প্রচলিত শবে-বরাতের ফজিলত সংক্রান্ত সকল হাদীস জয়ীফ অথবা জাল

প্রশ্ন: প্রচলিত শবে-বরাতের ফজিলত সংক্রান্ত সকল হাদীস জয়ীফ অথবা জাল। কিন্তু একটি হাদীসের একাধিক সূত্র থাকার ফলে শাইখ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) সহীহ বলেছেন। সেই হাদীসটির তাহক্বীক ও শবে-বরাতের ফজিলত সংক্রান্ত যাবতীয় সংশয় নিরসন।
▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: যে হাদীসটি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন পরিপূর্ণ বর্ননাটি হলো,মু‘আয বিন জাবাল (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘আল্লাহ তা‘আলা শাবান মাসের মধ্যরাতে (১৪ তারিখ দিবাগত রাত, যা শবে বরাত নামে প্রচলিত) তাঁর সৃষ্টির প্রতি (বিশেষ রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক/বিদ্বেষ পোষনকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’’(ইবনু মাজাহ হা/১৩৯০, ইবনু হিব্বান ৫৬৬৫)। তাহক্বীক: উপরোক্ত হাদীসটি একই অর্থের কাছাকাছি শব্দে মোট ৮ জন সাহাবী থেকে বর্নিত হয়েছে। যেমন: (১). আবু মূসা আশআরী, (২). আউফ ইবনু মালিক, (৩). আব্দুল্লাহ ইবনু আমর, (৪). মুয়ায ইবনু জাবাল, (৫). আবু সা’লাবা আল-খুশানী, (৬).আবু হুরাইরা, (৭). আম্মাজান আয়েশা ও (৮). আবু বাকর সিদ্দীক (রাঃ) থেকে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে।হাদীসটির সকল সনদ যঈফ। (ইবনু মাজাহ, আস- সুনান ১/৪৪৫; হা/১৩৯০ বাযযার, আল-মুসনাদ ১/১৫৭, ২০৭, ৭/১৮৬; আহমাদ ইবনু হাম্বল, আল-মুসনাদ ২/১৭৬; ইবনু আবি আসিম, আস-সুন্নাহ, পৃ ২২৩-২২৪; ইবনু হিব্বান, আস-সহীহ ১২/৪৮১; তাবারানী, আল-মুজাম আল-কাবীর, ২০/১০৮, ২২/২২৩; আল-মুজাম আল-আওসাত, ৭/৬৮; বায়হাক্বী, শু’আবুল ঈমান, ৩/৩৮১; ইবনু খুযায়মা, কিতাবুত তাওহীদ ১/৩২৫-৩২৬, মিশকাত হা/১৩০৬; সনদ জয়ীফ)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) উপরোক্ত হাদীসগুলো আলাদা আলাদা ভাবে সবগুলোর সনদ জয়ীফ। হাদীসগুলো শাইখ আলবানী তার কিতাবে উল্লেখ করে অতঃপর তিনি মন্তব্যে বলেন, এই বর্ণনাগুলোর একাধিক সূত্র সমূহ থাকার ফলে হাদীসটি আমার নিকটে ‘শক্তিশালী’ (قوى) এ কারণে যে, এর সমার্থক (শাওয়াহেদ) কিছু হাদীস রয়েছে। উক্ত সমার্থক বর্ণনাগুলি তিনি সিলসিলা সহীহাহ হা/১১৪৪ ও ১৫৬৩-তে এনেছেন। যার সংখ্যা ৭টি। মুসনাদে আহমাদের ভাষ্যকার আহমাদ শাকের (রাহিমাহুল্লাহ) ১০/১২৭ ও শু‘আয়েব আরনাঊত্ব (রাহিমাহুল্লাহ) হাদীসটির সনদ যঈফ বলেছেন। অতঃপর বিভিন্ন শাওয়াহেদ-এর কারণে উভয়ে ‘সহীহ লেগায়রিহি’ বলেছেন। (মুসনাদে আহমাদ হা/৬৬৪২)। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি উক্ত যঈফ ও কিছু মওযূ হাদীসের উপর ভিত্তি করে আরও অনেক বিদ্বান এই রাতের বিশেষ ফযীলত এবং এই রাতে বিশেষ ইবাদত করার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। (দ্রঃ তুহফাতুল আহওয়াযী, হা/৭৩৬-এর ব্যাখ্যা; মির‘আত হা/১৩১৪-এর ব্যাখ্যা, ৪/৩৪০-৪২; শাফেঈ, কিতাবুল উম্ম ১/২৩১; ইবনু তায়মিয়াহ, মজমূ‘ ফাতাওয়া ২৩/১৩১; ইবনু রাজাব, লাত্বাইফুল মা‘আরিফ ১/১৩৮, আত তাহরীক)।
.
প্রিয় পাঠক, নিঃসন্দেহে আমাদের নিকট ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ইলম, মর্যাদা, গ্রহণযোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও উপরোক্ত হাদীসটিতে তাঁর ইজতিহাদ বা গবেষণা গ্রহণযোগ্য সালফে-সালেহীনের মানহাজের উপর প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস বিখ্যাত সালাফি বা আহালুল হাদীস ইমামগণের কাছে অগ্রাধিকারযোগ্য নয়। সালাফি বা আহালুল হাদিস আলেমরা শাইখ আলবানী কে ভালবাসেন, শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, মানেন কিন্তু অন্ধভাবে অনুসরণ করে না। কারণ, কাউকে অন্ধভাবে তাক্বলীদ করা সালাফি মানহাজের বৈশিষ্ট্য নয়। প্রশ্নে উল্লেখিত হাদীসটির অন্যান্য সনদ ও শাহেদ এমন ত্রুটিপূর্ণ, যা পরস্পর মিলেও ‘গ্রহণযোগ্য’ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। বরং শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কিত হাদীসগুলো হয় জাল, না হয় দুর্বল। (এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ইবনু রজব, লাত্বায়েফুল মা‘আরেফ, পৃঃ ১৩৭; মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ইবনে বায ১/১৮৭ পৃ. দেখতে পারেন)।
.
প্রিয় পাঠক, তর্কের খাতিরে আমরা যদি ধরে নিই যে, শাবান মাসের মধ্যরাতে তথা কথিত শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কে উপরোক্ত হাদীসটি ‘গ্রহণযোগ্য’ বা সহীহ কিন্তু শবে-বরাতের দিনে বা রাতে অতিরিক্ত ও বিশেষ কোন সালাত, সিয়াম, রাত জেগে মসজিদে জিকির করা অতঃপর সম্মিলিত মুনাজাত করা, তবারক বিতরণ করা অথবা অন্য যেকোন নিদিষ্ট ইবাদত সম্পর্কে ‘সহীহ’, ‘হাসান’ এমনকি ‘অল্প যঈফ’ হাদীসও বর্ণিত হয়নি। বরং এ সম্পর্কিত সব হাদীস হয় অত্যন্ত দুর্বল, আর না হয় জাল। এজন্য উপমহাদেশের আহলেহাদীস বা সালাফি আলেমগনই শুধু নয়; বরং সর্বযুগের জগদ্বিখ্যাত ওলামায়ে কেরাম শবে বরাত উপলক্ষ্যে বিশেষ ইবাদত-বন্দেগীকে বিদ‘আত বলেছেন। এমনকি যে আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) ইবনু মাজাহর উপরোক্ত হাদীসকে ‘সহীহ’ বলেছেন, খোদ তিনিই বলেছেন, نعم لا يلزم من ثبوت هذا الحديث اتخاذ هذه الليلة موسمًا يجتمع الناس فيها، ويفعلون فيها من البدع ‘তবে হ্যাঁ, এই হাদীস প্রমাণিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, এই রাত্রিকে এমন মৌসুম হিসাবে গ্রহণ করতে হবে, যাতে মানুষ মসজিদে একত্রিত হবে এবং বিদ‘আতসমূহ করবে।’ অর্থাৎ এই রাত্রি উপলক্ষ্যে বিশেষ কোন আমল করাকে শায়খ আলবানী কঠোরভাবে বিদ‘আত বলেছেন। ( দেখুন, আল-ক্বাসেমী, ইসলাহুল মাসাজিদ মিনাল বিদা‘ ওয়াল আওয়ায়েদ, পৃঃ ৯৯, টীকা নং ২ ফাতাওয়া আলবানী (অডিও) ক্লিপ নং ১৮৬/৬)
.
ইমাম আব্দুর রহমান বিন যাইদ বিন আসলাম (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৮২ হি.] বলেছেন, “আমি আমাদের কোনো শাইখ বা ফাক্বীহকে এরূপ পাইনি যে, তাঁরা মধ্য শাবানের রাতের দিকে ভ্রুক্ষেপ করেছেন। আমি তাঁদের কাউকে এরূপ পাইনি যে, তাঁরা এ ব্যাপারে মাকহূলের হাদীস বর্ণনা করেছেন। অন্যান্য রাতের ওপর এই রাতের মর্যাদা আছে বলে তাঁরা মনে করতেন না।” [ইমাম ইবনু ওয়াদ্বদ্বাহ (রাহিমাহুল্লাহ), আল-বিদা‘উ ওয়ান নাহয়ু আনহা; আসার নং: ১১৩; সনদ: সাহীহ (তাহক্বীক্ব: আমর আব্দুল মুন‘ইম সালিম); পৃষ্ঠা: ৮৪; মাকতাবাতু ইবনি তাইমিয়্যাহ কর্তৃক প্রকাশিত; সন: ১৪২৯ হি./২০০৮ খ্রি.]। এছাড়া ও (১). যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ আশ-শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া, (২). সৌদি আরবের ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটি (৩). আল্লামাহ ইমাম ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) (৪). ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) (৫). ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) এবং (৬). আল্লামাহ ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ)সহ প্রায় সকল গ্রহণ যোগ্য আলেম এরাতে বিশেষ কোন আমল করাকে বিদআত বলেছেন। (বিস্তারিত দেখুন, ফাতাওয়া লাজনাহ দাইমাহ; ফাতওয়া নং: ৭৯২৯; মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ২৭৯-২৮১; বিন বায অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফাতওয়া নং-১৩৭৫২, আল-মুনতাক্বা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান; প্রশ্ন নং: ১৫৬)

🔸পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনার বিষয়ে আমাদের বক্তব্য:
______________________________________
(১). প্রশ্নে উল্লেখিত হাদীসটি যঈফ এবং একই মর্মের অন্যান্য ফযিলতের হাদীসটিগুলো ‘মওযূ’ হওয়ার কারণে আমলযোগ্য নয়। তাছাড়া হাদীসটিতে নির্দিষ্ট কোন ইবাদতের কথা নেই। তাই এরূপ হাদীসের উপর ভিত্তি করে কোন ইবাদত প্রতিষ্ঠা করা যায় না। কারণ, জমহুর ওলামাদের বিশুদ্ধ মতে যঈফ বা দুর্বল হাদিস কখনোই আমালযোগ্য বা গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং, যঈফ বা দুর্বল প্রমাণিত হয়ে যাওয়ার পরও তার উপর আমল করা নিঃসন্দেহে গর্হিত কাজ। মুহাদ্দিস যায়েদ বিন আসলাম বলেন, হাদীস মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও যে তার উপর আমল করে সে শয়তানের খাদেম।’ [মুহাম্মাদ তাহের পাট্টানী, তাযকিরাতুল মাওযূ‘আত [বৈরুত: দারুল এহইয়াইত তুরাছ আল-আরাবী, ১৯৯৫/১৪১৫ পৃঃ ৭; ড. ওমর ইবনু হাসান ফালাতাহ, আল- মা ফিল হাদীস [দিমাষ্ক: মাকতাবাতুল গাযালী, ১৯৮১/১৪০১ ১ম খন্ড, পৃঃ ৩৩৩]। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘শরী‘আতের কোন বিষয়ে সহীহ ও হাসান হাদীস ব্যতীত যঈফ বা দুর্বল হাদিসের উপর নির্ভর করা জায়েয নয়।’(মাজমূঊল ফাতাওয়া, ১/২৫০ পৃ.)। শায়খ ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, যঈফ হাদিসকে দলীল হিসাবে গ্রহণ করা যাবে না এবং তাকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নামের সঙ্গে সম্পৃক্তও করা যাবে না…।(ইবনে উসাইমীন, ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব, টেপ নং ২৭৬)
.
(২). হাদীসটি বুখারী-মুসলিম সহ বহু গ্রন্থে বর্ণিত সহীহ হাদীস সমূহের বিরোধী। কারণ, সকল সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন; প্রতি রাত্রে শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের মর্যাদাবান বারাকাতপূর্ণ রব দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, ‘যে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেব। যে আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করবে আমি তাকে তা দান করব। যে আমার নিকট মাফ চাইবে আমি তাকে মাফ করে দেব। সহীহ মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, তারপর তিনি হাত বাড়িয়ে দেন এবং বলেন, কে আছে যে এমন লোককে কর্য দেবে যিনি ফকীর নন, না অত্যাচারী এবং সকাল পর্যন্ত এ কথা বলতে থাকেন। (সহীহ বুখারী হা/১১৪৫, সহীহ মুসলিম হা/৭৫৮, মিশকাত হা/১২২৩)। অথচ অত্র যঈফ হাদীসে উক্ত আহ্বানকে শুধুমাত্র ১৫ই শা‘বানের রাতের জন্য খাস করা হয়েছে। যা গ্রহণযোগ্য নয়।
.
(৩). এই হাদীসটির সুযোগ নিয়ে বিদ‘আতীরা এই রাতে ইবাদতের নামে হাযারো রকম বিদ‘আতী আমলের সৃষ্টি করেছে। যা সমাজের প্রতিটি মসজিদে প্রতি দৃষ্টি দিলে দেখতে পারবেন। যেমন: (ক). শবে-বরাত মানে ভাগ্যরজনি; এই রাতে সবার ভাগ্য নতুন করে লেখা হয়। (খ). এই রাতের দিনে অধিক সওয়াবের আশায় সিয়াম রাখা। (গ). এই রাতে আল্লাহ সাধারণ ক্ষমা করেন। (ঘ). এই রাতে বয়স ও রিযিক্ব নির্ধারণ করা হয়। (ঙ). কবরবাসীকে আলোকিত করতে কবরে মোমবাতি, আগরবাতি জ্বালানো হয়। (চ). অধিক সওয়াবের আশায় এই দিনেই বেশি পরিমাণে দান-খয়রাত বিশেষ করে মৃতদের নামে বিশেষভাবে দান-খয়রাত করা এবং কাঙালিভোজের আয়োজন করা। (ছ). এই রাতকে লায়লাতুল ক্বদরের চাইতেও বেশি মর্যাদাবান মনে করা। (জ). এই রাতে বিশেষ মর্যাদায় কবর যিয়ারত এবং সওয়াবের নিয়্যতে বিভিন্ন মাযারে গিয়ে যিয়ারত করা। (ঝ). এই রাতে শীআ-রাফেযীদের মিথ্যা ও কল্পিত ইমাম মাহদীর জন্মদিবস পালন করা। (ঞ). এই রাতে হালুয়া, রুটি ও গোশত পাকানো এবং তা পাড়া-প্রতিবেশীদের মাঝে বিলানো। (ট). এই রাতে আগরবাতি, মোমবাতি জ্বালানো, আলোকসজ্জা এবং আনন্দ উৎসবে পটকা ফুটানো। (ঠ). এই দিনে সন্ধ্যায় গোসল করে নতুন কাপড় পরে সারা রাত সালাত পড়া, সেই সাথে অধিক সওয়াবের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মসজিদে গমন করা। (ড). এই রাতে সূরা ইয়াসীন তিনবার পাঠ করা। প্রথমবার বয়স বৃদ্ধির জন্য, দ্বিতীয়বার বালা-মুসিবত দূর করার জন্য এবং তৃতীয়বার কোনো মানুষের মুখাপেক্ষী না হওয়ার জন্য। (ঢ). এই মনে করা যে, এই দিনে উহুদের যুদ্ধে কাফেররা নবী করীম(ﷺ) -এর দাঁত মোবারক ভেঙেছিল। (ণ). এই রাতে যমযমের পানি অন্যান্য দিনের চেয়ে বৃদ্ধি পায় ধারণা করা। (ত). গত এক বছরে মৃত মানুষের রূহগুলোর আগের রূহের সাথে যমীনে নেমে আসে। (থ). এই রাতে সূরা আদ-দুখান পাঠকারীর জন্য সারা দিন ৭০ হাজার ফেরেশতা দু‘আ করবে মনে করে তা পাঠ করা। (দ). এই দিনে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে হালুয়া-রুটি, মুরগি, পোলাও রান্না করে পাঠানো। শবে-বরাতের নামে উপরোক্ত এসবই কুরআন ও সুন্নাহ পরিপন্থী কাজ।
.
(৪). এই রাতে বা দিনে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ও সহাবায়ে কেরাম কোনরূপ বাড়তি ইবাদত করেননি। এই রাতের যদি এতই ফজিলত থাকতো তাহলে রাসূল (ﷺ) এবং তার সাহাবীরা কেন এত ফজিলত থেকে বঞ্চিত হলেন উম্মত; কে কেন বঞ্চিত করলেন? অথচ রাসূল (ﷺ) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন এমন কোন জিনিসই আমি (বর্ণনা করতে) ছাড়িনি। আর আমি তার হুকুম তোমাদেরকে অবশ্যই দিয়েছি। আর আমি এমন কোন জিনিসই ছাড়িনি যা আল্লাহ তা‘আলা নিষেধ করেছেন। কিন্তু আমি তোমাদেরকে তা অবশ্যই নিষেধ করেছি।’(সিলসিলা সহীহাহ হা/১৮০৩; আস-সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী হা/১৩৮২৫, ইমাম শাফেঈ, কিতাবুর রিসালাহ, পৃঃ ১৫)। অতএব, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হওয়া সত্ত্বেও যারা ভাল কাজের দোহাই দিয়ে ইসলামের মধ্যে নতুন নতুন ইবাদতের জন্ম দিয়েছে ও তাকে লালন করছে তাদের ভাবখানা এমন যেন ইসলাম অপূর্ণাঙ্গ। আর এরূপ বিশ্বাস আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর মিথ্যারোপ করার শামিল। ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন, যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে বিদ‘আত সৃষ্টি করল এবং তাকে উত্তম আমল মনে করল, সে ধারণা করল যে, মুহাম্মাদ (ﷺ) রিসালাতে খিয়ানত করেছেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে (ইসলাম) পূর্ণাঙ্গ করলাম।’ (সূরা মায়েদাহ; ৫/৩)। সুতরাং, সে যুগে ( রাসূল (ﷺ) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগ) যা দ্বীন হিসাবে গণ্য ছিল না, বর্তমানেও তা দ্বীন হিসাবে পরিগণিত হবে না।’(আশরাফ ইব্রাহীম কাতকাত, আল-বুরহানুল মুবীন ফিত তাছাদ্দী লিল বিদ্ই ওয়াল আবাতীল; ১/৪২ পৃঃ)
.
(৫). তাবে-তাবেঈ বা অন্য বিদ্বানগণের ব্যক্তিগত কোন মতামত বা আমল উম্মতের জন্য অবশ্য পালনীয় নয়। কারন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন; আমার পরে তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে, তারা সত্বর বহু মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাতকে এবং সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদ্বীনের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরবে। তাকে কঠিনভাবে ধরবে এবং মাড়ির দাঁত সমূহ দিয়ে কামড়ে ধরে থাকবে। সাবধান! দ্বীনের মধ্যে নতুন সৃষ্টি হতে দূরে থাকবে। কেননা (দ্বীনের ব্যাপারে) যেকোন নতুন সৃষ্টি হল বিদ‘আত এবং প্রত্যেক বিদ‘আত হলো পথভ্রষ্টতা।’ (মুসনাদে আহমাদ, আবুদাঊদ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১৬৫)। ১৫ই শা‘বান উপলক্ষে রাসূল (ﷺ) এবং তাঁর সাহাবীদের কোন বিশেষ আমল বা ইবাদত নেই বিধায় এ রাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কোন শারঈ কারণ নেই।
.
(৬). রাসূল (ﷺ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছুর উদ্ভব ঘটাল, যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহীহ বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৪০)। তিনি আরো বলেন,রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি এমন আমল করল যাতে আমার কোন নির্দেশনা নেই, তা পরিত্যাজ্য।’ (সহীহ মুসলিম হা/১৭১৮)। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হামদ ও সালাতের পর বলেন, ‘নিশ্চয়ই শ্রেষ্ঠ বাণী হলো আল্লাহর কিতাব এবং শ্রেষ্ঠ হেদায়াত হলো মুহাম্মাদের হেদায়াত। আর নিকৃষ্টতম কাজ হলো দ্বীনের মধ্যে নতুন সৃষ্টি এবং প্রত্যেক নতুন সৃষ্টিই হলো ভ্রষ্টতা।’ (সহীহ মুসলিম, মিশকাত হা/১৪১)। আর নাসাঈতে রয়েছে, ‘প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণতি জাহান্নাম।’ (নাসাঈ হা/১৫৭৮)।অতএব ১৫ই শা‘বান উপলক্ষ্যে নির্দিষ্ট করে প্রচলিত সকল প্রকার ইবাদত ও অনুষ্ঠানাদি নিঃসন্দেহে বিদ‘আত। সুতরাং, আমাদের যে কোন ইবাদত করার ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর দলিলের সাহায্য নিয়ে ইবাদত করা উচিত।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
_____________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Share: