মসজিদের সামনে পেছনে ডানে-বামে অথবা মসজিদের অভ্যন্তরে কবর থাকলে শরঈ বিধান

প্রশ্ন: মসজিদের সামনে, পেছনে, ডানে-বামে অথবা মসজিদের অভ্যন্তরে কবর থাকলে শরঈ বিধান কী? এ অবস্থায় মসজিদে সালাত আদায় করা সহীহ হবে কি?
▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়,অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য এবং অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর, মসজিদ ও কবরের পারস্পরিক অবস্থান শরী‘আতের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মসজিদের সঙ্গে কবরের অবস্থান অনুযায়ী এ বিষয়ে হুকুমও ভিন্ন হয়ে থাকে। তাই কবরটি মসজিদের সামনে (কিবলার দিকে),পেছনে,ডানে-বামে নাকি মসজিদের অভ্যন্তরে অবস্থিত—এবং মসজিদ ও কবরের মাঝে পৃথক সীমানা, প্রাচীর বা ব্যবধান রয়েছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। এ দৃষ্টিকোণ থেকে কবরকেন্দ্রিক মসজিদের বিষয়টি মূলত তিনটি অবস্থায় বিভক্ত:
(ক) মসজিদের ডানে, বামে বা পেছনে কবর থাকা;
(খ) মসজিদের সামনে, অর্থাৎ কিবলার দিকে কবর থাকা; এবং
(গ) মসজিদের অভ্যন্তরে কবর থাকা।
নিম্নে কুরআন-সুন্নাহর দলিল, সালাফের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের ফাতওয়ার আলোকে প্রতিটি অবস্থার পৃথক শরঈ বিধান এবং সেখানে আদায়কৃত সালাত সহীহ হবে কি না—তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
.
▪️(ক). মসজিদের ডানে, বামে ও পেছনে কবর:
.
মসজিদের ডানে, বামে বা পেছনে কবর থাকলে—কবরগুলো যদি মসজিদের সীমানার বাইরে পৃথক স্থানে থাকে এবং মসজিদ ও কবরের মাঝে স্বতন্ত্র সীমানা/প্রাচীর থাকে, যার ফলে উভয়টি পৃথক স্থাপনা হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে সেখানে সালাত আদায় করা সহীহ। কারণ, কবরকে মসজিদের অংশ বানানো কিংবা কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করা নিষিদ্ধ।রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:«لَا تُصَلُّوا إِلَى الْقُبُورِ»“তোমরা কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করো না।”(সহীহ মুসলিম, হা/৯৭২) অন্য বর্ণনায় আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ কবরের মাঝে সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন।”(মুসনাদে বাযযার, হা/৪৪১)।
অতএব, কবর যদি মসজিদের বাইরে পৃথক সীমানায় থাকে এবং মুসল্লির কিবলার দিকে অর্থাৎ সামনে না থেকে ডানে, বামে বা পেছনে থাকে, তাহলে শুধু কবরের নিকটবর্তী হওয়ার কারণে সালাত বাতিল বা মাকরূহ হবে না। বরং মসজিদ ও কবরস্থান পৃথক থাকলে সেখানে সালাত আদায় করা জায়েয ও সহীহ। এর সমর্থনে আদ-দুরারুস সানিয়্যাহ-তে শাইখ মুহাম্মদ ইবনুশ শাইখ আবদুল লতীফ ইবনু আবদুর রহমান এবং শাইখ সুলাইমান ইবনু সাহমান রহিমাহুমাল্লাহ-এর ফতোয়া উল্লেখ করা হয়েছে:مسجد الطائف الذي في شقه الشمالي قبر ابن عباس رضي الله عنهما، الصلاة في المسجد، إذا جُعِل بين القبر وبين المسجد جدار يُرفَع، يُخرج القبر عن مسمَّى المسجد، فلا تُكره الصلاة فيه“তায়েফের যে মসজিদের উত্তর অংশে ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার কবর রয়েছে, সেখানে সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে যদি কবর ও মসজিদের মাঝে এমন একটি উঁচু প্রাচীর নির্মাণ করা হয়, যা কবরটিকে মসজিদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে পৃথক করে দেয়, তাহলে সেখানে সালাত আদায় করা মাকরূহ হবে না।”(আদ-দুরারুস সানিয়্যাহ, খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২৬৬)
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন:وَإِنْ كَانَ الْمَسْجِدُ مُنْفَصِلًا عَنِ الْقَبْرِ، فَحُكْمُهُ حُكْمُ سَائِرِ مَسَاجِدِ الْمُسْلِمِينَ“আর যদি মসজিদটি কবর থেকে পৃথক থাকে, তাহলে তার বিধান মুসলিমদের অন্যান্য মসজিদের মতোই।”(মাজমূ‘উল ফাতাওয়া, ৩১/১২)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে এমন একটি মসজিদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যার উত্তর ও দক্ষিণ দিক কবর দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং উত্তর ও দক্ষিণ উভয় দিকেই মসজিদ ও কবরস্থানের মধ্যকার দূরত্ব মাত্র দুই মিটার।
জবাবে তিনি বলেন:لا حرج في بقاء المسجد المذكور، لأن العادة جارية أن الناس يدفنون حول المسجد، فلا يضر ذلك شيئا، والمقصود أن الدفن حول المساجد لا بأس به، لأنه أسهل على الناس، فإذا خرجوا من المسجد دفنوه حول المسجد، فلا يضر ذلك شيئا ولا يؤثر في صلاة المصلين، لكن إذا كان في قبلة المسجد شيء من القبور، فالأحوط أن يكون بين المسجد وبين المقبرة جدار آخر غير جدار المسجد، أو طريق يفصل بينهما، هذا هو الأحوط والأولى، ليكون ذلك أبعد عن استقبالهم للقبور، أما إن كانت عن يمين المسجد، أو عن شماله، أي عن يمين المصلين، أو عن شمالهم فلا يضرهم شيئا، لأنهم لا يستقبلونها، لأن هذا أبعد عن استقبالها وعن شبهة الاستقبال”উল্লিখিত মসজিদটি বহাল রাখতে কোনো বাধা নেই; কারণ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রথা হলো তারা মসজিদের চারপাশেই দাফন করে থাকে, এতে কোনো ক্ষতি হয় না। মূলকথা হলো, মসজিদের আশপাশে দাফন করায় কোনো দোষ নেই, কারণ এটি মানুষের জন্য সহজতর। তারা যখন মসজিদ থেকে বের হয়, তখন তার পাশেই দাফন করে; এটি কোনো ক্ষতি করে না এবং মুসল্লিদের সালাতেও এর কোনো প্রভাব পড়ে না। তবে যদি মসজিদের কেবলার দিকে কোনো কবর থাকে, তবে অধিক সতর্কতা ও উত্তম হলো—মসজিদ ও কবরস্থানের মাঝে মসজিদের দেয়াল ছাড়াও অতিরিক্ত আরেকটি দেয়াল বা কোনো রাস্তা থাকা, যা দুটির মাঝে ব্যবধান সৃষ্টি করবে। এটিই অধিক সতর্কতামূলক ও শ্রেয় পদ্ধতি, যাতে মুসল্লিদের কবরের দিকে মুখ করার বিষয়টি থেকে দূরে রাখা যায়। আর যদি কবরগুলো মসজিদের ডানে বা বামে—অর্থাৎ মুসল্লিদের ডানে বা বামে থাকে, তবে তাতে কোনো ক্ষতি নেই; কারণ তারা সেগুলোর দিকে মুখ করছে না। এটি কবরের দিকে মুখ করার প্রবণতা এবং এ সম্পর্কিত সন্দেহ থেকে দূরে থাকার জন্য অধিক উপযোগী।”(ইমাম বিন বায;মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ৩৫৬)
.
সুতরাং মূলনীতি হলো—মসজিদের বাইরে পৃথক সীমানায় অবস্থিত কবর এবং মসজিদের অভ্যন্তরে বা মসজিদের অংশ হিসেবে অবস্থিত কবরের বিধান এক নয়। কবর যদি মসজিদের সীমানার বাইরে পৃথক স্থানে থাকে এবং মুসল্লিদের কিবলার দিকে না থেকে ডানে, বামে বা পেছনে অবস্থান করে, তাহলে শুধু কবরের নৈকট্যের কারণে সালাতকে বাতিল বা মাকরূহ বলা যাবে না; বরং এ অবস্থায় সালাত সহীহ হবে। পক্ষান্তরে, কবর যদি মসজিদের সীমানার অভ্যন্তরে থাকে বা মসজিদের অংশ হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে তার বিধান ভিন্ন এবং এ অবস্থায় সালাত আদায়ের বিষয়টি শরিয়তের নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত। অতএব, মসজিদ ও কবরের মাঝে সুস্পষ্ট পৃথকীকরণ থাকা এবং কবরকে মসজিদের অংশ হিসেবে গণ্য না করাই শরিয়তসম্মত সমাধান।
.
▪️(খ). মসজিদের সামনে কিবলার দিকে কবর:
.
মসজিদের সামনে কিবলার দিকে কবর বা কবরস্থান থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য হলো—মুসল্লি কি সরাসরি কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করছেন, নাকি মসজিদ ও কবরের মাঝে এমন কোনো পৃথককারী দেয়াল, প্রাচীর বা রাস্তা রয়েছে, যা উভয় স্থানকে স্বতন্ত্র করে দেয়। কেননা দলিলের আলোকে প্রমাণিত হয়েছে যে, সরাসরি কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করা হারাম। এর উদাহরণ হলো—কোনো ব্যক্তি এমন স্থানে সালাত আদায় করছেন, যার কিবলার দিকে একটি কবর বা কবরস্থান রয়েছে; যদিও তিনি কবরস্থানের ভেতরে সালাত আদায় করছেন না, কিন্তু কবরের খুব কাছাকাছি এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছেন যেখানে তাঁর ও কবরের মাঝে কোনো দেয়াল, প্রাচীর বা অন্য কোনো পৃথককারী ব্যবস্থা নেই। এ অবস্থায় তাঁর সালাত সরাসরি কবরমুখী হওয়ায় তা নিষিদ্ধ। এর হারাম হওয়ার দলিল হলো:
.
(১)- আবু মারসাদ আল-গানাওয়ী বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “তোমরা কবরের উপর বসবে না এবং কবরের দিকে নামায পড়বে না।”(হাদীসটি ইমাম মুসলিম (৯৭২) বর্ণনা করেন] উক্ত হাদীস প্রমাণ করে যে কবরস্থানের দিকে কিংবা কিছু কবরের দিকে অথবা একটি কবরের দিকে নামায পড়া হারাম।এমনকি যারা কবরস্থানকে মসজিদ হিসাবে ব্যবহার করে, তাদের প্রতি আল্লাহ অভিশাপ করেছেন। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মৃত্যুশয্যায় বলেছেন, ‘আল্লাহর অভিশাপ ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের প্রতি। তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে (সহীহ বুখারী, হা/১৩৩০; মিশকাত, হা/৭১২)।এ কারণেই ইবনু হাযম ‘আল-মুহাল্লা’-তে ইমাম আহমদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “যে ব্যক্তি কবরস্থানে অথবা কোনো কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করবে, সে সর্বদা পুনরায় সালাত আদায় করবে।” ইবনু হাযম নিজে, শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ, তাঁর শিষ্য ইবনুল কাইয়্যিম এবং ইমাম আশ-শাওকানীও এই মতের ওপর রয়েছেন।(আল-মুহাল্লা’ (৪/২৭)
.
ইমাম আশ-শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) আলিমদের বিভিন্ন মত উল্লেখ করার পর বলেছেন: “নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত মুতাওয়াতির হাদিসগুলো—যেমন ইবনু হাযম বলেছেন—নিষেধাজ্ঞার প্রকৃত অর্থ তথা হারাম হওয়ার ওপর প্রমাণ দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। উসূলের একটি প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি হলো, নিষেধাজ্ঞা নিষিদ্ধ কাজের বাতিল হওয়ার নির্দেশ দেয়। অতএব সঠিক মত হলো—এটি হারাম এবং বাতিল। কারণ নিষেধাজ্ঞা যে ‘ফাসাদ’ (অকার্যকারিতা)-কে আবশ্যক করে, তা ‘বাতিল’-এর সমার্থক; কবরের ওপর, কবরস্থানে এবং ‘কবরস্থান’ শব্দের আওতায় পড়ে এমন সব স্থানে সালাত আদায়ের মধ্যে এ ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই।”
.
(২)- আর যেহেতু কবরস্থানে নামায পড়া হারাম হওয়ার হেতুটি কবরের দিকে নামায পড়ার মাঝেও পাওয়া যায়।আর ব্যক্তি যেহেতু কবরের দিকে কিংবা কবরস্থানের দিকে এভাবে ফিরে থাকছে যে, তার ব্যাপারে বলা যায় যে সে কবরের দিকে ফিরে নামায পড়ছে; তাই সে নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হবে। আর যদি নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে “তোমরা নামায পড়ো না” এই হাদীসের কারণে সহিহ হবে না। যেহেতু এখানে নামায পড়তে নিষেধ করা হয়েছে। কেউ যদি কবরের দিকে ফিরে নামায পড়ে তাহলে তার এ আমলে আনুগত্য ও অবাধ্যতা উভয়টা একত্রিত হলো। এমনটি করার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করা সম্ভব নয়।লক্ষণীয় বিষয়: যদি নামাযীর মাঝে ও কবরগুলোর মাঝে প্রতিবন্ধক হিসেবে দেয়াল থাকে, তাহলে সে অবস্থায় নামায পড়তে সমস্যা ও নিষেধাজ্ঞা নেই। অনুরূপভাবে যদি আপনার মাঝে ও কবরগুলোর মাঝে রাস্তা অথবা কিছুটা দূরত্ব থাকে যার কারণে আপনি কবরের দিকে ফিরে নামায আদায়কারী হয়ে যান না; তাহলে সমস্যা নেই।আর আল্লাহই সর্বজ্ঞ।দেখুন: আল-মুগনী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪০৩) ও ইবনু উসাইমীনের আশ-শারহুল মুমতি; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২৩২)।
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ ‘আল-ইখতিয়ারাত’-এ বলেছেন:”ولا تصح الصلاة في المقبرة ولا إليها، والنهي عن ذلك هو سد لذريعة الشرك “কবরস্থানে সালাত সহিহ নয় এবং কবরের দিকে মুখ করেও সালাত সহিহ নয়। এরূপ সালাত থেকে নিষেধ করার উদ্দেশ্য হলো শিরকের পথ বন্ধ করা।”
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:إذا صلَّى الإنسان في مسجد أمامه مقبرة : فإن كان هناك فاصل شارع – مثلاً – أو جدار تام بحيث يكون المصلون لا يشاهدون المقبرة : فلا بأس بذلك ، أما إذا كان قريباً يلي المسجد مباشرة ، وليس فيه جدار ، أو فيه جدار قصير بحيث يشاهد المصلون هذه القبور : فإنه لا يجوز ؛ لأن النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم قال ( لا تصلوا إلى القبور ولا تجلسوا عليها ) -“কোনো ব্যক্তি যদি এমন একটি মসজিদে সালাত আদায় করে, যার সম্মুখে কবরস্থান রয়েছে—তাহলে যদি মসজিদ ও কবরস্থানের মাঝে কোনো পৃথককারী ব্যবস্থা থাকে; যেমন, একটি রাস্তা, অথবা এমন একটি পূর্ণাঙ্গ দেয়াল থাকে, যার কারণে মুসল্লিরা কবরস্থান দেখতে পায় না—তাহলে এতে কোনো অসুবিধা নেই।কিন্তু যদি কবরস্থানটি মসজিদের একেবারে নিকটবর্তী হয় এবং সরাসরি মসজিদের সঙ্গে লাগোয়া থাকে, আর সেখানে কোনো দেয়াল না থাকে; অথবা দেয়াল থাকলেও তা এত নিচু হয় যে, মুসল্লিরা কবরগুলো দেখতে পায়—তাহলে এ অবস্থায় সালাত আদায় করা জায়েজ নয়।কেননা নবী ﷺ বলেছেন: ‘তোমরা কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করো না এবং কবরের ওপর বসো না।”(সহিহ মুসলিম; ইবনু উসামীন লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-১৩৭)
.
শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন:”যদি কেউ প্রশ্ন করে, (কবরের) দিকে সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে সীমা বা ব্যবধান কতটুকু?
আমরা বলব:الجدارُ فاصل ، إلا أن يكون جدارَ المقبرة ، ففي النفس منه شيء ، لكن إذا كان جداراً يحول بينك وبين المقابر ، فهذا لا شَكَّ أنه لا نهي ، كذلك لو كان بينك وبينها شارع فهنا لا نهي”মধ্যবর্তী দেওয়ালই হলো ব্যবধান। তবে সেটি যদি কবরস্থানের দেওয়াল হয়, তবে তা নিয়ে মনে কিছুটা খটকা জাগে। কিন্তু যদি এমন একটি দেওয়াল থাকে যা আপনার ও কবরসমূহের মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করে, তবে এতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তেমনিভাবে আপনার ও কবরগুলোর মাঝে যদি কোনো সড়ক বা রাস্তা থাকে, তবে এক্ষেত্রেও কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।”(আশ-শারহুল মুমতি; ২/২৫৪)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.)-কে এমন বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, কেউ কবরমুখী হয়ে সালাত আদায় করলে তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে। মানুষের জন্য আবশ্যক হল কবরকে স্থানান্তর করা। অথবা কবর ও মসজিদের মাঝে পৃথক কোন দেয়াল উঁচু করে দেয়া। তবে অবশ্যই সেটা যেন কবরের দেয়াল না হয়। কবরের দেয়াল যদি সম্মান বাড়ানোর জন্য করে থাকে, তাহলে অবশ্যই তা ভেঙ্গে দিতে হবে। যদি কেউ জানার পূর্বে সালাত আদায় করে থাকে তাহলে অজ্ঞতা হেতু তার সালাত হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ”(ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৮৯)
.
সুতরাং, মসজিদের কিবলার দিকে যদি সরাসরি কবর বা কবরস্থান থাকে এবং মুসল্লি ও কবরের মাঝে কোনো পৃথককারী দেয়াল, প্রাচীর বা রাস্তা না থাকে, তাহলে সেখানে কবরমুখী হয়ে সালাত আদায় করা জায়েজ নয়; বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী এমন সালাত সহিহও নয়। তবে মসজিদ ও কবরের মাঝে এমন পূর্ণাঙ্গ দেয়াল বা স্বতন্ত্র সীমানা থাকে, যা কবরকে পৃথক করে দেয়, অথবা মাঝখানে এমন রাস্তা/ব্যবধান থাকে যার কারণে তাকে কবরমুখী সালাত আদায়কারী বলা হয় না—তাহলে নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। আর কোনো ব্যক্তি বিষয়টি না জেনে এমন স্থানে সালাত আদায় করে থাকলে, অজ্ঞতার কারণে তার পূর্বের সালাতের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও গ্রহণযোগ্যতার আশা করা যায়।
.
▪️(গ). মসজিদের ভিতরে কবর:
.
মসজিদ ও কবরকে একই স্থানে রাখা শরিয়তসম্মত নয়। তাই যে মসজিদের অভ্যন্তরে কবর রয়েছে,সেখানে সালাত আদায় করা হারাম।রাসূল (ﷺ) বলেছেন, لَا تَجْلِسُوْا عَلَى الْقُبُوْرِ وَلَا تُصَلُّوْا إِلَيْهَا ‘তোমরা কখনো ক্ববরের উপর বসবে না এবং ক্ববরের দিকে মুখ করে সালাতও আদায় করবে না”।(সহীহ মুসলিম, হা/৯৭২)। এমনকি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুমূর্ষু অবস্থায় ইহুদী খৃষ্টানদের কার্যকলাপ থেকে কঠিনভাবে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে উপরোক্ত বাণী পেশ করেন। উম্মে সালামা (রাঃ) হাবশায় হিজরত করে খৃষ্টানদের গীর্জা বা উপাসনালয়ে স্থাপিত বহু মূর্তী দেখেছিলেন। বিষয়টি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর কাছে উল্লেখ করলে তিনি বলেন: أُولَئِكَ قَوْمٌ إِذَا مَاتَ فِيهِمُ الْعَبْدُ الصَّالِحُ أَوِ الرَّجُلُ الصَّالِحُ بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّوَرَ أُولَئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ “ওরা এমন জাতি, তাদের মধ্যে কোন নেক বান্দা বা সৎলোক মৃত্যু বরণ করলে তার কবরের উপর তারা মসজিদ তৈরী করত এবং ঐ মূর্তিগুলো স্থাপন করত। ওরা আল্লাহর কাছে সৃষ্টির মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট।”(সহীহ বুখারী হা/৪৩৪) অপর বর্ননায় আবদুল্লাহ্ বিন মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)বলেন, “সর্বাধিক নিকৃষ্ট লোক হচ্ছে তারা, যাদের জীবদ্দশায় ক্বিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। আর যারা কবর সমূহকে মসজিদে রূপান্তরিত করেছে।” ইমাম আহমাদ উত্তম সনদে হাদীছটি বর্ণনা করেন। অতএব মু’মিন কখনই ইহুদী-খৃষ্টানদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সন্তুষ্ট হবে না এবং সৃষ্টি কুলের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট হবে না। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) ‘আল-ইখতিয়ারাত’-এ বলেছেন:”ولا تصح الصلاة في المقبرة ولا إليها، والنهي عن ذلك هو سد لذريعة الشرك “কবরস্থানে সালাত সহিহ নয় এবং কবরের দিকে মুখ করেও সালাত সহিহ নয়। এরূপ সালাত থেকে নিষেধ করার উদ্দেশ্য হলো শিরকের পথ বন্ধ করা।”
.
সুতরাং যদি কোনো স্থানে প্রথমে কবর থাকে, অতঃপর সেই কবরের ওপর বা তাকে কেন্দ্র করে মসজিদ নির্মাণ করা হয়,এক্ষেত্রে ওয়াজিব হচ্ছে এই মসজিদ পরিত্যাগ করা; বরং মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা। যদি না করা হয় তবে মুসলিম শাসকের উপর আবশ্যক হচ্ছে উক্ত মসজিদ ধ্বংস করে ফেলা। পক্ষান্তরে যদি প্রথমে মসজিদ নির্মিত হয়, অতঃপর তার অভ্যন্তরে কোনো মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা হয়, তাহলে কবরটি অপসারণ করে মৃত ব্যক্তিকে—অথবা দেহের অবশিষ্ট হাড়-হাড্ডি থাকলে সেগুলোকে—মুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করা ওয়াজিব। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ কবরকে মসজিদে পরিণত করা এবং কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। সুতরাং মসজিদের ভেতরে কবর বিদ্যমান থাকলে সেখানে সালাত আদায় না করে কবর অপসারণের শরঈ ব্যবস্থা করা আবশ্যক।
.
ইমাম ইবনু কাইয়িম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:وعلى هذا فيهدم المسجد إذا بني على قبر ، كما ينبش الميت إذا دفن في المسجد ، نص على ذلك الإمام أحمد وغيره ، فلا يجتمع في دين الإسلام مسجد وقبر ، بل أيهما طرأ على الآخر منع منه ، وكان الحكم للسابق .فلو وضعا معا : لم يجز ، ولا يصح هذا الوقف ، ولا يجوز ولا تصح الصلاة في هذا المسجد لنهي رسول الله صلى الله عليه وسلم عن ذلك ، ولعنه من اتخذ القبر مسجدا ، أو أوقد عليه سراجا ، فهذا دين الإسلام الذي بعث الله به رسوله ونبيه ، وغربته بين الناس كما ترى.”অনুরূপভাবে: কবরের ওপর মসজিদ নির্মিত হলে তা ভেঙে ফেলা হবে,ঠিক যেমন মসজিদের ভেতরে মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা হলে, তার লাশ কবর থেকে তুলে ফেলা হবে। ইমাম আহমাদ ও অন্যান্য আলেমগণ এই বিধান স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং, ইসলাম ধর্মে মসজিদ ও কবর এক জায়গায় একত্র হতে পারে না; বরং দুটির মধ্যে যেটি পরে ঘটে, সেটি বাতিল হবে এবং পূর্ববর্তীটির বিধানই বহাল থাকবে।আর যদি উভয়টিই একই সময়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে তা বৈধ হবে না এবং এ ধরনের ওয়াকফও সহীহ হবে না। এ মসজিদে সালাত আদায় করাও বৈধ নয়। কারণ, রাসূলুল্লাহ ﷺ তা থেকে নিষেধ করেছেন এবং যে ব্যক্তি কবরকে মসজিদে পরিণত করে অথবা তার ওপর প্রদীপ জ্বালায়, তাকে তিনি অভিশাপ দিয়েছেন। এটাই সেই ইসলামের বিধান, যার ওপর আল্লাহ তাঁর রাসূল ও নবীকে প্রেরণ করেছেন। অথচ মানুষের মাঝে এই দ্বীনের অপরিচিতি ও নিঃসঙ্গতা কেমন, তা তো তুমি নিজেই দেখতে পাচ্ছো।”(ইবনু ক্বাইয়িম, যাদুল মা‘আদ, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৫০)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে কবর আছে এমন মসজিদে সলাত আদায় করার হুকুম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল?
তিনি উত্তর দিয়েছেন:
” الصلاة في مسجد فيه قبر على نوعين :
الأول : أن يكون القبر سابقاً على المسجد ، بحيث يبنى المسجد على القبر ، فالواجب هجر هذا المسجد وعدم الصلاة فيه ، وعلى من بناه أن يهدمه ، فإن لم يفعل وجب على ولي أمر المسلمين أن يهدمه .
والنوع الثاني : أن يكون المسجد سابقاً على القبر ، بحيث يدفن الميت فيه بعد بناء المسجد ، فالواجب نبش القبر ، وإخراج الميت منه ، ودفنه مع الناس .
وأما المسجد فتجوز الصلاة فيه بشرط أن لا يكون القبر أمام المصلي ، لأن النبي صلى الله عليه وسلم نهى عن الصلاة إلى القبور.
أما قبر النبي صلى الله عليه وسلم الذي شمله المسجد النبوي فمن المعلوم أن مسجد النبي صلى الله عليه وسلم بُنِيَ قبل موته فلم يُبْنَ على القبر ، ومن المعلوم أيضاً أن النبي صلى الله عليه وسلم لم يدفن فيه ، وإنما دفن في بيته المنفصل عن المسجد ، وفي عهد الوليد بن عبد الملك كتب إلى أميره على المدينة وهو عمر بن عبد العزيز في سنة 88 من الهجرة أن يهدم المسجد النبوي ويضيف إليه حجر زوجات النبي صلى الله عليه وسلم ، فجمع عمر وجوه الناس والفقهاء وقرأ عليهم كتاب أمير المؤمنين الوليد فشق عليهم ذلك ، وقالوا : تَرْكُها على حالها أدعى للعبرة ، ويحكى أن سعيد بن المسيب أنكر إدخال حجرة عائشة ، كأنه خشي أن يتخذ القبر مسجداً فكتب عمر بذلك إلى الوليد فأرسل الوليد إليه يأمره بالتنفيذ فلم يكن لعمر بُدٌّ من ذلك ، فأنت ترى أن قبر النبي صلى الله عليه وسلم لم يوضع في المسجد ، ولم يُبْنَ عليه المسجد ، فلا حجة فيه لمحتج على الدفن في المساجد أو بنائها على القبور ، وقد ثبت عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه قال : ” لعنة الله على اليهود والنصارى اتخذوا قبور أنبيائهم مساجد ” ، قال ذلك وهو في سياق الموت تحذيراً لأمته مما صنع هؤلاء ، ولما ذكرت له أم سلمة رضي الله عنها كنيسة رأتها في أرض الحبشة وما فيها من الصور قال : ” أولئك إذا مات فيهم الرجل الصالح ، أو العبد الصالح بنوا على قبره مسجداً ، أولئك شرار الخلق عند الله ” ، وعن ابن مسعود رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال : ” إن مِن شرار الناس مَن تدركهم الساعة وهم أحياء ، والذين يتخذون من القبور مساجد ” أخرجه الإمام أحمد بسند جيد .والمؤمن لا يرضى أن يسلك مسلك اليهود والنصارى ، ولا أن يكون من شرار الخلق .
“যে মসজিদে কবর আছে সেখানে নামায পড়া দুই পদ্ধতিতে হতে পারে:
প্রথম পদ্ধতি: যদি মসজিদের পুর্বেই ঐ স্থানে কবর হয়, অতঃপর কবরের উপরে মসজিদ নির্মাণ করা হয়।তাহলে আবশ্যক হলো মসজিদটি স্থানান্তরিত করা এবং তাতে সালাত পড়া থেকে বিরত থাকা, আর যিনি এটা বানিয়েছে তার জন্য আবশ্যক হলো তা ধ্বংস করা। যদি তিনি এটা না করেন তাহলে মুসলিম শাসকদের জন্য আবশ্যক হলো তা ধ্বংস করা।
.
দ্বিতীয় পদ্ধতি: মসজিদ যদি আগে নির্মিত হয় অতঃপর মসজিদ নির্মাণের পর সেখানে মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা হয়। সেক্ষেত্রে আবশ্যক হলো কবর খনন করে মৃতের দেহাবশেষ সেখান থেকে বের করা এবং অন্যান্য মৃত মানুষদের সাথে (মুসলিম গোরস্থানে) তাকে দাফন করা। এ ধরনের মসজিদে নামায পড়া জায়েয, যতক্ষণ না নামাযরত ব্যক্তির সামনে কবর থাকে,কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের দিকে সলাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন।
.
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের ব্যাপারে যা মসজিদে নববীতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, এটা সর্বজনবিদিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পূর্বে মসজিদে নববী নির্মাণ করা হয়েছিল, কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করা হয়নি। এটাও সর্বজনবিদিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামকে মসজিদে দাফন করা হয়নি। বরং মসজিদ থেকে বিচ্ছিন্ন তাঁর নিজ বাড়িতে দাফন করা হয়েছিল। ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিকের শাসনামলে তিনি মদিনার গভর্নর উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কাছে ৮৮ হিজরীতে চিঠি লিখেছিলেন যে, মসজিদে নববী ভেঙে ফেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীদের কক্ষ সংযুক্ত করার। উমর লোকজনদেরকে এবং ফুকাহাদের-কে ডেকে তাদের সামনে খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিকের দেওয়া চিঠিটা পড়ে শোনালেন। এই জিনিসটা তাদের সবার কাছে কঠিন মনে হলো। ফলে তারা বলল: “এটিকে যে অবস্থায় আছে তেমনই রেখে দাও, এটাই উত্তম। এমনকি এটি বর্ণিত হয়েছে যে, “সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রাহিমাহুল্লাহ) আয়েশা (রা:)-এর ঘরকে মসজিদে অন্তর্ভুক্ত করার নিন্দা করেছিলেন এই ভয়ে যে, অনেকেই সেটাকে মাসজিদ রূপে গ্রহণ করে নিবে,তখন উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রাহিমাহুল্লাহ)-এই কথাটি খলিফা ওয়ালিদের কাছে লিখে পাঠালেন,ওয়ালিদ তাকে (উমর ইবনে আব্দুল আজিজকে) তার আদেশ পালন করার নির্দেশ দিয়ে তাকে একটি বার্তা পাঠান, ফলে উমর ইবনে আব্দুল আজিজের খলিফার নির্দেশ পালন করা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। আর কোন উপায় ছিল না। সুতরাং আপনি দেখতে পাচ্ছেন যে,নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবর মসজিদের বিতর স্থাপন করা হয়নি এবং এর উপর মসজিদ নির্মিত হয়নি, সুতরাং যারা এটিকে প্রমাণ হিসাবে উদ্ধৃত করার চেষ্টা করে তাদের পক্ষে কোন দলিল নেই যে রাসূল (ﷺ) কে মসজিদে দাফন করা হয়েছে কিংবা কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ইহুদি খ্রিস্টান এর উপর আল্লাহ তাআলার লানত, যারা তাদের নবীর কবরকে মসজিদের হিসেবে গ্রহণ করেছে‌। এটা দ্বারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতকে সতর্ক করেছেন যাতে করে তাদের মাঝে কোন বুজুর্গ ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তার কবরকে সিজদার স্থান হিসেবে গ্রহণ না করে। উম্মে সালমা গির্জার কথা উল্লেখ করেছেন যেটা তিনি আবিসিনিয়ায় দেখেছিলেন যে তাদের সিজদার স্থানে ছবি রয়েছে। তিনি (ﷺ) বলেন, যারা তাদের মাঝে সৎ ব্যাক্তিদের কবরকে মসজিদের হিসেবে তৈরি করে তারাই হলো আল্লাহ তাআলার নিকটে সৃষ্টির সবচেয়ে নিকৃষ্টতম সৃষ্টি। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তারাই সবচেয়ে নিকৃষ্টতম সৃষ্টি যারা তাদের বুজুর্গ ব্যক্তিদের কবরকে মসজিদ রূপে গ্রহণ করে”। এটি ইমাম আহমাদের বর্ণনা। সুতরাং মুমিনের উচিত নয় ইহুদি ও খ্রিস্টানদের পথ অনুসরণ করা বা সবচেয়ে নিকৃষ্টতম সৃষ্টিদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া।(মাজমুউ ফাতাওয়া শায়েখ বিন উসাইমীন: ১২/২৯২)
.
ইমাম ইবনু উসাইমিন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: “যে মসজিদে কবর রয়েছে—আর মুসল্লি জানেনই না যে সেখানে কবর আছে, কিংবা তিনি জানেন কিন্তু এ সংক্রান্ত বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ—এমন ব্যক্তির সালাতের বিধান কী? সালাতগুলো দীর্ঘ সময়ের হোক কিংবা অল্প সময়ের।”
​উত্তরে তিনি বলেন: “যদি তিনি না জেনে থাকেন যে সেখানে কবর রয়েছে, তবে তাঁর ওপর কোনো দায় বর্তায় না। কেননা মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন: ‘হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আপনি আমাদের পাকড়াও করবেন না’ [সুরা বাক্বারা: ২৮৬]।
​প্রশ্নকারী: আর যদি তিনি জানেন যে সেখানে কবর রয়েছে, কিন্তু বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ থাকেন?
​জবাবে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: একই কথা প্রযোজ্য; অর্থাৎ তিনি যদি জেনে থাকেন যে সেখানে কবর আছে কিন্তু বিধান জানা না থাকে, তবুও তাঁর ওপর কোনো দায় নেই। কারণ, তিনি অজ্ঞতাবশত নিষিদ্ধ কাজ করেছেন, আর অজ্ঞতাবশত সংঘটিত কাজের কারণে কোনো শাস্তি বা ত্রুটি সাব্যস্ত হয় না (ফলে তাঁর সালাত বাতিল হবে না)।
​প্রশ্নকারী: কবরের ওপর মসজিদ নির্মিত হওয়া এবং সচল মসজিদে কবর দেওয়া—উভয়ের হুকুম কি এক?
​জবাবে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: না, এক নয়। যদি কবরের ওপর মসজিদ নির্মিত হয় (অর্থাৎ কবরকে কেন্দ্র করে মসজিদ তৈরি করা হয়), তবে সে মসজিদ ভেঙে ফেলা ওয়াজিব এবং সেখানে সালাত আদায় করা সহিহ নয়।পক্ষান্তরে, যদি কোনো চালু মসজিদে কাউকে দাফন করা হয়, তবে সে ক্ষেত্রে মসজিদ ভেঙে ফেলা ওয়াজিব নয়; বরং কবর খুঁড়ে মৃতদেহ বের করে অন্যান্য কবরস্থানে দাফন করা আবশ্যক। এরপর সেই মসজিদে সালাত আদায় করা বৈধ হবে, তবে শর্ত হলো কবরটিকে নিজের ও কিবলার মাঝখানে রাখা যাবে না।”(ইবনু উসামীন লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ,খণ্ড: ২৭,পৃষ্ঠা: ২৩৪)
.
​শায়খ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরও এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, যিনি কবরের অস্তিত্ব রয়েছে এমন কোনো মসজিদে সালাত আদায় করেছেন, কিন্তু সালাত শেষ করার পর তা জানতে পেরেছেন। এ ক্ষেত্রে কি তাঁকে সালাত পুনরায় আদায় করতে হবে?
​জবাবে তিনি বলেন:”لا يعيد الصلاة مرة أخرى “তাঁকে পুনরায় সালাত আদায় করতে হবে না।” (‘ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৮)
.
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে, মসজিদের ডানে, বামে বা পেছনে মসজিদের সীমানার বাইরে কবর থাকলে এবং মসজিদ ও কবরের মাঝে পৃথক সীমানা, দেয়াল বা অনুরূপ ব্যবধান থাকলে শুধু কবর থাকার কারণে সালাতের কোনো সমস্যা নেই। তবে কিবলার সামনে কবর থাকলে মসজিদ ও কবরের মাঝে স্পষ্ট পৃথককারী ব্যবস্থা না থাকা অবস্থায় সেখানে সালাত আদায় করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। আর মসজিদের অভ্যন্তরে কবর থাকা শরিয়তসম্মত নয়; মসজিদ আগে নির্মিত হয়ে থাকলে পরবর্তীতে দাফন করা কবর অপসারণ করতে হবে, আর কবর আগে থাকা অবস্থায় তার ওপর মসজিদ নির্মিত হলে সেই মসজিদ পরিত্যাগ করতে হবে। অতএব, কবর কোথায় অবস্থিত, মসজিদের সীমানার ভেতরে না বাইরে, কিবলার দিকে কি না এবং মসজিদ ও কবরের মাঝে পৃথককারী ব্যবস্থা আছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করেই শরঈ হুকুম নির্ধারণ করতে হবে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: