কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

রুকু থেকে উঠার পরে বুকে হাত বাঁধতে হবে কিনা

সালাতে রুকু থেকে উঠার পর পুনরায় হাত বাঁধতে হবে কিনা এটি নিয়ে হাদীসের কিতাবে সুস্পষ্ট করে কোন বিশুদ্ধ বর্ণনা নেই। তাই এই মাসালায় আহালুল ইমামগনের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। একদল আলেম বলেছেন রুকু থেকে উঠার পর পুনরায় হাত বাঁধতে হবে। তারা দলিল হিসেবে ওয়ায়েল বিন হুজ্র ও সাহল বিন সাদ (রাঃ) বর্ণিত সালাতে বাম হাতের উপরে ডান হাত রাখার ‘আম’ হাদীসের উপরে ভিত্তি করে রুকূর আগে ও পরে ক্বওমা-র সময় বুকে হাত বাঁধার কথা বলেছেন। (দেখুন সহীহ মুসলিম, বুখারী, মিশকাত হা/৭৯৭,৭৯৮)
.
বিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, সৌদি ফাতাওয়া বোর্ডের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী, শাইখুল ইসলাম, ইমাম আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] এবং আরেক শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] ওয়ায়েল বিন হুজ্র ও সাহল বিন সাদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত সালাতে বাম হাতের উপরে ডান হাত রাখার ‘আম’ হাদীসের উপরে ভিত্তি করে বলেছেন, সালাতে রুকূর আগের কিয়ামে হাত বুকের উপর, রুকূ অবস্থায় হাঁটুর উপর, সিজদাহ অবস্থায় চেহারার দুই পাশে মুসাল্লায়, বসা অবস্থায় হাঁটু বা রানের উপর রাখার ব্যাপারে দলীল স্পষ্ট। কি­ন্তু রুকুর পর কওমার অবস্থায় হাত কোথায় থাকবে সে ব্যাপারে কোন প্রত্যক্ষ ও স্পষ্ট দলীল সুন্নাহতে নেই। অতএব অস্পষ্ট দলীলকে ভিত্তি করে বলা যায়, এই কিয়াম (কওমাহ্‌) ও ঐ কিয়ামেরই মত। তাই উভয় অবস্থায় বুকে হাত বাঁধা সুন্নত। (দেখুন ইবনে বায, মাজমূআতু রাসাইল ফিস স্বালাহ্‌, ১৩৪পৃ:, ইবনে উসাইমীন, মুমতি ৩/১৪৬)
.
অপরদিকে আরেকদলের আলেমগন বলেন রুকু থেকে উঠার পর উভয় হাত স্বাভাবিকভাবে ছেড়ে দেওয়াই সুন্নাতসম্মত। কেননা রুকুর পরে পুনরায় বুকে হাত বাঁধার স্পষ্ট কোন দলীল পাওয়া যায় না। তারা দলিল হিসবে বিখ্যাত সাহাবী আবু হুমায়েদ সাঈদী (রাঃ) যিনি ১০ জন সাহাবীর সম্মুখে রাসূল (ﷺ)-এর সালাতের নমুনা প্রদর্শন করে সত্যায়ন প্রাপ্ত হয়েছিলেন, সেখানে বলা হয়েছে- فَإِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ اسْتَوَى حَتَّى يَعُوْدَ كُلُّ فَقَارٍ مَكَانَهُ- ‘তিনি রুকূ থেকে মাথা উঠিয়ে সোজা দাঁড়িয়ে গেলেন এমনভাবে যে, মেরুদন্ডের জোড় সমূহ স্ব স্ব স্থানে ফিরে আসে।’(সহীহ বুখারী, মিশকাত হা/৭৯২)।অপর বর্ননায় সালাতে ভুলকারী (مسيئ الصلاة) জনৈক ব্যক্তিকে রাসূল (ﷺ) কর্তৃক হাতে-কলমে সালাত শিখানোর প্রসিদ্ধ হাদীসে এসেছে حَتَّى تَرْجِعَ الْعِظَامُ إِلَى مَفَاصِلِهَا ‘যতক্ষণ না অস্থি সমূহ স্ব স্ব জোড়ে ফিরে আসে।'(তিরমিযী, নাসাঈ, মিশকাত হা/৮০৪)।
.
বিগত শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খি.) সহ একদল আলেম বলেছেন, রুকূ থেকে মাথা উঠিয়ে সোজা দাঁড়িয়ে যাওয়ার হাদীসগুলি রুকূ পরবর্তী ‘ক্বওমা’র অবস্থা সম্পর্কে ‘খাছ’ ভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া বুকে হাত বাঁধার বিষয়টি হাতের স্বাভাবিক অবস্থার পরিপন্থী। এক্ষণে মেরুদন্ড সহ দেহের অন্যান্য অস্থি সমূহকে স্ব স্ব জোড়ে ফিরে আসতে গেলে ক্বওমার সময় হাতকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ছেড়ে দেওয়াটাই সহীহ হাদীস সমূহের যথাযথ অনুসরণ বলে অনুমিত হয়। (বিস্তারিত দেখুন, আলবানী, ছিফাতু ছালা-তিন্নবী, পৃঃ ১২০ টীকা, ‘ক্বওমা দীর্ঘ করা’ অনুচ্ছেদ; আলবানী, মিশকাত হা/৮০৪ টীকা,সালাতের বিবরণ’ অনুচ্ছেদ-১০; মুহিববুল্লাহ শাহ রাশেদী সিন্ধী, নায়লুল আমানী (করাচী তাবি) পৃঃ ১-৪২)
.
সালাতে রুকু থেকে উঠার পর পুনরায় হাত বাঁধতে হবে কিনা ব্যাপারটি স্পষ্ট দলীল-ভিত্তিক নয় বলেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মহান ইমাম, শাইখুল ইসলাম আবু আব্দুল্লাহ আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন হাম্বাল আশ-শাইবানী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ২৪১ হি.] বলেছেন, সালাত আদায়কারীর ইচ্ছা হলে রুকূর পর উঠে নিজেরহাত দু’টিকে ছেড়ে রাখবে, নচেৎ চাইলে বুকের উপর রাখবে।’(মাসাইলু আহমাদ, সালেহ্‌ বিন ইমাম আহমাদ ২/২০৫, ফুরু’ ১/৪৩৩, মুবদি’ ১/৪৫১, ইনসাফ ২/৬৩, শারহু মুন্তাহাল ইরাদাত ১/১৮৫, আলমুমতে’,শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উসাইমীন ৩/১৪৬ সালাতে মুবাশ্বির)
.
পরিশেষে, প্রিয় পাঠক, উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে সালাতে রুকু থেকে উঠার পর পুনরায় হাত বাঁধতে হবে কিনা বিষয়টি বিতর্কিত; তাই ফায়সালা ইজতিহাদের উপর। আর “মুজতাহিদ (আলেম) যখন ইজতিহাদ করে (কোন বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর চেষ্টা করে) এবং সে যদি সঠিকতায় পৌঁছে যায়, তখন তার ডাবল সওয়াব লাভ হয়। কিন্তু ইজতিহাদ করে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছলেও তার (গুনাহ হয় না, বরং) একটি সওয়াব লাভ হয়। এ ব্যাপারে কেউই অপরাধী নয়। (সহীহ বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৩৭৩২)। তাছাড়া একটি ঘটনা সবারই জানা খন্দকের যুদ্ধ শেষে যখন নবী (ﷺ) ফিরে এলেন, তখন তিনি আমাদেরকে বললেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ যেন বনী কুরাইযাহ্‌ ছাড়া অন্য স্থানে (আসরের) নামায না পড়ে।” পথে চলতে চলতে আসরের সময় উপস্থিত হল। একদল বলল, সেখানে না পৌঁছে আমরা নামায পড়ব না। (কারণ, তিনি সেখান ছাড়া অন্য স্থানে নামায পড়তে নিষেধ করেছেন।) অপর দল বলল, বরং আমরা পথেই নামায পড়ে নেব। কারণ, নামাযের সময় এসে উপস্থিত হয়েছে। তাছাড়া তাঁর উদ্দেশ্য এই ছিল না যে, আসরের সময় হলেও আমরা নামায পড়ব না। (বরং তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, আমরা যেন তাড়াতাড়ি বনী কুরাইযায় পৌঁছে যাই, যাতে সেখানে গিয়ে আসরের সময় হয়। ফলে প্রথম দল পথিমধ্যে নামায পড়ল না। আর দ্বিতীয় দল পড়ে নিল।) অতঃপর নবী (ﷺ) এর নিকট ঘটনাটি খুলে বলা হলে তিনি কোন দলকেই ভর্ৎসনা করলেন না। (সহীহ বুখারী ৯৪৬)ঠিক তেমনি রুকু থেকে দাড়ানোর পর হাত বাঁধার ব্যাপারটিও অনুরুপ ইজতিহাদী পর্যায়ের। তাছাড়া রুকু থেকে দাড়িয়ে পূনরায় হাত বাঁধা না বাঁধার উক্ত বিষয়টি সালাতের মধ্যেকার সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়। অতএব এ বিষয়ে সকল প্রকার বাড়াবাড়ি দলাদলি হতে বিরত থেকে যার কাছে যেটা সঠিক মনে হয় সে সেভাবেই আমল করতে পারেন উভয়েরই সুন্নত আদায় হয়ে যাবে।ইনশাআল্লাহ। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
__________________
উপস্থাপনা:
জুয়েল মাহমুদ সালফি।