প্রশ্ন: মানত কী? শরীয়তে মানতের বিধান কী? মানত কত প্রকার ও কি কি? মানত পূরণ করার বিধান কি?
▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর:মানত সংক্রান্ত পুরো বিষয়টি আমরা ধারাবাহিক ভাবে পয়েন্ট আকারে উল্লেখ করব ইনশাআল্লাহ।
.
মানত কী?
.
মানতের আরবি শব্দ হচ্ছে (نذر (নযর) যার বাংলা অর্থ হচ্ছে: নিজের দায়িত্বে নেয়া।অর্থাৎ যা নিজের দায়িত্ব নয় তা নিজের জন্য অপরিহার্য করে নেয়া। আসফাহানী (রাহিমাহুল্লাহ) ‘মুফরাদাতু আলফাযিল কুরআন’ গ্রন্থে (পৃ. ৭৯৭) বলেন: মানত হচ্ছে— কোনো কিছু ঘটার সাথে আপনি নিজের উপর এমন কিছু করা আবশ্যক করে নেয়া; যা আবশ্যক নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمَنِ صَوْمًا “আমি আর-রহমানের (আল্লাহর) জন্য রোযা মানত করেছি।”(সূরা মারইয়াম: ২৬) সুতরাং মানত হচ্ছে শরীয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজের উপর কোনো কিছু আবশ্যক করা, হোক সেটি (তৎক্ষণাৎ) কার্যকর কিংবা (কিছুর সাথে) শর্তযুক্ত। আল্লাহর কিতাবে মানতকে প্রশংসার স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের ব্যাপারে বলেন:إِنَّ الْأَبْرَارَ يَشْرَبُونَ مِن كَأْسٍ كَانَ مِزَاجُهَا كَافُورًا عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللَّهِ يُفَجِّرُونَهَا تَفْجِيرًا يُوفُونَ بِالنَّذْرِ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَ شَرُّهُ مُسْتَطِيرًا “সৎকর্মশীলরা এমন এক পেয়ালা থেকে পান করবে (যার শরাবে) কাফূরের মিশ্রণ থাকবে। এমন একটি ঝরনা যা থেকে আল্লাহর বান্দারা পান করবে এবং তারাই একে যথাযথভাবে (নিজেদের সুবিধামত) প্রবাহিত করবে। তারা (তাদের) মানত পূরণ করে (কর্তব্য পালন করে) এবং এমন একটি দিনকে ভয় করে যার অনিষ্ট হবে ব্যাপক।”[সূরা দাহর: ৫-৭] কিয়ামতের দিনের ভয়াবহতার ব্যাপারে তাদের শঙ্কা এবং মানত পূরণ করাকে আল্লাহ তাআলা তাদের নাজাত লাভ ও জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য করেছেন।
.
শরীয়তে মানতের বিধান:
.
ইসলামে (নযর) মানত করাকে নিরুৎসাহিত করেছে। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের অধিকাংশ ইমাম ও ফিকহবিদের অভিমত অনুসারে (নযর) মানত করা মাকরূহ বা অপছন্দনীয় কাজ।কারন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানত করতে নিষেধ করেছেন। আর মানত আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ভাগ্যকে পরিবর্তন করতে পারে না।বরং এটি কৃপণের সম্পদ থেকে কিছু অংশ বের করে আনে মাত্র।যেমন: রাসূল (ﷺ) বলেছেন:لَا تَنْذُرُوا فَإِنَّ النَّذْرَ لَا يُغْنِي مِنَ الْقَدَرِ شَيْئًا وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ من الْبَخِيل”তোমরা মানৎ করো না। কেননা মানৎ তাকদীরের কোনই পরিবর্তন করতে পারে না। অবশ্য এর দ্বারা কৃপণের ব্যয়-নির্বাহ হয় মাত্র”।(সহীহ বুখারী হা/ ৬৬০৯,সহীহ মুসলিম হা/১৬৪০) অপর বর্ননায় তিনি (ﷺ) আরো বলেছেন:النَّذْرُ لاَ يُقَدِّمُ شَيْئًا وَلاَ يُؤَخِّرُهُ وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ مِنَ الْبَخِيلِ “মানত কোনো কিছুকে আগেও করে না, পিছেও করে না। বরং এর দ্বারা কেবল কৃপণ ব্যক্তি থেকে বের করা হয়।”(সহীহ মুসলিম হা/৪৩২৬)
.
তবে হা! ইসলাম মানত করার ব্যাপারে অনুৎসাহিত করা হলেও বৈধ কাজের মানত করা হলে তা পূরণ করা আবশ্যক। যেমন কেউ যদি কোন ইবাদত বা নেক আমল করার মানত করলে সেটা পূর্ণ করা ওয়াজিব। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন:ثُمَّ لْيَقْضُوا تَفَثَهُمْ وَلْيُوفُوا نُذُورَهُمْ“তারপর তারা যেন তাদের ময়লাগুলো দূর করে এবং মানতগুলো পূরণ করে।”[সূরা হজ্জ: ২৯] ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: নির্দেশ ওয়াজিব সাব্যস্ত করে। পাশাপাশি শর্তযুক্ত মানতের উদাহরণ হলো: কেউ যদি বলে:কেউ একদিন বা দুইদিন রোযা রাখার মানত করল,আবার কোনও অসুস্থ ব্যক্তি মানত করে আমি যদি সুস্থ হই তাহলে একটি উমরাহ পালন করব।কিংবা কেউ যদি বলে: ‘আল্লাহ যদি আমার রোগীকে সুস্থ করে দেন, তাহলে আমি অমুক ব্যক্তিকে ওমরায় পাঠাবো।এখানে মানতের বিষয়টি শরিয়ত অনুমোদিত একটি ইবাদত ও আল্লাহর আনুগত্যের বিষয়।মানতের শর্ত পূরণ হলে এ মানত পূর্ণ করা ওয়াজিব।কারণ এটি একটি আনুগত্যের মানত। হাদিসে এসেছে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: (مَن نذر أن يطيع الله فليطعه )”যে ব্যক্তি আল্লাহ্র কোন আনুগত্য করার মানত করল তাকে ঐ আনুগত্য পালন করতে হবে।”(সহিহ বুখারী হা/৬৩১৮) শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন: لو نذر أن يأتي المسجد الحرام لحج أو عمرة؛ فإن هذا يلزمه بلا نزاع.”যদি কেউ মানত করে যে, সে হজ বা উমরার জন্য মসজিদুল হারামে যাবে, তবে এটি তার জন্য অবশ্যই পালনীয়—এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই।”(মাজমু’ আল-ফাতাওয়া” ২৭তম খণ্ড;পৃষ্ঠায়;৩৩৪)
.
প্রশংসনীয় ও নিষিদ্ধ মানতের মধ্যকার পার্থক্য:
কেউ যদি বলে: মানত পূরণকারীদের প্রশংসা করার পর আবার কীভাবে তা করতে নিষেধ করা হয়? তাহলে এর উত্তর হলো: প্রশংসনীয় মানত হচ্ছে কোনো কিছুর সাথে শর্তযুক্ত না করে নিছক আনুগত্যমূলক মানত। মানুষ নিজেকে আনুগত্যমূলক কাজে বাধ্য করতে এবং অলসতা থেকে নিবৃত করতে কিংবা নিয়ামতের শুকরিয়া হিসেবে এ ধরনের মানত করে থাকে।অন্যদিকে নিষিদ্ধ মানত কয়েক প্রকার। তন্মধ্যে রয়েছে: কোনো কিছুর বিনিময়মূলক মানত, যেখানে মানতকারী আনুগত্যকে কোনো কিছু প্রাপ্তি কিংবা প্রতিহত করার সাথে শর্তযুক্ত করে রাখে; ফলে সে ঐ বস্তু না পেলে সে আনুগত্যমূলক কাজটি করে না। এ ধরনের মানতের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য। সম্ভবতঃ এই নিষেধাজ্ঞায় নিহিত প্রজ্ঞা নিম্নরূপ:
.
(১).মানতকারী অনীহা নিয়ে মানত পূরণ করে; যেহেতু এটি হঠাৎ করে তার উপর আবশ্যক হয়ে গিয়েছে।
.
(২).মানতকারী যখন কোনো কিছু প্রাপ্তির শর্তে (আল্লাহর) নৈকট্যমূলক কাজ করার মানত করেছে, তখন তার এই মানত হয়ে পড়েছে বিনিময়; যা নৈকট্য অর্জনকারীর নিয়তে সমস্যা সৃষ্টি করে। যেমন: তার রোগী সুস্থ না হলে সুস্থতার সাথে সে যে পরিমাণ দান করাকে শর্তযুক্ত করেছিল সেটি সে করবে না। আর এটি কৃপণ ব্যক্তির অবস্থা। এই ব্যক্তি তাৎক্ষণিক বিনিময় ছাড়া নিজের সম্পদ থেকে কিছু দেয় না। সাধারণত সে যে পরিমাণ নিজ সম্পদ থেকে দান করে থাকে, তার থেকে অতিরিক্ত পরিমাণ কেবল সে এই বিনিময়ের কারণেই প্রদান করে থাকে।
.
(৩).কিছু মানুষের এ ধরনের জাহেলী বিশ্বাস আছে যে, সে যে উদ্দেশ্যে মানত করেছিল সেটি মানত করার কারণেই পূরণ হবে অথবা আল্লাহ মানতকারীকে তার মানতের জন্য উদ্দেশ্য পূরণ করে দিবেন।
.
(৪).কিছু অজ্ঞ ব্যক্তির মনে থাকা এক ধরনের বিশ্বাস নাকচ করা। সে বিশ্বাসটি হচ্ছে: মানত তাকদীরকে প্রতিহত করে অথবা তার জন্য তৎক্ষণাৎ ভালো কিছু নিয়ে আসে অথবা মন্দ কিছু দূর করে দেয়। অজ্ঞ ব্যক্তির এমন বিশ্বাসের আশঙ্কায় মানতকে নিষেধ করা হয়েছে। পাশাপাশি এ ধরনের বিশ্বাস আকীদার বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে কতটা ভয়াবহ সেটির দিকে সতর্ক করাও এর উদ্দেশ্য।
.
পূরণ করা ওয়াজিব হওয়ার বিবেচনা থেকে মানতের প্রকারভেদ:
(১). যে মানত পূরণ করা আবশ্যক (আনুগত্যের মানত): যে মানত আল্লাহর আনুগত্যে হয়ে থাকে। যেমন: নামায, রোযা, উমরা, হজ্জ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, ইতিকাফ, জিহাদ, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ। যেমন: যদি সে বলে, আমার উপর আল্লাহর জন্য এই পরিমাণ রোযা রাখা বা এই পরিমাণ দান করা আবশ্যক। কিংবা যদি সে বলে, আমার উপর আল্লাহর জন্য এই বছর হজ্জ করা আবশ্যক অথবা আল্লাহ আমার রোগীকে সুস্থ করার যে নিয়ামত দিয়েছেন তার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এ বছর মসজিদে হারামে দুই রাকাত নামায পড়া আমার উপর আবশ্যক। অথবা শর্তযুক্ত মানত; যেমন: কেউ যদি আল্লাহর নৈকট্যমূলক কোনো নেকীর কাজ করার মানত করে, তবে সেটা কোনো উপকারপ্রাপ্তির সাথে শর্তযুক্ত করে; যদি উপকারটি লাভ হয় সে নেকীর কাজটি করবে। উদাহরণস্বরূপ কেউ এভাবে বলা: যদি আমার হারানো ব্যক্তি ফিরে আসে অথবা যদি আল্লাহ আমাকে আমার শত্রুর অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন তাহলে এতটি রোজা রাখা বা এ পরিমাণ সদকা করা আমার উপর আবশ্যক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “কেউ যদি মানত করে যে সে আল্লাহর আনুগত্য করবে, সে যেন তার আনুগত্য করে। আর কেউ যদি মানত করে যে তার অবাধ্যতা করবে, সে যেন তার অবাধ্যতা না করে।”[হাদীসটি বুখারী (৬২০২) বর্ণনা করেন]
মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ, গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে:” اتفق الفقهاء على جواز تعليق النذر بالشرط , ولا يجب الوفاء قبل حصول المعلق عليه ; لعدم وجود سبب الوفاء , فمتى وجد المعلق عليه وجد النذر ولزم الوفاء به “ফকিহগণ একমত যে, শর্তযুক্ত মান্নত করা জায়েজ। তবে, যে শর্তের ওপর মান্নত নির্ভরশীল, তা পূর্ণ হওয়ার আগে মান্নত আদায় করা আবশ্যক নয়; কেননা, তখনো মান্নত আদায়ের কারণ অস্তিত্বে আসেনি। ফলে, যখন শর্ত পূর্ণ হবে, তখনই মান্নত কার্যকর হবে এবং তা পূরণ করা ওয়াজিব হবে।”(আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ; খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ৩১৫) হানাফি মাযহাবের আলেম ইমাম কাসানি’ বলেন: ” وإن كان معلقاً – أي : النذر – بشرط نحو أن يقول : إن شفى الله مريضي ، أو إن قدم فلان الغائب ، فلله عليّ أن أصوم شهراً أو أصلي ركعتين أو أتصدق بدرهم ، ونحو ذلك فوقته وقت الشرط ، فما لم يوجد الشرط ، لا يجب ؛ بالإجماع “যদি নজর কোনো শর্তের সাথে সম্পৃক্ত হয়, যেমন কেউ বলে— ‘যদি আল্লাহ আমার রোগীকে সুস্থ করেন’ অথবা ‘আমার অমুক প্রবাসী ফিরে এলে, তাহলে আমার উপর এক মাস রোযা রাখা, দুই রাকাত নামাজ আদায় করা বা এক দিরহাম সদকা করা ওয়াজিব হবে’, তাহলে এই নজরের সময় সেই শর্ত পূরণের পরই শুরু হবে। তাই শর্ত পূরণের আগে এটি পালন করা বাধ্যতামূলক নয়; এ বিষয়ে সর্বসম্মত মত রয়েছে।”(বাদায়েউস সানায়ি; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৯৪)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] ব্যথা কমার শর্তে মানত করা হলে সেটি কখন পূরণ করতে হবে এমন প্রশ্ন করা হলে জবাবে শাইখ :বলেছেন” إذا وجد الشرط المذكور وهو خفة الألم، فالواجب عليك الوفاء بالنذر فور”যদি (মানতের) উল্লিখিত শর্তটি পূর্ণ হয়,অর্থাৎ ব্যথা কমে যায়,তাহলে মানতকারীর উপর তার মানত অবিলম্বে পালন করা বাধ্যতামূলক…”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড/২২; পৃষ্ঠা: ১৬৬)
.
আবার কেউ যদি আল্লাহর আনুগত্যমূলক কোনো মানত করে, তারপর এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় যা তার মানত পূরণে প্রতিবন্ধক হয়; যেমন: সে যদি এক মাস রোযা রাখা অথবা হজ্জ করা অথবা উমরা করার মানত করে কিন্তু কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে রোযা রাখা, হজ্জ করা অথবা উমরা করতে অক্ষম হয় কিংবা দান করার মানত করে, কিন্তু দরিদ্র হয়ে যায় ফলে মানত পূরণ করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে, তাহলে সে মানতের কাফ্ফারা হিসেবে শপথ ভঙ্গের কাফ্ফারা দিবে। যেমনটি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: “কেউ যদি এমন কোনো মানত করে যা পূরণ করতে সে সক্ষম নয়, তাহলে এর কাফফারা হলো শপথ ভঙ্গের কাফ্ফারা।”[হাদীসটি আবু দাউদ বর্ণনা করেন। হাফেয ইবনে হাজার বুলুগুল মারাম গ্রন্থে বলেন: হাদীসটির সনদ সহীহ। হাদীসের হাফেযরা বর্ণনাটি মাওকূফ (সাহাবী থেকে বর্ণিত) হওয়ার মতটি প্রাধান্য দিয়েছেন] শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ ‘আল-ফাতাওয়া’ গ্রন্থে বলেন: ‘কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর কোনো আনুগত্য করার মানত করে তাহলে তার উচিত এই মানত পূরণ করা। কিন্তু, যদি আল্লাহর জন্য কৃত মানত পূরণ না করে তাহলে অধিকাংশ সালাফের মতে সে শপথভঙ্গের কাফফারা দিবে।”(আল-ফাতাওয়া: ৩৩/৪৯)
.
(২). যে মানত পূরণ করা জায়েয নেই, আর এতে রয়েছে শপথভঙ্গের কাফ্ফারা। এ প্রকার মানতে অন্তর্ভুক্ত হবে:
ইমাম আহমদ (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন, যিয়াদ ইবনে জুবাইর বর্ণনা করেন: ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মিনায় হেঁটে যাচ্ছিলেন এর মধ্যে এক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করল: ‘আমি সারা জীবন প্রতি মঙ্গলবার বা বুধবার রোযা রাখার মানত করেছি। আজকের এই দিনটি কুরবানির দিনে পড়ে গেছে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?’ তিনি বললেন: ‘আল্লাহ মানত পূরণের আদেশ দিয়েছেন, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন কিংবা (বলেছেন) আমাদেরকে কুরবানির দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে।’ লোকটি মনে করল যে তিনি প্রশ্নটি শোনেননি। সে আবার জিজ্ঞেস করল: ‘আমি সারা জীবন প্রতি মঙ্গলবার বা বুধবার রোযা রাখার মানত করেছি। আজকের এই দিনটি কুরবানির দিনে পড়ে গেছে। তখন তিনি বললেন: ‘আল্লাহ মানত পূরণ করার আদেশ দিয়েছেন, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন কিংবা (বলেছেন) আমাদেরকে কুরবানির দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে।’ পাহাড়ে ওঠার আগ পর্যন্ত তিনি অতিরিক্ত কিছু বলেননি। হাফেয ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: ‘এ বিষয়ে ইজমা (সর্বসম্মত মত) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনে নফল কিংবা মানত কোনো প্রকার রোযা রাখাই বৈধ নয়।’
.
.
১. জিদ বা রাগের মানত: এটি এমন প্রত্যেক মানত যা শপথের মতো কোনো কাজ করতে উৎসাহ দিতে বা বাধা দিতে, সত্যায়ন করতে বা অস্বীকার করতে করা হয়। মানতকারী মানতকে উদ্দেশ্য করে না বা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনকে উদ্দেশ্যে করে না। যেমন: রাগের সময় কেউ এভাবে বলা: ‘আমি যদি এটা করি তবে আমার ওপর হজ করা আবশ্যক’ বা ‘এক মাস রোযা রাখা আবশ্যক’ বা ‘এক হাজার দিনার সদকা করা আবশ্যক’ অথবা যদি বলে: ‘আমি যদি অমুকের সাথে কথা বলি তবে আমার এই দাসকে মুক্ত’ বা ‘আমার স্ত্রী তালাক’ ইত্যাদি। এরপর সে কাজটি করে ফেলে। অথচ এ কথাগুলো বলার পিছনে তার উদ্দেশ্য ছিল কেবল কাজটি না করার ব্যাপারে দৃঢ়তা প্রকাশ করা; অন্যকিছু নয়। তার প্রকৃত উদ্দেশ্য শর্তকৃত কাজটি না করা এবং ফলাফলও কার্যকর না করা। এ ধরনের মানতে মানতকারীকে দুইটির কোনো একটি করার অবকাশ দেওয়া হয়: (মানত পূরণ করা কিংবা শপথের কাফফারা আদায় করা)।
২. যে মানতের অবস্থা হচ্ছে তর্ক-বিতর্ক কিংবা যে মানতের উদ্দেশ্য কোনো কিছু করা বা না করার প্রতি উৎসাহ প্রকাশ করা (মানত পূরণ করা কিংবা মানতের বদলে শপথের কাফ্ফারা দেওয়া; বিষয়টিকে মূলতঃ মানত হিসেবে গণ্য করে)। ইবনে তাইমিয়া বলেন: ‘যদি মানতকে শপথের মত করে শর্তযুক্ত করে; যেমন এভাবে বলল: ‘আমি যদি তোমাদের সাথে সফর করি তাহলে আমার ওপর হজ করা অনিবার্য’ বা ‘আমার সম্পদ সদকা’ বা ‘দাস মুক্ত’, তবে এটি সাহাবায়ে কেরাম ও জমহুর আলেমের মতে মানতের শপথ; মানত নয়। তাই সে নিজের উপর যা অনিবার্য করেছে সেটা যদি পূরণ না করে; তবে শপথের কাফফারা দেয়াই যথেষ্ট।” তিনি অন্য স্থানে বলেন: “আমাদের মতে জিদ ও রাগের মানতের ক্ষেত্রে দুটো বিষয়ের কোনটি করতে পারবে: কাফফারা দেওয়া কিংবা শর্তযুক্ত কাজটি করা। যদি সে শর্তযুক্ত অনিবার্যকৃত কাজটি না করে, তাহলে কাফফারা ওয়াজিব হবে।”
৩. বৈধ বিষয়ে মানত করা: এটি এমন মানত যা বৈধ কাজের সাথে সম্পর্কিত। যেমন নির্দিষ্ট পোশাক পরা, নির্দিষ্ট খাবার খাওয়া, নির্দিষ্ট বাহনে চড়া, নির্দিষ্ট ঘরে প্রবেশ করা ইত্যাদি।সাবিত ইবনে দাহহাক থেকে বর্ণিত: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এক ব্যক্তি বুওয়ানাহ নামক স্থানে উট জবাই করার মানত করেছিল (এক বর্ণনায় আছে: তার পুত্র সন্তান জন্মানোর কারণে)। তখন সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল: ‘আমি বুওয়ানাহতে উট জবাই করার মানত করেছি।’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন: “সেখানে কি জাহেলিয়াতের কোনো মূর্তি পূজিত হতো?” তারা বলল: ‘না।’ তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন: “সেখানে কি তাদের কোনো উৎসব হতো?” তারা বলল: ‘না।’ তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “তোমার মানত পূরণ করো; কারণ আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কোনো মানত পূরণ করা যায় না এবং এমন কোনো মানত পূরণ করা যায় না যা আদম সন্তানের মালিকানায় নেই।”(আবু দাউদ হা/২৮৮১) এই ব্যক্তি পুত্র সন্তান লাভের কারণে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করে (ইয়াম্বুর পেছনে) বুওয়ানাহ নামক স্থানে উট জবাই করার মানত করেছিল। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সেখানে মানত পূরণের অনুমতি দিয়েছিলেন।
.
পরিশেষে, আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর পছন্দনীয় ও সন্তোষজনক কাজ করার তৌফিক দান করেন। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-২৫৮৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।