নারীদের মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহার করা যাবে কি

ভূমিকা: পরম করুণাময়,অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। অগণিত দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর “মেন্সট্রুয়াল কাপ” হলো চিকিৎসা গ্রেডের সিলিকন বা নরম উপাদানে তৈরি একটি ছোট কাপ, যা নারীদের হায়েজ চলাকালীন রক্ত প্রবাহ সংগ্রহ করার জন্য যোনিপথের ভিতরে ব্যবহার করা হয়। এটি স্যানিটারি প্যাড বা ট্যাম্পনের মতো রক্ত শোষণ না করে বরং রক্ত সংগ্রহ করে রাখে, ফলে কোনো প্রকার নিঃসরণের ভয় থাকে না। অতঃপর নির্দিষ্ট সময় পর পর কাপটি বের করে খালি করা হয়, এবং পরিষ্কার করে পুনরায় ব্যবহার করা হয়। এখন প্রশ্ন হলো মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহার করা জায়েজ নাকি জায়েজ নয়!—এ বিষয়ে কথা হচ্ছে,এটি মূলত একটি ইজতিহাদী বিষয়। কারণ শরীয়তে এ বিষয়ে সরাসরি কোনো স্পষ্ট নস (দলিল) পাওয়া যায় না। তবে সমসাময়িক কিছু আলিম ও গবেষক শরীয়তের সাধারণ নীতিমালা, প্রয়োজন ও উপকারিতার দিক বিবেচনা করে এর বৈধতার পক্ষে মত দিয়েছেন—বিশেষত বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে। তাদের বক্তব্য হলো, রক্ত নিয়ন্ত্রণ ও বাইরে ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার করার অবকাশ শরীয়তে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তারা ইস্তিহাযায় আক্রান্ত নারীদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কিছু নির্দেশনাকেও দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের অন্যতম দলিল হলো, হামনা বিনতে জাহাশ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:“হে আল্লাহর রাসূল! আমার দীর্ঘসময় ধরে প্রচুর ইস্তিহাযার রক্তপাত হয়। এটি কি আমাকে সালাত ও সাওম থেকে বিরত রাখবে?” তখন নবী ﷺ বলেনঃ“আমি তোমাকে কাপড় ব্যবহারের একটি পদ্ধতি বলে দিচ্ছি। তুমি কাপড়টিকে গুপ্তাঙ্গের উপর স্থাপন করবে; এটি রক্তপাত কমাতে সহায়তা করবে। তিনি বললেন, “রক্তপাত এর চেয়েও বেশি।তখন নবী ﷺ বলেনঃ “এটি শয়তানের একটি আঘাত…”(সুনানে ইবনু মাজাহ, হা/৬২২; সুনানে তিরমিযি, হা/১২৮; সুনানে আবু দাউদ, হা/২৮৭) ইমাম তিরমিযী (রাহিমাহুল্লাহ) হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। ইমাম আহমদ থেকেও এর সহীহ হওয়ার বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে। ইমাম বুখারী এটিকে হাসান বলেছেন। আর ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) “ইরওয়াউল গালীল” (১/২০২)-এ হাদিসটিকে হাসান আখ্যায়িত করেছেন। এছাড়াও উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে:«ثُمَّ اغْتَسِلِي وَاسْتَثْفِرِي وَصَلِّي» “অতঃপর তুমি গোসল করবে, কাপড়ের বিশেষ পট্টি (ইস্তিসফার) ব্যবহার করবে এবং সালাত আদায় করবে।”(সুনানে নাসায়ী, হা/৩৫৪)
.
হাদিসটির ব্যাখায় ইমাম মুহাম্মাদ শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
فتلجمي) قال في الصحاح والقاموس: اللجام ما تشد به الحائض ، قال الخليل : معناه افعلي فعلا يمنع سيلان الدم ، واسترساله ، كما يمنع اللجام استرسال الدابة .وأما الاستثفار: فهو أن تشد فرجها بخرقة عريضة ، تُوثِق طرفيها في حقب تشده في وسطها، بعد أن تحتشي كرسفا، فيمنع ذلك الدم “
“ফাতালজামি শব্দ সম্পর্কে আস সিহাহ ও আল কামুস গ্রন্থে বলা হয়েছে: লিজাম হলো এমন একটি বাঁধন যা ঋতুমতী নারী ব্যবহার করে। খলীল বলেছেন: এর অর্থ হলো এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যা রক্তের প্রবাহ ও ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করে দেয়, যেমন লাগাম পশুর চলাচলকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর ইস্তিসফার হলো,নারী তার লজ্জাস্থানে একটি চওড়া কাপড় বেঁধে নেবে। কাপড়ের দুই প্রান্ত কোমরে বাঁধা একটি বেল্ট বা ফিতার সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রাখবে। এর আগে সে তুলা ব্যবহার করবে। এতে রক্ত বের হওয়া বন্ধ বা কমে যাবে।”(শাওকানী;নায়লুল আওতার ১/৩৪৩)
.
ইমাম খাত্ত্বাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
” وفيه من الفقه أن المستحاضة يجب عليها أن تستثفر، وأن تعالج نفسها بما يسد المسلك ويرد الدم، من قطن ونحوه ، كما قال في حديث حمنة : (أنعت لك الكرسف) وقال لها : (تلجمي واستثفري) .
“এই হাদিস থেকে একটি ফিকহি বিধান জানা যায় যে, ইস্তিহাযা আক্রান্ত নারীর জন্য ইস্তিসফার করা আবশ্যক। অর্থাৎ সে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে যা রক্ত বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখে এবং রক্তকে প্রতিহত করে। যেমন: তুলা বা অনুরূপ কোনো বস্তু ব্যবহার করা। যেমন হামনা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) এর হাদিসে নবী (ﷺ) তাকে বলেছিলেন: আমি তোমাকে তুলা ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছি এবং আরও বলেছিলেন: লাগামের মতো বেঁধে নাও এবং ইস্তিসফার করো।”(মাআলিমুস সুনান: ১/৭৪]
.
উপরোক্ত হাদীসসমূহ ও সেগুলোর ব্যাখ্যার আলোকে একদল আলেম এ মূলনীতি গ্রহণ করেছেন যে, ঋতুস্রাবের রক্ত নিয়ন্ত্রণ করা বা বাইরে ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার করা বৈধ। এ দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু আলেম—বিশেষত বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে—“মেন্সট্রুয়াল কাপ” ব্যবহারেরও অবকাশ উল্লেখ করেছেন; তবে শর্ত হলো, এতে যেন কোনো শারীরিক ক্ষতি, চিকিৎসাগত জটিলতা বা শরীয়তবিরোধী বিষয় না থাকে। ঋতুস্রাবের রক্ত বাইরে নির্গত হওয়া বা উপচে পড়া প্রতিরোধে উপযুক্ত মাধ্যম ব্যবহার করে সেই স্থান সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এ বাণীর অন্তর্ভুক্ত বলেও বিবেচিত হতে পারে: “তোমরা তোমাদের দুনিয়াবী বিষয়গুলো সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত।” —(সহীহ মুসলিম, হা/২৩৬৩)। তাই এ ধরনের বিষয়ে ডাক্তারের পরামর্শ, মানুষের অভিজ্ঞতা, প্রচলিত ব্যবহার এবং উদ্দেশ্য পূরণে যে মাধ্যম অধিক কার্যকর, নিরাপদ ও উপযোগী বলে বিবেচিত হয়, তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে অপর একদল আলেমের মতে, যেহেতু মেন্সট্রুয়াল কাপ লজ্জাস্থানের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে ব্যবহার করতে হয়, তাই নারীদের জন্য তা ব্যবহার করা মাকরূহ; কারণ এতে হস্তমৈথুন সদৃশ অনুভূতি বা যৌন উত্তেজনার আশঙ্কা থাকতে পারে। পাশাপাশি বাস্তব দিক থেকেও এ উপকরণ কতটুকু নিরাপদ এবং এতে কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে কি না—তা নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা, চিকিৎসাবিষয়ক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞ মতামতের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে চিকিৎসকদের মাঝেও মতভেদ রয়েছে। কিছু বিশেষজ্ঞ নারী চিকিৎসক সম্ভাব্য কয়েকটি ক্ষতির দিক উল্লেখ করেছেন; যেমন—এটি কুমারী মেয়েদের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে, প্রজনন অঙ্গে সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে এবং অন্যান্য প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় জীবাণু ও দূষণের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে। অন্যদিকে অধিকাংশ নারী মাসিক চলাকালীন সময়ে স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করে থাকেন এবং চিকিৎসকদের মতে এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত। তাই অনেক আলেমের মতে, যখন নিরাপদ ও সহজ বিকল্প হিসেবে স্যানিটারি প্যাড বিদ্যমান রয়েছে, তখন মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহার থেকে বিরত থাকাই অধিক সতর্কতাপূর্ণ ও উত্তম; বিশেষত এতে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি বা কুমারিত্বের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে।(এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৩১৩২২৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: