কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করার শরয়ী বিধান কী

প্রশ্ন: কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করার শরয়ী বিধান কী? এতে কি মৃত ব্যক্তি উপকৃত হয়? এ বিষয়ে ফাতাওয়া ইবনু উসাইমীন গ্রন্থের ২৪০ নম্বর ফাতওয়ার অনুবাদ কিংবা মূল ফাতওয়ায় কি কোনো ভুল রয়েছে? একটি গবেষণা ভিত্তিক পর্যালোচনা।
▬▬▬▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার জন্য। অগণিত দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর, সম্প্রতি এক ভাইকে দেখলাম আমাদের সম্মানিত কয়েকজন তরুণ দাঈ কর্তৃক অনূদিত ফাতাওয়া ইবনু উসাইমীন নামক গ্রন্থের ২৪০ নম্বর ফাতওয়া—যার বিষয় মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছায় কি না—তা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। তিনি প্রথমে দাবি করেন যে ফাতওয়ার অনুবাদে ভুল রয়েছে; কিন্তু কোথায় সেই ভুল হয়েছে জানতে চাওয়া হলে কোনো সুস্পষ্ট ইলমি ব্যাখ্যা উপস্থাপন না করে পরবর্তীতে ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মূল ফাতওয়াকেই ভুল বলে মন্তব্য করেন। অথচ তাঁর বক্তব্য ও আলোচনার ধরন থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এ বিষয়ে তাঁর পর্যাপ্ত ইলম ও গভীর গবেষণার ঘাটতি রয়েছে।কারন বাস্তবতা হলো,ফাতওয়ায় ইবনু উসাইমীন-এর উক্ত ফাতওয়ার অনুবাদে কোনো ভুল প্রমাণিত হয়নি এবং ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতকে সরাসরি ভুল বলা ন্যায়সংগত নয়। কারণ, মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছায় কি না—এটি একটি সুপরিচিত ইজতিহাদি মাসআলা, যাতে প্রাচীন ও সমকালীন বহু আলেমের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর এই ফাতওয়াটি তাঁর নিজস্ব কোনো ব্যতিক্রমী মত নয়; বরং তাঁর পূর্বেও বহু ইমাম একই মত গ্রহণ করেছেন এবং কুরআন-সুন্নাহ থেকে এর পক্ষে দলিল ও ইলমি যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। তাই এমন একটি ইজতিহাদি বিষয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল, গভীর গবেষণা ও পর্যাপ্ত শরঈ জ্ঞান ছাড়া কোনো ফাতওয়ার অনুবাদকে ভুল বলা কিংবা ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতো একজন স্বীকৃত ইমামের ফাতওয়াকে সরাসরি ‘ভুল’ আখ্যায়িত করা ইলম, ইনসাফ ও আদবের পরিপন্থী।একই সঙ্গে এটিও উল্লেখযোগ্য যে, শাইখ ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) নিজে এ আমলকে উত্তম বা অগ্রাধিকারযোগ্য বলেননি; বরং তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, মানুষের উচিত নিজের নেক আমল নিজের জন্য সংরক্ষণ করা এবং মৃতদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা। কেননা, দোয়াই তাদের জন্য নেক আমলের সওয়াব উৎসর্গ করার চেয়ে অধিক উত্তম ও উপকারী। তাই এমন একটি ইজতিহাদি বিষয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল, গভীর গবেষণা ও পর্যাপ্ত শরঈ জ্ঞান ছাড়া কোনো ফাতওয়ার অনুবাদকে ভুল বলা কিংবা ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতো একজন স্বীকৃত ইমামের ফাতওয়াকে সরাসরি ‘ভুল’ আখ্যায়িত করা ইলম, ইনসাফ ও আদবের পরিপন্থী। আমাদের সেই ভাইয়ের প্রতি আন্তরিক নসীহত হলো—শরঈ বিষয়ে কথা বলার সময় আল্লাহকে ভয় করুন, যথাযথ যাচাই-বাছাই করে কথা বলুন এবং কোনো মতের সমালোচনা করতে চাইলে তা কুরআন, সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের বক্তব্যের আলোকে বিনয়, ইনসাফ ও ইলমি পদ্ধতিতে উপস্থাপন করুন। কারণ, বিশুদ্ধ ইলম ছাড়া শরঈ বিষয়ে মন্তব্য করা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যথাযথ প্রমাণ ব্যতীত কোনো ফাতওয়াকে ভুল হিসেবে প্রচার করা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করার শরয়ী বিধান কী, মৃত ব্যক্তি এর দ্বারা উপকৃত হন কি না, এবং এ বিষয়ে ফাতাওয়া ইবনু উসাইমীন গ্রন্থের ২৪০ নম্বর ফাতওয়ার অনুবাদ বা মূল ফাতওয়ায় কোনো ভুল রয়েছে কি না—এসব বিষয় কুরআন, সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের বক্তব্যের আলোকে সংক্ষেপে পর্যালোচনা করার চেষ্টা করব।
.
◽কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করার শরয়ী বিধান কী? এতে কি মৃত ব্যক্তি উপকৃত হয়?
.
প্রথমত: প্রথমেই জানা উচিত, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করলে তা তার কাছে পৌঁছায় কি না—এটি কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত (কাতঈ) দলিল দ্বারা প্রমাণিত এমন কোনো আকীদাগত বিষয় নয়, যার ওপর ঈমান আনা ফরজ; বরং এটি একটি ফিকহি ও ইজতিহাদভিত্তিক মাসআলা, যেখানে যুগে যুগে নির্ভরযোগ্য আহলুস সুন্নাহর আলেমদের মধ্যে মতভেদ বিদ্যমান রয়েছে। তাই এ বিষয়ে আলোচনা, গবেষণা বা মতামত প্রদান করতে হলে কুরআন-সুন্নাহর দলিল, সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এবং সালাফে সালেহীনের বুঝের আলোকে ইলমী আমানতদারিতা, ইনসাফ ও শরয়ী আদব বজায় রাখা অপরিহার্য। এ ধরনের ইজতিহাদি মতভেদকে আকীদাগত বিরোধে রূপ দেওয়া, কিংবা এর কারণে কাউকে বিদআতী, পথভ্রষ্ট বা আহলুস সুন্নাহর গণ্ডির বাইরে আখ্যায়িত করা মোটেও সঙ্গত নয়। বিশেষত যারা এ মাসআলায় অতি কঠোরতা বা বাড়াবাড়ির পরিচয় দিয়ে নিজেদের মতকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য মনে করে এবং ভিন্নমত পোষণকারী নির্ভরযোগ্য আলেমদের ইজতিহাদকে অবমূল্যায়ন বা নিন্দা করে, তারা ইলমী ইনসাফ ও আহলুস সুন্নাহর আদব থেকে বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। অতএব, এ ধরনের ইজতিহাদি মতভেদের ক্ষেত্রে দলিলের অনুসরণ, পারস্পরিক সম্মান, ন্যায়পরায়ণতা এবং শিষ্টাচার বজায় রাখাই একজন তালিবুল ইলম ও আহলুস সুন্নাহর অনুসারীর প্রকৃত বৈশিষ্ট্য।
.
দ্বিতীয়ত: মূলনীতি হলো, মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার নিজস্ব আমলের ধারা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায় এবং তার আমলনামায় নতুন করে কোনো নেকি লিপিবদ্ধ হয় না। তবে শরীয়তে এ মূলনীতির কিছু সুস্পষ্ট ব্যতিক্রম রয়েছে। সহীহ দলিল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহর ইচ্ছায় জীবিত ব্যক্তির নির্দিষ্ট কিছু নেক আমলের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তি উপকৃত হতে পারেন এবং তার নিকট সেই আমলের সওয়াব পৌঁছাতে পারে। এ প্রসঙ্গে আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: “মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি জিনিস ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দ্বারা উপকার লাভ করা হয় এবং এমন নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।” (সহীহ মুসলিম, হা/১৬৩১)। তবে জীবিত ব্যক্তি মৃতের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করে তার সওয়াব উৎসর্গ করলে তা মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছায় কি না—এ বিষয়ে প্রাচীনকাল থেকেই আহলুস সুন্নাহর আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ বিষয়ে তাদের দুটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে। (১). প্রথম মত অনুযায়ী, জীবিত ব্যক্তি মৃতের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করে তার সওয়াব উৎসর্গ করলে তা মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে এবং তিনি এর দ্বারা উপকৃত হন। (২). আর দ্বিতীয় মত অনুযায়ী, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করলে তা তার নিকট পৌঁছে না; বরং এ ক্ষেত্রে কেবল সেই সব আমলই মৃতের উপকারে আসে, যেগুলোর পক্ষে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহয় সুস্পষ্ট দলিল বিদ্যমান।
.
▪️প্রথম মত অনুযায়ী: যারা বলেন যে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে, তারা এ বিষয়ে কুরআন বা সহিহ হাদিস থেকে কোনো সুস্পষ্ট, সহিহ ও সরাসরি দলিল পেশ করতে পারেন না। বরং তাদের মতের ভিত্তি হলো কিয়াস (তুলনামূলক যুক্তি) এবং শরীয়তে প্রমাণিত কিছু সাধারণ নীতিমালা। তাদের বক্তব্য হলো, যেহেতু সহিহ দলিল দ্বারা প্রমাণিত যে মৃত ব্যক্তি জীবিতের দোয়া, সদকা, হজ্জ এবং মান্নতের রোজার মাধ্যমে উপকৃত হয়, তাই কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াবও তার কাছে পৌঁছানো উচিত। অর্থাৎ, তারা কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছানোর জন্য কোনো স্বতন্ত্র ও নির্দিষ্ট দলিল উপস্থাপন করেন না; বরং অন্যান্য ইবাদতের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছানোর প্রমাণের ওপর কিয়াস করে এ মত গ্রহণ করেন। এ ক্ষেত্রে তারা বিশেষভাবে দোয়ার দলিল পেশ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ﴾ — “হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের পূর্ববর্তী মুমিন ভাইদের ক্ষমা করে দিন।” (সূরা আল-হাশর: ১০)। তাদের যুক্তি হলো, যেহেতু দোয়া মৃতের উপকারে আসে, তাই কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াবও পৌঁছাবে। একইভাবে সহিহ হাদিসে মৃতের পক্ষ থেকে সদকা করা, হজ্জ আদায় করা এবং মান্নতের রোজা পূরণ করার অনুমতি ও তার উপকারিতার কথা বর্ণিত হয়েছে। তাই তাদের দাবি, যখন এসব ইবাদতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছায়, তখন কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াবও কিয়াসের ভিত্তিতে তার অন্তর্ভুক্ত হবে।এ মতটি হানাফি ও হাম্বলি মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও শক্তিশালী মত। এছাড়া কিছু শাফেয়ি আলেম, শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) এবং আরও বহু আলেম এ মতকে সমর্থন করেছেন। এমনকি এটিই জমহুর (অধিকাংশ) আলেমের অভিমত। কিন্তু শাইখ ইবনু উসাইমীন, শাইখ আল-আলবানী প্রমুখ আলেম বলেন, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃতকে উৎসর্গ করার পক্ষে সহিহ ও স্পষ্ট কোনো দলিল নেই। তাই এটিকে ইবাদত হিসেবে নিয়মিত করা শরয়িসম্মত নয়। তবে মৃতের জন্য দোয়া, সদকা, হজ ইত্যাদি—যেগুলোর ব্যাপারে সহিহ দলিল রয়েছে—সেগুলোই করা উচিত।
.
আল মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ-এ বলা হয়েছে:
ذهب الحنفية والحنابلة إلى جواز قراءة القرآن للميت وإهداء ثوابها لـه، قال ابن عابدين نقلاً عن البدائع: ولا فرق بين أن يكون المجعول لـه ميتاً أو حياً، والظاهر أنه لا فرق بين أن ينوي به عند الفعل للغير أو يفعل لنفسه، ثم بعد ذلك يجعل ثوابه لغيره.وقال الإمام أحمد: الميت يصل إليه كل شيء من الخير، للنصوص الواردة فيه، ولأن الناس يجتمعون في كل مِصْرٍ، ويقرؤون ويهدون لموتاهم من غير نكير فكان إجماعاً. قاله البهوتي من الحنابلة.
وذهب المتقدمون من المالكية إلى كراهة قراءة القرآن للميت، وعدم وصول ثوابها إليه، لكن المتأخرين على أنه لا بأس بقراءة القرآن والذكر وجعل الثواب للميت ويحصل له الأجر.وقال ابن هلال: الذي أفتى به ابن رشد، وذهب إليه غير واحد من أئمتنا الأندلسيين، أن الميت ينتفع بقراءة القرآن الكريم ويصل إليه نفعه، ويحصل لـه أجره إذا وهب القارئ ثوابه لـه، وبه جرى عمل المسلمين شرقاً وغرباً، ووقفوا على ذلك أوقافاً، واستمر عليه الأمر منذ أزمنة سالفة.والمشهور من مذهب الشافعي أنه لا يصل ثواب القراءة إلى الميت، وذهب بعض الشافعية إلى وصول ثواب القراءة للميت، قال سليمان الجمل: ثواب القراءة للقارئ، ويحصل مثله أيضاً للميت، لكن إن كان بحضرته أو بنيته، أو يجعل ثوابها لـه بعد فراغها على المعتمد في ذلك.
“হানাফি ও হাম্বলি মাযহাবের মত:হানাফি ও হাম্বলি পন্থীগণ মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করা এবং তার সওয়াব তাকে বখশে দেওয়া (দান করা) জায়েয বলে মত দিয়েছেন। ইবনু আবেদীন (রাহিমাহুল্লাহ) ‘আল-বাদায়ে‘’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করে বলেন,যার জন্য সওয়াব দান করা হবে সে ব্যক্তি জীবিত হোক কিংবা মৃত, তাতে কোনো পার্থক্য নেই। তিলাওয়াত করার সময় থেকেই অন্যের জন্য নিয়ত করা কিংবা নিজের জন্য আমল করার পর তার সওয়াব অন্যকে দান করা—উভয় পদ্ধতির মাঝেই দৃশ্যত কোনো পার্থক্য নেই।ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: মৃত ব্যক্তির কাছে সব ধরনের নেক আমলের সওয়াব পৌঁছে। কারণ এ বিষয়ে বিভিন্ন দলিল রয়েছে। তাছাড়া মুসলমানরা সব যুগে ও সব দেশে একত্র হয়ে কুরআন তিলাওয়াত করে তাদের মৃতদের সওয়াব দান করে আসছে,অথচ এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত বা অস্বীকৃতি জানা যায়নি; সুতরাং এটি ইজমা (ঐকমত্য) হিসেবে গণ্য।” কথাটি হাম্বলি আলেম আল-বাহূতি (রাহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন।
মালিকি মাযহাবের মত: প্রাচীন মালিকি আলেমদের মতে, মৃতের জন্য কুরআন তিলাওয়াত করা মাকরূহ এবং এর সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছায় না। তবে পরবর্তী মালিকি আলেমদের মতে, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির ইত্যাদি করে তার সওয়াব মৃতকে দান করতে কোনো অসুবিধা নেই এবং মৃত ব্যক্তি এর দ্বারা উপকৃত হন।ইবনু হিলাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: ইবনু রুশদ (রাহিমাহুল্লাহ) যে ফতোয়া দিয়েছেন এবং আন্দালুসের আমাদের বহু ইমাম যে মত গ্রহণ করেছেন তা হলো মৃত ব্যক্তি পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের উপকার লাভ করেন এবং তিলাওয়াতকারী যদি তার সওয়াব মৃতকে তাকে দান করেন, তবে সে সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছে। পূর্ব ও পশ্চিমের মুসলিম উম্মাহর সর্বযুগের আমল এর ওপরই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এ ব্যাপারে তারা ওয়াকফ বা endowments নির্ধারণ করেছেন এবং সুদূর অতীত থেকেই এই ধারাবাহিকতা চলে আসছে।
শাফেয়ি মাযহাবের মত: প্রসিদ্ধ শাফেয়ি মত অনুযায়ী, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছায় না।তবে শাফেয়ি মাযহাবের কিছু আলেম বলেন, কুরআনের তিলওয়াতের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছে।সুলাইমান জামাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:তিলওয়াতের মূল সওয়াব তো তিলাওয়াতকারীর জন্যই। তবে নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী,যদি মৃত ব্যক্তির উপস্থিতিতে তিলাওয়াত করা হয়, অথবা তার জন্য নিয়ত করা হয়, কিংবা তিলাওয়াত শেষ করে তার সওয়াব মৃতকে দান করা হয়, তাহলে নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী মৃতও অনুরূপ সওয়াব লাভ করবেন।”(আল-মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ; খণ্ড: ৩৩; পৃষ্ঠা:  ৬০)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] তাঁর আল মুগনী গ্রন্থে মৃতের কাছে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছানোর পক্ষে কিছু দলিল উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন:وهذه أحاديث صحاح، وفيها دلالة على انتفاع الميت بسائر القرب، لأن الصوم والحج والدعاء والاستغفار عبادات بدنية قد أوصل الله نفعها إلى الميت، فكذلك ما سواها مع ما ذكرنا من الحديث في ثواب من قرأ سورة (يس) وتخفيف الله -تعالى- عن أهل المقابر بقراءته، ولأنه إجماع المسلمين، فإنهم في كل عصر ومصر يجتمعون ويقرأون القرآن ويهدون ثوابه إلى موتاهم من غير نكير”এগুলো সহীহ হাদিস। এগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে, মৃত ব্যক্তি অন্যান্য নেক আমলের দ্বারাও উপকৃত হয়। কারণ, রোজা, হজ, দোয়া ও ইস্তিগফার এসব শারীরিক ইবাদতের উপকারও আল্লাহ মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেন। সুতরাং অন্যান্য ইবাদতও একইভাবে পৌঁছবে। এছাড়া সূরা ইয়াসীন পাঠের সওয়াব এবং তা পাঠ করার কারণে কবরবাসীদের শাস্তি লাঘব হওয়ার যে হাদিস বর্ণিত হয়েছে, সেটিও এর পক্ষে উল্লেখযোগ্য। আরও কারণ হলো, এটি মুসলিমদের ধারাবাহিক আমল। কেননা, প্রত্যেক যুগে ও প্রত্যেক দেশে মুসলিমরা একত্রিত হয়ে কুরআন তিলাওয়াত করেছেন এবং তার সওয়াব তাদের মৃতদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছেন; এ বিষয়ে কোনো আপত্তি বা অস্বীকৃতি দেখা যায়নি।”(ইবনু কুদামাহ আল মুগনী; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৫৬৮)
.
হানাফী ফকীহগণও স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃতের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করলে মৃত ব্যক্তি তা দ্বারা উপকৃত হন। (আদ দুররুল মুখতার ও রদ্দুল মুহতার-এ বলা হয়েছেويقرأ سورة (يس) لما ورد: من دخل المقابر فقرأ سورة (يس) خفف الله عنهم يومئذ، وكان له بعدد من فيها حسنات”সূরা ইয়াসীন পাঠ করবে। কারণ, বর্ণিত হয়েছে: যে ব্যক্তি কবরস্থানে প্রবেশ করে সূরা ইয়াসীন পাঠ করবে, আল্লাহ সেদিন কবরবাসীদের শাস্তি হালকা করে দেবেন এবং পাঠকারীর জন্য সেখানে সমাহিত ব্যক্তিদের সংখ্যার সমপরিমাণ নেকি লেখা হবে। (আদ দুররুল মুখতার ও রদ্দুল মুহতার: ২/২৪৩)
.
মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন তিলাওয়াত সম্পর্কে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:إن ثوابها يصل إليه فقد ذكر أن في هذه المسألة قولين للعلماء، ثم رجح القول بوصول ثواب قراءة القرآن للميت فقال -رحمه الله- تعالى: “وأما الصيام، وصلاة التطوع، وقراءة القرآن فهذا فيه قولان للعلماء:الأول:- ينتفع به وهو مذهب أحمد وأبي حنيفة وغيرهما.الثاني: لا تصل إليه وهو المشهور في مذهب مالك.ثم قال –رحمه الله- في فتوى له: وتنازعوا في وصول الأعمال البدنية: كالصوم والصلاة وقراءة القرآن، والصواب أن الجميع يصل إليه، أي يصل ثوابها إلى الميت”নিশ্চয়ই মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন তিলাওয়াত করলে তার সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছে। এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে দুটি মত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এরপর তিনি মৃতের কাছে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছায় এই মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বলেন: আর রোজা, নফল সলাত এবং কুরআন তিলাওয়াত এগুলো সম্পর্কে আলেমদের দুটি মত রয়েছে। প্রথম মত: এগুলোর সওয়াব মৃত ব্যক্তি লাভ করে। এটি ইমাম আহমাদ, ইমাম আবু হানিফা এবং আরও অনেক আলেমের মত। দ্বিতীয় মত: এগুলোর সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছায় না। এটি ইমাম মালিকের মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত।এরপর তিনি অন্য এক ফতোয়ায় বলেন: শারীরিক ইবাদত যেমন রোজা, সলাত এবং কুরআন তিলাওয়াত এর সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছায় কি না, এ বিষয়ে আলেমদের মতভেদ রয়েছে। তবে সঠিক মত হলো, এসব ইবাদতের সওয়াবই মৃতের কাছে পৌঁছে।”(মাজমূউল ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৪; পৃষ্ঠা: ৩১৫ ও ৩৬৬)
.
আর ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: والعبادات قسمان : مالية وبدنية ، وقد نبه الشارع بوصول ثواب الصدقة على وصول سائر العبادات المالية ، ونبه بوصول ثواب الصوم على وصول سائر العبادات البدنية وأخبر بوصول ثواب الحج المركب من المالية والبدنية، فالأنواع الثلاثة ثابتة بالنص والاعتبار .”ইবাদত মূলত দুই প্রকার (১) আর্থিক ইবাদত এবং (২) শারীরিক ইবাদত। শরীয়ত সদকার সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছানোর কথা বলে অন্যান্য আর্থিক ইবাদতের সওয়াবও পৌঁছানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। আবার রোজার সওয়াব পৌঁছানোর কথা বলে অন্যান্য শারীরিক ইবাদতের সওয়াবও পৌঁছানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। আর হজ যা আর্থিক ও শারীরিক উভয় ধরনের ইবাদতের সমন্বয় তার সওয়াবও পৌঁছায় বলে জানিয়েছে। সুতরাং এই তিন প্রকার ইবাদতের সওয়াব পৌঁছানো কুরআন-সুন্নাহর দলিল এবং সঠিক কিয়াস উভয় দ্বারাই প্রমাণিত।”(কিতাবুর রূহ পৃষ্ঠা: ৪৮)
.
তবে এ মতের আলেমগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, মৃতের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব পৌঁছানোর কথা ধরা হলেও, তিলাওয়াত অবশ্যই একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হতে হবে; এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক বা কোনো দুনিয়াবি স্বার্থ গ্রহণ করা যাবে না। কারণ অর্থের বিনিময়ে কুরআন তিলাওয়াত করলে সেই আমলে কোনো সওয়াব অবশিষ্ট থাকে না। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,وأما الاستئجار لنفس القراءة –أي قراءة القرآن – والإهداء، فلا يصح ذلك، لأنه لا يجوز إيقاعها إلا على وجه التقرب إلى الله تعالى، وإذا فعلت بعروض لم يكن فيها أجر بالاتفاق، لأن الله تعالى إنما يقبل من العمل ما أريد به وجهه لا ما فعل لأجل عروض الدنيا.ثم قال – رحمه الله تعالى-: وأما إذا كان لا يقرأ القرآن إلا لأجل العروض – أي الأعواض المادية – فلا ثواب له على ذلك، وإذا لم يكن في ذلك ثواب فلا يصل إلى الميت شيء؛ لأنه إنما يصل إلى الميت ثواب العمل لا نفس العمل ..”শুধু কুরআন তিলাওয়াতের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ নয়। কেননা এ ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই নিবেদিত হওয়া উচিত। যদি তা দুনিয়াবি লাভের উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে সর্বসম্মতিক্রমে এতে কোনো সওয়াব থাকে না; কারণ আল্লাহ কেবল সেই আমলই কবুল করেন, যা একনিষ্ঠভাবে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য সম্পাদিত হয়। তিনি আরও বলেন, যে ব্যক্তি কেবল অর্থের বিনিময়ে কুরআন তিলাওয়াত করে, সে নিজেই এ তিলাওয়াতের কোনো সওয়াব পাবে না। আর যখন তার নিজেরই কোনো সওয়াব থাকবে না, তখন মৃতের কাছেও কিছু পৌঁছাবে না। কেননা মৃতের নিকট পৌঁছে আমলের সওয়াব, আমলটি নিজে নয়।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মৃতের কবরের কাছে অথবা তার রূহের উদ্দেশ্যে কুরআন পড়ার জন্য কাউকে পারিশ্রমিক দিয়ে নিয়োগ করার হুকুম কী?
উত্তরে তারা বলেন: (لا يجوز استئجار من يقرأ القرآن على قبر الميت أو على روحه، ويهب ثوابه للميت؛ لأنه لم يفعله النبي – صلى الله عليه وسلم -، ولا أحدٌ من السَّلف، ولا أمر به أحد من أئمة الدين، ولا رخص فيه أحد منهم فيما نعلم، والاستئجار على نفس التلاوة غير جائز بلا خلاف) “মৃতের কবরের কাছে বা তার রূহের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করে তার সওয়াব মৃতকে দান করার জন্য কাউকে ভাড়া করা বৈধ নয়।কারণ,রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এটি করেননি, সালাফে সালেহীনদের কেউও করেননি। দ্বীনের কোনো ইমাম এ কাজের নির্দেশ দেননি, এবং আমাদের জানা মতে কেউ এর অনুমতিও দেননি। বিশেষ করে কেবল কুরআন তিলাওয়াতের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ বা দেওয়া এটি সর্বসম্মতিক্রমে অবৈধ।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৯;পৃষ্ঠা: ৩৫–৪১)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন: ولكن استئجار من يقرأ القرآن له هذا هو الذي يكون حراما، لأن قراءة القرآن قربة، والقربة لا يصح أخذ الأجرة عليها، فلو استأجروا شخصا يقرأ القرآن للميت فإن عقد الإجارة محرم، والقارئ لا يملك الأجرة بذلك، وليس له ثواب من قراءته، لأنه أراد بها غير وجه الله، والميت لا ينتفع بها حينئذ، لأنها ليست مقبولة يترتب عليها الأجر والثواب، وحينئذ يكون أهل الميت الذين بذلوا هذه الدراهم خاسرين، وقد فات الميت ما يرجونه من الثواب”তবে মৃতের জন্য কুরআন পড়ার উদ্দেশ্যে কাউকে পারিশ্রমিক দিয়ে নিয়োগ করা হারাম। কারণ, কুরআন তিলাওয়াত একটি ইবাদত, আর ইবাদতের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ নয়। যদি কেউ মৃতের জন্য কুরআন পড়ার উদ্দেশ্যে কাউকে ভাড়া করে, তাহলে সেই চুক্তি শরিয়তসম্মত নয়। এভাবে পাঠকারী ব্যক্তি ওই পারিশ্রমিকের অধিকারী নয় এবং তার তিলাওয়াতেরও কোনো সওয়াব হবে না। কারণ, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি নয়, বরং দুনিয়াবি লাভের উদ্দেশ্যে তিলাওয়াত করেছে।ফলে মৃত ব্যক্তিও এর দ্বারা উপকৃত হবে না। কেননা, এ তিলাওয়াত আল্লাহর কাছে কবুল হয় না, আর কবুল না হলে এর ওপর কোনো সওয়াবও নির্ধারিত হয় না।সুতরাং মৃতের স্বজনরা যারা এ অর্থ ব্যয় করেছে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর মৃত ব্যক্তিও যে সওয়াবের আশা তারা করেছিল, তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।”(ইবনু উসাইমীন; মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৬২)
.
শাইখ বকর ইবনে আব্দুল্লাহ আবু যায়েদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:عند حديثه عن المحدثات فائدة هذا نصها:(استئجار شخص أو أكثر لقراءة القرآن، وإهداء ثوابها لميت أو حي، وهذا عمل مبتدع، وقد فات ثواب القراءة على القارئ لما فيه من إرادة الإنسان بعمله الدنيا، وفات على المستأجر؛ لأنه عمل مبتدع، وقد قال – صلى الله عليه وسلم -:”من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد”)”একজন বা একাধিক ব্যক্তিকে পারিশ্রমিক দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করানো এবং সেই তিলাওয়াতের সওয়াব কোনো মৃত বা জীবিত ব্যক্তিকে দান করা একটি বিদআত। এতে তিলাওয়াতকারীর সওয়াব নষ্ট হয়ে যায়, কারণ সে তার আমলের মাধ্যমে দুনিয়াবি স্বার্থ কামনা করেছে। আর যে ব্যক্তি তাকে ভাড়া করেছে, সেও সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়, কারণ সে একটি বিদআতী কাজ করেছে। নবী (ﷺ) বলেছেন:”যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কোনো নতুন বিষয়ের অবতারণা করে যা তার অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।”(সহীহ বুখারী: ২৬৯৭, সহীহ মুসলিম: ১৭১৮)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: রমজানে আমি যদি কুরআন তিলাওয়াত করে তার সওয়াব কোনো মৃত ব্যক্তিকে দান করি, অথবা তার পক্ষ থেকে তাওয়াফ করি এটি কি জায়েয?
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:هذا يعني أنك تعمل عملاً صالحاً وتجعل ثوابه لشخص ميت، والجواب أن ذلك لا بأس به، فإذا أراد شخص أن يصلي ويجعل ثوابها لميته، أو يتصدق، أو يحج، أو يقرأ القرآن، أو يصوم، ويجعل ثواب ذلك لميته فلا بأس به. وذلك لما ورد في الحديث الصحيح أن رجلاً أتى رسول الله – صلى الله عليه وسلم- فقال: يا رسول الله، إن أمي افتُلتت نفسها، وإنها لو تكلمت لتصدقت أفأتصدق عنها؟ قال: «نعم». وكذلك أذن لسعد بن عبادة – رضي الله عنه- أن يتصدق لأمه، وسائر العبادات كالصدقة إذ لا فرق بينهما. والنبي – صلى الله عليه وسلم- لم يرد عنه نص يمنع مثل ثواب هذه للميت، حتى نقول: إننا نقتصر على ما ورد، فإذا جاءت السنة بجنس العبادات فإنه يكون المسكوت عنه مثل المنطوق به، لاسيما وأن هذا ليس بنطق من الرسول – صلى الله عليه وسلم-، بل إنه استفتاء في قضايا أعيان، وإفتاء الرسول – صلى الله عليه وسلم- بأنه يجوز أن يتصدق الإنسان عن أمه لا يدل على أن ما سواه ممنوع. ولكن الذي أرى أن يجعل الإنسان العمل الصالح لنفسه، وأن يدعو لأمواته، فالدعاء أفضل من التبرع لهم، لأن النبي – صلى الله عليه وسلم- قال: «إذا مات الإنسان انقطع عمله إلا من ثلاث: إلا من صدقة جارية، أو علم ينتفع به، أو ولد صالح يدعو له»، ولم يقل: يتعبد له. وبناء على ذلك فالدعاء لأبيك، أو لأمك أفضل من أن تهدي لهم الصلاة، أو القرآن، أو ما أشبه ذلك، واجعل الأعمال لنفسك كما أرشد إلى ذلك رسول الله – صلى الله عليه وسلم-. والله الموفق”এর অর্থ হলো, আপনি একটি নেক আমল করে তার সওয়াব একজন মৃত ব্যক্তিকে দান করছেন।এর জবাব হলো: এতে কোনো অসুবিধা নেই। অতএব, কেউ যদি নামাজ পড়ে, সদকা করে, হজ করে, কুরআন তিলাওয়াত করে অথবা রোজা রেখে তার সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে দান করতে চায়, তবে এতে কোনো দোষ নেই। কারণ, সহিহ হাদিসে এসেছে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সা. এর কাছে এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি মনে করি, যদি তিনি কথা বলতে পারতেন, তবে সদকা করতেন। আমি কি তার পক্ষ থেকে সদকা করব? তিনি বললেন: হ্যাঁ। এছাড়া তিনি সা‘দ ইবনু উবাদাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কেও তাঁর মায়ের পক্ষ থেকে সদকা করার অনুমতি দিয়েছিলেন। অন্যান্য ইবাদতও সদকার মতোই, এদের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। নবী (ﷺ) থেকে এমন কোনো সহিহ বর্ণনা নেই, যা মৃতকে কুরআন বা অন্যান্য নেক আমলের সওয়াব পৌঁছানো নিষিদ্ধ করে। তাই আমরা শুধু বর্ণিত কয়েকটি ইবাদতেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখব এমন কথা বলা সঠিক নয়। বরং যখন সুন্নাহ একটি শ্রেণির ইবাদতের সওয়াব পৌঁছানোর প্রমাণ দিয়েছে, তখন একই ধরনের অন্যান্য ইবাদতও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। বিশেষ করে এগুলো রাসূল ﷺ -এর নিজ উদ্যোগে বলা কথা নয় বরং নির্দিষ্ট ঘটনার প্রশ্নের উত্তরে দেওয়া ফতোয়া। সুতরাং তিনি যখন মায়ের পক্ষ থেকে সদকা করার অনুমতি দিয়েছেন, তখন তা থেকে অন্য ইবাদত নিষিদ্ধ এ কথা প্রমাণিত হয় না। তবে আমার (শাইখ ইবনু উসাইমীনের) অভিমত হলো: মানুষের উচিত নিজের নেক আমল নিজের জন্য রাখা এবং মৃতদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা। কারণ দোয়া, তাদের জন্য নেক আমলের সওয়াব দান করার চেয়ে উত্তম। নবী (ﷺ) বলেছেন: মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি জিনিস ব্যতীত: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে। তিনি বলেননি যে তার জন্য ইবাদত করবে। অতএব, আপনার বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করা তাদের উদ্দেশ্যে নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত বা অনুরূপ ইবাদতের সওয়াব দান করার চেয়ে উত্তম। আর নিজের নেক আমল নিজের জন্য রাখুন যেমনটি রাসূলুল্লাহ সা. এর দিকনির্দেশনা থেকে প্রতীয়মান হয়। আল্লাহ তাআলা তাওফীকদাতা।”(ইবনু উসাইমীন; মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ১৭; পৃষ্ঠা: ২৫৩–২৫৪)। এটিই ফাতওয়ায় ইবনু উসাইমীনে রয়েছে।যেটা সম্পর্কে পোস্টকারী উক্ত ফাতওয়াটি সঠিকভাব না বুঝে মন্তব্য করেছেন। শাইখ এখানে মৃত ব্যক্তির জন্য নেক আমলের সওয়াব পৌঁছানোর বিষয়ে একটি মত উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি এটিকে সুন্নাহর নির্দেশিত সর্বোত্তম পদ্ধতি হিসেবে বলেননি। বরং ফাতওয়ার শেষাংশে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, মানুষের উচিত নিজের নেক আমল নিজের জন্য রাখা এবং মৃত ব্যক্তির জন্য বেশি বেশি দোয়া করা; কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মৃতের জন্য দোয়া করার বিষয়টিই উল্লেখ করেছেন। অতএব, শাইখ রাহিমাহুল্লাহ এখানে সরাসরি এ কথা বলেননি যে, মৃতের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করলে অবশ্যই সওয়াব পৌঁছে যায়; বরং তিনি একটি মত উল্লেখ করার পর দোয়ার শ্রেষ্ঠত্বের দিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাই কোনো আলেমের বক্তব্য বুঝতে হলে পুরো ফাতওয়া ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি।
.
▪️দ্বিতীয় মত অনুযায়ী: কুরআন তিলাওয়াতের সাওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছায় না। এ মতের মূল ভিত্তি হলো—এর পক্ষে সরাসরি কোনো সহীহ দলিল নেই তাছাড়া রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনো কুরআন তিলাওয়াত করে তাঁর কোনো নিকটাত্মীয় বা অন্য কোনো মৃত মুসলিমের উদ্দেশ্যে সাওয়াব উৎসর্গ করেননি। যদি এ আমলের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তি উপকৃত হতো, তবে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই তা করতেন এবং উম্মতকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিতেন। কারণ তিনি ছিলেন উম্মতের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ও কল্যাণকামী। একইভাবে খুলাফায়ে রাশেদীন ও অন্যান্য সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)ও তাঁর যথাযথ অনুসরণ করেছেন; অথচ তাঁদের কারো থেকেই কুরআন তিলাওয়াত করে মৃতের উদ্দেশ্যে সাওয়াব বখশে দেওয়ার কোনো সহীহ প্রমাণ বর্ণিত হয়নি। তাই এ মতের আলেমগণ এটিকে বিদআতী আমল বলে মনে করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “তোমরা নব উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ থেকে সতর্ক থাকো; কেননা প্রত্যেক নব উদ্ভাবিত বিষয়ই বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।” (আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৭; মুসনাদ আহমাদ, হা/১৭১৮৫)। যদিও এটি তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক আলেমের মত, তবুও দলিলের বিচারে এটিই অধিক বিশুদ্ধ মত। তাঁদের যুক্তি হলো, কুরআন তিলাওয়াত জীবিত ব্যক্তির নিজস্ব আমল; এটি মৃত ব্যক্তির আমল নয়। তাই এর সাওয়াব মূলত তিলাওয়াতকারীর জন্যই নির্ধারিত। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿وَأَن لَّيۡسَ لِلۡإِنسَٰنِ إِلَّا مَا سَعَىٰ﴾ — “আর এই যে, মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পায়।” (সূরা আন-নাজম: ৩৯)। অতএব, এ মত অনুযায়ী জীবিত ব্যক্তি নিজের কুরআন তিলাওয়াতের সাওয়াব অন্যের, বিশেষত মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে দেওয়ার শরয়ী অধিকার রাখে না।এ মতটি মালিকী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত, শাফেয়ী মাযহাবের একদল আলেম, সৌদি আরবের স্থায়ী ফাতওয়া কমিটি (আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ), শাইখ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ), শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) প্রমুখ সমসাময়িক আলেমের অভিমত; দলিলের বিচারে অনেক মুহাক্কিক আলেম এটিকেই অধিক বিশুদ্ধ মত হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদাতের সাওয়াব কি মৃতদের নিকট পৌঁছে? মৃত ব্যক্তির সন্তান বা যার পক্ষ থেকেই হোক? উত্তরে তারা বলেছেন: আমরা যতদূর জানি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন তিলাওয়াত করে নিকট আত্মীয় বা অন্য কোনো মৃত ব্যক্তির জন্য ঈসালে সাওয়াব করেন নি। তিলাওয়াতের সাওয়াব যদি মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছত বা এর দ্বারা সে কোনোভাবে উপকৃত হত, তাহলে অবশ্যই তিনি তা করতেন, উম্মতকে বাতলে দিতেন, যেন তাদের মৃতরা উপকৃত হয়। তিনি ছিলেন মুমিনদের ওপর দয়ালু ও অনুগ্রহশীল। তাঁর পরবর্তীতে খুলাফায়ে রাশেদীন ও সকল সাহাবায়ে কেরাম তার যথাযথ অনুসরণ করেছেন, (আল্লাহ তাদের সকলের ওপর সন্তুষ্ট হোন) আমাদের জানা মতে তারা কেউ কুরআন তিলাওয়াত করে ঈসালে সাওয়াব করেন নি। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের আদর্শ অনুসরণ করাই আমাদের জন্য কল্যাণ। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:«اياكم ومحدثات الامور فان كل محدثة بدعة، وكل بدعة ضلالة‏»“খবরদার! তোমরা নতুন আবিষ্কৃত বস্তু থেকে সতর্ক থেকো, কারণ প্রত্যেক নতুন আবিষ্কৃত বস্তু বিদ’আত, আর প্রত্যেক বিদ’আত গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতা।”(আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৯৯৩) তিনি অন্যত্র বলেন:«من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد‏»“যে আমাদের এ দীনে এমন কিছু আবিষ্কার করল, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা পরিত্যক্ত।”(সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫১২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩২৪৮) তাই আমরা বলি, মৃতদের জন্য কুরআন তিলাওয়াত করা বা করানো জায়েয নয়, এর সাওয়াব তাদের নিকট পৌঁছে না, বরং এটা বিদ’আত। এ ছাড়া যেসব ইবাদাতের সাওয়াব মৃতদের নিকট পৌঁছে মর্মে বিশুদ্ধ দলীল রয়েছে তা অবশ্য গ্রহণীয়। যেমন, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সদকা ও হজ করা মর্মে বিশুদ্ধ দলীল রয়েছে। আর যে সব বিষয়ে কোনো দলীল নেই তা বৈধ নয়। তাই প্রমাণিত হলো, কুরআন তিলাওয়াত করে মৃতদের ঈসালে সাওয়াব করা বৈধ নয়, তাদের নিকট এর সাওয়াব পৌঁছায় না, বরং এটা বিদ’আত। এটাই আলেমদের বিশুদ্ধ অভিমত। আর আল্লাহই ভালো জানেন।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৪৪-৪৬ ফাতওয়া নং-২২৩২)
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ডের বর্তমান গ্র্যান্ড মুফতি,যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: জীবিতদের পক্ষ থেকে মৃত ব্যক্তি কোন কোন আমলের দ্বারা উপকৃত হন? শারীরিক ইবাদত ও আর্থিক ইবাদতের মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে? এ বিষয়ে একটি মূলনীতি জানিয়ে দিন।
তিনি উত্তর দেন:ينتفع الميت من الحي بما دل عليه الدليل من الدعاء له والاستغفار له والتصدق عنه والحج عنه والعمرة عنه وقضاء الديون التي عليه وتنفيذ وصاياه الشرعية ، كل ذلك قد دلت الأدلة على مشروعيته‏ .وقد ألحق بها بعض العلماء كل قربة فعلها مسلم وجعل ثوابها لمسلم حي أو ميت‏ ،‏ والصحيح الاقتصار على ما ورد به الدليل ، ويكون ذلك مخصصًا لقوله تعالى‏ : ( وَأَنْ لَيْسَ لِلإِنْسَانِ إِلا مَا سَعَى )”মৃত ব্যক্তি জীবিতদের পক্ষ থেকে কেবল সেই সব আমলের মাধ্যমে উপকৃত হন, যেগুলোর ব্যাপারে শরিয়তের দলিল এসেছে। যেমন,তার জন্য দোয়া করা, তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা,তার পক্ষ থেকে সদকা করা, তার পক্ষ থেকে হজ করা,তার পক্ষ থেকে উমরা করা, তার ওপর থাকা ঋণ পরিশোধ করা, এবং তার বৈধ ওসিয়ত বাস্তবায়ন করা।এসবের বৈধতার ব্যাপারে শরিয়তের সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।কিছু আলেম এ সবের সঙ্গে আরও প্রতিটি নেক আমলকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যদি কোনো মুসলিম তার সওয়াব জীবিত বা মৃত অন্য মুসলিমকে দান করে।কিন্তু সঠিক মত হলো, কেবল যেসব বিষয়ে শরিয়তের দলিল এসেছে, সেগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা। এটাই আল্লাহ তাআলার এই বাণীর ব্যাখ্যা ও বিশেষীকরণ:মানুষ কেবল সেই আমলেরই অধিকারী, যার জন্য সে নিজে চেষ্টা করেছে। (সূরা নাজম: ৩৯; আল-মুনতাক্বা মিন ফাতাওয়াস শাইখ সালিহ আল-ফাওযান; খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৬১)
.
শাইখ (হাফিজাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: জীবিত ও মৃত অবস্থায় পিতা-মাতার জন্য কোন কোন আমল তাদের উপকারে আসে?
তিনি উত্তরে বলেন:الأعمال هي : برهما في حياتهما ، والإحسان إليهما بالقول والعمل ، والقيام بما يحتاجانه من النفقة والسكن وغير ذلك والأنس بهما ، والكلام الطيب معهما وخدمتهما ؛ لقوله تعالى ‏:‏ ( وَقَضَى رَبُّكَ أَلا تَعْبُدُوا إِلا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا) الإسراء‏/‏ 23‏ ،‏ خصوصًا في كبرهما ، أما بعد الممات : فإنه يبقى من برهما أيضًا الدعاء ، والصدقة لهما ، والحج والعمرة عنهما ، وقضاء الديون التي في ذمتهما ، وصلة الرحم المتعلقة بهما ، وكذلك برُّ صديقهما ، وتنفيذ وصاياهما المشروعة‏ “কাজগুলো হলো: জীবিত অবস্থায় পিতা মাতার প্রতি উত্তম আচরণ করা, কথা ও কাজে তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা, তাদের প্রয়োজনীয় খরচ, বাসস্থান ও অন্যান্য চাহিদা পূরণ করা, তাদের সঙ্গ দেওয়া, তাদের সঙ্গে কোমল ও সুন্দর ভাষায় কথা বলা এবং তাদের সেবা করা এসবই তাদের প্রতি সদাচরণের অন্তর্ভুক্ত।কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন:”আর আপনার রব ফায়সালা করেছেন যে, আপনারা কেবল তাঁরই ইবাদত করবেন এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবেন”।(সূরা ইসরা: ২৩) বিশেষ করে যখন তারা বার্ধক্যে উপনীত হন। আর মৃত্যুর পরও তাদের প্রতি সদাচরণ অব্যাহত থাকে। যেমন তাদের জন্য দোয়া করা, তাদের পক্ষ থেকে সদকা করা, তাদের পক্ষ থেকে হজ ও উমরা আদায় করা, তাদের ঋণ পরিশোধ করা, তাদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের বন্ধুদের সম্মান ও সদ্ব্যবহার করা,এবং তাদের বৈধ অসিয়ত বাস্তবায়ন করা।”(আল-মুনতাক্বা মিন ফাতাওয়াস শাইখ সালিহ আল-ফাওযান; খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৬২)
.
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথা পরিষ্কার যে, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করলে মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবে কিনা—এটি একটি ইজতিহাদি ফিকহি মাসআলা, যেখানে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একদল আলেম তা বৈধ বলেছেন, আবার অন্যদল বলেছেন এর পক্ষে সুস্পষ্ট দলিল নেই। শাইখ ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ফাতওয়ায় কোনো ভুল নেই; তিনি একটি মত উল্লেখ করার পাশাপাশি মৃতের জন্য দোয়াকে অধিক উত্তম বলেছেন। তাই এ বিষয়ে মতভেদকে সম্মান করা, আলেমদের বক্তব্য ইনসাফের সঙ্গে বোঝা এবং কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত আমল যেমন দোয়া, সদকা ইত্যাদির প্রতি গুরুত্ব দেওয়াই উচিত। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬
আপনাদের দ্বীনি ভাই: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: