কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

বিবাহে পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের মানদণ্ড কী এবং পাত্র-পাত্রী পছন্দের সময় যে প্রশ্নগুলো করা যেতে পারে

বিবাহে পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলামী নির্দেশনা হল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)বলেন, নারীকে বিবাহ করা হয় চারটি কারণে :
(১) তার সম্পদের কারণে
(২) তার বংশ মর্যাদার কারণে
(৩) তার সৌন্দর্যের কারণে এবং
(৪) তার দ্বীনদারীর কারণে। এর মধ্যে তোমরা দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও। নইলে ধ্বংস হও’(সহীহ বুখারী,মুসলিম, মিশকাত হা/৩০৮২)

অতঃপর তিনি ছেলে সম্পর্কে বলেন, যখন তোমাদের কাছে এমন কোন ছেলে বিবাহের পয়গাম দেয়, যার দ্বীনদারী এবং সচ্চরিত্রতার ব্যাপারে তোমরা সন্তুষ্ট, তখন ঐ ছেলের সাথে তোমাদের মেয়েকে বিয়ে দাও। যদি না দাও, তাহ’লে পৃথিবীতে ফিৎনা ও বড় ধরনের ফাসাদ সৃষ্টি হবে’ [তিরমিযী, মিশকাত হা/৩০৯০]

উপরোক্ত দু’টি হাদীছে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের বিবাহের মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে। এক্ষণে দ্বীনদারীকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাকীগুলি যথাসম্ভব সামঞ্জস্য রেখে পারস্পরিক বিবাহ সম্পাদন করাই শরী‘আত সম্মত।তবে সর্বদিক দিয়ে নিজের মান যেমন, ঠিক সেই সমপর্যায় মান ও পরিবেশের পাত্র-পাত্রী পছন্দ করা উচিৎ। এতে করে কেউ কারোর উপর গর্ব প্রকাশ না করতে পেরে কথার আঘাতে প্রেমের গতি বাধাপ্রাপ্ত হবে না। পজিশন, শিক্ষা, সভ্যতা, অর্থনৈতিক অবস্থা, বংশ প্রভৃতি উভয়ের সমান হলে সেটাই উত্তম। যেমন উভয়ের বয়সের মধ্যে বেশী তারতম্য থাকা উচিৎ নয়। নচেৎ ভবিষ্যতে বিভিন্ন জোয়ার-ভাটা দেখা দিতে পারে।

উপর্যুক্ত সর্বপ্রকার গুণ ও পজিশনের পাত্র-পাত্রী পেলেই সোনায় সোহাগা। এমন দাম্পত্য হবে চিরসুখের এবং এমন স্বামী-স্ত্রী হবে বড় সৌভাগ্যবান। পক্ষান্তরে কিছু না পেলেও যদি দ্বীন পায়, তবে তাও তার সৌভাগ্যের কারণ অবশ্যই। সুতরাং বউ ও জামাই পছন্দের কষ্টিপাথর একমাত্র দ্বীন ও চরিত্র। বংশের উচ্চ-নীচতা কিছু নেই। যেহেতু মানুষ সকলেই সমান। সকল মুসলিম ভাই-ভাইহে মানুষ! আল্লাহ বলেন,আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী হতে সৃষ্টি করেছি। পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে; যাতে তোমরা এক অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে ব্যক্তি অধিক সংযমী [মুত্তাকী ও পরহেযগার][সূরা আল-হুজুরাত: ১৩]

🔰বিবাহে পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের সময় কি কি প্রশ্ন করা যেতে পারে এই মর্মে কুরআন-সুন্নাহ সুনির্দিষ্ট কোনো বর্ণনা আসেনি তবে কুরআন-সুন্নাহর মূলনীতির আলোকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো জেনে নেওয়া যেতে পারে। যেমন:-

◼️পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের সময় আপনার প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত- “আপনি/তুমি কি এই মুহুর্তে বিয়ে করার জন্য মানসিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত? তোমার উপর কেউ জোর/বিবাহে বাধ্য করছে কি?সেটা যেনে নেয়া।

◼️দ্বিতীয় প্রশ্ন হিসেবে আপনাকে বাহ্যিকভাবে তার পছন্দ হয়েছে কি না বা আপনাকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে তার বিশেষ আপত্তি আছে কি না তা জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে পারেন।

◼️তারপর পাত্র বা পাত্রী কোন্ স্কুলে পড়েছে জানার আগে কোন্ পরিবেশে মানুষ হয়েছে–তা জানার চেষ্টা করুন। কারণ, অনেক সময় বংশ খারাপ হলেও পরিবেশ-গুণে মানুষ সুন্দর ও চরিত্রবান হয়ে গড়ে উঠে।

◼️পাত্র বা পাত্রীর চরিত্র দেখার আগে তার বাপ-মায়ের চরিত্রও বিচার্য। কারণ, সাধারণতঃ ‘আটা গুণে রুটি আর মা গুণে বেটি’ এবং ‘দুধ গুণে ঘি ও মা গুণে ঝি’ হয়ে থাকে। আর ‘বাপকা বেটা সিপাহি কা ঘোড়া, কুছ না হো তো থোড়া থোড়া।’

◼️ ছেলের জন্য এমন পাত্রী পছন্দ করা উচিৎ, যে হবে পুণ্যময়ী, সুশীলা, সচ্চরিত্রা, দ্বীনদার, পর্দানশীন; যাকে দেখলে মন খুশীতে ভরে ওঠে, যাকে আদেশ করলে সত্বর পালন করে, স্বামী বাইরে গেলে নিজের দেহ, সৌন্দর্য ও ইজ্জতের এবং স্বামীর ধন-সম্পদের যথার্থ রক্ষণা-বেক্ষণা করে[নাসাঈ ৩২৩১ হাকেম ২/১৬১, মুসনাদে আহমদ ২/২৫১]

◼️মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে চরিত্রবান ও দ্বীনদার যুবককে অগ্রাধিকার দেয়া উচিৎ। কেনানা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:যখন তোমাদের নিকট এমন কোন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে, যার চরিত্র ও দীনদারীতে তোমরা সন্তুষ্ট, তবে তোমরা তার বিয়ের ব্যবস্থা করে দাও। যদি তোমরা তা না কর, তবে তা পৃথিবীর মধ্যে বিপর্যয় ডেকে আনবে এবং ব্যাপক বিশৃঙ্খলার কারণ হবে।[ইবনে মাজা:হাদিস নং- ১৯৬৭]
বিশেষ করে চরিত্রবান সহীহ আকীদা সম্পন্ন কোন যুবক পেলে তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কেননা, তার মধ্যেই প্রকৃত দ্বীন পাওয়া যাবে।

◼️বিবাহ একটি সহাবস্থান কোম্পানী প্রতিষ্ঠাকরণের নাম। সুতরাং এমন সঙ্গী নির্বাচন করা উচিৎ যাতে উভয়ের পানাহার প্রকৃতি ও চরিত্রে মিল খায়। নচেৎ অচলাবস্থার আশঙ্কাই বেশী তাই পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের সময় পছন্দের খাদ্য সম্পর্কে জেনে নিতে পারেন [তুহফাতুল আরূস, ৪৯পৃঃ]

আবার কারো বাহ্যিক দ্বীনদারী দেখেও ধোঁকা খাওয়া উচিৎ নয়। কারণ, সকাল ৭ টায় কাউকে নামায পড়তে দেখলেই যে সে চাশ্তের নামায পড়ে–সে ধারণা ভুলও হতে পারে। কেননা, হতে পারে সে চাশ্তের নয়, বরং ফজরের কাযা আদায় করছিল।

অনুরূপ কারো বাপের দ্বীনদারীর মতো কথা শুনে অথবা কেবল কারো ভাইয়ের বা বুনায়ের দ্বীনদারীর কথা শুনে তার দ্বীনদারী হওয়াতে নিশ্চিত হয়ে ধোঁকা খাওয়াও অনুচিত। খোদ পাত্র বা পাত্রী কেমন তা সর্বপ্রথম ও শেষ বিচার্য।

অনুরূপ মাল-ধন আছে কি না, কিছু পাব কি না পাব—তাও বিচার্য নয়। কারণ, তা তো আজ আছে কাল নাও থাকতে পারে। আবার আজ না থাকলে কাল এসে যেতেও পারে। আমি যেমন ঠিক তেমনি ঘরে বিবাহ করা বা দেওয়াই উচিৎ। বিশেষ করে ঘুষ (মোটা টাকা পণ) দিয়ে বড় ঘরে ঢুকতে যাওয়া ঠিক নয়।

জ্ঞানীরা বলেন, ‘তোমার চেয়ে যে নীচে তার সঙ্গ গ্রহণ করো না। কারণ, হয়তো তুমি তার মূর্খতায় কষ্ট পাবে এবং তোমার চেয়ে যে উচ্চে তারও সাথী হয়ো না। কারণ, সম্ভবতঃ সে তোমার উপর গর্ব ও অহংকার প্রকাশ করবে। তুমি যেমন ঠিক তেমন সমমানের বন্ধু, সঙ্গী ও জীবন-সঙ্গিনী গ্রহণ করো, তাতে তোমার মন কোন প্রকার ব্যথিত হবে না।’

হাতি-ওয়ালার সাথে বন্ধুত্ব করলে হাতি রাখার মত ঘর নিজেকে বানাতে হবে। নতুবা ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ, ক্ষণে হাতে দড়ি ক্ষণে চাঁদ।’

এ কথা ভাবা যায় যে, বড় বাড়িতে মেয়ে পড়লে তার খেতে-পরতে কোন কষ্ট হবে না; সুখে থাকবে। কিন্তু তার নিশ্চয়তা কোথায়? ‘বড় গাছের তলায় বাস, ডাল ভাঙ্গলেই সর্বনাশ।’পাশাপাশি মেয়ের অভিভাবকের উচিৎ, মেয়ের রুচি ও পছন্দের খেয়াল রাখা। অবশ্য তার হাতে ডোর ছেড়ে দেওয়া উচিৎ নয়। পরন্তু দ্বীনের ডোর কোন সময়ই ছাড়ার নয়। কারণ, সাধারণতঃ মেয়েদের কল্পনায় থাকে,

‘রসের নাগর, রূপের সাগর, যদি ধন পাই,
আদর ক’রে করি তারে বাপের জামাই।’

বাস্! এই হল ভোগবাদিনী ও পরলোক সম্বন্ধে অন্ধ নারীদের আশা। এরা কেবল বাহ্যিক দৃষ্টির সৌন্দর্য পছন্দ ও কামনা করে; কিন্তু অন্তর্দৃষ্টির সৌন্দর্য অপ্রয়োজনীয় ভাবে! তারা জানে না যে, কুৎসিত মনের থেকে কুৎসিত মুখ অনেক ভালো।

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! কোন স্ত্রী সর্বোত্তম?
তিনি বলেন: “(স্বামী) যে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে পুলকিত হয়, কোন নির্দেশ দিলে আনুগত্য করে এবং সে তার নিজস্ব ব্যাপারে বা তার অর্থ-সম্পদের ব্যাপারে স্বামী যেটা অপছন্দ করে তার বিপরীত কিছু করে না।”[মুসনাদে আহমদ। শাইখ আলবানি হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। উৎস: সিলসিলা সহিহা, হা/১৮৩৮]

এক ব্যক্তি হাসান বাসরী (রঃ) কে জিজ্ঞাসা করল, ‘আমার একটি মেয়ে আছে। বহু জায়গা হতে তার বিয়ের কথা আসছে। কাকে দেব বলতে পারেন?’

হাসান বললেন, ‘সেই পুরুষ দেখে মেয়ে দাও; যে আল্লাহকে ভয় করে (যে পরহেযগার)। এতে যদি সে তাকে ভালোবাসে, তাহলে তার যথার্থ কদর করবে। আর ভালো না বাসলে সে তার উপর অত্যাচার করবে না।’[উয়ূনুল আখবার, ইবনে কুতাইবাহ ৪/১৭]

অতএব এ কাজে অভিভাবককে তার মেয়ের সহায়ক হওয়া একান্ত ফরয। তাই তো মেয়ের বিবাহে অভিভাবক থাকার শর্তারোপ করা হয়েছে। অবশেষে,আল্লাহ তাআলা প্রতিটি নারী-পুরুষকে তার পছন্দের দীনদার নারী-পুরুষকে বিয়ে করার মাধ্যেম একটি সুস্থ ও সুন্দর দাম্পত্য জীবন গড়ার তওফিক দান করুন। আমিন।
___________________
জুয়েল মাহমুদ সালাফি