তাওরিয়া কী এবং কোন কোন পরিস্থিতিতে ইচ্ছাকৃত অস্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করা শরিয়তসম্মত

প্রশ্ন: তাওরিয়া কী? কোন কোন পরিস্থিতিতে ইচ্ছাকৃত অস্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করা শরিয়তসম্মত? যদি এটি কেবল প্রয়োজনের ক্ষেত্রেই বৈধ হয়, তবে সেই ‘প্রয়োজন’-এর শরয়ি সংজ্ঞা কী?
▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহ্‌র জন্য। আমাদের নবী, সর্বশেষ নবী, রাসূলদের সর্দার মুহাম্মদ এর প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবায়ে কেরাম সকলের প্রতি আল্লাহ্‌র রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর আরবি (التورية) “তাওরিয়া” শব্দের অর্থ হলো—কোনো বিষয় আড়াল করে বলা। অর্থাৎ, এমনভাবে কথা বলা যাতে কথার একটি বাহ্যিক অর্থ থাকে, যা শ্রোতা সহজে বুঝতে পারে; কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে আরেকটি ভিন্ন উদ্দেশ্য, যা বক্তার প্রকৃত অভিপ্রায়। শরী‘আতের পরিভাষায় তাওরিয়া বলতে বোঝায়—ইচ্ছাকৃতভাবে এমন দ্ব্যর্থবোধক কথা বলা, যার প্রকাশ্য অর্থ শুনে শ্রোতা একটি ধারণা গ্রহণ করে, অথচ বক্তা সেই শব্দগুলোর দ্বারা ভিন্ন অর্থ বোঝাতে চান। তাই এটি সরাসরি মিথ্যা নয়, বরং সত্যের এমন এক রূপ, যেখানে উদ্দেশ্য গোপন রাখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি বলে “আমার পকেটে একটি দিরহামও নেই,” তাহলে সাধারণভাবে মনে হবে তার কাছে কোনো টাকা পয়সাই নেই। কিন্তু বাস্তবে এর মাধ্যমে সে বোঝাতে পারে তার কাছে দিরহাম নেই, যদিও দিনার থাকতে পারে। আরবি অলংকারশাস্ত্রেও এই ধরনের দ্ব্যর্থবোধক বক্তব্যকে তাওরিয়া বলা হয় যেখানে একদিকে সত্য বলা হয়, আবার অন্যদিকে ভিন্ন অর্থ ইঙ্গিত করা হয়। সুতরাং শরী‘আতের দৃষ্টিতে তাওরিয়া একটি বৈধ কৌশল—বিশেষত তখন, যখন সরাসরি সত্য বলা কারো জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এবং সে মিথ্যাও বলতে চায় না। তবে এর ব্যবহার কেবল প্রয়োজন, কল্যাণ বা শরী‘আতসম্মত উদ্দেশ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।কারণ, অহেতুক বা অন্যায় সুবিধা লাভের জন্য অস্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করা নিন্দনীয়। অনেক আলেমের মতে, যদি কোনো বৈধ কারণ বা জরুরি প্রয়োজন না থাকে, তাহলে ইচ্ছাকৃতভাবে এ ধরনের ধোঁয়াটে ভাষা ব্যবহার করা হারাম। শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রহিমাহুল্লাহ) এ মতকে সমর্থন করেছেন (বিস্তারিত জানতে তার আল-ইখতিয়ারাত গ্রন্থটি পড়া যেতে পারে)। তবে এমন কিছু বিশেষ পরিস্থিতি রয়েছে, যেখানে রাসূল ﷺ আমাদের ইঙ্গিতপূর্ণ বা পরোক্ষ ভাষা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন—যাতে সত্যও রক্ষা পায় এবং ক্ষতিও এড়ানো যায়।
.
ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘সহীহ বুখারী’-তে একটি অধ্যায় সংকলন করেছেন এবং শিরোনাম দিয়েছেন:باب المعاريض مندوحة عن الكذب “ইশারাপূর্ণ কথা বলা মিথ্যার বিকল্প হতে পারে।”(সহীহ বুখারী, আদব অধ্যায়,অনুচ্ছেদ নং ১১৬) উদাহরণস্বরূপ বলা যায়,কেউ যদি জামাতে নামাজ পড়ার সময় ওজু ভেঙে ফেলে, তাহলে সে যেন সরাসরি ওজু ভেঙে যাওয়ার কথা বলে অন্যদের সামনে লজ্জায় না পড়ে—এ জন্য এমন কৌশলী ও অপ্রত্যক্ষ ভঙ্গিতে বেরিয়ে যেতে পারে, যাতে তার ব্যক্তিগত পরিস্থিতি গোপন থাকে এবং সম্মান রক্ষা পায়। এর প্রমান হচ্ছে, আয়িশাহ্ সিদ্দীক্বা (রাঃ) থেকে বর্ণিত,নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন: إذا أحدث أحدكم في صلاته فليأخذ بأنفه ثم لينصرف “তোমাদের কেউ যখন সলাতে উযূ ভঙ্গ করে ফেলে সে যেন তার নাক চেপে ধরে তারপর সলাত ছেড়ে চলে আসে।”(আবু দাউদ হা/১১৪০; সহীহুল জামি হা/২৮৬)
.
এই হাদীসের ব্যাখ্যায় শারফুদ্দীন আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আত-ত্বীবী (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃত্যু: ৭৪৩ হি.) বলেন:أمر بالأخذ ليخيل أنه مرعوف ( والرعاف هو النزيف من الأنف ) ، وليس هذا من الكذب ، بل من المعاريض بالفعل ، ورُخِّص له في ذلك لئلا يسوِّل له الشيطان عدم المضي استحياء من الناس “নাক চেপে ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেন মানুষ মনে করে তার নাক থেকে রক্ত বের হচ্ছে। এটি মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং এটি বাস্তব কার্যকলাপের মাধ্যমে ‘তাওরিয়া’ (অস্পষ্ট ইঙ্গিত) প্রয়োগ।এর উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন লোকলজ্জার ভয়ে নামাযে দাঁড়িয়ে না থাকে, আর শয়তান তাকে এই বিব্রত অবস্থায় ধ্বংসের দিকে না ঠেলে দেয়।”(মিরকাতুল মাফাতীহ; শরহ মিশকাতুল মাসাবীহ; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৮)
.
ইমাম খাত্ত্বাবী মা‘আলিম গ্রন্থের ১ম খন্ডের ২৪৮ পৃষ্ঠায় বলেন: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়ু নিঃসরণকারীকে নাকে ধরতে বলেছেন এজন্য যে, যাতে মানুষ মনে করে তার নাক দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে।”
.
এছাড়াও সহীহ বুখারীতে আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, ইবরাহীম (‘আঃ) তিনবার ছাড়া কখনও মিথ্যা বলেননি। তন্মধ্যে দু’বার ছিল আল্লাহ্‌র ব্যাপারে। তার উক্তি “আমি অসুস্থ”- (আস সাফফাতঃ ৮৯) এবং তাঁর অন্য এক উক্তি “বরং এ কাজ করেছে, এই তো তাদের বড়টি-(আম্বিয়াঃ ৬৩)। বর্ণনাকারী বলেন, একদা তিনি [ইবরাহীম (‘আঃ)] এবং সারা অত্যাচারী শাসকগণের কোন এক শাসকের এলাকায় এসে পৌঁছলেন। তখন তাকে খবর দেয়া হল যে, এ এলাকায় জনৈক ব্যক্তি এসেছে। তার সঙ্গে একজন সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা আছে। তখন সে তাঁর নিকট লোক পাঠাল। সে তাঁকে নারীটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল, এ নারীটি কে? তিনি উত্তর দিলেন, মহিলাটি আমার বোন। অতঃপর তিনি সারার নিকট আসলেন এবং বললেন, হে সারা! তুমি আর আমি ব্যতীত পৃথিবীর উপর আর কোন মু’মিন নেই। এ লোকটি আমাকে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল। তখন আমি তাকে জানিয়েছি যে, তুমি আমার বোন। কাজেই তুমি আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করো না। অতঃপর সারাকে আনার জন্য লোক পাঠালো। তিনি যখন তার নিকট প্রবেশ করলেন এবং রাজা তাঁর দিকে হাত বাড়ালো তখনই সে পাকড়াও হল। তখন অত্যাচারী রাজা সারাকে বলল, আমার জন্য আল্লাহর নিকট দু’আ কর, আমি তোমার কোন ক্ষতি করবো না। তখন সারা আল্লাহর নিকট দু’আ করলেন। ফলে সে মুক্তি পেয়ে গেল। অতঃপর দ্বিতীয়বার তাঁকে ধরতে চাইল। এবার সে পূর্বের মতো বা তার চেয়ে কঠিনভাবে পাকড়াও হলে, এবারও সে বলল, আল্লাহর নিকট আমার জন্য দু’আ কর। আমি তোমার কোন ক্ষতি করবো না। আবারও তিনি দু’আ করলেন, ফলে সে মুক্তি পেয়ে গেল। অতঃপর রাজা তার এক দারোয়ানকে ডাকল। সে তাকে বলল, তুমি তো আমার নিকট কোন মানুষ আননি। বরং এনেছ এক শয়তান। অতঃপর রাজা সারার খিদমতের জন্য হাযেরাকে দান করল। অতঃপর তিনি (সারা) তাঁর (ইবরাহীম) নিকট আসলেন, তিনি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন। তখন তিনি হাত দ্বারা ইশারা করে সারাকে বললেন, কি ঘটেছে? তখন সারা বললেন, আল্লাহ কাফির বা ফাসিকের চক্রান্ত তারই বুকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আর সে হাযেরাকে খিদমতের জন্য দান করেছে। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, হে আকাশের পানির ছেলেরা! হাযেরাই তোমাদের আদি মাতা।”(সহীহ বুখারী হা/৩৩৫৮)এই হাদীসে উক্ত তিনটি বিষয়কে ‘মিথ্যা’ শব্দে উল্লেখ করা হলেও মূলতঃ এগুলির একটাও প্রকৃত অর্থে মিথ্যা ছিল না। বরং এগুলি ছিল আরবী অলংকার শাস্ত্রের পরিভাষায় ‘তাওরিয়া’ (الةورية) বা দ্ব্যর্থ বোধক পরিভাষা। যেখানে শ্রোতা বুঝে এক অর্থ এবং বক্তার নিয়তে থাকে অন্য অর্থ। যেমন- রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একদিন আয়েশার কাছে তার এক বৃদ্ধা খালাকে দেখে বললেন, কোন বৃদ্ধা জান্নাতে যাবে না। একথা শুনে খালা কান্না শুরু করলে রাসূল (ﷺ) বললেন, তারা তখন সবাই যুবতী হয়ে যাবে’ (শামায়েলে তিরমিযী;সহীহাহ হা/২৯৮৭)। হিজরতের সময় পথিমধ্যে রাসূল (ﷺ) সম্পর্কে জনৈক ব্যক্তির প্রশ্নের জওয়াবে আবুবকর (রাঃ) বলেন, ‘ইনি আমাকে পথ দেখিয়ে থাকেন’ (বুখারী হা/৩৯১১)। এতে লোকটি ভাবল, উনি একজন সাধারণ পথপ্রদর্শক ব্যক্তি মাত্র। অথচ আবু বকরের উদ্দেশ্য ছিল তিনি আমাদের নবী অর্থাৎ ধর্মীয় পথপ্রদর্শক। অনুরূপভাবে যুদ্ধকালে রাসূল (ﷺ) একদিকে বেরিয়ে অন্য দিকে চলে যেতেন। যাতে তাঁর গন্তব্য পথ গোপন থাকে। এগুলি হল উক্তিগত ও কর্মগত তাওরিয়ার উদাহরণ”(বিস্তারিত জানতে দেখুন; নবীদের কাহিনী-খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১২৮-১২৯)
.
সহীহ বুখারীর আরেক বর্ননায় এসেছে, ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি আনাস ইবনু মালিক (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেন,مات ابنٌ لأبي طلحة، فقال: كيف الغلام؟ فقالت أم سُلَيْمٍ: هدَأَ نفَسُه، وأرجو أن يكون قد استراح. وظن أنها صادقة.”আবূ তালহা (রাঃ)-এর এক পুত্র অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরন করলেন। তখন আবূ তালহা (রাঃ) বাড়ির বাইরে ছিলেন। তাঁর স্ত্রী যখন দেখলেন যে, ছেলেটি মারা গেছে, তখন তিনি কিছু প্রস্তুতি নিলেন এবং ছেলেটিকে ঘরের এক কোণে রেখে দিলেন। আবূ তালহা (রাঃ) বাড়িতে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ছেলের অবস্থা কেমন? স্ত্রী জওয়াব দিলেন, তার আত্মা শান্ত হয়েছে এবং আশা করি সে এখন আরাম পাচ্ছে। আবূ তালহা ভাবলেন তাঁর স্ত্রী সত্য (সুস্থ হওয়ার কথা) বলেছেন।…..”(সহীহ বুখারী হা/১৩০১)
.
হাদিসটির ব্যাখায় শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন:”‌وفيه ‌استعمال ‌المعاريض ‌عند ‌الحاجة، ‌لقولها: (هو أسكن مما كان)؛ فإنه كلام صحيح، مع أن المفهوم منه أنه قد هان مرضه، وسهل، وهو في الحياة.وشرط المعاريض المباحة: أن لا يضيع بها حق أحد”
“এই হাদিসে প্রয়োজনবশত ‘মাআরিজ’ (এমন দ্ব্যর্থবোধক কথা যা শুনলে এক অর্থ মনে হয়, কিন্তু বক্তা ভিন্ন অর্থ উদ্দেশ্য করেন) ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। উম্মে সুলাইম (রা.)-এর উক্তি: “সে আগের চেয়ে শান্ত আছে”—এর মাধ্যমেই তা স্পষ্ট। তাঁর এই কথাটি (ক্ষুদ্রতম অর্থে) সত্য ছিল, যদিও এর দ্বারা শ্রোতার কাছে বাহ্যিকভাবে মনে হচ্ছিল যে, রোগীর অসুস্থতা কমেছে বা তিনি সুস্থবোধ করছেন এবং জীবিত আছেন।আর মুবাহ বা বৈধ পরোক্ষ কথার (মাআরিজ) শর্ত হলো: এর মাধ্যমে যেন কারো পাওনা বা অধিকার (হক) ক্ষুণ্ণ না হয়।”(ইমাম নববী; শারহু সহীহ মুসলিম; খণ্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ১২৪)
.
উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন:أما في المعاريض ما يكفي المسلم من الكذب”ইশারা-ইঙ্গিত বা দ্ব্যর্থবোধক কথার মধ্যে কি একজন মুসলিমের জন্য মিথ্যা থেকে বাঁচার মতো যথেষ্ট সুযোগ নেই?” (সহীহুল আদাবুল মুফরাদ; পৃষ্ঠা: ৩৩০)। আরেক বর্ননায় ইমরান ইবনে হুসাইন (রাদিয়াল্লাহ আনহু) বলেছেন:إن في المعاريض لمندوحة عن الكذب”নিশ্চয়ই ইশারা-ইঙ্গিত বা দ্ব্যর্থবোধক কথার মধ্যে মিথ্যা থেকে বাঁচার প্রশস্ত অবকাশ রয়েছে।” (ইমাম বুখারী এটি ‘আল-আদাবুল মুফরাদ’ গ্রন্থে সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন; সহীহুল আদাবুল মুফরাদ; পৃষ্ঠা: ৩১৯)।
.
ইবনে কুতাইবা (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
جاءت الرخصة[2] في المعاريض، وقيل: إن فيها عن الكذب مندوحةً، فمن المعاريض قولُ إبراهيم الخليل صلى الله عليه وسلم في امرأته: إنها أختي، يريد أن المؤمنين إخوة، وقولُه: ﴿ بَلْ فَعَلَهُ كَبِيرُهُمْ هَذَا فَاسْأَلُوهُمْ إِنْ كَانُوا يَنْطِقُونَ ﴾؛ أراد: بل فعله كبيرهم هذا إن كانوا ينطقون، فجعل النطق شرطًا للفعل، وهو لا ينطق ولا يفعل، وقولُه: ﴿ إِنِّي سَقِيْمٌ ﴾؛ يريد سَأسْقَمُ؛ لأن من كُتب عليه الموت والفناء فلا بد من أن يسقَمَ، قال الله تعالى لنبيه صلى الله عليه وسلم: ﴿ إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ ﴾ [الزمر: 30]، ولم يكن النبي صلى الله عليه وسلم مَيِّتًا في وقته ذلك، وإنما أراد أنك ستموت وسيموتون”
​”ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তার (মা‘আরীদ) ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে। বলা হয়ে থাকে যে, এর মাধ্যমে মিথ্যা পরিহার করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। মা‘আরীদ-এর উদাহরণ হলো—ইব্রাহিম খলীল (আলাইহিস সালাম) তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে বলেছিলেন: ‘নিশ্চয়ই সে আমার বোন’; তিনি এর মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, মুমিনরা পরস্পর ভাই-বোন। তাঁর আরেকটি উক্তি: ‘বরং তাদের এই বড়টিই একাজ করেছে, সুতরাং তাদেরকেই জিজ্ঞেস করো—যদি তারা কথা বলতে পারে’ [সূরা আম্বিয়া: ৬৩]; এখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন: ‘যদি তারা কথা বলতে পারে, তবেই তাদের এই বড়টি এটি করেছে’। অর্থাৎ তিনি কথা বলাকে কাজটির (মূর্তি ভাঙার) জন্য শর্ত হিসেবে যুক্ত করেছেন; অথচ তারা (মূর্তিগুলো) কথা বলতে পারে না এবং কোনো কাজও করতে পারে না। তাঁর অন্য একটি উক্তি হলো: ‘নিশ্চয়ই আমি অসুস্থ’ [সূরা সাফফাত: ৮৯]; এর দ্বারা তিনি উদ্দেশ্য নিয়েছেন—‘আমি অচিরেই অসুস্থ হব’। কারণ যার ওপর মৃত্যু ও বিনাশ অবধারিত, তাকে অবশ্যই অসুস্থ হতে হবে। মহান আল্লাহ তাঁর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন: ‘নিশ্চয়ই তুমি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল’ [সূরা যুমার: ৩০]। অথচ সেই সময়ে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মৃত ছিলেন না; বরং আল্লাহ বোঝাতে চেয়েছেন যে—তুমি অচিরেই মৃত্যুবরণ করবে এবং তারাও মৃত্যুবরণ করবে।”(তাউয়ীলু মুখতালিফিল হাদীস; পৃষ্ঠা: ৮১)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন:
قال العلماء :‏ فإن دعَت إلى ذلك مصلحة شرعيَّة راجحة على خداع المخاطب ، أو دعت إليه حاجة لا مندوحة عنها إلا بالكذب : فلا بأس بالتعريض ،‏ فإن لم تدع إليه مصلحة ولا حاجة : فهو مكروه وليس بحرام ، فإن توصل به إلى أخذ باطل أو دفع حق فيصير حينئذ حراماً ، وهذا ضابط الباب .
“​আলেমগণ বলেছেন: যদি এর (অর্থাৎ দ্ব্যর্থবোধক বা ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলার) পেছনে এমন কোনো প্রবল শারঈ কল্যাণ (মাসলাহাত) থাকে যা সম্বোধিত ব্যক্তিকে বিভ্রান্ত করার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ, অথবা এমন কোনো অপরিহার্য প্রয়োজন দেখা দেয় যা মিথ্যা বলা ছাড়া পূরণ করা সম্ভব নয়—তবে সেক্ষেত্রে মিথ্যার পরিবর্তে ‘তা’রীয’ (ইঙ্গিতপূর্ণ বা দ্ব্যর্থবোধক কথা) বলায় কোনো দোষ নেই।আর যদি এর পেছনে কোনো (শারঈ) কল্যাণ বা প্রয়োজন না থাকে, তাহলে তা মাকরুহ (অপছন্দনীয়), কিন্তু হারাম নয়। কিন্তু যদি এর মাধ্যমে কোনো বাতিল বা অন্যায় কিছু অর্জন করা হয় অথবা কোনো অধিকার (হক) খর্ব করা হয়,তাহলে তা হারাম হিসেবে গণ্য হবে। আর এটাই হলো এই বিষয়ের শারঈ (মূলনীতি) দিকনির্দেশনা।”(ইমাম নববী আল আযকার; পৃষ্ঠা: ৩৮০)
.
তাওরিয়া প্রয়োগের উদাহরণ সালাফদের থেকেও প্রমাণিত রয়েছে; যেমনটি ইবনু কাইয়ুম (রাহিমাহুল্লাহ) তার ইগাসাতুল লাহফান খণ্ড:১;পৃষ্ঠা;৩৮১এবং ২/১০৬-১০৭; ইবনুল মুফলিহ আদাবুস শারইয়্যাহ: ১/১৪ তে উল্লেখ করেছেন; উদাহরণস্বরূপ, হাম্মাদ (রাহিমাহুল্লাহ)–এর সম্পর্কে বর্ণিত আছে,أنه إذا أتاه من لا يريد الجلوس معه قال متوجعاً : ضرسي ، ضرسي ، فيتركه الثقيل الذي ليس بصحبته خير “যখনই তার কাছে এমন কেউ আসতেন যার সঙ্গে তিনি বসতে অপছন্দ করতেন, তিনি তখন কৌশলে বলতেন: “আমার দাঁত, আমার দাঁত!” (অর্থাৎ দাঁতের ব্যথার অজুহাত দিতেন)। ফলে ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি বুঝে যেতেন না কিন্তু তাঁকে একা ছেড়ে চলে যেতেন।
.
আরও বর্ণিত আছে যে,وأحضر سفيان الثوري إلى مجلس الخليفة المهدي فاستحسنه ، فأراد الخروج فقال الخليفة لا بد أن تجلس فحلف الثوري على أنه يعود فخرج وترك نعله عند الباب ، وبعد قليل عاد فأخذ نعله وانصرف فسأل عنه الخليفة فقيل له إنه حلف أن يعود فعاد وأخذ نعله “ইমাম সুফিয়ান সাওরিকে খলিফা আল-মাহদির দরবারে উপস্থিত করা হয়। খলিফা তাকে (তার জ্ঞান ও ব্যক্তিত্বের জন্য) খুব পছন্দ করলেন।এরপর সাওরি যখন চলে যেতে চাইলেন, খলিফা বললেন আপনাকে অবশ্যই বসতে হবে। তখন সাওরি শপথ করলেন যে, তিনি ফিরে আসবেন। এরপর তিনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে দরজার কাছে নিজের জুতো জোড়া রেখে গেলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি পুনরায় ফিরে এসে নিজের জুতো নিয়ে চলে গেলেন। খলিফা যখন তার সম্পর্কে খোঁজ নিলেন, তখন তাকে জানানো হলো তিনি ফিরে আসার শপথ করেছিলেন, তাই ফিরে এসে নিজের জুতো নিয়ে চলে গেছেন।”
.
ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) নিজ ঘরে অবস্থান করছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে কয়েকজন ছাত্রও ছিলেন। তাঁদের মধ্যে মাওয়ার্দীও ছিলেন। এমন সময় একজন ভিক্ষুক দরজার বাইরে এসে মাওয়ার্দীর খোঁজ করল। কিন্তু ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ ) চাচ্ছিলেন না যে মাওয়ার্দী বাইরে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করুক। তখন তিনি বললেন: “মাওয়ার্দী এখানে নেই। মাওয়ার্দী এখানে কী করবে?”—এই কথা বলতে বলতে তিনি নিজের একটি আঙুল অন্য হাতের তালুর ভেতরে ঢুকিয়ে ইশারা করছিলেন, যাতে বোঝান যে, মাওয়ার্দী আসলে তাঁর কাছেই রয়েছে। কেননা, ভিক্ষুক তো ভেতরের অবস্থা দেখতে পাচ্ছিল না।”(ইবনু কাইয়ুম; ইগাসাতুল লাহফান; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৮১এবং ২/১০৬-১০৭; ইবনুল মুফলিহ আদাবুস শারইয়্যাহ: ১/১৪; গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-২৭২৬১)
.
এমন অস্পষ্টতা বা পরোক্ষতা ব্যক্ত করার আরও কিছু উদাহরণ হলো—
যদি কেউ আপনাকে জিজ্ঞাসা করে, “আপনি কি অমুক ব্যক্তিকে দেখেছেন?” এবং আপনি যদি জানেন যে তার সম্পর্কে সত্য বলা প্রশ্নকারী বা অন্য কারও ক্ষতির কারণ হতে পারে, তাহলে আপনি বলতে পারেন: “মা রা’আইতুহু” — যার অর্থ সাধারণত হয় “আমি তাকে দেখিনি”; তবে আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী এর আরেকটি অর্থ হতে পারে “আমি তার ফুসফুস কাটি নাই” (কারণ “রা’আ” এর একটি অর্থ “চিরে দেখা” বা “অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দেখা” এবং “আয়তুহু” অর্থ “তার ফুসফুস”)। এটি দ্ব্যর্থবোধক বাক্য। অথবা আপনি সেই ব্যক্তিকে দেখার বিষয়টি অস্বীকার করতে পারেন, তবে নিজের মনে এমন একটি সময় বা স্থান নির্দিষ্ট করে নিন, যেখানে সত্যিই আপনি তাকে দেখেননি—এভাবে আপনি মিথ্যা না বলেই কথা গোপন রাখলেন। একইভাবে, যদি কেউ আপনাকে শপথ করায় যে, “আপনি কখনো অমুক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলবেন না,” তখন আপনি বলতে পারেন: “ওয়াল্লাহি লা উকাল্লিমুহু” — এর প্রচলিত অর্থ হলো “আল্লাহর কসম, আমি তার সঙ্গে কথা বলব না”; তবে আরবীতে “কাল্লামা” ক্রিয়াটি “ক্ষত করা” অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে। সুতরাং এর আক্ষরিক অর্থ হতে পারে “আমি তাকে আহত করব না” — এটিও একটি দ্ব্যর্থবোধক বাক্য।
আরও একটি উদাহরণ: যদি কাউকে কুফর (অবিশ্বাস) প্রকাশ করতে বাধ্য করা হয়, যেমন—তাকে আল্লাহ্‌কে অস্বীকার করতে বলা হয়, তখন তার জন্য জায়েয হয় এই বাক্য বলা: “কাফারতু বিল-লাহি”। এই বাক্যটি উচ্চারণে “আমি আল্লাহকে অস্বীকার করি” বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এর ভিন্ন অর্থ হতে পারে: “আমি ‘বিল্লাহি’ নামের কাউকে অভিশাপ দিলাম” বা “আমি প্লেবয়কে (ধরুন এর নাম বিল্লাহি) নিন্দা করলাম।” এতে মুখে কুফর উচ্চারণ হলেও অন্তরের বিশ্বাস ঠিক থাকে।(ইবনু আল-কাইয়্যেমের ইগাতাতুল লাহফান গ্রন্থে, এবং ইবন মুফলিহের আল-আদাব ash-শার’ইয়্যাহ–এর ‘মাআরিদ’ (প্রতিবন্ধকতা/বাধা) বিভাগে এ বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।)
.
তবে সতর্ক থাকা উচিত যে এই ধরনের বক্তব্য বা ভাষার ব্যবহার শুধুমাত্র কঠিন ও সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতেই সীমিত রাখা দরকার। অন্যথায়, এর অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষকে মিথ্যাচারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এমনকি কেউ কেউ তাদের ভালো বন্ধুদেরও হারাতে পারেন, কারণ বন্ধুদের মনে সবসময় সন্দেহ জাগতে পারে—এ ধরনের কথা বলার আসল মানে কী ছিল। যদি কেউ বুঝতে পারেন যে বাস্তবতা তার জানার চেয়ে আলাদা ছিল, এবং সেই ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্টতা কিংবা দ্বিধার আশ্রয় নিয়েছেন, তাহলে তিনি তাকে মিথ্যাবাদী ভাবতে পারেন। এটি এমন একটি আচরণ, যা একজন ব্যক্তির সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং আত্মমর্যাদা রক্ষার নীতির বিরুদ্ধেও যায়। যে ব্যক্তি বারবার এই কৌশল ব্যবহার করে, সে হয়তো মানুষের সরলতা কিংবা বিশ্বাসকে ব্যবহার করে নিজেকে দক্ষ মনে করতে পারে। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: