ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত হলো ইসলামের সেই অবিভাজ্য ও শাশ্বত মূলধারা, যা মূলত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের প্রদর্শিত পন্থার ওপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। কিয়ামত অবধি নাজাতপ্রাপ্ত এই জামাআত সম্পর্কে নবীজি (ﷺ) ইরশাদ করেছেন যে, তিনি এবং তাঁর সাহাবীগন যে আদর্শের ওপর আছেন, যারা তার অনুসরণ করবে তারাই হবে মুক্তিপ্রাপ্ত। সুতরাং এটি কোনো সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী নয়, বরং কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ মর্মার্থ এবং সাহাবীদের কর্মপদ্ধতির সমন্বয়ে গঠিত এক ভারসাম্যপূর্ণ আদর্শিক ধারা; যার মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো অনুধাবন করা প্রতিটি মুমিনের ঈমানী চেতনার জন্য অপরিহার্য। আর এই প্রেক্ষাপটে আশআরী মতবাদ সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো স্পষ্ট করা জরুরি:
.
(১).আহলুস সুন্নাহ’র আকীদার একটি সুস্পষ্ট মূলনীতি রয়েছে, যা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত এবং ওহীর দলীলসমূহকে সালাফদের বুঝ অনুযায়ী গ্রহণ করে।
.
(২).আহলুস সুন্নাহ তারাই, যারা বিশুদ্ধ আকীদাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছেন এবং এর ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ততক্ষণ পর্যন্ত আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না, যতক্ষণ না তারা এই আকীদা সম্পর্কে গভীর প্রজ্ঞা অর্জন করে একে বুদ্ধি, রাজনীতি, ব্যক্তিগত অভিমত ও রুচির ওপর নিরঙ্কুশ প্রাধান্য দেয়। প্রকৃতপক্ষে,যে ব্যক্তি সুন্নাহকে নিজের নেতা, পথপ্রদর্শক ও মানদণ্ড হিসেবে গ্রহন করে, সে আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। আর যে ব্যক্তি সুন্নাহকে নিজের বিবেক, রুচি, মত বা রাজনৈতিক চিন্তা ধারার সাথে মিলিয়ে দেখে এবং সেখান থেকে কেবল সেই অংশই গ্রহণ করে যা তার চিন্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সে আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত নয়। এ কারণেই আকীদার মৌলিক বিষয়গুলোতে সালাফদের মাঝে কোনো মতভেদ দেখা যায়নি বরং তাদের বক্তব্য ও হৃদয়সমূহ ছিল একই সূত্রে গ্রথিত।
.
(৩).এতে কোন সন্দেহ নাই যে, ইমাম আবুল হাসান আশআরীর আকীদা থেকে বর্তমান আশআরীদের বিচ্যুতি ঘটেছে।বলা হয়,আবুল হাসান আশআরী তাঁর জীবনে তিনটি পর্যায় অতিক্রম করেছেন:
.
প্রথম পর্যায়: মু‘তাযিলা মতবাদে অবস্থান, যেখানে তিনি প্রায় চল্লিশ বছর তাঁর শিক্ষক আবু আলী জুব্বায়ীর সান্নিধ্যে ছিলেন।
.
দ্বিতীয় পর্যায়: কুল্লাবিয়া পর্যায়, যেখানে তিনি সাতটি সিফাত সাব্যস্ত করেন এবং আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সিফাত অস্বীকার করেন। এ সময় তিনি আল লামউ ফি রদ্দি আলা আহলিয যাইগ ওয়াল বিদয়ী গ্রন্থ রচনা করেন।
.
তৃতীয় পর্যায়: সুন্নী পর্যায়, যেখানে তিনি পূর্বের বিশ্বাস থেকে ফিরে এসে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলের আকীদা গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি আল ইবানাহ,মাকালাতুল ইসলামিয়া, রিসালাতু ইলা আহলিস সাগর প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন এবং এ আকীদার উপরই মৃত্যুবরণ করেন। অথচ আশআরীরা তাঁর মধ্যবর্তী পর্যায়কেই গ্রহণ করে সেটির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।
.
(৪).আশআরীরা বহু বিষয়ে সালাফদের মতবাদের বিরোধিতা করেছে। যেমন: মুকাল্লাফ ব্যক্তির উপর সর্বপ্রথম ওয়াজিব কী?,আল্লাহর খবরী ও ইখতিয়ারী সিফাতসমূহের ব্যাপারে তাদের অবস্থান, আল্লাহর কালামে হরফ ও শব্দ অস্বীকার করা, আখিরাতে আল্লাহকে দেখার বিষয়ে তাদের মত, এবং আকীদার আরও বিভিন্ন বিষয়।
.
(৫).আশআরী ও মাতুরীদীদের মাঝে আকীদাগত প্রায় ডজনখানেক বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কিছু মতভেদ শব্দগত, আর কিছু অর্থগত। অথচ সালাফদের আকীদার ক্ষেত্রে বক্তব্য ছিল এক ও অভিন্ন।
.
(৬). ইতিহাস জুড়ে বহু প্রসিদ্ধ ইমাম আশআরী মতবাদের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, মানুষ সুন্নাহর উপরই ছিল, যতক্ষণ না আবুল হাসান আশআরী ও তাঁর অনুসারীরা আগমন করেন। যেমন: আবু নাসর সিজযী, হারাওয়ী, ইবনু খুয়াইজ মিনদাদ, ইবনু হাজম প্রমুখ, যারা আশআরী মতবাদের সমালোচনা করেছেন। সুতরাং,আশআরী মতাদর্শের অনুসারীদেরকে নিঃশর্তভাবে আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত করা যেমন সঠিক নয়, তেমনি তাদের ভালো কাজগুলোকে অস্বীকার করে সরাসরি সুন্নাহর গণ্ডি থেকে বের করে দেওয়াও ইনসাফপূর্ণ হবে না; বরং তাদের অবস্থা সূরা তাওবার ১০২ নম্বর আয়াতের সেই বর্ণনার মতো, যেখানে ভালো ও মন্দের মিশ্রণ রয়েছে। মূলত আহলুস সুন্নাহ শব্দটি দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়—একটি ব্যাপক অর্থে, যেখানে শিয়া বা খারেজীদের বিপরীতে থাকা আশআরী ও মাতুরিদীসহ সকলকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়; আর অন্যটি সংকীর্ণ বা বিশেষ অর্থে, যেখানে কেবল তারাই অন্তর্ভুক্ত যারা আসমা ওয়াস-সিফাতসহ দ্বীনের মৌলিক বিষয়ে কোনো প্রকার অপব্যাখ্যা ছাড়াই সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীনের বিশুদ্ধ আকিদাকে হুবহু ধারণ করেন। এই দ্বিতীয় সংজ্ঞায় আশআরীদের কিছু আকিদা যেহেতু জাহমিয়া বা মু‘তাযিলাদের সাথে মিলে যায়, তাই তারা এই স্তরে আহলুস সুন্নাহর মূলধারা থেকে বিচ্যুত হিসেবে বিবেচিত হন। সুতরাং আশাআরীরা আহলে সুন্নাহ’র অন্তর্ভুক্ত কিনা এ বিষয়ে আমাদের আলেমগণের অবস্থান হচ্ছে,আহলুস সুন্নাহ’ শব্দটি দুটি ভাবে ব্যবহৃত হতে পারে:
.
(১).ব্যাপক অর্থে, আশআরী শব্দটি যখন শিয়া বা রাফেযী সম্প্রদায়ের বিপরীতে যারা সাহাবায়ে কেরামের খেলাফত ও সুন্নাহর প্রতি অনুগত,এই ক্ষেত্রে,‘আহলুস সুন্নাহ’ শব্দটি আশ‘আরী, মাতুরিদীসহ,মুতাযিলাদেরকও অন্তর্ভুক্ত করে।
.
(২).বিশেষ অর্থে অর্থাৎ আহলুস সুন্নাহ’ শব্দটি অনেক সময় বিদআতীদের বিপরীত শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই অর্থে, এর দ্বারা কেবল তারাই উদ্দেশ্য যারা প্রকৃত সুন্নাহ’র অনুসারী এবং বিশুদ্ধ আকীদার ওপর অবিচল—অর্থাৎ সালাফি ও আহলে হাদীস উলামায়ে কেরাম। এক্ষেত্রে ‘আহলুস সুন্নাহ’ পরিভাষাটি আশআরী বা অন্য কোনো গোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে না; কারণ তারা তাদের আক্বীদার মূলে এমন কিছু নীতি যুক্ত করেছে যা সুন্নাহর পরিপন্থী (যেমন: ইলমুল কালাম)। অনেক মৌলিক বিষয়েই আহলুস সুন্নাহর (সালাফিদের) সাথে তাদের স্পষ্ট মতভেদ রয়েছে।উদাহরণস্বরূপ, পরবর্তী যুগের আশআরীরা তাকদীরের বিষয়ে জাবরিয়্যা এবং ঈমানের সংজ্ঞার ক্ষেত্রে মুরজিয়াদের মতাদর্শ পোষণ করত। তারা আল্লাহর অধিকাংশ গুণাবলিকে (সিফাত) অস্বীকার করেছে—কেবল সাতটি সিফাত ছাড়া—এই যুক্তিতে যে, আল্লাহর গুণাবলি কেবল ‘আকল’ বা যুক্তির মাপকাঠিতেই প্রমাণিত হতে হবে। তারা আল্লাহর আরশের ওপর উঠা (ইস্তিওয়া) এবং সৃষ্টির ঊর্ধ্বে তাঁর সুউচ্চ থাকা (উলূ’) অস্বীকার করে।তারা বলে,ঈমান কেবল ‘তাসদিক’ বা অন্তরের বিশ্বাসের নাম; তারা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত করে না…
তারা আরও দাবি করে: ‘আল্লাহ সৃষ্টিজগতের ভেতরেও নেই, বাইরেও নেই; উপরেও নেই, নিচেও নেই।’ এই জাতীয় অসংখ্য মৌলিক পার্থক্যের উপস্থিতিতে আমরা কীভাবে তাদের ‘আহলুস সুন্নাহ’র অন্তর্ভুক্ত বলতে পারি?
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:
فَلَفْظُ “أَهْلِ السُّنَّةِ” يُرَادُ بِهِ مَنْ أَثْبَتَ خِلَافَةَ الْخُلَفَاءِ الثَّلَاثَةِ، فَيَدْخُلُ فِيْ ذَلِكَ جَمِيْعُ الطَّوَائِفِ إِلَّا الرَّافِضَةَ، وَقَدْ يُرَادُ بِهِ أَهْلُ الْحَدِيثِ وَالسُّنَّةِ الْمَحْضَةِ، فَلَا يَدْخُلُ فِيهِ إِلَّا مَنْ يُثْبِتُ الصِّفَاتِ لِلَّهِ تَعَالَى وَيَقُولُ: إِنَّ الْقُرْآنَ غَيْرُ مَخْلُوقٍ، وَإِنَّ اللَّهَ يُرَى فِي الْآخِرَةِ، وَيُثْبِتُ الْقَدْرَ، وَغَيْرَ ذَلِكَ مِنَ الْأُصُولِ الْمَعْرُوفَةِ عِنْدَ أَهْلِ الْحَدِيثِ وَالسُّنَّةِ ‘
“আহলুস সুন্নাহ’ পরিভাষাটি দ্বারা (কখনো) এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বোঝানো হয়, যারা (প্রথম) তিন খলিফার খিলাফতের বৈধতাকে স্বীকার করে। এই অর্থে রাফেযী (শীআ) সম্প্রদায় ছাড়া আর বাকি সকল দলই এর অন্তর্ভুক্ত। আবার কখনো এই পরিভাষাটি দ্বারা কেবল ‘আহলুল হাদীস’ এবং ‘সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসারীদের’ বোঝানো হয়। (এই বিশেষ অর্থে) কেবল তারাই এর অন্তর্ভুক্ত হবে যারা আল্লাহ তাআলার (সিফাত) গুণাবলিকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে এবং ঘোষণা দেয় যে— কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি (মাখলুক) নয়, পরকালে মহান আল্লাহকে সরাসরি দেখা যাবে এবং তারা তাকদীরের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে; সেই সাথে আহলুল হাদীস ও সুন্নাহর নিকট সুপরিচিত আকিদার অন্যান্য মূলনীতিগুলোকেও মেনে চলে।”(সূত্র: মিনহাজুস সুন্নাহ আন-নববিয়্যাহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ২২১)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
” أهل السنة يدخل فيهم المعتزلة ، يدخل فيهم الأشعرية ، يدخل فيهم كل من لم يكفر من أهل البدع ، إذا قلنا هذا في مقابلة الرافضة .لكن إذا أردنا أن نبين أهل السنة ، قلنا : إن أهل السنة حقيقة هم السلف الصالح الذين اجتمعوا على السنة وأخذوا بها ، وحينئذ يكون الأشاعرة والمعتزلة والجهمية ونحوهم : ليسوا من أهل السنة بهذا المعنى “
“আহলুস সুন্নাহ’ শব্দটি যদি রাফেযীদের বিপরীতে ব্যবহৃত হয়, তবে এতে মুতাযিলা, আশ‘আরী এবং এমন অনেক লোক অন্তর্ভুক্ত হবে যারা মুবতাদী, তবে তাদের বিদ‘আত কুফরের পর্যায়ে পৌঁছায় না। তবে যদি আমরা ‘আহলুস সুন্নাহ’ শব্দের প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করতে চাই, তবে আমরা বলব যে, সত্যিকারের আহলুস সুন্নাহ হলো সালাফে সালেহীনগণ, যারা সুন্নাহর অনুসরণে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। এই ক্ষেত্রে, আশ‘আরী, মুতাযিলা, জাহমিয়া ইত্যাদি আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত নয়।”(ইমাম ইবনু উসামীন আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড:১১ পৃষ্ঠা:৩০৬)
.
অপর ফাতাওয়ায় যখন ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:আশআরিরা কি আহলে সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত?
জবাবে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:الأشاعرة من أهل السنة والجماعة فيما وافقوا فيه أهل السنة والجماعة، وهم مخالفون لأهل السنة والجماعة في باب الصفات؛ لأنهم لا يثبتون من صفات الله إلا سبع صفات، ومع هذا لا يثبتونها على الوجه الذي أثبته عليه أهل السنة، فلا ينبغي أن نقول هم من أهل السنة على الإطلاق، ولا أن ننفي عنهم كونهم من أهل السنة على الإطلاق، بل نقول هم من أهل السنة، فيما وافقوا فيه أهل السنة وهم مخالفون لأهل السنة فيما خالفوا فيه أهل السنة.
“আশআরীরা যেসব বিষয়ে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সাথে একমত, সেসব ক্ষেত্রে তারা আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। তবে সিফাতের অধ্যায়ে তারা আহলুস সুন্নাহর বিরোধিতা করেছে। কারণ তারা আল্লাহর সিফাতের মধ্যে মাত্র সাতটি সিফাত সাব্যস্ত করে। তাছাড়া সেগুলোকেও তারা সেই পদ্ধতিতে সাব্যস্ত করে না, যেভাবে আহলুস সুন্নাহ সাব্যস্ত করে। তাই একেবারে নিঃশর্তভাবে তাদেরকে আহলুস সুন্নাহ বলা উচিত নয়, আবার একেবারে নিঃশর্তভাবে তাদেরকে আহলুস সুন্নাহর বাইরে বলাও উচিত নয়। বরং বলা হবে যে বিষয়ে তারা আহলুস সুন্নাহর সাথে একমত, সে বিষয়ে তারা আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত; আর যে বিষয়ে তারা বিরোধিতা করেছে,সে বিষয়ে তারা আহলুস সুন্নাহর বিরোধী।”(ইবনু উসামীন লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-৬)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন,وأما الأشاعرة والماتريدية هل هم من أهل السنة والجماعة؟ أقول: هم من أهل السنة والجماعة في كثير من عقائدهم، ولكن في عقائد أخرى انحرفوا عن أهل السنة والجماعة، إما إلى الجبرية وإما إلى الانعزالية ونحو ذلك “আশআরী ও মাতুরীদীরা কি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত? আমি বলি: তাদের বহু আকীদায় তারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু কিছু আকীদায় তারা আহলুস সুন্নাহ থেকে বিচ্যুত হয়েছে কখনো জাবরিয়াদের দিকে, কখনো মু‘তাযিলাদের দিকে, অথবা এজাতীয় অন্যান্য ভ্রান্ত মতবাদের দিকে।”
.
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে, আশ’আরী মতাদর্শের অনুসারীরা আহলুস সুন্নাহ কি না, তা নির্ভর করে ‘আহলুস সুন্নাহ’ পরিভাষার প্রয়োগের ওপর: অর্থাৎ আহলুস সুন্নাহ’ পরিভাষাটি যদি রাফেযী বা শিয়াদের বিপরীতে ব্যবহৃত হয় তবে আশ’আরীরা এর অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু যদি সালাফে সালেহীনের বিশুদ্ধ আকিদার মাপকাঠিতে বিচার করা হয় তবে আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলির অপব্যাখ্যা ও যুক্তিনির্ভর দর্শনের (ইলমুল কালাম) কারণে তারা সুন্নাহর মূলধারা থেকে বিচ্যুত। তাই ইনসাফপূর্ণ অবস্থান হলো—আশ’আরীরা যেসব বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী সেসব ক্ষেত্রে তারা আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত,আর যেসব বিষয়ে তারা সালাফদের আকিদা ও পদ্ধতির বিরোধিতা করেছে সেসব ক্ষেত্রে তারা আহলুস সুন্নাহর বহির্ভূত; অর্থাৎ তাদেরকে নিঃশর্তভাবে সুন্নাহর অনুসারী বা পুরোপুরি সুন্নাহর বাইরে—কোনোটিই বলা সঠিক নয়। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি সৌদি আরব।