তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত চলাকালে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার হুকুম

প্রশ্ন: তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত চলাকালে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার হুকুম কী?
▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর বিবাহের প্রস্তাব সংক্রান্ত মূলনীতি হলো— কোনো ব্যক্তি যদি বিয়ের ইচ্ছা পোষণ করে এবং নির্দিষ্ট কোনো নারীকে প্রস্তাব দেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প করে, তবে সে একা কিংবা তার কোনো নিকট আত্মীয়— যেমন বাবা বা ভাই—কে সঙ্গে নিয়ে মেয়ের অভিভাবকের কাছে যেতে পারে। চাইলে অন্য কাউকে মাধ্যম হিসেবেও প্রস্তাব পাঠানো যায়। এ বিষয়ে শরিয়তে প্রশস্ততা রয়েছে।তবে সমাজের প্রচলিত রীতিনীতিও বিবেচনায় রাখা উচিত; কারণ কিছু দেশে প্রস্তাবদাতার একাকী যাওয়া অপ্রচলিত বা অসমীচীন হিসেবে দেখা হয়।এছাড়া প্রস্তাবদাতার জন্য প্রস্তাবিত নারীকে দেখা শরিয়তসম্মত। অন্যদিকে,
তালাকপ্রাপ্তা নারীর ইদ্দত চলাকালে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার বিধান সম্পূর্ণ ভিন্ন; এ ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করা প্রয়োজন।
.
প্রথমত: বিয়ের প্রস্তাব (খুতবাহ) দুই ধরনের হতে পারে: স্পষ্ট প্রকাশ (تصريح) অথবা ইঙ্গিত প্রদান (تعريض)।
(ক).স্পষ্ট প্রকাশ (তাসরিহ): এমন শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা যা শুধুমাত্র বিয়ের অর্থ বহন করে, অন্য কোনো সন্দেহ বা দ্ব্যর্থবাদ রাখে না। উদাহরণস্বরূপ— “তোমার ইদ্দত শেষ হলে আমি তোমার সঙ্গে বিয়ে করব” বলা, অথবা সরাসরি তার অভিভাবকের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পৌঁছে দেওয়া ইত্যাদি।
.
(খ).ইঙ্গিত প্রদান (তারিদ): এমন শব্দ ব্যবহার করা যাতে বিয়ের প্রস্তাবের সম্ভাবনাও থাকে আবার অন্য অর্থও হতে পারে। যেমন— “আপনার মতো গুণবতী নারী সবার কাম্য,” অথবা “আমি একজন স্ত্রী খুঁজছি,” অথবা “আশা করি আল্লাহ আপনার জন্য উত্তম কোনো ব্যবস্থা বা রিজিকের ফয়সালা করবেন” ইত্যাদি।
.
দ্বিতীয়ত: ইদ্দত পালনরত নারীকে সরাসরি বা স্পষ্টভাবে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া নাজায়েজ (হারাম)। চাই তিনি তালাক-এ-রাজয়ি (ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ আছে এমন তালাক),হোক কিংবা তালাক-এ-বায়েন (চূড়ান্ত বিচ্ছেদ এমন তালাক) অথবা স্বামীর মৃত্যুর ইদ্দত পালনকারিণী হোন না কেন।যেহেতু আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: এবং নির্দিষ্ট কাল পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনের সংকল্প করো না।”[সূরা বাকারা: ২৩৫] এ বিধানের গূঢ় রহস্য হলো সেই নারী গর্ভবতী হওয়া থেকে নিরাপদ না হওয়া। যার ফলে একজনের পানির সাথে অন্যজনের পানির মিশ্রণ ঘটবে এবং বংশ পরিচয়ে জটিলতা তৈরী হবে।
.
​তবে ইঙ্গিতপূর্ণ বিবাহ প্রস্তাবের (তারিদ) ক্ষেত্রে বিস্তারিত বিধান রয়েছে:
​(১).যদি নারী তালাক-এ-রাজয়ি-এর ইদ্দত পালন করেন, তাহলে তাকে ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়াও জায়েজ নেই। কারণ, রাজয়ি তালাকপ্রাপ্তা নারী ইদ্দত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রীর মর্যাদাভুক্ত থাকেন। আল্লাহ তাআলা এ প্রসঙ্গে বলেন:(وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَدِّهِنَّ فِي ذَلِكَ إِنْ أَرَادُوا إِصْلاحا)”আর তাদের স্বামীরা এই মেয়াদের মধ্যে তাদের ফিরিয়ে নিতে চাইলে তারা অধিক হকদার” (সূরা বাকারা: ২২৮)। এখানে আল্লাহ তালাকদাতা স্বামীকে স্পষ্টভাবে ‘স্বামী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অতএব,যখন নারী এখনও অন্যের বিবাহাধীনে আছেন,তখন তাকে অন্য কেউ প্রস্তাব দেওয়া কীভাবে সম্ভব!
.
ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন;ولا يجوز التعريض لخطبة الرجعية إجماعا؛ لأنها كالزوجة” انتهى.”ইজমা বা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তালাকে রাজ’ঈপ্রাপ্তা নারীকে (যে তালাকের পর ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে) ইশারা-ইঙ্গিতেও বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া বৈধ নয়; কারণ ইদ্দত চলাকালীন তিনি স্ত্রীর মতোই গণ্য।”(তাফসিরে কুরতুবি; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৮৮)
.
​(২).যদি কোনো নারীর স্বামীর মৃত্যুবরণ করে বা তিন তালাক দেয়, অথবা অন্য কোনো শরীয়ত সম্মত ত্রুটির কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের ইদ্দত পালন করেন,তাহলে তাকে ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া জায়েজ,কিন্তু সরাসরি প্রস্তাব দেওয়া নাজায়েজ। ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাব জায়েজ হওয়ার দলিল হলো মহান আল্লাহর এই বাণী:وَ لَا جُنَاحَ عَلَیۡكُمۡ فِیۡمَا عَرَّضۡتُمۡ بِهٖ مِنۡ خِطۡبَۃِ النِّسَآءِ اَوۡ اَكۡنَنۡتُمۡ فِیۡۤ اَنۡفُسِكُمۡ ؕ عَلِمَ اللّٰهُ اَنَّكُمۡ سَتَذۡكُرُوۡنَهُنَّ وَ لٰكِنۡ لَّا تُوَاعِدُوۡهُنَّ سِرًّا اِلَّاۤ اَنۡ تَقُوۡلُوۡا قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ۬ؕ وَ لَا تَعۡزِمُوۡا عُقۡدَۃَ النِّكَاحِ حَتّٰی یَبۡلُغَ الۡكِتٰبُ اَجَلَهٗ ؕ وَ اعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰهَ یَعۡلَمُ مَا فِیۡۤ اَنۡفُسِكُمۡ فَاحۡذَرُوۡهُ ۚ وَ اعۡلَمُوۡۤا اَنَّ اللّٰهَ غَفُوۡرٌ حَلِیۡمٌ”আর যদি তোমরা আকার-ইঙ্গিতে (সে) নারীদের বিয়ের প্রস্তাব দাও বা তোমাদের অন্তরে গোপন রাখ তবে তোমাদের কোন পাপ নেই। আল্লাহ জানেন যে, তোমরা তাদের সম্বন্ধে অবশ্যই আলোচনা করবে: কিন্তু বিধিমতো কথাবার্তা ছাড়া গোপনে তাদের সাথে কোন প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখো না; এবং নির্দিষ্ট কাল পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনের সংকল্প করো না। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের অন্তরে যা আছে তা জানেন। কাজেই তাকে ভয় কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাপরায়ণ, পরম সহনশীল।”(সূরা বাকারা: ২৩৫)
.
সূরা বাকারা’র এই আয়াতটি মূলত সেই মহিলার ক্ষেত্রে নাযিল হয়েছে যার স্বামী মারা গেছেন। তবে ওলামায়ে কেরাম (ইসলামি বিশেষজ্ঞগণ) কিয়াস বা সাদৃশ্যের ভিত্তিতে একে সেই সব মহিলাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলেছেন যারা এমন ইদ্দত পালন করছেন যেখানে স্বামীর আর ফিরিয়ে নেওয়ার (রাজআত) সুযোগ নেই।
.
আয়াতটির তাফসিরে ইবনে আতিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর তাফসীরে বলেছেন:والتعريض هو الكلام الذي لا تصريح فيه، كأنه يَعْرِض لفكر المتكلم به.وأجمعت الأمة على أن الكلام مع المعتدة بما هو نص في تزويجها ، وتنبيه عليه : لا يجوز. وكذلك أجمعت على أن الكلام معها ، بما هو رفث وذكر جماع أو تحريض عليه: لا يجوز. وجُوِّز ما عدا ذلك”
“তা’রীয’ (ইশারা-ইঙ্গিত) হলো এমন কথা যাতে (উদ্দেশ্যটি) স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয় না, বরং তা কেবল বক্তার চিন্তাকে পরোক্ষভাবে প্রকাশ করে। উম্মতের আলেমগণ এই বিষয়ে (ইজমা) একমত হয়েছেন যে, ইদ্দত পালনকারী নারীর সাথে এমন কথা বলা জায়েজ নয় যা সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব বা তার প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। তেমনিভাবে আলেমগণ এ বিষয়েও ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে,অশ্লীল কথাবার্তা, যৌন মিলন বা তার প্রতি উস্কানিমূলক কথা বলাও যে নাজায়েজ এ ছাড়া বাকি সব (ইশারা-ইঙ্গিতপূর্ণ) কথা বলা বৈধ রাখা হয়েছে”।(তাফসীরে ইবনে আতিয়্যাহ; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩১৫)
.
সৌদি আরবের প্রথিতযশা মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ ইমাম ‘আব্দুর রহমান বিন নাসির আস-সা‘দী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৩৭৬ হি./১৯৫৬ খ্রি.] বলেছেন,”
هذا حكم المعتدة من وفاة, أو المبانة في الحياة. فيحرم على غير مبينها (زوجها) أن يصرح لها في الخطبة, وهو المراد بقوله : ( وَلَكِنْ لَا تُوَاعِدُوهُنَّ سِرًّا ).وأما التعريض, فقد أسقط تعالى فيه الجناح. والفرق بينهما: أن التصريح, لا يحتمل غير النكاح, فلهذا حرم, خوفاً من استعجالها, وكذبها في انقضاء عدتها, رغبة في النكاح ، وقضاءً لحق زوجها الأول, بعدم مواعدتها لغيره مدة عدتها.وأما التعريض وهو: الذي يحتمل النكاح وغيره, فهو جائز للبائن كأن يقول: إني أريد التزوج, وإني أحب أن تشاوريني عند انقضاء عدتك, ونحو ذلك, فهذا جائز لأنه ليس بمنزلة التصريح, وفي النفوس داع قوي إليه. وكذا إضمار الإنسان في نفسه أن يتزوج من هي في عدتها, إذا انقضت (يعني لا حرج فيه أيضاً) . ولهذا قال : ( أَوْ أَكْنَنْتُمْ فِي أَنْفُسِكُمْ عَلِمَ اللَّهُ أَنَّكُمْ سَتَذْكُرُونَهُنَّ ) هذا التفصيل كله, في مقدمات العقد. وأما عقد النكاح فلا يحل ( حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ ). أي: تنقضي العدة “
​”এটি এমন নারীর বিধান যে তার (স্বামীর) মৃত্যুতে কিংবা জীবদ্দশায় চূড়ান্ত বিচ্ছেদের (বায়েন তালাক) কারণে ইদ্দত পালন করছে। সুতরাং যে স্বামী তাকে বিচ্ছিন্ন করেছে (অর্থাৎ বায়েন তালাকের ক্ষেত্রে), সে ব্যতীত অন্য কারো জন্য তাকে স্পষ্টভাবে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হারাম। আর আল্লাহ তাআলার বাণী— ‘কিন্তু তোমরা তাদের সাথে গোপনে কোনো প্রতিশ্রুতি দিও না’—এর দ্বারা এটাই উদ্দেশ্য।তবে ইশারায় বা ইঙ্গিতে (বিয়ের কথা) বলার ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ গুনাহ তুলে নিয়েছেন (অর্থাৎ তা বৈধ করেছেন)।সরাসরি প্রস্তাব এবং ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাবের মধ্যে পার্থক্য হলো:’সরাসরি প্রস্তাব’ বিবাহ ছাড়া অন্য কোনো অর্থ বহন করে না, তাই এটি হারাম করা হয়েছে; এই আশঙ্কায় যে,যাতে নারীটি দ্রুত বিয়ের লোভে ইদ্দত শেষ হওয়ার ব্যাপারে মিথ্যা তথ্য না দেয় এবং প্রথম স্বামীর হকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে ইদ্দত চলাকালীন অন্য কারো সাথে অঙ্গীকারবদ্ধ না হয়। আর ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাব যা বিয়ে কিংবা অন্য কোনো অর্থও বহন করতে পারে—তা ‘বায়েন’ (চূড়ান্ত ভাবে বিচ্ছিন্ন) নারীর ক্ষেত্রে জায়েজ। যেমন কেউ তাকে বলল: ‘আমি বিয়ে করার ইচ্ছা রাখি’ অথবা ‘আমি পছন্দ করি যে, আপনার ইদ্দত শেষ হলে আপনি আমার সাথে পরামর্শ করবেন’—এই জাতীয় কথা। এটি জায়েজ হওয়ার কারণ হলো এটি স্পষ্ট প্রস্তাবের সমপর্যায়ভুক্ত নয় এবং মানুষের মনে এমন আকাঙ্ক্ষা জাগা স্বাভাবিক।অনুরূপভাবে, ইদ্দত শেষ হওয়ার পর কোনো নারীকে বিয়ে করার সংকল্প মনে মনে গোপন রাখাও বৈধ। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন: ‘অথবা তোমরা তোমাদের মনের মধ্যে যা গোপন রাখো, আল্লাহ জানেন যে তোমরা অবশ্যই তাদের কথা স্মরণ করবে। এই বিস্তারিত আলোচনাটি কেবল বিয়ের প্রাথমিক আলোচনা (প্রস্তাব) সংক্রান্ত। আর বিয়ের মূল আকদ বা চুক্তি করা ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধ নয়, ‘যতক্ষণ না নির্ধারিত সময় (ইদ্দত) তার শেষ সীমায় পৌঁছাবে’—অর্থাৎ, যতক্ষণ না ইদ্দত পূর্ণ হবে।”(তাফসির আস সাদী; পৃষ্ঠা: ১০৬; আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন: আল-মুগনি; খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ১১২; আল-মাওসুআহতুল ফিকহিয়্যাহ; খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ১৯১)।
.
▪️এখানে একটি প্রশ্ন আসতে পারে-সরাসরি প্রস্তাব এবং ইঙ্গিতপূর্ণ প্রস্তাবের মধ্যে পার্থক্যের হিকমত (রহস্য) কী?
.
​সরাসরি প্রস্তাব এবং ইশারার মধ্যে পার্থক্যের পেছনে হিকমত হলো:সরাসরি প্রস্তাবের ক্ষেত্রে একজন নারীর মনে এই নিশ্চয়তা তৈরি হয় যে, প্রস্তাবকারী তাকে বিয়ে করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এমতাবস্থায় দ্রুত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় নারী তার ইদ্দত শেষ হওয়ার ব্যাপারে অসত্য তথ্য দিতে পারে। কিন্তু ইশারা-ইঙ্গিত কোনো নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি একটি অস্পষ্ট সম্ভাবনা মাত্র। এই অনিশ্চয়তার কারণে নারী কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে মিথ্যা বলার ঝুঁকি নেয় না।শরীয়ত এখানে দুটি স্বার্থের মধ্যে চমৎকার ভারসাম্য বজায় রেখেছে:(১).আগ্রহী পুরুষের স্বার্থ: ইশারা-ইঙ্গিতের সুযোগ রেখে আগ্রহী পুরুষকে তার পছন্দ প্রকাশের একটি পথ দেওয়া হয়েছে, যাতে অন্য কেউ তার আগে বিয়ের সুযোগ না পায়। (২)অনিষ্ট রোধ: সরাসরি প্রস্তাব নিষিদ্ধ করে তাড়াহুড়ো বা মিথ্যার মাধ্যমে ইদ্দতের পবিত্রতা নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করা হয়েছে।এছাড়া ইশারা সব সময় নিজের জন্যই হতে হবে এমন নয়; অনেক সময় তা অন্য কারো পক্ষেও হতে পারে। যেমন সহীহ মুসলিম-এর (১৪৮০) হাদিসে বর্ণিত আছে,রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইদ্দত চলাকালে ফাতিমা বিনতে কায়েস-এর কাছে লোক পাঠিয়ে বলেন: “আমার অনুমতি ছাড়া তুমি নিজের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিও না।” পরে তাঁর ইদ্দত শেষ হলে তিনি তাঁকে উসামাহ্‌ ইবনু হারিসাহ্‌ (রাঃ)-এর সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে দিলেন।”(সহীহ মুসলিম হা/২৫৯২) আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৯৩২৩৭)
.
▪️আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা জানা অত্যন্ত জরুরি:
.
আর তা হলো:কখনো কখনো অজ্ঞতার কারণে এমন ঘটে যে, কোনো নারীর ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই তার সঙ্গে বিবাহ সম্পাদন করা হয়। অথচ কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট বিধান অনুযায়ী এটি হারাম। তাই কোনো নারী ইদ্দত অবস্থায় থাকা অবস্থায় যদি তার সঙ্গে বিবাহ করা হয়, তবে সে বিবাহ শরিয়তের দৃষ্টিতে বাতিল বলে গণ্য হবে এবং উভয়ের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানো আবশ্যক। এরপর ওই নারীকে অবশ্যই তার প্রথম স্বামীর ইদ্দত সম্পূর্ণ করতে হবে।
.
আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষে এসেছে;
اتفق الفقهاء على أنه لا يجوز للأجنبي نكاح المعتدة أيا كانت عدتها من طلاق أو موت أو فسخ أو شبهة ، وسواء أكان الطلاق رجعيا أم بائنا بينونة صغرى أو كبرى . وذلك لحفظ الأنساب وصونها من الاختلاط ومراعاة لحق الزوج الأول ، فإن عقد النكاح على المعتدة في عدتها ، فُرّق بينها وبين من عقد عليها ، واستدلوا بقوله تعالى : ( ولا تعزموا عقدة النكاح حتى يبلغ الكتاب أجله ) والمراد تمام العدة ، والمعنى : لا تعزموا على عقدة النكاح في زمان العدة ، أو لا تعقدوا عقدة النكاح حتى ينقضي ما كتب الله عليها من العدة … وفي الموطأ : أن طليحة الأسدية كانت زوجة رشيد الثقفي وطلقها ، فنكحت في عدتها ، فضربها عمر بن الخطاب وضرب زوجها بخفقةٍ ضربات ، وفرق بينهما ، ثم قال عمر : أيما امرأة نكحت في عدتها فإن كان الذي تزوجها لم يدخل بها فرق بينهما ، ثم اعتدت بقية عدتها من زوجها الأول ، ثم إن شاء كان خاطبا من الخطاب . وإن كان دخل بها فُرق بينهما ، ثم اعتدت بقية عدتها من الأول ، ثم اعتدت من الآخر ، ثم لا ينكحها أبدا “
“ফকিহগণ (ইসলামি আইনজ্ঞ) এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, কোনো ভিনদেশি বা পরপুরুষের জন্য ইদ্দত পালনরত নারীকে বিবাহ করা বৈধ নয়; চাই সেই ইদ্দত তালাক, মৃত্যু, বিবাহ বিচ্ছেদ (ফাসখ) কিংবা শুবহাহ (সংশয়পূর্ণ মিলন) যে কারণেই হোক না কেন।তালাকটি রাজঈ (প্রত্যাবর্তনযোগ্য) হোক কিংবা বাইন—ছোট বিচ্ছেদ (বাইনুনা সুগরা) কিংবা বড় বিচ্ছেদ (বাইনুনা কুবরা) হোক—সর্বাবস্থায় এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।এ বিধান রাখা হয়েছে বংশধারা সংরক্ষণ, বংশের মিশ্রণ থেকে সুরক্ষা এবং প্রথম স্বামীর অধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখার জন্য।যদি ইদ্দত চলাকালীন কোনো নারীর সাথে বিবাহের আকদ (চুক্তি) সম্পন্ন করা হয়, তবে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেওয়া হবে। এ বিষয়ে তারা আল্লাহ তাআলার এই বাণীর মাধ্যমে দলিল পেশ করেছেন: (আর তোমরা বিবাহের সংকল্প করো না যতক্ষণ না ইদ্দত তার নির্ধারিত সময়ে পৌঁছায় (অর্থাৎ শেষ হয়)।”(সূরা বাকারা: ২৩৫) আর (এই আয়াতে বর্ণিত নির্ধারিত সময়) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইদ্দত পূর্ণ হওয়া। এর অর্থ হলো: তোমরা ইদ্দত চলাকালীন সময়ের মধ্যে বিবাহের সংকল্প করো না, অথবা আল্লাহ তার (নারীর) ওপর ইদ্দতের যে সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ো না।”মুয়াত্তা (ইমাম মালিক)-এ বর্ণিত হয়েছে যে: তালিহা আল-আসাদিয়্যা রুশাইদ আস-সাকাফীর স্ত্রী ছিলেন এবং তিনি তাকে তালাক দিয়েছিলেন।তারপর ওই নারী তার ইদ্দত চলাকালীন সময়েই (অন্যত্র) বিবাহ করেন। তখন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তাকে এবং তার স্বামীকে চাবুক দিয়ে কয়েকবার আঘাত করেন এবং তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেন। অতঃপর উমর (রা.) বলেন:”যে নারীই তার ইদ্দত চলাকালীন সময়ে বিবাহ করবে, যদি সেই বিবাহকারী স্বামী তার সাথে সহবাস না করে থাকে, তবে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেওয়া হবে। এরপর সেই নারী তার প্রথম স্বামীর ইদ্দতের অবশিষ্ট অংশ পূর্ণ করবে। এরপর (ইদ্দত শেষে) সেই ব্যক্তি চাইলে অন্য আর দশজন প্রস্তাবকারীর মতো পুনরায় বিবাহের প্রস্তাব দিতে পারবে। আর যদি সে (দ্বিতীয় স্বামী) তার সাথে সহবাস করে থাকে, তবে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেওয়া হবে। এরপর ওই নারী প্রথম স্বামীর ইদ্দতের অবশিষ্ট অংশ পূর্ণ করবে, অতঃপর (সহবাসের কারণে) দ্বিতীয় স্বামীর জন্য ইদ্দত পালন করবে। এরপর (শাস্তিস্বরূপ) ওই (দ্বিতীয় স্বামী ও স্ত্রী) উভয় আর কখনোই (আজীবন) বিবাহ করতে পারবে না।”(আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ; খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ৩৪৬)
.
প্রিয় পাঠক!ওমর (রা.)-এর এই আসার (বর্ণনা) থেকে বোঝা যায় যে, কোনো তালাকপ্রাপ্তা নারী যদি ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তবে তার ক্ষেত্রে দুটি অবস্থা হতে পারে:
প্রথমত: যদি শুধু বিবাহ সম্পন্ন হয় কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর মিলন (সহবাস) না ঘটে: সেক্ষেত্রে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ করিয়ে দেওয়া হবে এবং নারীটি প্রথম স্বামীর ইদ্দত পূর্ণ করবেন। এরপর দ্বিতীয় ব্যক্তি চাইলে তাকে পুনরায় বিবাহ করতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত: যদি বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর মিলন ঘটে থাকে: সেক্ষেত্রেও তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ করিয়ে দেওয়া হবে এবং নারীটি প্রথম স্বামীর ইদ্দত পূর্ণ করবেন। এরপর দ্বিতীয় স্বামীর কারণেও তাকে ইদ্দত পালন করতে হবে। এমতাবস্থায় (ওমর রা.-এর ফতোয়া অনুযায়ী) ওই নারী দ্বিতীয় ব্যক্তির জন্য চিরতরে হারাম হয়ে যাবেন; তিনি তাকে আর কখনোই বিবাহ করতে পারবেন না। এটি মালিকী মাযহাবের মত এবং হাম্বলী মাযহাবের দুটি মতের একটি। তবে হানাফী, শাফেয়ী এবং হাম্বলী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মত (জমহুর) অনুযায়ী, ইদ্দত শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় ব্যক্তি তাকে বিবাহ করতে পারবেন।
.
​অবশ্য হাম্বলী ফকীহগণ বলেন: দ্বিতীয় ব্যক্তি তাকে ততক্ষণ বিবাহ করতে পারবেন না যতক্ষণ না “উভয় ইদ্দত” (প্রথম স্বামীর ইদ্দত এবং দ্বিতীয় ব্যক্তির সাথে মিলনের কারণে পালনীয় ইদ্দত) শেষ হয়।মাতালিবু উলিন নুহা” গ্রন্থে বলা হয়েছে:وللثاني الذي تزوجته في عدتها ووطئها أن ينكحها بعد انقضاء العدتين ، لأنه قبل انقضاء عدة الأول يكون ناكحا في عدة غيره ، وأما انقضاء عدته فلأنها عدة لم تثبت لحقه ؛ لأن نكاحه لا أثر له ، وإنما هي لحق الولد فلم يجز له النكاح فيها كعدة غيره”যে ব্যক্তি ইদ্দত চলাকালীন কোনো নারীকে বিবাহ করেছে এবং তার সাথে সহবাস করেছে, সে ব্যক্তি উভয় ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তাকে পুনরায় বিবাহ করতে পারবে। কারণ প্রথম ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে বিবাহ করলে তা অন্যের ইদ্দত চলাকালীন বিবাহ হিসেবে গণ্য হয়। আর দ্বিতীয় ইদ্দত (যা নিজের মিলনের ফলে ওয়াজিব হয়েছে) শেষ হওয়া জরুরি, কারণ এটি একটি শরয়ি ইদ্দত যা সন্তানের বংশপরিচয় রক্ষার জন্য আবশ্যক। তাই অন্যের ইদ্দতের মতোই এই ইদ্দত চলাকালীন বিবাহ জায়েজ নয়।”(দ্রষ্টব্য: আল-মুনতাকা লিল-বাজি; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩১৭; মাতালিবু উলিন নুহা; খণ্ড: ৫/৯৭, ৫৭৭; আহকামুল কুরআন লিল-জাসাস; খণ্ড: ১;পৃষ্ঠা: ৫৮০), ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ; খণ্ড: ১৮; পৃষ্ঠা: ২৪৮)।
.
তবে এই মাসালায় (আল্লাহু আলাম) অধিকতর সঠিক (রাজ্যেহ) মত হলো:ইদ্দতের মধ্যে বিবাহকারী নারী যদি প্রথম স্বামীর ইদ্দত পূর্ণ করেন, তবে দ্বিতীয় ব্যক্তি তার সাথে নতুন করে আকদ (বিবাহ) করতে পারবেন; সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় ব্যক্তির জন্য আলাদা ইদ্দতের প্রয়োজন নেই। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই নারীর অভিভাবকের (ওয়ালী) অনুমতি এবং দুজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর উপস্থিতিতে হতে হবে। নারী নিজে নিজের বিয়ের আকদ করতে পারেন না।(দ্রষ্টব্য: ইবনু উসাইমীন আশ-শারহুল মুমতি; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ৩৮৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
​▬▬▬▬✿▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: