কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

বিবাহের ক্ষেত্রে পুরুষের শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকা দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে

প্রশ্ন: বিবাহের ক্ষেত্রে পুরুষের শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকা দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে? বিয়ে করার জন্য একটি ছেলের শারীরিক ও আর্থিক ‘সামর্থ্য’ ন্যূনতম কতটুকু হওয়া জরুরী? বিষয়টি কি আসলেই কঠিন ও জটিল?
▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: ব্যক্তির অবস্থার আলোকে বিয়ে করার বিধান ভিন্ন ভিন্ন হয়। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একই কথা। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে যার শক্তি-সামর্থ্য রয়েছে এবং নিজেকে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে নিরাপদ রাখার ক্ষমতা আছে, স্বাভাবিক ভাবে তার জন্য বিবাহ করা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। কিন্তু যার শারীরিক শক্তিমত্তা, সক্ষমতা ও আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে এবং যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ ও পদস্খলন বা নিষিদ্ধ কর্মে লিপ্ত হওয়ার আশংকা করে, তার জন্য বিবাহ করা ওয়াজিব। এর বিপরীতে আবার যার দৈহিক মিলনের সক্ষমতা ও স্ত্রীর ভরণ-পোষণের সামর্থ্য নেই তার জন্য বিবাহ করা হারাম। (ফিক্বহুস সুন্নাহ; ৩/১৩১)। আজ আমরা জানার চেষ্টা করবো বিবাহের ক্ষেত্রে পুরুষের শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকা দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে?
.
🔸প্রথমে আলোচনা করবো শারীরিক সামর্থ্যের ব্যাপারে।
_______________________________________
ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিতে, ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের বালেগ হওয়ার বয়সসীমা ও আলামত শরীয়তের পক্ষ থেকে নির্ধারিত রয়েছে। কোন ছেলে বা মেয়ের মধ্যে বালেগ হওয়ার নির্দিষ্ট আলামত পাওয়া গেলে বা নির্দিষ্ট বয়সসীমায় পৌঁছলেই তাকে বালেগ গণ্য করা হবে এবং তখন থেকেই শরীয়তের হুকুম-আহকাম তার উপর প্রযোজ্য হবে। ছেলেদের বালেগ হওয়ার আলামত হল: ক) স্বপ্নদোষ হওয়া। খ) বীর্যপাত হওয়া। গ) দাঁড়ি বা গোঁফ উঠা। সুতরাং যখন থেকে একটি ছেলের ঘুমের মধ্যে স্বপ্নদোষ হয়, তখন থেকেই সে বালেগ হয়ে যায়; বাংলায় যাকে আমরা প্রাপ্তবয়স্ক (Adult) বলি। তখন থেকেই তার উপর শরীয়তের প্রতিটি বিধান মানা ফরজ হয়ে যায় এবং সে বিয়ের ব্যাপারে উপযুক্ত সাব্যস্ত হয়। যদি বালেগ হওয়ার পর কোন ছেলের মাঝে যৌন সমস্যা দেখা দেয়, অথবা নারীদের প্রতি আগ্রহবোধ না করে কিংবা পুরুষত্বহীনতার সম্ভাবনা থাকে, তখন তার জন্য বিয়ে করা জায়েয নেই। বরং সে চিকিৎসা নেবে, সুস্থ হবে, এরপর বিয়ের চিন্তা করবে। আর, যদি সে অন্য দশটি ছেলের মতো সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করে, নারীদের প্রতি যৌন কামনা অনুভব করে এবং সঙ্গীর অভাববোধ করে, তাহলে তাকে বিয়ের ব্যাপারে ‘শারীরিকভাবে সক্ষম’ হিসেবে ধরে নেওয়া হবে। অর্থাৎ, যৌন অক্ষমতার ব্যাপারটি ব্যতিক্রমী কেইস। একমাত্র যে রোগী, সে ব্যতীত অন্যদেরকে শারীরিকভাবে সক্ষম হিসেবে ধরে নেওয়া হবে। কারণ, বিয়ের আগে হারাম পন্থায় যৌনতা করে নিজেকে প্রমাণ করার কথা ইসলাম বলে না। ছেলে যদি সহবাসের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী থাকে, তাহলেই যথেষ্ট। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলছেন, বিয়ে দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং যৌন জীবনকে সংযমী করে। (সহীহ বুখারী হা/৫০৬৬; সহীহ মুসলিম হা/১৪০০; আবু দাঊদ হা/২০৪৬)

🔸এরপর আসি, আর্থিক সামর্থ্যের ব্যাপারে।
_______________________________________
ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘হে যুবকের দল! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে নেয় এবং যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কেননা, রোজা যৌন কামনাকে দমন করে।” (ইমাম বুখারী: ৫০৬৫; ইমাম মুসলিম হা/১৪০০) উপরোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন, উক্ত হাদীসে ব্যবহৃত আরবী الْبَاءَةَ ‘(‘আল-বাআত)’’ শব্দটির উদ্দেশ্য নিয়ে উলামাগণের মাঝে দু’টি অগ্রগণ্য মত রয়েছে। তন্মধ্যে একটি মত হলো, الْبَاءَةَ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সহবাস। সুতরাং, মূল কথা হলো যে সহবাসে সক্ষম সে যেন বিবাহ করে। আর যে স্ত্রীর ভরণ-পোষণে অক্ষম ও সহবাসে অক্ষম, তার যৌন চাহিদা দমন করার জন্য সিয়াম পালন করতে হবে আর এটাই তার খারাপ মনোবৃত্তি দূর করবে। দ্বিতীয় মত হলো, বিবাহের খরচাদি বহনের সক্ষমতা (অর্থাৎ- দেন-মোহর, ওয়ালীমা ইত্যাদি)। সুতরাং, হাদীসটির উদ্দেশ্য হলো, যে ব্যক্তি বিবাহের সমস্ত খরচ পরবর্তী স্ত্রী খরচাদি বহনে সক্ষম সে যেন বিবাহ করে। আর যে এতে অক্ষম সে তার প্রবৃত্তি দমনে সিয়াম পালন করবে। (ইমাম নববী শরহে মুসলিম, ৯/১৭৩)
.
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাদীসে উল্লেখিত বাক্যে (مَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ) এখানে الْبَاءَةَ এর মধ্যে সহবাসে সক্ষমতা ও স্ত্রীর যাবতীয় খরচাদিসহ সবই রয়েছে। কারণ তিরমিযীতে আস্ সাওরী (রহঃ)-এর সূত্রে আ‘মাশ হতে বর্ণিত রয়েছে, যে ব্যক্তি الْبَاءَةَ করতে সক্ষম নয় সে সিয়াম পালন করবে। তিরমিযীর বর্ণনায় আবু আওয়ানাহ্-এর সূত্রে বর্ণিত রয়েছে, যে ব্যক্তি বিবাহ করতে সক্ষম সে যেন বিবাহ করে। আবার নাসায়ীর বর্ণনায় রয়েছে, যার সামর্থ্য আছে সে বিবাহ করবে। ইবন হাযম (রহ.) বলেন; সহবাসে সক্ষম ব্যক্তি মাত্র সবার ওপর বিবাহ করা ফরয, যদি তার বিবাহ করার সামর্থ্য থাকে। এতে যদি সে অক্ষম হয় তবে বেশী বেশী সিয়াম পালন করবে। আর এটাই এক দল সালাফগণের বক্তব্য। ইবনুল বাত্ত্বল (রহ.) বলেন; নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা দ্বারা বিবাহ ওয়াজিব প্রমাণিত হয় না। কারণ, বিবাহের পরিবর্তে সিয়াম পালন ওয়াজিব না, সুতরাং বিবাহটা অনুরূপই হবে। সিয়াম পালনের নির্দেশ রয়েছে সহবাসে অক্ষমতার কারণে, সুতরাং তা আবশ্যকীয় নয়। ব্যাপারটা এ রকম যে, কেউ কাউকে বলল, এ কাজ তোমার জন্য করা ওয়াজিব, তবে তা যদি না পার তবে তোমার জন্য এটা করা ভাল। আহমাদ-এর প্রসিদ্ধ বক্তব্য রয়েছে যে, পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা না থাকলে বিবাহ করা ওয়াজিব নয়। আল্লামা কুরতুরী (রহঃ) বলেন; সামর্থ্যবান ব্যক্তির যদি বিবাহ ছাড়া নিজের ওপর কিংবা দ্বীনের ব্যাপারে ক্ষতির (যিনায় লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা) আশঙ্কা থাকে এবং বিবাহ ছাড়া যদি এ অবস্থা থেকে মুক্তির সম্ভাবনা না থাকে তবে তার জন্য বিবাহ করা ওয়াজিব। এতে কারো দ্বিমত নেই। (ফাতহুল বারী ৯ম খন্ড, হা/৫০৬৫)। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন; বিবাহ করার ক্ষমতা হল বিবাহের খরচ বহন করার ক্ষমতা, সহবাস করার ক্ষমতা নয়। কারণ, হাদীসটি তাদের সম্বোধন করা হয়েছে যারা সহবাস করতে সক্ষম। তাই যাদের সামর্থ্য নেই তাদের রোজা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ এটি একটি ঢাল। (আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা, ৩/১৩৪)
.
মোটকথা কোন ছেলে যদি স্ত্রীর ভরণপোষণ দেওয়ার ব্যাপারে সামর্থ্য রাখে তাহলে সে বিবাহ করবে। কিন্তু যদি সে স্ত্রীর ভরণপোষণ সামর্থ্য না রাখে, তাহলে আপাতত সে অপেক্ষা করবে, প্রয়োজনে সিয়াম পালন করবে। আর ভরণপোষণ বলতে, কমপক্ষে বউয়ের খাবার, কাপড় এবং বাসস্থান নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে সহজ কথা হল কোন ছেলে যদি আর্থিকভাবে খুব দুর্বলও হয়, কিন্তু পরিশ্রমী ও উদ্যমী হয়, হালাল উপার্জনের ব্যাপারে অলসতা না করে এবং পরিবারের ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়, তাহলে সেই ছেলের বিয়ে করতে কোন বাধা নেই। যেমন: আলি (রা.)-এর কাছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সবচেয়ে আদরের কন্যা ফাতিমা (রা.)-কে বিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ আলি (রা.) তখন অত্যন্ত দরিদ্র ছিলেন। সহিহ বুখারিতে (৫১৩৫ নং হাদিস) এসেছে, একজন দরিদ্র সাহাবীর সাথে নবীজি এক নারীকে বিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সাহাবীর কিছুই ছিল না। ফলে, বউকে কুরআন শেখানোর শর্তে (অর্থাৎ এটিকে মোহরানা বানিয়ে) বিয়ে দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার আর্থিক দুরবস্থার কারণে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তোমার কাছে কি একটা লোহার আংটিও নেই?’ তখন সেটিও ছিল না সেই সাহাবীর কাছে। সহজ কথা হল বর্তমানে যেমন আমাদের অনেকের একটা ফিক্সড ইনকামের ব্যবস্থা থাকে, সাহাবীদের মধ্যে তেমনটা ছিল না। তাঁদের অনেকেই দিন এনে দিন খেতেন। তাই, উপস্থিত সময়ে যদি সেরকম অর্থ-সম্পদ না থাকে, কিন্তু সে হালাল উপার্জনে অভ্যস্ত থাকে আর কনে তার এই অবস্থাটি মেনে নেয়, তাহলে তার বিয়ে করতে কোনো বাধা নেই, যদিও সে অত্যন্ত দরিদ্র হয়। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিয়ে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎ, তাদেরকেও। তারা অভাবগ্ৰস্ত হলে, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করবেন; আল্লাহ তো প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’’ (সুরা আন-নূর, আয়াত: ৩২)। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘‘আল্লাহ্ তা‘আলা তিন শ্রেণির মানুষকে সাহায্য করা নিজের কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। (১) আল্লাহর পথে জিহাদকারী; (২) চুক্তিবদ্ধ গোলাম, যে চুক্তির অর্থ পরিশোধের ইচ্ছা করে এবং (৩) বিবাহে আগ্রহী ব্যক্তি, যে (বিয়ের মাধ্যমে) পবিত্র জীবন যাপন করতে চায়।’’ (ইমাম তিরমিযি, আস-সুনান: ১৬৫৫; হাদিসটি হাসান)। আল্লাহ আমাদেরকে বিবাহের গুরুত্ব উপলব্ধি করার এবং পারস্পরিক পবিত্র বন্ধন রক্ষা করার তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!! (কিছু বিষয় সংকলিত। আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
______________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।