প্রশ্ন: বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য ভিসা ক্রয়-বিক্রয় করা এবং ভিসার ব্যবসা বা বাণিজ্য করা সম্পর্কে ইসলামী শরী‘আতের বিধান কী?
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য ভিসা ক্রয়-বিক্রয় কিংবা ভিসার ব্যবসা-বাণিজ্য করা জায়েয নাকি হারাম—তা ভিসার প্রকৃতি, ইস্যু করার পদ্ধতি, ভিসা প্রদানকারী রাষ্ট্রের আইন এবং ক্রয়-বিক্রয়ের ধরন ও উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভরশীল। যদি কোনো দেশের সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বৈধ অনুমোদনক্রমে ভিসা প্রদান করা হয় এবং আইনগতভাবে তা অন্যের কাছে হস্তান্তর বা বিক্রয়ের অনুমতি থাকে, তাহলে কোনো ব্যক্তি বৈধভাবে নিজের অর্থ, সময় ও শ্রম ব্যয় করে ভিসা প্রসেসিং, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত, নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ, সরকারি ফি প্রদান ইত্যাদি বৈধ সেবা প্রদান করলে, এসব সেবার বিনিময়ে শরী‘আতসম্মত পদ্ধতিতে যুক্তিসংগত পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েয। পক্ষান্তরে কোনো ভিসা যদি নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য ইস্যু করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী তা বিক্রি বা অন্যের কাছে হস্তান্তর করা নিষিদ্ধ থাকে, তাহলে সেটিকে পণ্য বানিয়ে তৃতীয় পক্ষের নিকট ক্রয়-বিক্রয় করা বা এর মাধ্যমে ব্যবসা করা জায়েয নয়; কারণ এতে চুক্তি ও আইন লঙ্ঘন, প্রতারণা ও ধোঁকাবাজির মতো শরী‘আতবিরোধী বিষয় জড়িয়ে থাকে। একইভাবে ঘুষ, প্রতারণা, জালিয়াতি, মিথ্যা তথ্য প্রদান, অবৈধ দালালি, রাষ্ট্রীয় আইন লঙ্ঘন কিংবা মানুষের প্রয়োজন ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে ভিসা ক্রয়-বিক্রয় বা ব্যবসা করা হারাম। অতএব, একজন মুসলিমের জন্য বৈধ ও স্বচ্ছ পন্থায় উপার্জন করা, চুক্তি ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের বৈধ আইন-কানুনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা এবং প্রতারণা ও অন্যায় উপার্জনের সকল পথ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।আল্লাহ্ তাআলা বলেন, “তোমরা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ কর। নিশ্চয় প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”[সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ৩৪] এছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাই্হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “মুসলিমরা নিজেদের (চুক্তিপত্রের) শর্তগুলো পালন করতে বাধ্য।”(তিরমিযী হা/১৩৫২; ও আবু দাউদ হা/৩৫৯৪)
.
জেনে রাখা আবশ্যক যে, আমাদের জানা মতে, কোনো দেশের সরকারই ভিসা ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুমোদন প্রদান করেনি। বিশেষত, সৌদি আরবে ভিসা ক্রয়-বিক্রয় একটি দণ্ডনীয় অপরাধ; এ অপরাধের জন্য প্রতিটি ভিসার বিপরীতে ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) সৌদি রিয়াল পর্যন্ত আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে। শুধু রাষ্ট্রীয় আইন ও বিধি-বিধানের দৃষ্টিতেই নয়, সৌদি আরবের বিশিষ্ট ও প্রখ্যাত আলেমগণও ভিসা ক্রয়-বিক্রয় ও এর ব্যবসা-বাণিজ্যকে শরী‘আতসম্মত মনে করেননি; বরং এতে মিথ্যা, প্রতারণা, ধোঁকাবাজি, অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জন এবং দেশের সরকারি আইন ও বিধি-বিধান লঙ্ঘনের মতো শরী‘আতবিরোধী বহু বিষয় জড়িত থাকার কারণে তাঁরা একে হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছেন। অতএব, রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা জেনে-শুনেও যারা ভিসার ব্যবসা করে এবং যারা বিদেশে গমনের উদ্দেশ্যে এ ধরনের ভিসা ক্রয় করে, উভয় পক্ষই এ অবৈধ কাজে জড়িত হওয়ার কারণে গুনাহগার হবে। কেননা, পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করা হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন: وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ — “তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।” [সূরা আল-মায়েদা: ২] এ বিষয়ে সৌদি আরবের কয়েকজন বিশিষ্ট আলেমের ফতোয়া ও বক্তব্য নিম্নে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]- কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:কতিপয় মানুষ বিদেশী শ্রমিক আনার জন্য ভিসা বের করে। কিন্তু উদ্দেশ্য থাকে, ভিসাগুলো অন্যদের কাছে বিক্রয় করবে। পরে যাদের কাছে সেগুলো বিক্রয় করে তারা যে কাজের উদ্দেশ্যে ভিসা বের হয়েছিল সে কাজ বাদ দিয়ে শ্রমিকদেরকে অন্যত্র অন্য কাজ করার সুযোগ দেয়। এর ফলে তারা ঐ সকল শ্রমিকদের সাথে চুক্তি মাফিক প্রতিমাসে কিছু অর্থ গ্রহণ করে। অনুরূপভাবে ইকামা (রেসিডেন্ট পারমিট) নবায়ন করার সময়ও টাকা নেয়। যারা এ কাজ করে তাদের জন্য তা হালাল না কি হারাম?
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:بسم الله، والحمد لله، هذا العمل لا يجوز، بل هو غش وخداع، وكذب لا يجوز، فلا يأخذ العمال إلا ليعملوا لنفسه، إما ليعملوا لبناء أو لمزرعة أو غيرها، أما أن يكذب ليأخذ تأشيرات ورخصا ثم يبيعها فهذا لا يجوز؛ لأنه كذب على الدولة، وقد يكون فتح باب شر على المسلمين باستقدامه أولئك العمال، بل على الإنسان أن يطلب من الدولة على قدر حاجته، وعلى حسب نظام الدولة، لا يزيد ولا ينقص ولا يكذب، وقد صدر قرار من هيئة كبار العلماء منذ سنوات في منع هذا وبيان أنه منكر ولا يجوز، وليس له أن يستقدم ولا يأخذ إلا بقدر حاجته من غير كذب، وأخذ المال بهذه الطريقة أخذ للحرام بالكذب والسحت، نسأل الله السلامة “বিসমিল্লাহ,ওয়াল হামদুলিল্লাহ-সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।এ কাজটি নাজায়েজ। বরং এটি ধোঁকাবাজি, প্রতারণা এবং মিথ্যাচার। এটা জায়েয হতে পারে না।তারা নিজেদের কাজ ছাড়া শ্রমিক নিতে পারবে না। বিল্ডিং নির্মাণ, ক্ষেত-খামার বা অন্য কাজের জন্য শ্রমিক আনবে। কিন্তু মিথ্যা বলে ভিসা উঠিয়ে সেগুলো বিক্রয় করবে-এটা জায়েয হবে না। এটা রাষ্ট্রের সাথে মিথ্যাচার। হতে পারে এ সকল শ্রমিক আনার মাধ্যমে মুসলিমদের জন্য ক্ষতির রাস্তা উন্মুক্ত হয়ে যাবে। সুতরাং করণীয় হল, সরকারের আইন মেনে যতজন শ্রমিক প্রয়োজন কেবল ততটি ভিসার দরখাস্ত করবে। কমও না বেশিও না এবং কোনভাবেই মিথ্যার আশ্রয় নিবে না।বহু বছর পূর্বে উচ্চ উলামা পরিষদ (হাইআতু কিবারিল উলামা) এ কাজ নিষিদ্ধ করার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত জারি করেছে এবং স্পষ্ট করেছে যে, এটি একটি মুনকার (গর্হিত ও নিন্দনীয়) কাজ এবং জায়েয নয়।তাই কোনো ব্যক্তির জন্য নিজের প্রয়োজনের পরিমাণ ছাড়া অতিরিক্ত শ্রমিক আনার বা ভিসা গ্রহণের অধিকার নেই। মিথ্যার মাধ্যমে এভাবে অর্থ গ্রহণ করা হলো মিথ্যার আশ্রয়ে হারাম ও অবৈধ সম্পদ উপার্জন করা। আমরা আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা ও সুস্থতা কামনা করি।”(কিতাবুদ দাওয়া, ফাতাওয়া ইবনে বায রহিমাহুল্লাহ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৯০-১৯৯; ফাতওয়া প্রদানের তারিখ: ১০/০৬/১৪২৩ হি.)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: কিছু লোক একটি ভিসা বের করল যার খরচ প্রায় তিন হাজার রিয়াল, তারপর তিনি সেটিকে আট অথবা দশ হাজার রিয়ালে অন্য ব্যক্তির নিকট বিক্রি করে দিল যাতে করে সে তার ভাইকে আনতে পারে । সুতরাং এ ক্ষেত্রে হুকুম কি হতে পারে??
উত্তরে তিনি বলেছেন:”(الفيزة) الرخصة يعني يأخذ رخصة من الوزارة لاستقدام عامل، ثم يبيع هذه الرخصة على أحد يستقدم عاملاً، فهذا حرامٌ ولا يجوز؛ لأننا نقول: إن كنت محتاجاً إلى هذا العامل فالفيزة بيدك، وإن لم تكن محتاجاً فرد الفيزة إلى من أخذتها منه، ولا يحل لك أن تبيعها . . . ثم هذا كذب؛ إذا أخذ فيزة على أنه يستقدم عاملاً ثم باعها صار كاذباً”ভিসা লাইসেন্সের বা অনুমতিপত্রের অর্থ হল মন্ত্রণালয় থেকে লাইসেন্স নেওয়া একজন কর্মী নিয়োগের জন্য, তারপর এই লাইসেন্সটি এমন কারও কাছে বিক্রি করে দেওয়া যে একজন কর্মী নিয়োগ করতে চাচ্ছে, এটি হারাম, জায়েজ নয়, কেননা আমরা বলি: যদি আপনার এই শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, তাহলে ভিসাটি আপনার হাতে আছে, যদি আপনার প্রয়োজন না হয়, তাহলে আপনি যার কাছ থেকে ভিসা নিয়েছেন তাকে ফেরত দিয়ে দিন এবং এটি বিক্রি করা আপনার জন্য জায়েজ নয়। অতঃপর এটা হচ্ছে মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত। যদি সে ভিসা গ্রহণ করে একজন কর্মীকে নিয়োগ করার উদ্দেশ্যে করে থাকে, তারপর সে ভিসা বিক্রি করে দেয় তাহলে সে মিথ্যুক বলে গণ্য হবে।”(ইবনু উসাইমীন; লিকাউল বাবিল মাফতুহ: ১৫/১৭০)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: আমি একজন ৩৩ বছরের যুবক, আমার আর্থিক অবস্থা দুর্বল, কোন এক দিন একজন ভাই এসেছে সে জাতিগতভাবে পাকিস্তানের মুসলিম নাগরিক ।আমার কাছে থেকে তার জন্য কয়েকটা ভিসা চেয়েছিল তার কিছু আত্মীয়-স্বজনকে পাকিস্তান থেকে নিয়ে আসার জন্য আমাকে প্রত্যেকটা ভিসার জন্য সাত হাজার রিয়াল দেওয়ার বিনিময় দিতে চেয়েছিল। আমি আমার আর্থিক অবস্থা এবং এই অর্থের প্রয়োজনের কারণে এটি করেছি। আমি তার কাছ থেকে চারটি ভিসার মূল্য পেয়েছি। ঐ সমস্ত লোকেদের নিয়ে এসেছিল যাদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভিসা কেনা হয়েছিল, বর্তমানে তারা চার বছর ধরে দেশের মধ্যে নিজস্ব অ্যাকাউন্টে কাজ করছে। আমার প্রশ্ন হলো:এই সম্পদ যেটা আমি তাদের কাছ থেকে নিয়েছি! এই টাকা কি হালাল নাকি হারাম? উল্লেখ্য যে, উল্লেখিত ব্যক্তিগণ আমাকে যে পরিমাণ অর্থ দিয়েছিলো তার কয়েকগুণ উপার্জন করেছে এবং তারা সউদি আরবে থেকে অর্থিক আয়-উপার্জন করে তাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট।(দয়া করে আমাকে পরামর্শ দিন, আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।) তারা উত্তর দিয়েছেন: “هذا المال حرام ؛ لأنه عوض عن الكفالة ، وهي من عقود الإحسان ، وأيضا كذب ؛ لأنه مخالف للأنظمة التي وضعتها الدولة للمصلحة العامة “এই অর্থ হারাম। কারণ তা কাফালা (স্পন্সরশীপ) এর বিনিময় মূল্য গ্রহণের নামান্তর। অথচ স্পন্সরশীপ হল, একটি দাতব্য চুক্তি। আরও কারণ হল, এখানে মিথ্যার আশ্রয় নেয়া হয়েছে- যেহেতু এটি জনস্বার্থে প্রণীত সরকারী আইনের লঙ্ঘন।” (ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; গ্রুপ: ২; খণ্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ১৮৯)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, আমি প্রায় চার বছর আগে বিদেশী কর্মী নিয়ে এসেছি, এবং আমি এখানে একজনের ভিসা বিক্রি করে দিয়েছিলাম, সে পাকিস্তানের হোক বা মিশরের হোক, এই শর্তে যে সে কর্মীদের নিয়ে আসবে এবং তাদের নিজস্ব উপায়ে কাজ করবে। আমার নিকট কোনো সংগঠন ছিলো না। এটি আমার এবং তাদের মধ্যে শর্ত ছিল, একটি চুক্তি ছিল যে প্রতি শেষ মাসে এক শতাংশ প্রদান করা হবে তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়। আল্লাহ আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন, আমি আল্লাহর কাছে তওবা করেছি। সম্মানিত শায়েখ এটি আমি আল্লাহর কাছে আশা করি আপনাদের কাছ থেকে আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন। কিছু শ্রমিক তাদের দেশে চলে গেছে, আমি তাদের ঠিকানা জানি না, অন্যরা সেখানে আছে, কিন্তু আমি তাদের কাছ থেকে কিছুই নেয়নি। তাঁরা উত্তরে বলেছেন:
بيع الفيز لا يجوز؛ لأن في بيعها كذبا ومخالفة واحتيالا على أنظمة الدولة، وأكلا للمال بالباطل، قال الله تعالى: (وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ) وعلى ذلك فإن ثمن الفيز التي بعتها والنسب التي تأخذها من العمال كسب محرم، يجب عليك التخلص منه، وإبراء ذمتك منه، فما حصلت عليه من ثمن الفيز تنفقه في وجوه البر والخير، من فقراء وإنشاء وبناء مرافق تنفع المسلمين.وأما الأموال التي أخذتها من العمال أنفسهم نسبة في كل شهر، فإنه يجب عليك ردها إليهم إن كانوا موجودين، أو تيسر إيصالها إليهم في بلدهم على عناوينهم. وإن تعذر معرفتهم أو إيصالها إليهم فإنك تتصدق بها عنهم؛ لأن هذه النسبة اقتطعت منهم بغير حق، وبدون عوض، وعليك الاستمرار في التوبة من هذا العمل، وعدم العودة إليه مستقبلا، ومن ترك شيئا لله عوضه الله خيرا منه، قال الله تعالى: (وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ) “
“ভিসা বিক্রি করা জায়েজ নয়, কারণ এই বিক্রির মাঝে রয়েছে মিথ্যা বলা, রাষ্ট্রের বিধি লঙ্ঘন , প্রতারণা এবং অবৈধভাবে অর্থ গ্রহণ। আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে বুঝে অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে বিচারকদের কাছে পেশ করো না”।(সূরা বাকারা ১৮৮)। এর ভিত্তিতে, আপনি যে ভিসাগুলো বিক্রি করেছেন এবং শ্রমিকদের নিকট থেকে যে কমিশন (শতাংশ) নিয়েছেন তা হারাম উপার্জন। আপনার ওপর আবশ্যক হলো তা থেকে দায়মুক্ত হওয়া। সুতরাং, ভিসার মূল্য বাবদ যা অর্জন করেছেন তা জনকল্যাণমূলক কাজে—যেমন দরিদ্রদের সহায়তা করা এবং মুসলমানদের উপকারে আসে এমন অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করে দেবেন।
পক্ষান্তরে, শ্রমিকদের নিকট থেকে প্রতি মাসে যে অর্থ কেটে রাখা হয়েছে, তারা যদি উপস্থিত থাকে অথবা তাদের নিজ দেশের ঠিকানায় তা পৌঁছানো সহজ হয়, তবে তা অবশ্যই তাদের নিকট ফেরত দিতে হবে। যদি তাদের পরিচয় জানা অসম্ভব হয় বা তাদের নিকট পৌঁছানো না যায়, তবে তাদের পক্ষ থেকে তা সদকা করে দেবেন। কারণ এই অংশ তাদের কাছ থেকে কোনো রকম অধিকার ও বিনিময় ছাড়াই অন্যায়ভাবে কেটে নেওয়া হয়েছিল।আপনাকে অবশ্যই এই কাজ থেকে তওবা অব্যাহত রাখতে হবে এবং ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। আর যে কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো কিছু ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম বিনিময় দান করেন। মহান আল্লাহ বলেন: {আর যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য মুক্তির পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না} [সূরা তালাক: ২-৩; ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; গ্রুপ: ২; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ৭৯)
.
সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সা‘ঊদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অনুষদ সদস্য ও অধ্যাপক,আকিদা ও ফিকহের প্রাজ্ঞ পণ্ডিত, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আল-বাররাক (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫২ হি./১৯৩৩ খ্রি.]- কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:হজ্জ ভিসা বিক্রি করার হুকুম কি? যে ভিসাগুলো বের করা অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার।
উত্তরে শাইখ হাফিজাহুল্লাহ বলেন:لا يجوز للإنسان أن يأخذ تأشيرة لنفسه وهو لا يريد الحج، فإن أخذ تأشيرة لنفسه وهو يريد الحج ثم عدل عن ذلك ، فليس له أن يبيعها إلا بنفس التكلفة التي بذلها في سبيل الحصول عليها . ومعنى ذلك أنه لا يجوز أن تتخذ تأشيرات الحج تجارة يستغلّ بها ضعفاء المسلمين والحريصين على الحج، بل ينبغي للمسلم أن يكون معيناً على الخير، وأن يساعد إخوانه المسلمين لا أن يستغلهم والله أعلم.”সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।যে ব্যক্তি নিজে হজ্জ করতে চায় না তারজন্য হজ্জ ভিসা বের করা জায়েয নেই। যে ব্যক্তি হজ্জ করার ইচ্ছায় ভিসা নিয়েছেন কিন্তু পরে তাকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়েছে সে ব্যক্তির ভিসা পেতে যা খরচ হয়েছে তিনি তার খরচের দামেই ভিসাটি বিক্রি করবেন। অর্থাৎ হজ্জের ভিসা বিক্রিকে একটা ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করা, দুর্বল ও হজ্জ করতে তীব্র আগ্রহী মুসলমানদেরকে এর খদ্দের বানানো নাজায়েয। বরং মুসলিমের দায়িত্ব হচ্ছে- অপর মুসলমান ভাইকে ভাল কাজে সাহায্য, সহযোগিতা করা। তাদেরকে ব্যবসায়ের গুটি বানানো নয়।আল্লাহই ভাল জানেন”।(ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১৪২২৮)
.
পরিশেষে, উপরোক্ত কুরআন-সুন্নাহর দলিল, রাষ্ট্রীয় বিধি-বিধান এবং সম্মানিত আলেমগণের ফাতওয়ার আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র কর্তৃক নির্দিষ্ট ব্যক্তি, নিয়োগকর্তা বা নির্দিষ্ট কাজের জন্য প্রদত্ত ভিসা প্রকৃত প্রয়োজন ছাড়া সংগ্রহ করে তা ক্রয়-বিক্রয় করা, অন্যের কাছে হস্তান্তর করা কিংবা ভিসার বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করা শরী‘আতসম্মত নয়; বরং এতে মিথ্যা, প্রতারণা, ধোঁকাবাজি, চুক্তি ও সরকারি আইন লঙ্ঘন এবং অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করার মতো একাধিক নিষিদ্ধ বিষয় জড়িত থাকে। একইভাবে ভিসা বিক্রির পর শ্রমিকদের কাছ থেকে মাসিক নির্ধারিত অর্থ, শতাংশ বা অন্য কোনো বিনিময় গ্রহণ করাও জায়েয নয়। অতএব, মুসলিমের কর্তব্য হলো এ ধরনের অবৈধ লেনদেন থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা এবং হালাল ও স্বচ্ছ পন্থায় জীবিকা উপার্জন করা। আর কেউ পূর্বে এ কাজে জড়িত হয়ে থাকলে তার জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে তাওবা করা, এ কাজ সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা এবং হারামভাবে অর্জিত অর্থ প্রকৃত মালিকের কাছে ফেরত দেওয়া আবশ্যক; মালিককে খুঁজে পাওয়া বা অর্থ পৌঁছানো সম্ভব না হলে তা সওয়াবের নিয়ত না করে দরিদ্র-অসহায় ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করে সেই হারাম সম্পদ থেকে দায়মুক্ত হতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিযিকের ওপর সন্তুষ্ট থাকার, হারাম উপার্জন থেকে বেঁচে থাকার এবং তাঁর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার তাওফীক দান করুন। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।