কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ এর আক্বীদার উৎস

আহলে সুন্নাহর অন্যতম ইমাম আবু হানীফা নু’মান (রাহিমাহুল্লাহ) এর আক্বীদার উৎস কি ছিল?
▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬
উছূলুদ্দীন বা দ্বীনের মূলনীতি বিষয়ক মাসআলা-মাসায়েল আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) স্পষ্ট ও পরিপূর্ণভাবে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন, যার পরে আর কারো ওযর থাকে না। সুস্পষ্টভাবে সবচেয়ে গুরুত্বের সাথে যে বিষয়টি রাসূল (ﷺ) মানুষকে বর্ণনা করেছেন, সেটি হচ্ছে আক্বীদা। বরং রাসূলগণ (আঃ)-এর মাধ্যমে এই আক্বীদা দিয়েই মহান আল্লাহ মানুষের উপর দলীল দাঁড় করিয়েছেন। (ইবনু তাইমিয়াহ, তা‘আরুযিল আক্বলি ওয়ান নাক্বল, তাহক্বীক্ব: মুহাম্মাদ রশাদ সালেম, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সু‘ঊদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়ায, ২য় প্রকাশ: ১৪১১ হি./১৯৯১ খৃ.), ১/২৭)।
.
যার পরে আর কারো অজুহাত পেশ করার কিছু থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন, رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنْذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا ‘আর (পাঠিয়েছি) রাসূলগণকে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে, যাতে আল্লাহর বিপক্ষে রাসূলগণের পর মানুষের জন্য কোনো অজুহাত না থাকে। আর আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (আন-নিসা, ৪/১৬৫)।
.
আল্লাহর কালাম ও রাসূল (ﷺ) এর বাণীর অনুসরণ-অনুকরণের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম এ পথেই হেঁটেছেন। তাদের কেউ কুরআন ও হাদীসের বাইরে অন্য কিছু দিয়ে আক্বীদা বিষয়ক দলীল গ্রহণ করেননি। মহান আল্লাহ, ফেরেশতামণ্ডলী, আসমানী কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, পরকাল, তাক্বদীরের ভালো-মন্দ সহ আরো যা কিছু ঈমানের মূলনীতির সাথে সম্পর্কিত, সেগুলো এই ইলাহী উৎস থেকেই তারা নিয়েছেন। মাক্বরীযী (রহিঃ) বলেন, আল্লাহর একত্ব ও মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর নবুঅত সাব্যস্তের ক্ষেত্রে তারা আল্লাহর কিতাব ছাড়া অন্য কিছু থেকে দলীল গ্রহণ করেননি।(ইবনু তাইমিয়াহ, র্দ্উা তা‘আরুযিল আক্বলি ওয়ান নাক্বল, তাহক্বীক্ব: মুহাম্মাদ রশাদ সালেম, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সু‘ঊদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়ায, ২য় প্রকাশ: ১৪১১ হি./১৯৯১ খৃ., ১/২৭)

এই পদাঙ্ক অনুসরণ করেই চলেছেন তাবে‘ঊন ও আতবা‘উত তাবে‘ঈন। ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ) সহ চার ইমাম, এমনকি সকল যুগের সালাফী আলেম ছিলেন এ পথেরই পথিক। ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ) এর নিকট সাধারণভাবে দ্বীনের সব বিষয় এবং বিশেষভাবে আক্বীদা সংক্রান্ত বিষয়ে কিতাব ও সহীহ হাদীসই ছিলো মূল উৎস। ‘দ্বীনের সকল বিষয়ের ন্যায় আক্বীদার ক্ষেত্রেও মূল ভিত্তি হলো কুরআনুল কারীম, সহীহ হাদীস এবং এরপর সাহাবীগণের মত। আক্বীদা ও ফিক্বহের মৌলিক পার্থক্য হলো, ফিক্বহের ক্ষেত্রে ইজতিহাদ, ক্বিয়াস, যুক্তি বা ‘আক্বলী দলীলের প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু আক্বীদার ক্ষেত্রে এর কোনো সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবীগণের অনুসরণই একমাত্র করণীয়। কারণ ফিক্বহের বিষয়বস্তু পরিবর্তনশীল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বা সাহাবীগণের যুগে ছিল না এমন কোনো নতুন বিষয়ে ফিক্বহী মত জানার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু আক্বীদার বিষয়বস্তু মহান আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি, নবী-রাসূলগণ ইত্যাদি। এগুলো অপরিবর্তনীয়। এক্ষেত্রে মুমিনের একমাত্র দায়িত্ব রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবীগণের আক্বীদা জানা ও মানা। (ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, আল-ফিকহুল আকবার (বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা), (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স, প্রকাশকাল: ১৪৩৫ হি./২০১৪ খৃ.), পৃঃ ২৩৮)।
.
আক্বীদার ক্ষেত্রে কোনটা ‘মুতাওয়াতির হাদীস’ আর কোনটা ‘আহাদ হাদীস’ তার কোনো পার্থক্য ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ) করেননি। এই মর্মে তিনি বলেন, آخذ بِكِتَاب الله فما لم أَجِدْ فَبِسُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فَمَا لَمْ أَجِدْ فِي كِتَابِ اللَّهِ ولافى سُنَّةُ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم أَخَذْتُ بِقَوْلِ أَصْحَابِهِ آخُذُ بِقَوْلِ مَنْ شِئْتُ مِنْهُمْ وَأَدَعُ مَنْ شِئْتُ مِنْهُمْ وَلا أَخْرُجُ مِنْ قَوْلِهِمْ إِلَى قَوْلِ غَيْرِهِمْ ‘আমি আল্লাহর কিতাব ধারণ করি। যা (সেখানে) না পাই, তা রাসূল (ﷺ) এর সুন্নাত থেকে গ্রহণ করি। যা আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (ﷺ) এর সুন্নাতে না পাই, তা সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য থেকে গ্রহণ করি। তাদের মধ্যে যার কথা মনে চাই গ্রহণ করি, যার কথা মনে চাই না গ্রহণ করি না। তবে তাদের কথা রেখে অন্য কারো কথা গ্রহণ করিনা।’ (আল-ইনতিক্বা, পৃঃ ১৪২)।
.
তিনি আরো বলেন, إِذَا لَمْ يَكُنْ فِي كِتَابِ اللَّهِ وَلَا فِي سُنَّةِ رَسُوْلِ اللهِ نَظَرْتُ فِيْ أَقَاوِيْلِ أَصْحَابِهِ وَلَا أَخْرُجُ عَنْ قَوْلِهِمْ إِلَى قَوْلِ غَيْرِهِمْ فَإِذَا انْتَهَى الْأَمْرُ أَوْ جَاءَ الْأَمْرُ إِلَى إِبْرَاهِيْمَ وَالشَّعْبِيِّ وَابْنِ سِيْرِيْنَ وَالْحَسَنِ وَعَطَاءٍ وَسَعِيْدِ بْنِ جُبَيْرٍ وَعَدَّدَ رِجَالًا فَقَوْمٌ اجْتَهَدُوْا فَأَجْتَهِدُ كَمَا اجْتَهَدُوْا ‘যখন আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সুন্নাতে না থাকে, তখন সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্যের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করি। তাদের বক্তব্য থেকে বের হয়ে অন্য কারো বক্তব্য ধরি না। এরপর কোনো বিষয় যখন ইবরাহীম, শা‘বী, ইবনে সীরীন, হাসান, আতা, সাঈদ ইবনে জুবাইর (রহিঃ) প্রমুখের কাছে আসে, তখন দেখি তারা ইজতিহাদ করেছেন। ফলে তাদের ইজতিহাদের মত আমিও ইজতিহাদ করি।’ (প্রাগুক্ত,পৃঃ ১৪৩)।
.
ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ) এর ছাত্র হাসান ইবনে যিয়াদ লুলুয়ী (রহিঃ) বলেন, لَيْسَ لِأَحَدٍ أَنْ يَقُوْلَ بِرَأْيِهِ مَعَ نَصٍّ عَنْ كِتَابِ اللهِ أَوْ سُنَّةٍ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ أَوْ إِجْمَاعٍ عَنِ الْأُمَّةِ وَإِذَا اخْتَلَفَ الصَّحَابَةُ عَلَى أَقْوَالٍ نَخْتَارُ مِنْهَا مَا هُوَ أَقْرَبُ إِلَى الْكِتَابِ أَوِ السُّنَّةِ وَنَجْتَنِبَ عَمَّا جَاوَزَ ذَلِكَ ‘আল্লাহর কিতাব বা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর হাদীসে কোনো বক্তব্য থাকলে অথবা উম্মতের ইজমা বিদ্যমান থাকলে সে বিষয়ে নিজস্ব মতানুযায়ী কথা বলার অধিকার কারো নেই। আর যদি সাহাবীগণ (কোনো বিষয়ে) মতভেদ করেন, তাহলে আমরা তাদের মতগুলোর মধ্যে কুরআন বা হাদীসের অধিক নিকটবর্তী বক্তব্যটি গ্রহণ করি এবং এর বাইরের সবকিছু পরিত্যাগ করি। (মুহিউদ্দীন আব্দুল ক্বাদের হানাফী, আল-জাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহ ফী ত্ববাক্বাতিল হানাফিয়্যাহ, মীর মুহাম্মাদ কুতুবখানা, করাচী, তা. বি.), ২/৪৭৩)। মোদ্দাকথা, ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর নিকট সাধারণভাবে দ্বীনের সব বিষয় এবং বিশেষভাবে আক্বীদা সংক্রান্ত বিষয়ে শারঈ দলীলের ক্রমধারা এরকম: কুরআন মাজীদ, অতঃপর সহীহ হাদীস, অতঃপর সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য। আর ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য ছেড়ে অন্য দিকে না যাওয়ার পেছনে কারণ হচ্ছে, তারা ছিলেন যাবতীয় বিদ‘আতমুক্ত এবং তাদের অন্তর ও নিয়্যত ছিলো পরিচ্ছন্ন। তাছাড়া তারা অহি অবতীর্ণ হতে দেখেছেন।
.
মহান আল্লাহ আরশের উপর ইসতিওয়া সম্পর্কে ইমাম আবু হানীফা (৮০-১৫০ হিঃ) বলেন, عَنْ أَبِى مُطِيْعٍ الْحَكَمِ بْنِ عَبْدِ اللهِ الْبَلَخِىِّ صَاحِبِ الْفِقْهِ الْأَكْبَرِ قَالَ سَأَلْتُ أَبَا حَنِيْفَةَ عَمَّنْ يَقُوْلُ لَا أَعْرِفُ رَبِّىْ فِي السَّمَاءِ أَمْ فِي الْأَرْضِ فَقَالَ قَدْ كَفَرَ لِأَنَّ اللهَ تَعَالَى يَقُوْلُ الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى وَعَرْشُهُ فَوْقَ سَبْعِ سَمَوَاتِهِ فَقُلْتُ إِنَّهُ يَقُوْلُ أَقُوْلُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى وَلَكِنْ قَالَ لَا يَدْرِى الْعَرْشَ فِي السَّمَاءِ أَوْ فِى الْأَرْضِ قَالَ إِذَا أَنْكَرَ أَنَّهُ فِي السَّمَاءِ فَقَدْ كَفَرَ আল-ফিক্বহুল আকবার’ এর সংকলক আবু মুত্বী‘ হাকাম ইবনু আব্দুল্লাহ আল-বালখী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) কে ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, যে বলে আমার রব আসমানে আছেন না-কি যমীনে আছেন, তা আমি জানি না। তিনি উত্তরে বললেন, সে কুফরী করল। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, রহমান আরশের উপর সমুন্নত। আর তাঁর আরশ তাঁর সপ্তম আসমানের উপরে। অতঃপর আমি বললাম, সে বলে যে, আমি বলি, তিনি আরশের উপর সমুন্নত। কিন্তু আরশ আসমানে না যমীনে তা সে জানে না। আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, আরশ আসমানে এই কথা যে অস্বীকার করল, সে কুফরী করল। (আলবানী, মুখতাছারুল ঊলূ লিল‘আলিয়্যিল আযীম, হা/১১৮, সনদ ছহীহ,; ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূউ ফাতাওয়া, ৫/৪৭ পৃঃ আল-ফিক্বহুল আকবার, পৃ. ১৩৫)।
.
ইমাম আবূ হানীফা (রা) কে মহান আল্লাহর অবতরণ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। তিনি উত্তরে বলেন, ينزل بلا كيف মহান আল্লাহ অবতরণ করেন, কোনোরূপ পদ্ধতি বা স্বরূপ ব্যতিরেকে।’(বাইহাকী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত ২/৩৮০; মোল্লা আলী কারী, শারহুল ফিকহিল আকবার, পৃ ৬৯) তিনি আরো বলেন, وَلَهُ يَدٌ وَوَجْهٌ وَنَفْسٌ كَمَا ذَكَرَهُ اللهُ تَعَالَى فِي الْقُرْآنِ، فَمَا ذَكَرَهُ اللهُ تَعَالَى فِي الْقُرْآنِ مِنْ ذِكْرِ الْوَجْهِ وَالْيَدِ وَالنَّفْسِ، فَهُوَ لَهُ صِفَاتٌ بِلَا كَيْفَ ‘তার হাত আছে, চেহারা আছে এবং প্রাণ আছে, যেমনটি আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তা বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে চেহারা, হাত ও প্রাণ সম্পর্কে যা উল্লেখ করেছেন, তা অবশ্যই তারই গুণাবলি, যার ধরন ও প্রকৃতি কারো জানা নেই’।(আল-ফিক্বহুল আকবার, পৃ. ২৭)।
.
ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) নবী রাসূলের আগমন সম্পর্কে বলেন, বিভিন্ন নবী ও রাসূলকে আল্লাহ বিভিন্ন শরীয়াহ দিয়েছেন, তবে সকলের দীন এক ও অভিন্ন। প্রত্যেক রাসূল তাঁর জাতিকে পূর্ববর্তী রাসূলের দীন বর্জন করতে নির্দেশ দিতেন না; কারণ তাঁদের দীন ছিল এক। প্রত্যেক রাসূল তাঁর নিজ শরীয়ত পালনের দাওয়াত দিতেন এবং পূর্ববর্তী রাসূলের শরীয়ত পালন করতে নিষেধ করতেন; কারণ তাঁদের শরীয়ত ছিল ভিন্ন ভিন্ন। এজন্য আল্লাহ বলেছেন: ‘‘তোমাদের প্রত্যেককে শরীয়ত ও স্পষ্ট পথ প্রদান করেছি, ইচ্ছা করলে আল্লাহ তোমাদেরকে এক জাতি করতে পারতেন’’ তিনি আরো বলেছেন যে, নবী-রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম) এর ভুল-ত্রুটি হতে পারে। তিনি বলেন, اَلْأَنْبِيَاءُ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ كُلُّهُمْ مُنَزَّهُوْنَ عَنِ الصَّغَائِرِ وَالْكَبَائِرِ وَالْكُفْرِ وَالْقَبَائِحِ وَقَدْ كَانَتْ مِنْهُمْ زَلَّاتٌ وَخَطَايَا প্রত্যেক নবীই (আলাইহিমুস সালাম) সগীরা গোনাহ, কাবীরা গোনাহ, কুফর ও নিকৃষ্ট কাজকর্ম থেকে মুক্ত। তবে তাদের পক্ষ থেকে ভুলত্রুটি হতে পারে। (আল-ফিক্বহুল আকবার, পৃ. ৩৭ মাসিক আল ইতিসাম)।

চার ইমামের মধ্যে প্রথমেই হলেন ইমাম আবু হানীফা নুমান বিন ছাবিত (রাহিমাহুল্লাহ)। তাঁর সাথীগণ তাঁর অনেক কথা বিভিন্ন ভাষায় বর্ণনা করেছেন, সব কয়টি কথা একটাই বিষয়ের প্রতি নির্দেশ করে, আর তা হচ্ছেঃ হাদীছকে আকড়ে ধরা ও তার বিপক্ষে ইমামগণের কথা পরিহার করা ওয়াজিব। (কথাগুলো হচ্ছে)।

(১) إذا صح الحديث فهو مذهبى অর্থঃ হাদীছ বিশুদ্ধ সাব্যস্ত হলে ওটাই আমার মাযহাব বলে পরিগণিত হবে।[ইবনু আবিদীন এর হাশিয়া ১ম খন্ড ৬৩ পৃষ্ঠা, “রসমিল মুফতী” ১ম খণ্ড ৪র্থ পৃষ্ঠা, ছালিহ আল ফাল্লানীর “ইকাযুল হিমাম” পৃষ্ঠা ৬২, ইবনু আবিদীন ইবনুল হুমামের উস্তায ইবনুশ শাহনা আল কাবীরের “শারহুল হিদায়া” থেকে উদ্ধৃতি করেনঃ إذا صح الحديث وكان على خلاف المذهب عمل بالحديث ويكون ذلك مذهبه ولا يخرج مقلد عن كونه حنيفا بالعمل به فقد صح ان ابى حنيفة انه قال: إذا صح الحديث فهو مذهبي وقد حكى ذلك الامام ابن عبد البر عن ابى حنيفة وغيره من الأئمة অর্থঃ যখন হাদীছ বিশুদ্ধ সাব্যস্ত হয়ে যাবে আর তা মাযহাবের বিপক্ষে থাকবে তখন হাদীছের উপরেই আমল করা উচিত হবে এবং এটাই তাঁর (ইমামের) মাযহাব বলে বিবেচিত হবে। উক্ত হাদীছের উপর আমল করাটা তাকে হানাফী মাযহাব থেকে বহিষ্কার করবে না। কেননা বিশুদ্ধ সূত্রে ইমাম আবু হানীফা থেকে এসেছে যে, হাদীছ বিশুদ্ধ সাব্যস্ত হলে এটাই আমার অনুসৃত পথ বলে জানতে হবে। একথা ইমাম ইবনু আব্দিল বার ইমাম আবু হানীফাসহ অন্যান্য ইমামদের থেকেও বর্ণনা করেন। আমি বলছিঃ এটা হচ্ছে ইমামগণের ইলম ও তাকওয়ার পরিপূর্ণতার বহিঃপ্রকাশ। যাতে তারা একথারই ইঙ্গিত প্ৰদান করছেন যে, তারা সমস্ত হাদীছ আয়ত্ব করতে পারেননি। যে কথা ইমাম শাফিয়ী স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন, পরবর্তীতে যার উল্লেখ রয়েছে। তাই কদাচ তাদের নিকট অনাগত অজানা সুন্নাতের বিপরীত কিছু (বচন-আচরণ) পাওয়া যেতে পারে। এজন্যই তাঁরা আমাদেরকে সুন্নাহ্ আকড়ে ধরার এবং এটাকেই তাদের অবলম্বিত পথ (মাযহাব) হিসাবে গণ্য করার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা তাদের সবাইকে রহম করুন।

لايحل لأحد أن يأخذ بقولنا ما لم يعلم من أين أخذناه (২)
আমরা কোথা থেকে কথাটি নিলাম এটা না জানা পর্যন্ত কারো জন্য আমাদের কথা গ্ৰহণ করা বৈধ নয়।
অপর বর্ণনায় রয়েছেঃ حرام على من لم يعرف دليلي أن يفتي بكلامي অর্থঃ যে আমার কথার প্রমাণ জানে না তার পক্ষ আমার কথার দ্বারা ফতওয়া প্ৰদান করা হারাম। (টীকায় উল্লেখকৃত দ্বিতীয় বর্ণনাটি)[ইবনু আব্দিল বার “আল ইনতিকা ফী ফাযায়েলুস সালাসাতিল আইম্মাতিল ফুকাহা” পৃষ্ঠা ১৪৫, ইবনুল কাইয়্যিম এর “ই’লামুল মুয়াক্কিঈন” (২/৩০৯), ইবনুল আবিদীন “আল বাহরুর রা’ইক” এর টীকায় (৬/২৯৩), “রসমীল মুফতী” পৃষ্ঠা ২৯, ৩২, শা’রানীর “আল মিযান” এ দ্বিতীয় বর্ণনাটি রয়েছে (১/৫৫) আর তৃতীয় বর্ণনা পাওয়া যাবে আব্বাছ আদদূরীর বর্ণনায় ইবনু মাঈন এর “আত-তারীখ” গ্রন্থে (৬/৭৭/১) যুফার থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে। এ ধরনের বর্ণনা ইমাম সাহেবের সাথী যুফার, আবু ইউসুফ এবং আফিয়া ইবনু ইয়াযীদ থেকেও এসেছে “আল-ইকায” পৃষ্ঠা ৫২, ইবনুল কাইয়িম আবু ইউসুফ থেকে একথার বিশুদ্ধতার কথা দৃঢ়তার সাথে বলেছেন। অতিরিক্ত কথাটি যা আবু ইউসুফকে সম্বোধন করে বলেছেন। “আল ইকায” এর ৬৫ পৃষ্ঠার টীকায় ইবনু আব্দিল বার ও ইবনুল কাইয়িম ও অন্যান্যদের থেকে উদ্ধৃত হয়েছে।

অপর বর্ণনায় রয়েছেঃ ويحك يا يعقوب (هو أبو يوسف) لا تكتب كل ما تسمع منى فإني قد أرى الرأى اليوم واتركه غدا، وأرى الرأى غدا واتركه بعد غد অর্থঃ এই হতভাগা ইয়াকুব (আবু ইউসুফ) তুমি আমার থেকে যাই শুন তা লিখনা, কেননা আমি আজ এক মত পোষণ করি এবং আগামীকাল তা পরিহার করি, আবার আগামীকাল এক মত পোষণ করি আর পরশুদিন তা পরিত্যাগ করি।[আল। ঈকায গ্রন্থের ৬৫ পৃষ্ঠার টীকা দ্রষ্টব্য)।

اذا قلت قولا یخالف کتاب الله تعالی و خبر الرسول صلی الله عليه وسلم فاترکوا قولي (৩)

অর্থঃ যখন আমি এমন কথা বলি যা আল্লাহ তা’আলার কিতাব ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর হাদীছ বিরোধী তা হলে তোমরা আমার কথা পরিত্যাগ করবে।[ফাল্লানীর “আল ইকায” গ্রন্থের ৫০ পৃষ্ঠায় তিনি এটাকে ইমাম মুহাম্মদের কথা বলেও উল্লেখ করেন। অতঃপর বলেনঃ এ কথা এবং এ মর্মের অন্য সব বক্তব্য মুজতাহিদের জন্যে নয় কেননা তিনি ইমামদের কথার প্রয়োজন বোধ করেন না। বরং এটি (ইমামের কথাকে দলীলের সঙ্গে মিলিয়ে মানা) মুকাল্লিদ-এর জন্যই প্রযোজ্য)।

চার ইমাম সম্পর্কে ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: مَعْرِفَةُ فَضْلِ أَئِمَّةِ الْإِسْلَامِ وَمَقَادِيْرِهِمْ وَحُقُوْقِهِمْ وَمَرَاتِبِهِمْ، وَأَنَّ فَضْلَهُمْ وَعِلْمَهُمْ وَنُصْحَهُمْ لِلهِ وَرَسُوْلِهِ لَا يُوْجِبُ قَبُوْلَ كُلِّ مَا قَالُوْهُ، وَمَا وَقَعَ فِيْ فَتَاوِيْهِمْ مِنْ الْمَسَائِلِ الَّتِيْ خَفِيَ عَلَيْهِمْ فِيْهَا مَا جَاءَ بِهِ الرَّسُوْلُ فَقَالُوْا بِمَبْلَغِ عِلْمِهِمْ وَالْحَقُّ فِيْ خِلَافِهَا لَا يُوْجِبُ إطْرَاحَ أَقْوَالِهِمْ جُمْلَةً وَتَنَقُّصَهُمْ وَالْوَقِيْعَةَ فِيْهِمْ ‘দ্বীনের ইমামদের ইজ্জত-সম্মান, হক্ব, মর্যাদা জানা এবং তাদের শ্রেষ্ঠত্ব, জ্ঞান এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ব্যাপারে আন্তরিক হওয়াটা, ঢালাওভাবে তাদের সকল বক্তব্য গ্রহণ করা আবশ্যক করে না। অনেক সময় তাদের ফাতাওয়া প্রদানের ক্ষেত্রে জিজ্ঞাসিত বিষয়ে তাদের নিকট রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর আনীত সমাধানটি গোপন থাকার কারণে তাঁরা তাঁদের ‘ইলমের বহরের উপর নির্ভর করে ফৎওয়া প্রদান করেছেন। অথচ পরবর্তীতে দেখা গেল হক্ব তাঁর উল্টো। (তবে এ জাতীয় ভুলের কারণে) একবাক্যে তাঁদের সকল বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করা, তাদের মানহানি করা বা তাদের সাথে আক্রমণাত্মক আচরণ করা মোটেও সমীচীন নয়’। (মুহাম্মাদ ইবনু আবি বকর ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযী, ই‘লামুল মুয়াক্কি‘ঈন, ৩য় খণ্ড (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, ১৪১১ হি.), পৃ. ২২০)।
.
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) সম্পর্কে ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.] কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,যেসব সালাফ আবু হানীফার সমালোচনা করেছেন, তারা এ কারণে করেছেন যে,আবু হানীফাহ কিয়াসের ওপর নির্ভর করেন।হাদীসের মাধ্যমে দলীল গ্রহণ করেন না।অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার ভরসা কিয়াস।যারা সমালোচনা করেছেন শুধুমাত্র এ কারণে সমালোচনা করেছেন যে, তিনি কিয়াসের আশ্রয় নেন।এতে কোনো সন্দেহ নেই যে,কিয়াস শরয়ী দলীল।কেননা দলীলের মূল হল, কিতাব, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস। তবে ইমামগণ কিয়াসের আশ্রয় নেননি প্রয়োজন ছাড়া।তারা যখন কিতাব, সুন্নাহ ও ইজমা থেকে দলীল পাননি, তখন কিয়াস অনুযায়ী বলেছেন। কিন্তু আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ কিয়াসের পরিধি বৃদ্ধি করেছেন। সালাফরা এ বিষয়ে তার সমালোচনা করেছেন এবং নিন্দা করেছেন যে, তিনি কিয়াসে পরিধি বৃদ্ধি করেছেন। কোনো কোনো মুহাক্কিক আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহর পক্ষ থেকে জবাব দিয়েছেন যে, তিনি ফিতনার সময় ইরাকে বসবাস করতেন। তখন হাদীসের নামে মিথ্যাচার ও জালিয়াতি চরম আকার ধারণ করে।ফলে তিনি কিয়াসের ওপর নির্ভর করতেন। জালিয়াতিকারী ও মিথ্যাচারকারীদের ভয়ে নয়। কেননা মিথ্যাচার ইরাকে ছড়িয়ে পড়ে। তবে হিজায মক্কা ও মদীনা ছিলো এর বিপরীত।তারা ছিলেন বর্ণনা ও হাদীসের অধিকারী এবং পণ্ডিত। কিন্তু ইরাকে যখন অনেক ফিরকার আবির্ভাব হয় এবং হাদীস জালিয়াতি ও রাসূলের নামে মিথ্যাচার ব্যাপক হয়ে যায়, তখন আবু হানীফাহ রাহিমাহুল্লাহ কিয়াসের ওপর নির্ভর করেন। আবু হানীফা রাহিমাল্লাহর কিয়াসের ওপর নির্ভর করার এবং কিয়াসের পরিধি বৃদ্ধি করার এটি কারণ।নিঃসন্দেহে তিনি সম্মানিত ইমাম। তিনি চার ইমামের মধ্যে বড়। তিনি তাবিয়ীদের থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন। কেউ বলেছেন, সাহাবীদের থেকে গ্রহণ করেছেন। তিনি একজন সম্মানিত ইমাম। তার আকীদাহ ও দ্বীনের ব্যাপারে কোনো সমালোচনা নেই। কিয়াসের পরিধি বৃদ্ধির ব্যাপারে তার সমালোচনা রয়েছে।এটাই তার সমালোচনার কারণ।তিনি এ ক্ষেত্রে মাযুর, যেমনটা আমরা উল্লেখ করেছি।কারণ, তার সময়ে মিথ্যা ও জালিয়াতি ছড়িয়ে পড়ে; বিশেষ করে ইরাকে। তিনি এ থেকে বিরত ছিলেন। যাহোক, আমরা চাই না এ বিষয়গুলো নতুন করে জাগ্রত করা হোক। মক্কার প্রধান বিচারক আবদুল্লাহ ইবন হাসানের সময় আলিমরা যে নুসখার ওপর নির্ভর করতেন তখন কিতাবের এ অংশ সেই নুসখায় বিলুপ্ত ছিলো। যে নুসখা তিনি তার তত্ত্বাবধানে প্রকাশ করেন তাতে এ বর্ধিতাংশ ছিলো না। কিন্তু পরবর্তীতে কিছু গবেষকের আবির্ভাব হয়, আল্লাহ তাদের হিদায়াত দিন, তারা তা যুক্ত করে দেন। এভাবে এই সন্দেহ জন্ম নেয়। অবস্থা যাই হোক, আমরা আবু হানীফাকে ভালোবাসি। তিনি আমাদের ইমাম। কেননা তিনি একজন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ইমাম।আমাদের ইমামসমূহের মধ্যে একজন ইমাম। আমরা কখনো তাকে দোষারোপ করি না (https://youtu.be/NekJ9mBTL8g)

অতএব, ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ) এর নিকট পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীসই ছিলো আক্বীদা ও আমলের উৎস। সুতরাং ইমাম আবু হানীফা (রহিঃ)-এর আক্বীদা ও আমলের উৎস হোক আমাদেরও আক্বীদা-আমলের উৎস। তাহলে যাবতীয় বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী
_________________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।