প্রশ্ন: স্ত্রী কি তার স্বামীর সেবা করতে বাধ্য? এই বিষয়ে শারঈ নীতিমালা কি?
▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি অতঃপর স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীর সেবা করা ওয়াজিব কি না—এ বিষয়ে ফকীহদের মাঝে সুপরিচিত মতভেদ রয়েছে। জমহুর (অধিকাংশ আলেম) মত হলো: স্বামীর সেবা করা স্ত্রীর ওপর নির্দিষ্টভাবে ফরজ বা ওয়াজিব নয়; বরং তা সদাচরণ ও উত্তম সহাবস্থানের অন্তর্ভুক্ত। তবে অপর একদল আলেমের মতে, স্বামীর সেবা করা স্ত্রীর উপর ওয়াজিব। এ দুই মতের মধ্যে সমন্বয় করে প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত হিসেবে বলা হয়—সাধারণ অবস্থায় স্ত্রীর জন্য স্বামীর সেবা করা ওয়াজিব; তবে এই সেবার প্রকৃতি, সীমা ও ধরণ নির্ধারিত হয় সমাজের প্রচলিত রীতি-নীতি (উরফ), পারিবারিক পরিবেশ এবং উভয়ের পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে। সুতরাং, কোন কাজগুলো স্ত্রীর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত হবে আর কোনগুলো হবে না—তা একেক সমাজ ও পরিস্থিতি ভেদে ভিন্ন হতে পারে; এবং এ ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি হলো পারস্পরিক সহমর্মিতা, সদ্ব্যবহার ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে দাম্পত্য জীবন পরিচালনা করা।
.
হাদিসে এসেছে, আসমা (রাঃ) বলেন, আমি সাংসারিক কাজে যুবায়ের (রাঃ)-এর সাহায্য করতাম। তার একটি ঘোড়া ছিল। আমি তার পরিচর্যা করতাম। ঘোড়াটির পরিচর্যা করার চাইতে কোন কাজ আমার কাছে কঠিনতর ছিল না। আমি তার জন্য ঘাস সংগ্রহ করতাম, তার দেখাশুনা ও পরিচর্যা করতে থাকতাম।”(সহীহ মুসলিম হা/২১৮২; মুসনাদে আহমাদ হা/২৭০১৭) অন্যত্র এসেছে, তিনি বলেন, যখন যুবায়ের (রাঃ) আমাকে বিয়ে করলেন, তখন তার কাছে কোন ধন-সম্পদ ছিল না। এমনকি কোন জমি-জমা, দাস-দাসীও ছিল না। শুধুমাত্র কুয়ো থেকে পানি উত্তোলনকারী একটি উট ও একটি ঘোড়া ছিল। আমি তাঁর উট ও ঘোড়া চরাতাম, পানি পান করাতাম এবং পানি উত্তোলনকারী মশক ছিঁড়ে গেলে সেলাই করতাম, আটা পিষতাম; কিন্তু ভালো রুটি তৈরি করতে পারতাম না। তাই আনছারী প্রতিবেশী মহিলারা আমার রুটি তৈরিতে সাহায্য করত। আর তারা ছিল খুবই উত্তম নারী”।(সহীহ বুখারী হা/৫২২৪; মুসলিম হা/২১৮২)
.
আরেকটি হাদীসে এসেছে, আলী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, ফাতেমা (রাঃ) আটা পিষার কষ্টের কথা জানান। তখন তাঁর নিকট সংবাদ পৌঁছে যে, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট কয়েকজন বন্দী আনা হয়েছে। ফাতেমা (রাঃ) আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর নিকট এসে একজন খাদেম চাইলেন। তিনি তাঁকে পেলেন না। তখন তিনি আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট তা উল্লেখ করেন।অতঃপর নবী করীম (ﷺ) এলে আয়েশা (রাঃ) তাঁর নিকট বিষয়টি বললেন। (রাবী বলেন) আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আমাদের নিকটে আসলেন। তখন আমরা শুয়ে পড়েছিলাম। আমরা উঠতে চাইলাম। তিনি বললেন, তোমরা নিজ নিজ জায়গায় থাক। আমি তাঁর পায়ের শীতলতা আমার বুকে অনুভব করলাম। তখন তিনি বললেন, তোমরা যা চেয়েছ, আমি কি তোমাদের তার চেয়ে উত্তম জিনিসের সন্ধান দিব না? যখন তোমরা বিছানায় যাবে, তখন চৌত্রিশ বার ‘আল্লাহু আকবার’ তেত্রিশবার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ এবং তেত্রিশবার ‘সুবহানাল্লাহ’ বলবে, এটাই তোমাদের জন্য তার চেয়ে উত্তম, যা তোমরা চেয়েছ”।(সহীহ বুখারী হা/৩১১৩, ৩৭০৫, ৫৩৬১, ৬৩১৮; মুসলিম হা/২৭২৭)
.
আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষে উল্লেখ করা হয়েছে:
” لا خلاف بين الفقهاء في أن الزوجة يجوز لها أن تخدم زوجها في البيت، سواء أكانت ممن تخدم نفسها أو ممن لا تخدم نفسها.
إلا أنهم اختلفوا في وجوب هذه الخدمة:
فذهب الجمهور (الشافعية والحنابلة وبعض المالكية) إلى أن خدمة الزوج لا تجب عليها لكن الأولى لها فعل ما جرت العادة به.
وذهب الحنفية إلى وجوب خدمة المرأة لزوجها ديانةً لا قضاءً؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم قَسَّم الأعمال بين علي وفاطمة رضي الله عنهما، فجعل عمل الداخل على فاطمة، وعمل الخارج على علي، ولهذا فلا يجوز للزوجة – عندهم – أن تأخذ من زوجها أجرا من أجل خدمتها له.
وذهب جمهور المالكية وأبو ثور، وأبو بكر بن أبي شيبة وأبو إسحاق الجوزجاني، إلى أن على المرأة خدمة زوجها في الأعمال الباطنة التي جرت العادة بقيام الزوجة بمثلها؛ لقصة علي وفاطمة رضي الله عنها، حيث إن النبي صلى الله عليه وسلم قضى على ابنته فاطمة بخدمة البيت، وعلى علي بما كان خارج البيت من الأعمال، ولحديث: لو أمرت أحدا أن يسجد لأحد لأمرت المرأة أن تسجد لزوجها، ولو أن رجلا أمر امرأته أن تنقل من جبل أحمر إلى جبل أسود، ومن جبل أسود إلى جبل أحمر لكان نولها [حقها] أن تفعل. قال الجوزجاني: فهذه طاعته فيما لا منفعة فيه فكيف بمؤنة معاشه.
ولأن النبي صلى الله عليه وسلم كان يأمر نساءه بخدمته فيقول: يا عائشة أطعمينا، يا عائشة هلمي المدية واشحذيها بحجر.
وقال الطبري: إن كل من كانت لها طاقة من النساء على خدمة بيتها في خبز، أو طحن، أو غير ذلك أن ذلك لا يلزم الزوج، إذا كان معروفا أن مثلها يلي ذلك بنفسه
“ফকিহগণের (ইসলামি আইনবিদ) মধ্যে এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই যে, স্ত্রীর জন্য স্বামীর ঘরের মধ্যে সেবা করা জায়েজ,সে এমন নারী হোক যে নিজের কাজ নিজে করে, বা এমন হোক যে সাধারণত নিজে কাজ করে না। তবে এ সেবা করা তার উপর ওয়াজিব কি না এ বিষয়ে তারা মতভেদ করেছেন। জমহুর তথা অধিকাংশ আলেম (শাফিঈ, হাম্বলি এবং কিছু মালেকি) তাঁদের মতে,স্বামীর সেবা করা স্ত্রীর উপর ওয়াজিব নয়। তবে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী করাটাই তার জন্য উত্তম বা শ্রেয়। হানাফি মাযহাবের আলেমগণের মতে, স্ত্রীর জন্য স্বামীর সেবা করা ‘দিয়ানাতান’ (ধর্মীয় ও নৈতিক বিবেচনায়) ওয়াজিব, তবে ‘কাদায়ান’ (আদালতের মাধ্যমে আইনত প্রয়োগযোগ্য) নয়। এর কারণ হলো, নবী করীম (ﷺ) আলী এবং ফাতেমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর মধ্যে ঘরের কাজগুলো ভাগ করে দিয়েছিলেন; ঘরের ভেতরের কাজের দায়িত্ব ফাতেমার ওপর এবং বাইরের দায়িত্ব আলী (রাদিআল্লাহু আনহু)-এর ওপর ন্যস্ত করেছিলেন। একারণে হানাফিদের মতে—স্ত্রী তার সেবার বিনিময়ে স্বামীর কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ করা জায়েজ নয়। মালেকি মাযহাবের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, আবু সাওর, আবু বকর ইবনে আবি শাইবাহ এবং আবু ইসহাক আল-জুজাজানি-এর মত: তাঁদের মতে,স্ত্রীর উপর স্বামীর সেবা করা আবশ্যক, বিশেষ করে সেই গৃহস্থালির কাজগুলো, যেগুলো প্রচলিতভাবে স্ত্রীগণ করে থাকে।এর দলিল হলো আলী (রাঃ) ও ফাতিমা (রাঃ)-এর ঘটনা, যেখানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর কন্যা ফাতিমা (রাঃ)-এর উপর ঘরের কাজ নির্ধারণ করেছিলেন এবং আলী (রাঃ)-এর উপর বাইরের কাজ নির্ধারণ করেছিলেন।আর হাদীসে এসেছে,রাসূল (ﷺ) বলেছেন:”আমি যদি কাউকে অন্য কাউকে সিজদা করতে আদেশ করতাম, তাহলে স্ত্রীকে তার স্বামীকে সিজদা করতে আদেশ করতাম।” আর যদি কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নির্দেশ দেয় যে, লাল পাহাড় থেকে কালো পাহাড়ে কিছু বহন করে নিয়ে যেতে, আবার কালো পাহাড় থেকে লাল পাহাড়ে নিয়ে যেতে,তাহলেও তার জন্য তা পালন করা কর্তব্য হতো।” আবু ইসহাক আল-জাওযাজানি বলেন,”যে কাজে সরাসরি কোনো উপকার নেই (পাহাড়ের পাথর সরানো) তাতেই যদি আনুগত্যের এই গুরুত্ব থাকে, তবে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যাদিতে আনুগত্যের গুরুত্ব কেমন হবে (তা সহজেই অনুমেয়)।” তাছাড়া নবী করীম (ﷺ) তাঁর স্ত্রীদেরকেও সেবা করার নির্দেশ দিতেন। যেমন তিনি বলতেন, হে আয়েশা! আমাদের খাবার দাও।হে আয়েশা! ছুরিটি নিয়ে আসো এবং পাথরে ঘষে সেটি ধারালো করো।’ ইমাম তবারি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: ‘যেসব নারীর রুটি বানানো, আটা পেষা বা অনুরূপ ঘরের কাজ করার সক্ষমতা রয়েছে এবং সামাজিকভাবেও তাদের স্তরের নারীরা নিজেরাই এসব কাজ করে থাকে, তবে (তাদের জন্য খাদেম বা পরিচারিকা রাখা) স্বামীর ওপর বাধ্যতামূলক নয়।”(উদ্ধৃতি সমাপ্ত; আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ’ খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ৪৪) একই গ্রন্থের (৩০/১২৬) অংশে মালেকি মাযহাবের পূর্বোক্ত মতটির অধিকতর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে:”… إلا أن تكون من أشراف الناس فلا تجب عليها الخدمة، إلا أن يكون زوجها فقير الحال “…তবে স্ত্রী যদি অতি উচ্চবংশীয় বা অতি সম্ভ্রান্ত ঘরের (আশরাফ) নারী হয়ে থাকেন, তবে তাঁর ওপর ঘরের কাজ করা ওয়াজিব নয়; যদি না তাঁর স্বামী দরিদ্র হন (স্বামী দরিদ্র হলে সম্ভ্রান্ত ঘরের নারী হলেও তাকে সেবা করতে হবে)।”(আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ’ খণ্ড: ৩০; পৃষ্ঠা: ১২৬)
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:
“وتنازع العلماء: هل عليها أن تخدمه في مثل فراش المنزل ومناولة الطعام والشراب والخبز والطحن والطعام لمماليكه وبهائمه، مثل علف دابته ونحو ذلك؟
فمنهم من قال: لا تجب الخدمة. وهذا القول ضعيف كضعف قول من قال: لا تجب عليه العشرة والوطء؛ فإن هذا ليس معاشرة له بالمعروف؛ بل الصاحب في السفر الذي هو نظير الإنسان وصاحبه في المسكن، إن لم يعاونه على مصلحة، لم يكن قد عاشره بالمعروف.
وقيل – وهو الصواب – وجوب الخدمة؛ فإن الزوج سيدها في كتاب الله؛ وهي عانية عنده بسنة رسول الله صلى الله عليه وسلم، وعلى العاني والعبد الخدمة. ولأن ذلك هو المعروف.
ثم من هؤلاء من قال: تجب الخدمة اليسيرة. ومنهم من قال: تجب الخدمة بالمعروف وهذا هو الصواب؛ فعليها أن تخدمه الخدمة المعروفة من مثلها لمثله، ويتنوع ذلك بتنوع الأحوال؛ فخدمة البدوية ليست كخدمة القروية، وخدمة القوية ليست كخدمة الضعيفة.”
“আলেমগণ এ বিষয়ে মতভেদ করেছেন যে,স্ত্রীর উপর কি স্বামীর জন্য গৃহস্থালির কাজ করা (ওয়াজিব) আবশ্যক,যেমন: বিছানা প্রস্তুত করা, খাবার-দাবার পরিবেশন করা, রুটি বানানো,শস্য পেষণ করা এবং স্বামীর দাস-দাসী ও পশুপাখির খাবারের ব্যবস্থা করা,যেমন তার বাহনের খাদ্য দেওয়া ইত্যাদি? তাদের মধ্যে একদল বলেছেন: (স্ত্রীর ওপর) এই সেবা করা আবশ্যক নয়। তবে এই মতটি ততটাই দুর্বল, যতটা দুর্বল ওই ব্যক্তির মত যে বলে—’স্বামীর ওপর স্ত্রীর সাথে বসবাস ও সহবাস করা আবশ্যক নয়।’ কারণ, এটি (সেবা না করা) স্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বামীর সাথে ‘উত্তম পন্থায় জীবনযাপন করা’ (মুআশারা বিল মারুফ) হলো না।এমনকি সফরের কোনো সঙ্গী—যে কি না মানুষের সমপর্যায়ের এবং ঘরের সহাবস্থানকারী—সেও যদি প্রয়োজনীয় কাজে তার সাথীকে সহযোগিতা না করে, তবে সে তার সঙ্গীর সাথে সদ্ভাবে বসবাস করল না বলে গণ্য হয়। অন্য একদল বলেছেন এবং এটিই সঠিক মত—যে: (স্বামীর) সেবা করা ওয়াজিব বা আবশ্যক। কেননা আল্লাহর কিতাব (কুরআন) অনুযায়ী স্বামী হলো তার (স্ত্রীর) ‘সাইয়্যেদ’ বা কর্তা; আর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী স্ত্রী হলো স্বামীর কাছে ‘আনিয়া’ (বন্দিনীর মতো অনুগত)। আর অনুগত ব্যক্তি ও দাসের ওপর সেবা করা আবশ্যক। তা ছাড়া এটিই হলো প্রচলিত উত্তম রীতি (মারুফ)। অতঃপর যারা সেবাকে ওয়াজিব বলেছেন, তাদের মধ্যে কেউ বলেছেন: সামান্য সেবা ওয়াজিব। আবার কেউ বলেছেন: প্রচলিত রীতি অনুযায়ী (বিল মারুফ) সেবা করা ওয়াজিব; আর এটিই সঠিক মত। সুতরাং, স্ত্রীর ওপর তার মতো নারীর পক্ষ থেকে স্বামীর মতো পুরুষের জন্য যেটুকু সেবা করা প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী স্বীকৃত, সেটুকু করা আবশ্যক। আর এই সেবার ধরন পরিবেশ ও পরিস্থিতির ভিন্নতায় ভিন্ন হতে পারে; যেমন—মরুচারী (বেদুঈন) নারীর সেবার ধরন আর গ্রাম বা শহরের নারীর সেবার ধরন এক নয়, তেমনি একজন শক্তিশালী নারীর সেবার ধরন আর একজন দুর্বল নারীর সেবার ধরন এক নয়।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ৩৪; পৃষ্ঠা: ৯০-৯১)
.
আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা,(রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেন,
“العقود المطلقة إنما تُنزل على العرف، والعرف خدمة المرأة، وقيامها بمصالح البيت الداخلة، وقولهم: إن خدمة فاطمة وأسماء كانت تبرعا وإحسانا، يرده أن فاطمة كانت تشتكي ما تلقى من الخدمة، فلم يقل لعلي: لا خدمة عليها، وإنما هي عليك، وهو صلى الله عليه وسلم لا يحابي في الحكم أحدا، ولما رأى أسماء والعلف على رأسها، والزبير معه، لم يقل له: لا خدمة عليها، وأن هذا ظلم لها، بل أقره على استخدامها، وأقر سائر أصحابه على استخدام أزواجهم، مع علمه بأن منهن الكارهة والراضية هذا أمر لا ريب فيه.” انتهى من “زاد المعاد” (5 / 171).
নিরঙ্কুশ (শর্তহীন) চুক্তিগুলো মূলত প্রচলিত প্রথা বা রীতির (উরফ) ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয়। আর প্রচলিত রীতি হলো—স্ত্রী গৃহস্থালির ভেতরের কাজগুলো করা এবং ঘরের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো পরিচালনা করা।আর কেউ যদি বলে যে, ফাতিমা ও আসমা (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর ঘরোয়া কাজ করা ছিল কেবলই ঐচ্ছিক বা অনুগ্রহমূলক (আবশ্যক নয়);তাদের এই দাবিটি এই বাস্তবতার দ্বারা খণ্ডন হয় যে: ফাতিমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) গৃহস্থালি কাজের কঠোরতা নিয়ে (নবীজির কাছে) অভিযোগ করেছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলেননি যে—‘স্ত্রীর ওপর কোনো কাজ নেই, বরং সব দায়িত্ব তোমার’। অথচ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কখনো বিচার-ফয়সালায় কারও প্রতি পক্ষপাতিত্ব করতেন না।অনুরূপভাবে, যখন তিনি আসমা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-কে দেখলেন যে তিনি মাথায় করে পশুর খাদ্য বহন করছেন এবং যুবাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর সাথেই ছিলেন; তখনও তিনি যুবাইরকে বলেননি যে—‘স্ত্রীর ওপর কোনো কাজ নেই’ অথবা ‘এটি তাঁর প্রতি জুলুম’। বরং তিনি আসমা কর্তৃক এই সেবা প্রদানকে বহাল রেখেছেন এবং অন্যান্য সকল সাহাবীদের ক্ষেত্রেও তাঁদের স্ত্রীদের নিকট থেকে গৃহস্থালি সেবা গ্রহণকে অনুমোদন দিয়েছেন; অথচ তিনি জানতেন যে—তাঁদের (স্ত্রীদের) মধ্যে কেউ হয়তো এটি সানন্দে করতেন, আবার কেউ হয়তো কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও করতেন। এটি এমন এক বিষয় যাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।”-(ইবনু ক্বাইয়িম, যাদুল মা‘আদ,খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ১৭১)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
“يلزم الزوجين العشرة بالمعروف… لقوله تعالى: (وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ)، وهذا أمر، والأصل في الأمر الوجوب، وقال تعالى: (وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ).
فأثبت أن عليهن عشرة، فيجب على الزوج والزوجة، كل منهما أن يعاشر الآخر بالمعروف.
وقوله: (بِالْمَعْرُوفِ) يحتمل أن المراد به ما عرفه الشرع وأقره، ويحتمل أن المراد به ما اعتاده الناس وعرفوه، ويمكن أن نقول بالأمرين جميعا، ما عرفه الشرع وأقره، وما اعتاده الناس وعرفوه، فلو اعتاد الناس أمرا محرما، فإنه لا يجوز العمل به ولو كان عادة؛ لأن الشرع لا يقره، وما سكت عنه الشرع، ولكن العرف يلزم به، فإنه يلزم؛ لأن هذا من تمام العقد، إذ العقود الجارية بين الناس تتضمن كل ما يستلزمه هذا العقد، شرعا أو عرفا، فلو قالت الزوجة: أنت ما شرطت علي أني أفعل كذا، نقول: لكن مقتضى العقد عرفا أن تفعلي هذا الشيء.
ولو قال الزوج: يا فلانة اصنعي طعاما فإن معي رجالا، فقالت: لا أصنع، أنا ما تزوجت إلا للاستمتاع فقط، أما أن أخدمك فلا، فهل يلزمها أو لا؟
نعم، يلزمها؛ لأن هذا مقتضى العرف، وما اطرد به العرف: كالمشروط لفظا، وبعضهم يعبر بقوله: الشرط العرفي كالشرط اللفظي
“স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য একে অপরের সাথে সদ্ভাবে (মাক্’রূফ পদ্ধতিতে) জীবনযাপন করা আবশ্যক… কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “আর তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।” (সূরা আন-নিসা: ১৯) এটি একটি নির্দেশ, আর নির্দেশের মূলনীতি হলো তা ‘ওয়াজিব’ (আবশ্যক) হওয়াকে বুঝায়। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন: “আর নারীদের তেমনি ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে, যেমন রয়েছে তাদের ওপর পুরুষদের অধিকার।” (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২২৮) সুতরাং আল্লাহ এখানে প্রমাণ করেছেন যে, নারীদের ওপরও (স্বামীদের সাথে) সদ্ভাবে জীবনযাপনের দায়িত্ব রয়েছে। অতএব, স্বামী ও স্ত্রী প্রত্যেকের ওপর ওয়াজিব হলো একে অপরের সাথে সদ্ভাবে জীবন অতিবাহিত করা। তাঁর (আল্লাহর) বাণী: ‘বিল মা’রূফ’ (بِالْمَعْرُوفِ)-এর দ্বারা দুটি বিষয় উদ্দেশ্য হতে পারে: (১).যা শরীয়ত কর্তৃক স্বীকৃত এবং অনুমোদিত। (২).যা মানুষের মাঝে প্রচলিত (উরফ) এবং তারা ভালো হিসেবে জানে। আমরা বলতে পারি যে, এখানে উভয় অর্থই উদ্দেশ্য; অর্থাৎ যা শরীয়ত কর্তৃক স্বীকৃত এবং যা মানুষের মাঝে প্রচলিত। তবে মানুষ যদি কোনো হারাম বিষয়ে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তবে তা প্রথা বা অভ্যাস হলেও পালন করা জায়েজ নয়; কারণ শরীয়ত তাকে অনুমোদন দেয় না। কিন্তু যে বিষয়ে শরীয়ত নীরব রয়েছে অথচ সামাজিক রীতিনীতি (উরফ) তা পালনে বাধ্য করে, তবে তা পালন করা আবশ্যক। কারণ এটি (বিবাহ) চুক্তির পূর্ণতার অংশ। কেননা মানুষের মাঝে সম্পাদিত চুক্তিগুলো এমন সব বিষয়কে শামিল করে যা শরীয়ত বা প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী ঐ চুক্তির জন্য অপরিহার্য।
এখন স্ত্রী যদি বলে: ‘আপনি তো আমার ওপর এই কাজটি করার শর্ত দেননি’; তখন আমরা বলব: ‘কিন্তু প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী এ কাজ করা তোমার বৈবাহিক চুক্তিরই দাবি।’
আবার যদি স্বামী বলে: ‘হে অমুক! খাবার প্রস্তুত করো, কারণ আমার সাথে মেহমান আছে’; আর স্ত্রী উত্তর দেয়: ‘আমি খাবার তৈরি করব না, আমি কেবল যৌনসুখ লাভের জন্যই বিয়ে করেছি; তোমার সেবা করার জন্য নয়।’—এমতাবস্থায়, (রান্না করা) কি তার জন্য আবশ্যক হবে নাকি হবে না? হ্যাঁ, তার ওপর তা আবশ্যক হবে। কারণ এটি প্রচলিত সামাজিক রীতির (উরফ) অন্তর্ভুক্ত। আর যে বিষয়টি প্রচলিত রীতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত, তা মুখে উচ্চারিত শর্তের মতোই গণ্য। একারণেই ওলামায়ে কেরাম বলেন: “প্রচলিত শর্ত, মুখে বলা শর্তের মতোই কার্যকর।” [সূত্র: আশ-শারহুল মুমতি‘ আলা যাদিল মুস্তাক্বনি‘, খণ্ড: ১২, পৃষ্ঠা: ৩৮৩-৩৮৪]
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ) এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, শাইখ আবদুল্লাহ ইবনে জিবরীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪৩০ হি./২০০৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল,স্ত্রীর জন্য কি স্বামীর জন্য রান্না করা ওয়াজিব? যদি সে তা না করে, তবে কি সে গুনাহগার হবে?
তিনি উত্তরে বলেন:لم يزل عُرْف المسلمين على أن الزوجة تخدم زوجها الخدمة المعتادة لهما في إصلاح الطعام وتغسيل الثياب والأواني وتنظيف الدور ونحوه، كلٌّ بما يناسبه، وهذا عرف جرى عليه العمل من العهد النبوي إلى عهدنا هذا من غير نكير، ولكن لا ينبغي تكليف الزوجة بما فيه مشقَّة وصعوبة، وإنما ذلك حسب القدرة والعادة، والله الموفق “মুসলিমদের মাঝে সর্বদা এই প্রচলিত রীতি (উরফ) বিদ্যমান রয়েছে যে, স্ত্রী তার স্বামীর এমন সাধারণ সেবা করবে যা তাদের উভয়ের মাঝে প্রচলিত; যেমন—খাবার প্রস্তুত করা, কাপড় ও বাসনপত্র ধোয়া, ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা এবং এই জাতীয় অন্যান্য কাজ। এই সেবা হবে প্রত্যেকের (সামর্থ্য ও সামাজিক) অবস্থান অনুযায়ী যা তার জন্য উপযুক্ত। এটি এমন এক রীতি যার ওপর নবীজি (ﷺ)-এর যুগ থেকে আমাদের এই সময় পর্যন্ত কোনো প্রকার আপত্তি ছাড়াই আমল জারি রয়েছে। তবে স্ত্রীর ওপর এমন কোনো কাজ চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয় যাতে চরম কষ্ট বা কঠিনতা রয়েছে; বরং এই দায়িত্ব পালন হবে সামর্থ্য এবং প্রচলিত প্রথার (আদত) ভিত্তিতে। আর আল্লাহই তাওফীক দানকারী।”(ফাতাওয়া আল-উলামা ফি ইশরাতিল নিসা, পৃষ্ঠা: ২০)
.
পরিশেষে প্রিয় পাঠক! সার্বিক শরঈ দলীল ও ফকীহগণের মতামতের আলোকে এটি স্পষ্ট যে, দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও উত্তম আচরণই ইসলামের মূল লক্ষ্য। যদিও ঘরের কাজে স্ত্রীর বাধ্যবাধকতা নিয়ে তাত্ত্বিক মতভেদ রয়েছে, তবে শক্তিশালী ও প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত হলো—সামাজিক প্রচলিত রীতি (উরফ) অনুযায়ী সামর্থ্যের ভেতরে থেকে গৃহস্থালি কাজ ও স্বামীর সেবা করা স্ত্রীর ওপর নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব (ওয়াজিব)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা.)-কে ঘরের ভেতরের কাজ এবং আলী (রা.)-কে বাইরের কাজের যে বন্টন করে দিয়েছিলেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম পরিবারের জন্য একটি আদর্শ নীতিমালা। সুতরাং স্বামী-স্ত্রী একে অপরের প্রতি কেবল শুষ্ক আইনি দৃষ্টিভঙ্গি না রেখে বরং ইহসান, ত্যাগ ও প্রচলিত রীতির ভিত্তিতে ঘর পরিচালনা করলেই একটি সুখী ও শান্তিময় পরিবার গঠন সম্ভব। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
আপনাদের দ্বীনি ভাই: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।