কেন মানুষ বারবার কা’বার দিকে ছুটে যেতে চায়

ভূমিকা: পরম করুণাময়,অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য এবং অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর,কেন মানুষ বারবার কাবার দিকে ছুটে যেতে চায়? কেন একবার কাবা দেখে ফিরে আসার পরও হৃদয় আবার সেই পবিত্র ঘরের সান্নিধ্য কামনা করে? এর পেছনে রয়েছে এক মহান আল্লাহর দয়া এবং এক মহান নবীর হৃদয়ছোঁয়া দোয়া। নবী ইবরাহীম (আ.) যখন আল্লাহর ঘর নির্মাণ করছিলেন, তখন তিনি দোয়া করেছিলেন—মানুষের অন্তর যেন কাবার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সেখানে বারবার ফিরে আসে। আল্লাহ তাআলা তাঁর সেই দোয়া কবুল করেছেন। তাই কাবার প্রতি মুমিনের এই গভীর আকর্ষণ কেবল অনুভূতির বিষয় নয়; এটি ইবরাহীম (আ.)-এর কবুল হওয়া দোয়ারই এক অপূর্ব নিদর্শন।
.
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: ( وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِلنَّاسِ وَأَمْنًا وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ * وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ اجْعَلْ هَذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقْ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ مَنْ آمَنَ مِنْهُمْ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ قَالَ وَمَنْ كَفَرَ فَأُمَتِّعُهُ قَلِيلًا ثُمَّ أَضْطَرُّهُ إِلَى عَذَابِ النَّارِ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ ) “আর স্মরণ করুন, যখন আমরা কাবাঘরকে মানবজাতির মিলনকেন্দ্র ও নিরাপত্তাস্থল করেছিলাম এবং (আদেশ দিলাম যে,) তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ করো। আর ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ দিয়েছিলাম তাওয়াফকারী, ই’তিকাফকারী, রুকু’ ও সিজদাকারীদের জন্য আমার ঘরকে পবিত্র রাখতে।আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীম বলেছিলেন, হে আমার রব! এটাকে নিরাপদ শহর করুন এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনে তাদেরকে ফলমূল হতে জীবিকা প্রদান করুন। তিনি (আল্লাহ) বললেন, যে কুফরী করবে তাকেও কিছু কালের জন্য জীবনোপভোগ করতে দিব, তারপর তাকে আগুনের শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করব। আর তা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল!”(সূরা বাকারা আয়াত: ১২৫-১২৬)
.
উক্ত আয়াতের তাফসিরে হাফিয ইবনু কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
” ومضمون ما فسر به هؤلاء الأئمة هذه الآية : أن الله تعالى يذكر شرف البيت وما جعله موصوفًا به شرعًا وقدرًا من كونه مثابة للناس ، أي: جعله مَحَلا تشتاق إليه الأرواح وتحن إليه ، ولا تقضي منه وطرً ا، ولو ترددَت إليه كلَّ عام ، استجابة من الله تعالى لدعاء خليله إبراهيم ، عليه السلام، في قوله : ( فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِنَ النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ ) إلى أن قال: ( رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ ) إبراهيم / 37 -40 ، ويصفه تعالى بأنه جعله أمنًا ؛ من دخله أمن ، ولو كان قد فعل ما فعل ، ثم دخله : كان آمنًا.وقال عبد الرحمن بن زيد بن أسلم : كان الرجل يلقى قاتل أبيه وأخيه فيه فلا يَعْرض له ، كما وصفها في سورة المائدة بقوله تعالى : ( جَعَلَ اللَّهُ الْكَعْبَةَ الْبَيْتَ الْحَرَامَ قِيَامًا لِلنَّاسِ ) المائدة / 97 . أي: يُرْفَع عنهم بسبب تعظيمها السوءُ ، كما قال ابن عباس : لو لم يحج الناسُ هذا البيت لأطبق الله السماءَ على الأرض ” .
“এই আয়াতের ব্যাখ্যায় পূর্ববর্তী ইমামগণ যা বলেছেন, তার সারমর্ম হলো—মহান আল্লাহ এই ঘরের মর্যাদা এবং শরিয়ত ও তাকদির উভয় দিক থেকে এটিকে যে সকল বৈশিষ্ট্যে বিশেষায়িত করেছেন, তা উল্লেখ করেছেন। সেসব বৈশিষ্ট্যের একটি হলো—তিনি একে মানুষের জন্য ‘মাসাবাহ’ (مَثَابَةً) তথা প্রত্যাবর্তনস্থল বানিয়েছেন। অর্থাৎ, তিনি একে এমন একটি স্থান করেছেন, যার প্রতি অন্তরসমূহ আকৃষ্ট হয়, যার প্রতি হৃদয়সমূহ ব্যাকুল হয়ে ওঠে এবং মানুষ প্রতি বছর সেখানে বারবার আসা-যাওয়া করলেও তার আকাঙ্ক্ষা তৃপ্ত হয় না। এটি তাঁর খলীল ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর সেই দোয়ার প্রতি মহান আল্লাহর সাড়া,যেখানে তিনি বলেছিলেন: ‘অতএব, আপনি মানুষের কিছু অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে দিন।’ অতঃপর তাঁর দোয়ার শেষাংশে তিনি বলেছিলেন:”হে আমাদের রব!আপনি আমার দোয়া কবুল করুন।”[সূরা ইবরাহীম, ৩৭–৪০]।আর তিনি এটিকেও বর্ণনা করেছেন যে, তিনি এই ঘরকে নিরাপত্তার স্থান বানিয়েছেন; যে ব্যক্তি এতে প্রবেশ করে, সে নিরাপদ হয়ে যায়। এমনকি সে এর পূর্বে যত কিছুই করে থাকুক না কেন, এরপর যখন এতে প্রবেশ করে, তখন সে নিরাপদ থাকে।আবদুর রহমান ইবনু যায়দ ইবনু আসলাম বলেন: কোনো ব্যক্তি সেখানে তার পিতা অথবা ভাইয়ের হত্যাকারীর সাক্ষাৎ পেলেও তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিত না। যেমন আল্লাহ তাআলা সূরা আল-মায়িদায়ও এর বর্ণনা দিয়ে বলেছেন:(আল্লাহ কাবা ঘর তথা পবিত্র গৃহকে মানুষের জীবনযাত্রার মাধ্যম বানিয়েছেন) [সূরা আল-মায়িদাহ, ৯৭]। অর্থাৎ, এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কারণে মানুষের কাছ থেকে অনিষ্ট ও অকল্যাণ প্রতিহত করা হয়।যেমন ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেছেন: মানুষ যদি এই ঘরের হজ না করত, তবে আল্লাহ আকাশকে পৃথিবীর ওপর চাপিয়ে দিতেন।”(তাফসির ইবনু কাসীর, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪১৩)
.
আব্দুর রহমান আস-সা‘দী (রাহিমাহুল্লাহ) সূরা বাকারা ১২৫ নং আয়াতের তাফসিরে বলেন: أي: مرجعا يثوبون إليه ، لحصول منافعهم الدينية والدنيوية ، يترددون إليه ، ولا يقضون منه وطرا ، وجعله أمنا يأمن به كل أحد ، حتى الوحش ، وحتى الجمادات كالأشجار.ولهذا كانوا في الجاهلية – على شركهم – يحترمونه أشد الاحترام ، ويجد أحدهم قاتل أبيه في الحرم ، فلا يهيجه ، فلما جاء الإسلام ، زاده حرمة وتعظيما ، وتشريفا وتكريما “অর্থাৎ, এমন একটি প্রত্যাবর্তনস্থল, যার দিকে মানুষ তাদের দ্বীনি ও পার্থিব কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যে বারবার ফিরে আসে। তারা সেখানে বারবার যাতায়াত করে এবং সেখান থেকে তাদের প্রয়োজন-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তৃপ্ত হয় না। আর তিনি (আল্লাহ) একে এমন একটি নিরাপদ স্থান করেছেন, যেখানে প্রত্যেকেই নিরাপত্তা লাভ করে—এমনকি বন্যপ্রাণীরাও এবং জড়বস্তুর মধ্যেও গাছপালাও।এ কারণেই জাহেলি যুগে তারা মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও এই ঘরের প্রতি অত্যন্ত কঠোরভাবে সম্মান প্রদর্শন করত। এমনকি তাদের কেউ হারামের মধ্যে তার পিতার হত্যাকারীকে দেখতে পেলেও তার ওপর কোনো আক্রমণ করত না বা তাকে কোনোভাবে উত্ত্যক্ত করত না। অতঃপর যখন ইসলাম আগমন করল, তখন ইসলাম এই ঘরের মর্যাদা, সম্মান, মহত্ত্ব ও পবিত্রতাকে আরও বৃদ্ধি করে দিল।”(তাফসির আস-সা‘দী, পৃ. ৬৫)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: