প্রশ্ন: মানুষ কি জীনকে দেখতে পায়? আমরা কীভাবে জীনের অনিষ্ট থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারব?
▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর প্রশ্ন অনুযায়ী মানুষ কি জীনকে দেখতে পায়? আমরা কীভাবে জীনের অনিষ্ট থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারব? এই প্রশ্নটি আমরা দুটি অংশে বিভক্ত করব।
.
.
জেনে রাখুন যে, জিনদের মূল বৈশিষ্ট্য হলো তারা মানুষের দৃষ্টি থেকে আড়ালে বা গুপ্ত থাকে। জিন এর শাব্দিক অর্থ গুপ্ত। যেহেতু তারা মানুষের চোখের আড়ালে থাকে তাই তাদেরকে জ্বীন (الجن) বলা হয়। কারণ আরবি ভাষার ‘জিম’ (ج) ও ‘নুন’ (ن) বর্ণদ্বয় কোনো কিছু ‘ঢাকা’ বা ‘গোপন থাকা’ অর্থ প্রকাশ করে।(যেমনটি ইবনে ফারিস তাঁর মাকায়িসুল লুগাহ গ্রন্থে ‘জ-ন’ ধাতুর ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন।) অতএব,জিনদের জিন’ বলা হয় কারণ তারা মানুষের কাছে অদৃশ্য। একইভাবে মাতৃগর্ভে থাকা শিশুকে ‘জানীন’ (ভ্রূণ) বলা হয় কারণ সে তার মায়ের গর্ভে আড়ালে থাকে; বাগানকে ‘জান্নাত’ বলা হয় কারণ তা ঘন বৃক্ষরাজি দ্বারা ঢাকা থাকে; আর পাগলকে ‘মাজনুন’ বলা হয় কারণ তার বুদ্ধি ঢাকা পড়ে গেছে। এই মূলধাতু থেকে উৎপন্ন প্রতিটি শব্দের অর্থেই এমন লুক্কায়িত থাকার ভাব রয়েছে। আল্লাহ তাআলা এই ধ্রুব সত্যটি পবিত্র কুরআনে এভাবে বর্ণনা করেছেন (يَابَنِي آدَمَ لا يَفْتِنَنَّكُمْ الشَّيْطَانُ كَمَا أَخْرَجَ أَبَوَيْكُمْ مِنْ الْجَنَّةِ يَنزِعُ عَنْهُمَا لِبَاسَهُمَا لِيُرِيَهُمَا سَوْآتِهِمَا إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لا تَرَوْنَهُمْ ) “হে বনী আদম! শয়তান যেন তোমাদেরকে ফিতনায় না ফেলে, যেভাবে সে তোমাদের পিতা-মাতাকে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছিল এবং তাদের থেকে তাদের পোশাক খুলে নিয়েছিল যাতে তাদের লজ্জাস্থান তাদের সামনে প্রকাশ পায়। নিশ্চয়ই সে এবং তার দলবল তোমাদেরকে এমনভাবে দেখে যেখান থেকে তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না।” (সূরা আল-আ’রাফ: ২৭)
.
এখন প্রশ্ন হলো: মানুষ কি জিনদের তাদের আসল (প্রকৃত) রূপে সরাসরি দেখতে পারে? এ বিষয়ে আহলুল-ইলমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ডক্টর আবদুল কারীম উবাইদাত তাঁর মাস্টার্স থিসিসে— “আল-‘আলামুল জিন্ন ফী দাও’ইল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ” (পৃষ্ঠা ২৯–৪২)—এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি চারটি মত উল্লেখ করেন:
.
১. জমহুর বা সংখ্যাগরিষ্ঠের মত: অধিকাংশ আলেমের মতে, জিনদের সরাসরি দেখা সম্ভব, তবে তা সাধারণত তাদের আসল (প্রকৃত) রূপে নয়। বরং যখন তারা কোনো বিশেষ আকৃতি (মানুষ বা অন্য প্রাণীর রূপ) ধারণ করে, তখন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের দেখতে পারেন।
.
২. দ্বিতীয় মত: এই মতানুসারে, জিনদের দেখা পাওয়া কেবল আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের জন্য নির্ধারিত বা খাস। এই মতের প্রবক্তাদের মধ্যে রয়েছেন—ইমাম শাফেয়ী, ইবনে হাযম, আন-নাহহাস ও আল-কুশাইরী (রাহিমাহুল্লাহ)। তাঁরা মনে করেন, সাধারণ মানুষের পক্ষে তাদের দেখা সম্ভব নয়।
.
৩. তৃতীয় মত: এই দলের মতে, নবী হোক বা সাধারণ মানুষ হোক; কারো পক্ষেই জিনদের দেখা পাওয়া জাগতিকভাবে সম্পূর্ণ অসম্ভব। তাঁদের মতে, এটি মানুষের দৃষ্টিশক্তির সীমানার বাইরে।এটি কিছু সংখ্যক মুহাদ্দিসের মত।
.
৪. চতুর্থ মত: এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী জীনদের দেখার পরিধি কিছুটা বিস্তৃত। নবীদের পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা যাদের বিশেষ আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য বা নেয়ামত দান করেছেন, এমন কিছু ওলী-আউলিয়া ব্যক্তির পক্ষেও জিনদের তাদের আসল রূপে দেখা সম্ভব।এটি আল-আলুসী ও ইবনুল ‘আরাবীর মত।
.
এরপর লেখক প্রত্যেক মতের পক্ষে দলিল উপস্থাপন করে বিশ্লেষণ করেন। শেষে তিনি বলেন:ومما تقدم لنا من الأقوال في مسألة رؤية الجن، يتبين لنا أن الحق مع الفريق الذي قال بوقوع رؤيتهم للأنبياء مطلقا، ولغيرهم عند تمثلهم، وهو ما عليه الأكثرية من العلماء، وهو القول الذي تدعمه النصوص الثابتة من السنة النبوية، وهو الذي تشهد له التجربة مع كثير من الناس”জিনদের দেখার মাসআলায় (বিষয়টি নিয়ে) উপরে বর্ণিত মতসমূহ থেকে আমাদের কাছে এটিই স্পষ্ট হয় যে—সত্য বা সঠিক মত হলো সেই পক্ষের বক্তব্য, যারা বলেন: নবীগণ জিনদের সাধারণভাবে (তাদের প্রকৃত রূপেই) দেখতে পারেন, আর অন্যেরা দেখতে পায় কেবল যখন তারা ভিন্ন কোনো রূপ ধারণ (মানুষ বা প্রাণীর আকৃতি গ্রহণ) করে। এটিই অধিকাংশ আলেমের অভিমত। আর সুন্নাহর সুসাব্যস্ত দলিলসমূহ এই মতটিকেই সমর্থন করে এবং বহু মানুষের অভিজ্ঞতাও এর সত্যতার সাক্ষ্য দেয়।”(উদ্ধৃতি সমাপ্ত;আল-‘আলামুল জিন্ন ফী দাও’ইল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ/পৃষ্ঠা ২৯–৪২)
.
শাইখুল ইসলাম নাসিরুল হাদীস ফাক্বীহুল মিল্লাত ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইদরীস আশ-শাফি‘ঈ আল-মাক্কী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ২০৪ হি.] বলেছেন,من زعم من أهل العدالة أنه يَرى الجن أبطلت شهادته لأن الله عز وجل يقول: إنه يراكم هو وقبيله من حيث لا ترونهم إلا أن يكون نبيّاً. “যে দ্বীনদার ব্যক্তি দাবি করে যে সে জীন দেখে তার সাক্ষ্য বাতিল হবে। কারণ মহান আল্লাহ বলেছেন: “সে ও তার দলবল তোমাদেরকে দেখতে পায়; কিন্তু তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না”। তবে নবী হলে জীনকে দেখতে পায়।”আহকামুল কুরআন; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৯৫, ১৯৬)
.
ইবনে হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:”জীন সত্য। তারা আল্লাহর অন্যতম সৃষ্টি। তাদের মধ্যে রয়েছে কাফের ও মুমিন। তারা আমাদেরকে দেখতে পায়; আমরা তাদেরকে দেখতে পাই না। তারা খায়, সন্তান জন্ম দেয় ও মারা যায়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন: يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالإنْسِ “হে জীন ও মানুষ সম্প্রদায়”। তিনি আরো বলেছেন: وَالْجَانَّ خَلَقْنَاهُ مِن قَبْلُ مِن نَّارِ السَّمُومِ “আমরা ইতঃপূর্বে জীনকে ধুম্রহীন আগুন থেকে সৃষ্টি করেছি।” তিনি তাদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন:وَأَنَّا مِنَّا الْمُسْلِمُونَ وَمِنَّا الْقَاسِطُونَ ۖ فَمَنْ أَسْلَمَ فَأُولَٰئِكَ تَحَرَّوْا رَشَدًا (*) وَأَمَّا الْقَاسِطُونَ فَكَانُوا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا“আমাদের মধ্যে (আল্লাহর কাছে) মুসলিমরাও আছে, আবার আমাদের মধ্যে বিপথগামীরাও আছে। যারা মুসলিম, তারাই সঠিক পথ খুঁজে নিয়েছে। আর যারা বিপথগামী, তারা হবে জাহান্নামের জ্বালানি।” তিনি আরো বলেন: إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ “সে ও তার দলবল তোমাদেরকে দেখতে পায়; কিন্তু তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না।” তিনি আরো বলেন: أَفَتَتَّخِذُونَهُ وَذُرِّيَّتَهُ أَوْلِيَاءَ مِن دُونِي “তোমরা কি আমাকে ছাড়া তাকে ও তার বংশধরদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে?” তিনি আরো বলেন: كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ “ভূপৃষ্ঠে যারা আছে তাদের প্রত্যেকেই ধ্বংসশীল।”এছাড়াও তিনি বলেন: كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ “প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।”…(ইবনু হাযাম; আল-মুহাল্লা; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৪-৩৫)
.
.
জীনরা যেহেতু আমাদেরকে দেখতে পায় কিন্তু আমরা তাদেরকে দেখতে পাই না সেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের থেকে বাঁচার বহুবিধ পন্থা আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। যেমন: জীনের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার জন্য মানুষ সুন্নাহতে বর্ণিত সুরক্ষক দোয়াগুলো পড়বে। উদাহরণস্বরূপ: আয়াতুল কুরসী। কেননা আয়াতুল কুরসী কোনো রাতে পড়লে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য রক্ষাকারী থাকে এবং সকাল হওয়া পর্যন্ত তার কাছে কোনো শয়তান আসতে পারে না।পাশাপাশি আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া।সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়া।এছাড়া আল্লাহর কাছে তার এই বাণীর মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা করা:وَقُلْ رَبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ (97) وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَنْ يَحْضُرُونِ“আর বলুন: “হে আমার প্রভু! শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই। হে আমার প্রভু! আমার কাছে তারা উপস্থিত হওয়া থেকেও আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই।”[সূরা মূমিনুন: ৯৭-৯৮] অনুরূপভাবে ঘরে প্রবেশ করা, খাবার গ্রহণ করা, পানীয় পান করা, সহবাস করা প্রভৃতির পূর্বে বিসমিল্লাহ পাঠ করা শয়তানকে মানুষের ঘরে রাত্রি-যাপন করা থেকে, মানুষের সাথে খাদ্য-পানীয় গ্রহণ ও সহবাস করা থেকে বাধা দেয়। একইভাবে শৌচাগারে প্রবেশের আগে ও কাপড় খোলার আগে বিসমিল্লাহ বলা জীনকে মানুষের গোপনাঙ্গ দেখতে ও তার ক্ষতি করতে বাধা দেয়। এর দলীল হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “জীন ও মানুষের গোপন অঙ্গের মাঝখানের পর্দা হলো শৌচাগারে প্রবেশকালে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা।”(হাদীসটি তিরমিযী (৫৫১) বর্ণনা করেন। এটি সহীহুল জামে গ্রন্থে আছে]
.
একজন ব্যক্তির ঈমান ও দ্বীনের দৃঢ়তা তাকে জীনের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে বাধা দেয়। বরং এমনও হয় যে তারা যদি কোনো লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয় তাহলে ঈমানদার সেই লড়াইয়ে বিজয়ী হয়। এর দলীল হচ্ছে ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনা, তিনি বলেন: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক সাহাবী এক জীনের সাক্ষাৎ পেল। তারা কুস্তি শুরু করলে মানুষটা তাকে পরাজিত করে দিল। তারপর মানুষটি তাকে বলল: ‘আমি তো দেখতে পাচ্ছি তুমি খুব ছিপছিপে লিকলিকে। তোমার দুই বাহু যেন কুকুরের বাহু। তোমরা জীনেরা কি এমন নাকি তুমি তাদের মাঝে এমন?’ জীন বলল: ‘না, বরং আমি তাদের মাঝে শক্ত-পোক্ত। কিন্তু আমার সাথে আরেকবার লড়াই করো। এবার আমাকে পরাজিত করলে তোমাকে এমন কিছু শিখিয়ে দিব যা তোমার উপকারে আসবে।’ মানুষটি বলল: ‘হ্যাঁ’। সে বলল: ‘তুমি আয়াতুল কুরসী পড়বে।’ সে বলল: ‘হ্যাঁ’। জীন বলল: ‘তুমি কোনো ঘরে এই আয়াত পড়লে শয়তান গাধার মত বায়ুত্যাগ করতে করতে চলে যাবে, তারপর সকাল হওয়ার আগে সে ঘরে ঢুকবে না।’[হাদীসটি দারেমী হা/৩২৪৭) বর্ণনা করেন]
.
.
(১).আউযুবিল্লাহ পড়া তথা আল্লাহর কাছে জীন থেকে আশ্রয় চাওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন:وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ“আর যদি তোমার কাছে শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো কুমন্ত্রণা আসে তাহলে আল্লাহর আশ্রয় চাইবে। নিশ্চয়ই তিনি সবকিছু শোনেন, সবকিছু জানেন।”[সূরা আ’রাফ: ২০০] সুলাইমান ইবনে সুরাদ বর্ণনা করেন: দুজন লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে গালমন্দ করছিল। এক পর্যায়ে একজনের চেহারা রক্তিম বর্ণ ধারণ করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “আমি এমন বাক্য জানি যা পড়লে এই ব্যক্তির রাগ চলে যাবে। সেটি হচ্ছে: আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বানির রাজীম।”(হাদীসটি বুখারী (৩১০৮) ও মুসলিম (২৬১০) বর্ণনা করেন]
.
(২).সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়া: আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীন ও মানুষের বদনজর থেকে পানাহ চাইতেন (আউযুবিল্লাহ পড়তেন)। এক পর্যায়ে সূরা ফালাক ও সূরা নাস অবতীর্ণ হলো। এই দুটি অবতীর্ণ হওয়ার পর তিনি এই দুই সূরা গ্রহণ করলেন এবং এই দুটি ছাড়া অন্য সব কিছু পরিহার করলেন।হাদীসটি তিরমিযী হা/২০৫৮) বর্ণনা করেন এবং বলেন: হাদীসটি হাসান-গরীব। এছাড়া নাসাঈ হা/৫৪৯৪) ও ইবনে মাজাহ হা/৩৫১১) এটি বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটিকে ‘সহীহুল জামে’ হা/৪৯০২) গ্রন্থে সহিহ বলে গণ্য করেছেন]
.
(৩).আয়াতুল কুরসী পড়া: আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: এক রাতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ফিতরার সম্পদ পাহারায় নিযুক্ত করলেন। এমন সময় আমার কাছে এক ব্যক্তি এসেই অঞ্জলি ভরে খাদ্যশস্য উঠাতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেললাম ও বললাম: আমি তোমাকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে যাব। সে বলল: ‘আমি তোমাকে এমন কয়টি বাক্য শিখাব, যে বাক্যগুলোর দ্বারা আল্লাহ তোমার উপকার করবেন। আমি বললাম: সেগুলো কী? সে বলল: তুমি শোবার জন্য বিছানায় গেলে পড়বে: الله لا إله إلا هو الحي القيوم … আয়াতুল কুরসির শেষ পর্যন্ত। তাহলে আল্লাহর তরফ থেকে তোমার জন্য একজন রক্ষী থাকবে, ভোর হওয়া পর্যন্ত তোমার কাছে শয়তান ঘেঁষতে পারবে না।’ ভোরে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন: ‘তোমার বন্দীর কী হলো? আমি বললাম: ‘হে আল্লাহর রাসূল! সে দাবি করল যে সে আমাকে এমন কয়টি বাক্য শিখাবে যার দ্বারা আল্লাহ আমার উপকার করবেন।’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “কী সেটা?” আবু হুরাইরা বললেন: ‘সে আমাকে শিখিয়েছে যেন আমি ঘুমানোর জন্য শুতে গেলে আয়াতুল কুরসী পড়ি। তাহলে সকাল পর্যন্ত সে আমার কাছে আসবে না। আর আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আমার জন্য রক্ষী থাকবে।’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “শুনো! সে সে চরম মিথ্যুক হলেও তোমাকে সত্য বলেছে। ওটা ছিল শয়তান।”[হাদীসটি ইমাম বুখারী হা/৩১০১) বর্ণনা করেন]
.
(৪).সূরা বাকারা পড়া: আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,لَا تَجْعَلُوْا بُيُوْتَكُمْ مَقَابِرَ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِىْ تُقْرَأُ فِيْهِ سُوْرَةُ الْبَقَرَةِ”তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরে পরিণত কর না। যে ঘরে সূরা বাক্বারাহ পড়া হয় সে ঘর থেকে শয়তান পালিয়ে যায়’ (সহীহ মুসলিম, হা/৭৮০)। আবূ উমামা আল-বাহিলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি যে, اقْرَءُوْا سُوْرَةَ الْبَقَرَةِ فَإِنَّ أَخْذَهَا بَرَكَةٌ وَتَرْكَهَا حَسْرَةٌ وَلَا تَسْتَطِيْعُهَا الْبَطَلَةُ ‘তোমরা সূরা আল-বাক্বারাহ পড়। কেননা এর পাঠে বরকত রয়েছে এবং তা বর্জন করা আফসোসের কারণ। আর বাতিলপন্থীরা এতে সক্ষম হয় না”।(সহীহ মুসলিম, হা/৮০৪)।
.
(৫).সূরা বাকারার শেষাংশ পড়া:আবু মাসউদ আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “যে ব্যক্তি কোনো রাতে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়বে তার জন্য এই দুই আয়াতই যথেষ্ট।”(হাদীসটি বুখারী হা/৪৭২৩) ও মুসলিম হা/৮০৭) বর্ণনা করেন) অপর বর্ননায় নু’মান ইবনে বশীর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ আসমান ও যমীন সৃষ্টির দুই হাজার বছর আগে একটি কিতাব লিখেছেন। এর মধ্য থেকে দুটি আয়াত তিনি অবতীর্ণ করেছেন, সে দুটো দিয়ে তিনি সূরা বাকারার সমাপ্তি করেছেন। কোনো ঘরে এই আয়াত দুটি তিনরাত পড়া হলে তাতে শয়তান অবস্থান করে না।”[হাদীসটি তিরমিযী হা/২৮৮২ বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী সহিহুল জামে’ হা/১৭৯৯; গ্রন্থে এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেছেন।]
.
(৬).একশ বার ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাই-ইন ক্বাদীর’ পড়া: আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি দিনে একশ বার এই দোয়া পড়বে:لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ”আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। রাজত্ব একমাত্র তাঁরই। সমস্ত প্রশংসাও একমাত্র তাঁরই জন্য। আর তিনি সকল বিষয়ের ওপর ক্ষমতাবান’, তাহলে দশটি গোলাম মুক্ত করার সমান সাওয়াব তার হবে। তার জন্য একশটি সাওয়াব লেখা হবে এবং আর একশটি গুনাহ মিটিয়ে ফেলা হবে। ঐদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত এই দুআটি তার জন্য রক্ষাকবচ হবে। কোন লোক তার চেয়ে উত্তম সওয়াবের কাজ করতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, কেবল ঐ ব্যক্তি সক্ষম হবে, যে ঐ দুআটির আমল এর চেয়েও বেশি পরিমাণে করবে।”(হাদীসটি বুখারী হা/৩১১১৯) ও মুসলিম হা/২৬৯১) বর্ণনা করেন)
.
(৭).সর্বদা শরী‘আতসম্মত যিকির-আযকারে নিজেকে ব্যস্ত রাখা: সেই যিকির যেকোন সময়, কাজ ও ইবাদতের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারে অথবা অনির্দিষ্ট যিকির-আযকার হতে পারে। যেমন, ছালাতের সাথে সম্পৃক্ত যিকির হল- ফরয ছলাতের পরে; বিভিন্ন কাজকর্মের সাথে সম্পৃক্ত যিকির হল- ঘুমের পূর্বে, মাঝে ও পরে। বাড়িতে প্রবেশের ও বের হবার সময়, কোন স্থানে অবতরণের সময় ইত্যাদি। বান্দা যতবেশী যিকির-আযকার করবে, ততবেশী শয়তানের অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকবে। আর সেক্ষেত্রে শয়তান দুর্বল হবে এবং তার ষড়যন্ত্রও দুর্বল হয়ে পড়বে। শয়তান যখনই আদম সন্তানকে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে, তখনই যিকির-আযকার করলে তা দূরীভূত হয়, আত্মগোপন করে, লাঞ্চিত ও পদদলিত হয়ে যায়। আল-হারেস আল-আশআরী বর্ণনা করেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ তাআলা ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া আলাইহিস সালামকে পাঁচটি বিষয়ের আদেশ করলেন যেন তিনি নিজে তা অনুযায়ী আমল করেন এবং বনী ইসরাঈলকেও তার উপর আমল করার আদেশ করেন। … আমি তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছি যেন তোমরা আল্লাহ তাআলার যিকির করো। যিকিরের উদাহরণ হল সেই ব্যক্তির ন্যায় যার দুশমনেরা তার পিছু ধাওয়া করছে। অবশেষে সে একটি সুরক্ষিত দুর্গে প্রবেশ করে শক্র হতে নিজের প্রাণ রক্ষা করল। তদ্রুপ কোন বান্দা আল্লাহ তা’আলার যিকির ছাড়া নিজেকে শয়তানের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না।…সম্পূর্ণ হাদীস।”(হাদীসটি তিরমিযী হা/২৮৬৩) বর্ণনা করেন এবং বলেন: এটি হাসান সহীহ। শাইখ আলবানী সহীহুল জামে’ গ্রন্থে হা/১৭২৪; এটিকে সহীহ বলে গণ্য করেন]
.
(৮).আযান: সুহাইল ইবনে আবী সালিহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমার পিতা আমাকে বনু হারিসা গোত্রের কাছে পাঠালেন। আমার সাথে আমাদের এক দাস অথবা আমার এক সাথী ছিল। তখন এক বাগানের দেয়ালের ভিতর থেকে তার নাম ধরে কে যেন তাকে ডাকল। আমার সাথী দেয়ালের উপর দিয়ে তাকিয়ে কোনো কিছুকে দেখতে পেল না। এ ঘটনা আমি আমার পিতার কাছে বর্ণনা করলাম। তিনি বললেন: আমি যদি মনে করতাম যে তুমি এমন অবস্থার মুখোমুখি হবে তবে তোমাকে পাঠাতাম না। কিন্তু, যখন তুমি এমন কোনো শব্দ শুনতে পাবে তখন নামাযের অনুরূপ আযান দিবে। কেননা আমি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলতে শুনেছি: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যখন নামাযের আযান দেয়া হয় তখন শয়তান বায়ু ছাড়তে ছাড়তে তাড়াতাড়ি পালিয়ে যায়।”(হাদীসটি মুসলিম হা/৩৮৯ বর্ণনা করেন)
.
(৯).কুরআন তেলাওয়াত শয়তানদের থেকে সুরক্ষা দেয়: আল্লাহ তাআলা বলেন:وَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ جَعَلْنَا بَيْنَكَ وَبَيْنَ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ حِجَابًا مَّسْتُورًا“তুমি যখন কুরআন পাঠ করো তখন আমি তোমার মধ্যে ও যারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাদের মধ্যে একটি প্রচ্ছন্ন পর্দা স্থাপন করি।”[সূরা ইসরা: ৪৫] আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করি, তিনি যেন আমাদেরকে দ্বীন, দুনিয়া, শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থ-সম্পদ, রুজি-রোজগার এবং শয়তানের যাবতীয় অনিষ্ট ও ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেন এবং মুসলিমদের হেফাযত করেন-আমীন। (আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১০৫১৩)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।