দুনিয়াবী জীবনে মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনুধাবন করার জন্য ইমাম আহমেদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ এর একটি নাসীহা

দুনিয়াবী জীবনে মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনুধাবন করার জন্য ইমাম আহমেদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ এর এই একটি নাসীহাই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হতে পারে।
▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি অতঃপর, ইবনুল জাওযী (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন: হুসাইন ইবনুল হাসান আল-মাররুযী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, একবার আমি আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, দিনটি কেমন কাটল আপনার?
জবাবে তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) বললেন:
كيف أصبح من ربه يطالبه بأداء الفرض، ونبيه يطالبه بأداء السنة، والملكان يطالبانه بتصحيح العمل، ونفسه تطالبه بهواها، وإبليس يطالبه بالفحشاء، وملك الموت يطالبه بقبض روحه، وعياله يطالبونه بالنفقة؟ !
“যার প্রতিপালক তার কাছে ফরয আদায়ের আশা করেন, যার নবী তাকে সুন্নত পালনের আহ্বান করেন, যার দুই কাঁধের ফেরেশতা তাকে আমল বিশুদ্ধ করার কথা বলেন, অন্তর যাকে তার প্রবৃত্তির চাহিদাপূরণে প্রলুব্ধ করে, শয়তান যাকে অশ্লীল কাজ করতে কুমন্ত্রণা দেয়, মালাকুল মাওত যার আত্মা নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষমান, যার কাছে তার পরিবার ভরণপোষণের আশায় রয়েছে, তার দিন আর কেমন কাটতে পারে?!(ইমাম যাহাবী; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা; খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ২২৭; তাবাকাতুল হানাবিলাহ; ইবনু আবি ইয়া’লা: ১/৫৭০)
.
প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত ফাতওয়ার অন্তর্নিহিত মর্ম ও প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবনের পূর্বে দ্বীনের এই মহান ইমামের জীবন ও অবদান সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত হলেও সুস্পষ্ট ধারণা অর্জন করা একান্ত জরুরি। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মহান ইমাম, শাইখুল ইসলাম আবু আব্দুল্লাহ আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন হাম্বাল আশ-শাইবানী আল-মারওয়াযী,অতঃপর বাগদাদী (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম ১৬৪ হি./৭৮০ খ্রি. এবং মৃত্যু ২৪১ হি./৮৫৫ খ্রি.]—যিনি “আবু আব্দুল্লাহ” উপনামে প্রসিদ্ধ—ইসলামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ছিলেন বিশ্ববরেণ্য ফকিহ, প্রাজ্ঞ মুহাদ্দিস এবং সুন্নি মতাদর্শের চারটি প্রধান মাযহাবের অন্যতম হাম্বলী মাযহাবের ইমাম। আল্লাহ তাআলা তাঁর মাধ্যমে দ্বীনকে শক্তিশালী করেছেন এবং সুন্নাহকে সংরক্ষিত রেখেছেন। শৈশবেই পিতৃহারা হয়ে এতিম অবস্থায় বেড়ে উঠলেও তিনি অল্প বয়স থেকেই ইলম অর্জনের পথে আত্মনিয়োগ করেন এবং মাত্র পনেরো বছর বয়স থেকেই জ্ঞান অন্বেষণে আত্মনিবেদন করেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল সুঠামদেহী ও শ্যামবর্ণের, আর চল্লিশ বছর বয়সে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ইমাম আবু জুরআ আর-রাজি (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর সম্পর্কে বলেন, তিনি এক লক্ষ নয়, বরং দশ লক্ষ হাদিস মুখস্থ রাখতেন। তাঁর জীবন ছিল সত্যনিষ্ঠা, ইলমের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং ঈমানের অবিচল দৃঢ়তার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। তিনি বাতিলের সামনে আপসহীন, সুন্নাহর প্রতি অটল এবং ত্যাগ-তিতিক্ষায় ভরা সংগ্রামী জীবনযাপনের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর জন্য চিরন্তন প্রেরণার উৎস হয়ে আছেন। তিনি শুধু ইলম অর্জনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং সেই ইলমকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করেছেন। তাঁর চরিত্রে ছিল গভীর বিনয়, তাকওয়া ও আল্লাহভীতি, যা তাঁকে যুগের শ্রেষ্ঠ আলেমদের কাতারে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কঠিন পরীক্ষার মুহূর্তেও তিনি হক থেকে এক চুল পরিমাণ বিচ্যুত হননি; বরং সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য নির্যাতন, কারাবরণ ও কষ্টকে সানন্দে গ্রহণ করেছেন। বিশেষত ‘মিহনা’-এর কঠিন সময়ে তাঁর দৃঢ় অবস্থান ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যেখানে অনেকেই চাপে পড়ে আপস করলেও তিনি কুরআন সংক্রান্ত বিশুদ্ধ আকীদার বিষয়ে সুন্নাহর অবস্থানে অটল ছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের ঈমান রক্ষা করেননি, বরং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সঠিক আকীদার দিকনির্দেশনাও স্থাপন করেছেন। ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়—ইলমের প্রকৃত মর্যাদা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা আমল, ধৈর্য এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হয়; আর তাঁর জীবন ও আদর্শ প্রতিটি মুসলিমের জন্য এক আলোকবর্তিকা, যা সত্যের পথে অবিচল থাকার সাহস ও প্রেরণা জোগায়।
.
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ)-এর “আপনি কেমন আছেন?”—এই প্রশ্নের উত্তরে যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে, তা নিছক একটি সাধারণ প্রশ্নের জবাব নয়; বরং আমি জুয়েল মাহমুদের চিন্তাভাবনার আলোকে এটি একজন সচেতন মুমিনের অন্তর্জগত, তার দায়িত্ববোধ এবং অবিরাম আত্মিক সংগ্রামের এক জীবন্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ চিত্র। সাধারণত আমরা যখন কাউকে “কেমন আছেন?” জিজ্ঞেস করি, তখন প্রশ্নকারী ও উত্তরদাতা উভয়ের মনোযোগ থাকে দুনিয়াবি অবস্থা, শারীরিক সুস্থতা কিংবা পার্থিব স্বস্তি-অস্বস্তির সীমিত পরিসরের মধ্যে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তরও সেই সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যেই আবদ্ধ থাকে। কিন্তু ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর দৃষ্টিভঙ্গি এই প্রচলিত ধারণাকে অতিক্রম করে আরও গভীর এক বাস্তবতার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি যেন বুঝিয়ে দেন—একজন সত্যিকারের জাগ্রত মুমিনের জীবন কখনোই উদাসীনতা বা স্থবিরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বরং সে প্রতিটি মুহূর্তেই আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতার অনুভূতি নিয়ে জীবন যাপন করে। এই বক্তব্যকে আমার ইলমহীন মস্তিষ্কের চিন্তাধারার আলোকে অনুধাবন করলে আরও স্পষ্ট হয় যে, “ভালো থাকা” কেবল শারীরিক সুস্থতা বা বাহ্যিক স্বাচ্ছন্দ্যের নাম নয়; বরং এটি একটি বহুমাত্রিক বাস্তবতা, যেখানে দুনিয়া ও আখিরাতের ভারসাম্য, অন্তরের অবস্থান, ইবাদতের স্থিতি এবং দায়িত্ব পালনের সচেতনতা—সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত।ফলে ইমামুল আহসলুস সুন্নাহ’র এই বক্তব্য গভীরভাবে অনুধাবন করলে স্পষ্ট হয়—“ভালো থাকা” কেবল একমাত্রিক কোনো বিষয় নয়; বরং তা মূলত বহুস্তরবিশিষ্ট বাস্তবতা, যার অন্তত দুটি দিক রয়েছে।
.
(১).দুনিয়াবি ভালো থাকা:এটি সেই ভালো থাকা, যা মানুষের বাহ্যিক জীবনে প্রতিফলিত হয়—শারীরিক সুস্থতা, আর্থিক স্বচ্ছলতা, প্রিয়জনদের সান্নিধ্য, সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তার সমন্বয়ে গঠিত। এ ধরনের জীবনকে সাধারণত সুখী ও সফল মনে হয়। তবে এই স্বস্তি স্থায়ী নয়; এটি পরিবর্তনশীল এবং অনেক সময় তা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা হিসেবেও আসে, যার ওপর মানুষের কোনো স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নেই।
.
(২).আত্মিক/দ্বীনি ভালো থাকা: এটাই হলো অন্তরের প্রকৃত প্রশান্তি এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্কের সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এক অবস্থা। এখানে একজন বান্দা সর্বদা তার জবাবদিহির ব্যাপারে সচেতন থাকে; ফরয ও সুন্নাহ পালনে যত্নশীল হয়; প্রতিটি আমলে ইখলাস ও শুদ্ধতা অর্জনের চেষ্টা করে; এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে সতর্ক থাকে।এই ভালো থাকা বাহ্যিক আরাম-আয়েশের উপর নির্ভরশীল নয়; বরং তা জন্ম নেয় অন্তরের গভীরে—তাকওয়া, দৃঢ় ঈমান এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে। তাহলে প্রকৃত “ভালো থাকা” কোনটি? বাস্তবে সত্যিকারের ভালো থাকা হলো দ্বিতীয়টিই। কারণ দুনিয়ার স্বস্তি ক্ষণস্থায়ী—আজ আছে, কাল নেই; কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর নৈকট্য চিরস্থায়ী।বাহ্যিক সুখ অনেক সময়ই বিভ্রান্তির আবরণ মাত্র; কিন্তু অন্তরের ঈমান, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর আনুগত্যই মানুষের হৃদয়ে এনে দেয় প্রকৃত প্রশান্তি। এমনকি দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটনের মাঝেও একজন মুমিন অন্তরে শান্তি অনুভব করতে পারে যদি তার সম্পর্ক আল্লাহর সাথে দৃঢ়, জীবন্ত ও অটুট থাকে।দ্বীনের এই মহান ইমামের বক্তব্যের সঠিক তাৎপর্য কয়েকটি পয়েন্টে নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
.
​(১). প্রতিপালকের দাবি: ফরয আদায়:
.
আল্লাহ তাআলা মানুষকে উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেননি; বরং এক মহান লক্ষ্য সামনে রেখেই সৃষ্টি করেছেন—তাঁর ইবাদত, আনুগত্য এবং একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার জন্য।কেননা তিনি বলেছেন: “আমি আসমান-জমিন আর এ দুটির মাঝে যা আছে সে সব তামাশা করে সৃষ্টি করিনি। আমি ও দুটিকে যথাযথ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।”[সূরা দুখান, আয়াত: ৩৮, ৩৯] সবচেয়ে যে মহান উদ্দেশ্য ও মহা পরীক্ষার জন্য মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে সেটা হচ্ছে- তাওহীদ বা নিরংকুশভাবে এক আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশ প্রদান করা। আল্লাহ নিজেই মানুষ সৃষ্টির এ উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:( وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالإِنْسَ إِلا لِيَعْبُدُونِ ) “আমি জিন্ন ও মানবকে সৃষ্টি করেছি একমাত্র এ কারণে যে, তারা আমারই ‘ইবাদাত করবে।”[সূরা যারিয়াত, আয়াত: ৫৬]
ইবনে কাছির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:”أي : إنما خلقتهم لآمرهم بعبادتي ، لا لاحتياجي إليهم ، وقال علي بن أبي طلحة عن ابن عباس : إلا ليعبدون ، أي : إلا ليقروا بعبادتي طوعاً أو كرهاً ، وهذا اختيار ابن جرير ، وقال ابن جريج : إلا ليعرفون ، وقال الربيع بن أنس : إلا ليعبدون ، أي : إلا للعبادة “অর্থাৎ আমি তাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদেরকে আমার ইবাদতের নির্দেশ প্রদান করার জন্য; তাদের প্রতি আমার মুখাপেক্ষিতার কারণে নয়। আলি বিন আবু তালহা ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, “একমাত্র আমার ইবাদতের জন্য” অর্থাৎ যাতে তারা ইচ্ছাই বা অনিচ্ছায় আমার ইবাদতের স্বীকৃতি দেয়। এটি ইবনে জারীরের নির্বাচিত তাফসির। ইবনে জুরাইয বলেন: যাতে তারা আমাকে চিনে। আল-রাবি বিন আনাস বলেন: “একমাত্র আমার ইবাদতের জন্য” অর্থাৎ ইবাদতের জন্য।” (তাফসিরে ইবনে কাছির; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২৩৯)
ইমাম আব্দুর রহমান আল-সাদী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
” فالله تعالى خلق الخلق لعبادته ، ومعرفته بأسمائه وصفاته ، وأمرهم بذلك ، فمن انقاد ، وأدى ما أمر به ، فهو من المفلحين ، ومن أعرض عن ذلك ، فأولئك هم الخاسرون ، ولا بد أن يجمعهم في دار ، يجازيهم فيها على ما أمرهم به ونهاهم ، ولهذا ذكر الله تكذيب المشركين بالجزاء ، فقال : ( ولئن قلت إنكم مبعوثون من بعد الموت ليقولن الذين كفروا إن هذا إلا سحر مبين ) أي : ولئن قلتَ لهؤلاء ، وأخبرتهم بالبعث بعد الموت ، لم يصدقوك ، بل كذبوك أشد التكذيب ، وقدحوا فيما جئت به ، وقالوا : ( إن هذا إلا سحر مبين ) ألا وهو الحق المبين
আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য, তাঁর নাম ও গুণাবলির মাধ্যমে তাঁকে চেনার জন্য এবং তিনি তাঁকে সে নির্দেশ দিয়েছেন। যে ব্যক্তি তাঁর প্রতি আনুগত্যশীল হবে এবং নির্দেশ পালন করবে সে সফলকাম। আর যে ব্যক্তি মুখ ফিরিয়ে নিবে সে ক্ষতিগ্রস্ত। তাদেরকে এমনস্থানে সম্মিলিত করা অনিবার্য যেখানে তিনি তাদেরকে তার আদেশ-নিষেধ পালনের ভিত্তিতে প্রতিদান দিতে পারবেন। এ কারণে মুশরিকদের প্রতিদানকে অস্বীকার করার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর যদি আপনি তাদেরকে বলেন যে, নিশ্চয় তোমাদেরকে মৃত্যুর পরে জীবিত ওঠানো হবে, তখন কাফেরেরা অবশ্য বলে এটা তো স্পষ্ট যাদু!”[সূরা হুদ, আয়াত: ০৭] অর্থাৎ যদি আপনি এদেরকে বলেন এবং মৃত্যুর পরে পুনরুত্থানের ব্যাপারে সংবাদ দেন তারা আপনার কথায় বিশ্বাস করবে না। বরং আপনাকে তীব্রভাবে মিথ্যায়ন করবে এবং আপনি যা নিয়ে এসেছেন সেটার উপর অপবাদ দিবে। তারা বলবে: “এটা তো স্পষ্ট যাদু” জেনে রাখুন এটা স্পষ্ট সত্য।”(তাফসিরে সাদী; পৃষ্ঠা- ৩৩৩)
.
তাই বান্দার জীবনের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো, সে যেন তার প্রতিপালকের নির্ধারিত ফরয বিধানসমূহ যথাযথভাবে আদায় করে।সালাত,সিয়াম, যাকাত, হজ—এসব কেবল কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; বরং এগুলো বান্দা ও তার রবের মাঝে সম্পর্কের দৃঢ় বন্ধন। এসব ফরয আমলের মাধ্যমেই বান্দা তার দাসত্বের স্বীকৃতি দেয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে অগ্রসর হয়।ফরয ইবাদত হলো দ্বীনের ভিত্তি ও স্তম্ভ। এগুলোর উপরই ঈমানের কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকে। যদি কেউ এগুলো অবহেলা করে, তবে তার আমলের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে—যার পরিণতি আখেরাতে অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। এ কারণেই সালাফে সালিহীনগণ সর্বপ্রথম ফরযের প্রতি গুরুত্ব দিতেন। তারা গভীর উপলব্ধি থেকে বলতেন—“ফরয নষ্ট করে কেউ নফলের মাধ্যমে কখনো আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে না।”অর্থাৎ,নফল ইবাদত যতই অধিক হোক না কেন, তা কখনো ফরযের ঘাটতি পূরণ করতে পারে না, যদি মূল দায়িত্বই অবহেলিত থাকে।ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্য আমাদের এ দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে—একজন মুমিনের দিন শুরু হওয়া উচিত আত্মজিজ্ঞাসা দিয়ে:“আজ আমার ওপর আমার রবের কী কী হক রয়েছে? আমি কীভাবে সেগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে আদায় করব?” এই চিন্তাধারা একজন মানুষকে দায়িত্বশীল, সচেতন ও আল্লাহভীরু করে তোলে। সে বুঝতে শেখে—সে স্বাধীন নয়; বরং সে তার প্রতিপালকের অধীনস্থ এক বান্দা, যার প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি কাজ হিসাবের আওতায়। এখানেই প্রকাশ পায় আল্লাহর পরম সার্বভৌমত্ব এবং বান্দার চূড়ান্ত নির্ভরতা। বান্দা যত বেশি এই বাস্তবতা অনুধাবন করবে, ততই তার জীবনে ইবাদতের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে এবং সে প্রকৃত সফলতার পথে অগ্রসর হবে।
.
​(২). নবীর দাবি: সুন্নত পালন:
.
মহান আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন কেবল তাঁরই ইবাদতের জন্য। তবে সেই ইবাদতের সঠিক পদ্ধতি, পরিপূর্ণতা ও সৌন্দর্য মানুষের সীমিত বুদ্ধির ওপর ছেড়ে দেননি। বরং তিনি মানবজাতির হিদায়াতের জন্য প্রেরণ করেছেন তাঁর প্রিয়তম রাসূল মুহাম্মদ ﷺ-কে—যিনি শুধু আল্লাহর বাণীর বাহক নন,বরং সেই বাণীর উপর আমল করার ক্ষেত্রে ছিলেন জীবন্ত বাস্তব প্রতিচ্ছবি।রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্পষ্ট দাবি হলো তাঁর আদর্শ অনুসরণ করা। কেননা মুসলিম হওয়ার জন্য কুরআন মেনে চলা যেমন আবশ্যক, তেমনি সুন্নাহ মেনে চলাও অপরিহার্য। সুন্নাহকে বাদ দিয়ে কুরআন অনুসরণ করা অসম্ভব। তেমনিভাবে সুন্নাহর খেলাফ বা সুন্নাহকে উপেক্ষা করলে পরকালে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا أَطِيْعُوْا اللّٰهَ وَأَطِيْعُوْا الرَّسُوْلَ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের’ (সূরা আন-নিসা: ৫৯)। তিনি অন্যত্র বলেন, مَنْ يُطِعِ الرَّسُوْلَ فَقَدْ أَطَاعَ اللّٰهَ ‘যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করে, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল’ (সূরা আন-নিসা: ৮০)। তিনি আরো বলেন, وَأَطِيعُوا اللّٰهَ وَالرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ ‘আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমরা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হও’ (সূরা আলে-ইমরান : ১৩২)।রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আনুগত্য হল আল্লাহর আনুগত্য। হাদীছে এসেছে, জাবের ইবনু আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, فَمَنْ أَطَاعَ مُحَمَّدًا ﷺ فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ وَمَنْ عَصَى مُحَمَّدًا ﷺ فَقَدْ عَصَى اللهَ ‘যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর আনুগত্য করল, সে যেন আল্লাহর আনুগত্য করল। আর যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর অবাধ্যতা করল, সে যেন আল্লাহরই অবাধ্যতা করল”।(সহীহ বুখারী হা/৭২৮১) তিনি আরো বলেন, فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِىْ فَلَيْسَ مِنِّىْ “যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত হতে মুখ ফিরিয়ে নিল, সে আমার দলভুক্ত নয়”।(সহীহ বুখারী, হা/৫০৬৩) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরও বলেছেন, كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُونَ الجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبَى قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ وَمَنْ يَأْبَى قَالَ مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الجَنَّةَ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبَى “আমার সকল উম্মতই জান্নাতে প্রবেশ করবে, কিন্তু যে অস্বীকার করবে।সাহাবীগণ (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) বললেন, কে অস্বীকার করবে? তিনি বললেন, যারা আমার অনুসরণ করবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্য হবে সে-ই অস্বীকার করবে।”(সহীহ বুখারী, হা/৭২৮০) শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,فَعَلَى كُلِّ مُؤْمِنٍ أَنْ لَا يَتَكَلَّمَ فِيْ شَيْءٍ مِنْ الدِّيْنِ إلَّا تَبَعًا لِمَا جَاءَ بِهِ الرَّسُوْلُ وَلَا يَتَقَدَّمُ بَيْنَ يَدَيْهِ؛ بَلْ يَنْظُرُ مَا قَالَ فَيَكُوْنُ قَوْلُهُ تَبَعًا لِقَوْلِهِ وَعَمَلُهُ تَبَعًا لِأَمْرِهِ فَهَكَذَا كَانَ الصَّحَابَةُ وَمَنْ سَلَكَ سَبِيْلَهُمْ مِنْ التَّابِعِيْنَ لَهُمْ بِإِحْسَانِ وَأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِيْنَ؛ فَلِهَذَا لَمْ يَكُنْ أَحَدٌ مِنْهُمْ يُعَارِضُ النُّصُوْصَ بِمَعْقُوْلِهِ وَلَا يُؤَسِّسُ دِيْنًا غَيْرَ مَا جَاءَ بِهِ الرَّسُوْلُ وَإِذَا أَرَادَ مَعْرِفَةَ شَيْءٍ مِنْ الدِّيْنِ وَالْكَلَامِ فِيْهِ نَظَرَ فِيْمَا قَالَهُ اللهُ وَالرَّسُوْلُ فَمِنْهُ يَتَعَلَّمُ وَبِهِ يَتَكَلَّمُ وَفِيْهِ يَنْظُرُ وَيَتَفَكَّرُ وَبِهِ يَسْتَدِلُّ فَهَذَا أَصْلُ أَهْلِ السُّنَّةِ “সুতরাং প্রত্যেক মুমিনের উপর আবশ্যক হল, নবী করীম (ﷺ) যা কিছু নিয়ে এসেছেন তাঁর অনুসরণ ব্যতীত দ্বীনের কোন বিষয়ে কোন কথা না বলা এবং যা তাঁর সামনে আসে না সে বিষয়েও কোন কথা না বলা। বরং সে যেন লক্ষ্য করে নবী করীম (ﷺ) কী বলেছেন। অতঃপর তাঁর কথাটি যেন হয় নবী করীম (ﷺ)-এর অনুকূলে। তার আমলটি যেন হয় নবী করীম (ﷺ)-এর নির্দেশ অনুসারে। ছাহাবী, তাবেঈ ও মুসলিমদের ইমামগণ এরূপই ছিলেন। একারণেই তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ নিজ বুদ্ধি দিয়ে কুরআন ও সুন্নাহর বিরোধিতা করেননি। আর নবী করীম (ﷺ) যা নিয়ে এসেছেন তা ব্যতীত অন্য কোন দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করেননি। তাঁরা যখনই দ্বীনের কোন বিষয়কে জানার ইচ্ছা করেছেন তারা লক্ষৗ করেছেন যে ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) কী বলেছেন। অতঃপর তা থেকেই শিক্ষা অর্জন করেছেন। তা দিয়েই কথা বলেছেন এবং তাঁর মধ্যেই দৃষ্টি রেখেছেন। আর তাঁকেই প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপণ করেছেন। আর এটাই আহলুস সুন্নাহর মূলনীতি।”(ইবনু তাইমিয়াহ, মাজমূঊল ফাতাওয়া, ১৩তম খণ্ড,পৃষ্ঠা: ৬৩) তাছাড়া রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহই ফরয ইবাদতের পরিপূরক,এবং আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম প্রধান পথ। একজন সত্যিকারের মুমিন শুধু ফরয আদায় করেই থেমে যায় না; বরং সে নবী ﷺ-এর প্রতিটি কথা, কাজ ও আচরণকে নিজের জীবনে বাস্তবায়নের সর্বাত্মক চেষ্টা করে। এটিই হলো ঈমানের দাবি, ভালোবাসার বাস্তব প্রমাণ এবং পূর্ণ আনুগত্যের পরিচয়।ইমাম আহমাদ নিজে ছিলেন ‘নাসিরুস সুন্নাহ’ (সুন্নাহর সাহায্যকারী)। তিনি মনে করতেন, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে—চলা-ফেরা, কথা-বার্তা ও আচার-আচরণে—যদি রাসূল ﷺ-এর অনুসরণ না থাকে, তবে সেই জীবন পূর্ণতা লাভ করতে পারে না।ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ.) থেকে বর্ণিত উসূলুস সুন্নাহতে এসেছে: “أصول السنة عندنا: التمسك بما كان عليه أصحاب رسول الله ﷺ، والاقتداء بهم، وترك البدع، وكل بدعة ضلالة”আমাদের নিকট সুন্নাহর মূলনীতি হলো—রাসূল ﷺ-এর সাহাবীগণ যে পথের উপর ছিলেন তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা, তাঁদের অনুসরণ করা, বিদআত পরিত্যাগ করা; আর প্রতিটি বিদআতই ভ্রষ্টতা।”(উসূলুস সুন্নাহ পৃষ্ঠা: ৩৩)।অতএব, রাসূল ﷺ-এর প্রকৃত দাবি হলো—উম্মত যেন বিদআত পরিহার করে সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে, এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শকে বাস্তবায়ন করে।
.
​(৩).ফেরেশতাদের দাবি: আমল বিশুদ্ধ করা:
মানুষের দুই কাঁধে নিয়োজিত দুজন সন্মানিত ফেরেশতা (কিরামান কাতিবীন) সার্বক্ষণিকভাবে তার প্রতিটি আমল লিপিবদ্ধ করেন।মানুষের আমল বা কাজগুলো যে সারাক্ষণ লেখা হচ্ছে, সে সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন:وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ – كِرَامًا كَاتِبِينَ – يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ”অবশ্যই তোমাদের ওপর তত্ত্বাবধায়করা (ফেরেশতারা) নিযুক্ত রয়েছে। তারা অত্যন্ত সম্মানিত এবং (তোমাদের আমলসমূহ) লিপিবদ্ধকারী। তোমরা যা কিছু করো, তারা তা জানে।”(সূরা আল-ইনফিতার, আয়াত: ১০-১২)তারা শুধু আমলের সংখ্যা সংরক্ষণ করেন না; বরং আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী প্রতিটি কাজকে যথাযথভাবে, নির্ভুলভাবে এবং কোনো প্রকার কম-বেশি বা বিকৃতি ছাড়া রেকর্ড করেন।ফেরেশতারা মানুষের প্রতিটি কথা সংরক্ষণ করেন,তা এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:​مَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ”সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তার কাছে একজন তৎপর পাহারাদার (ফেরেশতা) উপস্থিত থাকে।”(সূরা ক্বাফ,আয়াত:১৮) মানুষের অন্তরের গোপন কথা এবং আলাপ-আলোচনা সম্পর্কেও এই আয়াতে সতর্ক করা হয়েছে:أَمْ يَحْسَبُونَ أَنَّا لَا نَسْمَعُ سِرَّهُمْ وَنَجْوَاهُم ۚ بَلَىٰ وَرُسُلُنَا لَدَيْهِمْ يَكْتُبُونَ”তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন কথা ও গোপন পরামর্শ শুনতে পাই না? অবশ্যই (শুনতে পাই)। আর আমার প্রেরিত ফেরেশতারা তাদের কাছে থেকে সবকিছু লিখে নেয়। (সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৮০) এই আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, মানুষের প্রকাশ্য কিংবা গোপন—কোনো কথাই বা কোনো কাজই আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়; বরং সবকিছুই পূর্ণভাবে সংরক্ষিত থাকে। কিয়ামতের দিন এই নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত আমলনামাই মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হবে।এর মাধ্যমে বোঝা যায়, বান্দার আমল শুধু পরিমাণের দিক থেকেই নয়; বরং গুণগত দিক থেকেও সম্পূর্ণ নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে—অর্থাৎ প্রতিটি কাজের প্রকৃত অবস্থা, সময় ও স্বরূপ কোনো ধরনের ত্রুটি ছাড়াই আল্লাহর নিকট সংরক্ষিত থাকে। এটি কোনো সাধারণ “কোয়ালিটি কন্ট্রোল” নয়; বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত সর্বোচ্চ নির্ভুল ও ন্যায়ভিত্তিক হিসাব-রক্ষণের এক পরিপূর্ণ ব্যবস্থা।সম্ভবত আল্লাহু আলাম ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্যও এই গভীর বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত বহন করে।
.
​(৪).নফসের (অন্তর) দাবি: প্রবৃত্তি পূরণ:
.
মানুষের ভেতরে যে অন্তর্নিহিত শক্তি বা প্রবৃত্তি বিদ্যমান, তাকে ইসলামী পরিভাষায় বলা হয় নফস।আরও সহজে বললে নফস বা প্রবৃত্তি হলো: মানুষ যা চায়, পছন্দ করে ও তাতে সন্তুষ্ট থাকে এবং কামনা-বাসনা করে এবং তারই প্রতি আকৃষ্ট হয়, তাকে নফস বা প্রবৃত্তি বলা হয়। আহালুল আলেমগনের মতে,মানুষের নফস একটি হলেও এর তিনটি অবস্থা বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে:(এক) “নফসে আম্মারা” তথা কুপ্রবৃত্তি যা সর্বদা কুমন্ত্রণা ও অন্যায় ও অসৎ কর্মের নির্দেশ করে। (দুই) “নফসে লাওয়ামা” অর্থাৎ- অসৎ ও অন্যায় কাজের জন্য অনুতপ্ত মন দোটানা মন। (তিন) “নফসে মুতমাইন্না” মানে বিশুদ্ধ ও শান্ত মন এটিই সর্বোত্তম নফস।আর নফসে আম্মারা এটিই যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি যা সর্বদা কুমন্ত্রণা ও অন্যায় ও অসৎ কর্মের নির্দেশদাতা।এই নফস স্বভাবতই মানুষকে সবসময় সহজ, আরামদায়ক ও ইচ্ছামতো জীবনযাপনের দিকে টেনে নেয়। এটি অনেক সময় কল্যাণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।নফস চায় মানুষ যেন কষ্ট, দায়িত্ব ও সংযম থেকে দূরে থাকে এবং কেবল নিজের কুপ্রবৃত্তি,খেয়াল-খুশি, আকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছার অনুসরণ করে জীবন পরিচালনা করে। এর ফলে মানুষ ধীরে ধীরে অলসতা, উদাসীনতা এবং নিষিদ্ধ বা অনুচিত আনন্দের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।ইসলামের দৃষ্টিতে এটি একটি বড় পরীক্ষা। কারণ নফস যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে তা মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে—চাই তা পাপের মাধ্যমে হোক,কিংবা দায়িত্বহীনতার মাধ্যমে।এই কারণেই নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে বলা হয় “জিহাদুন নাফস” (অন্তরের সাথে যুদ্ধ)। এটি কোনো বাহ্যিক যুদ্ধ নয়; বরং নিজের ভেতরের ইচ্ছা, কামনা-বাসনা ও খারাপ প্রবণতার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ও সচেতন সংগ্রাম।এই সংগ্রামে মানুষকে ইবাদত ও আনুগত্যের মাধ্যমে নফসকে প্রশিক্ষিত করতে হয়,ধৈর্য ও সংযমের মাধ্যমে প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং সর্বদা আল্লাহর ভয় ও আখিরাতের জবাবদিহিতাকে স্মরণ রাখতে হয় কারণ প্রকৃত সফলতা হলো সেই ব্যক্তি, যে তার নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে এবং তাকে পাপের পথে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করেছে।আল্লাহ তাআলা বলেন:“যে ব্যক্তি তার নফসকে পবিত্র করেছে, সে সফল হয়েছে; আর যে তাকে কলুষিত করেছে,সে ব্যর্থ হয়েছে।”(সূরা আশ-শামস (৯১:৯–১০) অপরদিকে আল্লাহ তা’য়ালা প্রবৃত্তির গোলামীর ক্ষতির কথা উল্লেখ করে বলেন:فَلَا یَصُدَّنَّکَ عَنۡہَا مَنۡ لَّا یُؤۡمِنُ بِہَا وَ اتَّبَعَ ہَوٰىہُ فَتَرۡدٰی“সুতরাং যে ব্যক্তি কিয়ামতে বিশ্বাস রাখে না এবং নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, সে যেন আপনাকে তা থেকে নিবৃত না করে। নিবৃত হলে আপনি ধ্বংস হয়ে যাবেন।”(সূরা ত্ব-হা: ১৬) তিনি আরও বলেন;اَرَءَیۡتَ مَنِ اتَّخَذَ اِلٰـہَہٗ ہَوٰىہُ ؕ اَفَاَنۡتَ تَکُوۡنُ عَلَیۡہِ وَکِیۡلًا, اَمۡ تَحۡسَبُ اَنَّ اَکۡثَرَہُمۡ یَسۡمَعُوۡنَ اَوۡ یَعۡقِلُوۡنَ ؕ اِنۡ ہُمۡ اِلَّا کَالۡاَنۡعَامِ بَلۡ ہُمۡ اَضَلُّ سَبِیۡلًا “আপনি কি তাকে দেখেন না, যে তার প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি আপনি তার যিম্মাদার হবেন? আপনি কি মনে করেন যে, তাদের অধিকাংশ শোনে অথবা বোঝে? তারা তো চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং আরও পথভ্রান্ত [সূরা ফুরকান: ৪৩,৪৪) অপর আয়াতে বলেন:وَ کَذَّبُوۡا وَ اتَّبَعُوۡۤا اَہۡوَآءَہُمۡ وَ کُلُّ اَمۡرٍ مُّسۡتَقِرٌّ “তারা মিথ্যারোপ করেছে এবং নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে। প্রত্যেক কাজ যথাসময়ে স্থিরকৃত হয়।” (সুরা কামার: ৩] আদম [আঃ]-এর সস্তান কাবীলের আপন ভাই হাবীলকে হত্যার কারণ ছিল প্রবৃত্তির গোলামী।فَطَوَّعَتۡ لَہٗ نَفۡسُہٗ قَتۡلَ اَخِیۡہِ فَقَتَلَہٗ فَاَصۡبَحَ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ“অতঃপর তার নফস তাকে ভ্রাতৃহত্যায় উদ্বুদ্ধ করল। অনন্তর সে তাকে হত্যা করল। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।” [সূরা মায়েদা: ৩০]
.
কুপ্রবৃত্তি বলতে নফসের প্রবণতা, খেয়াল-খুশী, কামনা-বাসনা, রিপু ও কোন জিনিসের প্রতি টানকে বুঝায়। ইহা অধিকাংশ বক্রতা ও স্রষ্টার প্রতি প্রয়োগ হয়।ইমাম ইবনুল কায়োম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “স্বভাব ও মেজাজের অনুকুলের প্রতি টানকে প্রবৃত্তি বলে। নফসের কামনা-বাসনার চাহিদাই হলো প্রবৃত্তি। ঝোঁক মানুষের টিকে থাকার জন্যেই তার মাঝে সৃষ্টি করা হয়েছে; কারণ যদি তার খাদ্য, পানি ও বিবাহের প্রতি টান না থাকত, তাহলে সে খানাপিনা ও বিবাহ-শাদি করত না। তাই প্রবৃত্তি মানুষকে উৎসাহিত করে যখন সে চায়। যেমন রাগ যা তাকে কষ্ট দেয় তা দূর করে। তাই সর্বদা প্রবৃত্তিকে দোষারোপ করা বা সর্বদা প্রশংসা করা উচিত নয়। যেরূপ রাগকে সব সময় ভৎসনা বা প্রশংসা করা ঠিক নয়। বরং দুই প্রকারের মধ্যে যে অভিরঞ্জন করত: উপকার ও ক্ষতির সীমা অতিক্রম করবে তাকেই শুধু ভর্ৎসনা করা উচিত।”(রাওয়াতুল মুহিদীন ইবনুল কায়োম; পৃষ্ঠা: ৪৬৯) তাই অবহেলায় সময় নষ্ট না করে সময়ের গুরুত্ব অনুধাবন করে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যায় করা উচিত। কেননা মানুষের নফস বা আত্মা কখনোই নিষ্ক্রিয় বা শূন্য থাকে না। এটি সবসময় কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত থাকে। তাই একজন বান্দা যদি নিজের সময়, শক্তি ও চিন্তাকে উপকারী ও ভালো কাজে নিয়োজিত না করে, তাহলে তার নফস নিজে থেকেই তাকে অপ্রয়োজনীয়, ক্ষতিকর বা গুনাহের কাজে টেনে নিয়ে যাবে।যেমনটি ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ ) বলেছেন:مِنْ أَعْظَمِ الْأَشْيَاءِ ضَرَراً عَلَىَ الْعَبْدِ بِطَالَتُهُ وَفَرَاغُهُ، فَإِنَّ النَّفْسَ لاَ تَقْعُدُ فَارِغَةً، بَلْ إِنْ لَمْ يُشَغِّلْهَا بِمَا يَنْفَعُهَا شَغَّلَتْهُ بِمَا يَضُرُّه وَلَا بُدَّ، “বান্দার জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় হ’ল বেকারত্ব ও অবসর। কেননা নফস কখনো অবসর বসে থাকে না। বান্দা যদি একে উপকারী কাজে ব্যস্ত না রাখে, তবে সে বান্দাকে অবশ্যই ক্ষতিকর কাজে নিয়োজিত করবে।”(ইবনু ক্বাইয়িম, ত্বরীকুল হিজরাতাইন, পৃষ্ঠা: ২৭৫) ইমাম ইবনু ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) এখানে আমাদেরকে সতর্ক করেছেন যে, অবসর ও বেকারত্ব মানুষের জন্য বড় একটি ফিতনা। কারণ ফাঁকা সময় অনেক সময় শয়তানের প্রবেশদ্বার হয়ে দাঁড়ায়। যখন মানুষ লক্ষ্যহীন থাকে, তখন তার চিন্তা-ভাবনা বিচ্যুত হয়, অলসতা বাড়ে এবং ধীরে ধীরে সে এমন কাজের দিকে ঝুঁকে পড়ে যা তার দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের জন্য ক্ষতিকর।
.
​৫.শয়তানের দাবি: অশ্লীল কাজ ও কুমন্ত্রণা:
.
শয়তান মানবজাতির প্রকাশ্য শত্রু। তার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করা, আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরানো এবং পাপ ও অশ্লীলতার দিকে ধাবিত করা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা মানুষকে সতর্ক করেছেন যে, শয়তান ধীরে ধীরে ও কৌশলে মানুষকে প্ররোচিত করে, একসাথে বড় পাপে না ঠেলে বরং ছোট ছোট ধাপে গুনাহের দিকে নিয়ে যায়।সে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা (ওয়াসওয়াসা) সৃষ্টি করে—বিশেষ করে চিন্তা, কল্পনা ও ইচ্ছার স্তরে।প্রথমে ছোট একটি খারাপ ধারণা দেয়, তারপর সেটিকে আকর্ষণীয় করে তোলে, এরপর ধীরে ধীরে মানুষকে সেই কাজে অভ্যস্ত করে ফেলে। এভাবেই সে মানুষকে লজ্জাহীনতা, অশ্লীলতা, হারাম দৃষ্টি, এবং নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে।শয়তানের এই প্রভাব শুধু বাহ্যিক আক্রমণ নয়; বরং এটি একটি সূক্ষ্ম মানসিক ও আত্মিক ষড়যন্ত্র। তাই তাকে “বাহ্যিক প্রতিকূলতা ও ষড়যন্ত্র” বলা হয়—কারণ সে সরাসরি জোর করে নয়, বরং ধোঁকা, প্রলোভন ও মিথ্যা সৌন্দর্যের মাধ্যমে মানুষকে ফাঁদে ফেলে।আল্লাহ তাআলা বলেন: শয়তান মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়, তাকে খারাপ চিন্তার দিকে ডাকে এবং ভালো কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তাই মুমিনের দায়িত্ব হলো তার কুমন্ত্রণা সম্পর্কে সচেতন থাকা, আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং নফস ও ইমানকে শক্তিশালী করা। এভাবে সয়তান এর ফাঁদ থেকে বাঁচার প্রধান উপায় হলো আল্লাহর স্মরণ (যিকর), ইস্তিগফার, এবং নেক আমলের ওপর অবিচল থাকা। সূরা আল-আরাফ ৭: ২০০–২০১ নং আয়াতে শয়তানের কুমন্ত্রণা এলে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে বলা হয়েছে।অনুরূপভাবে সূরা ফুসসিলাত ৪১: ৩৬ নং আয়াতে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
.
​(৬).মালাকুল মাউতের দাবি: জান কবজ করা:
.
মৃত্যু মানবজীবনের এক চূড়ান্ত ও অবধারিত বাস্তবতা। এর নির্দিষ্ট সময় বা মুহূর্ত সম্পর্কে কোনো মানুষই অবগত নয়; বরং তা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত ফয়সালার অধীন।আল্লাহ তাআলা বলেন—“প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; এবং কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে।” (সূরা আলে ইমরান: ৩: ১৮৫) অন্যত্র তিনি বলেন—“বলুন, নিশ্চয়ই যে মৃত্যু থেকে তোমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছ, তা অবশ্যই তোমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।” (সূরা আল-জুমু‘আ: ৬২:৮) এই আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, মৃত্যু কোনো দূরবর্তী সম্ভাবনা নয়; বরং প্রতিটি মানুষের জন্য নির্ধারিত এক অনিবার্য সত্য।আল্লাহ তাআলা মৃত্যুর দায়িত্ব এক মহান ফেরেশতার ওপর অর্পণ করেছেন, যাকে তাঁর নির্দেশে মানুষের রুহ কবজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন—“বলুন, তোমাদের (জান কবজের) জন্য নিয়োজিত মালাকুল মউত (মৃত্যুর ফেরেশতা) তোমাদের জান কবজ করবে। অতঃপর তোমাদেরকে তোমাদের প্রভুর নিকট ফিরিয়ে নেয়া হবে।”[সূরা আস-সাজ্‌দাহ, আয়াত: ১১] এ থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, মৃত্যুর নির্ধারিত সময়ের বাইরে অগ্রগতি বা বিলম্বের কোনো সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট সেই মুহূর্তে আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতা এসে আত্মা গ্রহণ করেন।রাসূলুল্লাহ ﷺ মৃত্যুকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন—“তোমরা স্বাদ বিনষ্টকারী জিনিস অর্থাৎ মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করো।” (তিরমিজি হা/২৩০৭) মৃত্যুর স্মরণ মানুষের অন্তরকে দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত করে এবং আখিরাতমুখী জীবন গঠনে সহায়তা করে। সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীনগণ এমন জীবন যাপন করতেন, যেন প্রতিটি মুহূর্তই জীবনের শেষ মুহূর্ত হতে পারে। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্য থেকেও এ শিক্ষা পাওয়া যায় যে, মুমিনের হৃদয়ে সর্বদা এই অনুভূতি থাকা উচিত—এই নিঃশ্বাসের পরই হয়তো আর কোনো সুযোগ থাকবে না।
.
​(৭).পরিবারের দাবি: ভরণপোষণ:
.
ইসলামে পরিবারের ভরণপোষণ (নফকা) কোনো সাধারণ সামাজিক বা অর্থনৈতিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি এক মহান ইবাদত,নৈতিক কর্তব্য এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত এক গুরুতর আমানত। একজন পুরুষকে পরিবারের কর্তা ও অভিভাবক হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যে তার অধীনস্তদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল এবং তাদের প্রতিটি প্রয়োজন পূরণে জবাবদিহির আওতাভুক্ত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহিহ হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, প্রত্যেক অভিভাবক তার অধীনস্তদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। তাই স্ত্রী, সন্তান এবং নির্ভরশীল আত্মীয়দের ভরণপোষণ, সঠিক শিক্ষা ও উত্তম প্রতিপালন নিশ্চিত করা একজন মুসলিমের মৌলিক কর্তব্য।যদি কোনো ব্যক্তি এ দায়িত্বে অবহেলা করে এবং তার অবহেলার কারণে পরিবার দ্বীনি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে পাপের দিকে ধাবিত হয়, তবে সে নিঃসন্দেহে গুনাহগার হবে। কারণ, সে তাদের সঠিক পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব পালন করেনি। তবে যদি সে আন্তরিকভাবে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে, এরপরও তার পরিবারের কেউ ভুল বা পাপে লিপ্ত হয়, তাহলে সে তাদের পাপের দায় বহন করবে না। তবুও তার কর্তব্য হলো তাদেরকে নিয়মিত নসিহত করা, আল্লাহর ভয় স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং সুন্দরভাবে সৎ পথে আহ্বান করা।ইসলামী শরিয়তে “নফকা” বলতে এমন সব মৌলিক প্রয়োজনকে বোঝায়, যা একজন মানুষের স্বাভাবিক ও সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—খাদ্য ও পানীয়, উপযুক্ত পোশাক, নিরাপদ ও সম্মানজনক বাসস্থান, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা এবং দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়। সামর্থ্য অনুযায়ী এসব প্রয়োজন পূরণ করা শুধু সদয়তা বা অনুগ্রহ নয়; বরং এটি একটি বাধ্যতামূলক অধিকার (হক), যা অবহেলা করা মারাত্মক গুনাহের কারণ হতে পারে।একজন মুমিনের উচিত হালাল উপার্জনের মাধ্যমে তার পরিবারের জন্য রিজিকের ব্যবস্থা করা এবং তাদেরকে অভাব-অনটন থেকে রক্ষা করা। এ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সে শুধু পারিবারিক দায়িত্বই আদায় করে না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথেও অগ্রসর হয়। প্রকৃতপক্ষে, যে ঘরে দায়িত্বশীলতা, দয়া, ন্যায়পরায়ণতা এবং দ্বীনি চেতনা বিদ্যমান থাকে—সেই ঘরই পরিণত হয় শান্তি, ভালোবাসা ও বরকতের এক অনন্য কেন্দ্রস্থলে।ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ)-এর “পরিবার আমার কাছে ভরণপোষণ দাবি করছে” কথাটির উদ্দেশ্য হলো—একজন মুমিনের উপর যেমন আল্লাহর ফরজসমূহ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ এবং নফস ও শয়তানের বিরুদ্ধে সংগ্রামের দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি তার উপর পরিবারের হক আদায় করাও একটি অপরিহার্য ওয়াজিব দায়িত্ব। স্ত্রী, সন্তান ও নির্ভরশীলদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করা এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত দায়িত্ব, যা অবহেলা করা বৈধ নয়। অর্থাৎ, একজন মুমিনের জীবন কেবল ইবাদত বা ব্যক্তিগত আমলে সীমাবদ্ধ নয়; বরং একই সঙ্গে সে আল্লাহর হক, নিজের আত্মার দায়িত্ব এবং পরিবারের হক—এই সবগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে বাধ্য।
.
পরিশেষে, ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ)-এর এই গভীর উত্তর আমাদের সামনে একজন সত্যিকার ঈমানদারের জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তাঁর দৃষ্টিতে মানুষের জীবন কোনো স্থির শান্তির নাম নয়; বরং এটি এক অবিরাম দায়িত্ব, পরীক্ষার ও জবাবদিহির কেন্দ্রবিন্দু।একদিকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরয আদায়ের নির্দেশ, অন্যদিকে রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ অনুসরণের আহ্বান—এই দুই মহান দায়িত্ব মানুষকে সর্বদা বাধ্য করে নিজের আমল ও জীবনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। একইসাথে দুই কাঁধের ফেরেশতা তার প্রতিটি কাজ পর্যবেক্ষণ করে তা বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার দিকে নজর রাখে। আবার তার নিজের নফস তাকে অবিরত প্রবৃত্তির দিকে টেনে নিতে চায়, শয়তান তাকে গুনাহ ও অশ্লীলতার দিকে প্ররোচিত করে, আর মৃত্যুর ফেরেশতা তার জীবন সমাপ্তির অপেক্ষায় থাকে। এর পাশাপাশি তার পরিবারও তার ভরণপোষণ ও দায়িত্ব পূরণের প্রত্যাশায় থাকে। এমন বহু দিক থেকে ঘিরে থাকা অবস্থায় একজন মানুষের জন্য আত্মতুষ্টি, গাফেলতি বা অহংকারের কোনো সুযোগ থাকে না। বরং তার হৃদয়ে সর্বদা জেগে থাকে এক গভীর সচেতনতা—আমি দায়িত্বের মাঝে আছি, আমাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। এই উপলব্ধিই তাকে বিনয়ী করে, নিজের আমলের প্রতি কঠোর পর্যবেক্ষণ শেখায় এবং তাকে সর্বদা সংশোধন ও উন্নতির পথে রাখে। ফলে তার জীবন হয়ে ওঠে এক ধরনের “দায়িত্ববোধের ইবাদত”, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা। মহান আল্লাহ আমাদের দ্বীনের এই মহান ইমামের উপরোক্ত নসিয়া থেকে উপকৃত হওয়ার তৌফিক দান করুন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: