বান্দা কীভাবে আল্লাহ তাআলার তাওহীদকে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে

ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য। অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রাণপ্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর আপনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয় সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন।তাওহীদ এমন এক মহান বিষয়, যা আল্লাহ তাআলা যার জন্য সহজ করে দেন, তার জন্য সহজ হয়ে যায়। আমরা মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের এবং সকল মুসলিম ভাইয়ের জন্য যাবতীয় কল্যাণের পথ সুগম করে দেন। জেনে রাখুন, বান্দা যথাযথভাবে তাওহীদ বাস্তবায়ন করতে পারে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই) এবং ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল)—এই দুটি সাক্ষ্যের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে। অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা, তাঁর ইবাদতে কাউকে শরিক না করা এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ঈমান এনে তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ ও তাঁর নির্দেশিত পন্থায় আল্লাহর ইবাদত করা।
.
শাইখ আব্দুল আযিয বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:فالواجب على جميع المسلمين أن يحققوا هذه الكلمة، بمراعاة هذه الشروط، ومتى وجد من المسلم معناها، والاستقامة عليه: فهو مسلم، حرام الدم والمال، وإن لم يعرف تفاصيل هذه الشروط، لأن المقصود هو العلم بالحق، والعمل به ، وإن لم يعرف المؤمن تفاصيل الشروط المطلوبة“সকল মুসলিমের উপর ফরয হলো: এই কালিমা বাস্তবায়ন করা; এর শর্তগুলো রক্ষা করার মাধ্যমে। যখনই কোন মুসলিমের মাঝে এই শর্তগুলোর মর্ম পাওয়া যাবে এবং এর উপর অবিচলতা পাওয়া যাবে তখনই সে মুসলিম; যার রক্ত ও সম্পদ হারাম; এমনকি সে যদি এই শর্তগুলো বিস্তারিতভাবে না জেনে থাকে তবুও। কেননা উদ্দেশ্য হচ্ছে সত্যকে জানা এবং সে অনুযায়ী আমল করা। যদিও কোন মুমিন শর্তগুলোর বিস্তারিত বিবরণ না জানে।”[মাজমুউ ফাতাওয়াস শাইখ বিন বায;৭/৫৮)]
.
শাইখ হাফেয আল-হাকামী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:” لم ينتفع قائل لا إله إلا الله بنطقه بها مجردا، إلا حيث يستكملها أي: هذه الشروط السبعة. ومعنى استكمالها: اجتماعها في العبد، والتزامه إياها، بدون مناقضة منه لشيء منها.وليس المراد من ذلك عد ألفاظها، وحفظها ، فكم من عامي اجتمعت فيه، والتزمها، ولو قيل له: اعددها، لم يحسن ذلك.وكم حافظ لألفاظها، يجري فيها كالسهم ، وتراه يقع كثيرا فيما يناقضها، والتوفيق بيد الله، والله المستعان “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ কেবল মৌখিকভাবে বলার দ্বারা ব্যক্তি উপকৃত হবে না; যতক্ষণ না এই সাতটি শর্ত পূর্ণ না করে। শর্তগুলো পূর্ণ করার অর্থ হলো: বান্দার মধ্যে এগুলো পাওয়া যাওয়া এবং বান্দা এগুলোর উপর অটল থাকা; এগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক কিছু ব্যতিরেকে।এর উদ্দেশ্য এটা নয় যে, গুণে গুণে এ শর্তগুলোর শব্দাবলী মুখস্ত করা। কত সাধারণ মানুষের মাঝে এ শর্তগুলো পাওয়া যায় এবং এগুলো তিনি পূর্ণ করেন; কিন্তু তাকে যদি বলা হয়: শর্তগুলো বলেন তো; বলতে পারবেন না। আবার এ শর্তগুলোর শব্দাবলী মুখস্তকারী কত হাফেয রয়েছে; কিন্তু সে এ শর্তগুলোর মধ্যে তীরের মত ছুটাছুটি করে। আপনি দেখবেন যে, সে এমন অনেক কিছুতে লিপ্ত হয় যা এই শর্তবলীর সাথে সাংঘর্ষিক। তাওফিক আল্লাহ্‌র হাতে এবং আল্লাহই্ সহায়।”[মাআ’রিজুল কাবুল (২/৪১৮) থেকে সমাপ্ত]
.
তাওহীদের এই বাস্তবায়নের দুটি স্তর রয়েছে:
.
প্রথম স্তর: আবশ্যকীয় স্তর: তাওহীদের আবশ্যকীয় স্তর হলো, বান্দা এমনভাবে আল্লাহর একত্ববাদ বাস্তবায়ন করবে, যাতে তার ঈমান ও আমল শিরক, বিদআত এবং যাবতীয় পাপাচার থেকে মুক্ত থাকে। আর তা অর্জন করতে হলে তাকে তিনটি বিষয় যথাযথভাবে পরিহার করতে হবে:
.
(১).সকল প্রকার শিরক পরিত্যাগ করা: চাই তা বড় শিরক হোক কিংবা ছোট শিরক অথবা গোপন শিরক। অর্থাৎ, ইবাদতের কোনো প্রকার আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য নিবেদন না করা এবং আল্লাহর অধিকার ও একক ইবাদতে কাউকে শরিক না করা।
.
(২).সকল প্রকার বিদআত পরিত্যাগ করা: অর্থাৎ, দ্বীনের মধ্যে এমন কোনো নতুন বিষয় বা ইবাদতের পদ্ধতি উদ্ভাবন না করা, যার পক্ষে কুরআন ও সুন্নাহর কোনো দলিল নেই। বরং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা।
.
(৩).সকল প্রকার পাপাচার ও আল্লাহর অবাধ্যতা পরিত্যাগ করা: অর্থাৎ, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, আল্লাহর আদেশ পালন করা এবং তাঁর নিষেধকৃত বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকা।
সুতরাং, তাওহীদের আবশ্যকীয় স্তর বাস্তবায়নের অর্থ হলো—বান্দা তার আকীদা, ইবাদত ও আমলকে শিরক, বিদআত এবং যাবতীয় অবাধ্যতা থেকে মুক্ত রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। এভাবেই সে আল্লাহর একত্ববাদের আবশ্যকীয় হক আদায়ের পথে অগ্রসর হবে।
.
▪️দ্বিতীয় স্তর: মুস্তাহাব বা তাওহীদের পরিপূর্ণতার স্তর: এটি তাওহীদ বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ উৎকর্ষ ও পরিপূর্ণতার স্তর, যেখানে মানুষের মধ্যে মর্যাদা, ফযিলত ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের ক্ষেত্রে ব্যাপক তারতম্য সৃষ্টি হয়। এ স্তরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, বান্দার অন্তর সম্পূর্ণরূপে মহান আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট থাকবে; আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো প্রতি কোনো ধরনের অন্তর্নিহিত আসক্তি, আকর্ষণ কিংবা নির্ভরশীলতা তার অন্তরে স্থান পাবে না। তার প্রতিটি কথা, কাজ, ইবাদত ও আমল হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে। এমনকি তার অন্তরের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি ও যাবতীয় প্রবণতাও আল্লাহর আনুগত্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের অধীন থাকবে। একদল আলেম এই স্তরকে এভাবে ব্যক্ত করেছেন: যে বিষয়টি মূলত দোষণীয় বা নিষিদ্ধ নয়, তবুও কোনো দোষণীয় কিংবা নিষিদ্ধ বিষয়ে পতিত হওয়ার আশঙ্কায় তা পরিহার করাই এ স্তরের অন্তর্ভুক্ত। এ স্তরের অন্তর্ভুক্ত হলো অন্তরের আমল, জিহ্বার আমল এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল। আর তাওহীদের এই দুটি স্তর যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে কয়েকটি বিষয় অপরিহার্য।
.
(১).বিশুদ্ধ জ্ঞান ও সঠিক উপলব্ধি অর্জন: তাওহীদ সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান অর্জন করা এবং এর প্রকৃত তাৎপর্য ও দাবি অনুধাবন করা। কেননা, কোনো ব্যক্তি যে বিষয়ে জ্ঞান রাখে না, সে বিষয়ে যথাযথভাবে আমল করাও তার পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তির ওপর আবশ্যক হলো, সে তাওহীদ সম্পর্কে এতটুকু জ্ঞান অর্জন করবে, যার মাধ্যমে তার আকিদা, কথা ও আমল বিশুদ্ধ হয়।
.
(২).দৃঢ় ঈমান ও অবিচল বিশ্বাস স্থাপন: আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল ﷺ-এর পক্ষ থেকে যেসব সংবাদ, নির্দেশনা ও বাণী এসেছে, সেগুলোর প্রতি কোনো ধরনের সন্দেহ, দ্বিধা কিংবা সংশয় ছাড়াই দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা।
.
(৩).পূর্ণ আনুগত্য ও আত্মসমর্পণ: আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর যাবতীয় আদেশ-নিষেধের সামনে নিঃশর্ত আনুগত্য ও আত্মসমর্পণ করা। অর্থাৎ, তাঁদের আদেশ যথাযথভাবে পালন করা এবং নিষিদ্ধ ও হারাম বিষয়গুলো সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা। বান্দা যত বেশি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে এসব বিষয় বাস্তবায়ন করবে, তার তাওহীদ তত বেশি পরিপূর্ণতা লাভ করবে এবং সে অনুযায়ী তার প্রতিদানও বৃদ্ধি পাবে।
.
তাওহীদকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাস্তবায়নকারীদের পুরস্কার:
আমাদের রাসূলুল্লাহ সা. আমাদের জানিয়েছেন, যে ব্যক্তি তাওহীদের সর্বোচ্চ স্তর বাস্তবায়ন করতে পারবে, তার জন্য সুসংবাদ হলো সে সত্তর হাজার ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত হবে, যারা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমরা আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করি। ‘ইমরান ইবনু হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত:বদনজর কিংবা বিষাক্ত দংশন ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রে ঝাড়ফুঁক নেই। বর্ণনাকারী বলেন: এরপর এ হাদিস আমি সাঈদ ইবন যুবাইর (রহঃ)-এর কাছে উল্লেখ করলে তিনি বললেন: আমাদের নিকট ইবন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:”আমার সামনে সকল উম্মতকে পেশ করা হয়েছিল। (তখন আমি দেখেছি) দু-একজন নবী পথ চলতে লাগলেন এমতাবস্থায় যে, তাঁদের সাথে একজনও নেই। অবশেষে আমার সামনে তুলে ধরা হল বিশাল দল। আমি জিজ্ঞেস করলাম: এটা কী? এ কি আমার উম্মত? উত্তর দেয়া হল: না, ইনি মূসা (আঃ) এবং তাঁর কওম। আমাকে বলা হল: আপনি ঊর্ধ্বাকাশের দিকে তাকান। তখন দেখলাম: বিশাল একটি দল যা দিগন্তকে ঢেকে রেখেছে। তারপর আমাকে বলা হল: আকাশের দিগন্তসমূহ ঢেকে দিয়েছে এমন একটি বিশাল দলের প্রতি লক্ষ্য করুন। তখন বলা হল: এরা হল আপনার উম্মত। আর তাদের মধ্য থেকে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।তারপর নবী (ﷺ) ঘরে চলে গেলেন। উপস্থিতদের কাছে কথাটির কোন ব্যাখ্যা প্রদান করলেন না। (যে বিনা হিসাবের লোক কারা হবে?) ফলে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে তর্ক বিতর্ক শুরু হল। তারা বলল: আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর অনুসরণ করে থাকি। সুতরাং আমরাই তাদের অন্তর্ভুক্ত। কিংবা তারা হল আমাদের সে সকল সন্তান-সন্ততি যারা ইসলামের যুগে জন্মগ্রহণ করেছে। আর আমাদের জন্ম হয়েছে জাহিলি যুগে।নবি (ﷺ)-এর কাছে এ সংবাদ পৌঁছালে তিনি বেরিয়ে আসলেন এবং বললেন: তারা হল সে সব লোক যারা মন্ত্র পাঠ করে না, পাখির মাধ্যমে কোন কাজের ভাল-মন্দ নির্ণয় করে না এবং আগুনের সাহায্যে দাগ লাগায় না। বরং তারা তো তাদের রবের উপরই ভরসা করে থাকে।তখন উক্কাশা ইবন মুহসান (রাঃ) বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! তাদের মধ্যে কি আমি আছি? তিনি বললেন: হ্যাঁ। তখন আরেকজন দাঁড়িয়ে বলল: তাদের মধ্যে কি আমিও আছি? তিনি বললেন: উক্কাশা এ সুযোগ তোমার আগেই নিয়ে নিয়েছে।”(সহীহ বুখারী হা/৫৭০৫, সহীহ মুসলিম ২২০)
.
উক্ত হাদীসের কয়েকটি শব্দের ব্যাখ্যা: لا يسترقون (লা ইয়াসতারকুন) অর্থাৎ,তারা অন্যের কাছে ঝাড়ফুঁক করানোর আবেদন করে না। যদিও ঝাড়ফুঁক করানোর আবেদন করা বৈধ, তবে তা উত্তম ও অধিক পরিপূর্ণ পন্থার পরিপন্থী।ولا يتطيرون (ওয়ালা ইতাত্বইয়্যারুন) অর্থাৎ, তারা পাখি কিংবা অন্য কোনো বস্তুর মাধ্যমে কুলক্ষণ গ্রহণ করে না। যেমন কোনো কিছুকে অশুভ মনে করে পূর্বনির্ধারিত কোনো কাজ থেকে বিরত থাকা। কুলক্ষণ গ্রহণ করা হারাম এবং এটি ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত। (ولا يكتوون (ওয়ালা ইয়াকতাউন) অর্থাৎ, তারা নিজেদের রোগের চিকিৎসার জন্য আগুন দিয়ে দাগ দেওয়ার পদ্ধতি অবলম্বন করে না; যদিও এর উপকারিতা প্রমাণিত হয়। কারণ রাসূল (ﷺ)-এই চিকিৎসাপদ্ধতিকে অপছন্দ করেছেন। আর আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার একমাত্র আগুনের রবের।এই তিনটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে যে বিষয়টি অভিন্ন, তা হলো: তারা নিজেদের রবের ওপরই পূর্ণ ভরসা রাখে।তারা তাওয়াক্কুলের সর্বোচ্চ ও পরিপূর্ণ স্তর অর্জন করেছে। ফলে তাদের অন্তরে উপায়-উপকরণের প্রতি সামান্যতম নির্ভরতাও অবশিষ্ট নেই; বরং তাদের নির্ভরতা একমাত্র তাদের রবের ওপর। সাঈদ ইবনু হাবীব বলেছেন, তাওয়াক্কুল হলো ঈমানের সামগ্রিক রূপ। বরং ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,এটি হলো ঈমানের সর্বোচ্চ চূড়ান্ত স্তর। এই হাদীস সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৪২০৩ নম্বর প্রশ্নের উত্তরটি দেখে নিতে পারেন। বিষয়টির গুরুত্বের কারণে সেটি পর্যালোচনা করা উচিত।(আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে ভালো জানেন)
.
তাওহীদ বাস্তবায়ন কেবল আকাঙ্ক্ষা,বাহ্যিক সাজসজ্জা কিংবা বাস্তবতাবিবর্জিত দাবির মাধ্যমে অর্জিত হয় না। বরং তা অর্জিত হয় অন্তরে সুদৃঢ়ভাবে প্রোথিত ঈমানের আকিদা ও ইহসানের বাস্তবতার মাধ্যমে যার সত্যতা প্রমাণ করে সুন্দর চরিত্র এবং মহান নেক আমলসমূহ। সুতরাং প্রত্যেক মুসলিমের উচিত,জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানো, সময়ের প্রতিটি ক্ষণকে কল্যাণের কাজে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতার ময়দান হিসেবে গ্রহণ করা এবং ইবাদত-বন্দেগিতে পরস্পর অগ্রগামী হওয়ার চেষ্টা করা। কঠিন বিষয়কে সহজ মনে করতে হবে এবং কষ্টকে উপভোগ করতে শিখতে হবে। কেননা, আল্লাহর পণ্য অত্যন্ত মূল্যবান। জেনে রাখুন, আল্লাহর পণ্য হলো জান্নাত। (আল কাওলুস সাদীদ আলা মাকাসিদি কিতাবিত তাওহীদ, শাইখ আব্দুর রহমান সা‘দী রহ. ২০–২৩)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
وتحقيق التوحيد: تخليصه من الشرك، ولا يكون إلا بأمور ثلاثة:
الأول: العلم; فلا يمكن أن تحقق شيئا قبل أن تعلمه، قال الله تعالى: {فاعلم أنه لا إله إلا الله}.
الثاني: الاعتقاد، فإذا علمت ولم تعتقد، واستكبرت، لم تحقق التوحيد، قال الله تعالى عن الكافرين: {أجعل الآلهة إلها واحدا إن هذا لشيء عجاب}، فما اعتقدوا انفراد الله بالألوهية.
الثالث: الانقياد، فإذا علمت واعتقدت، ولم تنقد، لم تحقق التوحيد، قال تعالى: {إنهم كانوا إذا قيل لهم لا إله إلا الله يستكبرون ويقولون أإنا لتاركوا آلهتنا لشاعر مجنون}.
فإذا حصل هذا، وحقق التوحيد; فإن الجنة مضمونة له بغير حساب،
“আর তাওহীদকে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করার অর্থ হলো,একে শিরক থেকে মুক্ত ও বিশুদ্ধ করা। আর তা কেবল তিনটি বিষয়ের মাধ্যমেই সম্ভব।
প্রথমত: জ্ঞান (العلم)। কোনো বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন না করে তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ বলেন,”অতএব, জেনে রাখুন, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই।”(সূরা মুহাম্মাদ: ১৯)
দ্বিতীয়ত: বিশ্বাস (الاعتقاد)। যখন তুমি কোনো বিষয় সম্পর্কে জানলে, কিন্তু তা বিশ্বাস করলে না এবং অহংকার প্রদর্শন করলে, তখন তুমি তাওহীদ বাস্তবায়ন করতে পারলে না। মহান আল্লাহ কাফিরদের সম্পর্কে বলেন,”সে কি সকল উপাস্যকে এক উপাস্যে পরিণত করেছে? নিশ্চয়ই এটি এক বিস্ময়কর ব্যাপার!’ (সূরা সোয়াদ: ৫) কেননা, তারা আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে মানতে এবং তাঁর একক ইলাহ হওয়ার বিষয়টি বিশ্বাস করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
তৃতীয়ত: আনুগত্য ও আত্মসমর্পণ (الانقياد)। যখন তুমি কোনো বিষয় সম্পর্কে জানলে, তা বিশ্বাসও করলে, কিন্তু তার প্রতি আনুগত্য ও আত্মসমর্পণ করলে না, তখনো তুমি তাওহীদ বাস্তবায়ন করতে পারলে না। মহান আল্লাহ বলেন,”তাদের অবস্থা ছিল এই যে, যখন তাদের বলা হতো, “আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই”, তখন তারা অহংকার করত। আর বলত, “আমরা কি এক উন্মাদ কবির কথায় আমাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করব?”’ (সূরা আস-সাফফাত: ৩৫–৩৬) সুতরাং, যখন এই তিনটি বিষয় অর্জিত হবে এবং তাওহীদ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হবে, তখন তার জন্য বিনা হিসাবে জান্নাত নিশ্চিত হয়ে যাবে….।”(ইবনু উসাইমীন: শারহু কিতাবিত তাওহীদ; খন্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৯১; গৃহীত ইসলাম ওয়েব ফাতওয়া নং-৩৭৩১৯৫)
.
পরিশেষে বলা যায়, তাওহীদ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করার অর্থ হলো—বিশুদ্ধ জ্ঞান, দৃঢ় বিশ্বাস ও পূর্ণ আনুগত্যের মাধ্যমে নিজের আকিদা, ইবাদত, কথা ও কাজকে সব ধরনের শিরক থেকে মুক্ত রেখে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা। পাশাপাশি শিরক, বিদআত ও যাবতীয় পাপাচার থেকে বেঁচে থেকে অন্তরকে একমাত্র আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট রাখা এবং তাঁর ওপর পূর্ণ ভরসা করা। সুতরাং তাওহীদ কেবল মুখের স্বীকৃতি নয়; বরং এটি অন্তরের বিশ্বাস ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার বাস্তব প্রতিফলন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বিশুদ্ধ তাওহীদ অর্জন, যথাযথভাবে তা বাস্তবায়ন এবং আমৃত্যু এর ওপর অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।
Share: