জাতিগত বৈষম্য সম্পর্কে ইসলাম কি বলে

পৃথিবীর সকল মানুষ যেমন মুমিন ও কাফির, ইহুদী-খ্রিষ্টান, আরব ও অনারব, ধনী-গরীব, সম্ভ্রান্ত ও নিচু সকলেই এক পুরুষ ও এক নারীর বংশধর। ইসলাম বর্ণ, গোত্র বা বংশের পার্থক্যকে গুরুত্ব দেয় না। সমস্ত মানুষ আদম (আলাইহিস সালাম) থেকে এসেছে এবং আদম (আলাইহিস সালাম)-কে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ইসলামে মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা হয় ইমান এবং তাকওয়ার উপর ভিত্তি করে। শরী’আতের পরিভাষায় তাকওয়া অর্থ হলো- আল্লাহ্‌ তা’আলার ভয়ে নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ হতে দূরে থেকে ইসলাম নির্ধারিত পথে চলার আপ্রাণ চেষ্টা করা অথবা আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তা পালন করা এবং আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা পরিহার করে। এই মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন; হে মানবজাতি! আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, আর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অন্যের সাথে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই বেশী মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে বেশী তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত। (সূরা হুজুরাত: ৪৯/১৩)
.
উক্ত আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, পৃথিবীতে যত মানুষ এসেছে তা এক পিতা ও এক মাতা তথা আদম ও হাওয়া (আলাইহিস সালাম) থেকে এসেছে। পৃথিবীর সকল মানুষ এক ঔরসজাত ও বংশোদ্ভূত। আর মানুষকে বিভিন্ন জাতি, বর্ণ, গোত্রে বিভক্ত করা হয়েছে পারস্পরিক পরিচিতির জন্য। তা ব্যতীত মানুষের জন্মগতভাবে উঁচু-নিচু, ছোট-বড়, ধনী-গরীব, সাদা-কালো, রাজা-প্রজা ভাবার কোন অবকাশ নেই। এর পরেও সুদূর অতীত এবং জাহেলী যুগে মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে বিশেষ করে কুরায়েশ ও অন্যান্য জাতির মধ্যে যখন বংশগৌরব, অহংকার বোধ, ভেদাভেদ ও পার্থক্য দেখা দিল, তখন আল্লাহ তা‘আলা মানবাধিকারের শ্রেষ্ঠ রূপকার মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন; ‘হে কুরাইশ বংশের লোকেরা! আল্লাহ তোমাদের জাহিলী যুগের অহংকার-গৌরব ও পূর্ব বংশীয় শ্রেষ্ঠত্ব বোধকে সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে দিয়েছেন।’ (যাদুল মা‘আদ ৩/৩৫৯; আল-বিদায়াহ ৪/৩০১; ইবনে হিশাম ২/৪১২)। মক্কা বিজয়ের সময় কা’বার তাওয়াফের পর তিনি যে বক্তৃতা করেছিলেন তাতে বলেছিলেন; “সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি তোমাদের থেকে জাহেলিয়াতের দোষ-ত্রুটি ও অহংকার দূর করে দিয়েছেন। হে লোকেরা! সমস্ত মানুষ দু’ ভাগে বিভক্ত। এক. নেককার ও পরহেজগার যারা আল্লাহর দৃষ্টিতে মর্যাদার অধিকারী। দুই. পাপী ও দুরাচার যারা আল্লাহর দৃষ্টিতে নিকৃষ্ট। অন্যথায় সমস্ত মানুষই আদমের সন্তান। আর আদম মাটির সৃষ্টি।” (তিরমিযী: হা/৩১৯৩)। এখানে রাসূল (ﷺ)-এর আগমনের পূর্বে আরবে এবং সারা বিশ্বে মানুষের মধ্যে যে শ্রেণীবৈষম্য, জাতিভেদ ও দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার-নির্যাতন বিদ্যমান ছিল; তা চুরমার করে দেয়া হয়েছে। মানুষে মানুষে যে কোন বিভেদ ও একে অপরের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পৃথিবীতে অতীতের নমরূদ, ফেরাঊনের ন্যায় অত্যাচারী শাসকদের মত আজও যারা শক্তিমত্তার যে দাবী করে থাকে তার কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই বলে প্রতীয়মান হয়।
.
অধিকার ও কর্তব্যের ক্ষেত্রে ইসলাম সকল মানুষকে সমান বলে মনে করে। অর্থাৎ শরীয়তের কাছে মানুষ সমান, যেমন আল্লাহ বলেছেন: যে ব্যক্তি সৎকাজ করবে- সে পুরুষ হোক বা মহিলা, অবশ্যই আমরা তাকে পবিত্র জীবন দান করব। আর অবশ্যই আমরা তাদেরকে তারা যা করত তার তুলনায় শ্রেষ্ঠ প্রতিদান দেব। (আন-নাহল: ১৬/৯৭)। ঈমান, সত্যবাদিতা এবং তাকওয়া সবই জান্নাতে নিয়ে যায়। যা এই গুণাবলী অর্জনকারীর অধিকার, যদিও সে ব্যক্তি দুর্বলতম বা নিম্নতম মানুষের একজন হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন; “আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করে তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে বের করে আনার জন্য। আর যে কেউ আল্লাহর উপর ঈমান আনবে এবং সৎকাজ করবে তিনি তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ্‌ তো তাকে উত্তম রিযিক দেবেন।”(সূরা আত-তালাক; ৬৫/১১)। অপরদিকে কুফর, অহংকার এবং অত্যাচার সবই জাহান্নামে নিয়ে যায়। এমনকি যে এই কাজগুলো করে সে যদি সবচেয়ে ধনী বা সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিও হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন; আর যারা কুফরী করবে এবং আমার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করবে, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী; সেখানে তারা স্থায়ী হবে। কত মন্দ ঐ প্রত্যাবর্তনস্থল! (সূরা আত-তাগাবুন: ৬৪/১০)
.
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপদেষ্টাদের মধ্যে সকল গোত্র ও বর্ণের মুসলিম পুরুষদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাদের অন্তর তাওহীদে পূর্ণ ছিল এবং তাদের ঈমান ও তাকওয়া দ্বারা একত্রিত হয়েছিল যেমন কুরাইশ থেকে আবু বকর, বনী হাশিম থেকে আলী ইবনে আবি তালিব, ইথিওপিয়ান থেকে বিলাল, রোমান থেকে সুহায়ব, পারস্য থেকে সালমান, উসমান ইবনে আফফানের মতো ধনী ব্যক্তিরা। এবং ‘আম্মার’-এর মতো দরিদ্র ও গরিব মানুষ এবং আহলে সুফফাহ-এর মতো দরিদ্র মানুষ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)। বংশমর্যাদা আর জাতিভিমানের সেই যুগে তিনিই প্রথম শান্তি আর সাম্য প্রতিষ্ঠায় এই মহান বাণী প্রচার করেন যে, “তাকওয়া (আল্লাহ ভীরুতা) ছাড়া অন্য কোন কারণে অনারবদের উপর আরবদের কোন মর্যাদা নাই। সাদা কালোর প্রতি এবং কালো সাদার প্রতি বৈষম্য ছোট বা বড় নয়। তাই তো তিনি হাবশি গোলাম বেলাল (রা.)-কে পৃথিবীর প্রথম মুয়াজ্জিন এর মর্যাদা দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। উপঢৌকন পাওয়া ক্রীতদাস যায়দ বন হারিসকে কেবল আজাদই করেছিলেন তা নয়, নিজের ফুপাতো বোন জয়নাবের সাথে তার বিয়ে দিয়ে পরিবারের একজন করে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিলেন এবং তাঁর সন্তুষ্টির জন্য সংগ্রাম করেছিলেন, যতক্ষণ না আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন। তারাই ছিল প্রকৃত ঈমানদার। মহান আল্লাহ বলেন; তাদের প্রতিপালকের নিকট আছে তাদের পুরস্কার স্থায়ী জান্নাত; যার নিম্নদেশে নদীমালা প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট, এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট; এ (প্রতিদান) তার জন্য, যে তার প্রতিপালককে ভয় করে। (আল-বাইয়্যিনাহ: ৯৮/৮)
.
বিদায় হজ্জের সময় আইয়ামে তাশরীকের মাঝামাঝি সময়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বক্তৃতা করেছিলেন। তাতে তিনি বলেছিলেন, “হে লোকজন! সাবধান তোমাদের আল্লাহ একজন। কোন অনারবের ওপর কোন আরবের ও কোন আরবের ওপর কোন অনারবের, কোন কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের ও কোন শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণঙ্গের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই আল্লাহভীতি ছাড়া। তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশী আল্লাহভীরু সেই আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদাবান। আমি কি তোমাদেরকে পৌঁছিয়েছি? তারা বলল, আল্লাহর রাসূল পৌঁছিয়েছেন। তিনি বললেন, তাহলে যারা এখানে উপস্থিত আছে তারা যেন অনুপস্থিত লোকদের কাছে এ বাণী পৌছিয়ে দেয়।” (মুসনাদে আহমাদ: ৫/৪১১)। অন্য হাদীসে এসেছে, “তোমরা সবাই আদমের সন্তান। আর আদমকে মাটি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছিল। লোকজন তাদের বাপদাদার নাম নিয়ে গর্ব করা থেকে বিরত হোক। তা না হলে আল্লাহর দৃষ্টিতে তারা নাক দিয়ে পায়খানা ঠেলে এমন নগণ্য কীট থেকেও নীচ বলে গণ্য হবে।” (মুসনাদে বাযযার: ৩৫৮৪)। আর একটি হাদীসে তিনি বলেছেন; “আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন তোমাদের বংশ ও আভিজাত্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন না। তোমাদের মধ্যে যে বেশী আল্লাহভীরু সে-ই আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী। (ইবনে জারীর: ৩১৭৭২)। আরো একটি হাদীসের ভাষা হচ্ছে; “আল্লাহ তা’আলা তোমাদের চেহারা-আকৃতি ও সম্পদ দেখেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও কাজ-কর্ম দেখেন।” (মুসলিম: ২৫৬৪, ইবনে মাজাহ: ৪১৪৩)। আল্লাহ আমাদেরকে জাতিগত বৈষম্য-ভেদাভেদ থেকে হেফাজত করে ঈমান ও তাক্বওয়ার উপর অটুট রাখুন। আমীন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
__________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Share On Social Media