কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

ক্বাযা সালাতের বিধান

প্রশ্ন: ক্বাযা শব্দের অর্থ কি? ইসলামে ক্বাযা সালাতের বিধান কী? ক্বাযা সালাত কত প্রকার?ক্বাযা সালাত আদায়ের কয়টি অবস্থা হতে পারে? এবং ফরজ সালাতের ক্বাযা কখন এবং কিভাবে আদায় করব এর কোন নিষিদ্ধ সময় আছে কি? বিস্তারিত জানতে মনোযোগ সহকারে পোস্টটি পড়ুন ইন শা আল্লাহ্।
▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬
ক্বাযা আরবী শব্দ,অর্থ দেরী করা,বিলম্ব করা।
শরীয়তের পরিভাষায়ঃ নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে নির্দিষ্ট কিছু রুকন আদায় না করে সেটা নিদিষ্ট সময় পরে সম্পাদন করাকে কাযা বলে। অর্থাৎ ফজর,যোহর,আসর.মাগরীব ও এশা এই ৫ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের যে নিদিষ্ট সময় রয়েছে তা সময়ের পরে আদায় করার নাম কাযা। ইচ্ছাকৃত নামাজ কাজা করলে তা কুফরী হবে।

◾ইসলামে ক্বাযা সালাত আদায়ের বিধান কী?
________________________________
▪️ক্বাযা সালাত সমূহ তিন ভাগে বিভক্তঃ

▪️প্রথম প্রকারঃ দেরী করার ওযর দূর হয়ে গেলেই ক্বাযা আদায় করে নিতে হয়। তা হচ্ছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের ক্ষেত্রে। অনুরূপভাবে বিতর ও সুন্নাত নামায সমূহ।

▪️দ্বিতীয় প্রকারঃ যার পরিবর্তে অন্য নামায ক্বাযা হিসেবে আদায় করবে। তা হচ্ছে, জুমআর নামায। এ নামায ছুটে গেলে তার পরিবর্তে যোহর নামায আদায় করবে। কেউ যদি জুমআর দিন ইমামের দ্বিতীয় রাকাআতের রুকূ থেকে মাথা উঠানোর পর নামাযে শামিল হয়, তবে সে যোহর নামায আদায় করবে। ঐ অবস্থায় যোহরের নিয়ত করে ইমামের সাথে নামাযে শামিল হবে। অনুরূপভাবে কেউ যদি ইমামের সালামের পর আসে তবে সেও যোহর পড়বে।

তবে কেউ যদি দ্বিতীয় রাকাআতে ইমামের সাথে রুকূ পায়, তবে সে জুমআর নামাযই আদায় করবে। অর্থাৎ ইমাম সালাম ফিরালে এক রাকাআত আদায় করবে। অনেক লোক ইমামের দ্বিতীয় রাকাআতের রুকূ থেকে মাথা উঠানোর পর জুমআর নামাযে শামিল হয়। অতঃপর সালাম শেষে জুমআর নামায হিসেবে দু‘রাকাআত নামায আদায় করে। এটা ভুল। বরং তার জন্য উচিৎ হচ্ছে ইমামের সালাম ফেরানোর পর যোহর হিসেবে চার রাকাআত নামায আদায় করা।

▪️তৃতীয় প্রকারঃ এমন নামায যা ছুটে যাওয়া সময়েই কাযা আদায় করতে হবে। আর তা হচ্ছে ঈদের নামায। কখনো ঈদের দিন সম্পর্কে জানা গেল না। কিন্তু সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে যাওয়ার পর জানা গেল যে আজকে ঈদের দিন ছিল। এক্ষেত্রে বিদ্বানগণ বলেন, পরবর্তী দিন সকাল বেলা উক্ত ঈদের নামাযের কাযা আদায় করতে হবে। কেননা ঈদের নামায আদায় করার সময় হচ্ছে সকাল বেলা। [ইবনে উসাইমিন (রহঃ) ফতোয়া আরকানুল ইসলাম প্রশ্ন নং২০৯]

◾অনাদায়কৃত ক্বাযা সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে তিনটি অবস্থা হতে পারে:
__________________________________
▪️প্রথম অবস্থা: ঘুম বা ভুলে যাওয়ার মত শরিয়ত অনুমোদিত ওজরের কারণে সালাত ছুটে যাওয়া। এ অবস্থায় তার উপর ছুটে যাওয়া নামায ক্বাযা করা ওয়াজিব।

▪️দ্বিতীয় অবস্থা: এমন ওজরের কারণে সালাত ছুটে যাওয়া যে সময় ব্যক্তির কোন হুঁশ থাকে না।যেমন-অজ্ঞান হওয়া। এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার ব্যক্তিকে সালাতের বিধান থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। তাই তাকে উক্ত সালাতের কাযা করতে হয় না কারণ, সে জ্ঞানহীন পাগলের পর্যায়ভুক্ত। আর পাগলের পাপ-পুণ্য কিছু নেই। [সুনানে তিরমিযী ১৪২৩,আবূ দাঊদ ৪৪০৩ মিশকাত ৩২৮৭ ফিকহুস সুন্নাহ্‌ ১/২৪১,শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন রহঃ২/১২৬ সৌদি গবেষণা ও ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির ফতোয়া ৬/২১] ইবনে উমার (রাঃ) অজ্ঞান অবস্থায় কোন নামায ত্যাগ করলে তা আর ক্বাযা পড়তেন না।[আব্দুর রাযযাক, মুসান্নাফ, ফিকহুস সুন্নাহ্‌ ১/২৪১] অবশ্য নামায পড়তে পারত এমন সময়ের পর অজ্ঞান হলে জ্ঞান ফিরার পর সেই সময়ের নামায কাযা পড়া জরুরী। [শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ২/১২৬-১২৭]

▪️তৃতীয় অবস্থা: ইচ্ছাকৃতভাবে কোন ওজর ছাড়া সে যদি অবহেলা বা অলসতাবশত প্রথম ওয়াক্তের সালাত ত্যাগ করে,পরের ওয়াক্তে পড়ে তবে তার উক্ত কাযা আদায় শুদ্ধ হবে না। কারণ সে যখন সালাত ত্যাগ করেছিল তখন তার কোন গ্রহণযোগ্য ওজর ছিল না।আল্লাহ তো সুনির্ধারিত ও সুনির্দিষ্ট সময়ে নামায আদায় করাকে তার উপর ফরজ করেছেন। আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন: “নিশ্চয়ই নির্ধারিত সময়ে সালাত আদায় করা মু’মিনদের জন্য অবশ্য কর্তব্য।”[সূরানিসা, ৪:১০৩] অর্থাৎ নামাযের সুনির্দিষ্ট সময় আছে। আরেকটি দলীল হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী: “যে ব্যক্তি এমন কোন কাজ করবে যা আমাদের শরিয়তভুক্ত নয় তবে তা প্রত্যাখ্যাত।[সহীহ বুখারী হা/২৬৯৭ সহীহ মুসলিম,হা/১৭১৮ আবু দাউদ হা/৪৬০৬ ফিকহুস সুন্নাহ্‌ ১/২৪১-২৪৩, ফিকহুস সুন্নাহ্‌ উর্দু পৃ:৭৮]

◾ক্বাযা সালাত কখন এবং কিভাবে পড়তে হবে:
_____________________________________
কেউ যথাসময়ে নামায পড়তে ঘুমিয়ে অথবা ভুলে গেলে এবং তার নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হয়ে গেলে, স্মরণে আসা কিংবা ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার সাথে সাথে পড়ে নিতে হবে। সে সময় সূর্য উদয়,অস্ত বা মাঝ বরাবর যেখানেই থাকুক। ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ,ইমাম আহমাদ ও ইসহাক (রহঃ)-এর এটাই মত।অন্য যে হাদীসে তিনটি সময়ে সালাত আদায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সে হাদীস সাধারণ অর্থবোধক অর্থাৎ নফলের সাথে সম্পর্কিত। [ইরওয়াউল গালীল,২৬৩ মিশকাত,৬০৩ নং হাদীসের ব্যাখ্যা দৃষ্টব্য]

সুতরাং ক্বাযা সালাত আদায় করতে দেরী করা সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের জন্য অপেক্ষা করা এবং নিষিদ্ধ সময়ে ক্বাযা সালাত আদায় করা যাবে না মর্মে সমাজে যে ধারনা চালু আছে তা সুস্পষ্ট সহীহ হাদীসের বিরোধী। বরং যখনই স্মরণ হবে কিংবা ঘুম থেকে জাগ্রত হবে তখনই পবিত্রতা অর্জন করে ধারাবাহিক ভাবে ক্বাযা সালাত আদায় করে নিতে হবে। এর জন্য ইচ্ছেকৃত ভাবে ১০/১৫ মিনিট অপেক্ষা করা যাবেনা অপেক্ষা করলে গুনাহগার হতে হবে। ফরজ সালাতের কায্বা আদায় করা ফরজ এবং সুন্নত সালাতের কায্বা আদায় করা সুন্নত। এটাই কুরআন-সুন্নাহর বক্তব্য। কেননা রাসূলুল্লাহ (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, مَنْ نَسِىَ صَلاَةً أَوْ نَامَ عَنْهَا فَكَفَّارَتُهَا أَنْ يُصَلِّيَهَا إِذَا ذَكَرَهَا ‘কেউ ভুলে গেলে কিংবা ঘুমিয়ে গেলে তার কাফফারা হল, ঘুম ভাঙলে অথবা স্মরণ হলে সাথে সাথে ক্বাযা সালাত আদায় করা’।[সহীহ বুখারী হা/৫৯৭, ১/৮৪ পৃঃ, (ইফাবা হা/৫৬৯ ও ৫৭১, ২/৩৫-৩৬ পৃঃ) ছহীহ মুসলিম হা/১৫৯২, ১৫৯৮, ১৬০০, ১/২৩৮,মিশকাত হা/৬০৩, ৬৮৪, ৬৮৭]

আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘কেউ কোন সালাত আদায় করতে ভুলে গেলে যখন স্মরণ হবে তখনই যেন তা আদায় করে নেয়। এটুকুই তার জন্য কাফফারা।’[সহীহ মুসলিম, হা/৬৮৪ ইঃফাঃ হা/১৪৫২ আবূ দাঊদ, হা/৪৪২]
.
তিনি আরো বলেন,নিদ্রা অবস্থায় কোন শৈথিল্য নেই। শৈথিল্য তো জাগ্রত অবস্থায় হয়। সুতরাং যখন তোমাদের মধ্যে কেউ কোন নামায পড়তে ভুলে যায় অথবা ঘুমিয়ে পড়ে, তখন তার উচিৎ, স্মরণ হওয়া মাত্র তা পড়ে নেওয়া। কেননা,মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,আর আমাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে তুমি নামায কায়েম কর। [সূরা ত্বহা ২০/১৪, সহীহ মুসলিম ৬৮১, ৬৮৪, আবূ দাঊদ ৪৪১,সুনানে নাসায়ী ৬১৫,মিশকাত ৬০৪]
.
আর কায্বা আদায়ের ক্ষেত্রে মূল ওয়াক্তে যেভাবে সালাত আদায় করা হয় ঠিক ঐ নিয়মেই সালাত আদায় করতে হবে।অর্থাৎ যে নামায যে অবস্থায় কাযা হয়,সেই নামাযকে সেই অবস্থা ও আকারে পড়া জরুরী। সুতরাং রাতের নামায দিনে কাযা পড়ার সুযোগ হলে রাতের মতই করে জোরে ক্বিরাআত করতে হবে। কারণ, মহানবী (ﷺ) যখন ফজরের নামায দিনে কাযা পড়েছিলেন, তখন ঠিক সেই রুপই পড়েছিলেন, যেরুপ প্রত্যেক দিন ফজরের সময় পড়তেন।[সহীহ মুসলিম, ৬৮১]

তদনুরুপ ছুটে যাওয়া নামায রাতে কাযা পড়ার সুযোগ হলে দিনের মতই চুপে চুপে ক্বিরাআত পড়তে হবে। [নাইলুল আউতার, শাওকানী ২/২৭,আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৪/২০৪, ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ্‌, সঊদী উলামা-কমিটি ১/৩১০]অতএব উপরোক্ত হাদীসগুলো থেকে এটা পরিস্কার যে ফরজ সালাতের ক্বাযা আদায়ের নিষিদ্ধ কোন সময় নেই।বরং স্মরণ হওয়ার সাথে সাথেই পড়তে হয়।এর বিপরীতে যারা বলে তাদের বক্তব্য সঠিক নয়।মহান আল্লাহ সবাইকে কুরআন সুন্নাহর আলোকে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমীন। (আল্লাহ্‌ই অধিক জ্ঞাত আছেন)।
_______________________
উপস্থাপনায়,
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।