে, তা ধোয়া আবশ্যক। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ‘তোমাদের কারো পাত্রে কুকুর মুখ দিলে, তার পবিত্র করার পদ্ধতি হলো—তা সাতবার ধোয়া; যার প্রথমবারটি মাটি দিয়ে।”(সহীহ মুসলিম) আর কাপড় যদি পবিত্র পানিতে ধোয়া হয় এবং এমনভাবে ধোয়া হয় যে, তা থেকে নাপাকির সমস্ত চিহ্ন দূর হয়ে যায়, তাহলে তা কুকুরের নাপাকি এবং অন্যান্য সব নাপাকি থেকেই পবিত্র হয়ে যাবে। তবে শর্ত হলো, কুকুরের নাপাকির ক্ষেত্রে কাপড়টি সাতবার ধোয়া হবে; যার প্রথমবারটি মাটি দিয়ে অথবা মাটির বিকল্প কোনো পরিষ্কারকারী বস্তু—যেমন সাবান বা উশনান (পরিষ্কারক উদ্ভিদ)—দিয়ে হবে।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; গ্রুপ: ২; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১৯৬)
.
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে, কুকুর সত্তাগতভাবে নাপাক কি না—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে তিনটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে: (১) কুকুর সম্পূর্ণরূপে নাপাক, (২) কুকুর ও তার লালা উভয়ই পবিত্র, এবং (৩) কুকুরের দেহ ও পশম পবিত্র; তবে তার লালা নাপাক। দলিল-প্রমাণের গভীর পর্যালোচনায় বহু মুহাক্কিক আলেম—যেমন শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ)—তৃতীয় মতটিকেই অধিক শক্তিশালী ও প্রাধান্যযোগ্য বলে গ্রহণ করেছেন। এ মতানুযায়ী, কুকুরের শরীর বা পশম স্পর্শ করলে—বিশেষত তা শুষ্ক অবস্থায় হলে—মানুষের শরীর বা পোশাক নাপাক হয় না। তবে কুকুরের লালা শরীর, পোশাক বা কোনো পাত্রে লাগলে, শরীয়ত নির্দেশিত পদ্ধতিতে তা সাতবার ধৌত করতে হবে; যার একবার হবে মাটি দ্বারা (অথবা প্রয়োজনে মাটির সমতুল্য পরিচ্ছন্নকারী কোনো বস্তু দ্বারা)। এছাড়া কুকুর স্পর্শ করা বা তার লালা লাগার কারণে ওযু ভঙ্গ হয় না। অতএব, এ বিষয়ে অযথা কঠোরতা, বাড়াবাড়ি বা অমূলক সন্দেহে না পড়ে, সহীহ সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী কেবল কুকুরের লালার নাপাকির বিধান যথাযথভাবে পালন করাই একজন মুসলিমের কর্তব্য।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: