টেলিভিশনে কিংবা সরাসরি ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখা কি জায়েজ

প্রশ্ন: টেলিভিশনে কিংবা সরাসরি ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখা কি জায়েজ? একটি গবেষণা ভিত্তিক পর্যালোচনা।
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। অগণিত দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর যেসব ক্রিকেট বা ফুটবল ম্যাচ সেটা বিশ্বকাপ হোক কিংবা পাড়ার মহল্লায় আয়োজিত কোনো ম্যাচ যেখানে শরীয়তবিরোধী আর্থিক লেনদেন, অবৈধ পুরস্কারব্যবস্থা কিংবা অন্যান্য হারাম উপাদানের ভিত্তিতে পরিচালিত ও আয়োজন করা হয়। তাতে অংশগ্রহণ করা, সরাসরি মাঠে গিয়ে দেখা কিংবা টেলিভিশনে উপভোগ করা কোনোটিই জায়েজ নয়; কারণ এমন আয়োজন দেখা মানেই হলো পরোক্ষভাবে সেই নিষিদ্ধ কাজকে সমর্থন, প্রচার ও উৎসাহিত করা। ইসলামের স্পষ্ট নীতি অনুযায়ী যেকোনো পাপকাজে সহযোগিতা বা সহমত পোষণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, যা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মহান আল্লাহ তাআলা সূরা আল-মায়েদাহর ২ নম্বর আয়াতে বলেন,وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ“তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়ার বিষয়ে পরস্পরকে সহযোগিতা করো; কিন্তু পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সাহায্য করো না। আর আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।”[সূরা আল-মায়েদাহ: ২] সুতরাং,একজন সচেতন মুসলিমের দায়িত্ব হলো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দ্বীনের বিধানকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসব শরীয়তবিরোধী বিষয় থেকে নিজেকে দূরে রাখা, বিশেষ করে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ফুটবল ম্যাচগুলোর সঙ্গে এমন কিছু নিষিদ্ধ ও সতর্কতামূলক বিষয় জড়িত থাকে, যেগুলো একজন সচেতন মুসলিমের বিবেচনায় রাখা জরুরি:
(১).বর্তমান যুগে ফুটবলসহ অন্যান্য ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কেবল মাঠের সাধারণ বিনোদনেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং স্পন্সরশিপ, কর্পোরেট পুঁজি এবং বিভিন্ন বেটিং অ্যাপের সমন্বয়ে তা আজ বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল জুয়া ও অনৈতিক বাণিজ্যের শিল্পে রূপান্তরিত হয়েছে। ক্রীড়াজগতের এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও বৈশ্বিক আবেদনকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা বাজির সংস্কৃতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিশ্বব্যাপী জুয়ার বাজারকে আরও বিস্তৃত, সক্রিয় এবং শক্তিশালী করে তুলছে।
.
(২).বর্তমান সময়ের অধিকাংশ ম্যাচ সম্প্রচারে এমন বহু বিষয় দেখা যায়, যা ইসলামী শালীনতা ও শরীয়তের নির্দেশনার পরিপন্থী। যেমন—খেলোয়াড়দের সতর (নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ) উন্মুক্ত থাকা, গ্যালারিতে নারী-পুরুষের অবাধ ও বেপর্দা মেলামেশা প্রদর্শন, খেলা চলাকালীন বা বিরতির সময় বাদ্যযন্ত্র, কুরুচিপূর্ণ সঙ্গীত এবং বিভিন্ন শরীয়তবিরোধী পণ্যের বিজ্ঞাপনের ব্যাপক প্রচার। এসব বিষয় ইসলামের নৈতিকতা, লজ্জাশীলতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের অন্তর্ভুক্ত।
.
(৩).বিশ্বকাপ ফুটবল দেখা নাজায়েজ হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, এটি অনেক মানুষের অন্তরে খেলোয়াড়দের প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা, অন্ধ ভক্তি ও গভীর আসক্তির জন্ম দেয়। একপর্যায়ে এসব খেলোয়াড়ই তাদের কাছে আদর্শ ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়। অথচ একজন মুসলমানের সর্বোচ্চ আদর্শ ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হলেন মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বহু মানুষ অমুসলিম কিংবা ইসলামি আদর্শ থেকে বিচ্যুত খেলোয়াড়দের পোশাক-পরিচ্ছদ, চুলের ধরন, অঙ্গভঙ্গি, উদযাপনের পদ্ধতি এবং জীবনযাত্রাকে গর্বের সঙ্গে অনুসরণ করতে শুরু করে। এর ফলে তাদের অন্তরে ধীরে ধীরে ইসলামি মূল্যবোধের পরিবর্তে খেলোয়াড় ও তারকাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং মুসলিম পরিচয়ের স্বাতন্ত্র্য ক্ষুণ্ন হয়। তদুপরি, তারকাখ্যাত খেলোয়াড়দের প্রতি অতিরঞ্জিত ভালোবাসা ও আবেগ অনেক সময় এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, তা ব্যক্তিপূজাসদৃশ মানসিকতার রূপ ধারণ করে এবং ‘আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা’ (মিত্রতা ও বৈরিতার আকিদা)-এর ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ ধরনের আকিদাগত বিচ্যুতি, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষতির আশঙ্কার কারণেই অনেক আলেম বর্তমান বিশ্বকাপ খেলা না-জায়েজ বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
.
(৪).এর পাশাপাশি, দ্বীনি কিংবা প্রকৃত দুনিয়াবী কল্যাণহীন দেড়-দুই ঘণ্টাব্যাপী দীর্ঘ এসব ম্যাচ মানুষের মূল্যবান সময় অপচয় করার পাশাপাশি বিশেষত তরুণ সমাজের মধ্যে এক ধরনের মারাত্মক আসক্তির জন্ম দিচ্ছে। এই আসক্তির প্রভাবে অনেকেই জামায়াতে সালাত আদায়ে অবহেলা করছে, রাত জাগার কারণে ফজরের সালাত ছুটে যাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক ও ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ থেকেও দূরে সরে যাচ্ছে।
.
সুতরাং বাস্তবতা যখন এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, তখন একজন মুসলিমের জন্য এসব অনর্থক ও ক্ষতিকর কাজে সময় ও মনোযোগ ব্যয় করা শোভনীয় নয়। বরং ক্ষণিকের বিনোদন ও প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণ বয়ে আনে—এমন হালাল ও উপকারী কাজে আত্মনিয়োগ করাই একজন প্রজ্ঞাবান মুমিনের পথ। এ বিষয়ে আমাদের সম্মানিত আলেমদের ফাতওয়াগুলো লক্ষ্য করুন।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে প্রশ্ন করা হয়েছিল:বিশ্বকাপসহ বিভিন্ন খেলার প্রতিযোগিতা দেখার হুকুম কী? জবাবে তারা বলেছেন:
مباريات كرة القدم التي على مال أو نحوه من جوائز حرام ؛ لكون ذلك قمارا ؛ لأنه لا يجوز أخذ السَّبَق وهو العوض إلا فيما أذن فيه الشرع ، وهو المسابقة على الخيل والإبل والرماية ، وعلى هذا فحضور المباريات حرام ، ومشاهدتها كذلك ، لمن علم أنها على عوض ؛ لأن في حضوره لها إقرارا لها .أما إذا كانت المباراة على غير عوض ، ولم تشغل عما أوجب الله من الصلاة وغيرها ، ولم تشتمل على محظور : ككشف العورات ، أو اختلاط النساء بالرجال ، أو وجود آلات لهو – فلا حرج فيها ولا في مشاهدتها”
“যেসব ফুটবল ম্যাচ অর্থ বা অনুরূপ কোনো পুরস্কারের বিনিময়ে অনুষ্ঠিত হয়, তা হারাম; কারণ তা জুয়ার অন্তর্ভুক্ত। শরিয়ত যে প্রতিযোগিতাগুলোতে সাবাক্ব’ (السَّبَق) (প্রতিযোগিতার পুরস্কার বা বিনিময়) গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে, তা হলো ঘোড়দৌড়, উটদৌড়, তীরন্দাজির প্রতিযোগিতা। অতএব এ ধরনের ম্যাচে উপস্থিত হওয়া হারাম। অনুরূপভাবে, যে ব্যক্তি জানে যে এগুলো পুরস্কার বা বিনিময়ের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তার জন্য সেগুলো দেখা-ও হারাম। কারণ তার উপস্থিতি এর প্রতি সমর্থন ও অনুমোদন প্রকাশ করার শামিল।তবে যদি প্রতিযোগিতাটি কোনো পুরস্কার বা বিনিময় ছাড়া অনুষ্ঠিত হয়, এবং তা আল্লাহ কর্তৃক ওয়াজিবকৃত বিষয়—যেমন সালাত বা অন্যান্য দায়িত্ব থেকে বিরত না রাখে, এবং তার সাথে কোনো নিষিদ্ধ বিষয়ও যুক্ত না হয়; যেমন আওরাহ (লজ্জাস্থান) উন্মুক্ত হওয়া, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, অথবা বাদ্যযন্ত্র ও আমোদ-প্রমোদের উপকরণের উপস্থিতি—তাহলে এ ধরনের প্রতিযোগিতায় কোনো অসুবিধা নেই এবং তা দেখাতেও কোনো অসুবিধা নেই।”—[“ফতোয়াটিতে স্বাক্ষর করেছেন সৌদি আরবের গবেষণা ও ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির বিশিষ্ট আলেমবৃন্দ—সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি, ইমাম আব্দুল আযীয ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ), পরবর্তী গ্র্যান্ড মুফতি, শাইখ আব্দুল আযীয আলে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বর্তমান গ্র্যান্ড মুফতি, শাইখ সালিহ বিন ফাওযান আল ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) এবং শাইখ বকর আবু যায়েদ (রাহিমাহুল্লাহ)।[ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ১৫; পৃষ্ঠা: ২৩৮; ফতোয়া নং-২০২৪৯]
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ) এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, শাইখ আবদুল্লাহ ইবনে জিবরীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪৩০ হি./২০০৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “একজন নারীর জন্য বিনোদন বা কোনো দলের সমর্থনের উদ্দেশ্যে খেলার ম্যাচ দেখা কি বৈধ?”
শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) উত্তরে বলেন:
“لا يجوز مشاهدة المباريات ، حيث إن اللاعبين رجال متجردون غالبًا عن اللباس الساتر ، وقد يبدو بعض الفخذ ، وقد تتمثل العورة وراء اللباس ، وذلك فتنة للنساء ، ولو كان القصد التسلية ففي الإمكان التسلي بالذكر والقرآن وكتب الحديث والفقه والأحكام”
“ম্যাচ দেখা জায়েজ নয়। কারণ খেলোয়াড়রা সাধারণত এমন পোশাক পরিধান করে থাকে যা শরীর পুরোপুরি আবৃত করে না। অনেক সময় উরুর কিছু অংশ প্রকাশিত হয়ে যায়। আবার কখনো পোশাক পরিহিত থাকা সত্ত্বেও শরীরের গঠন ও অবয়ব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এসব বিষয় নারীদের জন্য ফিতনা ও প্রলোভনের কারণ হতে পারে। আর যদি উদ্দেশ্য কেবল বিনোদন হয়ে থাকে, তাহলে যিকির, কুরআন তেলাওয়াত, হাদিস, ফিকহ ও শরিয়তের বিধিবিধান সম্পর্কিত গ্রন্থ অধ্যয়নের মাধ্যমে বৈধভাবে বিনোদন ও সময় কাটানো সম্ভব।”—(শাইখ ইবনু জিবরীনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফতোয়া; গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১৪৬৮৪৪)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটবল খেলা দেখার বিধান কী? তিনি রাহিমাহুল্লাহ উত্তরে বলেন:
الذي أرى أن مشاهدة الألعاب التي تعرض في التلفاز أو في غيره من المشاهدات ، أنها مضيعة للوقت ، وأن الإنسان العاقل الحازم لا يضيع وقته بمثل هذه الأمور التي لا تعود عليه بفائدة إطلاقا .هذا إن سلمت من شر آخر ، فإن اقترن بها شر آخر بحيث يقوم في قلب المتفرج تعظيم اللاعب الكافر مثلا ، فإن هذا حرام بلا شك ، لأنه لا يجوز لنا أن نعظم الكفار أبدا مهما حصل لهم من التقدم فإنه لا يجوز لنا أن نعظمهم ، أو كانت هذه المباراة قد ظهرت فيها أفخاذ شباب يحصل بها فتنة ، فإن الراجح عندي أنه لا يجوز للشباب حين لعبهم بالكرة أن يخرجوا أفخاذهم ؛ لما في ذلك من الفتنة ، حتى على القول بأن الفخذ ليس بعورة ، فلا أرى أن الشاب يخرج فخذه أبدا ، أما إذا قلنا بأن الفخذ عورة كما هو المشهور من مذهب الإمام أحمد ، فالأمر في هذا واضح : أنه لا يجوز على كل حال .فالذي أنصح به إخواننا أن يحرصوا على أوقاتهم فإن الأوقات أغلى من الأموال
“আমার মতে,টেলিভিশন বা অন্য কোনো মাধ্যমে খেলাধুলা দেখা সময়ের অপচয়। একজন বুদ্ধিমান ও দৃঢ়চেতা মানুষের উচিত নয় এমন কাজে সময় ব্যয় করা, যা তার কোনো উপকারে আসে না। এটাও তখন, যখন এর সঙ্গে অন্য কোনো অনিষ্ট যুক্ত না থাকে। কিন্তু যদি এর সঙ্গে অন্য কোনো অনিষ্ট যুক্ত হয় যেমন দর্শকের মনে কোনো কাফির খেলোয়াড়ের প্রতি অতিরিক্ত শ্রদ্ধা ও মহত্ত্ববোধ জন্মায় তাহলে তা নিঃসন্দেহে হারাম। কারণ আমরা কোনো অবস্থাতেই কাফিরদের মহিমান্বিত করতে পারি না।এছাড়া যদি খেলায় তরুণদের উরু প্রকাশ পায় এবং তা ফিতনার কারণ হয়, তাহলে আমার মতে তাদের জন্য উরু খোলা রাখা বৈধ নয়। এমনকি যারা বলেন উরু আওরাহ নয়, তাদের মত অনুযায়ীও আমি মনে করি না যে কোনো যুবকের উরু প্রকাশ করা উচিত।সুতরাং আমি আমার মুসলিম ভাইদের উপদেশ দিচ্ছি, তারা যেন নিজেদের সময়ের মূল্য দেয়। কারণ সময় সম্পদের চেয়েও অধিক মূল্যবান।”(http://www.awda-dawa.com/pages.php?ID=3047

গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১৪৬৮৪৪)

.
এছাড়াও শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: “ছোট প্যান্ট (হাফপ্যান্ট) পরে খেলাধুলা করার এবং যারা এমনটি করে তাদের খেলা দেখার বিধান কী? ​তিনি উত্তর দিয়েছিলেন:
” ممارسة الرياضة جائزة إذا لم تله عن شيء واجب ، فإن ألهت عن شيء واجب فإنها تكون حراماً ، وإن كانت ديدن الإنسان بحيث تكون غالب وقته فإنها مضيعة للوقت ، وأقل أحوالها في هذه الحال الكراهة . أما إذا كان الممارس للرياضة ليس عليه إلا سروال قصير يبدو منه فخذه أو أكثره فإنه لا يجوز ، فإن الصحيح أنه يجب على الشباب ستر أفخاذهم ، وأنه لا يجوز مشاهدة اللاعبين وهم بهذه الحالة من الكشف عن أفخاذهم ” ا
“খেলাধুলা করা জায়েয (বৈধ), যদি তা কোনো ওয়াজিব (আবশ্যিক) দায়িত্ব থেকে বিমুখ বা গাফেল না করে। আর যদি তা কোনো ওয়াজিব কাজ থেকে বিমুখ করে, তবে তা হারাম (নিষিদ্ধ)। আর যদি এটি মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়—যার ফলে তার সময়ের সিংহভাগ এতেই ব্যয় হয়—তবে তা সময়ের অপচয়; আর এই পরিস্থিতিতে এর সর্বনিম্ন বিধান হলো এটি ‘মাকরূহ’ (অপছন্দনীয়)।
পক্ষান্তরে, খেলাধুলাকারী ব্যক্তি যদি এমন ছোট প্যান্ট পরিহিত থাকে যার কারণে তার উরু বা উরুর অধিকাংশ অংশ প্রকাশ পেয়ে যায়, তবে তা জায়েয নয়। কারণ সঠিক মতানুযায়ী, যুবকদের জন্য তাদের উরু ঢেকে রাখা ওয়াজিব (আবশ্যিক)। আর খেলোয়াড়রা উরু উন্মুক্ত রাখা অবস্থায় তাদের খেলা দেখাও জায়েয নয়।”(সমাপ্ত—উদ্ধৃত: ‘ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ’, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৪৩১)
.
সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সা‘ঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদ সদস্য ও অধ্যাপক,আকিদা ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আল-বাররাক (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫২ হি./১৯৩৩ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল;প্রশ্ন: অমুসলিম বা কাফের দেশগুলোর ফুটবল ম্যাচ দেখার বিধান (হুকুম) কী?
জবাবে শাইখ হাফিজাহুল্লাহ বলেন:
نظّمة؛ كمباراة كأس العالم، أو كأس كذا، أو المبارايات التي تُقام بين البلدان والدول، كلّ هذه من الباطل، مشتمل على أنواع من الباطل، والله تعالى يقول في عباد الرحمن: وَٱلَّذِينَ لَا يَشهَدُونَ ٱلزُّورَ [الفرقان:72] هذا زور، نفْس اللعب، فاللعب اسمه “لعب”، اللعب للصبيان، هذا الأصل في لعب الكرة أنّها مِن أعمال الصبيان، ولكن تطوّرت حتى صارت علمًا وصارت عملًا معظّمًا !يكفي العاقل ما يجري من الغوغاء واللغو والصّياح والصّفير والتّصفيق والأعمال الجنونيّة عند الهزيمة أو النّصر، أيُّ نصر وأي هزيمة ! ولاسيما بالنسبة لعمل المسلمين مهزلة، كيف يمارسون هذه الأعمال ويفرحون بالنّصر في اللعب وتنكسر نفوسهم! أضف إلى هذا ما يُنفق عليها من الأموال الهائلة، هؤلاء اللاعبون من الكفار أو من المسلمين يتقاضون الأموال الطائلة، هذا عمل مناقض لموجب العقل والشرع، كيف تشاهدها أنت يا إنسان، يا رجل عاقل، ألّا تشمئز نفسكّ من مشاهدة هذا اللغو، سبحان الله، عجب!
“আমার মতে এটি জায়েয নয়। এই পরিচিত ও সংগঠিত খেলাগুলো দেখা জায়েয নয় যেমন বিশ্বকাপের খেলা, অমুক কাপের খেলা, কিংবা দেশ ও রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অনুষ্ঠিত ম্যাচসমূহ। এগুলো সবই বাতিল কাজের অন্তর্ভুক্ত এবং বিভিন্ন ধরনের অসত্য ও অনর্থে পরিপূর্ণ।আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের গুণ বর্ণনা করে বলেছেন:”আর তারা মিথ্যা ও অসার কাজে উপস্থিত থাকে না।”(সূরা ফুরকান ৭২) এটাও (খেলাধুলাও) এক ধরনের অসত্য ও অনর্থক। কারণ এটি মূলত খেলা, আর খেলা তো শিশুদের কাজ। বল খেলা মূলত শিশুদের কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একে এক ধরনের বিদ্যা ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, একজন বিবেকবান মানুষের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে এসব খেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের হইচই, অর্থহীন কথাবার্তা, চিৎকার-চেঁচামেচি, বাঁশি বাজানো, হাততালি দেওয়া এবং জয়-পরাজয়ের সময় উন্মত্ত আচরণগুলো দেখে। এটা কেমন বিজয়? আর কেমন পরাজয়? বিশেষ করে মুসলমানদের অবস্থা তো এক ধরনের প্রহসন। তারা এসব কাজে মেতে ওঠে, খেলায় জিতলে আনন্দে আত্মহারা হয়, আর হারলে তাদের মনোবল ভেঙে পড়ে, এর সঙ্গে আরও যোগ করুন যে, এসবের পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়। এসব খেলোয়াড় তারা কাফির হোক বা মুসলিম অত্যন্ত বিপুল অর্থ গ্রহণ করে। এটি এমন একটি কাজ, যা সুস্থ বিবেক ও শরীয়তের দাবির পরিপন্থী। হে মানুষ হে বিবেকবান ব্যক্তি তুমি কীভাবে এসব খেলা দেখো? এসব অর্থহীন কর্মকাণ্ড দেখতে কি তোমার অন্তর বিরক্ত হয় না? সুবহানাল্লাহ সত্যিই বিস্ময়কর।”(https://shalbarrak.com/fatwas/3051)

(https://sh-albarrak.com/fatwas/13810)

.
সৌদি আরবের বর্তমান গ্র্যান্ড মুফতি,যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.] ইমাম সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: টিভিতে ফুটবল খেলা দেখার বিধান কী? উত্তরে শাইখ হাফিজাহুল্লাহ বলেন: «
يعني عندك فراغ! ما لك شغل إلا متابعة القدم ومدري وايش! المسلم وقته ثمين ما ينبغي أن يضيعه في المباريات والمسلسلات والأشياء الهابطة التي لا تفيده في دينه ولا في دنياه. يحفظ وقته فيما ينفعه وما يفيده. كونك تنام أحسن من كونك تشاهد المبارايات. تنام، ترتاح، تقوم تصلي آخر الليل، أحسن لك من أنك تشاهد شيىء ما فيه فائدة، ويؤخر عليك النوم، ويكسلك عن صلاة الفجر، نعم»
“এর মানে হচ্ছে আপনার হাতে (অতিরিক্ত) অবসর সময় আছে! ফুটবল খেলা বা এই জাতীয় জিনিসপত্র নিয়ে পড়ে থাকা ছাড়া যেন আপনার আর কোনো কাজই নেই! একজন মুসলমানের সময় অত্যন্ত মূল্যবান। ফুটবল খেলা, নাটক-সিরিয়াল বা এই ধরনের অহেতুক বিষয়ে সময় নষ্ট করা তার মোটেও সমচীন নয়, যা তার দ্বীন (ধর্ম) কিংবা দুনিয়া—কোনোটারই উপকারে আসে না।বরং তার উচিত নিজের সময়কে এমন কাজে নিয়োজিত রাখা যা তার জন্য কল্যাণকর এবং উপকারী।আপনার জন্য খেলা দেখার চেয়ে ঘুমিয়ে থাকাটাও অনেক ভালো। আপনি ঘুমাবেন, বিশ্রাম নেবেন, তারপর রাতের শেষভাগে (তাহাজ্জুদ) সালাত আদায়ের জন্য উঠবেন—এটি আপনার জন্য এমন কিছু দেখার চেয়ে অনেক উত্তম যাতে কোনো কল্যাণ নেই, যা আপনার ঘুমাতে দেরি করিয়ে দেয় এবং ফজরের সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে আপনাকে অলস করে তোলে।”(শাইখের অডিও ফতোয়া থেকে অনূদিত)
.
অপর এক ফাতওয়ায় শাইখ (হাফিযাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:প্রশ্ন: আল্লাহ আপনার প্রতি অনুগ্রহ করুন, হে সম্মানিত শাইখ! এক প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—যেসব মানুষ কাফির রাষ্ট্রগুলোর বিভিন্ন ক্রীড়া দলকে সমর্থন করে, তাদের ব্যাপারে আপনার দিকনির্দেশনা কী? পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, তারা ঐ দলগুলোর পরাজয়ে গভীরভাবে মর্মাহত হয় এবং বিজয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হয়। শুধু তাই নয়, তাদের কেউ কেউ ঐসব কাফির দলের প্রতি পক্ষপাতিত্বের কারণে নিজেদের মুসলিম ভাইদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করে ফেলে, এমনকি শত্রুতায়ও জড়িয়ে পড়ে।আর যখন তাদেরকে নসীহত করা হয়, তখন তারা বলে, “আমরা তো কেবল খেলাকে এবং খেলোয়াড়দেরই সমর্থন করি।”এমন লোকদের ব্যাপারে আপনার পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা কী?
.
উত্তরে শাইখ হাফিজাহুল্লাহ বলেন;
«واللعب واللاعبين ايش الفائدة منه؟ هذا كله من العبث! أنك تشجع العبث وتشجع الهزل.ما يليق بالمؤمن أنه يشجع الهزل والعبث من المسلم فكيف بالكافر. هذا ترهات لا تجوز. نعم».
​”খেলাধুলা এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে কী ফায়দা (উপকার) আছে? এর পুরোটাই তো অনর্থক কাজের অন্তর্ভুক্ত!(খেলোয়াড়দের সমর্থন করা মানে) আপনি অনর্থক কাজকে সমর্থন করছেন এবং তামাশাকে উৎসাহিত করছেন। মুমিনের জন্য সংগত নয় যে সে কোনো মুসলমানের তামাশা ও অনর্থক কাজকে সমর্থন করবে, তাহলে কাফিরের ব্যাপারটা কেমন করে (বৈধ) হতে পারে? এগুলো অসার বিষয়, যা জায়েয নয়। হ্যাঁ।”(শাইখের অডিও ফতোয়া থেকে অনূদিত)
.
পরিশেষে বলা যায়, টেলিভিশনে বা সরাসরি মাঠে গিয়ে ফিফা বিশ্বকাপসহ যেকোনো ফুটবল ম্যাচ দেখা ইসলামের দৃষ্টিতে পরিহারযোগ্য। কারণ, আধুনিক যুগের এসব জমকালো ফুটবল আয়োজন কেবল সাধারণ বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর সাথে বিলিয়ন ডলারের জুয়া ও বাণিজ্যিক স্বার্থ, খেলোয়াড়দের সতর (নাভি থেকে হাঁটু) উন্মুক্ত থাকা, বাদ্যযন্ত্র ও বেপর্দা পরিবেশের মতো একাধিক শরীয়তবিরোধী উপাদান জড়িত। এছাড়া এটি মানুষের মূল্যবান সময় অপচয় করে এবং ফরজ সালাত ও দ্বীনি দায়িত্বের প্রতি উদাসীনতা ও আসক্তি তৈরি করে। সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ) এবং শাইখ ইবনে উসাইমীন ও শাইখ ইবনে জিবরীনের মতো শীর্ষস্থানীয় ফক্বীহ ও উলামাগণের ফতোয়া অনুযায়ী—যে খেলায় শরীয়ত নিষিদ্ধ বিষয় ও ফিতনার উপাদান বিদ্যমান থাকে, তা দেখা ও তাতে উপস্থিত হওয়া গুনাহের কাজ। সুতরাং, একজন সচেতন মুমিনের দায়িত্ব হলো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দ্বীনের বিধানকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসব অনর্থক ও ক্ষতিকর আসক্তি থেকে দূরে থাকা এবং ইহকাল ও পরকালের কল্যাণকর কাজে নিজের সময়কে নিয়োজিত করা। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়ল: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি সৌদি আরব।
Share: