কোরআন ও সহীহ সুন্নাহ ভিত্তিক বার্তা প্রচার করাই এই ওয়েবসাইটের মূল উদ্দেশ্য।।

থার্টি ফার্স্ট নাইট, নববর্ষ দিবস উদযাপন সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা

ইসলাম ধর্মে মুসলিমদের উৎসবের দিন দুইটি ১. ঈদুল আযহা ২. ঈদুল ফিতর। আল্লাহ তা‘আলা মুসলিমদেরকে এ দুটি দিবস নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যে দুটি দিবসে তারা উৎসব পালন করবে, একে অপরের মধ্যে আনন্দ ভালোবাসা সুখ দুখ বিনিময় করবে। তাই ইসলামে উপরোক্ত দুটি উৎসবের দিন ছাড়া বাকি সব যেমন:- থার্টিফার্স্ট নাইট, ভালোবাসা দিবস, নববর্ষ দিবস, স্বাধীনতা দিবস বিজয় দিবস, জন্মদিবস, মৃত্যুদিবস, শোক দিবস,মা দিবস, বাবা দিবস, মে দিবস ইত্যাদি যত দিবস আছে এবার হোক সেটা আরবি, বা বাংলা, অথবা ইংরেজি,এক কথায় সকল দিবস পালন করা নিকৃষ্ট বিদ‘আত এবং নিষিদ্ধ হারাম। তাই এই সকল দিবসে অংশগ্রহণ করা তো দূরের কথা দূর থেকে দেখাও যাবে না।

আনাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেছেন, “রাসূলুল্লাহ ﷺ মাদীনাহ’য় পৌঁছে দেখতে পান যে, সেখানকার অধিবাসীরা দুইটি দিন [নওরোজ ও মেহেরজান] খেলাধুলা ও আনন্দ-উৎসব করে থাকে। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘এই দুটি দিন কীসের?’ তারা বলে, ‘জাহেলি যুগে আমরা এই দুই দিন খেলাধূলা ও উৎসব করতাম।’ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে এই দুই দিনের পরিবর্তে অন্য দুটি উত্তম দিন দান করেছেন। আর তা হলো, ‘ঈদুল আদ্বহা [কোরবানীর ‘ঈদ] এবং ‘ঈদুল ফিত্বর [রোজার ‘ঈদ]’। [আবূ দাঊদ, হা/১১৩৪; সনদ: সাহীহ] রাসূল ﷺ তো চাইলে বলতে পারতেন যে, তোমাদের দুই দিন থাক। সাথে এই দুটিও নাও। কিন্তু তিনি তা বলেননি। কারণ ইসলাম এসেছে হক প্রতিষ্ঠা করতে বাতিলকে বিলুপ্ত করতে প্রাচীন অপসংস্কৃতি জাহেলিয়াতকে অপসৃত করতে। ইসলাম আর জাহেলিয়াত কখনো এক হতে পারে না। উপরোক্ত হাদীস থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে গেল যে, মুসলিমদের জীবনে এই দুটি দিবস ছাড়া অন্য কোনো দিবস থাকতে পারে না সুতরাং এই সকল দিবস নিষিদ্ধ হওয়ার কয়েকটি কারন নিচে উল্লেখ্য করা হল।

🌓প্রথমতঃ এই সকল দিবস রাসূল সাঃ নিজে অথবা তার ছাহাবীগণ কখনো নিজেরা পালন করেননি এবং এদিনগুলো কে কেন্দ্র করে বিশেষ কোনো আমল করেননি। তাছাড়া সব ধরনের দিবস পালন বিজাতীয় অপসংস্কৃতি ইহুদী-খ্রিস্টানদের অনুকরণ মাত্র। যা ইসলামে নিষিদ্ধ [আবূদাঊদ হা/৪০৩১, তিরমিযী হা/২৬৯৫ সিলসিলা ছহীহাহ হা/২১৯৪]।

অপর বর্ননায় রাসূল [ছাঃ] স্বীয় উম্মতকে সাবধান করে বলেন, তোমরা ইহূদী-নাছারাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে হাতে হাতে ও বিঘ’তে বিঘ’তে। তারা যদি গুই সাপের গর্তে ঢুকে পড়ে, তোমরাও সেখানে ঢুকবে’[ইবনু মাজাহ হা/৩৯৯৪,সনদ হাসান]

🌓দ্বিতীয়তঃ শারঈ কোন নির্দেশনা নেই এমন কোন কাজ মুসলিমরা করতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ রয়েছে আল্লাহর রাসূলের মধ্যে [সূরা আল-আহযাব : ২১]

রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছুর উদ্ভব ঘটাল, যা তার মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’[বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৪০]

🌓তৃতীয়তঃ এসকল দিবসে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজনের দ্বারা বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সময়ের অপচয় হয়। আল্লাহ বলেন, অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই [সূরা বনী ইসরাঈল ২৭]

অপচয়কারীর জন্য আখেরাতে রয়েছে কঠিন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আল্লাহ বলেন,আর বাম পাশের দল। কতই না হতভাগ্য তারা! তারা থাকবে উত্তপ্ত বায়ু ও ফুটন্ত পানির মধ্যে। যা শীতল নয় বা আরামদায়ক নয়। ইতিপূর্বে তারা ছিল ভোগ-বিলাসে মত্ত’ [সূরা ওয়াক্বি‘আহ ৫৬/৪১-৪৫]

🌓চতুর্থতঃএসব অনুষ্ঠান সমাজে অশ্লীলতা ও বেলাল্লাপনা প্রসারের অন্যতম মাধ্যম। আর মহান আল্লাহ প্রকাশ্য ও গোপন সকল প্রকার অশ্লীলতা করা দুরে থাক অশ্লীলতার নিকটবর্তী হতেও নিষেধ করেছেন[সূরা বনি ইসরাইল:৩২ আন‘আম ১৫১]

🌓পঞ্চমতঃএই সকল দিবসকে কেন্দ্র করে সমাজে যা প্রচলিত আছে তার সবই বিজাতীয় কুসংস্কার অনেক ক্ষেত্রে শিরকের অন্তর্ভুক্ত। ইসলামী সভ্যতায় এসবের কোনো অস্তিত্ব নেই। কেননা নির্ধারিত দিনে কোনো কল্যাণ বা বরকত রয়েছে মনে করা শিরক। আবূ ওয়াক্বিদ আল-লায়ছী [রাযিয়াল্লাহু আনহু] হতে বর্ণিত, যখন রাসূলুল্লাহ [ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] হুনায়নের যুদ্ধে বের হলেন, তখন তিনি মুশরিকদের এমন এক গাছের নিকট দিয়ে গমন করলেন, যাতে তারা নিজেদের অস্ত্রসমূহ ঝুলিয়ে রাখত। উক্ত গাছটিকে ‘যাতু আনওয়াত’ বলা হত। এটা দেখে কোন কোন নতুন মুসলিমরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ঐ সমস্ত মুশরিকদের মতো আমাদের জন্যও একটি ‘যাতু আনওয়াত’ ধার্য করে দিন। তখন রাসূলুল্লাহ >ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম][বিস্ময় প্রকাশে] বললেন, ‘সুবহা-নাল্ল-হ মূসা [আলাইহিস সালাম]-এর সম্প্রদায়ও তাকে বলেছিল, ‘হে মুসা! আমাদের জন্য এরূপ উপাস্য নির্ধারণ করে দিন যেরূপ ঐ কাফের সম্প্রদায়ের উপাস্য রয়েছে’[আল আ’রাফ, ৭/১৩৮]তোমরাও তো সেরূপ কথা বললে, সেই মহান সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চয় তোমরা ঐ সকল লোকদের পথ অনুকরণ করে চলবে, যারা তোমাদের আগে অতীত হয়ে গেছে [মিশকাত, হা/৫৪০৮]

🌓ষষ্ঠঃমুসলিমদের অনেকেই বর্ষবরণ করতে দিয়ে শিরকের মত সবচেয়ে বড় পাপে লিপ্ত হয়ে ঈমান হারা হচ্ছে। এই দিনে আর তাদের শ্লোগান হচ্ছে- “মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরাঅগ্নি স্নানে সূচি হোক ধরা।”

উক্ত শ্লোগানে অগ্নিপূজকদের আগুন দ্বারা পবিত্র হওয়ার ভ্রান্ত বিশ্বাস সু-স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে। অথচ অগ্নিকে সম্মান করা, আগুনের কাছে সাহায্য চাওয়া এবং আগুন দ্বারা পবিত্র হওয়ার ধারণা করা শিরক। আর আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,নিশ্চয় আল্লাহ তা’য়ালা তার সাথে শিরক কারীকে ক্ষমা করবেন না।”[সূরা নিসাঃ৪৮]

অপর আয়াতে শিরক কারীদের জন্য জান্নাত হারাম ঘোষণা করেছেন [সূরা মায়েদাহ:৭২]

🌓এই সকল দিবস নিষিদ্ধ এ ব্যাপারে কয়েকজন যুগশ্রেষ্ঠ বিদ্বানের বক্তব্য নিম্নরূপ—

◽১. সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ বিন ‘আমর [রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা] বলেছেন,“যে ব্যক্তি [অগ্নিপূজক] পারসিকদের দেশে গমন করে, অতঃপর তাদের নওরোজ [নববর্ষ] ও মেহেরজান [উৎসবের দিবস] পালন করে, আর তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে এবং এ অবস্থাতেই মারা যায়, তাহলে কেয়ামতের দিন তার হাশর তাদের সাথেই হবে।” [বাইহাক্বী, খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ২৩৪; গৃহীত: ইমাম ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ), আহকামু আহলিয যিম্মাহ, পৃষ্ঠা: ১২৪৮; ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ ও ইমাম ইবনুল ক্বাইয়্যিম [রহঃ] দীসটিকে সাহীহ বলেছেন]

◽২. ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,“হিজরী নববর্ষের আগমন উপলক্ষে উৎসব করা কিংবা নববর্ষের দিবস উপলক্ষে পরস্পরকে সম্ভাষণ জানানোর রীতি চালু করা সুন্নাহ বহির্ভূত কর্ম।” [আদ্ব-দ্বিয়াউল লামি‘, পৃষ্ঠা: ৭০২; গৃহীত: sahab.net]
·
◽৩. ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) প্রদত্ত ফাতওয়া—প্রশ্ন: “যদি কোনো ব্যক্তি আমাকে বলে, ‘সকল বছরে আপনি ভালো থাকুন’, তাহলে এই [নববর্ষের] দিনগুলোতে এই শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা কি শরিয়তসম্মত হবে?”

উত্তর: “না, এই শব্দগুচ্ছ শরিয়তসম্মত নয়। এটি অবৈধ, না-জায়েজ।” [আল-ইজাবাতুল মুহিম্মাহ, পৃষ্ঠা: ২৩০; গৃহীত: sahab.net]
·
◽৪. সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটি [সৌদি ফাতাওয়া বোর্ড] প্রদত্ত ফাতওয়া’য় বলা হয়েছে,“হিজরী নববর্ষ উপলক্ষে মুবারকবাদ জানানো জায়েজ নয়। কেননা নববর্ষকে অভ্যর্থনা জানানো শরিয়তসম্মত নয়।” [ফাতাওয়া লাজনাহ দাইমাহ; ফাতওয়া নং: ২০৭৯৫; গৃহীত: sahab.net ফতোয়া অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ মৃধা (হাফিঃ)]

অবশেষে আমাদের আহবান, হে আমার প্রানপ্রিয় মুসলিম ভাইবোন আসুন আমরা মহান আল্লাহ এবং সর্ব কালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব তার রাসূল [সাঃ] কে ভালোবাসে এই সকল দিবসকে প্রত্যাখ্যান করি কোরআন ও সহীহ সুন্নাহর অনুসরণ করি। মহান আল্লাহ সমস্ত মুসলিম উম্মাহকে সকল বেহায়াপনা অশ্লীলতা থেকে হেফাজত করুন আমীন।আল্লাহু আলাম
_________________________________
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়ঃ বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক
আবদুল্লাহ শাহেদ আল-মাদানী [হাফিঃ]
লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এম, এম ফার্স্ট ক্লাস। দাঈ: জুবাই দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।