প্রশ্ন: প্রচলিত মিলাদুন্নবী উদযাপনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছি বলে মিলাদ পন্থীরা আমাকে তিরস্কার করে এবং বলে আমার ইসলাম নতুন ইসলাম। এ বিষয়ে কোন উপদেশ আছে কী?
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর প্রিয় পাঠক! দ্বীনের সঠিক ও বিশুদ্ধ মানহাজ বা পথ আঁকড়ে থাকার কারণে বিরোধীদের পক্ষ থেকে তিরস্কার বা মানসিক আঘাত পাওয়া নতুন কিছু নয়; বরং এটি নবীদের উত্তরাধিকার ও হক পন্থীদের চিরন্তন পথ। এ বিষয়ে কিছু অমূল্য উপদেশ ও সান্ত্বনার বাণী আপনার জন্য পেশ করছি:
প্রথমত: প্রিয় ভাই!আপনি এ বিদআতটি পরিহার করে উত্তম কাজটি করেছেন যে বিদআতটি অভ্যাসের মত মানুষের মাঝে বিস্তার লাভ করেছে। যারা আপনাকে নবীর অনুসরণের ঘাটতি উল্লেখ করে অপবাদ দিল অথবা ইসলামী আদর্শের উপর আপনার অবিচলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল আপনার সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করার দরকার নেই। এমন কোন রাসূল নেই যাঁর সাথে লোকেরা তিরস্কার করেনি বা তাঁর বিবেক-বুদ্ধি ও দ্বীনদারির উপর অপবাদ দেয়নি। আল্লাহ তাআলা বলেন: “এমনিভাবে, তাদের পূর্ববর্তীদের কাছে যখনই কোন রাসূল আগমন করেছে, তারা বলেছে যাদুকর কিংবা উন্মাদ।”[সূরা যারিয়াত, আয়াত: ৫২] নবীদের জীবনে আপনার জন্য উত্তম আদর্শ। সুতরাং আপনি যে কষ্ট পাচ্ছেন এতে ধৈর্য ধারণ করুন এবং আল্লাহর কাছে সওয়াবের প্রত্যাশা করুন।
দ্বিতীয়ত: আপনার জন্য নসিহত হচ্ছে- হক কথা বলার কারনে যারা আপনাকে তিরস্কার করে,আপনি তাদের সাথে কোন আলোচনা-পর্যালোচনা, তর্ক-বিতর্ক এড়িয়ে চলবেন। যদি এদের মধ্যে জাগ্রত বিবেকের কেউ থাকে যে কথা শুনে ও বুঝতে চেষ্টা করে তাহলে তার সাথে আলোচনা করতে পারেন। বাছাই করে এ ধরণের ব্যক্তিদেরকে আপনি মিলাদের স্বরূপ, এর হুকুম, এটি সঠিক না হওয়ার দলিল জানাতে পারেন। তাদের কাছে আপনি নবীকে অনুসরণ করার মর্যাদা ও বিদআত প্রচলন করার খারাপ দিকটি তুলে ধরতে পারেন। যদি আপনি এমন কাউকে দেখেন তাহলে তাদের সাথে নিম্নোক্ত পন্থায় সংলাপ করতে পারেন এবং তাদেরকে নসিহত করতে পারেন।
.
(১). তারা যেখানে শেষ করেছে আমরা সেখান থেকে শুরু করব। তারা আপনাকে বলেছে: আপনার ইসলাম নতুন ইসলাম। আমরা বলব: কোনটা আগে শুরু হয়েছে- মিলাদ করা; নাকি মিলাদ না করা? নিঃসন্দেহে বিবেকবান ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি স্বীকার করবেন যে, মীলাদ পালন না করাই আগে ছিল; কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনের যুগে মীলাদ উদযাপনের কোনো প্রচলন ছিল না। পরবর্তী সময়ে উবাইদীয়দের যুগে এর প্রচলন শুরু হয়। তাহলে ভেবে দেখুন—যে আমল নবী ﷺ ও তাঁর সর্বোত্তম প্রজন্মের যুগে ছিল না, বরং বহু পরে প্রচলিত হয়েছে, সেটি গ্রহণ করার পরও কাকে “নতুন ইসলাম”-এর অনুসারী বলা হবে? অতএব, দ্বীনের ক্ষেত্রে মাপকাঠি কোনো আমল কতদিন ধরে প্রচলিত—তা নয়; বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম যে পথে ছিলেন, সেই পথের সঙ্গে আমলটি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—সেটিই মূল বিষয়।
.
(২). আমরা যদি প্রশ্ন করি—নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন ও সম্মান করতেন—সাহাবায়ে কেরাম, নাকি তাঁদের পরবর্তী যুগের মানুষ? নিঃসন্দেহে প্রত্যেক বিবেকবান মানুষের উত্তর হবে, সাহাবায়ে কেরামই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সর্বাধিক ভালোবাসতেন, সম্মান করতেন এবং তাঁর সুন্নাহর অনুসরণে সর্বাধিক অগ্রগামী ছিলেন। তাহলে প্রশ্ন হলো—তাঁরা কি কখনো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম উপলক্ষে ‘মিলাদ’ উদযাপন করেছেন? যদি তাঁরা তা না করে থাকেন, তাহলে পরবর্তী যুগের মানুষদের জন্য এমন কোনো আমলকে নবীপ্রেমের নিদর্শন হিসেবে গ্রহণ করা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত? বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে যারা সাহাবায়ে কেরামের চেয়ে নিজেদের অধিক উৎসাহী মনে করে, তাদের নিজেদেরই ভেবে দেখা উচিত—তারা কি সত্যিই নবীপ্রেমে সাহাবায়ে কেরামের চেয়ে অগ্রসর হতে পারে?
.
৩). আমরা যদি প্রশ্ন করি—নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ কী?—তাহলে প্রত্যেক বিবেকবান ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির কাছেই এর উত্তর স্পষ্ট: তা হলো, তাঁর আদর্শ অনুসরণ করা, তাঁর সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা এবং তিনি যেভাবে জীবনযাপন করেছেন, সেভাবেই তাঁর প্রদর্শিত পথে চলা। যদি প্রচলিত মিলাদ পালনকারীরা সত্যিই তাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসত এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণ করত, তাহলে তাঁর প্রতি সর্বাধিক ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনকারী সাহাবায়ে কেরাম এবং পরবর্তী নেককার পূর্বসূরিগণ যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, সেটিই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো। তখন তারা উপলব্ধি করতে পারত যে, কল্যাণ নিহিত রয়েছে পূর্ববর্তীদের অনুসরণে; আর অকল্যাণ নিহিত রয়েছে পরবর্তীদের নবপ্রবর্তিত রীতিনীতিতে।
.
কাযী ইয়ায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসার আলামত শীর্ষক অধ্যায়ে বলেন: “যে ব্যক্তি কাউকে ভালবাসে সে তাকে অগ্রাধিকার দেয়। তার সাথে সাদৃশ্য অর্জনকে প্রাধান্য দেয়। তা না হলে সে ভালবাসা সত্য নয়; বরং নিছক দাবিমাত্র। যে ব্যক্তি সত্যিই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালবাসে এর আলামত তার মধ্যে দেখা যেতে হবে। প্রথম আলামত হচ্ছে: সুসময়ে, দুঃসময়ে, কর্মোদ্দীপনা ও অলসতা সর্বাবস্থায় তাঁর অনুকরণ, তাঁর আদর্শের অনুসরণ, তাঁর কথা-কাজ-নির্দেশের অনুগমন, তাঁর নিষেধগুলো পরিহার, তাঁর শিষ্টাচারগুলো গ্রহণ। এর প্রমাণ রয়েছে আল্লাহর বাণীতে “বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর; এতে করে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপরাশি মার্জনা করে দিবেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী, দয়ালু।[সূরা আলে-ইমরান: ৩১]
তাঁর শরিয়তকে অগ্রাধিকার দেয়া, আত্মপ্রবৃত্তি ও নিজ-মতের পরিবর্তে তাঁর শরিয়তের অনুসরণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন: “যারা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে মদীনায় বসবাস করেছিল এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তারা মুহাজিরদের ভালবাসে, মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে, তজ্জন্যে তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদেরকে অগ্রাধিকার দান করে।” [সূরা হাশর: ৯] আল্লাহর রেজামন্দি হাছিলের জন্য বান্দাকে নারাজ করা: যে ব্যক্তি এসব গুণে গুণান্বিত সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে পূর্ণ ভালবাসে। যে ব্যক্তি এসব ক্ষেত্রে কিঞ্চিত ঘাটতি করে তার ভালবাসাতে ঘাটতি আছে; তবে সেও তাঁদেরকে ভালবাসে।”(আস-শিফা বি তারিফি হুকুকিল মুস্তাফা (২/২৪-২৫)
.
(৪). আমরা যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মতারিখ বা ‘মিলাদ’ নিয়ে পর্যালোচনা করি, তাহলে প্রথমেই প্রশ্ন আসে—এ-সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো কি নির্ভরযোগ্য ও প্রমাণিত? অপরদিকে, তাঁর ইন্তেকালের তারিখ নিয়েও যদি একইভাবে যাচাই-বাছাই করি, তাহলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিঃসন্দেহে একজন বিবেকবান ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি স্বীকার করবেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দিষ্ট জন্মতারিখ সহীহ ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত হয়নি; পক্ষান্তরে তাঁর ইন্তেকালের তারিখ সুস্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্যভাবে সাব্যস্ত হয়েছে। আল্লাহ তাঁর প্রতি সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন। সীরাতের গ্রন্থগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মতারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সীরাতকারদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন ২ রবিউল আউয়াল, কেউ ৮ রবিউল আউয়াল, কেউ ১০ রবিউল আউয়াল, আবার কেউ ১২ রবিউল আউয়াল। এমনকি যুবাইর ইবনু বাক্কার (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, তিনি রমযান মাসে জন্মগ্রহণ করেছেন। অতএব, যখন তাঁর জন্মতারিখ নিয়েই এতগুলো ভিন্ন মত পাওয়া যায় এবং কোনো একটি তারিখ নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত নয়, তখন ১২ রবিউল আউয়ালকেই তাঁর নিশ্চিত জন্মতারিখ হিসেবে দাবি করা ঐতিহাসিক ও প্রামাণ্য বিচারে সঙ্গত নয়।
.
যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মতারিখ জানার উপর দ্বীনের কোন কিছু নির্ভর করত তাহলে সাহাবায়ে কেরাম অবশ্যই তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেন অথবা তিনি নিজেই তাদেরকে এ ব্যাপারে অবহিত করতেন। অথচ এর কোনটি ঘটেনি।পক্ষান্তরে,নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয় সাল্লামের মৃত্যু তারিখের ব্যাপারে সামান্য মতভেদ থাকলেও সঠিক মত হচ্ছে। তাঁর মৃত্যু তারিখ হিজরী ১১ সালের ১২ই রবিউল আউয়াল। এরপর আমরা যদি দেখি এ বিদআতপন্থী লোকগুলো কখন মিলাদুন্নবী (নবীর জন্মবার্ষিকী) পালন করে? তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীর দিন। উবাইদি সম্প্রদায় (যারা বংশ পরিচয়ে জালিয়াতি করে নিজেদেরকে ফাতেমা রাঃ এর সাথে সম্পৃক্ত করে ফাতেমী দাবী করে) এভাবে এ কর্মের প্রচলন করে গেছেন এবং লোকেরা নির্বোধের মত এটাকে গ্রহণ করে নিয়েছে। অথচ তারা ছিল জিন্দিক, নাস্তিক বা ধর্মত্যাগী সম্প্রদায়। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুতে ফুর্তি করার জন্য এমন একটি উপলক্ষের উদ্ভব করেছে। এর জন্য তারা জমায়েত হত এবং খুশি প্রকাশ করত। আর নির্বোধ মুসলমানদেরকে এভাবে ধোকা দিত যে, তাদের অনুকরণে এ অনুষ্ঠান করার মানে- নবীর প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করা। এভাবে তারা তাদের নিকৃষ্ট ও মন্দ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ও ভালবাসার অর্থকে বিকৃত করণে সফল হল। তাদের কাছে নবীর ভালবাসা হচ্ছে- মিলাদের কাসিদা পড়া, সিরনি ও মিষ্টি বিতরণ, নাচের আয়োজন, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, ঢোল বাজানো, বেপর্দাপনা, পাপাচার, বিভিন্ন বিদআতী দুআ ও শিরকী কথাবার্তা, যেগুলো মিলাদের মজলিসে বলা হয়ে থাকে।
.
পরিশেষে প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুকরণের উপর ধৈর্য ধারণ করুন। তাঁর বিরুদ্ধাচারণকারীদের সংখ্যাধিক্য দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। আমরা আপনাকে ইলমে দ্বীন অর্জন ও মানুষের উপকার করার পরামর্শ দিচ্ছি। এ ধরণের ইস্যু যেন পরিবারের সদস্যদের থেকে আপনাকে বিচ্ছিন্ন করে না রাখে। কারণ তারা এমন লোকদের তাকলিদ করছেন যারা মিলাদের জলসাগুলো জায়েয হওয়ার, এমনকি মুস্তাহাব হওয়ার পক্ষে ফতোয়া দেয়। তাই এ বিদআতের বিরোধিতা করার সময় তাদের সাথে কোমল হওয়া উচিত। কথা, কাজ ও আখলাকের সৌন্দর্যতা ফুটিয়ে তুলতে সচেষ্ট থাকা উচিত। নবীর অনুসরণের প্রভাব আপনি আপনার আচার-আচরণ, ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে তাদের কাছে ফুটিয়ে তুলুন। আমরা আপনার জন্য আল্লাহর কাছে তাওফিকের দুআ করছি।(গৃহীত পরিমার্জিত, ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১২৫৬৯০) আল্লাহই ভাল জানেন।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।