চাঁদাবাজি বা অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যয় নির্বাহের ব্যাপারে ইসলামি শরীয়াহর বিধান

প্রশ্ন: চাঁদাবাজি বা অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যয় নির্বাহের ব্যাপারে ইসলামি শরীয়াহর বিধান কী? একটু বড় হলেও গুরুত্বপূর্ণ।
​▬▬▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর শার’ঈ দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা-ভাবনা করলে বলা যায় হারাম সম্পদ দুই প্রকার: (১). স্বত্তাগত হারাম, ও (২). উপার্জনের কারণে হারাম।
.
⚫(১). স্বত্তাগত হারাম (নিজ বস্তুটিই হারাম): যে সম্পদ মূল মালিকের সম্মতি ছাড়া নেওয়া হয়েছে।যেমন: চুরি করা মাল, জবরদখল বা চাঁদাবাজি করা সম্পদ, লুট করা সম্পদ। এই ধরনের সম্পদ গ্রহণকারীর জন্য যেমন হারাম, তেমনি পরবর্তীতে যার কাছেই পৌঁছাক, যদি সে জানে যে এটি অবৈধভাবে অর্জিত, তবে তার জন্যও তা হারাম।কারণ এই হারাম হওয়ার বিষয়টি সম্পদের মূল সত্তার সাথেই সংশ্লিষ্ট। প্রকৃতপক্ষে এটি মাজলুমের হক, তাই তা তার নিকট ফিরিয়ে দেওয়া ফরজ। এ থেকে উপকৃত হওয়া মানে জুলুমে সহযোগিতা করা এবং গুনাহে অংশীদার হওয়া। জোরপূর্বক দখল করা সম্পদ তার প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ফরজ হওয়ার বিষয়ে আলেমদের ‘ইজমা’ বা ঐক্যমত্য বর্ণিত হয়েছে।
.
মহান আল্লাহ বলেন:يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ”হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না;(সূরা নিসা;২৯)এ আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, পরস্পরের মধ্যে অন্যায় পন্থায় একের সম্পদ অন্যের পক্ষে ভোগ করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। হাদিসে এসেছে, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুফাসসিরকুল শিরোমণি, উম্মাহ’র শ্রেষ্ঠ ‘ইলমী ব্যক্তিত্ব, সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) [মৃত: ৬৮ হি.]-থেকে বর্নিত তিনি বলেন,রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কোরবানির দিন (বিদায় হজ্জের ভাষণে) সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে বলেন:(فإنَّ دِماءَكم وأموالَكم وأعراضَكم عليكم حرامٌ كحُرمةِ يَومِكم هذا، في بَلَدِكم هذا، في شَهْرِكم هذا )”নিশ্চয় তোমাদের জান-মাল এবং সম্মান (বিনষ্ট করা) তোমাদের উপর এরূপ হারাম, যেরূপ তোমাদের জন্য আজকের দিন, এ মাস এবং এ নগরের পবিত্রতা বিনষ্ট করা হারাম।”(সহীহ বুখারী হা/৬৭;সহীহ মুসলিম হা/৪২৭৬) অপর বর্ননায় প্রখ্যাত সাহাবী আবূ হুরায়রা (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) [মৃত: ৫৯ হি.]-থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,(من كانت له مَظلَمةٌ لأحَدٍ مِن عِرْضِه أو شَيءٍ فلْيَتحَلَّلْه منه اليومَ قبل ألَّا يَكونَ دِينارٌ ولا دِرْهمٌ! إن كان له عَمَلٌ صالحٌ أُخِذَ منه بقَدْرِ مَظلَمَتِه، وإن لم تَكُنْ له حَسَناتٌ أُخِذَ مِن سَيِّئاتِ صاحِبِه فحُمِلَ عليه! “যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্মানহানি বা অন্য কোন বিষয়ে যুলুমের জন্য দায়ী, সে যেন আজই তার কাছ থেকে মাফ করিয়ে নেয়; সে দিন আসার পূর্বে যে দিন কোন দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) বা দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) থাকবে না। সে দিন তার কোন সৎকর্ম থাকলে সেটা থেকে তার যুলুমের পরিমাণ কেটে নেয়া হবে। আর তার কোন সৎকর্ম না থাকলে তার (মজলুম) প্রতিপক্ষের পাপের কিছু তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে।”(সহীহ বুখারী হা/২৪৪৯)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,إذا كان معه مال حرام وأراد التوبة والبراءة منه – فإن كان له مالك معين – وجب صرفه إليه أو إلى وكيله , فإن كان ميتا وجب دفعه إلى وارثه“যদি কারো কাছে হারাম সম্পদ থাকে এবং সে এর থেকে তাওবা করতে চায় ও মুক্ত হতে চায়; যদি উক্ত সম্পদের নির্দিষ্ট কোন মালিক থাকে; তাহলে সেটি সেই মালিককে বা মালিকের প্রতিনিধিকে প্রদান করা ওয়াজিব। যদি মালিক মৃত হন তাহলে তার ওয়ারিশদেরকে পরিশোধ করা ওয়াজিব।”(ইমাম নববী; শারহুল মুহায্‌যাব;  খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৪২৮)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:এক ব্যক্তি জানে যে তার পিতার সম্পদের উৎস হারাম সে কি তার পিতার খাবার খেতে পারবে? আর যদি না খায়, তাহলে কি তা পিতামাতার অবাধ্যতা হবে?
তিনি উত্তরে বলেন:الرجل الذي علم أن مال أبيه من الحرام إن كان حراماً بعينه، بمعنى: أنه يعلم أن أباه سرق هذا المال من شخص فلا يجوز أن يأكله، لو علمت أن أباك سرق هذه الشاة وذبحها، فلا تأكل، ولا تُجِبْ دعوته.أما إذا كان الحرام من كسبه يعني: أنه هو يرابي أو يعامل بالغش أو ما يشابه ذلك، فكل، والإثم عليه هو”যে ব্যক্তি জানে তার পিতার সম্পদ হারাম যদি তা স্বত্তাগত হারাম হয় (অর্থাৎ নির্দিষ্টভাবে হারাম সম্পদ), যেমন সে জানে তার পিতা এই সম্পদ কারো কাছ থেকে চুরি করেছে, তাহলে তা খাওয়া জায়েজ নয়। যদি তুমি জানো তোমার পিতা এই ছাগল চুরি করে জবাই করেছে, তাহলে তা খেও না এবং তার দাওয়াতও গ্রহণ করো না। কিন্তু যদি হারাম হয় তার উপার্জনের কারণে যেমন সে সুদ খায়, প্রতারণা করে বা এ ধরনের লেনদেন করে, তাহলে তুমি খেতে পারো, গুনাহ তার উপরই হবে।”(ইবনু উসামীন; লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ; লিক্বা নং-১৮৮/১৪)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে ব্যক্তি যা পাওয়ার অধিকার নেই সেটা গ্রহণ করেছে জবাবে তিনি বলেন: আপনার উপর আবশ্যকীয় হচ্ছে- এ সম্পদ ফেরত দেওয়া। কেননা আপনি এ দায়িত্ব পালন না করার কারণে আপনি সেটার হকদার নন। যদি সেটা ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভবপর না হয় তাহলে কোন কল্যাণের পথে সেটা ব্যয় করুন; যেমন- গরীবদের মাঝে সদকা করে দেওয়া কিংবা কোন কল্যাণমুখী প্রজেক্টে দান করে দেওয়া। আর সাথে সাথে তওবা ও ইস্তিগফার করা এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ পুনরায় করা থেকে সতর্ক থাকা।”(ফাতাওয়া উলামায়িল বালাদিল হারাম; পৃষ্ঠা-৮৩১)
.
সুতরাং যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ গ্রহণ করেছে তার উপর আবশ্যকীয় হচ্ছে—সে সম্পদ ঐ ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দেয়া।তিনি মৃত হলে তার ওয়ারিশদের কাছে সম্পদ ফিরিয়ে দেয়া; এমনকি সেটা তার পক্ষে কঠিন হলেও; যেহেতু এটি সম্ভবপর। কঠিন হলেও সম্ভবপর হওয়া, আর ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভবপর না হওয়া—দুটো বিষয়ের মাঝে পার্থক্য আছে। যদি সম্পদ তার মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভবপর হয় তাহলে তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া আবশ্যকীয়; কেননা তারাই এর হকদার। এ সম্পদ খরচ করার অধিকার তাদেরই। তাদেরকে না জানিয়ে তাদের সম্পদ দান করা জায়েয নয়;কারণ কোন ব্যক্তির জন্য অন্যের সম্পদ থেকে তার অজান্তে গরীবদের মাঝে দান করা সঙ্গত নয়। সে নিজের সম্পদ থেকে যা খুশি দান করতে পারে।সুতরাং আত্মসাৎকৃত সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া তার তওবা পূর্ণ হবে না। দলিল হচ্ছে আবু হুরায়রা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদিস তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোন বিষয়ে যুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার থেকে মাফ করিয়ে নেয়, সে দিন আসার পূর্বে যে দিন তার কোন দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) বা দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) থাকবে না। যদি তার সৎকর্ম থাকে তাহলে তার সৎকর্ম থেকে জুলুমের সমপরিমাণ কেটে রাখা হবে। আর তার সৎকর্ম না থাকলে তার প্রতিপক্ষের পাপ হতে জুলুমের সমপরিমাণ নিয়ে তা তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে।”(সহিহ বুখারী হা/২৪৪৯)
ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:قال العلماء: التوبة واجبة من كل ذنب ، فإن كانت المعصية بين العبد وبين الله تعالى لا تتعلق بحق آدمي فلها ثلاثة شروط : أحدها : أن يقلع عن المعصية. والثاني : أن يندم على فعلها . والثالث : أن يعزم أن لا يعود إليها أبدا . فإن فقد أحد الثلاثة لم تصح توبته . وإن كانت المعصية تتعلق بآدمي فشروطها أربعة : هذه الثلاثة ، وأن يبرأ من حق صاحبها ، فإن كانت مالا أو نحوه رده إليه ، وإن كانت حدّ قذف ونحوه مكّنه منه أو طلب عفوه ، وإن كانت غيبة استحله منها “আলেমগণ বলেন, প্রত্যেক গুনাহ থেকে তওবা করা ওয়াজিব। যদি গুনাহটি বান্দার মাঝে ও আল্লাহ্‌র মাঝে হয়ে থাকে; কোন মানুষের হক্বের সাথে সম্পৃক্ত না হয় তাহলে সে তওবার জন্য শর্ত তিনটি: ১। গুনাহ ত্যাগ করা। ২। কৃত কর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া। ৩। সে গুনাতে পুনরায় লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়া। যদি এ তিনটি শর্তের কোন একটি না পাওয়া যায় তাহলে সে তওবা শুদ্ধ হবে না।আর যদি গুনাহটি মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হয় তাহলে সে তওবার জন্য শর্ত চারটি: উল্লেখিত তিনটি এবং হক্বদারের হক্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করা; যদি সম্পদ বা এ জাতীয় কিছু হয় তাহলে সেটা মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া। আর যদি অপবাদ এবং এ ধরণের কিছু হয় তাহলে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য নিজেকে তার কাছে পেশ করা কিংবা ক্ষমা চেয়ে নেওয়া। আর যদি গীবত হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া।”(নববী; রিয়াদুস সালেহীন; পৃষ্ঠা-৩৩)
.
স্থায়ী কমিটির ফতোয়াসমগ্র” তে এসেছে—في جندي سرق مالا من عبدٍ : ” إن كان يعرف العبدَ أو يعرف من يعرفه : فيتعين عليه البحث عنه ليسلم له نقوده فضة أو ما يعادلها أو ما يتفق معه عليه ، وإن كان يجهله وييأس من العثور عليه : فيتصدق بها أو بما يعادلها من الورق النقدي عن صاحبها ، فإن عثر عليه بعد ذلك فيخبره بما فعل فإن أجازه فبها ونعمت ، وإن عارضه في تصرفه وطالبه بنقوده : ضمنها له وصارت له الصدقة ، وعليه أن يستغفر الله ويتوب إليه ويدعو لصاحبها”জনৈক সৈনিক একজন দাস থেকে কিছু অর্থ চুরি করেছে: যদি সৈনিক ব্যক্তি দাসটিকে চেনে কিংবা দাসটিকে যে ব্যক্তি চেনে তাকে চেনে সেক্ষেত্রে সন্ধান করে তাকে সে রৌপ্যমুদ্রা বা সমমূল্য বা তার সাথে যা পরিশোধ করতে একমত হবে সেটা পরিশোধ করা। আর যদি তাকে না চেনে ও তার সন্ধান পাওয়ার ব্যাপারে হতাশ হয়ে যায় তাহলে ঐ অর্থ কিংবা ঐ অর্থের সমমূল্যের কাগুজে মুদ্রা এর মালিকের পক্ষ থেকে সদকা করে দিবে। পরে যদি উক্ত ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে বিষয়টি তাকে অবহিত করবে। যদি মালিক সদকার বিষয়টি মেনে যায় তাহলে ভাল। আর যদি সদকা করাটা মেনে না যায় এবং অর্থ দাবী করে তাহলে তাকে তার অর্থ ফেরত দিতে হবে এবং সদকাকৃত অর্থ সৈনিকের নিজের সদকা হিসেবে গণ্য হবে। এ সৈনিকের কর্তব্য হল: আল্লাহ্‌র কাছে ইস্তিগফার করা, তওবা করা এবং এ অর্থের মালিকের জন্য দোয়া করা।”(ফাতাওয়া ইসলামিয়্যা; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১৬৫) থেকে সমাপ্ত]
.
ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেন: “সম্পদগুলো মালিকদের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে হবে; যেহেতু তারা চেনা ব্যক্তি কিংবা তাদের ওয়ারিশগণ চেনা ব্যক্তি। পক্ষান্তরে, আপনি যদি তাদেরকে ভুলে যান কিংবা মূলতঃই না চেনেন কিংবা তাদেরকে খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে আপনি নিরাশ হয়ে পড়েন— সে ক্ষেত্রে আপনি তাদের পক্ষ থেকে দান করে দিন। কিন্তু, তারা যদি চেনা মানুষ হয় কিংবা তারা মারা গেছেন তবে তাদের ওয়ারিশগণ চেনা হয়; কারো জন্য হয়ত তাদের কাছে গিয়ে বলা: ‘আমি তোমাদের কাছ থেকে এ সম্পদগুলো অবৈধভাবে গ্রহণ করেছি, আপনারা আমার তওবা গ্রহণ করুন এবং সম্পদগুলো গ্রহণ করুন’—সমস্যা হতে পারে। এ দিক থেকেও এটা কঠিন হতে পারে যে, শয়তান হয়তো তাদের মনে ঢুকিয়ে দিবে যে, তুমি এর চেয়ে বেশি সম্পদ নিয়েছ ইত্যাদি। তাই, আপনি একজন আস্থাভাজন, বুদ্ধিমান ও দ্বীনদার মানুষ খুঁজে নিন। তাকে বলবেন: ভাই, বিষয়টি এমন এমন। অমুকের এই পাওনা আছে কিংবা সে মারা গিয়ে থাকলে তার ওয়ারিশদের এই পাওনা আছে। আশা করি সে ব্যক্তি আপনাকে দায়মুক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবেন এবং যাদের পাওনা তাদের সাথে যোগাযোগ করে বলবে যে, ভাই! এই ব্যক্তি আল্লাহ্‌র কাছে তওবা করেছেন। তিনি তোমাদের এত এত সম্পদ অন্যায়ভাবে নিয়েছেন। এই নাও সে সম্পদ। এভাবে তার দায়মুক্ত হবে। কারণ আলেমগণ বলেন: যে সম্পদের মালিক চেনা; সে সম্পদ তার মালিকের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে হবে।”(ইবনু উসাইমীন; আল-লিকা আস-শাহরি; নং-৩১ থেকে সমাপ্ত)
.
⚫(২). উপার্জনের কারণে হারাম: হারাম সম্পদগুলো যদি উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে কোন হারাম বিনিময় কিংবা হারাম কাজের বিপরীতে অর্জিত হয়ে থাকে; যেমন মদের মূল্য, গানবাজনা, জ্যোতিষীপনা, সুদের লিখন, মিথ্যা-সাক্ষ্য দেয়া ইত্যাদি হারাম কাজের বিপরীতে তাহলে এটি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ: এই প্রকার সম্পদ সম্পর্কে দুই দিক থেকে মতভেদ রয়েছে:
▪️প্রথম দিক: যদি উপার্জনকারী তওবা করে, তাহলে তার করণীয় কী? মালিককে ফিরিয়ে দেবে? দান করে দেবে? নাকি নিজের জন্য রাখা বৈধ হবে? আর শেষ মতের ক্ষেত্রে হারাম জানত কি জানত না এ বিষয়ে কি পার্থক্য হবে? এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
.
(ক).যদি ব্যক্তি এর হারাম হওয়া সম্পর্কে না-জেনে এটি উপার্জন করে থাকে তাহলে এই সম্পদ তার। এই সম্পদ থেকে মুক্ত হওয়া তার উপর আবশ্যক নয়। যেহেতু আল্লাহ্‌ তাআলা সুদের নিষেধাজ্ঞা নাযিল করার পর সুদের ব্যাপারে বলেন:(فَمَنْ جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِنْ رَبِّهِ فَانتَهَى فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ وَمَنْ عَادَ فَأُوْلَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ )“অতএব, যার নিকট তার রবের কাছ থেকে উপদেশ আসার পর সে (সুদ খাওয়া থেকে) বিরত হয়, তাহলে আগে যা (নেওয়া) হয়েছে তা তারই এবং তার বিষয়টি (ফয়সালার ভার) আল্লাহ্‌র কাছে। আর যারা ফিরে যাবে (অর্থাৎ পুনরায় সুদ খাবে) তারা জাহান্নামের অধিবাসী হবে, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।”[সুরা বাক্বারা: ২৭৫]
.
(খ).আর যদি সেই ব্যক্তি এই সম্পদ হারাম হওয়া সম্পর্কে জ্ঞাত থাকে; তবে ঐ সম্পদটি সে খরচ করে ফেলে ও নিঃশেষ হয়ে যায়; তাহলে সে যদি খাঁটি তাওবা করে তার ওপর আর কিছু আবশ্যক হবে না।
.
(গ). আর যদি সেই সম্পদ অবশিষ্ট থাকে; তাহলে সেই সম্পদকে কোন ভাল খাতে ব্যয় করে এর থেকে মুক্ত হওয়া অনিবার্য। তবে সে যদি ঐ সম্পদের মুখাপেক্ষী থাকে তাহলে তার প্রয়োজন মাফিক সেই সম্পদ থেকে গ্রহণ করবে এবং অবশিষ্ট সম্পদ থেকে সে অবমুক্ত হবে।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:আমি আপনাদেরকে জিজ্ঞেস করছি যে, একজন আলেমের একটি ফতোয়া মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। সেটি হলো যদি কোন ব্যক্তি মদ বানিয়ে বা বিক্রি করে কিংবা মাদকদ্রব্য বিক্রি করে সম্পদ উপার্জন করে এবং আল্লাহ্‌র কাছে তাওবা করে; তাহলে মদ বানানো বা বিক্রি করা কিংবা মাদকদ্রব্য বিক্রি করা বা বাজারজাত করার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ তার জন্য হালাল। তারা জবাবে বলেন:إذا كان حين كسب الحرام يعلم تحريمه ، فإنه لا يحل له بالتوبة ، بل يجب عليه التخلص منه بإنفاقه في وجوه البر وأعمال الخير”যদি হারাম সম্পদ উপার্জনকালে এটি হারাম হওয়া সম্পর্কে অবহিত থাকে তাহলে তাওবার মাধ্যমে এটি তার জন্য হালাল হবে না। বরং কোন নেক কাজে ও ভালো কাজে ব্যয় করার মাধ্যমে এর থেকে মুক্ত হওয়া তার উপর আবশ্যক হবে।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ৩৩)
.
আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনু কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা,(রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেন:إذا عاوض غيره معاوضة محرمة وقبض العوض ، كالزانية والمغني وبائع الخمر وشاهد الزور ونحوهم ثم تاب والعوض بيده . فقالت طائفة : يرده إلى مالكه ؛ إذ هو عين ماله ولم يقبضه بإذن الشارع ولا حصل لربه في مقابلته نفع مباح .وقالت طائفة : بل توبته بالتصدق به ولا يدفعه إلى من أخذه منه ، وهو اختيار شيخ الإسلام ابن تيمية ، وهو أصوب القولين …“যদি কোন ব্যক্তি অপর কাউকে কোন হারামের বিনিময় প্রদান করে ও বিনিয়মটি সেই ব্যক্তি গ্রহণ করে; যেমন ব্যভিচারিনী, গায়ক, মদবিক্রেতা, মিথ্যাসাক্ষ্যদানকারী প্রমুখ; পরবর্তীতে ঐ ব্যক্তি এর থেকে তাওবা করে এবং ঐ বিনিয়মটি তার হাতে থাকে; সেক্ষেত্রে একদল আলেম বলেন: বিনিময়টি এর মালিককে ফেরত দিবে। যেহেতু এটি স্বয়ং সেই সম্পদ; যা গ্রহণ করার অনুমতি শরিয়তপ্রণেতা (আইনদাতা) প্রদান করেননি এবং এ সম্পদের মালিকের এর বিপরীতে বৈধ উপকার অর্জিত হয়নি। আর অপর একদল আলেমের মতে, এই সম্পদ দান করে দেয়াটাই হলো তার তাওবা। যার কাছ থেকে এটি গ্রহণ করেছে তাকে ফেরত দিবে না। এটি শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার নির্বাচিত অভিমত এবং সর্বাধিক সঠিক অভিমত…।”(ইবনু ক্বাইয়িম,মাদারিজুস সালেকীন;খণ্ড;১;পৃষ্ঠা;৩৮৯)
ইবনু কাইয়্যেম (রাহিমাহুল্লাহ) এই মাসয়ালাটি ‘যাদুল মাআদ’-এ বিশদভাবে আলোচনা করেছেন এবং তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, এই সম্পদ থেকে অবমুক্ত হওয়া ও তাওবার পরিপূর্ণতা হবে: এটি দান করে দেয়ার মাধ্যমে। আর যদি এই সম্পদের মুখাপেক্ষী হয় তাহলে তার প্রয়োজন মাফিক এর থেকে গ্রহণ করবে এবং বাকীটুকু দান করে দিবে।”(ইবনু ক্বাইয়িম; যাদুল মা‘আদ; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৭৭৮)
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:فإن تابت هذه البَغِيّ وهذا الخَمَّار ، وكانوا فقراء جاز أن يصرف إليهم من هذا المال قدر حاجتهم ، فإن كان يقدر يتّجر أو يعمل صنعة كالنسيج والغزل ، أعطي ما يكون له رأس مال “যদি এই পতিতা ও এই মদবিক্রেতা তাওবা করে এবং তারা গরীব হয়; তাহলে এই সম্পদ থেকে তাদের প্রয়োজন অনুপাতে খরচ করা জায়েয হবে। যদি ব্যবসা জানে কিংবা কাপড় বুননের মত কোন পেশা জানে তাহলে তাকে এই সম্পদ থেকে মূলধন প্রদান করা হবে।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ৩০৮)
.
▪️দ্বিতীয় দিক: অবৈধ পন্থায় উপার্জিত সম্পদ কি উপার্জনকারী ছাড়া অন্য কারো জন্য হালাল হবে? যেমন: দান, উত্তরাধিকার, খরচ ইত্যাদির মাধ্যমে কারো কাছে এলে। এ ব্যাপারে ফকিহদের দুই মত:
প্রথম মত: উপার্জনকারী ও অন্য কারো জন্যই হালাল নয়। এটাই অধিকাংশ আলেমের মত। হানাফি, শাফেয়ি, হাম্বলি মাযহাব এবং স্থায়ী ফতোয়া কমিটিও এই মত দিয়েছে।তাদের যুক্তি হল: এই সম্পদ উপার্জনকারীর জন্যই হালাল নয়, সে শরীয়ত অনুযায়ী এর মালিকও নয়। তার উপর ওয়াজিব এটি থেকে মুক্ত হওয়া বা আসল মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া। সুতরাং এটি অন্যের কাছে স্থানান্তরিত হবে না কারণ উত্তরাধিকার বা হিবা দ্বারা স্থানান্তর হওয়া মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার উপর নির্ভরশীল এখানে তা পাওয়া যায়নি। এই মাসআলায় জমহুর আলেমদের বক্তব্য তুলনামূলক কম কারণ তারা মূল নীতির উপর নির্ভর করেছেন, হারাম সম্পদ মৃত্যু দ্বারা পবিত্র হয় না, এক হাত থেকে অন্য হাতে গেলেও তা হালাল হয় না।প্রখ্যাত সাহাবী আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি একবার খাবার খেলেন, তারপর তাকে জানানো হলো যে তা হারাম থেকে এসেছে, তখন তিনি তা বমি করে বের করে দেন।(জামিউল উলূম;খণ্ড;১;পৃষ্ঠা;২১১) এ কারণেই স্থায়ী ফতোয়া কমিটি ফতোয়া দিয়েছে যে, সুদের লাভ উত্তরাধিকার হিসেবে বণ্টিত হবে না, সন্তানরা তা ভোগ করবে না (ফাতাওয়া লাজনাতুদ দায়েমা; খণ্ড: ১৬; পৃষ্ঠা: ৪৫৫, ও খণ্ড: ২২; পৃষ্ঠা: ৩৪৪) আহকামুল মালিল হারাম ওয়া দাওয়াবিতুল ইন্তিফা ওয়াত তাসাররুফ বিহি ফিল ফিক্বহিল ইসলামী ড. আব্বাস আহমাদ আল বায, পৃষ্ঠা ৭৩–৯২। এটি একটি গবেষণাধর্মী রিসালা, যেখানে গবেষক অধিকাংশ আলেমের মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।এছাড়াও জামিউল উলূম ওয়াল হিকাম ইবনু রজব ১/২০৮–২১১)
.
দ্বিতীয় মত: উপার্জনকারীর জন্য হারাম,কিন্তু বৈধ পথে অন্য কারো কাছে এলে তার জন্য হালাল। যেমন: উত্তরাধিকার, হিবা ইত্যাদি। এটি মালিকি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মত,কিছু হানাফি আলেম, হাসান বসরি, যুহরি এবং শাইখ ইবনু উসাইমীন (রাহি.) এই মত গ্রহণ করেছেন।তাদের যুক্তি হল:নবী (ﷺ) এবং তাঁর সাহাবীগণ ইহুদিদের সাথে ক্রয়-বিক্রয়, ভাড়া, ঋণ ইত্যাদি লেনদেন করতেন যদিও তাদের মধ্যে সুদ খাওয়া ও হারাম সম্পদ ভোগ করার বিষয়টি প্রসিদ্ধ ছিল।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:এক ব্যক্তি সুদী লেনদেন করত এবং সে সম্পদ ও সন্তান রেখে মারা গেছে এটা সন্তান জানে। তাহলে উত্তরাধিকার হিসেবে এই সম্পদ কি সন্তানের জন্য হালাল হবে, না হবে না?
তিনি উত্তরে বলেন:أما القدر الذي يَعلم الولد أنه ربا : فيخرجه إما أن يرده إلى أصحابه إن أمكن وإلا تصدق به. والباقي لا يحرم عليه؛ لكن القدر المشتبه يستحب له تركه. إذا لم يجب صرفه في قضاء دين أو نفقة عيال.وإن كان الأب قبضه بالمعاملات الربوية التي يرخص فيها بعض الفقهاء : جاز للوارث الانتفاع به. وإن اختلط الحلال بالحرام وجهل قدر كل منهما جعل ذلك نصفين”সন্তান যে পরিমাণ সম্পদকে নিশ্চিতভাবে সুদের টাকা বলে জানে, তা সে বের করে দেবে, সম্ভব হলে আসল মালিকদের ফেরত দেবে, তা সম্ভব না হলে সদকা করে দেবে। বাকিটা তার জন্য হারাম নয়। তবে যে অংশ সন্দেহযুক্ত, তা ছেড়ে দেওয়া মুস্তাহাব, যদি তা ঋণ পরিশোধ বা পরিবারের খরচে ব্যয় করা জরুরি না হয়। আর যদি পিতা এমন সুদী লেনদেনের মাধ্যমে তা গ্রহণ করে থাকে, যেগুলোকে কিছু ফকিহ অনুমোদন দিয়েছেন, তাহলে ওয়ারিসের জন্য তা ভোগ করা জায়েজ। আর যদি হালাল-হারাম মিশে যায় এবং কোনটা কত তা জানা না যায়, তাহলে তা অর্ধেক অর্ধেক ধরে নেওয়া হবে। (মাজমূউল ফাতাওয়া ২৯/৩০৭) এ মতটি হচ্ছে অধিকাংশ আলেমের মতের ভিত্তিতে।
ইবনু রুশদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وقال ابن رشد: “وروي عن ابن شهاب أنه قال فيمن كان على عمل فيأخذ الرشوة، والغلول، والخمس، وفيمن كانت أكثر تجارته الربا: إن ما تركا من الميراث سائغ لورثتهما بميراثهم الذي فرضه الله لهم، علموا بخبث كسبه أو جهلوه، وإثم الظلم على جانيه”ইবনু শিহাব সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো দায়িত্বপূর্ণ কাজে থেকে ঘুষ নেয়, অথবা গনিমতের সম্পদে খিয়ানত করে, অথবা যার অধিকাংশ ব্যবসা সুদের উপর প্রতিষ্ঠিত, তারা যে সম্পদ রেখে মারা যায়, তা তাদের ওয়ারিসদের জন্য বৈধ কারণ তারা আল্লাহ নির্ধারিত উত্তরাধিকার হিসেবে তা পেয়েছে, তারা উপার্জনের হারাম হওয়া জানুক বা না জানুক। গুনাহ হবে জুলুমকারী উপার্জনকারীর উপরই।”(ফাতাওয়া ইবনু রুশদ ১/৬৪০)
.
ইবনু রজব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: এ বিষয়ে সালাফদের থেকে বহু বর্ণনা রয়েছে। সহীহভাবে ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তাঁকে এমন এক ব্যক্তির সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো যার প্রতিবেশী প্রকাশ্যে সুদ খায় এবং হারাম সম্পদ গ্রহণে কোনো পরোয়া করে না‌, সে তাকে খাবারের দাওয়াত দেয় তিনি বললেন: তার দাওয়াত কবুল করো, তোমাদের জন্য তা উপভোগ আর গুনাহ তার উপর। অন্য বর্ণনায় তিনি বলেছেন: আমি তার সম্পদের কিছুই জানি না, সবই নাপাক বা হারাম তবুও তিনি বলেছেন: তার দাওয়াত গ্রহণ করো। ইমাম আহমাদ এই বর্ণনাকে সহীহ বলেছেন। তবে এর বিপরীতে ইবনু মাসউদ (রা.) থেকেই আরেকটি বর্ণনা আছে তিনি বলেছেন: গুনাহ হচ্ছে যা অন্তরকে কাঁপিয়ে তোলে। সালমান (রাঃ) থেকেও প্রথম মতের অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। আর সাঈদ ইবনু জুবাইর, হাসান বসরী, মুররিক আল ইজলি, ইবরাহিম নাখঈ, ইবনু সিরিন প্রমুখ থেকেও অনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। এসব বর্ণনা ‘আল আদাব’ (হুমাইদ ইবনু জানজুয়াইহ), ‘আল‌ জামি’ (খাল্লাল),আব্দুর রাজ্জাক ও ইবনু আবি শাইবার মুসান্নাফ প্রভৃতি গ্রন্থে পাওয়া যায়। (জামি‘উল উলূম ওয়াল হিকাম; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২০৯–২১০)
.
ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:قال بعض العلماء: ما كان محرما لكسبه، فإنما إثمه على الكاسب ، لا على من أخذه بطريق مباح من الكاسب، بخلاف ما كان محرما لعينه، كالخمر والمغصوب ونحوهما . وهذا القول وجيه قوي، بدليل أن الرسول صلى الله عليه وسلم اشترى من يهودي طعاما لأهله، وأكل من الشاة التي أهدتها له اليهودية بخيبر، وأجاب دعوة اليهودي، ومن المعلوم أن اليهود معظمهم يأخذون الربا ويأكلون السحت . وربما يقوي هذا القول قوله صلى الله عليه وسلم في اللحم الذي تصدق به على بريرة: (هو لها صدقة ، ولنا منها هدية) “কিছু আলেম বলেছেন: যে সম্পদ উপার্জনের কারণে হারাম, তার গুনাহ উপার্জনকারীর উপরই হবে, যে ব্যক্তি তার কাছ থেকে বৈধ পদ্ধতিতে তা গ্রহণ করেছে, তার উপর নয়। আর যে সম্পদ নিজ সত্তাগতভাবে হারাম যেমন মদ, জবরদখল করা মাল ইত্যাদি তার হুকুম ভিন্ন। এই মতটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য। এর দলিল হলো নবী (ﷺ) এক ইহুদির কাছ থেকে তাঁর পরিবারের জন্য খাদ্য ক্রয় করেছিলেন, খাইবারে এক ইহুদি নারী যে ছাগল হাদিয়া দিয়েছিল তা খেয়েছিলেন এবং এক ইহুদির দাওয়াত গ্রহণ করেছিলেন। অথচ জানা কথা যে অধিকাংশ ইহুদি সুদ গ্রহণ করত এবং হারাম সম্পদ ভোগ করত। আরও এ মতকে শক্তিশালী করে নবী (ﷺ) এর সেই কথা বারীরাকে যে গোশত সাদকাহ করা হয়েছিল সে সম্পর্কে তিনি বলেন: এটি তার জন্য সাদকাহ, আর আমাদের জন্য হাদিয়া।”(আল কওলুল মুফীদ আলা কিতাবিত তাওহীদ ৩/১১২)
.
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন:انظر مثلاً بريرة مولاة عائشة رضي الله عنهما، تُصُدق بلحم عليها، فدخل النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم يوماً إلى بيته ، ووجد البُرمة -القدر- على النار، فدعا بطعام ولم يؤت بلحم، أتي بطعام ولكن ما فيه لحم، فقال: ألم أر البرمة على النار؟ قالوا: بلى يا رسول الله، ولكنه لحم تصدق به على بريرة. والرسول عليه الصلاة والسلام لا يأكل الصدقة، فقال: (هو لها صدقة ، ولنا هدية) ؛ فأكله الرسول عليه الصلاة والسلام ، مع أنه يحرم عليه هو أن يأكل الصدقة؛ لأنه لم يقبضه على أنه صدقة ، بل قبضه على أنه هدية. فهؤلاء الإخوة نقول: كلوا من مال أبيكم هنيئاً مريئاً، وهو على أبيكم إثم ووبال، إلا أن يهديه الله عز وجل ويتوب، فمن تاب تاب الله عليه”বারীরা (রাঃ), যিনি আয়েশা (রাঃ)-এর দাসী ছিলেন তাকে কিছু গোশত সদকা করা হয়েছিল। একদিন নবী (ﷺ) তাঁর ঘরে প্রবেশ করে হাঁড়ি আগুনের উপর দেখলেন। তিনি খাবার আনতে বললেন, কিন্তু যে খাবার আনা হলো তাতে গোশত ছিল না। তিনি বললেন: আমি কি হাঁড়ি আগুনে দেখিনি? সাহাবারা বললেন: হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল কিন্তু সেটি এমন গোশত যা বারীরাকে সদকা করা হয়েছে। রাসূল (ﷺ) নিজে সাদকাহ খান না। তখন তিনি বললেন: এটি তার জন্য সাদকাহ আর আমাদের জন্য হাদিয়া। অতঃপর তিনি তা খেলেন। কারণ তিনি সেটি সাদকাহ হিসেবে গ্রহণ করেননি, বরং হাদিয়া হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। অতএব আমরা এ ভাইদের বলি: তোমরা তোমাদের পিতার সম্পদ আনন্দের সাথে ভোগ করো। এর গুনাহ তোমাদের পিতার উপরই থাকবে, যদি না আল্লাহ তাকে হেদায়াত দেন এবং সে তওবা করে, যে তওবা করে আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।”(ইবনু উসাইমীন; আল-লিক্বাউশ শাহরী; লিক্বা নং-৪৫/২৬)
.
মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সবাইকে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন গড়ার এবং প্রতিটি পদক্ষেপে এর সঠিক অনুসরণের তৌফিক দান করুন। (তিনিই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়, ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।
Share: