বদলি হজ্বের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিয়মাবলি

ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি।অতঃপর মহান আল্লাহ সামর্থ্যবান ও শরয়ীভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রত্যেক মুসলিমের উপর জীবনে একবার হজ্ব ফরজ করেছেন এবং এটিকে ইসলামের অন্যতম মহান রুকন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।এটি দ্বীনের এমন এক অকাট্য ও সর্বজনবিদিত বিধান, যা প্রত্যেক মুসলিমের জানা আবশ্যক। অতএব, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, তাঁর আদেশের আনুগত্য এবং তাঁর প্রতিদানের আশা ও শাস্তির ভয় অন্তরে ধারণ করে মুসলমানের উপর ফরজ ইবাদতসমূহ যথাযথভাবে পালন করা অপরিহার্য।এ বিশ্বাসও হৃদয়ে দৃঢ় রাখা প্রয়োজন যে, মহান আল্লাহ তাঁর সকল বিধান ও ফয়সালায় পরম প্রজ্ঞাময় ও অসীম দয়ালু। তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য কেবল সেসব বিধানই নির্ধারণ করেছেন, যেগুলোর মধ্যে তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ ও উপকার নিহিত রয়েছে। অতএব, বিধানদানের একমাত্র অধিকার তাঁরই; আর বান্দার দায়িত্ব হলো তাঁর বিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও আত্মসমর্পণ করা।এই প্রেক্ষাপটে, বদলি হজ্ব—অর্থাৎ অন্যের পক্ষ থেকে হজ্ব পালন—একটি গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী ইবাদত। তাই এ ইবাদত বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য শরিয়ত নির্ধারিত কিছু প্রয়োজনীয় শর্ত, বিধান ও আদব সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। নিম্নে সে বিষয়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
.
(১).যে ব্যক্তি শারীরিকভাবে সুস্থ এবং নিজেই নিজের পক্ষ থেকে হজ্ব পালনে সক্ষম, তিনি অন্য কাউকে দিয়ে বদলি হজ্ব করানো বা তার পক্ষ থেকে অন্য কেউ হজ্ব করলে তা শুদ্ধ হবে না।
.
​(২).বদলি হজ্ব কেবল ওই ব্যক্তির পক্ষ থেকেই বৈধ, যার উপরে হজ্ব ফরজ হয়েছিল কিন্তু তিনি হজ্ব করার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছেন অথবা জীবিত থাকলেও আর্থিকভাবে সক্ষম; কিন্তু বার্ধক্য বা এমন স্থায়ী শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত, যার থেকে সুস্থ হওয়ার কোনো আশা নেই,যার ফলে তিনি সৌদি আরব গিয়ে হজ্ব করতে অক্ষম। তবে মনে রাখতে হবে, যে ব্যক্তি আর্থিকভাবে অক্ষম কিংবা নিরাপত্তা, ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞা বা অনুরূপ বাহ্যিক প্রতিবন্ধকতার কারণে হজ্বে যেতে পারছেন না—তার পক্ষ থেকে বদলি হজ্ব আদায় করা বৈধ নয়।
.
​(৩).আবারও বলছি, যার সাময়িক কোনো ওজর বা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এবং যা অচিরেই দূর হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তার পক্ষ থেকে বদলি হজ্ব করা জায়েজ নয়। যেমন: এমন কোনো নারী যার সাথে সফর করার মতো আপাতত কোনো মাহরাম নেই, অথবা এমন কোনো ব্যক্তি যার আইডেন্টিটি কার্ড বা পরিচয়পত্র নেই, কিংবা যাকে তার রাষ্ট্র কোন কারনে সফরে যেতে বাধা দিচ্ছে। কারণ, এই ব্যক্তিদের অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে এবং পরিস্থিতির বদলও হতে পারে, যার ফলে তারা পরবর্তীতে নিজেরাই হজ্বের কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হতে পারেন। এটি সেই ব্যক্তির মতো নয়, যার শারীরিক অক্ষমতা স্থায়ী ও চিরস্থায়ী।
.
(৪).যার হজ্ব করার মত আর্থিক সামর্থ্য না হওয়ার কারণে হজ্ব করতে পারেননি এমন ব্যক্তিকে প্রতিনিধি করে কারো পক্ষ থেকে বদলি হজ্বে পাঠানো বৈধ কিনা মাসআলা কিছুটা মতভেদ থাকলেও গ্রহণযোগ্য কথা হলো এমনটি জায়েজ নয় কারণ রাসূল (ﷺ) জৈনক সাহাবীকে নিজের হজ্ব আদায় করেনি বলে শুবরুমার পক্ষ থেকে বদলি হজ্ব করার অনুমতি দেননি।
.
(৫).বদলি হজ্জের ক্ষেত্রে নিয়ত ছাড়া পদ্ধতিগত আর কোন পার্থক্য নেই। অর্থাৎ সে ব্যক্তি নিয়ত করবে যে, তিনি এ অমুক ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করছেন। তালবিয়ার সময় নাম উল্লেখ করে বলবে: ‘লাব্বাইকা আন ফুলান’ (অর্থ- অমুক ব্যক্তির পক্ষ থেকে আমি হাজির)। এরপর হজ্জের মধ্যে দোয়া করার সময় নিজের জন্য দোয়া করবে এবং যার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করছে তার জন্যেও দোয়া করবে।
.
৬.দারিদ্র্যের কারণে কারো ওপর হজ্ব ফরজ না হলে, তার পক্ষ থেকে হজ্ব করার প্রয়োজন নেই। বদলি হজ্ব মূলত তাদের জন্যই প্রযোজ্য যাদের ওপর হজ্ব ফরজ হওয়া সত্ত্বেও স্থায়ীভাবে শারীরিক সক্ষমতার অভাবে তা পালন করতে পারছেন না।
.
​৭.আর বদলি হজ্জকারী; আত্মীয়ের পক্ষ থেকে বদলি হজ্জকারী হোক কিংবা অনাত্মীয় কারো পক্ষ থেকে বদলি হজ্জকারী হোক তাকে অবশ্যই বদলি হজ্জের আগে নিজের হজ্জ আদায় করেছে এমন হতে হবে। নিজের ওপর ফরজ হওয়া হজ্ব সম্পন্ন না করে অন্য কারো পক্ষ থেকে হজ্ব করা বৈধ নয়।যদি কেউ প্রতিনিধি হয়ে এমনটি করেন,আলেমদের মতামত অনুযায়ী সেটি তার নিজের পক্ষ থেকেই গণ্য হবে, অন্যের পক্ষ থেকে নয়।
.
​৮.একজন পুরুষ অন্য নারী বা পুরুষের পক্ষ থেকে এবং একজন নারী অন্য পুরুষ বা নারীর পক্ষ থেকে বদলি হজ্ব করতে পারেন।
.
​৯.মনে রাখবেন, একই বছরে একজন ব্যক্তি একই সাথে একাধিক ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্ব করতে পারবেন না।তবে তিনি চাইলে নিজের পক্ষ থেকে বা অন্য কারো পক্ষ থেকে উমরাহ করতে পারেন, কিন্তু হজ্বটি করতে হবে কেবল একজনের পক্ষ থেকেই।
.
​১০.বদলি হজ্ব করার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ইবাদত সম্পাদন, পবিত্র স্থানসমূহ জিয়ারত এবং কোনো মুমিনের উপকার করা। অর্থ উপার্জন বা ব্যবসায়িক মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে এটি করা শরীয়ত সম্মত নয়।
.
​১১.কোনো ব্যক্তি হজ্ব ফরজ হওয়ার পর তা আদায় না করেই মৃত্যুবরণ করলে, তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে হজ্ব করানো ওয়াজিব, সে অসিয়ত করে থাকুক বা না থাকুক এটাই বিশুদ্ধ মত।
.
​১২.বিশুদ্ধ মতানুসারে, বদলি হজ্বের ক্ষেত্রে প্রতিনিধি যে ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্ব আদায় করেন, হজ্বের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল আমল ও ইবাদতের যেমন তাওয়াফ, সাঈ, আরাফায় অবস্থান, মুযদালিফায় অবস্থান ইত্যাদির মূল সওয়াব সেই ব্যক্তির আমলনামায়ই লিপিবদ্ধ হবে। তবে হজ্ব পালনকালে প্রতিনিধি নিজে যে অতিরিক্ত ইবাদত, দোয়া, যিকির, কুরআন তিলাওয়াত বা অন্যান্য নেক আমল করবেন, সেগুলোর সওয়াব তিনি নিজেও লাভ করবেন। পাশাপাশি প্রতিনিধি যদি আন্তরিকতা, ইখলাস, সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি, যথাযথ আদব ও বিধিবিধান মেনে হজ্ব সম্পন্ন করেন, তাহলে তিনিও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি, বিশেষ সওয়াব ও কল্যাণ লাভের আশা রাখতে পারেন; বরং আল্লাহর ইচ্ছায় তিনিও হজ্বের বরকতে গুনাহমুক্ত ও পবিত্র হয়ে ফিরে আসতে পারেন—ইনশাআল্লাহ।
.
​১৩.বদলি হজ্ব করার ক্ষেত্রে উত্তম হলো সন্তান তার বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে এবং নিকটাত্মীয়রা একে অপরের পক্ষ থেকে হজ্ব পালন করা। তবে প্রয়োজনে অপরিচিত কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে দিয়েও বদলি হজ্ব করানো জায়েজ।
.
​১৪.হজ্ব পালনের সময় যার পক্ষ থেকে বদলি হজ্ব করা হচ্ছে, তার নাম মুখস্থ থাকা জরুরি নয়; বরং অন্তরে তার পক্ষ থেকে আদায় করার নিয়ত থাকাই যথেষ্ট।
.
​১৫.যাকে বদলি হজ্বের দায়িত্ব (উকালতি) দেওয়া হয়েছে, তিনি যার পক্ষ থেকে হজ্ব করছেন তার অনুমতি ছাড়া অন্য কাউকে এই দায়িত্ব হস্তান্তর করতে পারবেন না।
.
​১৬.নফল হজ্বের ক্ষেত্রে বদলি বা প্রতিনিধি নিয়োগ করা শরীয়তসম্মত কিনা এই বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।কেউ কেউ জায়েজ বললেও (আল্লাহু আলম) আমরা নিষিদ্ধের মতকে অধিক বিশুদ্ধ মনে করি যেমনটি আমাদের ইমাম ইবনু উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ প্রাধান্য দিয়েছেন।কেউ যদি প্রশ্ন করেন নফল হজ্ব কোনটি জবাব হচ্ছে,প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য জীবনে একবার হজ্ব ফরজ।ফরজ আদায়ের পর তিনি যদি পুনরায় হজ্ব করতে চান তবে পরবর্তী প্রত্যেকটিই তার জন্য নফল হিসেবে গণ্য হবে।
.
​১৭.যিনি অন্যের পক্ষ থেকে হজ্ব আদায় করেন, তিনি মূলত হজ্ব ও হজ্ব-সংশ্লিষ্ট যাবতীয় আমল সেই ব্যক্তির পক্ষ থেকেই সম্পাদন করেন। তাই দোয়ার স্থানগুলোতে উত্তম ও অধিকতর পরিপূর্ণ আদব হলো—যার প্রতিনিধি হয়ে হজ্ব করছেন তার জন্য দোয়া করা পাশাপাশি নিজেকেও সেই দোয়ায় শামিল করা। কারণ প্রতিনিধি হিসেবে হজ্ব আদায়ের দাবি হলো ইখলাস, বিশ্বস্ততা ও তাকওয়ার পরিচয় বহন করা। অতএব, কেউ যদি কেবল নিজের জন্যই দোয়া করে এবং যার পক্ষ থেকে হজ্ব করছে তাকে দোয়ায় অন্তর্ভুক্ত না করে, তবে তা উত্তম আচরণ ও তাকওয়ার পরিপূর্ণতার পরিপন্থী বটে; তবে এর দ্বারা হজ্বের শুদ্ধতার কোনো ক্ষতি হবে না, হজ্ব সহীহই গণ্য হবে।
.
১৮.সবশেষে, বদলি হজ্বের জন্য এমন ব্যক্তিকে নির্বাচন করা উচিত, যিনি দ্বীনদার, সৎ, বিশ্বস্ত ও আমানতদার; বিশুদ্ধ সুন্নাহর অনুসারী; এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে হজ্বের বিধি-বিধান, শর্ত, ওয়াজিব ও করণীয় বিষয়সমূহ সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা রাখেন, যাতে তিনি সঠিক পদ্ধতিতে হজ্বের দায়িত্ব আদায় করতে সক্ষম হন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
​আপনাদের দ্বীনি ভাই: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: