প্রশ্ন: শরীয়তের দৃষ্টিতে নখ, গোঁফ, বগলের লোম ও লজ্জাস্থানের লোম চল্লিশ দিনের বেশি রেখে দেওয়ার বিধান কী? চল্লিশ দিন কি এসব অপসারণের নির্ধারিত সময়, নাকি এটি সর্বোচ্চ সীমা? আর ইচ্ছাকৃতভাবে এ সীমা অতিক্রম করলে একজন মুসলিমের হুকুম কী?
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ওপর অতঃপর, সহীহ হাদীসে প্রমাণিত হয়েছে যে,চল্লিশ দিন পার হওয়ার আগেই নখের পরিচর্যা করা, গুপ্ত অঙ্গের লোম কাটা আবশ্যক। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নখ কাটা, নাভির নীচের পশম কাটা, বগলের পশম উপড়ানো এবং গোঁফ ছাটাই করার সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন: এই মর্মে সহিহ মুসলিমে হা/২৫৮ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদিস সাব্যস্ত হয়েছে। আনাস বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, “وُقِّتَ لَنَا فِي قَصِّ الشَّارِبِ، وَتَقْلِيمِ الْأَظْفَارِ، وَنَتْفِ الْإِبِطِ، وَحَلْقِ الْعَانَةِ، أَنْ لَا نَتْرُكَ أَكْثَرَ مِنْ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً “গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা এবং বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং নাভীর নিচের লোম ছেঁচে ফেলার জন্য আমাদেরকে সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল যে আমরা তা চল্লিশ দিনের অধিক দেরি না করি।”(সহীহ মুসলিম হা/২৫৫) তাই নর-নারী উভয়ের উপর এই বিষয়টি লক্ষ্য রাখা ওয়াজিব যে চল্লিশ দিনের বেশি সময় নখ, গোঁফ, নাভির নীচের পশম ও বগলের পশম রেখে দেওয়া যাবে না।আর এ বিধানের অন্যতম হিকমত হলো পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্য বজায় রাখা।
.
উপরোক্ত হাদিসের ব্যাখায় শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,”معناه: أن لا نترك تركا يتجاوز الأربعين.وقوله: ( وُقِّتَ لَنَا) هو من الأحاديث المرفوعة، مثل قوله: ” أمرنا بكذا “، وقد جاء في غير صحيح مسلم: ( وقت لنا رسول الله صلى الله عليه وسلم )، والله أعلم “এর অর্থ হলো—আমরা যেন এগুলো এমনভাবে অবহেলা করে না রাখি, যার মেয়াদ চল্লিশ রাত অতিক্রম করে যায়। আর তাঁর (আনাস রা.-এর) উক্তি:’আমাদের জন্য সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে’—এই উক্তিটি মারফূ হাদিসের অন্তর্ভুক্ত, যেমন সাহাবিদের এই কথা যে, ‘আমাদের অমুক কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে’। সহিহ মুসলিম ব্যতীত অন্য গ্রন্থে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে: ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের জন্য সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন’, আল্লাহই ভালো জানেন।”(শারহু সহিহ মুসলিম; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৫০)
.
ইবনুল জাওযী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:”وفي الحديث: (وُقِّتَ لَنَا فِي قَصِّ الشَّارِبِ، وَتَقْلِيمِ الْأَظْفَارِ، وَنَتْفِ الْإِبِطِ، وَحَلْقِ الْعَانَةِ، أَنْ لَا نَتْرُكَ أَكْثَرَ مِنْ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً).اعلم أنه متى زاد الزمان على هذا المقدار كثرت الأوساخ، وربما حصل تحت الظفر ما يمنع وصول الماء إليه. ثم إنها تعدم الزينة التي خصت بالأظفار والشارب”আর হাদিসে এসেছে: গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা এবং বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং নাভীর নিচের লোম ছেঁচে ফেলার জন্য আমাদেরকে সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল যে আমরা তা চল্লিশ দিনের অধিক দেরি না করি।” জেনে রাখুন, যখন এর চেয়ে বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়, তখন শরীরে ময়লা-আবর্জনা জমে যায়। এমনকি নখের নিচে এমন কিছু জমে যেতে পারে যা (অজু বা গোসলের সময়) সেখানে পানি পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করে। তাছাড়া এর মাধ্যমে সেই সৌন্দর্যও নষ্ট হয়ে যায় যা নখ ও গোঁফের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে।”(কাশফুল মুশকিল; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩১৩)
.
দ্বিতীয়ত: নখ কাটা এবং বগল ও নাভির নিচের লোম অপসারণে ৪০ রাত হলো সর্বোচ্চ সময়সীমা। এর অর্থ এই নয় যে, সুন্নত হলো ঠিক ৪০ রাত পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারপর এগুলো অপসারণ করা। বরং সঠিক কথা হচ্ছে, যখনই নখ বা গুপ্ত অঙ্গের লোম বড় হয়ে যায় এবং অপসারণের প্রয়োজন দেখা দেয়, তখনই তা কেটে বা পরিষ্কার করে ফেলা সুন্নত ও উত্তম। তাই কোনো অবস্থাতেই ৪০ রাতের বেশি বিলম্ব করা বৈধ নয়। ইবনে হুবাইরা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:هذا الحديث هو الغاية في تأخير ذلك، والأولى أخذ ذلك فيما قبل هذه الغاية “এই হাদীসটি দেরি করার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেছে। আর উত্তম হলো, এই সীমা পূর্ণ হওয়ার আগেই তা অপসারণ করা।”(আল ইফসাহ; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৩৯৬)
.
ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,”وأما وقت حلقه – أي شعر القبل – فالمختار أنه يضبط بالحاجة وطوله، فإذا طال حلق، وكذلك الضبط في قص الشارب، ونتف الإبط، وتقليم الأظفار، وأما حديث أنس المذكور في الكتاب: ( وُقِّتَ لَنَا فِي قَصِّ الشَّارِبِ، وَتَقْلِيمِ الْأَظْفَارِ، وَنَتْفِ الْإِبِطِ، وَحَلْقِ الْعَانَةِ، أَنْ لَا نَتْرُكَ أَكْثَرَ مِنْ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً )، فمعناه: لا يترك تركا يتجاوز به أربعين، لا أنهم وقت لهم الترك أربعين، والله أعلم “
“আর লজ্জাস্থানের লোম কাটার সময়ের ব্যাপারে—নির্বাচিত মত হলো যে, এটি প্রয়োজন এবং এর দৈর্ঘ্যের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে। সুতরাং যখন এগুলো বড় হয়ে যায়, তখন তা কেটে ফেলতে হবে। অনুরূপ নিয়ম প্রযোজ্য গোঁফ ছাঁটা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং নখ কাটার ক্ষেত্রেও।আর কিতাবে বর্ণিত আনাস (রা.)-এর হাদিস: (‘আমাদের জন্য গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং লজ্জাস্থানের লোম কাটার সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে যে, আমরা যেন চল্লিশ রাতের বেশি সময় তা ফেলে না রাখি’)—এর অর্থ হলো: চল্লিশ রাতের বেশি সময় কোনো অবস্থাতেই এগুলো ফেলে রাখা যাবে না। এর অর্থ এই নয় যে, চল্লিশ দিন পর্যন্ত ফেলে রাখতেই হবে বলে সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।ওয়াল্লাহু আ’লাম।”(শারহু সহীহ মুসলিম; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৪৮,১৪৯)
.
তৃতীয়ত: এটিও জানা উচিত যে, হাদীসে ‘চল্লিশ রাত’ বলা হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, লোম কেবল রাতের বেলায় কাটতে হবে বা সময়ের হিসাব শুধু রাতের ভিত্তিতেই হবে। বরং আরবি ভাষার প্রচলিত রীতিতে ‘রাত’ দ্বারা একটি পূর্ণ দিন-রাতের সময়কাল (২৪ ঘণ্টা) বোঝানো হয়। তাই এখানে উদ্দেশ্য হলো—চল্লিশ দিনের বেশি এ কাজ বিলম্বিত না করা।
.
ইমাম ইবনুল জাওযী (রাহিমাহুল্লাহ) আল্লাহ তাআলার বাণী: (وَإِذْ وَاعَدْنَا مُوسَى أَرْبَعِينَ لَيْلَةً ثُمَّ اتَّخَذْتُمُ الْعِجْلَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَنْتُمْ ظَالِمُونَ) البقرة/51. قال رحمه الله تعالى:” وإنما ذكرت الليالي دون الأيام، لأن عادة العرب التأريخ بالليالي، لأن أول الشهر ليلة، واعتماد العرب على الأهلة، فصارت الأيام تبعا لليالي“আর যখন আমি মূসার জন্য চল্লিশ রাতের প্রতিশ্রুতি নির্ধারণ করেছিলাম, তারপর তাঁর (তূর পর্বতে যাওয়ার) পর তোমরা বাছুরকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলে।”(সূরা আল-বাকারা: ৫১) এর ব্যাখ্যায় বলেন: “এখানে দিনের পরিবর্তে শুধু ‘রাত’-এর উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ আরবদের রীতি ছিল রাতকে ভিত্তি করে সময় গণনা ও তারিখ নির্ধারণ করা। কেননা মাসের সূচনা হয় রাত থেকেই, আর তাদের সময় গণনা চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাই দিনগুলোকে রাতের অনুসারী (অন্তর্ভুক্ত) হিসেবে ধরা হতো।”(যাদুল মাসীর: ১/৮০)
.
মোটকথা ‘চল্লিশ রাত’ বলতে শুধু রাতগুলো বোঝানো হয়নি; বরং পূর্ণ চল্লিশ দিন-রাতের সময়কালই উদ্দেশ্য। তাই হাদিসে ‘চল্লিশ রাত’ বলা হলেও এর অর্থ চল্লিশ পূর্ণ দিন-রাত, শুধুমাত্র রাত নয়।এছাড়া আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু).-এর হাদীসের আরেকটি বর্ণনায়, যা নাসাঈ ১৪ নং হাদীসে এসেছে, সেখানে দিন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। অতএব, হিসাব মানুষের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী হবে। আমাদের বর্তমান সময়ে লোম কাটার পর প্রতি ২৪ ঘণ্টা অতিক্রম করলে এক দিন পূর্ণ হয়েছে বলে গণ্য হবে। এভাবে চল্লিশ দিন পূর্ণ হবে।
.
চতুর্থত: এখন চল্লিশ দিনের বেশি সময় নখ এবং লজ্জাস্থানের লোম না কাটার বিধান কী? এ সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। শাফেয়ী মাযহাবের মতে, চল্লিশ দিনের বেশি বিলম্ব করা মাকরূহ। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:” تقليم الأظفار، وإزالة شعر العانة، بحلق، أو نتف، أو قص، أو نورة، أو غيرها، والحلق أفضل. ويستحب إزالة شعر الإبط بأحد هذه الأمور، والنتف أفضل لمن قوي عليه. ويستحب قص الشارب، بحيث يبين طرف الشفة بيانا ظاهرا. ويبدأ في هذه كلها، باليمين، ولا يؤخرها عن وقت الحاجة، ويكره كراهة شديدة، تأخيرها عن أربعين يوما، للحديث في “صحيح مسلم” بالنهي عن ذلك “নখ কাটা এবং নাভির নিচের লোম অপসারণ করা—কামিয়ে, উপড়ে, কেটে, নাউরা (লোম অপসারণের বিশেষ মিশ্রণ) ব্যবহার করে অথবা অন্য যেকোনো উপায়ে করা যায়; তবে কামিয়ে ফেলা উত্তম। অনুরূপভাবে, এসব উপায়ের যেকোনো একটির মাধ্যমে বগলের লোম অপসারণ করা মুস্তাহাব; তবে যার পক্ষে সম্ভব ও কষ্টসহনীয়, তার জন্য উপড়ে ফেলা উত্তম। আর গোঁফ এমনভাবে ছাঁটা মুস্তাহাব, যাতে ঠোঁটের কিনারা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। এসব কাজ ডান দিক থেকে শুরু করা মুস্তাহাব। প্রয়োজনের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর এগুলো বিলম্বিত করা উচিত নয়। আর চল্লিশ দিনের বেশি বিলম্ব করা অত্যন্ত মাকরূহ। কেননা, সহীহ মুসলিমে এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা-সংবলিত হাদিস বর্ণিত হয়েছে।”(নববী; রাওযাতুত ত্ব-তালিবীন: ৩/২৩৪)
.
হাম্বলী মাযহাবেও একই মত পাওয়া যায়।মাতালিবু উলিন নুহা গ্রন্থে বলা হয়েছে: فإن تركه فوق أربعين يوما: كره ، لحديث أنس قال: ( وقت لنا في قص الشارب وتقليم الأظفار ونتف الإبط وحلق العانة؛ أن لا يترك فوق أربعين ) رواه مسلم “যদি কেউ এগুলো (গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং নাভির নিচের লোম অপসারণ) চল্লিশ দিনের বেশি সময় পর্যন্ত ফেলে রাখে, তবে তা মাকরূহ। কারণ আনাস (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন: ‘আমাদের জন্য গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং নাভির নিচের লোম কামানোর ব্যাপারে সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে—যাতে আমরা এগুলো চল্লিশ দিনের বেশি ফেলে না রাখি।” (সহীহ মুসলিম; মাতালিবু উলিন নুহা; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৮৭)
.
অন্যদিকে, হানাফী মাযহাব এবং অন্যান্য কিছু সংখ্যক আলেমের মতে, হাদীসে উল্লেখিত এসব বিষয় চল্লিশ দিনের বেশি ফেলে রাখা হারাম।ইবনু আবেদীন (রাহিমাহুল্লাহ) হাশিয়াতু ইবনু আবেদীন -এ বলেন:قال في “شرح المنية”: وفي “المضمرات” عن ابن المبارك في تقليم الأظفار وحلق الرأس في العشر، أي عشر ذي الحجة، قال: لا تؤخَّر السُّنَّة، وقد ورد ذلك، ولا يجب التأخير اهـ.”শারহুল মুনইয়াহ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, আর ‘আল-মুদাম্মারাত’ গ্রন্থে ইবনুল মুবারক (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে যিলহজ্জের প্রথম দশ দিনে নখ কাটা ও মাথা মুণ্ডানো সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে,“সুন্নতকে বিলম্বিত করা উচিত নয়। এ বিষয়ে (অর্থাৎ সুন্নত বিলম্ব না করার ব্যাপারে) বর্ণনা এসেছে। তবে বিলম্ব করাই যে আবশ্যক—এমনটি নয়।”(হাশিয়াতু ইবনু আবেদীন (৩/৬৬)
.
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: যখন জিলহজ্জের প্রথম দশ দিন শুরু হবে এবং তোমাদের কেউ কুরবানির ইচ্ছা করবে, তখন সে যেন তার চুল ও নখ না কাটে।”এই হাদীসটি আলেমগণের সর্বসম্মত মতানুযায়ী ওয়াজিবের নয়, বরং মুস্তাহাব (অনুপ্রেরণামূলক) বিধানের ওপর বহন করা হবে। সুতরাং এর দ্বারা বোঝা যায় যে, চুল ও নখ কাটা বিলম্বিত করা ওয়াজিব নয়।তবে কোনো কাজ ওয়াজিব না হওয়া, সেটি মুস্তাহাব হওয়ার বিরোধী নয়।অতএব, (কুরবানির ইচ্ছা থাকলে) চুল ও নখ না কাটা মুস্তাহাব। কিন্তু যদি তা বিলম্ব করতে গিয়ে শরীয়ত অনুমোদিত সময়সীমা অতিক্রম হয়ে যায়, তাহলে আর তা মুস্তাহাব থাকবে না। আর বিলম্ব করার সর্বোচ্চ সীমা হলো চল্লিশ দিনের কম; চল্লিশ দিনের বেশি বিলম্ব করা বৈধ নয়।আল কুনইয়াহ গ্রন্থে বলা হয়েছে:”القنية”: الأفضل أن يقلم أظفاره ويقص شاربه ويحلق عانته وينظف بدنه بالاغتسال في كل أسبوع، وإلا ففي كل خمسة عشر يوما، ولا عذر في تركه وراء الأربعين، ويستحق الوعيد. فالأول: أفضل، والثاني: الأوسط، والأربعون: الأبعد”উত্তম হলো প্রতি সপ্তাহে একবার নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা, লজ্জাস্থানের লোম অপসারণ করা এবং গোসলের মাধ্যমে শরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত প্রতি পনেরো দিনে একবার তা করা উচিত। আর চল্লিশ দিনের বেশি বিলম্ব করার কোনো গ্রহণযোগ্য অজুহাত নেই; (এর চেয়ে বেশি বিলম্বকারী) ব্যক্তি শাস্তির হুমকির উপযুক্ত হবে। অতএব, প্রতি সপ্তাহে একবার করা সর্বোত্তম; প্রতি পনেরো দিনে একবার করা মধ্যম পর্যায়ের; আর চল্লিশ দিনের (সীমা অতিক্রম করার) পূর্ব পর্যন্ত অপেক্ষা করা সর্বশেষ সীমা।”(ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতওয়া নং-৩৯৪৬২২)।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] মত প্রকাশ করেছেন যে, ৪০ দিন পূর্ণ হওয়ার আগেই এসব অপসারণ করা ওয়াজিব। তিনি বলেন:
” الأظفار يجب تعهدها قبل مضي أربعين ليلة؛ لأن رسول الله صلى الله عليه وسلم وقّت للناس في قلم الأظفار، وحلق العانة، ونتف الإبط، وقص الشارب: ألا يترك ذلك أكثر من أربعين ليلة، هكذا ثبت عن رسول الله صلى الله عليه وسلم… “
“নখের যত্ন নেওয়া (অর্থাৎ সময়মতো নখ কাটা) ৪০ রাত অতিক্রম হওয়ার আগেই আবশ্যক। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ মানুষের জন্য নখ কাটা, লজ্জাস্থানের লোম কামানো, বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং গোঁফ ছাঁটার ক্ষেত্রে সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন—যেন এগুলো ৪০ রাতের বেশি অবহেলায় না রাখা হয়। এভাবেই রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে সহীহভাবে প্রমাণিত হয়েছে…”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড:১০; পৃষ্ঠা: ৫০)
.
.সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ-কে বর্তমান যুগে নারীদের নখ বড় রাখার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে
তারা উত্তর দেন:
” لا يجوز تطويل الأظافر؛ لأن هذا مخالف لسنن الفطرة التي حث عليها النبي صلى الله عليه وسلم ومنها (قص الأظافر).
الواجب في تقليم الأظفار ونتف الإبط وحلق العانة وقص الشارب، أن لا يترك شيء من ذلك أكثر من أربعين ليلة؛ لما روى مسلم في “صحيحه” عن أنس رضي الله عنه قال: ( وُقِّتَ لَنَا فِي قَصِّ الشَّارِبِ، وَتَقْلِيمِ الْأَظْفَارِ، وَنَتْفِ الْإِبِطِ، وَحَلْقِ الْعَانَةِ، أَنْ لَا نَتْرُكَ أَكْثَرَ مِنْ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً )، فيجب على هؤلاء النسوة التوبة إلى الله، وترك هذه العادة السيئة المخالفة لما أمر به النبي صلى الله عليه وسلم، والله سبحانه وتعالى يقول: ( وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا )، ويقول سبحانه: ( فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ )
“নখ বড় করে রাখা জায়েয নয়। কারণ এটি ফিতরাতের (স্বভাবজাত সুন্নতসমূহের) অন্তর্ভুক্ত সুন্নতের বিরোধী। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেসব ফিতরাতের সুন্নতের প্রতি উৎসাহিত করেছেন, তার অন্যতম হলো নখ কাটা।নখ কাটা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা, নাভির নিচের লোম (যৌনাঙ্গের আশপাশের লোম) অপসারণ করা এবং গোঁফ ছাঁটা—এসব বিষয়ে কর্তব্য হলো,এগুলোর কোনোটি যেন চল্লিশ রাতের বেশি অবহেলায় রেখে দেওয়া না হয়। কারণ, ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে আনাস (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: ‘আমাদের জন্য গোঁফ ছাঁটা, নখ কাটা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং নাভির নিচের লোম অপসারণ করার ব্যাপারে সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে—যাতে আমরা এগুলোর কোনোটি চল্লিশ রাতের বেশি রেখে না দিই।’ অতএব, এসব নারীর ওপর আল্লাহর নিকট তাওবা করা এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশনার বিরোধী এই নিকৃষ্ট অভ্যাস পরিত্যাগ করা আবশ্যক।মহান আল্লাহ বলেন: “রাসূল তোমাদের যা দেন, তা গ্রহণ করো; আর তিনি তোমাদের যা থেকে নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো।”(সূরা আল-হাশর:৭) তিনি আরও বলেন: “অতএব, যারা তাঁর (রাসূলের) আদেশের বিরোধিতা করে, তারা যেন সতর্ক থাকে—কোথাও তাদের ওপর কোনো ফিতনা (বিপর্যয়) এসে না পড়ে অথবা তাদের ওপর কোনো যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি নেমে না আসে।”(সূরা আন-নূর: ৬৩; ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৬০)
.
পরিশেষে বলা যায়, নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং লজ্জাস্থানের লোম অপসারণ ফিতরাতের সুন্নতসমূহের অন্তর্ভুক্ত। সহীহ হাদীস অনুযায়ী এগুলো চল্লিশ দিনের বেশি অবহেলায় ফেলে রাখা বৈধ নয়; বরং চল্লিশ দিন হলো সর্বোচ্চ সময়সীমা, নির্ধারিত সময় নয়। তাই প্রয়োজন দেখা দিলেই এগুলো অপসারণ করা সুন্নত ও উত্তম।আর শরয়ী কোনো ওজর ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে চল্লিশ দিনের বেশি বিলম্ব করা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশনার বিরোধিতা এবং নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন। এ কারণে অধিকাংশ সমসাময়িক মুহাক্কিক আলেমের মতে এতে গুনাহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যদিও ফকীহদের মধ্যে এ বিষয়ে হারাম ও তীব্র মাকরূহ—উভয় মতই বিদ্যমান। অতএব একজন মুসলিমের উচিত চল্লিশ দিনের আগেই এসব ফিতরাতের সুন্নতের যথাযথ পরিচর্যা করা। (গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩৯৪৬২২) আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়, ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।