প্রশ্ন: শুধুমাত্র শখের বশে ও বিনোদনের জন্য শিকার করা কি শরীয়তে জায়েয? প্রজনন ঋতুতে পাখি শিকারের হুকুম কী?
▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা:পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য। অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রাণপ্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর শিকার সাধারণত দুই প্রকার।
.
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম ইবনে উছাইমীন বলেন:فهذا لا شك في جوازه ، وهو مما أحله الله عزّ وجل في كتابه ، وثبتت به السنة عن النبي صلّى الله عليه وسلّم ، وأجمع عليه المسلمون”এটার বৈধতার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। মহান আল্লাহ তার কিতাবে একে হালাল করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ মর্মে সুন্নাহ সাব্যস্ত হয়েছে এবং মুসলিমরাও এ মর্ম ইজমা (ঐকমত্য) পোষণ করেছেন। [আশ-শারহুল মুমতি (১৫/৯৮) থেকে সমাপ্ত]।সুতরাং বুঝা গেল,কেউ যদি বৈধ নিয়তে বৈধ পশু শিকার করে; যেমন: বিক্রয়ের মাধ্যমে উপার্জন করা বা খাওয়া; তাহলে আলেমদের ঐক্যমতে সেটা শিকারে কোনো সমস্যা নেই।
.
.
এই পশু মাকরূহ হওয়ার পক্ষে দলীল হলো আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীস, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:مَنْ قَتَلَ عُصْفُورًا بِغَيْرِ حَقِّهِ ، سَأَلَهُ اللَّهُ عَنْهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ) .قِيلَ : وَمَا حَقُّهُ ؟. قَالَ : ( أَنْ تَذْبَحَهَا فَتَأْكُلَهَا ، وَلَا تَقْطَعْ رَأْسَهَا فَيُرْمَى بِهَا )“কেউ যদি অধিকার না দিয়ে চড়ুই পাখি হত্যা করে, আল্লাহ তাকে সেটার জন্য জিজ্ঞাসা করবেন।” জিজ্ঞাসা করা হল, এর অধিকার কী? তিনি উত্তর দিলেন: “এর অধিকার হলো এটাকে যবেহ করে খাওয়া এবং মাথাকে নিক্ষেপ না করা।” [হাদীসটি নাসাঈ (৪৩৪৯) ও দারেমী (১৯৭৮) বর্ণনা করেছেন। যাহাবী মুহায্যাব বইয়ে (৭/৩৬১৪) বলেছেন: এর সনদ ‘উত্তম’। ইবনুল মুলাক্কিন আল-বদরুল মুনীর (৯/৩৭৬) বইয়ে এটাকে ‘সহিহ’ বলেছেন। ইবনে কাসীর ইরশাদুল ফকীহ (১/৩৬৮) বইয়ে এটাকে ‘হাসান’ বলেছেন। শাইখ আলবানী সহীহুত তারগীবে (১০৯২) এটাকে ‘হাসান’ বলেছেন।]
.
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন:الصيد لحاجة جائز ، وأما الصيد الذي ليس فيه إلا اللهو واللعب فمكروه ، وإن كان فيه ظلم للناس بالعدوان على زرعهم وأموالهم فحرام“প্রয়োজনে শিকার করা জায়েয। আর যে শিকার শুধু বিনোদন বা খেল-তামাশার জন্য সেটা মাকরূহ। যদি এ শিকারের মাধ্যমে মানুষের ফসল ও সম্পদের ওপর সীমালঙ্ঘন করা হয় তাহলে সেটা হারাম।”[আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা (৫/৫৫০)]
.
শাইখ মনসুর আল-বুহূতী রাহিমাহুল্লাহ বলেন:يكره الصيد لهوا ؛ لأنه عبث ، وإن كان في الصيد ظلم الناس بالعدوان على زروعهم وأموالهم فهو حرام ؛ لأن الوسائل لها أحكام المقاصد“বিনোদনের জন্য পশু শিকার করা মাকরূহ। যেহেতু সেটি অনর্থক কাজ। আর যদি শিকার করতে গিয়ে মানুষের ফসল ও সম্পদের ওপর সীমালঙ্ঘনের মাধ্যমে জুলুম করা হয় তাহলে সেটা হারাম। কারণ উদ্দিষ্ট কাজের যে হুকুম উক্ত কাজের মাধ্যমেরও একই হুকুম।’[কাশ্শাফুল ক্বিনা (৬/২১৩)]
.
শাইখ ইবনে উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:فهذا مكروه ، ولو قيل بتحريمه لكان له وجه ؛ لأنه عبث ، وإضاعة مال ، وإضاعة وقت“এটা মাকরূহ। যদি এই কাজকে হারাম বলা হয়, তাহলেও সে মতটার গ্রহণযোগ্যতা থাকে। কারণ এটা অনর্থক কাজ। এতে অর্থ-সম্পদ ও সময় নষ্ট হয়।” [আশ-শারহুল মুমতি (১৫/৯৮) থেকে সমাপ্ত]।
.
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: فَلَوْ لَمْ يَقْصِدِ الِانْتِفَاعَ بِهِ حَرُمَ ؛ لِأَنَّهُ مِنَ الْفَسَادِ فِي الْأَرْضِ ، بِإِتْلَافِ نَفْسٍ عَبَثًا“যদি শিকারের দ্বারা উপকৃত হওয়ার উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে সেটা হারাম। কারণ তখন সেটা অনর্থক প্রাণ সংহারের মাধ্যমে যমীনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার অন্তর্ভুক্ত হয়।” [ফাতহুল বারী (৯/৬০২) থেকে সমাপ্ত]।
.
ফাতাওয়াল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ-তে আছে:أما قتله لمجرد اللعب واللهو فممنوع ؛ لما فيه من ضياع المال ، مع تعذيب الحيوان ، وقد نهى النبي صلى الله عليه وسلم عن ذلك“নিছক খেল-তামাশা ও বিনোদনের জন্য হত্যা করা নিষিদ্ধ। কারণ এতে অর্থ-সম্পদ নষ্ট হয় এবং পশুকে কষ্ট দেওয়া হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাজ করতে নিষেধ করেছেন।”(ফাতাওয়াল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ (২২/৫১২)
.
শাইখ বিন বায রাহিমাহুল্লাহ বলেন:إذا كان لمصلحة شرعية ليأكل أو يبيع كأن يصيد الحبارى والضبا والأرانب وغير هذا من الأشياء المباحة ليأكلها أو ليبيعها فلا بأس ، أما إذا كان يصيدها ليقتلها ويتركها فهذا لا ينبغي ، أقل أحواله الكراهة الشديدة فلا يصيد حيواناً مأكولاً إلا لمصلحة ، إما ليأكل أو ليطعمه الفقراء ويهديه ، أو يبيعه أما للعب فلا يجوز، فهذا لعب لا ينبغي للمؤمن أن يفعله، وقد روي عن النبي -صلى الله عليه وسلم- أنه نهى عن الصيد إلا لمأكلة، يعني ليؤكل وينتفع به”যদি খাওয়া বা বিক্রি করার মত কোন শরয়ী কল্যাণে শিকার করে; যেমন হাউবারা, হরিণ, খরগোশ বা অন্য কোন বৈধ প্রাণী খাওয়া বা বিক্রি করার জন্য শিকার করে তাহলে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু যদি হত্যা করার জন্য বা ফেলে রাখার জন্য শিকার করে তাহলে সেটা অনুচিত। এর সর্বনিম্ন অবস্থা হলো চূড়ান্ত মাত্রায় মাকরূহ হওয়া। তাই খাওয়ার উপযুক্ত কোনো প্রাণী তখনই শিকার করবে যখন এতে কোন কল্যাণ থাকবে। হয় সেটা নিজে খাবে নতুবা দরিদ্রদেরকে খাওয়াবে ও সেটা উপহার দিবে কিংবা বিক্রি করবে। কিন্তু বিনোদনের জন্য হলে জায়েয নেই। কোন মুমিনের এ বিনোদন করা উচিত না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি খাওয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া অন্যান্য উদ্দেশ্যে পশু শিকার করতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ পশু খাওয়া ও এর থেকে উপকৃত হওয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া।”[শাইখ ইবনে বাযের ওয়েবসাইট থেকে গৃহীত]
.
দুই: প্রাণীদের প্রজনন ও বাচ্চা জন্ম দেওয়ার মৌসুমে শিকার করা নিষিদ্ধ—এমন কোনো সুস্পষ্ট শরয়ী দলিল, নিষেধাজ্ঞা কিংবা নির্ভরযোগ্য আলেমের বক্তব্য আমাদের জানা নেই। তাই কেবল প্রজনন বা বাচ্চা জন্ম দেওয়ার মৌসুম হওয়ার কারণে শিকারকে হারাম বা নিষিদ্ধ বলা যাবে না। বরং এ সময়ে শিকার করার বিধানও মূলত সাধারণ বৈধতার নীতির অধীনেই থাকবে। তবে শিকারের কারণে যদি কোনো প্রাণীর প্রজনন ব্যাহত হয়, বাচ্চাগুলো অনাহারে মারা যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় কিংবা অন্য কোনো শরয়ী নিষেধাজ্ঞা বা ক্ষতির কারণ সৃষ্টি হয়, তাহলে সে বিষয়টি পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে।
.
শাইখ ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:ظاهر الحكم الشرعي أنه جائز ، ولكن الأفضل إذا كان في زمن إفراخها : أن لا يقتلها ، يعني : أن لا يصيدها إلا إذا كان يعرف مكان أفراخها ، ثم صادها وذهب لأفراخها وأخذها ، ثم ذبحها وانتفع بها“বাহ্যিক শরয়ী বিধান অনুযায়ী এটা জায়েয। তবে উত্তম হলো বাচ্চা জন্ম দেওয়ার সময়ে যেন তাকে হত্যা না করা হয়। অর্থাৎ বাচ্চাগুলোর অবস্থান জানার পরই শুধু শিকার করবে। শিকার করার পর বাচ্চাগুলো নিয়ে আসবে। তারপর সেগুলোও যবাই করে উপকৃত হবে।” [ফাতাওয়া নূরুন আলাদ্দারব (১/৭৫) থেকে সমাপ্ত]।
.
শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে ইব্রাহীম আলুশ শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: কিছু শিকার বা পাখি যদি সন্তানসম্ভবা হয় অথবা সেগুলোর যদি বাচ্চা থাকে, তাহলে সেগুলো কি ছেড়ে দেওয়া উচিত?
তিনি উত্তর দেন:ما سمعت فيه شيئاً [ يعني : لا أعلم دليلا من الشرع أنها تترك ] ؛ لكن فيه شيء من الخير إذا ترك أم الفراخ فهو شيء مناسب ، أما كون ذلك محرم فلا “আমি এ প্রসঙ্গে কিছু শুনিনি; (অর্থাৎ আমি এমন কোনো শরয়ী দলীল জানি না যেটা এই ধরনের শিকার ত্যাগ করতে বলে)। তবে বাচ্চার মা এমন পাখি ছেড়ে দেওয়ার মাঝে কিছু কল্যাণ আছে। এটাই উপযুক্ত কাজ। কিন্তু এই শিকার হারাম হবে না।” [ফাতাওয়া ওয়া-রাসাইলুশ শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ইব্রাহীম (১২/২২৩) থেকে সমাপ্ত]।
.
কিছু আলেম এমন মা-পাখি শিকার করাকে মাকরূহ বলেছেন, যেগুলোর ছোট বাচ্চা তাদের মুখাপেক্ষী। ফাতাওয়াল লাজনাহ আদ-দাইমাহ-তে এসেছে:لا يجوز قتل أمهاتها ، أو أخذها حية ، وأولادها صغار تحتاج إلى رعاية أمهاتها“বাচ্চার মা হত্যা করা কিংবা মায়ের পরিচর্যার মুখাপেক্ষী এমন বাচ্চা থাকা অবস্থায় বাচ্চার মাকে জীবিত অবস্থায় নিয়ে নেওয়া জায়েয হবে না।” [ফাতাওয়াল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ (২২/৫১২) থেকে সমাপ্ত]।
.
শাইখ ইবনে জিবরীন রাহিমাহুল্লাহ তায়ালা বলেন:يُكره صيد الطيور التي لها أفراخ صغيرة ؛ لأن في ذلك إضراراً بأفراخها ، وهكذا أيضًا يُكره أخذ أفراخها في حال صغرهم ؛ لأن في ذلك إضراراً بها لما ركَّب الله فيها من الرحمة لهم .أما إذا صادها وأخذ أفراخها ، فالظاهر أنه لا مانع من ذلك ؛ لأن الأصل إباحة الصيد المأكول“যে সমস্ত পাখির ছোট ছোট বাচ্চা আছে, সেগুলো শিকার করা মাকরূহ। কারণ এর মাধ্যমে বাচ্চাগুলোর ক্ষতি করা হয়। অনুরূপভাবে ছোট থাকা অবস্থায় বাচ্চা নিয়ে নেওয়া মাকরূহ। কারণ এমন কাজ করে বাচ্চাগুলোর মাকে কষ্ট দেওয়া হয়। আল্লাহ মায়ের স্বভাবে তাদের প্রতি মমতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন।তবে যদি মা-পাখি শিকার করে বাচ্চাগুলো নিয়ে নেয়, তাহলে বাহ্যত তাতে নিষেধাজ্ঞা নেই। কারণ যে শিকারকৃত পশু বা পাখি খাওয়া যায়, সেটা শিকার করা মৌলিকভাবে বৈধ।” [সমাপ্ত]।
.
পরিশেষে, শরিয়তের দৃষ্টিতে শিকারকৃত প্রাণী থেকে কোনো বৈধ উপকার গ্রহণের উদ্দেশ্যে শিকার করা জায়েয। তবে নিছক শখ, বিনোদন কিংবা খেল-তামাশার উদ্দেশ্যে কোনো প্রাণী শিকার করে হত্যা করা, অথচ তা থেকে কোনো উপকার গ্রহণ না করা, মাকরূহ; বরং একে হারাম বলারও অবকাশ রয়েছে। অন্যদিকে, পাখির প্রজনন ও বাচ্চা জন্ম দেওয়ার মৌসুমে শিকার করাকে নিষিদ্ধ করার মতো সুস্পষ্ট শরয়ী দলিল পাওয়া যায় না। তাই এ সময়ে শিকার করা মূলত বৈধ। তবে যেসব পাখির ছোট বাচ্চা রয়েছে এবং যেগুলো মায়ের পরিচর্যার মুখাপেক্ষী, সেসব পাখি শিকার না করাই উত্তম; কেননা এতে বাচ্চাগুলোর ক্ষতি ও অনাহারে মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। আর শিকারের কারণে যদি বাস্তব কোনো ক্ষতি, নিষ্ঠুরতা কিংবা শরিয়তবিরোধী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তাহলে সে অনুযায়ী বিধান পরিবর্তিত হবে। সুতরাং শিকারের ক্ষেত্রে বৈধ উদ্দেশ্য থাকা এবং প্রাণীদের প্রতি অযথা নিষ্ঠুরতা ও ক্ষতি সাধন থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য। মহান আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।(আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন;ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১৭১৬১৮; ১৫২২৬১)
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।