যে ব্যক্তি জেনেশুনে চুরিকৃত পণ্য ক্রয় করে হোক তা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য হোক বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে

প্রশ্ন: যে ব্যক্তি জেনেশুনে চুরিকৃত পণ্য ক্রয় করে হোক তা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে—শরীয়তের দৃষ্টিতে তার এ কাজের বিধান কী?
▬▬▬▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার জন্য। অগণিত দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর, জেনেশুনে চুরিকৃত পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের বিষয়টি বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী একটি মাসআলা। আমাদের সমাজে চুরির ঘটনা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত ব্যবহার কিংবা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে জেনেশুনে চুরিকৃত পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের প্রবণতাও কম নয়। অনেকেই কম দামে পণ্য পাওয়ার লোভে এ ধরনের লেনদেনে জড়িয়ে পড়েন, আবার অনেকে শরীয়তের বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে এমন কাজকে তেমন গুরুতর মনে করেন না। অথচ বাস্তবে চোরের কাছ থেকে চুরিকৃত পণ্য ক্রয় করা কেবল একটি অবৈধ লেনদেনই নয়; বরং এটি চুরি, জুলুম ও অন্যায়কে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করা এবং অপরাধীদের উৎসাহিত করার শামিল। এর ফলে মানুষের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, সমাজে অপরাধের বিস্তার ঘটে এবং পারস্পরিক আস্থা ও নিরাপত্তাবোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এ বিষয়ে ইসলামের সুস্পষ্ট বিধান জানা, এ ধরনের হারাম লেনদেন থেকে নিজেকে বিরত রাখা এবং সমাজে ন্যায়, ইনসাফ ও মানুষের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শরীয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
.
প্রথমত: মূলনীতি হলো চুরি করা পণ্য ক্রয় করা শরীয়তসম্মত নয়; যদিও তা কোনো কাফিরের কাছ থেকে চুরি করা হয়ে থাকে। কারণ চুরিকৃত সম্পদ সত্তাগতভাবেই হারাম এবং তা কারও জন্য বৈধভাবে অধিকারে নেওয়া জায়েয নয়—চাই তা ক্রয়ের মাধ্যমে হোক, উপহার (হেবা) হিসেবে হোক কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রেই হোক।সুতরাং যে ব্যক্তি জানে যে সে যে পণ্যটি কিনতে যাচ্ছে তা চুরি করা, তার ওপর ওয়াজিব হলো চোরকে এ অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করা, তাকে আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবার উপদেশ দেওয়া এবং চুরি করা সম্পদ তার প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করা। যদি মালিকের পরিচয় জানা থাকে এবং তা সম্ভব হয়, তবে পণ্যটি তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা, অথবা অন্তত তাকে কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা আবশ্যক। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি জেনেশুনে চুরিকৃত পণ্য ক্রয় করেছে, সে কবিরা গুনাহগার হয়েছে। তার তওবা তখনই পূর্ণতা লাভ করবে, যখন সে চুরিকৃত সম্পদ প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেবে এবং যে চোরের কাছ থেকে পণ্যটি কিনেছিল তার কাছ থেকে পরিশোধিত অর্থ ফেরত নেবে। কারণ, চোরের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করা মূলত তাকে পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করা, তার অপরাধকে উৎসাহিত করা এবং অন্যায় প্রতিরোধের ইসলামী দায়িত্ব পরিত্যাগ করার শামিল।তদুপরি,শরীয়তসম্মত ক্রয়-বিক্রয়ের মৌলিক শর্তগুলোর একটি হলো—বিক্রেতা বিক্রিত বস্তুর বৈধ মালিক হতে হবে। যেহেতু চোর সেই সম্পদের মালিক নয়, তাই তার বিক্রয় বৈধ নয় এবং এর ভিত্তিতে সম্পাদিত ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তিও বাতিল।আশ-শাইখ আল-বুহূতী (রহিমাহুল্লাহ) বিক্রয় চুক্তি সঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার শর্তাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন:الشَّرْطُ الرَّابِعُ : أَنْ يَكُونَ الْمَبِيعُ مَمْلُوكًا لِبَائِعِهِ وَقْتَ الْعَقْدِ مِلْكًا تَامًّا ، أَوْ مَأْذُونًا لَهُ فِي بَيْعِهِ وَقْتَ إيجَابٍ وَقَبُولٍ … فَإِنْ بَاعَ مِلْكَ غَيْرِهِ بِغَيْرِ إذْنِهِ لَمْ يَصِحَّ الْبَيْعُ”চতুর্থ শর্ত: চুক্তি সম্পাদনের সময় বিক্রিত বস্তু বা পণ্যটি বিক্রেতার পূর্ণ মালিকানাধীন হতে হবে, অথবা চুক্তি সম্পাদনের মুহূর্তেই (ইজাব ও কবুলের সময়) তা বিক্রি করার অনুমতিপ্রাপ্ত হতে হবে…অতএব, কেউ যদি অনুমতি ছাড়া অন্যের মালিকানাধীন বস্তু বিক্রি করে, তবে সেই বিক্রি সঠিক (সহীহ) হবে না।”(কাশশাফুল ক্বিনা’: ৩/১৮০)
.
অতএব, এ ধরনের ক্রয়-বিক্রয় বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো পাপের কাজে সহযোগিতা করাও হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ﴾—“তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করো; কিন্তু পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।”(সূরা আল-মায়িদাহ: ২)।
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যাতে ইমাম ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) ও ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এখানে আল্লাহ তা‘আলা মুমিন ব্যক্তিদেরকে ভালো কাজে সহযোগিতা করতে আদেশ করেছেন এবং অন্যায়, অসৎ ও হারাম কাজে সাহায্য, সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছেন’ (তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/১২; তাফসীরে কুরতুবী: ৬/৪৬-৪৭) এ ছাড়াও বহু কুরআনি আয়াত ও সহীহ হাদীস প্রমাণ করে যে, কোনো পাপীকে তার পাপে সহযোগিতা করা নিজেও একটি পাপ।
.
দ্বিতীয়ত: জেনেশুনে চুরিকৃত পণ্য ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত বিষয়ে পূর্ববর্তী আলেমদের ফতোয়াসমূহ নিম্নরূপ:
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেন:
الأموال المغصوبة والمقبوضة بعقود لا تباح بالقبض إن عرفه المسلم : اجتنبه ، فمن علمتُ أنه سرق مالاً ، أو خانه في أمانته ، أو غصبه فأخذه من المغصوب قهراً بغير حق : لم يجز لي أن آخذه منه ، لا بطريق الهبة ، و لا بطريق المعاوضة ، و لا وفاء عن أجرة ، ولا ثمن مبيع ، و لا وفاء عن قرض ، فإن هذا عين مال ذلك المظلوم “
“জবরদখলকৃত সম্পদ এবং অগ্রহণযোগ্য চুক্তির মাধ্যমে গ্রহণ করা সম্পদ দখলে নেওয়ার মাধ্যমে বৈধ হয় না। যদি মুসলিম তা জানতে পারে, তাহলে সে এর থেকে বিরত থাকবে। যে ব্যক্তি সম্পর্কে আমি জানি যে সে কারো সম্পদ চুরি করেছে বা আমানতের খিয়ানত করেছে বা অন্যায়ভাবে জোর করে কারো সম্পদ দখল করেছে: আমার জন্য তার কাছ থেকে তা নেওয়া জায়েয নয় — না হেবা বা উপহারের মাধ্যমে, না বিনিময় হিসেবে, না মজুরির পরিশোধ হিসেবে, না বিক্রয়মূল্য হিসেবে, আর না ঋণ পরিশোধ হিসেবে। কেননা এটি সেই মজলুমের নিজের সম্পদ।”[ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ৩২৩]
.
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ আরও বলেন:وإن كان الذي معهم – أي : التتار – أو مع غيرهم أموال يعرف أنهم غصبوها من معصوم : فتلك لا يجوز اشتراؤها لمن يتملكها ، لكن إذا اشتُريت على طريق الاستنقاذ لتصرف في مصارفها الشرعية فتعاد إلى أصحابها إن أمكن ، وإلا صرفت في مصالح المسلمين : جاز هذا “তাদের (অর্থাৎ তাতারদের) কাছে বা অন্য কারো কাছে যদি এমন সম্পদ থাকে যা তারা কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির কাছ থেকে জোরপূর্বক নিয়েছে বলে জানা যায়, তাহলে যে ব্যক্তি তা নিজের অধিকারে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ক্রয় করতে চায় তার জন্য তা ক্রয় করা জায়েয নয়। তবে যদি উদ্ধার করার লক্ষ্যে ক্রয় করা হয় যাতে শরীয়তসম্মত খাতে ব্যয় করা যায়, তাহলে সম্ভব হলে মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিবে। নতুবা মুসলিমদের কল্যাণে ব্যয় করা জায়েয হবে।”[ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ২৭৬]
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন:
إذا تيقن الإنسان من كون السلعة المعروضة للبيع أنها مسروقة ، أو مغصوبة ، أو أن مَن يعرضها لا يملكها ملكاً شرعيّاً ، وليس وكيلاً في بيعها : فإنه يحرم عليه أن يشتريها ؛ لما في شرائها من التعاون على الإثم والعدوان ، وتفويت السلعة على صاحبها الحقيقي ؛ ولما في ذلك من ظلم الناس ، وإقرار المنكر ، ومشاركة صاحبها في الإثم ، قال الله تعالى : ( وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ) المائدة/2 .
وعلى ذلك ينبغي لمن يعلم أن هذه السلعة مسروقة أو مغصوبة أن يقوم بمناصحة من سرقها برفق ولين وحكمة ليرجع عن سرقته ، فإن لم يرجع وأصر على جرمه : فعليه أن يبلغ الجهات المختصة بذلك ليأخذ الفاعل الجزاء المناسب لجرمه ، ولرد الحق إلى صاحبه ، وذلك من باب التعاون على البر والتقوى ؛ ولأن في ذلك ردعا للظالم عن ظلمه ، ونصرة له وللمظلوم .
ولذلك ثبت في الحديث الذي رواه أنس رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ( انصر أخاك ظالما أو مظلوما ) قالوا : يا رسول الله : هذا ننصره مظلوماً ، فكيف ننصره ظالماً ؟ قال : ( تأخذ فوق يديه ) أخرجه البخاري في صحيحه وأخرج الإمام أحمد في ” المسند ” نحوه ، وفي رواية أخرى : فقال رجل : يا رسول الله : أنصره إذا كان مظلوماً ، أفرأيت إذا كان ظالما كيف أنصره ؟ قال : ( تحجزه عن الظلم ، فإن ذلك نصره ) .وعلى ذلك : فإن نصر الظالم بردعه عن ظلمه ، واعتدائه ، ونصر المظلوم بالسعي في رد حقه عليه ، ومنع الظالم من تمكينه من إيذائه هو فرض كفاية ، فإذا لم يوجد من يقوم بذلك بصفة رسمية ، أو من هو أقوى منه في الأخذ على يد الظالم والعاصي لله ، وردعه عن ظلمه وجرمه : تعين الأمر عليه حسب قدرته واستطاعته ، مع الرفق واللين ، وله الأجر والثواب على ذلك ، إن شاء الله تعالى”
“যদি কোনো ব্যক্তি নিশ্চিত হয় যে বিক্রয়ের জন্য উপস্থাপিত পণ্যটি চুরি বা ছিনতাই করা অথবা যে ব্যক্তি তা উপস্থাপন করছে সে শরীয়তসম্মতভাবে এর মালিক নয় এবং তা বিক্রয়ে অনুমোদনপ্রাপ্ত ব্যক্তি নয়, তাহলে তা ক্রয় করা তার জন্য হারাম। কারণ এই ক্রয়ের মধ্যে রয়েছে পাপ ও সীমালঙ্ঘনে পারস্পরিক সহযোগিতা, প্রকৃত মালিকের কাছ থেকে পণ্য ছিনিয়ে নেওয়া, মানুষের উপর যুলুম করা, অন্যায়কে স্বীকৃতি দেওয়া এবং পাপে তার অংশীদার হওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন:وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ“সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পর সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করো না।”[সূরা আল-মায়িদাহ: ২] সুতরাং যে ব্যক্তি জানে যে এই পণ্যটি চুরি করা বা ছিনতাই করা, তার উচিত নম্রতা, কোমলতা ও প্রজ্ঞার সাথে চোরকে উপদেশ দেওয়া যাতে সে চুরি থেকে ফিরে আসে। যদি সে না ফেরে এবং তার অপরাধে অটল থাকে, তাহলে তার উপর দায়িত্ব হলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো, যাতে অপরাধী তার অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি পায় এবং অধিকার তার মালিকের কাছে ফিরে আসে। আর এটি সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত। কেননা এতে যালিমকে তার যুলুম থেকে বিরত রাখা এবং যালিম ও মযলুম উভয়কে সাহায্য করা হয়।এ কারণেই হাদীসে এসেছে, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে যালিম হোক বা মযলুম।” সাহাবীরা বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল! এই মযলুমকে সাহায্য করব, তা তো বুঝলাম, কিন্তু যালিমকে কীভাবে সাহায্য করব?” তিনি বললেন: ‘তার হাত ধরে রাখবে (অর্থাৎ তাকে যুলুম থেকে বিরত রাখবে)।’[বুখারী তার সহীহ গ্রন্থে এটি বর্ণনা করেছেন, এবং ইমাম আহমাদ মুসনাদে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।] আরেকটি বর্ণনায় রয়েছে: এক ব্যক্তি বললেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! মযলুম হলে সাহায্য করব, কিন্তু জালিম হলে কীভাবে সাহায্য করব?’ তিনি বললেন: “তাকে যুলুম থেকে বিরত রাখবে, কেননা এটিই তার সাহায্য।”সুতরাং, যালিমকে সাহায্য করার অর্থ তাকে তার যুলুম ও সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত রাখা এবং মযলুমকে সাহায্য করার অর্থ তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা এবং যালিমকে তাকে কষ্ট দেওয়া থেকে বাধা দেওয়া। এটি ফরযে কিফায়া। যদি সরকারিভাবে বা অধিক শক্তিমানের পক্ষ থেকে এ কাজ করার কেউ না পাওয়া যায়, তাহলে তার সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী নম্রতা ও কোমলতার সাথে এটি করা তার উপর কর্তব্য হয়ে পড়ে। আর এর জন্য সে ইনশাআল্লাহ সওয়াব ও পুরস্কার পাবে।”[শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে বায, শাইখ আব্দুল আযীয আলুশ শাইখ, শাইখ সালেহ আল-ফাউযান, শাইখ বকর আবু যাইদ।”[ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ৮২, ৮৩]
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:“আমার কাছে এমন একটি পণ্য উপস্থাপন করা হয়েছে যা চুরি করা বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। তবে যে তা উপস্থাপন করেছে সে চোর নয়, বরং সে তা এমন একজনের কাছ থেকে কিনেছে যে চোরের কাছ থেকে কিনেছিল। আমি যদি এটা জেনেও তা কিনি তাহলে কি আমি গুনাহগার হব, যদিও আমি সেই মালিককে চিনি না যার কাছ থেকে চুরি করা হয়েছে?”
তিনি উত্তরে বলেন:الذي يظهر من الأدلة الشرعية : أنه لا يجوز لك شراؤها إذا اتضح لك أو غلب على ظنك أنها مسروقة ؛ لقول الله سبحانه : ( وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ) ؛ ولأنك تعلم أو يغلب على ظنك أن البائع ليس مالكاً لها شرعاً ، ولا مأذوناً له شرعاً في بيعها ، فكيف تعينه على ظلمه فتأخذ مال غيرك بغير حق ، نعم إذا أمكن شراؤها للاستنقاذ وردها إلى مالكها : فلا بأس ، إذا لم يتيسر أخذها بالقوة ، وعقوبة الظالم ، أما إذا أمكن أخذها بالقوة وعقوبة الظالم بعقوبته الشرعية : فهذا هو الواجب للأدلة المعلومة من الحديث ( انصر أخاك ظالما أو مظلوماً … ) الحديث”“শরীয়তের দলিলসমূহ থেকে যা স্পষ্ট হয়: যদি তোমার কাছে স্পষ্ট হয় বা প্রবল ধারণা হয় যে এটি চুরি করা, তাহলে তা ক্রয় করা তোমার জন্য জায়েয নয়। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার বাণী:وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ “পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সহায়তা করো না।” আর এ কারণে যে, তুমি জানো বা তোমার প্রবল ধারণা হয় যে বিক্রেতা শরীয়ত অনুসারে এর মালিক নয় এবং তা বিক্রয়ে তাকে শরীয়ত অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাহলে তুমি কীভাবে তার যুলুমে তাকে সহায়তা করবে এবং অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করবে? হ্যাঁ, যদি উদ্ধারের উদ্দেশ্যে এবং মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তা ক্রয় করা সম্ভব হয়, তাহলে কোনো সমস্যা নেই, যদি জোর করে তা নেওয়া সম্ভবপর না হয় এবং যালিমকে শাস্তি দেওয়া সম্ভবপর না হয়। তবে যদি জোর করে তা নেওয়া এবং তাকে শরীয়তসম্মত শাস্তি দেওয়া সম্ভবপর হয়, তাহলে সেটি করাই ওয়াজিব হবে। উক্ত হুকুম এই হাদীসের উপর ভিত্তি করে: “তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে যালিম হোক বা মযলুম।”[মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ; খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ৯১, ৯২]
.
অতএব, উল্লেখিত কুরআন, সুন্নাহ এবং পূর্ববর্তী ও সমকালীন আলেমদের বক্তব্য থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, কোনো ব্যক্তি যদি নিশ্চিতভাবে জানে বা প্রবল ধারণা হয় যে কোনো পণ্য চুরি করা, তবে তা ব্যক্তিগত ব্যবহার বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ক্রয় করা তার জন্য বৈধ নয়। তবে অনেক সময় এমনও হয় যে, কোনো পণ্য স্বাভাবিক মূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি করা হচ্ছে। তখন প্রশ্ন দেখা দেয়—শুধু কম দাম দেখেই কি সেটিকে চুরি করা বলে ধরে নেওয়া হবে? নাকি এ ক্ষেত্রে শরীয়তের নির্ধারিত কোনো নীতিমালা রয়েছে? এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও নীতিগত একটি দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। ইমাম (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: এমন কোনো পণ্য কেনা কি জায়েজ আছে, যার দাম স্বাভাবিকের তুলনায় কম হওয়ায় সেটি চুরি হওয়া আশঙ্কা করা হয়?
উত্তরে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনهذا احتمال له درجات، والأحكام لا تُبنى على الظنون والأوهام ؛ فإذا كان الاحتمال قائما على غلبة الظن ؛ حينئذ لا يجوز شراء البضاعة هذه ، وجُلّ الأحكام الشرعية إنما تُبنى على ما يغلب على ظن المكلف ، أما مجرد خاطر خطر : فهذا لا يجوز الانسياق والتجاوب معه؛ لأنه يؤدّي إلى الوسوسة وإلى الأوهام”এই আশঙ্কার বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে। আর শরিয়তের বিধান কোনো ধারণ বা অমূলক কল্পনার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয় না। সুতরাং, যদি সম্ভাবনাটি প্রবল ধারণার স্তরে উন্নীত হয়, তবে সে ক্ষেত্রে সেই পণ্য কেনা জায়েজ নয়। মূলত অধিকাংশ শরিয়তসম্মত বিধানই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির (মুকাল্লিফ) প্রবল ধারণার ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে, মনে উদিত হওয়া কেবল ক্ষণস্থায়ী কোনো খটকার পেছনে চলা এবং তাতে সাড়া দেওয়া জায়েজ নয়; কারণ এটি মানুষকে কুমন্ত্রণা (ওয়াসওয়াসা) ও অমূলক কল্পনার দিকে নিয়ে যায়।”(ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-২৬৯০০৭) অর্থাৎ শাইখ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর এই ফতোয়া থেকে বোঝা যায় যে, শরীয়তের বিধান নিছক সন্দেহ, কল্পনা বা ওয়াসওয়াসার ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং যখন কোনো পণ্য চুরি হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত জ্ঞান বা প্রবল ধারণা (غلبة الظن) সৃষ্টি হয়, তখন তা ক্রয় করা হারাম। পক্ষান্তরে, কেবলমাত্র অমূলক সন্দেহ বা ভিত্তিহীন ধারণার কারণে কোনো মুসলিমের সম্পদকে চুরিকৃত বলে ধরে নেওয়া কিংবা তার সঙ্গে লেনদেন বর্জন করা শরীয়তের ন্যায়বিচার ও ভারসাম্যের পরিপন্থী। তাই একজন মুসলিমের কর্তব্য হলো—একদিকে চুরি ও পাপের কাজে কোনো ধরনের সহযোগিতা না করা, অন্যদিকে আবার প্রমাণহীন সন্দেহ ও ওয়াসওয়াসা থেকেও নিজেকে রক্ষা করা।(গৃহীত: ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৯৩০৩১; ২৬৯০০৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: