কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

তাহাজ্জুদ সালাতের ফযীলত

আজ আমরা তাহাজ্জুদের মত ফযীলতপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ কতিপয় আমল সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: উম্মতে মুহাম্মাদীর বয়স ষাট থেকে সত্তর বছর। এর থেকে অধিক বয়স কম লোকেরই হয়। (তিরমিযী হা/৩৫৫০; ইবনু মাজাহ হা/৪২৩৬; সহীহুল জামে‘ হা/৪০৯৪) তাই অল্প সময়ে অধিক নেকী উপার্জনের জন্য মহান আল্লাহ জান্নাত প্রত্যাশী প্রতিটি মানুষের জন্য খুশির সংবাদ দিয়েছেন। আর তা হল ইসলামী শরী‘আতে আল্লাহ এমন কতিপয় আমল বিধিবদ্ধ করেছেন, যা তাহাজ্জুদ সালাতের মতো মর্যাদাপূর্ণ। যাতে করে দুর্বল ঈমানদারগণ সহজে সেই আমলগুলো সম্পাদন করে তাহাজ্জুদের নেকী লাভ করতে পারে এবং নিজের আমলের যিন্দেগীতে বরকত লাভ করতে পারে। এক্ষণে তাহাজ্জুদের মত ফযীলতপূর্ণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আমলের বর্ণনা পেশ করা হলো। যেমন:

(১) এশা ও ফজর সালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করা: কোন ব্যক্তি যদি এশা ও ফজরের সালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করে তাহলে তার আমলনামায় সারা রাত নফল সালাত আদায়ের নেকী লিখা হবে। [মুসলিম হা/৬৫৬; আবূদাঊদ হা/৫৫৫; শব্দাবলী তার। তিরমিযী হা/২২১; মিশকাত হা/৬৩০]
.
(২) যোহরের পূর্বে চার রাক‘আত সালাত আদায় করা: তাহাজ্জুদের মত ফযীলতপূর্ণ আরেকটি সালাত হলো যোহরের ফরয সালাতের পূর্বের চার রাক‘আত সুন্নাত সালাত আদায় করা। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেন,
যোহরের পূর্বের চার রাক‘আত সালাত শেষ রাতের (তাহাজ্জুদ) সালাতের মত মর্যাদাপূর্ণ।’ [মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/৫৯৪০; সিলসিলা সহীহাহ হা/১৪১৩; সনদ হাসান]
.
(৩) ইমামের সাথে সম্পূর্ণ তারাবীহর সালাত আদায় করা: রামাযান মাসের তারাবীহর সালাত রাতের সালাতের অন্তর্ভুক্ত। তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ একই সালাত। কিন্তু সময়ের ভিন্নতার কারণে নাম পৃথক। কোন তাহাজ্জুদগুযার ব্যক্তি রামাযানে তারাবীহ সালাত আদায় করলে, তাকে আর তাহাজ্জুদ আদায় করতে হয় না। তারাবীহর সালাত একাকী আদায় করার চেয়ে জামা‘আতে আদায় করাই উত্তম। কেউ যদি ইমামের সাথে তারাবীহর সালাত আদায় করে, তাহলে সে সারা রাত নফল সালাত (তাহাজ্জুদ) আদায়ের নেকী পাবে। [আবু দাঊদ হা/১৩৭৫; তিরমিযী হা/৮০৬; মিশকাত হা/১২৯৮; সনদ সহীহ।]
.
(৪) রাতের বেলা একশত আয়াত কুরআন তেলাওয়াত করা: যারা রাতের বেলা পবিত্র কুরআন থেকে ১০০ আয়াত তিলাওয়াত করে, তাদের আমলনামায় সারা রাত তাহাজ্জুদ আদায়ের নেকী লিপিবদ্ধ করা হয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি রাতের বেলা একশত আয়াত তেলাওয়াত করবে, তার জন্য পুরো রাতটাই ইবাদত করা হিসাবে গণ্য হবে।’ [মুসনাদে আহমাদ হা/১৬৯৫৮; সুনানে দারেমী হা/৩৪৯৩; সহীহুল জামে‘ হ/৬৪৬৮; সনদ সহীহ্। মুসলিম হা/৭৪৭; আবু দাঊদ হা/১৩১৩; তিরমিযী হা/৫৮১; মিশকাত হা/১২৪৭]
.
(৫) রাতে সূরা বাক্বারাহর শেষ দুই আয়াত তেলাওয়াত করা: রাতে সূরা বাক্বারাহর শেষ দুই আয়াত তেলাওয়াতের মাধ্যমে ক্বিয়ামুল লায়ল বা তাহাজ্জুদের নেকী পাওয়া যায়। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রাত্রিকালে সূরা বাক্বারাহর শেষের দু্ই আয়াত তেলাওয়াত করবে, তার জন্য তা যথেষ্ট হয়ে যাবে।’ [বুখারী হা/৫০০৯; মুসলিম হা/৮০৭; শরহে নববী আলা মুসলিম ৬/৯১-৯২ ফাৎহুল বারী ৯/৫৬, ১০০৯ নং হাদীস দ্রষ্টব্য]
.
(৬) উত্তম চরিত্র: সচ্চরিত্রবান ব্যক্তিরা তাদের সদাচরণের মাধ্যমে তাহাজ্জুদ সালাত আদায়কারীর মর্যাদা লাভ করতে পারে। রাসূল (ﷺ) বলেন, নিশ্চয়ই মুমিন বান্দা তার উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে রাতের ক্বিয়ামকারী এবং দিনের সিয়াম পালনকারীর মর্যাদা লাভ করে থাকে।’ [আবু দাঊদ হা/৪৭৯৮; মিশকাত হা/৫০৮২; সনদ সহীহ, তিরমিযী হা/২০০৩; আবু দাঊদ হা/৪৭৯৯; সনদ সহীহ। তিরমিযী হা/২০১৮; সহীহ আত-তারগীব হা/২৬৪৯; সনদ সহীহ।]
.
(৭) মিসকীন ও বিধবা মহিলাদের সহযোগিতা করা: সহায়-সম্বলহীন মিসকীন ও স্বামীহারা বিধবা মহিলারদেরকে সহযোগিতার মাধ্যমে একজন মুসলিম সিয়াম পালনকারী, তাহাজ্জুদগুযার অথবা আল্লাহর পথের মুজাহিদের মর্যাদা লাভ করতে পারে। [তিরমিযী হা/১৯৬৯; নাসাঈ হা/২৫৭৭; ইবনু মাজাহ হা/২১৪০; সনদ সহীহ তাবারাণী, মু‘জামুল আওসাত্ব হা/৬০২৬; সহীহুল জামে‘ হা/১৭৬; সিলসিলা সহীহাহ হা/৯০৬; সনদ হাসান। জামে‘উল ‘উলুম ওয়াল হিকাম, ২/২৯৫।]
.
(৮) জুম‘আর দিনের কতিপয় আদব রক্ষা করা: জুম‘আর দিন মুসলমানদের সাপ্তাহিক ঈদের দিন। জুম‘আর দিনে করণীয় আমলের ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদের যে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। তন্মধ্যে পাঁচটি আমল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যথা: (১) যে ব্যক্তি জুম‘আর দিন অন্যকে গোসল করাল এবং নিজে গোসল করল। (২) (মসজিদে) আগে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দিল এবং নিজেও আগেভাগে মসজিদে গেল। (৩) পায়ে হেঁটে গেল এবং কোন কিছুতে (যানবাহনে) আরোহন করল না। (৪) অতঃপর ইমামের নিকটবর্তী হয়ে মনোযোগ সহকারে খুৎবা শ্রবণ করল এবং (৫) কোন অনর্থক কাজ করল না। তাহলে তার জন্য প্রতি কদমে এক বছরের (নফল) সিয়াম ও (রাত্রিকালীন) ক্বিয়ামের নেকী রয়েছে।’ [আবু দাউদ হা/৩৪৫; তিরমিযী হা/৪৯৬; ইবনু মাজাহ হা/১০৮৭; সহীহুল জামে‘ হা/৬৪০৫; সনদ সহীহ]
.
(৯) আল্লাহর রাস্তায় পাহারা দেওয়া: আল্লাহর পথে পাহারা দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যে ইবাদত সম্পাদনের মাধ্যমে বান্দা অশেষ নেকী হাসিল করার পাশাপাশি তাহাজ্জুদ সালাত আদায়ের নেকী পায়। [বুখারী হা/২৮৯২; মুসলিম হা/১৯১৩]
.
(১০) রাতে তাহাজ্জুদের নিয়তে ঘুমিয়ে পড়া: যারা তাহাজ্জুদের নিয়তে রাতে ঘুমিয়ে পড়ে তারা তাদের নিয়তের কারণে তাহাজ্জুদের নেকী পাবেন। [নাসাঈ হা/১৭৪৭; ইবনু মাজাহ হা/১৩৪৪; ছহীহুল জামে‘ হা/৫৯৪১, সনদ হাসান]
.
(১১) বেশী বেশী যিকির করা: অক্ষম ব্যক্তিরা যিকিরের মাধ্যমে তাহাজ্জুদের নেকী ও মর্যাদা লাভ করতে পারে। যিকির হলো অন্তরের খাদ্য। যিনি যত বেশী আল্লাহকে স্মরণ করেন, তার অন্তর তত প্রশান্ত থাকে [সূরা রা‘দ ১৩/২৮ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে যতগুলো যিকিরের ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন, তন্মধ্যে অন্যতম হলো ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী’। [তাবারাণী কাবীর হা/৭৮৭৭; সহীহ তারগীব হা/১৪৯৬; সনদ সহীহ। বুখারী হা/ ৬৪০৫; মিশকাত হা/২২৯৬; তিরমিযী হা/৩৩৭৭; ইবনু মাজাহ হা/৩৭৯০; মুস্তাদরাক হাকেম হা/১৮২৫; সনদ সহীহ।]
.
(১২) অপরকে তাহাজ্জুদের মত ফযীলতপূর্ণ আমল শিক্ষা দেওয়া: কোন আমলের ডবল নেকী পাওয়ার অন্যতম উপায় হলো, অপরকে সেই আমল শিক্ষা দানের মাধ্যমে তাকে অনুপ্রাণিত করা। কোন বান্দার অনুপ্রেরণায় ও দাওয়াতের মাধ্যমে যদি অপর কোন বান্দা ক্বিয়ামুল লায়ল বা তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হয়, দাওয়াত প্রদানকারীর আমলনামায় সেই সালাতুল লায়ল আদায়কারী ব্যক্তির সমান নেকী লিখে দেওয়া হবে। [মুসলিম হা/১৮৯৩ ও ৬৭৯৭]
.
পরিশেষে বলা যায়, তাহাজ্জুদ একটি নফল ইবাদত, যা মানুষের হৃদয় জগতকে পরিশুদ্ধ রাখে ও তার রবের নিকটবর্তী করে। মৃত্যুর পর মানুষের প্রকৃত বন্ধু হবে তার সৎ আমল। আখেরাতের কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য এটাই তার মূল পাথেয়। দুনিয়ার ঘরকে সাজানোর জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা কত শ্রম ও অর্থ ব্যয় করি। কিন্তু কবরের সাড়ে তিন হাত ঘরকে সাজানোর জন্য আমরা কতটুকু পরিশ্রম করেছি? তাই আসুন! পাপ থেকে তওবাহ করে যাবতীয় নেক আমল সম্পাদনের মাধ্যমে আখেরাতের জন্য উত্তম প্রস্ত্ততি গ্রহণ করি। মহান আল্লাহ আমাদের সেই তাওফীক্ব দান করুন। আমীন! আল্লাহু আলাম।
____________________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।