উপযুক্ত বয়স হওয়ার পরেও নারীদের অবিবাহিত থেকে যাওয়ার কিছু কারণ

প্রিয় পাঠক! এখানে আমরা সব নারীকে উদ্দেশ্য করছি না। এমন অনেক বোন রয়েছেন, যারা উপযুক্ত বয়স থেকেই আন্তরিকভাবে বিবাহিত জীবন কামনা করেন; কিন্তু বিভিন্ন বাস্তব ও অনিবার্য কারণে এখনো তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়নি। এ ক্ষেত্রে তাদের কোনো দোষ দিচ্ছি না।তবে এমন কিছু নারীও রয়েছেন, যারা বিবাহের উপযুক্ত বয়সে পৌঁছার পর শরী‘আতসম্মত ও উপযুক্ত কোনো পাত্রের প্রস্তাব এলে অযৌক্তিক প্রত্যাশা, অতিরিক্ত শর্ত, পারিবারিক বা সামাজিক চাপ কিংবা অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণে একের পর এক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে থাকেন। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপযুক্ত সুযোগগুলো হাতছাড়া হয়ে বিবাহ বিলম্বিত হতে থাকে। এমন কিছু কারণ উদাহরণসহ তুলে ধরা হলো:
১. কিছু সংখ্যক নারী উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করার জন্য বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
.
২. বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার জন্য বিয়ে প্রত্যাখ্যান করে।
.
৩. বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেননি—এমন পুরুষকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে।
.
৪. চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত বিয়ে করতে অস্বীকার করে।
.
৫. চাকরি করেন না—এমন পুরুষকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে।
.
৬. নিজের চেয়ে কম শিক্ষিত পুরুষকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে।
.
৭. নিজের চেয়ে কম সম্পদশালী পুরুষকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে।
.
৮. নিজের চেয়ে কম সুদর্শন পুরুষকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে।
.
৯. নিজের চেয়ে কম বংশমর্যাদার পুরুষকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে।
.
১০. নিজের শহরের বাইরে ভিন্ন শহরের কাউকে বিবাহ করতে অস্বীকার করে।
.
১১. নিজের দেশের বাইরের কাউকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে।
.
১২. পাত্রের আয়, বাড়ি, গাড়ি, জীবনযাপন ও সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে এমন উচ্চ প্রত্যাশা রাখে, যা তার নিজের ও পারিবারিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
.
১৩. পাত্রের দ্বীনদারি ও উত্তম চরিত্রের চেয়ে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, পদবি, পেশা, আয় বা সামাজিক পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়।
.
১৪. শুধুমাত্র বাহ্যিক সৌন্দর্য, শারীরিক গঠন বা চেহারাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে দ্বীনদারি ও উত্তম চরিত্রের উপযুক্ত পাত্রকে প্রত্যাখ্যান করে।
.
১৫. পাত্রের সামান্য কোনো দুর্বলতা বা অপূর্ণতা দেখলেই তার অন্যান্য ভালো গুণগুলো বিবেচনা না করে সম্পূর্ণ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
.
১৬. বিয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরিপূর্ণতা (পারফেকশন) খুঁজতে গিয়ে এমন প্রত্যাশা তৈরি করে যে, বাস্তবে প্রায় কোনো পাত্রই তার সব শর্ত পূরণ করতে পারে না।
.
এভাবেই একসময় তার বয়স ৩০ বছর হয়ে যায়, কিন্তু তখনও তার বিয়ে হয়নি।
.
১৭. পূর্বে বিবাহিত এবং বর্তমানে বিচ্ছিন্ন এমন কাউকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে।
.
১৮. বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে কিন্তু সন্তান রয়েছে—এমন পুরুষকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে।
.
১৯. নিজের চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় এবং বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে—এমন পুরুষকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে।
.
২০. বিবাহিত পুরুষকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে এবং বহুবিবাহও প্রত্যাখ্যান করে।
.
২১. এক বা একাধিক (সর্বোচ্চ তিনজন) স্ত্রী রয়েছে—এমন পুরুষকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে।
.
২২. নিজের জন্য আলাদা বাসস্থান ও ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে পারবে না—এমন পুরুষকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে।
.
২৩. প্রায় ৬০ বছর বয়সী কোনো পুরুষকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে।
.
এভাবে একসময় তার বয়স ৪০ বছর হয়ে যায়, তবুও তার বিয়ে হয় না।
.
২৪. বান্ধবী, আত্মীয়স্বজন বা সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে নিজের সম্ভাব্য পাত্রকে তুলনা করে ছোটখাটো পার্থক্যকেও বড় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
.
২৫. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নাটক-সিনেমা বা কল্পনাপ্রসূত গল্পের কারণে জীবনসঙ্গী সম্পর্কে অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি করে এবং বাস্তব জীবনের উপযুক্ত পাত্রদের প্রত্যাখ্যান করে।
.
২৬. ‘আরও ভালো পাত্র হয়তো পরে আসবে’—এই আশায় বর্তমানে পাওয়া উপযুক্ত প্রস্তাবগুলো বারবার প্রত্যাখ্যান করতে থাকে।
.
২৭. পাত্রের পরিবার, বাড়ি, শহর, পেশা বা জীবনযাপনের কিছু পার্থক্যকে অযথা বড় করে দেখে তার দ্বীনদারি, চরিত্র ও দায়িত্বশীলতার বিষয়টি উপেক্ষা করে।
.
২৮. বিয়ের পর নিজের স্বাধীনতা, পেশা, জীবনযাপন বা ব্যক্তিগত পছন্দে পরিবর্তন আসতে পারে—এই আশঙ্কায় উপযুক্ত প্রস্তাবও বারবার প্রত্যাখ্যান করে।
.
২৯. নিজের পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে একের পর এক উপযুক্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়, অথচ নিজের পক্ষ থেকে বিষয়টি বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়ন করা হয় না।
.
৩০. অভিভাবক ও বিশ্বস্ত অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধুমাত্র নিজের ধারণা, আবেগ বা বন্ধুদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে বিবাহের সিদ্ধান্ত নেয়।
.
৩১. উপযুক্ত পাত্রের ব্যাপারে যথাযথভাবে খোঁজখবর ও পরামর্শ না নিয়েই কেবল প্রথম দেখায় বা সামান্য কোনো তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।
.
৩২. বিয়ের বিষয়ে অতীতের কোনো ব্যর্থ প্রস্তাব বা তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে পরবর্তীতে আসা ভালো প্রস্তাবগুলোকেও একই দৃষ্টিতে দেখে প্রত্যাখ্যান করে।
.
৩৩. নিজের বয়স, পারিবারিক বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিবেচনা না করে দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের কঠোর শর্ত বজায় রাখে।
.
৩৪. পুরুষ নামের বিষয়টিই তার কাছে অপছন্দনীয় হয়ে যাওয়ায় বিয়ে করতে অস্বীকার করে।
.
৩৫. সে মনে করে, নারীর বিয়ে করতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
.
অবশেষে তার বয়স ৫০ বছরে পৌঁছে যায়। তখন সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট খুলে যেকোনো পুরুষের কাছে বিয়ের জন্য নিজেকে উপস্থাপন করতে শুরু করে। কিন্তু তখন! হায়, হায়, হায়! করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।
.
অতএব, প্রত্যেক বোনের প্রতি আমাদের পরামর্শ:
প্রিয় বোন! বিবাহের ক্ষেত্রে অযৌক্তিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অতিরিক্ত শর্ত কিংবা সামাজিক মর্যাদার অমূলক প্রত্যাশাকে প্রাধান্য না দিয়ে শরী‘আতের নির্দেশনা, বাস্তবতা ও নিজের পরিস্থিতি বিবেচনা করুন। পাত্রের সম্পদ, সৌন্দর্য, বংশ, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থানের চেয়ে তার দ্বীনদারি, উত্তম চরিত্র, দায়িত্বশীলতা ও সামর্থ্যকে অধিক গুরুত্ব দিন। উপযুক্ত কোনো প্রস্তাব এলে সামান্য পার্থক্য বা অযৌক্তিক প্রত্যাশার কারণে তা দ্রুত প্রত্যাখ্যান না করে অভিভাবক ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিয়ে ভেবে দেখুন।মনে রাখবেন,সুযোগ সবসময় একইভাবে ফিরে আসে না এবং বয়স ও পরিস্থিতির সঙ্গে বিবাহের সম্ভাবনাও পরিবর্তিত হতে পারে। তবে বিবাহ বিলম্বিত হওয়া বা উপযুক্ত পাত্র না পাওয়া কোনো নারীর অপরাধ কিংবা অসম্মানের বিষয় নয়; বরং আল্লাহর ফয়সালার ওপর ভরসা রেখে বৈধ ও উপযুক্ত উপায়ে চেষ্টা করে যাওয়া একজন মুমিনার কর্তব্য। তাই অতিরিক্ত প্রত্যাশার কারণে বাস্তব ও উপযুক্ত সুযোগগুলো অকারণে হাতছাড়া না করে বিচক্ষণতা, বিনয় ও ভারসাম্যের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিন।আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:إِذَا أَتَاكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ خُلُقَهُ وَدِينَهُ فَزَوِّجُوهُ إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ“তোমাদের নিকট এমন কোনো ব্যক্তি বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে এলে যার চরিত্র ও দ্বীনদারিতা সম্পর্কে তোমরা সন্তুষ্ট, তার সঙ্গে (তোমাদের মেয়েদের) বিবাহ দাও। তোমরা যদি তা না করো, তাহলে পৃথিবীতে বিপর্যয় ও ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে।”(তিরমিজি, হা/১০৮৪; ইবনে মাজাহ, হা/১৯৬৭; সিলসিলা সহীহা, হা/১০২২) (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: