কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝড় তুফানের সময় মহান আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন এবং নিম্নলিখিত দোয়া গুলো পাঠ করুন

ভূমিকা: প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভূমিকম্প, ঝড়-তুফানসহ যাবতীয় বালা মুসিবত মূলত আমাদের কৃতকর্মের ফল। আল্লাহ বলেন, তোমাদের যেসব বিপদাপদ স্পর্শ করে, সেগুলি তোমাদের কৃতকর্মের ফল (সূরা শূরা,
৪২/৩০) আল্লাহ অপর আয়াতে বলেন,মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সাগরে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে; ফলে তিনি তাদেরকে তাদের কোন কোন কাজের শাস্তি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে (সূরা রুম:৪১) আল্লাহ আরো বলেন,“আল্লাহ যদি মানুষকে তাদের সীমালংঘনের জন্য শাস্তি দিতেন তবে ভূপৃষ্ঠে কোন জীব-জন্তুকেই রেহাই দিতেন না; কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন।” (সূরা আন-নাহল: ৬১)আল্লাহ আরো বলেন, রেহাই দিতেন না, কিন্তু তিনি এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দিয়ে থাকেন।” (সূরা ফাতির: ৪৫) সুতরাং বালা-মুসিবতের সময় ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং তার জন্য সওয়াবের আশা পোষণ করতে হবে। সেই সাথে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে এবং তাঁর নিকটে তওবা করতে হবে। কেননা কুরআন ও হাদীস প্রমাণ করে যে, মানুষের গোনাহের কারণেই বিপদ-মুসিবত আপতিত হয় এবং তওবা ব্যতীত তা দূরীভূত হয় না। সুতরাং মানুষকে বেশী বেশী তওবা করতে হবে। দুনিয়াতে আমরা যে বিপদে-আপদে পতিত হই, তা থেকে পরিত্রাণের জন্য বা সেগুলো হালকা হওয়ার জন্য মুসিবত দূরীভূত হওয়ার উপায়সমূহ অবলম্বন করা উচিত।আল্লাহ বান্দাকে তওবার নির্দেশ দিয়ে বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا تُوْبُوْا إِلَى اللهِ تَوْبَةً نَّصُوْحاً- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট খাঁটি তওবা কর’ (সূরা তাহরীম ৬৬/৮)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, وَاسْتَغْفِرُوْا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوْبُوْا إِلَيْهِ ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট গুনাহ মাফ চাও এবং তাঁর দিকে ফিরে এসো’ (সূরা হূদ ১১/৯০)।
.
ঝড়-তুফান এবং আকাশে মেঘ দেখলে রাসূল (ﷺ)-এর অবস্থা কেমন হত ঘটনা বর্ননা করে আম্মাজান আয়িশাহ বলেন,আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মুখমণ্ডল বিবর্ণ হয়ে যেত। তিনি বিপদের ভয়ে একবার বের হয়ে যেতেন। আবার প্রবেশ করতেন। কখনো সামনে আসতেন। কখনো পেছনে সরতেন। বৃষ্টি শুরু হলে তার উৎকণ্ঠা কমে যেত। বর্ণনাকারী বলেন, একবার আয়িশাহ্ (রাঃ)-এর কাছে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এ উৎকণ্ঠা অনুভূত হলে তিনি তাঁর নিকট এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, হে ‘আয়িশাহ্। এ ঝড়ো হাওয়া এমনতো হতে পারে যা “আদ জাতি ভেবে ছিল। আল্লাহ তা’আলা কুরআনে বলেন, “তারা যখন একে তাদের মাঠের দিকে আসতে দেখল, বললো, এটা তো মেঘ। আমাদের ওপর পানি বর্ষণ করবে” (সূরাহ আল আহকাফ ৪৬: ২৪)। অন্য এক বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বাভাবিক বৃষ্টি দেখলে বলতেন, এটা আল্লাহর রহমাত (সহীহ: বুখারী ৪৮২৯, মুসলিম ৮৯৯ (১৫), সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী ৬৪৬৩, সহীহ আল কালিমুত্ব ত্বইয়্যিব ১৫৫, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর ৪৭৫৩, মিশকাতুল মাসাবিহ ১৫১৩)
.
সুতরাং ঝড়-তুফান, আযাব-গযব ও বিপদাপদ থেকে রক্ষার অন্যতম উপায় হচ্ছে আল্লাহর নিকটে বিনীতভাবে দো‘আ করা। কাকুতি-মিনতি সহকারে তাঁর নিকটে পাপ থেকে ক্ষমা চাওয়া এবং তাঁর সন্তোষ কামনা করা। তাহ’লে আল্লাহ দো‘আ কবুল করবেন এবং পাপীদেরকে ধ্বংস করবেন না। সুতরাং ঝড় তুফানের সময় বায়ুপ্রবাহকে গালি না দিয়ে মহান আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে নিন্মলিখিত দু’আ পড়তে হবে। যেমন:
.
(১). উবাই ইবনে কা‘ব (রাঃ) বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, বাতাসকে গালি দিয়োনা, বরং তোমরা অপসন্দনীয় কিছু দেখলে বল-

اللَّهُمَّ إِنَّا نَسْأَلُكَ مِنْ خَيْرِ هَذِهِ الرِّيْحِ وَخَيْرِ مَا فِيْهَا وَخَيْرِ مَا أُمِرَتْ بِهِ وَنَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ هَذِهِ الرِّيْحِ وَشَرِّ مَا فِيْهَا وَشَرِّ مَا أُمِرَتْ بِهِ-
অনুবাদ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকা মিন খাইরি হাযিহির রীহি অখাইরি মা ফীহা অখাইরি মা উমিরাত বিহ। অনাঊযু বিকা মিন শার্রি হাযিহির রীহি অশার্রি মা ফীহা অশার্রি মা উমিরাত বিহ।’

অর্থ: হে আল্লাহ! আমরা তোমার কাছে এ বাতাসের কল্যাণ দিক কামনা করছি। এতে যে কল্যাণ নিহিত রয়েছে তা এবং যে জন্য তাকে হুকুম দেয়া হয়েছে তার ভাল দিক চাই। আমরা তোমার কাছে পানাহ চাই, এ বাতাসের খারাপ দিক হতে। যত খারাপ এতে নিহিত রয়েছে তা হতেও। এ বাতাস যে জন্য নির্দেশিত হয়েছে তার মন্দ দিক হতেও। (তিরমিযী ২২৫২, সিলসিলা সহীফা ২৭৫৬, মিশকাত হা/১৫১৮)।
.
(২). ঝড়-তুফানের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুখের আকৃতি পরিবর্তন হয়ে যেত এবং তিনি বিভিন্ন দো‘আ পড়তেন।
.
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন ঝড়-তুফান চলা কালে আল্লাহর রাসূল এই দুআ করতেন,
,اللَّهُمَّ إِنِّى أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا فِيهَا وَخَيْرَ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا فِيهَا وَشَرِّ مَا أُرْسِلَتْ بِهِ-
অর্থ :হে আল্লাহ আমি তোমার নিকট এ ঝড়ের কল্যাণ কামনা করছি। যে কল্যাণ রয়েছে এর মধ্যে এবং যে কল্যাণ পাঠানো হয়েছে এর সাথে। আর তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি এ ঝড়ের অকল্যাণ হ’তে। যে অকল্যাণ এর মধ্যে রয়েছে এবং যে অকল্যাণ দ্বারা একে পাঠানো হয়েছে (সহীহ বুখারী ৪৮২৯, সহীহ মুসলিম ৮৯৯, তিরমিযী ৩২৫৭, মিশকাত হা/১৫১৩)।
.
(৩). প্রিয় নবী রাসূল (ﷺ) অবিরাম বৃষ্টির সময় বলতেন,
.
اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلَا عَلَيْنَا اللَّهُمَّ عَلَى الْآكَامِ وَالظِّرَابِ وَبُطُونِ الْأَوْدِيَةِ وَمَنَابِتِ الشَّجَرِ
আল্লা-হুম্মা হাওয়া-লাইনা ওয়া লা ‘আলাইনা, আল্লা-হুম্মা ‘আলাল আকা-মি ওয়াল্ জিবা-লি ওয়াল্ উজা-মি ওয়ায্ যিরা-বি ওয়াল্ আওদিইয়াতি ওয়া মানা-বিতিশ্ শাজারি

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমাদের আশে-পাশে বৃষ্টি বর্ষণ কর, আমাদের উপরে করো না। হে আল্লাহ! টিলা, পাহাড়, উচ্চভূমি, মালভূমি, উপত্যকা এবং বনাঞ্চলে বর্ষণ কর’ (বুখারী হা/১০১৪; মিশকাত হা/৫৯০২)।
.
(৪). আব্দুল্লাহ ইবনু যুবায়ের (রাঃ) যখন মেঘের গর্জন শুনতেন কথাবার্তা বন্ধ করে দিতেন। দিয়ে নিম্নের দো‘আটি পাঠ করতেন-
.
سُبْحَانَ الَّذِي يُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ وَالْمَلَائِكَةُ من خيفته.
অনুবাদ: ‘সুবহা-নাল্লাযী ইয়ুসাবিবহুর রা‘দু বিহামদিহী ওয়াল মালা-ইকাতু মিন খী-ফাতিহি’ ‘মহা পবিত্র সেই সত্তা যাঁর গুণগান করে বজ্র ও ফেরেশতামন্ডলী তার ভয়ে’(সূরা রা‘দ ১৩/১৩)। অতঃপর বলতেন এটা পৃথিবীবাসীর জন্য কঠিন ধমকি স্বরূপ (আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৭২; আল-আছারুস সহীহাহ হা/৬৮৯; মিশকাত হা/১৫২২,)।
.
(৫). ইবনে আব্বাস (রাঃ) বজ্রধ্বনি শুনতে পেলে বলতেনঃ
.
سُبْحَانَ الَّذِي سَبَّحْتَ لَهُ،
“মহাপবিত্র সেই সত্তা বজ্রধ্বনি যাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করলো”। তিনি বলেন, বজ্রধ্বনিকারী হলেন একজন ফেরেশতা। তিনি মেঘমালাকে হাঁকিয়ে নিয়ে যান, যেমন রাখাল তার মেষপালকে হাঁকিয়ে নিয়ে যায়। (আদাবুল মুফরাদ হাদিস নং ৭২৭)
.
উল্লেখ্য যে, সমাজে প্রচলিত আছে ঝড়-তুফানের সময় (হাইয়াল আছ্ছালা ও হাইয়াল আলফালা বাদ দিয়ে) আযান দেওয়া হলে ঝড় কমে যায় কিন্তু ইসলামি শরীয়তে রাসূল(ﷺ) থেকে এই রকম কোন দলিল পাওয়া যায় না তাই এসব করা থেকে বিরত থাকুন।
.
পরিশেষে বলব, উপরোক্ত নির্দেশনা সমূহ পালনের মাধ্যমে আমরা বালা-মুসিবত নাযিল হওয়ার পূর্বে তা থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার চেষ্টা করি। আর বালা-মুসিবত আপতিত হয়ে গেলে সৎকর্ম, তওবা-ইস্তেগফার ও দো‘আর মাধ্যমে তা থেকে বাঁচার চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বালা-মুসিবত থেকে বিশেষ করে চলমান যাবতীয় সমস্যা থেকে রক্ষা করুন-আমীন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
▬▬▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়ঃ
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।