প্রশ্ন: আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমরাই (জ্ঞানীরাই) তাঁকে ভয় করে।”[সূরা ফাতির: ২৮] আয়াতে ভয় (খাশিয়াত) কার দিকে ফিরে যায়? আমরা তো সবাই জানি,আল্লাহ কাউকে ভয় করেন না; বরং বান্দারাই তাঁকে ভয় করে। আয়াতটির বিশুদ্ধ তাফসির কি?
▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর:আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: (إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ) “আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমরাই (জ্ঞানীরাই) তাঁকে ভয় করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী ও পরম ক্ষমাশীল।” [সূরা ফাতির: ২৮]
.
উক্ত আয়াতে আরবি ব্যাকরণিক বিন্যাসটি অত্যন্ত চমৎকার; কারন আয়াতে ‘আল-উলামাউ’ (علماءُ) শব্দটি ‘ফায়েল’ (কর্তা) এবং আল্লাহর পবিত্র নাম ‘আল্লাহ’ (اللهَ) শব্দটি ‘মাফউল’ (কর্ম)। আরবি অলঙ্কারশাস্ত্র (বালাগাত)
অনুযায়ী, এখানে কর্মকে (Object) কর্তার (Subject) আগে নিয়ে আসা হয়েছে ‘সীমাবদ্ধতা’ বা ‘হাসর’ (Restriction) বোঝানোর জন্য। এর ফলে আয়াতের মূল দাবিটি দাঁড়ায়—ভয় পাওয়ার উপযুক্ত সত্তা হিসেবে কেবল আল্লাহকেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং সেই ভয়ের গুণটি কেবল আলেমদের মাঝে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ, মহান আল্লাহর মাহাত্ম্য ও পরিচয় সম্পর্কে সম্মুখ জ্ঞান রাখেন বলেই কেবল আলেমরাই তাঁকে যথাযথভাবে ভয় করেন।পক্ষান্তরে,যদি বাক্যটিতে ব্যাকরণের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ফায়েল বা আলেমদের আগে আনা হতো, তবে অর্থ হতো—আলেমরা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না; যা সকল ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত নয়। কারণ আলেমদের মধ্যেও অনেকে আল্লাহ ছাড়া অন্যকে ভয় পেতে পারেন, সুতরাং এর মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, মহান রবের পরিচয় ও তাঁর জালালিয়াত যার হৃদয়ে উদ্ভাসিত হবে, তার পক্ষে তাঁকে ভয় না করা অসম্ভব—আর এই জ্ঞানলব্ধ ভীতিই আলেমদের মূল বৈশিষ্ট্য। আয়াতটির তাফসিরে সৌদি আরবের প্রথিতযশা মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আস-সা‘দী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৩৭৬ হি./১৯৫৬ খ্রি.] বলেছেন,” فكل من كان بالله أعلم ، كان أكثر له خشية ، وأوجبت له خشية الله ، الانكفاف عن المعاصي ، والاستعداد للقاء من يخشاه، وهذا دليل على فضيلة العلم، فإنه داع إلى خشية الله، وأهل خشيته هم أهل كرامته، كما قال تعالى: رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ذَلِكَ لِمَنْ خَشِيَ رَبَّهُ”
“যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্পর্কে যত বেশি অবগত হবে, আল্লাহর প্রতি তার খাশিয়াত (শ্রদ্ধাপূর্ণ ভয়) তত বৃদ্ধি পাবে। আর আল্লাহর এই ভয় তাকে পাপাচার থেকে বিরত থাকতে এবং যার ভয় সে অন্তরে পোষণ করে, সেই মহান সত্তার সাথে সাক্ষাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করাকে অনিবার্য করে তুলবে। এটি ইলম বা জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বের এক অকাট্য দলিল; কারণ ইলম মানুষকে আল্লাহর ভয়ের দিকেই আহ্বান করে। আর যারা আল্লাহকে ভয় করে, তারাই মূলত তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ ও সম্মানের অধিকারী; যেমনটি মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: ‘আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। এই পুরস্কার কেবল তার জন্য, যে তার পালনকর্তাকে ভয় করে।’ (সূরা আল-বায়্যিনাহ: ৮; তয়সীরুল কারীমুর রাহমান ফী তাফসীরি কালামিল মান্নান (তাফসীরে আস-সা’দী), পৃষ্ঠা: ৬৮৮)
.
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি,অনেকে সূরা ফাতির ২৮ আয়াতটির ভুল ব্যাখ্যা করে মনে করেন, কেবল জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান বা শরয়ি বিদ্যায় পারদর্শী হলেই মানুষ এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। অথচ আয়াতটির প্রকৃত উদ্দেশ্য তা নয়। কেবল আরবী ভাষা, ব্যাকরণ-অলংকারাদি সম্পর্কে জ্ঞানী ব্যক্তিকেই কুরআনের পরিভাষায় ‘আলেম’ বলা হয় না।কেননা যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে না সে যুগের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত হলেও এ জ্ঞানের দৃষ্টিতে সে নিছক একজন মুর্খ ছাড়া আর কিছুই নয়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর গুণাবলী জানে এবং নিজের অন্তরে তাঁর ভীতি পোষণ করে সে অশিক্ষিত হলেও জ্ঞানী। তবে কারও ব্যাপারে তখনই এ আয়াতটির প্রয়োগ ক্ষেত্রে পরিণত হবে যখন তাদের মধ্যে আল্লাহভীতি থাকবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও এক হাদীসে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন, “যদি আমি যা জানি তা তোমরা জানতে তবে হাসতে কম কাঁদতে বেশী।” [বুখারী: ৬৪৮৬, মুসলিম: ২৩৫৯]এর কারণ, রাসূল আল্লাহকে সবচেয়ে বেশী জানেন, তার তাকওয়াও সবচেয়ে বেশী।সুতরাং আয়াতটি এটি বুঝাচ্ছে না যে, প্রত্যেক জ্ঞানীই আল্লাহকে ভয় করে; বরং এর মর্মার্থ হলো—যে ব্যক্তি আল্লাহকে সত্যিকার অর্থে ভয় করে, সেই-ই প্রকৃত জ্ঞানী। কারণ আল্লাহর মহিমা, তাঁর ক্ষমতা ও গুণাবলী সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধি না থাকলে, মানুষের অর্জিত জাগতিক জ্ঞান তাকে তার চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয় না। সেজন্যই বলা হয়,জ্ঞান যত গভীর হয়, অন্তরে বিনয় ও শ্রদ্ধা তত বৃদ্ধি পায়।তাই কেবল বাহ্যিক তথ্য বা বিজ্ঞান নয়, বরং যে জ্ঞান মানুষকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে এবং আল্লাহর আনুগত্যে বাধ্য করে, সেটিই এই আয়াতে বর্ণিত প্রকৃত জ্ঞান;যা তাকওয়াবান আলেমদের মধ্যে বিদ্যমান।
.
এ প্রসঙ্গে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:قال تعالى: ( إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ ) ، وهذا يدل على أن كل من خشي الله فهو عالم ، وهو حق ، ولا يدل على أن كل عالم يخشاه”আল্লাহ্ তাআলা বলেন,“আল্লাহ্কে তারাই ভয় করেন; আল্লাহ্র বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী”[সূরা ফাতির, আয়াত: ২৮] এ বাণীটি প্রমাণ করছে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ্কে ভয় করে সেই জ্ঞানী। এ ব্যাখ্যাই সঠিক। এ বাণীটি এ কথা প্রমাণ করে না যে, প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তিই আল্লাহ্কে ভয় করে।”[মাজমুউল ফাতাওয়া ৭/৫৩৯ থেকে সমাপ্ত]
.
অপর ফাতওয়ায় শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] আরও বলেছেন:” قوله تعالى : ( إنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ ) وَالْمَعْنَى أَنَّهُ لا يَخْشَاهُ إلا عَالِمٌ ; فَقَدْ أَخْبَرَ اللَّهُ أَنَّ كُلَّ مَنْ خَشِيَ اللَّهَ فَهُوَ عَالِمٌ كَمَا قَالَ فِي الآيَةِ الأُخْرَى : ( أَمَّنْ هُوَ قَانِتٌ آنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِداً وَقَائِماً يَحْذَرُ الآخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لا يَعْلَمُونَ ) الزمر/9 “
মহান আল্লাহর বাণী: (নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমরাই [জ্ঞানীরাই] তাঁকে ভয় করে)—আয়াতের অর্থ হচ্ছে-প্রকৃত আলেম বা জ্ঞানী ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ আল্লাহকে (যথাযথভাবে) ভয় করে না। অর্থাৎ আল্লাহ এখানে সংবাদ দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তিই আল্লাহকে ভয় করে, সে-ই মূলত একজন আলেম বা জ্ঞানী। যেমনটি তিনি অন্য আয়াতে বলেছেন:“যে ব্যক্তি রাতের বিভিন্ন প্রহরে সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, আখিরাতকে ভয় করে এবং তার রবের অনুগ্রহ প্রত্যাশা করে, (সে কি তার সমান, যে তা করে না? বলুন, ‘যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান?”(সূরা যুমার, আয়াত: ৯; ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড:৭; পৃষ্ঠা: ২১)
.
হাফেজ ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
” إنما يخشاه حق خشيته العلماء العارفون به ، لأنه كلما كانت المعرفة للعظيم القدير أتم والعلم به أكمل ، كانت الخشية له أعظم وأكثر .قال علي بن أبي طلحة عن ابن عباس في قوله تعالى : (إنما يخشى الله من عباده العلماء) قال : الذين يعلمون أن الله على كل شيء قدير… وقال سعيد بن جبير : الخشية هي التي تحول بينك وبين معصية الله عز وجل . وقال الحسن البصري : العالم من خشي الرحمن بالغيب ، ورغب فيما رغب الله فيه ، وزهد فيما سخط الله فيه ، ثم تلا الحسن : (إنما يخشى الله من عباده العلماء إن الله عزيز غفور) .
وعن ابن مسعود رضي الله عنه أنه قال : ليس العلم عن كثرة الحديث ، ولكن العلم عن كثرة الخشية . . .وقال سفيان الثوري عن أبي حيان التيمي عن رجل قال : كان يقال العلماء ثلاثة : عالم بالله عالم بأمر الله ، وعالم بالله ليس بعالم بأمر الله ، وعالم بأمر الله ليس بعالم بالله . فالعالم بالله وبأمر الله : الذي يخشى الله تعالى ويعلم الحدود والفرائض ، والعالم بالله ليس بعالم بأمر الله : الذي يخشى الله ولا يعلم الحدود ولا الفرائض . والعالم بأمر الله ليس العالم بالله : الذي يعلم الحدود والفرائض ولا يخشى الله عز وجل “
“নিশ্চয়ই আল্লাহকে যথাযথভাবে তারাই ভয় করে, যারা তাঁর সম্পর্কে জ্ঞান রাখে (আরিফ)। কারণ মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান যত পূর্ণাঙ্গ ও নিখুঁত হয়, তাঁর প্রতি ভয়ও তত বেশি ও সুমহান হয়।”
আল্লাহ তাআলার বাণী:”আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে”—এর ব্যাখ্যায় আলী ইবনে আবি তালহা (রাহিমাহুল্লাহ) ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন: “তারা হলো ঐসব লোক যারা জানে যে, আল্লাহ সবকিছুর উপর শক্তিমান।” সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “খাশয়াত (ভয়) হলো এমন এক অনুভূতি যা আপনার এবং আল্লাহর অবাধ্যতার মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।” হাসান বসরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “প্রকৃত জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যে না দেখেই দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ যা পছন্দ করেন তার প্রতি আগ্রহী হয় এবং যা আল্লাহ অপছন্দ করেন তার প্রতি বিরাগভাজন হয়।” এরপর হাসান (রাহিমাহুল্লাহ) এই আয়াতটি তিলওয়াত করেন: “আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে; নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ও ক্ষমাশীল।” ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: “বেশি বেশি হাদিস বা তথ্য জানার নামই জ্ঞান নয়; বরং প্রকৃত জ্ঞান হলো অধিক আল্লাহভীরুতা” সুফিয়ান সাওরী (রাহিমাহুল্লাহ) আবু হাইয়ান আত-তাইমী থেকে এবং তিনি জনৈক ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করেন যে, বলা হতো: “জ্ঞানী ব্যক্তিগণ তিন প্রকার: ১. যিনি আল্লাহ সম্পর্কে জানেন এবং আল্লাহর বিধান সম্পর্কেও জানেন, ২. যিনি আল্লাহ সম্পর্কে জানেন কিন্তু তাঁর বিধান সম্পর্কে (পর্যাপ্ত) জানেন না এবং ৩. যিনি আল্লাহর বিধান সম্পর্কে জানেন কিন্তু আল্লাহ সম্পর্কে জানেন না। প্রকৃতপক্ষে, যিনি আল্লাহ এবং তাঁর বিধান উভয়টি সম্পর্কে জানেন, তিনি হলেন সেই ব্যক্তি যিনি আল্লাহ তাআলাকে ভয় করেন এবং শরয়ি সীমানা ও ফরজ বিধানসমূহ সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। যিনি আল্লাহ সম্পর্কে জানেন কিন্তু তাঁর বিধান সম্পর্কে জানেন না, তিনি আল্লাহকে ভয় করেন বটে কিন্তু শরয়ি সীমানা ও ফরজ বিধানগুলো সম্পর্কে অবগত নন। আর যিনি আল্লাহর বিধান সম্পর্কে জানেন কিন্তু আল্লাহ সম্পর্কে জানেন না, তিনি শরয়ি সীমানা ও ফরজ বিধানগুলো ঠিকই জানেন কিন্তু আল্লাহ তাআলাকে ভয় করেন না।”[উৎস: তাফসিরে ইবনে কাসীর; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৭২৯ থেকে সংক্ষেপিত]
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]- জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে শুধু জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে”- উল্লিখিত আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য কী? জানতে চাই। উত্তরে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: এই আয়াতে একটি মহা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সেটি হলো আল্লাহকে ভয় করার বিষয়টি জ্ঞানীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আয়াতে উল্লিখিত (خشية) আরবি শব্দটির অর্থ হলো সম্মানের সহিত ভয় করা। শুধু আল্লাহ তা’আলাই এ ধরনের ভয়ের হকদার। যে ব্যক্তি আল্লাহর মহত্ব, গর্ব, ক্ষমতা, ইজ্জত সম্পর্কে জ্ঞান রাখে, সে ছাড়া অন্য কেউ তাকে এইভাবে ভয় করতে পারবে না। এখানে জ্ঞানী দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সম্পর্কে যারা জ্ঞানী, যারা আল্লাহর নাম, গুনাবলি ও নিদর্শনসমূহ সম্পর্কে জ্ঞানী। এর দ্বারা শিল্প ও প্রযুক্তির জ্ঞানীরা উদ্দেশ্য নয়। কেননা এরা হচ্ছে দুনিয়াবি বিষয়ে জ্ঞানী। আর যাকে ভয় করতে হবে তার সম্পর্কে না জানলে তাকে ভয় করা যায় না। আর এ কথা সর্বজনবিদিত যে, শিল্প ও প্রযুক্তির জ্ঞানের সাথে আল্লাহর মহত্বের জ্ঞানের কোন সম্পর্ক নেই। সেটা শুধু বস্তুবাদী জ্ঞান। যারা আল্লাহর ব্যাপারে বেশি জানে, তারা আল্লাহকে বেশি ভয় করবে। আল্লাহ তাওফীক দানকারী।(এই বিষয়ে জানতে ফাতওয়ায় ইবনু উসাইমীন রাহি.এর প্রথম খন্ডের বাংলা অনুবাদ দেখুন)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আল্লাহ তাআলার এই বাণীর ব্যাখ্যা কী? —”আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে।”
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
هذه الآية عظيمة ، تدل على : أن العلماء ، وهم العلماء بالله وبدينه وبكتابه العظيم وسنة رسوله الكريم ، هؤلاء هم أكمل الناس خشية لله ، وأكملهم تقوى لله وطاعة له سبحانه ، وعلى رأسهم : الرسل والأنبياء عليهم الصلاة والسلام .فمعنى : (إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ) أي الخشية الكاملة من عباده : العلماء ، وهم الذين عرفوا ربهم بأسمائه وصفاته وعظيم حقه سبحانه وتعالى ، وتبصروا في شريعته ، وآمنوا بما عنده من النعيم لمن اتقاه ، وما عنده من العذاب لمن عصاه وخالف أمره ، فهم لكمال علمهم بالله ، وكمال معرفتهم بالحق كانوا أشد الناس خشية لله ، وأكثر الناس خوفا من الله وتعظيما له سبحانه وتعالى ، وليس معنى الآية : أنه لا يخشى الله إلا العلماء ، فإن كل مسلم ومسلمة وكل مؤمن ومؤمنة يخشى الله عز وجل ويخافه سبحانه ، لكن الخوف متفاوت ، ليسوا على حد سواء ، فكلما كان المؤمن أعلم بالله وأفقه في دينه كان خوفه من الله أكثر وخشيته أكمل ، وهكذا المؤمنة كلما كانت أعلم بالله وأعلم بصفاته وعظيم حقه كان خوفها من الله أعظم ، وكانت خشيتها لله أكمل من غيرها ، وكلما قَلَّ العلم وقَلَّت البصيرة قَلَّ الخوف من الله وقَلَّت الخشية له سبحانه ، فالناس متفاوتون في هذا حتى العلماء متفاوتون ، فكلما كان العالم أعلم بالله ، وكلما كان العالم أقوم بحقه وبدينه وأعلم بأسمائه وصفاته كانت خشيته لله أكمل ممن دونه في هذه الصفات ، وكلما نقص العلم نقصت الخشية لله ، ولكن جميع المؤمنين والمؤمنات كلهم يخشون الله سبحانه وتعالى على حسب علمهم ودرجاتهم في الإيمان ؛ ولهذا يقول جل وعلا : (إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَئِكَ هُمْ خَيْرُ الْبَرِيَّةِ * جَزَاؤُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ذَلِكَ لِمَنْ خَشِيَ رَبَّهُ) البينة/7، 8 ، وقال تعالى : (إِنَّ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَيْبِ لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ) الملك/12 ، وقال تعالى : (وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ) الرحمن/46 ، فهم مأجورون على خشيتهم لله ، وإن كانوا غير علماء وكانوا من العامة ، لكن كمال الخشية يكون للعلماء ؛ لكمال بصيرتهم وكمال علمهم بالله ، فتكون خشيتهم لله أعظم ؛ وبهذا يتضح معنى الآية ويزول ما يتوهم بعض الناس من الإشكال في معناها، والله ولي التوفيق
“এই আয়াতটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; এটি নির্দেশ করে যে: আলেমগণই—অর্থাৎ যারা আল্লাহ সম্পর্কে, তাঁর দ্বীন, তাঁর মহান কিতাব এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন তারাই মানুষের মধ্যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করেন। তারা আল্লাহভীতি (তাকওয়া) ও তাঁর আনুগত্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ। আর এই জ্ঞানীদের অগ্রভাগে রয়েছেন নবী ও রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম) সুতরাং আয়াতের অর্থ হলো: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আলেমরাই আল্লাহকে (পরিপূর্ণভাবে) ভয় করে। তারা হলেন উলামা (বিজ্ঞ আলেমগণ)। কারণ তারাই তাদের প্রতিপালককে তাঁর নামসমূহ, গুণাবলি এবং তাঁর মহান অধিকারের মাধ্যমে চিনতে পেরেছেন। তারা আল্লাহর শরিয়ত সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ করেছেন এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছেন যে, যে তাঁকে ভয় করবে তার জন্য আল্লাহর কাছে রয়েছে অফুরন্ত নেয়ামত, আর যে তাঁর অবাধ্য হবে তার জন্য রয়েছে কঠিন আজাব। সুতরাং আল্লাহ সম্পর্কে তাদের পূর্ণ জ্ঞান এবং সত্যের প্রতি গভীর অন্তর্দৃষ্টির কারণেই তারা মানুষের মধ্যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করেন এবং তাঁকে সবচেয়ে বেশি সম্মান ও মহিমা দান করেন। এই আয়াতের অর্থ এটি নয় যে: আলেম ছাড়া অন্য কেউ আল্লাহকে ভয় করে না। বরং প্রত্যেক মুসলিম ও মুমিন নর-নারীই মহান আল্লাহকে ভয় করেন। তবে এই ভয়ের মাত্রায় পার্থক্য রয়েছে; সবাই সমান নয়। মুমিন ব্যক্তি আল্লাহ সম্পর্কে যত বেশি জানবেন এবং দ্বীনের যত গভীর জ্ঞান লাভ করবেন, আল্লাহর প্রতি তাঁর ভয় তত বেশি হবে এবং তাঁর আল্লাহভীতি তত পূর্ণাঙ্গ হবে। একইভাবে একজন মুমিন নারীও আল্লাহ সম্পর্কে এবং তাঁর গুণাবলি ও মহান অধিকার সম্পর্কে যত বেশি জানবেন, আল্লাহর প্রতি তাঁর ভয় তত মহিমান্বিত হবে এবং অন্যদের তুলনায় তাঁর আল্লাহভীতি তত পূর্ণ হবে। পক্ষান্তরে, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা যত কমবে, আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভীতিও তত কমে যাবে।মানুষ এই ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরের; এমনকি আলেমদের মধ্যেও তফাত রয়েছে। একজন আলেম আল্লাহ সম্পর্কে যত বেশি জানবেন, তাঁর অধিকার ও দ্বীন সম্পর্কে যত বেশি সজাগ হবেন এবং তাঁর নাম ও গুণাবলি সম্পর্কে যত বেশি অবগত হবেন, তাঁর আল্লাহভীতি অন্যদের তুলনায় তত বেশি নিখুঁত হবে। জ্ঞান কমে যাওয়ার সাথে সাথে এই ভীতিও কমতে থাকে। তবে সকল মুমিনই তাদের ঈমানের স্তর ও জ্ঞান অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় করেন। এ কারণেই মহান আল্লাহ বলেন: ”নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তারাই সৃষ্টির সেরা। তাদের প্রতিপালকের কাছে তাদের পুরস্কার হলো স্থায়ী জান্নাত… এটি তার জন্য যে তার প্রতিপালককে ভয় করে।” (সূরা আল-বাইয়্যিনাহ: ৭-৮)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:”নিশ্চয় যারা তাদের প্রতিপালককে না দেখেও ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহা পুরস্কার।” (সূরা আল-মুলক: ১২)
তারা সাধারণ মানুষ হয়ে থাকলেও এবং বড় আলেম না হলেও আল্লাহর প্রতি এই ভয়ের কারণে তারা পুরস্কৃত হবেন। তবে ভয়ের পূর্ণতা (كمال الخشية) কেবল আলেমদের জন্যই, কারণ তাদের রয়েছে পূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি ও আল্লাহ সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান। ফলে আল্লাহর প্রতি তাদের ভয় হয় সবচেয়ে গভীর। এর মাধ্যমেই আয়াতের অর্থ সুস্পষ্ট হয় এবং কারো মনে যদি কোনো অস্পষ্টতা থেকে থাকে তা দূর হয়ে যায়। আল্লাহই তৌফিক দানকারী।”(ইমাম বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড/২৪; পৃষ্ঠা: ২৬৮-২৭০)
.
পরিশেষে বলা যায়, উপরোক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে আলোচ্য আয়াতে ‘ফায়েল’ বা ক্রিয়ার কর্তা হচ্ছেন ‘উলামা’—অর্থাৎ আলেমগণই মহান আল্লাহকে সম্মানের সহিত যথার্থভাবে ভয় করেন; কেননা তাঁরাই আল্লাহর মহিমা, ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন। সুতরাং আয়াতের সঠিক অর্থ হলো—আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই প্রকৃত অর্থে তাঁকে ভয় করে; এর অর্থ কখনোই এই নয় যে আল্লাহ তাআলা কাউকে ভয় করেন (নাউযুবিল্লাহ), বরং তিনি এসব অপূর্ণ ধারণা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ও মহান। অতএব, আমরা মহান আল্লাহর নিকট উপকারী ইলম ও নেক আমলের তাওফিক কামনা করি; নিশ্চয়ই তিনিই সর্বজ্ঞ। (আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৫২৮১৭)
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়। জুয়েল মাহমুদ সালাফি।