দুজন ব্যক্তি জামাআতে সালাত পড়ার সময় ইমাম ও মুক্তাদি কিভাবে দাঁড়াবে

প্রশ্ন: দুজন ব্যক্তি জামাআতে সালাত পড়ার সময় ইমাম ও মুক্তাদি কিভাবে দাঁড়াবে। একটু আগে-পিছে হয়ে নাকি সমান্তরাল হয়ে দাঁড়াবে?
▬▬▬▬▬▬▬◢✪◣▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর যখন মাত্র দু’জন ব্যক্তি জামাআতে সালাত আদায় করবেন, তখন সুন্নাহ হলো—ইমাম ও মুক্তাদী একই কাতারে পাশাপাশি দাঁড়াবেন। মুক্তাদী ইমামের ডান পাশে এমনভাবে অবস্থান করবে, যাতে উভয়ের কাঁধ কাঁধের সঙ্গে এবং পায়ের গোড়ালি গোড়ালির সঙ্গে সমান্তরাল থাকে। সে (মুত্তাদী) ইমামের সামনে অগ্রসর হবে না, আবার সম্মান দেখানোর অজুহাতে পেছনেও সরে দাঁড়াবে না; বরং সম্পূর্ণ সমানভাবে একই সরলরেখায় অবস্থান করবে। কিছু মানুষের ধারণা ইমামের মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য মুক্তাদীর সামান্য পেছনে দাঁড়ানো উত্তম। কিন্তু সহীহ হাদীসে এর কোনো প্রমাণ নেই। বরং সাহাবী ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত সহীহ হাদীসে স্পষ্টভাবে এসেছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ডান পাশে সমান্তরালভাবে দাঁড়িয়েছিলেন; পেছনে সরে যাননি।তাছাড়া ইমাম ও একজন মুক্তাদী মিলেও একটি পূর্ণ কাতার হিসেবে গণ্য হয়। আর কাতার সোজা করার শরয়ী নির্দেশ হলো—সবাই সমানভাবে দাঁড়াবে; কেউ কারো চেয়ে অগ্রবর্তী বা পশ্চাৎবর্তী হবে না। এটাই সুন্নাহসম্মত ও সহীহ পদ্ধতি। (এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইবনু উসামীন আশ-শারহুল মুমতি; আলা জাদিল মুস্তাকনি; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১০-১২)
.
ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) তার সহিহ বুখারীতে এ মর্মে একটি অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন:بَاب يَقُومُ عَنْ يَمِينِ الْإِمَامِ بِحِذَائِهِ سَوَاءً إِذَا كَانَا اثْنَيْنِ”পরিচ্ছেদঃ দু জন ব্যক্তি সালাত আদায় করলে, মুক্তাদী ইমামের ডানপাশে সোজাসুজি দাঁড়াবে।(সহীহ বুখারী অধ্যায়: ১০/ আজান, পরিচ্ছেদ: ১০/৫৭) তারপর তিনি নিম্নোক্ত হাদিসটি পেশ করেন: ইবনে আববাস (রাদিয়াল্লাহ আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,بِتُّ فِي بَيْتِ خَالَتِي مَيْمُونَةَ فَصَلَّى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الْعِشَاءَ، ثُمَّ جَاءَ فَصَلَّى أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ ثُمَّ نَامَ، ثُمَّ قَامَ فَجِئْتُ فَقُمْتُ عَنْ يَسَارِهِ، فَجَعَلَنِي عَنْ يَمِينِهِ، فَصَلَّى خَمْسَ رَكَعَاتٍ، ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ نَامَ حَتَّى سَمِعْتُ غَطِيطَهُ ـ أَوْ قَالَ خَطِيطَهُ ـ ثُمَّ خَرَجَ إِلَى الصَّلاَةِ‏“আমি আমার খালা মায়মুনা রা. এর ঘরে রাত কাটালাম। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘ইশার সালাত আদায় করে আসলেন এবং চার রাক‘আত সালাত আদায় করে শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর উঠে সালাতে দাঁড়ালেন। তখন আমিও তাঁর বামপাশে দাঁড়ালাম। তিনি আমাকে তাঁর ডানপাশে নিয়ে নিলেন এবং পাঁচ রাকআত সালাত আদায় করলেন। অতঃপর আরও দু রাকআত সালাত আদায় করে নিদ্রা গেলেন। এমনকি আমি তাঁর নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেলাম। তারপর তিনি (ফজরের) সালাতের জন্য বের হলেন।”(সহীহ বুখারী হা/৬৯৯, ১১৭; মুসলিম হা/৬৬০)
.
“উক্ত হাদিস থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইবনে আব্বাস (রা.)–কে নিজের ডান পাশে একই কাতারে সমান্তরালভাবে দাঁড় করিয়েছিলেন; তাঁকে চার আঙুল পরিমাণ বা সামান্য পিছনে দাঁড় করাননি। এ থেকেই বোঝা যায়, যখন ইমাম ও একজন মুক্তাদি একসাথে সালাত আদায় করবে, তখন মুক্তাদি ইমামের ডান পাশে সরাসরি সমান্তরালভাবে দাঁড়াবে। এ বিধানটির দিকেই ইঙ্গিত করে ইমাম বুখারি তাঁর গ্রন্থ সহিহ বুখারি-তে একটি অধ্যায়ের শিরোনাম স্থির করেছেন: ‘যখন দু’জন ব্যক্তি সালাত আদায় করবে, তখন মুক্তাদি ইমামের ডান পাশে দাঁড়াবে।’”
.
এছাড়াও অন্য হাদিসে এসেছে: উবায়দুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে উতবা ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন: دَخَلْتُ عَلَى عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ بِالْهَاجِرَةِ فَوَجَدْتُهُ يُسَبِّحُ فَقُمْتُ وَرَاءَهُ فَقَرَّبَنِي حَتَّى جَعَلَنِي حِذَاءَهُ عَنْ يَمِينِهِ فَلَمَّا جَاءَ يَرْفَا تَأَخَّرْتُ فَصَفَفْنَا وَرَاءَهُ.”আমি উমার ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট প্রবেশ করলাম।সময়টা ছিল গরম। আমি তখন তাঁকে নফল সালাত রত (সালাতুয যোহা বা চাশতের সালাত) অবস্থায় পেলাম। তাই আমি তাঁর পেছনে দাঁড়ালাম। তারপর তিনি আমাকে কাছে আনলেন এবং তাঁর ডান পার্শ্বে তাঁর বরাবর আমাকে দাঁড় করালেন। তারপর ইয়ারফা (উমর রা. এর খাদেম) আসলে আমি পেছনে সরে আসলাম। তারপর আমরা দু’জনেই তাঁর পেছনে কাতার করে দাঁড়ালাম।”(মুআত্তা মালিক; পরিচ্ছদ-৯,হা/৩৪৮, সনদ সহিহ)
.
অপর একটি বর্ননায় আব্দুর রাযযাক তার মুসান্নাফ হাদিসগ্রন্থে ইবনে জুরাইজ থেকে বর্ণনা করেন قلت لعطاء: الرجل يصلي مع الرجل، أين يكون منه؟ قال: إلى شقه الأيمن، قلت: أيحاذي به حتى يصف معه لا يفوت أحدهما الآخر؟ قال: نعم، قلت: أتحب أن يساويه حتى لا تكون بينهما فرجة؟ قال: نعم”তিনি বললেন, আমি আত্বাকে জিজ্ঞেস করলাম, একজন ব্যক্তি আরেকজনের সাথে সালাত আদায় করলে সে কোথায় অবস্থান করবে? তিনি বললেন: তার ডান পাশে।আমি বললাম: সে কি তার সাথে এমন সমন্তরালভাবে কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়াবে যে, একজন অপরজন থেকে দূরে থাকবে না? তিনি বললেন: হ্যাঁ। আমি বললাম: আপনি এটা পছন্দ করেন যে, সে তার এমন বরাবর দাঁড়াবে যে,তাদের মাঝ কোনো ফাঁক থাকবে না? তিনি বললেন: হ্যাঁ।”(মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৪০৬; হা/৩৮৭০)
.
​দুঃখজনক হলেও সত্যি মাযহাবের দোহাই দিয়ে কেউ কেউ বলেন,ইমাম মুক্তাদী দুজন মিলে জামাআতে সালাত পড়ার সময় মুক্তাদী ইমাম থেকে একটু পেছনে সরে দাঁড়াবে। তাদের এই যুক্তি যে বাতিল সে সম্পর্কে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্ভল (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর মুসনাদে প্রখ্যাত সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) [মৃত: ৬৮ হি.] থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন:
أَتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ آخِرِ اللَّيْلِ فَصَلَّيْتُ خَلْفَهُ ، فَأَخَذَ بِيَدِي فَجَرَّنِي فَجَعَلَنِي حِذَاءَهُ ، فَلَمَّا أَقْبَلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى صَلاتِهِ خَنَسْتُ ، فَصَلَّى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمَّا انْصَرَفَ قَالَ لِي : ( مَا شَأْنِي أَجْعَلُكَ حِذَائِي فَتَخْنِسُ ؟) فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ : أَوَ يَنْبَغِي لأَحَدٍ أَنْ يُصَلِّيَ حِذَاءَكَ وَأَنْتَ رَسُولُ اللَّهِ الَّذِي أَعْطَاكَ اللَّهُ ؟
​”আমি শেষ রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এলাম এবং তাঁর পেছনে সালাতে দাঁড়ালাম। তখন তিনি আমার হাত ধরে টেনে আমাকে তাঁর পাশে (বরাবর) দাঁড় করালেন। এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন সালাতে পূর্ণ মনোযোগ দিলেন, তখন আমি (চুপিচুপি) পিছিয়ে গেলাম। সালাত শেষ করে তিনি আমাকে বললেন: ‘কী ব্যাপার, আমি তোমাকে আমার পাশে দাঁড়ালাম আর তুমি পিছিয়ে গেলে?’ আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! আপনার পাশে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করা কি কারো জন্য সমীচীন, যেখানে আপনি স্বয়ং আল্লাহর রাসূল যাকে আল্লাহ (এত বিশাল) মর্যাদা দান করেছেন?”।(মুসনাদে আহমাদ হা/২৯০২,ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) হাদিসটি ‘সিলসিলাহ সহিহাহ’ গ্রন্থে হা/২৫৯০ সহিহ বলেছেন)
.
এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, ইমামের সাথে মাত্র একজন মুক্তাদী হলে সে ইমামের ঠিক বরাবর ডান পাশে দাঁড়াবে—পিছনে নয়; কারণ রাসূল (ﷺ) নিজেই আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস-কে পাশে দাঁড় করিয়ে এ বিধান শিক্ষা দিয়েছেন। হাদিসটির সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেন:
وفيه فائدة فقهية هامة …وهي : أن السنة أن يقتدي المصلِّي مع الإمام عن يمينه وحذاءه غير متقدِّم عليه ولا متأخِّر عنه ، خلافاً لما في بعض المذاهب أه ينبغي أن يَأَخَّر عن الإمام قليلاً ، بحيث يجعل أصابع رجليه حذاء عقبي الإمام أو نحوه ، وهذا كما ترى خلاف هذا الحديث الصحيح ..
“​এই হাদিসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি শিক্ষা (উপকারিতা) রয়েছে…আর তা হলো: সুন্নাহ পদ্ধতি হলো—ইমামের সাথে (একাকী) সালাত আদায়কারী ব্যক্তি তাঁর ডান পাশে তাঁর বরাবর দাঁড়াবে; ইমামের থেকে সামনে এগিয়ে নয়, আবার পিছিয়েও নয় এটি কিছু মাযহাবের সেই মতের বিরোধী, যেখানে বলা হয়েছে যে, মুসল্লী ইমামের চেয়ে সামান্য পিছিয়ে দাঁড়াবেন,এমনভাবে যাতে মুসল্লির পায়ের আঙুলগুলো ইমামের গোড়ালি বরাবর থাকে। আর আপনি দেখতেই পাচ্ছেন যে, এই ধারণাটি এই সহিহ হাদিসের বিরোধী।”(দ্রষ্টব্য: সিলসিলাতুল আহাদিস আস-সহিহাহ; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১৭৪)। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
▬▬▬▬✿▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Share: