প্রশ্ন: কোনো ব্যক্তিকে মানুষের সামনে মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা কি অন্যায়? এটা কি তাকে অপমান করা, লজ্জিত করা বা তার দোষ প্রকাশ করার অন্তর্ভুক্ত? নাকি তাকে একান্তে নিষেধ করা ও উপদেশ দেওয়া জরুরি?
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর উপদেশ হচ্ছে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি আলামত। এটি পূর্ণ ঈমান ও পরিপূর্ণ ইহসান শ্রেণীর গুণ। কারণ কোন মুসলিম ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজের জন্য যা ভালবাসে তার মুসলিম ভাই-এর জন্যেও তা ভালবাসে। এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজের জন্য যা অপছন্দ করে তার মুসলিম ভাই-এর জন্যেও তা অপছন্দ করে। আর এটাই হচ্ছে- উপদেশ দেয়ার প্রেরণা। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম -এ জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে যে, তিনি বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে এই মর্মে বাইয়াত করলাম যে, নামায আদায় করব, যাকাত প্রদান করব এবং প্রত্যেক মুসলিমের কল্যাণ কামনা করব।”(বুখারী হা/৫৭ ও সহিহ মুসলিম হা/৫৬) এবং সহিহ মুসলিমে তামিম আদ-দারি (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “দ্বীন হচ্ছে- নাসীহা (উপদেশ, কল্যাণ কামনা)। আমরা বললাম: কার জন্য? তিনি বললেন: আল্লাহ্র জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, মুসলিম নেতৃবর্গের জন্য এবং সাধারণ মুসলমানদের জন্য।”(মুসলিম হা/৫৫) হাদিসের ব্যাখায় ইবনুল আছির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: সাধারণ মুসলমানদের জন্য নসীহত হচ্ছে- তাদেরকে নিজেদের কল্যাণের দিক-নির্দেশনা দেয়া।[আন-নিহায়া (৫/১৪২) থেকে সমাপ্ত]
.
দ্বিতীয়ত: ইসলামের মৌলিক নীতি হলো—কোনো মুসলিমের ভুল সংশোধনের উদ্দেশ্যে তাকে গোপনে একান্তে, আন্তরিকতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে নসিহত করাই সুন্নাহসম্মত এবং অধিক কল্যাণকর পদ্ধতি। তাই শরীয়তসম্মত কোনো সুস্পষ্ট ও বৃহত্তর স্বার্থ বা প্রয়োজন ব্যতীত জনসমক্ষে কাউকে নসিহত বা ভর্ত্সনা করা উচিত নয়। কেননা, প্রকাশ্যে নসিহত অনেক সময় ব্যক্তির সম্মানহানি ও বিব্রতবোধের কারণ হয়, ফলে সে উপদেশ গ্রহণের পরিবর্তে আত্মসম্মানে আঘাত পেয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তাই সাধারণ অবস্থায় ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষা করে নির্জনে নসিহত করাই ইসলামের শিক্ষা এবং নসিহতের উদ্দেশ্য সফল হওয়ার জন্য এটিই সর্বাধিক হিকমতপূর্ণ ও ফলপ্রসূ পন্থা।
.
শাইখুল ইসলাম নাসিরুল হাদীস ফাক্বীহুল মিল্লাত ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইদরীস আশ-শাফি‘ঈ আল-মাক্কী (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৫০ হি: মৃত: ২০৪ হি.]-এর দিওয়ানে তথা কবিতা সংকলনে এসেছে:تَعَمَّدني بِنُصحِكَ في اِنفِرادي *** وَجَنِّبني النَصيحَةَ في الجَماعَه,فَإِنَّ النُصحَ بَينَ الناسِ نَوعٌ *** مِنَ التَوبيخِ لا أَرضى اِستِماعَه,وَإِن خالَفتَني وَعَصِيتَ قَولي *** فَلا تَجزَع إِذا لَم تُعطَ طاعَه”আমাকে একান্ত গোপনে তোমার উপদেশে ধন্য করো এবং জনসমক্ষে উপদেশ দেওয়া থেকে দূরে থেকো। কেননা, মানুষের সামনে উপদেশ দেওয়া হলো এক প্রকার তিরস্কার যা শোনা আমি পছন্দ করি না।আর যদি তুমি আমার মতের বিরোধিতা করো এবং আমার কথা অমান্য করো,তাহলে আমার আনুগত্য না পেলে কোনো হতাশা প্রকাশ কোরো না।”
.
ইবনু রজব আল-হাম্বালী আল-বাগদাদী (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ৭৩৬ হি.মৃত:৭৯৫ হি:] বলেছেন, ” كان السَّلفُ إذا أرادوا نصيحةَ أحدٍ، وعظوه سراً، حتّى قال بعضهم: مَنْ وعظ أخاه فيما بينه وبينَه فهي نصيحة، ومن وعظه على رؤوس الناس فإنَّما وبخه.وقال الفضيل: المؤمن يَسْتُرُ ويَنْصَحُ، والفاجرُ يهتك ويُعيِّرُ”সলফে সালেহীন যখন কাউকে উপদেশ দিতে চাইতেন তখন তারা তাকে গোপনে সদুপদেশ দিতেন। এমনকি তাদের কেউ কেউ বলেছেন: যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইকে একান্তে উপদেশ দিয়েছে সেটাই নসীহা। আর যে ব্যক্তি মানুষের সামনে সদুপদেশ দিয়েছে সে তাকে ভর্ৎসনা করেছে। ফুযাইল (রহঃ) বলেন: ঈমানদার লোক দোষ গোপন রাখে ও উপদেশ দেয়। আর পাপী লোক বেইজ্জত করে ও ভর্ৎসনা করে।[জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৩৬ থেকে সমাপ্ত]
.
ইবনু হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:إِذا نصحت فانصح سرا لَا جَهرا، وبتعريض لَا تَصْرِيح، إِلَّا أَن لَا يفهم المنصوح تعريضك، فَلَا بُد من التَّصْرِيح…. فَإِن تعديت هَذِه الْوُجُوه فَأَنت ظَالِم لَا نَاصح”যদি তুমি উপদেশ দিতে চাও তাহলে গোপনে দাও; প্রকাশ্যে নয়। ইঙ্গিতে দাও, সরাসরি নয়। যদি সে তোমার ইঙ্গিত না বুঝে তাহলে সরাসরি উপদেশ দেয়া ছাড়া উপায় নেই…। যদি তুমি এ দিকগুলো এড়িয়ে যাও (অর্থাৎ প্রকাশ্যে অপমান করো বা কঠোরতা অবলম্বন করো) তাহলে তুমি জালিম; তুমি হিতৈষী নও।[আল-আখলাক ওয়াস সিয়ার; পৃষ্ঠা-৪৫) থেকে সমাপ্ত]
.
তবে, প্রকাশ্যে উপদেশ দানের মধ্যে যদি কোন অগ্রগণ্য কল্যাণ থাকে তাহলে প্রকাশ্যে উপদেশ দিতে কোন আপত্তি নেই। উদাহরণত যে ব্যক্তি কোন আকিদার মাসয়ালায় জনসম্মুখে ভুল করেছে; যাতে করে তার কথা দ্বারা মানুষ বিভ্রান্ত না হয় এবং তার ভুলের অনুসরণ না করে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি সুদকে জায়েয বলে প্রকাশ্যে তার প্রত্যুত্তর দেয়া। কিংবা যে ব্যক্তি মানুষের মাঝে বিদআত ও পাপকর্মের প্রসার ঘটায়। এ ধরণের লোককে প্রকাশ্যে উপদেশ দেয়া শরিয়তসম্মত। বরং কখনও কখনও অগ্রগণ্য কল্যাণ হাছিল ও প্রবল সম্ভাবনাময় ক্ষতি প্রতিরোধার্থে ওয়াজিব।
.
ইমাম ইবনু রজব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:إن كان مقصوده مجرد تبيين الحق، ولئلا يغتر الناس بمقالات من أخطأ في مقالاته: فلا ريب أنه مثاب على قصده، ودخل بفعله هذا بهذه النية في النصح لله ورسوله وأئمة المسلمين وعامتهم”যদি তার উদ্দেশ্য শুধু সত্যকে স্পষ্ট করা হয় এবং যাতে মানুষ ভুল মত পোষণকারী ব্যক্তির কথার দ্বারা প্রতারিত না হয়, তাহলে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সে তার এই সৎ উদ্দেশ্যের কারণে সওয়াবপ্রাপ্ত হবে।আর এই নিয়তের মাধ্যমে তার এই কাজ আল্লাহর জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, মুসলিমদের নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মুসলিমদের প্রতি কল্যাণকামিতা (নসীহত) করার অন্তর্ভুক্ত হবে।”(আল-ফারকু বাইনান নাসিহা ওয়াত তা’য়ীর’ (উপদেশ ও ভর্ৎসনা এর মধ্যে পার্থক্য; পৃষ্ঠা: ৭)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
وإذا كان الإنسان من طبيعته التقصير والنقص والعيب؛ فإن الواجب على المسلم نحو أخيه أن يستر عورته ولا يشيعها إلا من ضرورة. فإذا دعت الضرورة إلى ذلك فلابد منه، لكن بدون ضرورة فالأولى والأفضل أن يستر عورة أخيه؛ لأن الإنسان بشر ربما يخطئ عن شهوة ـ يعني عن إرادة سيئة ـ أو عن شبهة، حيث يشتبه عليه الحق فيقول بالباطل أو يعمل به، والمؤمن مأمور بأن يستر عورة أخيه.هب أنك رأيت رجلاً على كذب وغش في البيع والشراء؛ فلا تفش ذلك بين الناس؛ بل أنصحه واستر عليه، فإن توفق واهتدى وترك ما هو عليه؛ كان ذلك هو المراد، وإلا وجب عليك أن تبين أمره للناس؛ لئلا يغتروا به.وهب أنك وجدت إنساناً مبتلى بالنظر إلى النساء، ولا يغض بصره، فاستر عليه، وانصحه وبين له أن هذا سهم من سهام إبليس؛ لأن النظر – والعياذ بالله – سهم من سهام إبليس يصيب به قلب العبد، فإن كان عنده مناعة، اعتصم بالله من هذا السهم الذي ألقاه الشيطان في قلبه، وإن لم يكن عنده مناعة؛ أصابه السهم، وتدرج به إلى أن يصل إلى الفحشاء والمنكر والعياذ بالله يكون أشد عذاباً.فما دام الستر ممكناً، ولم يكن في الكشف عن عورة أخيك مصلحة راجحة أو ضرورة ملحة، فاستر عليه
ولا تفضحه”
“যেহেতু মানুষের প্রকৃতিগত স্বভাবই হলো ভুল-ত্রুটি, অপূর্ণতা ও দোষে পরিপূর্ণ, তাই একজন মুসলিমের ওপর তার মুসলিম ভাইয়ের ব্যাপারে কর্তব্য হলো তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা এবং কোনো প্রয়োজন ছাড়া তা মানুষের মধ্যে প্রচার না করা। তবে যদি এমন প্রয়োজন দেখা দেয় যে তা প্রকাশ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে, তাহলে তা প্রকাশ করতেই হবে। কিন্তু কোনো প্রয়োজন না থাকলে তার দোষ গোপন রাখাই অধিক উত্তম ও শ্রেয়। কারণ মানুষ তো মানুষই; সে কখনো প্রবৃত্তির তাড়নায় (অর্থাৎ খারাপ ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে) ভুল করে, আবার কখনো সত্য বিষয়টি তার কাছে অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে বাতিল কথা বলে বা বাতিল কাজ করে। অথচ একজন মুমিনকে তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।ধরা যাক, আপনি একজন লোককে কেনাবেচায় মিথ্যা বলা ও প্রতারণা করতে দেখলেন। তখন তার বিষয়টি মানুষের মধ্যে প্রচার করবেন না; বরং তাকে উপদেশ দিন এবং তার দোষ গোপন রাখুন। অতঃপর যদি আল্লাহ তাকে তাওফীক দেন, সে হিদায়াতপ্রাপ্ত হয় এবং তার সেই কাজ পরিত্যাগ করে, তবে সেটাই তো উদ্দেশ্য। কিন্তু যদি সে তা পরিত্যাগ না করে, তখন মানুষের কাছে তার অবস্থা স্পষ্ট করে দেওয়া আপনার জন্য অপরিহার্য হবে, যাতে মানুষ তার দ্বারা প্রতারিত না হয়।আবার ধরা যাক, আপনি এমন একজন ব্যক্তিকে পেলেন, যে নারীদের দিকে তাকানোর পরীক্ষায় আক্রান্ত এবং সে তার দৃষ্টি অবনত রাখে না। তখনও তার দোষ গোপন রাখুন এবং তাকে উপদেশ দিন। তাকে বুঝিয়ে বলুন, এটি ইবলিসের নিক্ষিপ্ত তীরসমূহের একটি। কেননা (অবৈধ) দৃষ্টি ইবলিসের তীরসমূহের একটি, যার দ্বারা সে বান্দার অন্তরে আঘাত হানে। যদি তার অন্তরে প্রতিরোধশক্তি থাকে, তবে সে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণের মাধ্যমে শয়তানের নিক্ষিপ্ত এ তীর থেকে আত্মরক্ষা করবে। আর যদি তার সেই প্রতিরোধশক্তি না থাকে, তবে সেই তীর তার অন্তরে বিদ্ধ হবে এবং ধাপে ধাপে তাকে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। তখন তার শাস্তি আরও কঠিন হবে।সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত গোপন রাখা সম্ভব এবং তোমার ভাইয়ের দোষ প্রকাশ করার মধ্যে কোনো বড় কল্যাণ বা জরুরি প্রয়োজন না থাকে, ততক্ষণ তার দোষ গোপন রাখো এবং তাকে লাঞ্ছিত করো না।”(ইবনু উসাইমীন; শারহু রিয়াদিস সালিহিন; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৬)
.
মুনকার বা অন্যায় ছড়িয়ে পড়লে তা প্রতিরোধ করা এবং মানুষের সামনে সত্য স্পষ্ট করা অবশ্যই জরুরি। তবে এ উদ্দেশ্যে পাপী ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা আবশ্যক নয়। বরং তার পরিচয় গোপন রেখে বিষয়টি তুলে ধরা অধিকতর হিকমতপূর্ণ হতে পারে। কারণ, এতে একদিকে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সতর্কতা প্রদান করা হয়, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সংশোধনের সুযোগও অক্ষুণ্ন থাকে। হতে পারে, গোপনে নসিহত ও দোষ গোপন রাখার ফলে আল্লাহ তাকে তাওফীক দান করবেন, সে তাওবা করে নিজের অবস্থার পরিবর্তন করবে এবং তার অনুসারীরাও এ থেকে শিক্ষা ও উপকার লাভ করবে।
.
এ বিষয়ে ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেছেন;
“وترك ذكر اسم الشخص فيه فائدتان عظيمتان:الفائدة الأولى: الستر على هذا الشخص.
الفائدة الثانية: أن هذا الشخص ربما تتغير حاله؛ فلا يستحق الحكم الذي يحكم عليه في الوقت الحاضر؛ لأن القلوب بيد الله، فمثلاً: هب أنني رأيت رجلاً على فسق، فإذا ذكرت اسمه، فقلت لشخص: لا تكن مثل فلان؛ يسرق أو يزني أو يشرب الخمر، أو ما أشبه ذلك، فربما تتغير حال هذا الرجل، ويستقيم، ويعبد الله، فلا يستحق الحكم الذي ذكرته من قبل، فهذا كان الإبهام في هذه الأمور أولى وأحسن، لما فيه من ستر، ولما فيه من الاحتياط إذا تغيرت حال الشخص”.
“কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করার মধ্যে দুটি মহৎ উপকার রয়েছে:
প্রথম উপকার: ঐ ব্যক্তির ওপর পর্দা রাখা (তার দোষ গোপন রাখা)।
দ্বিতীয় উপকার: ওই ব্যক্তির অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। তখন বর্তমান সময়ে তার ব্যাপারে যে বিধান বা মন্তব্য করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে সে তার আর উপযুক্ত নাও থাকতে পারে। কারণ অন্তরসমূহ আল্লাহর হাতেই রয়েছে।উদাহরণস্বরূপ,আমি যদি কোনো ব্যক্তিকে পাপাচারে লিপ্ত দেখি, অতঃপর তার নাম উল্লেখ করে কাউকে বলি তুমি অমুক ব্যক্তির মতো হয়ো না,সে চুরি করে, ব্যভিচার করে, মদ পান করে ইত্যাদি। পরে যদি ঐ ব্যক্তির অবস্থা পরিবর্তন হয়ে যায়, সে সঠিক পথে ফিরে আসে এবং আল্লাহর ইবাদত করতে থাকে, তাহলে আগে যে অপবাদ বা মন্তব্য করা হয়েছিল, তা তার জন্য আর উপযুক্ত থাকবে না। তাই এ ধরনের বিষয়ে ব্যক্তির নাম গোপন রাখা অধিক উত্তম ও ভালো;কারণ এতে একদিকে তার দোষ গোপন থাকে, অন্যদিকে পরবর্তীতে যদি তার অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যায়, তবে তার সম্পর্কে এমন কথা বলার কারণে অন্যায়ে পতিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেও নিরাপদ থাকা যায়।”(ইবনু উসাইমীন; শারহু রিয়াদিস সালিহিন; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২৪৬)
.
পরিশেষে সারকথা হলো: ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো মুসলিমের ভুল সংশোধনের মূলনীতি হলো—আন্তরিকতা, প্রজ্ঞা ও কোমলতার সঙ্গে তাকে একান্তে নসিহত করা এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে তার দোষ মানুষের সামনে প্রকাশ না করা। এতে তার সম্মান অক্ষুণ্ন থাকে এবং সংশোধনের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। তবে যদি কোনো ব্যক্তি প্রকাশ্যে ভ্রান্ত আকীদা, বিদআত, হারাম কাজ বা মানুষের জন্য ক্ষতিকর বিভ্রান্তি প্রচার করে এবং গোপনে নসিহত করার পরও তা থেকে বিরত না হয়, তাহলে তাকে হেয় বা অপমান করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং সত্যকে সুস্পষ্ট করা, মানুষকে বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করা এবং বৃহত্তর অনিষ্ট প্রতিরোধের স্বার্থে তার ভুল প্রকাশ্যে খণ্ডন ও সতর্ক করা শরীয়তসম্মত; বরং কখনো কখনো তা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। আর যেখানে ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করেও উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব, সেখানে নাম গোপন রাখাই অধিক হিকমতপূর্ণ ও উত্তম। একই সঙ্গে যে ব্যক্তি মানুষকে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন, তার উচিত নিজেও সে আদেশের ওপর আমল করা এবং যে বিষয় থেকে নিষেধ করেন, তা নিজে বর্জন করা। আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলকে এ বিষয়ে তিরস্কার করে বলেন, “তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দাও এবং নিজেদেরকে ভুলে যাও, অথচ তোমরা কিতাব পাঠ কর? তবুও কি তোমরা বুঝো না?” (সূরা আল-বাকারা: ৪৪)। অনুরূপভাবে, যে ব্যক্তি মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দেয় কিন্তু নিজে তা পালন করে না এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে অথচ নিজেই তা করে, তার ব্যাপারে হাদীসে কঠিন সতর্কবাণী এসেছে। অতএব, এ বিষয়ে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো—কাউকে অপমান বা হেয় করা নয়; বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কল্যাণকামিতা, সত্য প্রতিষ্ঠা এবং ফিতনা ও অনিষ্ট প্রতিরোধ করা। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়, ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।