ব্যক্তি ও সমাজজীবনে দারিদ্র্যের নেতিবাচক প্রভাব এবং দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামের নির্দেশনা

প্রশ্ন: ব্যক্তি ও সমাজজীবনে দারিদ্র্যের নেতিবাচক প্রভাব কী এবং দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামের নির্দেশনাগুলো কী?
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
💠প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর দারিদ্র্য সমগ্র বিশ্বের অন্যতম একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ ও মানুষ আজ দারিদ্র্য সমস্যায় জর্জরিত।ইসলামের দৃষ্টিতে দারিদ্র্য হচ্ছে এমন এক অবস্থা যা মানব জীবনের অব্যাহত প্রয়োজনীয় পণ্য বা মাধ্যম উভয়েরই অপর্যাপ্ততা থাকে। আভিধানিক অর্থে ‘দারিদ্র্য’ বলতে অভাব-অনটনকে বুঝায়। এটি এক প্রকার নেতিবাচক অর্থনৈতিক অবস্থা।দারিদ্র্য এমন একটি বিপদ যাতে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। সেটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি অথবা পরিবার অথবা সমাজের ক্ষেত্রে হতে পারে। আকীদা-বিশ্বাস ও আচার-আচরণের উপর দারিদ্র্যের বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। খ্রিষ্টধর্মের বহু প্রচারক বিভিন্ন জাতির দারিদ্র্যকে কাজে লাগিয়ে তাদের মাঝে খ্রিষ্টধর্মের বিস্তার করে যাচ্ছে। এছাড়া দারিদ্র্যের কারণে নিজেদের অভাব পূরণ করতে গিয়ে বহু মন্দ স্বভাবও ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মাঝে চুরি, হত্যা, ব্যভিচার, হারাম বস্তু বিক্রির প্রবণতা বিস্তার লাভ করে। নিঃসন্দেহে ব্যক্তি ও সমাজের উপর এ সকল অপরাধের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের ব্যাপারে বলেছেন যে, তাদের কেউ কেউ হয় দারিদ্র্যের কারণে নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করত অথবা দারিদ্র্যে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় সন্তানদের হত্যা করত!
.
আল্লাহ তাআলা প্রথম শ্রেণির ব্যাপারে বলেন:وَلا تَقْتُلُوا أَوْلادَكُمْ مِنْ إِمْلاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ“দারিদ্র্যের কারণে নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। তোমাদেরকে ও তাদেরকে আমিই জীবিকা দান করি।”[সূরা আন’আম: ১৫১] দ্বিতীয় শ্রেণির ব্যাপারে আল্লাহ বলেন:وَلا تَقْتُلُوا أَوْلادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْئاً كَبِيراً“অভাবের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমিই তাদের রুজির ব্যবস্থা করি এবং তোমাদেরও। তাদেরকে হত্যা করা নিশ্চয়ই একটি বড় পাপ।”[সূরা ইসরা: ৩১] এছাড়াও সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে এমন এক নারীর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যার আর্থিক প্রয়োজন এতটাই তীব্র হয়ে পড়েছিল যে, পৃথিবী যেন তার সামনে সংকীর্ণ হয়ে এসেছিল। একপর্যায়ে সে তার এক চাচাতো ভাই ছাড়া আর কারও কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার সুযোগ পেল না। কিন্তু সেই ব্যক্তি তাকে অর্থ দেওয়ার বিনিময়ে তার সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার প্রস্তাব দেয়। নারীটি যখন তাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাঁর শাস্তির ভয় দেখায়, তখন সে আল্লাহভীতিতে সেই অপকর্ম থেকে বিরত থাকে। এ ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, চরম দারিদ্র্য ও অভাব মানুষকে কত কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করতে পারে।” আর এ প্রসঙ্গে একটি প্রসিদ্ধ বাণী রয়েছে— «كاد الفقر أن يكون كفرًا»—অর্থাৎ, “দারিদ্র্য যেন কুফরির নিকটবর্তী করে দেয়।” এটি আবূ নু‘আইম তাঁর আল-হিলইয়াহ গ্রন্থে এবং ইমাম বায়হাকী তাঁর শু‘আবুল ঈমান গ্রন্থে আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তবে মুহাদ্দিসদের নিকট এর সনদ যঈফ (দুর্বল)। সুতরাং এটিকে সহীহ হাদীস হিসেবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামে উদ্ধৃত করা সমীচীন নয়। তবে এতে কোন সন্দেহ নাই যে, দারিদ্র্য ও চরম অভাব মানুষের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে নানা ধরনের অপরাধ, অন্যায় ও নৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে—এটি বাস্তব ও সুপরিচিত বিষয়। এ কারণেই পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি ও রাষ্ট্র দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য নানাবিধ ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে।
.
(كاد الفقر أن يكون كفرًا)
অর্থাৎ-“দারিদ্র্য কুফরীর দিকে নিয়ে যায়” প্রচলিত এই বাণীটি হাদিস হিসেবে দুর্বল। তবে এর অর্থের সমর্থনে আবূ সাঈদ খুদরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে,”দারিদ্র্য মানুষকে কুফরীর নিকটবর্তী করে দিতে পারে।”আল্লামা সান‘আনী (রাহিমাহুল্লাহ) এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।”(মিরকাতুল মাফাতিহ শরহু মিশকাতিল মাসাবিহ, ৫/১৭১৯) কারণ হিসেবে বলেছেন,দারিদ্র্য আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ভাগ্যের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করায় এবং আল্লাহ প্রদত্ত রিযক্বের প্রতি অসন্তুষ্ট করে। এভাবে ক্রমশ তা কুফরীর দিকে নিয়ে যায়- না‘ঊযুবিল্লাহ। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট ব্যাখ্যাকার আল্লামা বদরুদ্দীন আল-‘আইনী (রাহিমাহুল্লাহ) ‘উমদাতুল কারী গ্রন্থে বলেন:وذلك لأن الفقر ربما يحمل صاحبه على مباشرة ما لا يليق بأهل الدين والمروءة، ويهجم على أي حرام كان ولا يبالي، وربما يحمله على التلفظ بكلمات تؤديه إلى الكفر.“এর কারণ হলো, দরিদ্রতা অনেক সময় মানুষকে এমন সব কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করে যা দ্বীনদার ও মর্যাদাবান ব্যক্তিদের শান অনুযায়ী শোভনীয় নয়। তখন সে যে কোনো হারামে জড়িয়ে পড়তে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না এবং এমন সব কথা মুখে উচ্চারণ করে বসে যা তাকে কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে।”(উমদাতুল কারী শারহু সহীহ বুখারী: ২৩/৫)।
.
“ফায়যুল কদীর” গ্রন্থের রচয়িতা ইমাম মুনাওয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেছেন: “كاد الفقر (أي: الفقر مع الاضطرار إلى ما لا بد منه)، كما ذكره الغزالي- أن يكون كفرًا- أي: قارب أن يوقع في الكفر؛ لأنه يحمل على حسد الأغنياء، والحسد يأكل الحسنات، وعلى التذلُّل لهم بما يدنس به عرضه، ويثلم به دينه، وعلى عدم الرضا بالقضاء، وتسخط الرزق، وذلك إن لم يكن كفرًا فهو جارٍ إليه؛ ولذلك استعاذ المصطفى صلى الله عليه وسلم من الفقر. وقال سفيان الثوري: لأن أجمع عندي أربعين ألف دينار حتى أموت عنها أحبُّ إليَّ من فقر يوم، وذلي في سؤال الناس. قال: ووالله ما أدري ماذا يقع مني لو ابتُليت ببلية من فقر أو مرض، فلعلي أكفر ولا أشعر؛ فلذلك قال: كاد الفقر أن يكون كفرًا؛ لأنه يحمل المرء على ركوب كل صعب وذلول، وربما يؤديه إلى الاعتراض على الله والتصرُّف في ملكه”দারিদ্র্য—অর্থাৎ এমন দারিদ্র্য, যখন মানুষ তার একান্ত অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণে বাধ্য হয়—কুফরির কাছাকাছি পৌঁছে যায়।” এ কথা ইমাম গাযালী (রহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, দারিদ্র্য মানুষকে কুফরিতে পতিত করার উপক্রম করে। কারণ, এটি তাকে ধনীদের প্রতি হিংসা করতে প্ররোচিত করে; আর হিংসা নেক আমলসমূহকে ধ্বংস করে দেয়। এটি তাকে ধনীদের সামনে এমনভাবে নিজেকে হেয় ও অপমানিত করতে বাধ্য করে, যার মাধ্যমে তার সম্মান কলুষিত হয় এবং তার দ্বীনের ক্ষতি সাধিত হয়। তদুপরি, এটি তাকে তাকদিরের ফয়সালার প্রতি অসন্তুষ্ট এবং নির্ধারিত রিজিকের প্রতি ক্ষুব্ধ করে তোলে। এসব বিষয় কুফরি না হলেও কুফরির দিকে ধাবিত করে। এ কারণেই মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দারিদ্র্য থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। সুফিয়ান আস-সাওরি (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: “মানুষের কাছে হাত পেতে একদিন দারিদ্র্য ও অপমান ভোগ করার চেয়ে আমার কাছে অধিক প্রিয় হলো—আমি যেন চল্লিশ হাজার দিনার সঞ্চয় করি এবং তা আমার মৃত্যুর সময় পর্যন্ত আমার কাছে থাকে।” তিনি আরও বলেন, “আল্লাহর কসম! আমি জানি না, দারিদ্র্য কিংবা অসুস্থতার কোনো বিপদ দ্বারা যদি আমি পরীক্ষিত হই, তখন আমার দ্বারা কী ঘটে যেতে পারে! হতে পারে, আমি কুফরি করে ফেলব অথচ তা টেরও পাব না।” তাই বলা হয়েছে, “দারিদ্র্য কুফরির কাছাকাছি পৌঁছে যায়।” কারণ, দারিদ্র্য মানুষকে যেকোনো কঠিন ও সহজ—উভয় ধরনের উপায় অবলম্বন করতে বাধ্য করে। এমনকি কখনো কখনো তা তাকে আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি করা এবং তাঁর মালিকানাধীন জগতে এমনভাবে হস্তক্ষেপ করার পর্যায়ে নিয়ে যায়, যা অত্যন্ত ভয়াবহ।”(ফায়যুল কাদীর, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৪২)
.
💠দ্বিতীয়ত: দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামের নির্দেশনা:
.
দারিদ্র্য ব্যক্তি ও সমাজের জন্য কতটা ক্ষতিকর—তা আলোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। তাই দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের জন্য ইসলাম অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। ইসলাম কেবল দারিদ্র্যের পরিণতি নিয়ে আলোচনা করেনি; বরং এর প্রতিকার ও প্রতিরোধের জন্য ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—প্রতিটি স্তরেই সুস্পষ্ট ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছে। একদিকে ইসলাম মানুষকে হালাল ও সম্মানজনক উপায়ে উপার্জন, কর্মসংস্থান ও আত্মনির্ভরশীলতার প্রতি উৎসাহিত করেছে; অন্যদিকে যাকাত, সদাকাহ, দান-সদকা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকীন ও অসহায়দের অধিকার আদায়ের মাধ্যমে সম্পদের সুষম প্রবাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি সুদ, জুয়া, প্রতারণা, মজুতদারি ও অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণসহ অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণের পথগুলো নিষিদ্ধ করেছে। এভাবে ইসলাম ব্যক্তি-উদ্যোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সমন্বয়ে দারিদ্র্য বিমোচনের একটি সুদৃঢ় ও কল্যাণমুখী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাগুলো নিম্নরূপ:
.
🔹(১). মানুষকে এই বিশুদ্ধ আকীদা শেখানো যে, রিযিক আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে:
.
আল্লাহ তাআলা হচ্ছেন- রায্‌যাক (জীবিকাদাতা) এবং তিনিই উত্তম জীবিকাদানকারী। পৃথিবীতে বিচরণকারী প্রত্যেকটি জীবের জীবিকা আল্লাহরই দায়িত্বে। কোন লোভাতুরের লোভ অথবা হিংসুকের হিংসা কাউকে তার জীবিকা হতে বঞ্চিত করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রজ্ঞা অনুযায়ী মানুষের জীবিকার মধ্যে তারতম্য করেন। যেমনিভাবে মানুষের আকার-আকৃতি ও স্বভাব-চরিত্রের মধ্যেও তিনি ভিন্নতা দিয়ে থাকেন। আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবিকার মধ্যে বিস্তৃতি দেন। তিনি যাকে ইচ্ছা জীবিকার সচ্ছলতা দেন, যাকে ইচ্ছা জীবিকা সংকুচিত করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর পূর্ববর্তী জ্ঞান ও লিপিকার ভিত্তিতে মানুষের জীবিকা বণ্টন করেন। তাঁর পূর্ব জ্ঞান ও লিপিকাতে রয়েছে বান্দাদের মধ্যে কে সচ্ছল জীবিকা পাবে, আর কে সংকুচিত জীবিকা পাবে। এর মধ্যে রয়েছে মহান আল্লাহর প্রভূত হেকমত (গূঢ় রহস্য)। তাঁর সকল হেকমত অনুধাবন করা বান্দার সাধ্যে নেই। জীবিকায় সচ্ছলতা দান ও সংকোচনের একটি হেকমত হচ্ছে- নেয়ামত দিয়ে অথবা বিপদ-আপদ দিয়ে বান্দাকে পরীক্ষা করা। “আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি এবং আমারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।”[সূরা আম্বিয়া, ৩৫] আল্লাহ তাআলা আরো বলেন: “মানুষ এরূপ যে, যখন তার পালনকর্তা তাকে পরীক্ষা করেন এভাবে যে, তাকে সম্মান ও অনুগ্রহ দান করেন তখন সে বলে, আমার পালনকর্তা আমাকে সম্মান দান করেছেন। এবং যখন তাকে পরীক্ষা করেন এভাবে যে, তার রিযিক সংকুচিত করে দেন, তখন সে বলে: আমার পালনকর্তা আমাকে হেয় করেছেন।[সূরা ফজর: ১৫-১৬] এই বক্তব্যের পর আল্লাহ তাআলা বলেন: “এটা অমূলক”। অর্থাৎ মানুষ যা ধারনা করে প্রকৃত অবস্থা তদ্রূপ নয়। বরঞ্চ জীবিকার সচ্ছলতা ও সংকোচন বান্দার জন্য একটি পরীক্ষা; তাকে সম্মান দেয়া বা অপমান করা নয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে শুকরগুজার ও ধৈর্যশীল বান্দা এবং অকৃতজ্ঞ ও অধৈর্য বান্দাদের চেনা যায়। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞানী।
.
সুতরাং আল্লাহ যা কিছু বিপদ-আপদ নির্ধারণ করেন সেগুলো কিছু প্রজ্ঞার জন্যই করে থাকেন। দরিদ্র মুসলিমের করণীয় হচ্ছে বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করা এবং নিজের ও পরিবারের দারিদ্র্য দূর করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।আল্লাহ তাআলা বলেন:إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ“আল্লাহই তো জীবিকা দানকারী, ক্ষমতাশালী, মহাশক্তিমান।”[সূরা যারিয়াত: ৫৮] তিনি আরো বলেন: وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا وَيَعْلَمُ مُسْتَقَرَّهَا وَمُسْتَوْدَعَهَا كُلٌّ فِي كِتَابٍ مُبِينٍ“পৃথিবীতে চলমান সকল প্রাণীর জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর। তিনি তাদের অবস্থানস্থল ও সংরক্ষণস্থল জানেন। সবকিছুই এক স্পষ্ট গ্রন্থে (লিপিবদ্ধ) আছে।”[সূরা হূদ: ৬] তিনি আরো বলেন: أَمَّنْ هَذَا الَّذِي يَرْزُقُكُمْ إِنْ أَمْسَكَ رِزْقَهُ بَلْ لَجُّوا فِي عُتُوٍّ وَنُفُورٍ“তিনি যদি তার রিযিক বন্ধ করে দেন, তাহলে কে আছে এমন যে তোমাদেরকে রিযিক দিতে পারে? (কেউ নেই,) বরং (নির্বোধের মত) তারা অবাধ্যতা ও অনীহার মধ্যে অটল রয়েছে।”[সূরা মুলক: ২১] তিনি আরো বলেন:وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلاً“অবশ্যই আমি আদম-সন্তানদেরকে (মানবজাতিকে) সম্মানিত করেছি, তাদেরকে স্থলে ও সাগরে চলাচলের বাহন দিয়েছি, উৎকৃষ্ট দ্রব্যাদি থেকে তাদের জীবিকার ব্যবস্থা করেছি এবং আমি যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের চেয়ে তাদেরকে আমি মর্যাদা দিয়েছি।”[সূরা ইসরা: ৭০]
.
এই বিশ্বাসগুলো থাকলে মানুষ দারিদ্র্যে আক্রান্ত হলে ধৈর্যধারণ করে, রিযিক অন্বেষণে কেবল আল্লাহর কাছে ধর্ণা দেয়, আল্লাহর ফয়সালার প্রতি তুষ্ট থাকে এবং রিযিক অন্বেষণে প্রচেষ্টা চালায়। সাহাবী সুহাইব আর-রূমী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “মুমিনের অবস্থা বিস্ময়কর! সকল অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া অন্য কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। আনন্দকর কিছু পেলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে; ফলে এটি তার জন্য মঙ্গলকর হয়। আর অস্বচ্ছলতা বা বিপদে আক্রান্ত হলে সে সবর করে; ফলে এটিও তার জন্য কল্যাণকর হয়।”[হাদীসটি মুসলিম হা/ ২৯৯৯) বর্ণনা করেন] অন্যদের দিকে দৃষ্টিপাত করার মাধ্যমে আমরা মুসলিমদের মাঝে এই আকীদার প্রভাব জানতে পারি। উদাহরণস্বরূপ জাপানে ২০০৩ সালে তেত্রিশ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ: বেকারত্ব! বিবিসির ওয়েবসাইটে ১/৯/২০০৪ তারিখে প্রতিবেদনে এসেছে, তারা বলেন: ‘অফিসিয়াল হিসাব অনুসারে গত বছরে তেত্রিশ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করেছে। জাপানি কর্তৃপক্ষ বলেন: আত্মহত্যার হার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে জাপানে চলমান অর্থনৈতিক মন্দা, যা গত পঞ্চাশ বছরে সর্বোচ্চ। এটি বেকারত্বের হারকে এতটা বাড়িয়ে দিয়েছে যা অভূতপূর্ব। যার ফলে হতাশাগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে পৌঢ়ত্ব পৌঁছা পুরুষদের মাঝে এর হার বেশি।’[সমাপ্ত]
.
আল্লাহ তাআলা বলেন:إِِنَّ رَبَّكَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ إِنَّهُ كَانَ بِعِبَادِهِ خَبِيراً بَصِيراً“তোমার প্রভু যাকে চান তার জীবিকা বাড়িয়ে দেন, আবার সংকুচিত করেন। নিশ্চয়ই তিনি তাঁর বান্দাদের সব খবর রাখেন এবং তাদের সবকিছু দেখেন।”[সূরা ইসরা: ৩০] উক্ত আয়াতের তাফসিরে হাফিয ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وقوله تعالى ( إِنَّ رَبَّكَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ ) إخبار أنه تعالى هو الرزاق ، القابض ، الباسط ، المتصرف في خلقه بما يشاء ، فيُغني من يشاء ، ويُفقر من يشاء ، بما له في ذلك من الحكمة ؛ ولهذا قال : ( إِنَّهُ كَانَ بِعِبَادِهِ خَبِيرًا بَصِيرًا ) أي : خبير بصير بمن يستحق الغنى ، ومن يستحق الفقر … .وقد يكون الغنى في حق بعض الناس استدراجًا ، والفقر عقوبة ، عياذًا بالله من هذا وهذا “আল্লাহর বাণী: “তোমার রব যাকে চান তার জীবিকা বাড়িয়ে দেন, আবার সংকুচিত করেন” অবগত করছে যে আল্লাহই রিযিকদাতা, সংকোচনকারী, সম্প্রসারণকারী এবং সৃষ্টির মধ্যে নিজের ইচ্ছামত কাজ করে থাকেন। তিনি যাকে ইচ্ছা বিত্তশালী করেন, যাকে ইচ্ছা দরিদ্র করেন। তিনি তাঁর প্রজ্ঞাবলে এটি করে থাকেন। তাই তিনি বলেছেন: “তিনি তার বান্দাদের সব খবর রাখেন এবং তাদের সব কিছু দেখেন।” অর্থাৎ কে বিত্তের উপযুক্ত, আর কে দারিদ্র্যের উপযুক্ত সে ব্যাপারে তিনি সব কিছু জানেন ও দেখেন। … কিছু মানুষের জন্য বিত্তবান হওয়াটা তাকে পাকড়াও করার পূর্ব ধাপ হতে পারে। দারিদ্র্য কিছু মানুষের জন্য শাস্তি হতে পারে। তাই আল্লাহর কাছে এটা থেকে এবং ওটা থেকে পানাহ চাই।” (তাফসীরে ইবনে কাসীর; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৭১)
.
🔹(২). আল্লাহর কাছে দারিদ্র্য থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা:
.
দারিদ্র্য থেকে মুক্তির জন্য ইসলামে শুধু পার্থিব উপায় অবলম্বনের নির্দেশই দেওয়া হয়নি; বরং আল্লাহর কাছে দারিদ্র্য ও এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেও উৎসাহিত করা হয়েছে। কারণ দারিদ্র্য কখনো কখনো মানুষের ঈমান, আমল, চরিত্র ও পারিবারিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই একজন মুমিনের উচিত প্রয়োজনীয় উপায় অবলম্বনের পাশাপাশি নিয়মিত আল্লাহর কাছে দারিদ্র্য থেকে পানাহ চাওয়া।নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা করতেন এবং যা উম্মাহকে শেখাতেন সেটি সুন্নাহতে বর্ণিত হয়েছে। আর তা হলো: আল্লাহ তাআলার কাছে দারিদ্র্য থেকে পানাহ চাওয়া। যেহেতু ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের উপর দারিদ্রের প্রভাব রয়েছে। মুসলিম ইবনু আবী বাকরা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমার বাবা প্রত্যেক নামাযের পরে পড়তেন:اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ الْكُفْرِ وَالْفَقْرِ وَعَذَابِ الْقَبْرِ “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কুফরী, দারিদ্র্য ও কবরের আযাব থেকে আশ্রয় চাই।” আমিও সেগুলো বলতাম। আমার পিতা বললেন: ‘বাবা! তুমি এটা কার কাছ থেকে শিখেছ?’ আমি বললাম: ‘আপনার কাছ থেকে।’ তিনি বললেন: ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযের পরে এ বাক্যগুলো বলতেন।’[হাদীসটি নাসাঈ হা/১৩৪৭) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী সহীহুন নাসাঈ গ্রন্থে এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন] অপর হাদিসে এসেছে,আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন:اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ الْكَسَلِ وَالْهَرَمِ وَالْمَأْثَمِ وَالْمَغْرَمِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْقَبْرِ وَعَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ فِتْنَةِ النَّارِ وَعَذَابِ النَّارِ وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْغِنَى وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْفَقْرِ“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি— দারিদ্র্য, বার্ধক্য, পাপ ও ঋণ থেকে, কবরের ফিতনা ও কবরের আযাব থেকে, জাহান্নামের ফিতনা ও জাহান্নামের আযাব থেকে এবং বিত্তের ফিতনার অনিষ্ট থেকে। আপনার কাছে আরও আশ্রয় প্রার্থনা করছি— দারিদ্র্যের ফিতনার অনিষ্ট থেকে।”[হাদীসটি বুখারী হা/ ৬০০৭) ও মুসলিম (৫৮৯) বর্ণনা করেন]
.
🔹(৩). কাজ করা, উপার্জন করা ও রিযিক অন্বেষণের লক্ষ্যে পৃথিবীতে বিচরণ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান:
.
ইসলাম মানুষকে অলসতা, কর্মবিমুখতা ও মানুষের কাছে হাত পাতার পরিবর্তে হালাল উপায়ে কাজ করা এবং নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন পূরণের জন্য রিযিক অন্বেষণে উৎসাহিত করেছে। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি বৈধ উপায় অবলম্বন করে জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করা একজন মুমিনের প্রশংসনীয় গুণ। এ বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولاً فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِنْ رِزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ “তিনি পৃথিবীকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন। অতএব, তোমরা পৃথিবীর পথে-প্রান্তরে চলাচল করো এবং আল্লাহর দেওয়া জীবিকা থেকে আহার করো। তাঁর কাছেই (প্রত্যাবর্তনের জন্য তোমাদের) পুনরুত্থান (হবে)।”[সূরা মুলক: ১৫] তিনি আরো বলেন:فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيراً لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ “অতঃপর যখন নামায সমাপ্ত হবে তখন যমীনে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) সন্ধান করবে ও বেশি করে আল্লাহকে স্মরণ করবে, যাতে করে তোমরা সফলকাম হও।”[সূরা জুম’আ: ১০] মিকদাম রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “নিজের হাতের কাজ থেকে উত্তম কিছু কেউ উপার্জন করেনি। আল্লাহর নবী দাউদ আলাইহিস সালাম নিজ হাতের উপার্জন থেকে খেতেন।”[হাদীসটি বুখারী (১৯৬৬) বর্ণনা করেন] আরেক বর্ননায় যুবাইর ইবনুল আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে কেউ রশি নিয়ে তার পিঠে কাঠের বোঝা বয়ে আনা এবং সেটা বিক্রি করা এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ তার সম্মানকে রক্ষা করা মানুষের কাছে ভিক্ষা চাওয়ার চেয়ে উত্তম; চাই মানুষ তাকে ভিক্ষা দিক কিংবা না দিক।”[হাদীসটি বুখারী হা/১৪০২) বর্ণনা করেন]
.
🔹৪. ধনীদের সম্পদে যাকাত আবশ্যক করা:
.
ইসলামী জীবন দর্শনে দারিদ্র্য বিমোচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক হলো যাকাত। এটি একটি ফরয ‘ইবাদত। সমাজের দরিদ্র, সহায়-সম্বলহীন মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য যাকাতের বিধান প্রবর্তিত হয়েছে। যাকাত মুসলিমদের ব্যবহারিক জীবনে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের মূলোৎপাটন করে এক অভেদ্য সমাজ গঠনের শিক্ষা দেয়। যাকাত মানবতা প্রতিষ্ঠার এক কার্যকর পদক্ষেপ। রাসূল (ﷺ) এর রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাজস্ব আয়ের অন্যতম মাধ্যম ছিল যাকাত।আল্লাহ তাআলা যাকাতের সম্পদে দরিদ্রদের অংশ রেখেছেন। দরিদ্রকে যাকাতের মালিক করে দিতে হবে। দরিদ্রকে এতটুকু দিতে হবে যাতে করে সে অমুখাপেক্ষী হয়ে যায় এবং তার দারিদ্র্য দূর হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ“যাকাত হল কেবল ফকির, মিসকীন, যাকাতের কাজে নিয়োজিত কর্মী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের জন্য এবং ক্রীতদাস, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে যারা আছে তারা ও মুসাফিরদের খাতে। এটি আল্লাহ কর্তৃক ফরযকৃত। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”[সূরা তাওবাহ: ৬০] আল্লাহ তাআলা আরো বলেন:وَالَّذِينَ فِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ مَعْلُومٌ . لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ “যাদের সম্পদে নির্দিষ্ট হক (ন্যায্য অধিকার) রয়েছে যাচ্ঞাকারী ও বঞ্চিত ব্যক্তির জন্য।”[সূরা মা’আরিজ: ২৪, ২৫] শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, نَفْسُ الْمُتَصَدِّقِ تَزْكُوْ وَمَالُهُ يَزْكُوْ يَطْهُرُ وَيَزِيْدُ فِيْ الْمَعْنَى “দানকারী ব্যক্তির অন্তর পবিত্র হয়। আর তার মাল বিপদমুক্ত ও পবিত্র হয় এবং প্রকৃতার্থে তার মালও বৃদ্ধি পায়”।(মাজমূ‘ঊল ফাতাওয়া, ২৫ তম খণ্ড; পৃষ্ঠা: ৮)
.
🔹৫. দান-সদকা, ওয়াকফ করা ও এতিম-বিধবাদের দায়িত্ব নেওয়ার প্রতি উৎসাহ দেওয়া:
.
ইসলাম মানুষকে শুধু নিজের প্রয়োজন পূরণের প্রতি উৎসাহিত করেনি; বরং সামর্থ্য অনুযায়ী আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করা, অসহায়-দুঃস্থদের সহযোগিতা করা এবং সমাজের দুর্বল শ্রেণির মানুষের দায়িত্ব নেওয়ার প্রতি বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছে। দান-সদকা ও মানুষের কল্যাণে সম্পদ ব্যয় করা মুমিনের জন্য দুনিয়াতে বরকত এবং আখিরাতে মহাপুরস্কার লাভের অন্যতম মাধ্যম। এমনকি এতিম ও বিধবার দেখাশোনাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَأَنْفِقُوا خَيْرًا لِأَنْفُسِكُمْ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ“অতএব, যতটা পারো আল্লাহকে ভয় করো। (তাঁর কথা) শোনো। (তাঁর) আনুগত্য করো এবং (তাঁর পথে) ব্যয় করো। এতে তোমাদের নিজেদেরই কল্যাণ রয়েছে। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত তারাই সফলকাম।”[সূরা তাগাবুন: ১৬] তিনি আরো বলেন:وَمَا أَنْفَقْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُهُ وَهُوَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ“তোমরা (আল্লাহর রাস্তায়) যা কিছু ব্যয় করো তিনি এর প্রতিস্থাপন করে দিবেন। তিনি শ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা।”[সূরা সাবা: ৩৯] আল্লাহ তাআলা আরো বলেন:وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللَّهِ هُوَ خَيْرًا وَأَعْظَمَ أَجْرًا
“তোমরা নিজেদের জন্য ভালো যা কিছু অগ্রিম পাঠাবে সেটা আল্লাহর কাছে এমন অবস্থায় পাবে যে, তা আরো ভালো ও পুরস্কার হিসেবে আরো বড়।”[সূরা মুয্‌যাম্মিল: ২০] আদী ইবনে হাতিম বলেন: আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে থাকার সামর্থ্য রাখে সে যেন একটা খেজুরের টুকরা দিয়ে হলেও তাই করে।”[হাদীসটি বুখারী হা/১৩৪৭) ও মুসলিম (১০১৬) বর্ণনা করেন, হাদীসটির শব্দ মুসলিমের] অপর বর্ননায় সাহ্‌ল ইবনে সা’দ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমি ও এতীম পালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব। তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুলের মধ্যে সামান্য ফাঁকা রেখে ইশারা করে দেখালেন।”[হাদীসটি বুখারী হা/৪৯৯৮) ও মুসলিম (২৯৮৩) বর্ণনা করেন। মুসলিম হাদীসটি আবু হুরাইরা থেকে কাছাকাছি শব্দে বর্ণনা করেন] আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “বিধবা ও মিসকীনের জন্য (খাদ্য যোগাতে) সচেষ্ট ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদের মত অথবা রাত জেগে ইবাদতকারী ও দিনভর সিয়াম পালনকারীর মত।”[হাদীসটি বুখারী হা/৫০৩৮) ও মুসলিম (২৯৮২) বর্ণনা করেন]
.
🔹৬. সুদ ও জুয়া এবং ক্রয়-বিক্রয়ে প্রতারণা হারাম করা:
.
ইসলাম মানুষের জান, মাল ও অধিকার সংরক্ষণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে এবং অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ আত্মসাৎ করার সকল পথ বন্ধ করে দিয়েছে। তাই মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা, লেনদেনে ধোঁকা দেওয়া এবং ভাগ্যনির্ভর উপায়ে সম্পদ অর্জনের পথ ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। বিশেষত সুদ, জুয়া ও প্রতারণামূলক লেনদেন ব্যক্তি ও সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হওয়ায় এগুলোকে সুস্পষ্টভাবে হারাম করা হয়েছে।আল্লাহ তাআলা বলেন:يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ . فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِنْ تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُؤُوسُ أَمْوَالِكُمْ لا تَظْلِمُونَ وَلا تُظْلَمُونَ“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং (তোমাদের কাছে) যে সুদ বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা (প্রকৃত) ঈমানদার হয়ে থাকো। যদি তা না করো তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে একটি যুদ্ধের ঘোষণা শুনে রাখো। আর যদি তোমরা তাওবা করো তাহলে তোমাদের মূলধন তোমাদের থাকবে। (এ ব্যাপারে) তোমরাও যুলুম করবে না এবং তোমাদের উপরও যুলুম করা হবে না।”[সূরা বাকারা: ২৭৮, ২৭৯] তিনি আরো বলেন:يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ“হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি, ভাগ্য নির্ণয়ের তীর এগুলো বস্তুত শয়তানের এক একটি ঘৃণ্য কাজ। অতএব, এসব থেকে দূরে থাকো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।”[সূরা মায়েদা: ৯০] আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি খাদ্য স্তুপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় তিনি খাদ্যস্তুপের ভেতরে নিজের হাত প্রবেশ করিয়ে দেন। ফলে তাঁর আঙুলে কিছু ভেজা অনুভূত হল। তিনি বললেন: “হে খাদ্যের মালিক! এটা কী?” লোকটি বলল: ‘হে আল্লাহর রাসূল! এতে বৃষ্টির পানি পড়েছে।’ তিনি বললেন: ‘কেন তুমি ঐ ভেজা অংশটি উপরে রাখলে না; তাহলে লোকেরা তা দেখতে পেত। যে ধোঁকাবাজী করে সে আমার দলভূক্ত নয়।”[হাদীসটি মুসলিম (১০২) বর্ণনা করেন] সুদ, জুয়া ও প্রতারণামূলক ক্রয়বিক্রয় এগুলো মানুষদের মাঝে বিস্তার লাভের ফল হলো অন্যায়ভাবে তাদের সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া। কখনো কখনো মানুষ এগুলোর কারণে নিজেদের সমস্ত সম্পদ হারিয়ে ফেলে। তাই সুস্পষ্ট বক্তব্যের মাধ্যমে এগুলোকে হারাম করা হয়েছে।
.
🔹৭. দুস্থ ব্যক্তিকে সাহায্য করা ও দুর্বলদের পাশে দাঁড়ানো:
.
ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; বরং সমাজের অসহায়, দরিদ্র ও দুর্বল মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন এবং তাদের প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসারও নির্দেশ দেয়। একজন মুমিন নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও তা ভালোবাসবে এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের কষ্ট লাঘবে যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। কারণ, মুসলিম সমাজের পারস্পারিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধই ঈমানের সৌন্দর্য ও ভ্রাতৃত্বের অন্যতম প্রকাশ।সাহাবী নু’মান ইবনে বশীর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘মুমিনদের পারস্পারিক সম্প্রীতি, দয়া ও মায়া-মমতার উদাহরণ (একটি) দেহের মত। যখন দেহের কোন অঙ্গ পীড়িত হয় তখন তার জন্য সারা দেহ অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়।’[হাদীসটি বুখারী (৫৬৬৫) ও মুসলিম (২৫৮৬) বর্ণনা করেন] অপর বর্ননায় ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “সেই ব্যক্তি মুসলিম নয় যে পেট ভর্তি করে খায় অথচ তার প্রতিবেশি উপোস থাকে।”[হাদীসটি বাইহাকী শুয়াবুল ঈমান গ্রন্থে (৯২৫১) হাদীসটি বর্ণনা করেন। হাদীসটি শাইখ আলবানী হাসান বলে গণ্য করেন] মুয়াত্তা মালেক (১৭৪২) গ্রন্থে ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) এর সাথে গোশতের একটি পূর্ণ থলে দেখতে পেলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘এটি কী?’ জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: ‘আমীরুল মুমিনীন! আমার গোশত খাওয়ার ইচ্ছা হল। তাই এক দিরহাম দিয়ে গোশত ক্রয় করলাম।’ তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: ‘তোমাদের কেউই কি এটা চায় না যে, নিজে না খেয়ে প্রতিবেশীকে খাওয়াবে কিংবা তার চাচাতো ভাইকে দিবে?! তোমাদের কাছ থেকে এই আয়াতটি কোথায় গেল: (যেখানে বলা হয়েছে যে) أَذْهَبْتُمْ طَيِّبَاتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمْ الدُّنْيَا وَاسْتَمْتَعْتُمْ بِهَا “তোমরা তোমাদের ভালো কর্মগুলো দুনিয়ার জীবনে শেষ করে ফেলেছ এবং ভালো কর্মগুলোর বিনিময় উপভোগ করেছ।” আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন;ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং ৯৫৩৪০)
.
পরিশেষে: দারিদ্র্য শুধু অর্থ-সম্পদের সংকট নয়; বরং এর নেতিবাচক প্রভাব মানুষের ঈমান, চরিত্র, পরিবার ও সামগ্রিক সমাজব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে। এ কারণেই ইসলাম দারিদ্র্যকে উপেক্ষা না করে এর প্রতিকার ও বিমোচনের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা প্রদান করেছে। মুমিন বিশ্বাস করবে যে, রিযিকের প্রকৃত মালিক ও একমাত্র দাতা মহান আল্লাহ; তাই দারিদ্র্যে আক্রান্ত হলে সে হতাশ বা আল্লাহর ফয়সালার প্রতি অসন্তুষ্ট না হয়ে ধৈর্য ধারণ করবে, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করবে এবং হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাবে। একইসঙ্গে সমাজের সামর্থ্যবানদের দায়িত্ব হলো যাকাত আদায়, দান-সদকা, ওয়াকফ এবং এতিম, বিধবা, মিসকীন ও অসহায়দের সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের কষ্ট লাঘব করা। পাশাপাশি সুদ, জুয়া, প্রতারণা ও যাবতীয় হারাম উপার্জনের পথ বন্ধ করতে হবে। সুতরাং, ইসলামে দারিদ্র্য বিমোচন কেবল দরিদ্রের হাতে কিছু অর্থ তুলে দেওয়ার নাম নয়; বরং বিশুদ্ধ আকীদা, তাওয়াক্কুল, হালাল উপার্জন, যাকাতের যথাযথ বাস্তবায়ন, দান-সদকার প্রসার, অসহায়দের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং হারাম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বর্জনের সমন্বিত ব্যবস্থার নাম। এভাবেই ব্যক্তি ও সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য, পারস্পরিক সহমর্মিতা ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হালাল ও বরকতময় রিযিক দান করুন, দারিদ্র্যের পরীক্ষায় ধৈর্য ও ঈমান অটুট রাখার তাওফীক দিন এবং অসহায় ও দরিদ্র মানুষের হক যথাযথভাবে আদায় করে তাদের পাশে দাঁড়ানোর তাওফীক দান করুন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: