তাহিয়্যাতুল মসজিদ সালাত সম্পর্কে বিস্তারিত

প্রশ্ন: যেকোন সময় অবস্থানের নিয়তে মাসজিদে প্রবেশ করার পরই না বসে দুই রাকাত ‘তাহিয়্যাতুল মাসজিদ’’ সালাত পড়তে হয়। এ সম্পর্কে মাসয়ালাসহ জানতে চাই।
▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: অবস্থানের নিয়তে মসজিদে প্রবেশ করলে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করা কারো মতে ওয়াজিব, কারো সুন্নাতে মুয়াক্বাদাহ। তবে বিশুদ্ধ মত হল এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। সুতরাং মসজিদে প্রবেশের পর আদব হ’ল, দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করে বসা। এই হুকুম নারী-পুরুষ সবার জন্য সমান। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, إذا دخل أحدُكم المسجِدَ، فلا يجلِسْ حتى يركَعَ ركعتينِ. ‘তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে সে যেন দু’ রাক‘আত সালাত আদায় না করা পর্যন্ত না বসে’। [ইবনু মাজাহ হা/১০১২; সহীহ ইবনে হিববান হা/২৪৯৫ হাদীসটি সহীহ]।
.
আবূ ক্বাতাদাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمُ الْمَسْجِدَ فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ قَبْلَ أَنْ يَجْلِسَ ‘তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে সে যেন বসার আগে দু‘রাক‘আত সালাত আদায় করে নেয়’। [সহীহ বুখারী হা/৪৪৪; মুসলিম হা/৭১৪; মিশকাত হা/৭০৪]।
.
এমনকি জুম‘আর দিনে খুৎবা অবস্থায় যদি কেউ মসজিদে প্রবেশ করে তবুও তাকে দুই রাক‘আত সালাত আদায় করে বসতে হবে।জাবের (রাঃ) বলেন, ‘নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জুম‘আর দিনে খুৎবা দিচ্ছিলেন এমতাবস্থায় জনৈক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করে। তখন রাসূল (ছাঃ) তাকে বললেন, তুমি কি ছালাত আদায় করেছ? সে বলল, না। তখন তিনি বললেন, তুমি দাঁড়াও দুই রাক‘আত ছালাত আদায় কর’। [সহীহ বুখারী হা/৯৩০ ও ৯৩১, ১/১২৭ পৃঃ, (ইফাবা হা/৮৮৩ ও ৮৮৪, ২/১৯০ ও ১৯১ পৃঃ), ‘জুম‘আর ছালাত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩২; সহীহ মুসলিম হা/২০৫৫ ও ২০৫৬, ১/২৮৭ পৃঃ, ‘জুম‘আ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৫]।
.
তবে কেউ যদি মসজিদে বসার পূর্বে সেখান থেকে বেরিয়ে যায় তাহ’লে তার উপর থেকে উক্ত দু’ রাক‘আত সালাত রহিত হয়ে যায়। তাছাড়া নির্মাণ, মেরামত বা পরিচ্ছন্নতার কাজে প্রবেশ করলে এটি আদায় করা জরুরী নয়। [ইমাম নববী, আল-মাজমূ‘ ৩/৫৪৪; ফাৎহুল বারী ১/৫৩৮-৩৯; ফাতাওয়া লাজনা দায়েমাহ ৬/১৩৭; উছায়মীন, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১৪/৩৫৪]।
.
উল্লেখ্য যে, মসজিদের ভিতর দিয়ে যাতায়াত করবে অথচ দুই রাকাত সালাত আদায় করবে না এটি কেয়ামতের একটি ছোট আলামত। হাদীসে এসেছে ক্বিয়ামতের পূর্বে এমন অবস্থা হবে যে বড় বড় মসজিদ নির্মাণ করা হবে এবং লোকেরা এর ভিতর দিয়ে অন্যত্র যাতায়াত করবে। অথচ মসজিদকে রাস্তা হিসাবে ব্যবহার করা ইসলামী শরী‘আতে নিষেধ। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,
لَا تَتَّخِذُوا الْمَسَاجِدَ طُرُقًا، إِلَّا لِذِكْرٍ أَوْ صَلَاةٍ،
‘তোমরা মসজিদকে সালাত আদায় ও যিকির-আযকার ব্যতীত রাস্তা হিসাবে গ্রহণ করবে না’। [মু‘জামুল আওসাত্ব হা/৩১; সিলসিলা সহীহাহ হা/১০০১; সহীহুল জামে‘ হা/৭২১৫ হাদীসটি সহীহ]।
.
মসজিদকে রাস্তা হিসাবে ব্যবহার করা ক্বিয়ামতের আলামত। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,مِنِ اقْتِرَابِ السَّاعَةِ أَنْ يُرَى الْهِلَالُ قُبُلًا، فَيُقَالُ: لِلَيْلَتَيْنِ، وَأَنْ تُتَّخَذَ الْمَسَاجِدُ طُرُقًا، وَأَنْ يَظْهَرَ مَوْتُ الْفُجَاءَةِ- ‘ক্বিয়ামতের আলামত হ’ল নতুন চাঁদ বড় আকারে দেখা যাবে। তখন বলা হবে এটি দু’দিনের চাঁদ। আর মসজিদসমূহকে রাস্তা হিসাবে ব্যবহার করা হবে এবং আকস্মিক মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাবে’। [মু‘জামুল আওসাত্ব হা/৯৩৭৬; মু‘জামুল কাবীর হা/৯৪৯৭; সহীহুল জামে‘ হা/৫৮৯৯; সিলসিলা সহীহাহ হা/২২৯২ হাদীসটি সহীহ]।
.
তিনি আরো বলেন,إِنَّ مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ أَنْ يَمُرَّ الرَّجُلُ فِي طُولِ الْمَسْجِدِ، وَعِرْضِهِ لَا يُصَلِّي فِيهِ رَكْعَتَيْنِ- ‘ক্বিয়ামতের অন্যতম আলামত হ’ল লোকেরা দৈর্ঘ্য-প্রস্থে বড় মসজিদের ভিতর দিয়ে অতিক্রম করবে অথচ তাতে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করবে না’। [সহীহ ইবনু খুযায়মা হা/১৩২৬;সিলসিলা সহীহাহ হা/৬৪৯; সহীহুল জামে‘ হা/৫৮৯৬ হদীসটি সহীহ]।
.
তবে একান্ত প্রয়োজনে মসজিদের ভিতর দিয়ে অতিক্রম করা যাবে। [ফাৎহুল বারী ১/৫৪৭]।

◾তাহিয়্যাতুল মাসজিদ সম্পর্কে জরুরি কিছু বিষয়:
▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬
➤(১) মাসজিদে প্রবেশের পরপর না বসে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়তে হয়। এর নাম তাহিয়্যাতুল মাসজিদ। এটি মাসজিদের অধিকার এবং মাসজিদে আগন্তুকের পক্ষ থেকে মসজিদের প্রতি সৌজন্যবোধ।
.
➤(২) তাহিয়্যাতুল মাসজিদ নামাজ বিশুদ্ধ মতে যেহেতু ফরজ বা ওয়াজিব নয়, বরং সুন্নতে মুয়াক্কাদা অর্থাৎ নফল। তবে, এ ব্যাপারে হাদিসে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তাই, এই নামাজ পড়া উচিত। মাসজিদে এসে কোনো কারণ ছাড়া এই নামাজ না পড়ে বসে পড়াকে আলিমগণ মাকরুহ (অপছন্দনীয়) মনে করতেন। [নববি, শারহু মুসলিম: ৩/৩৪]।
.
➤(৩) তাহিয়্যাতুল মাসজিদ আদায়ের বিশেষ কোনো নিয়ম নেই, বরং সাধারণ নফল বা সুন্নাতের মতো দুই রাকাত নামাজ পড়বেন।
.
➤(৪) যদি মাসজিদে ঢুকে দেখেন, জামাত শুরু হয়ে গেছে, তাহলে জামাতে শামিল হবেন। আর যদি দেখেন, পর্যাপ্ত সময় আছে, তাহলে না বসে প্রথমে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মাসজিদ আদায় করবেন। এরপর যদি সুন্নাত থাকে, তবে সুন্নাত আদায় করবেন। সুন্নাত পড়ার সময় আছে, কিন্তু সুন্নাত+তাহিয়্যাতুল মাসজিদ পড়ার সময় নেই, তখন শুধু সুন্নাত পড়বেন। তাহলে তাহিয়্যাতুল মাসজিদও আদায় হয়ে যাবে।[মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যাহ্‌ ১৫/৬৭, লিকাউবাবিল মাফতূহ্‌, ইবনে উসাইমীন (রহঃ) ৫৩/৬৯] যেমন হারামের মসজিদে প্রবেশ করে (বিশেষ করে মুহ্‌রিমের জন্য) ‘তাহিয়্যাতুল মাসজিদ’ হল তওয়াফ; ২ রাকআত সুন্নত নয়।[মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যাহ্‌ ৬/২৬৪-২৬৫]।
.
➤(৫) আজান চলা অবস্থায় মাসজিদে প্রবেশ করলে না বসে দাঁড়ানো অবস্থায় প্রথমে আজানের জবাব দেবেন, এরপর তাহিয়্যাতুল মাসজিদ আদায় করবেন। [ইবনু রজব, ফাতহুল বারি: ৪/২১০]।
.
➤(৬) সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত ও ঠিক দুপুরে যেহেতু নামাজ আদায় করা জায়েয নেই, আমভাবে ‘নামাজ’ না পড়ার জন্য হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে। [সহিহ মুসলিম: ১৯৬৬] কিন্তু এই সময়গুলোতে ও মাসজিদে প্রবেশ করলে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মাসজিদ পড়তে হয়।কেননা মাসজিদে ঢুকে দুই রাকাত না পড়ে না বসার জন্য বলা হয়েছে হাদিসে। [সহিহ মুসলিম: ৭১৪]। তাই, যেকোনো সময়ে মাসজিদে প্রবেশ করলেই এই নামাজ পড়া যাবে। অর্থাৎ,অনেক ওলামাদের মতে তাহিয়্যাতুল মাসজিদের হুকুম ভিন্ন।
.
➤(৭) জুমু‘আর দিনে খুতবা চলাকালে মাসজিদে প্রবেশ করলে কী করণীয়, তা নিয়ে মতানৈক্য আছে।একদল আলিমের মত হলো, এমতাবস্থায় বসে যাবে এবং খুতবা শুনবে; কারণ খুতবা শুনা ওয়াজিব। তবে, আলিমগণের একাংশের মতে, প্রথমে দ্রুত দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মাসজিদ আদায় করে নেবে, এরপর খুতবা শুনবে। দুই পক্ষেই হাদিসের বিভিন্ন দলিল রয়েছে। তাই পড়াই উত্তম।
.
➤(৮) ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়ে যাওয়ার পরও যদি কেউ মাসজিদে ঢুকে, তাহলে প্রথমে তাহিয়্যাতুল মাসজিদ আদায় করবে, এমনটি বলেছেন আলিমগণের একাংশ। তবে, অধিকাংশ আলিমের মত হলো, ফজর শুরু হয়ে গেলে ফজরের নামাজ ব্যতীত অন্য কোনো নামাজ নেই। তাই এ সময় মাসজিদে গেলে তাহিয়্যাতুল মাসজিদ পড়বেন না। হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর ফজরের দুই রাকাত সুন্নাত ছাড়া অন্য কোন নামাজ পড়তেন না [এরপর দুই রাকাত ফরজ পড়তেন]। [মুসলিম, আস-সহিহ: ১৭১১]।
আল্লাহ তৌফিক দান করুন। আমীন। আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী।
▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Share On Social Media