নির্দিষ্ট খাতে দান করা টাকা নির্দিষ্ট সেই খাতের পরিবর্তে নিজের ইচ্ছামত অন্য কাজে ব্যয় করা যাবে কি

প্রশ্ন: জৈনক ব্যক্তি হাদিয়া হিসেবে আমাকে কিছু টাকা একটি নির্দিষ্ট খাতে খরচ করার জন্য দিয়েছিলেন যেমন: (পড়াশোনা কিংবা চিকিৎসা জন্য) এখন প্রশ্ন হল এই টাকা আমি নির্দিষ্ট সেই খাতের পরিবর্তে নিজের ইচ্ছামত অন্য কাজে ব্যয় করতে পারবো?
▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: যদি কোন ব্যক্তি আপনাকে নির্দিষ্ট কাজের জন্যই এই অর্থ দিয়ে থাকে; যেমনটা আপনার প্রশ্ন থেকে বুঝা যাচ্ছে; তাহলে এ অর্থ অন্য কোন খাতে ব্যয় করা কিংবা অন্য কাউকে উপহার/হাদিয়া দেয়ার অধিকার আপনার নেই। এমনকি যদি অর্থদাতা আপনাকে এই অর্থ নির্দিষ্ট খাতে খরচ করার পর অতিরিক্ত অর্থ তাকে ফেরত দিতে বলেন তাহলে খরচের অতিরিক্ত অর্থ তাকে ফেরত দেওয়া আপনার উপর অনিবার্য।কিন্তু হাদিয়া দাতার পক্ষ থেকে যদি এই অর্থ আপনাকে উপহার, দান বা সদকা হিসেবে দেওয়া হয় এবং ব্যয় করার কোন খাত নির্ধারণ না করা হয় অথবা দৃশ্যমান সুনির্দিষ্ট কোন কারণে তাকে দেওয়া না হয়; তাহলে এর দাবী হলো: সে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে এটি ব্যয় করার অধিকার লাভ করেছে, সুতরাং তখন এই অর্থ আপনি আপনার ইচ্ছে অনুযায়ী বিভিন্ন খাতে খরচ করতে পারবেন,অন্যথায় নয়।কারন মহান আল্লাহ বলেন, یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَوۡفُوۡا بِالۡعُقُوۡدِ হে মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর।(সূরা মায়েদাহ,৫/১) অপর আয়াতে বলেন,وَ اَوۡفُوۡا بِالۡعَهۡدِ ۚ اِنَّ الۡعَهۡدَ کَانَ مَسۡـُٔوۡلًا এবং অঙ্গীকার পূর্ণ কর, নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।(সূরা বনি ইসরাইল:৩৪) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ الْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ মুসলিমরা নিজেদের (চুক্তিপত্রের) শর্তসমূহ পালন করতে বাধ্য।(আবু দাউদ হা /৩৫৯৪) সুতরাং শরীয়ত বিরোধী শর্ত না থাকলে যাবতীয় চুক্তির শর্ত পূরণ করা আবশ্যক।
.
শাইখ যাকারিয়া আনসারীর ‘আসনাল মাত্বালিব’ বইয়ে এসেছে:

“وَلَوْ أَعْطَاهُ دَرَاهِمَ وَقَالَ اشْتَرِ لَك بِهَا عِمَامَةً أَوْ اُدْخُلْ بِهَا الْحَمَّامَ أَوْ نَحْوَ ذَلِكَ: تَعَيَّنَتْ لِذَلِكَ، مُرَاعَاةً لِغَرَضِ الدَّافِعِ. هَذَا إنْ قَصَدَ سَتْرَ رَأْسِهِ بِالْعِمَامَةِ، وَتَنْظِيفَهُ بِدُخُولِهِ الْحَمَّامَ، لِمَا رَأَى بِهِ مِنْ كَشْفِ الرَّأْسِ، وَشَعَثِ الْبَدَنِ وَوَسَخِهِ. وَإِلَّا؛ أَيْ: وَإِنْ لَمْ يَقْصِدْ ذَلِكَ، بِأَنْ قَالَهُ عَلَى سَبِيلِ التَّبَسُّطِ الْمُعْتَادِ؛ فَلَا تَتَعَيَّنُ لِذَلِكَ، بَلْ يَمْلِكُهَا، أَوْ يَتَصَرَّفُ فِيهَا كَيْفَ شَاءَ”

“যদি তাকে কিছু দিরহাম দিয়ে বলে যে, তুমি তোমার জন্য একটা পাগড়ী কিনো কিংবা এটা দিয়ে হাম্মামে ঢুকো কিংবা অনুরূপ কিছু; তাহলে দাতার উদ্দেশ্যকে বিবেচনায় রেখে সেটি করা আবশ্যক।এটি সেক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে যদি দাতা তার মাথা খালি দেখে পাগড়ী দ্বারা মাথা ঢাকাকে উদ্দেশ্য করে থাকে এবং শরীর নোংরা ও ময়লা দেখে হাম্মামে প্রবেশ দ্বারা পরিচ্ছন্নতাকে উদ্দেশ্য করে থাকে। আর যদি এমন কিছুকে উদ্দেশ্য করে না থাকে; তথা স্বভাবগত আলাপচারিতা হিসেবে বলে থাকে; তাহলে সেটা আবশ্যক হবে না। বরঞ্চ ব্যক্তি নিজে সেটার মালিক হয়ে যাবে এবং যেভাবে ইচ্ছা সেটাকে সেভাবে ব্যয় করতে পারবে।(আসনাল মাত্বালিব খন্ড: ২ পৃষ্ঠা: ৪৭৯)
.
শাইখ সুলাইমান ইবনে উমর আল-জামাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:

” لَوْ دَفَعَ لَهُ تَمْرًا لِيُفْطِرَ عَلَيْهِ : تَعَيَّنَ لَهُ عَلَى مَا يَظْهَرُ ، فَلَا يَجُوزُ اسْتِعْمَالُهُ فِي غَيْرِهِ ؛ نَظَرًا لِغَرَضِ الدَّافِعِ ”

“ব্যক্তিকে যদি ইফতার করার জন্য খেজুর প্রদান করা হয়; অগ্রগণ্য মতানুযায়ী তার জন্য সেটা করাই নির্ধারিত হয়ে যাবে। অন্য কিছুতে সে খেজুর ব্যবহার করা জায়েয হবে না। দাতার উদ্দেশ্য রক্ষার্থে।[হাশিয়াতুল জামাল আলা শারহিল মানহাজ: খন্ড: ২ পৃষ্ঠা: ৩২৮)
.
দারদীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:

” (وإن أعانه جماعة) ، أو واحد ، فأدى [أي العبد المكاتب ما عليه] ، وفَضَلَتْ فضلةٌ ، أو عجز : (فإن لم يقصدوا) بما أعانوه به (الصدقة) ، بأن قصدوا فك الرقبة، أو لا قصد لهم : (رجعوا بالفضلة) على العبد ، (و) رجعوا (على السيد بما قبضه) من مالهم ، (إن عجز) ؛ لعدم حصول غرضهم . (وإلا) ؛ بأن قصدوا الصدقة على المكاتب : (فلا) رجوع لهم بالفضلة ، ولا بما قبضه السيد إن عجز ؛ لأن القصد بالصدقة ذاتُ العبد ، وقد ملكها بحَوْزِها”

“যদি একদল লোক বা এক ব্যক্তি কোন মুকাতিব দাসকে সাহায্য করে। সে দাস এ সাহায্য দিয়ে নিজের ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম হয় এবং এর থেকে কিছু অতিরিক্ত থেকে যায় কিংবা সে ঋন পরিশোধ করতে অক্ষম হয়; তাহলে তারা যদি এ সাহায্য দ্বারা সদকা করার উদ্দেশ্য না করে দাসমুক্তির উদ্দেশ্য করে থাকে কিংবা তাদের কোনো উদ্দেশ্য না থাকে; তাহলে তারা অতিরিক্ত সম্পদ দাসের কাছ থেকে ফেরত নিবেন। আর যদি দাস ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম হয় তাহলে তাদের যে সম্পদ দাসের মনিব হস্তগত করেছে সেটা তারা তার থেকে ফেরত নিবেন; কেননা তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হয়নি। অন্যথায় অর্থাৎ তারা যদি মুকাতাব দাসকে এ সাহায্য সদকা হিসেবে করে থাকেন তাহলে তারা অতিরিক্ত সম্পদ দাসের কাছে ফেরত চাইতে পারবে না এবং দাস ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম হলে তাদের যে সম্পদ দাসের মনিব হস্তগত করেছে সেটা তারা তার কাছে ফেরত চাইতে পারবে না। কেননা এক্ষেত্রে দানের উদ্দিষ্ট হল দাসের আপন সত্ত্বা। আর হস্তগত করার মাধ্যমে সে ওটার মালিক হয়ে গিয়েছে।”(দারদীরের ‘আশ-শারহুল কাবীর: খন্ড: ৪ পৃষ্ঠা: ৪০৪)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেন:

” والقاعدة عندنا في هذا: أن من أخذ من الناس أموالا لشيء معين، فإنه لا يصرفها في غيره إلا بعد استئذانهم ”

আমাদের দৃষ্টিতে এ বিষয়ে মূল নীতি হল যে, যে ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে বা কারণে লোকদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করে, তার অনুমতি নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যয় করা উচিত নয়।(উসাইমীন-আল-লিক্বাউশ শাহরী লিকা নং-৯)
.
পরিশেষে,প্রিয় পাঠক! উপরক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে, কেউ নিদিষ্ট কোন উদ্দেশ্যে কাউকে কিছু উপহার কিংবা দান হিসেবে দিলে কিংবা কারো কাছ থেকে নিদিষ্ট কোন উদ্দেশ্য পূরণের জন্য কিছু চেয়ে নিলে সেই অর্থ উক্ত প্রয়োজনীয় খাতেই খরচ করতে হবে ভিন্ন খাতে নয়,তবে দাতা কোন শর্ত কিংবা কোন উদ্দেশ্য ছাড়া কিছু দান কিংবা উপহার দিলে সেটা ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী যে কোন খাতেই খরচ করতে পারবে। আরো বিস্তারিত জানতে দেখুন।(ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-২৬৩৯৬৯) (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
_______________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Share On Social Media